১
‘গান্ধী কে সাথ এক কদম’ নাম দিয়ে একটি ১৫ দিলের পদযাত্রা (২-রা অক্টোবর থেকে ১৬-ই অক্টোবর, ২০২৬) আয়োজন করেছেন সর্ব সেবা সংঘ ও কিছু গণতান্ত্রিক শান্তিকামী মানুষজন। হাঁটা হবে বেলেঘাটার গান্ধী ভবন থেকে শান্তিনিকেতন অবধি। এই খবরটা যখন পেলাম তখন আমি ভিতরে ভিতরে অত্যন্ত অস্থির হয়ে আছি। পশ্চিমবঙ্গে যেভাবে আগ্রাসী হিন্দুত্ববাদ সমস্ত রাষ্ট্রীয় হাতিয়ার হাতের মুঠোয় নিয়ে মুসলমানদের ‘দেশের শত্রু’-তে পরিণত করতে চাইছে, হিন্দু ছাড়া অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদেরও হিন্দুত্বকে সেলাম করে তবেই বেঁচে থাকতে হবে বলে ফরমান জারি করছে, নির্বাচক-তালিকা থেকে কাতারে কাতারে মুসলমানদের নাম ‘এস.আই.আর.’ নামক এক আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে কেটে বাদ দিয়ে তাদের বে-নাগরিক করে দেওয়ার আশঙ্কা ঘনিয়ে তুলেছে, ‘ডিটেক্ট-ডিলিট-ডিপোর্ট’ নামক সাধারণ বিচার-বিভাগীয় প্রক্রিয়ার আওতার বাইরে কায়েম করা এক প্রক্রিয়ায় হাজার হাজার মুসলমানকে ধরে ‘হোল্ডিং সেন্টার’-এ বন্দী করছে ও কয়েকদিনের মধ্যেই সীমান্তে নিয়ে গিয়ে দেশের বাইরে বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে--- এসব নিয়ে পশ্চিমবাংলার বিভিন্ন জেলায় ঘুরে ঘুরে তথ্য সংগ্রহ করতে করতে ভিতরে ভিতরে ভয়ঙ্কর বিপন্ন বোধ করছিলাম: ধর্মের নামে বিদ্বেষ, হিংসা, বিভাজন ও সন্ত্রাস এভাবে কায়েম করার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করার ভূমিকা কীভাবে এখনই নেওয়া যায়, সেই ভাবনা নাছোড় হয়ে উঠেছে। তাই যখন খবর পেলাম যে গান্ধী-রবীন্দ্রনাথ-উচ্চারিত শান্তি ও ভালোবাসার আহ্বান নিয়ে সর্বজনের কাছে যাওয়ার জন্য পদযাত্রার পরিকল্পনা হচ্ছে, তখন ভিতরের এই অস্থিরতা থেকেই তাতে শামিল হয়ে গেলাম।
২
পদযাত্রা শুরু কলকাতার বেলেঘাটার গান্ধী-ভবন থেকে। ১৯৪৭ সালের ১৫-ই আগস্ট, যখন এই ভবনের নাম ছিলো হায়দারি মঞ্জিল, গান্ধী এখানে দাঙ্গা প্রতিরোধ করার জন্য অনশনে বসেছিলেন। একবার ফিরে দেখা যাক সেই দিনগুলোর দিকে।
বিশিষ্ট গান্ধীবাদী লোকসেবক ও লেখক কানাইলাল দত্ত তাঁর ২০০৮ সালে প্রকাশিত ‘সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সন্ধানে মহাত্মা গান্ধী’ পুস্তকে এই বর্ণনা দিয়েছেন:
(নোয়াখালির উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে) ৯ আগস্ট (১৯৪৭) কলকাতা পৌঁছে তিনি (গান্ধীজি) সোদপুর খাদি প্রতিষ্ঠানে ওঠেন।… সন্ধ্যায় মুসলিম লিগ নেতা মহম্মদ ওসমান আসেন। তিনি অভিযোগ করেন সকল মুসলিম কর্মচারী পূর্ব পাকিস্তানে চলে যাওয়ায় (ভারত বিভাগের শর্ত হিসেবে সামরিক অসামরিক সকল শ্রেণির কর্মচারী নিজের পছন্দমতো খণ্ডে, অর্থাৎ, ভারতবর্ষে বা নবগঠিত পাকিস্তানে যোগদানের অধিকার পেয়েছিলেন; অতি সামান্য ব্যতিক্রম বাদ দিলে সকল মুসলমান কর্মচারী পাকিস্তানে চাকুরি করা স্বীকার করে নেন) কলকাতার হিন্দুরা এখন বদলা নেওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে। একমাত্র গান্ধীজিই এই কঠিন পরিস্থিতি সমামলাতে সমর্থ। তাই তাঁরা গান্ধীজিকে নোয়াখালি যাত্রা স্থগিত রেখে কিছুদিন কলকাতায় থাকতে অনুরোধ করেন।
পরের দিন মহম্মদ ওসমান সাহেব মুসলিম সমাজের নেতৃস্থানীয় আরও কয়েকজনকে সঙ্গে করে আবার গান্ধীজির নিকট আসেন। তাঁরাও গান্ধীজিকে এই সময় কলকাতায় থাকার সনির্বন্ধ অনুরোধ করেন। জবাবে গান্ধীজি জানান--- নোয়াখালিতে শান্তি বজায় থাকবে এই প্রতিশ্রুতি পেলে তিনি কয়েকদিন থেকে যেতে প্রস্তুত আছেন। তিনি আরও বলেন--- নোয়াখালিতে কোনও গোলমাল হলে আমার জীবন বরবাদ হয়ে যাবে এবং আমার আমৃত্যু অনশন আপনাদের দেখতে হবে। কঠিন শর্ত। তখনই কিছু না বলে ফিরে গিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে তারা গান্ধীজির শর্ত মেনে নেন। নোয়াখালিতে গোলাম সারোয়ার ও তার ডেপুটি কাশিমকে টেলিগ্রাম পাঠিয়ে যে-কোনও মূল্যে নোয়াখালিতে শান্তি বজায় রাখার অনুরোধ করা হয়। এই ব্যবস্থায় সন্তুষ্ট হয়ে গান্ধীজি নোয়াখালি যাত্রার দিন ১১ আগস্ট বাতিল করে ১৩ আগস্ট নির্ধারণ করেন।
ছেচল্লিশের আগস্ট মাসে শুরু হওয়া কলকাতার দাঙ্গা এই সময়ে অনেকটা নিয়ন্ত্রিত হলেও সুযোগ-সুবিধা মতো খুন-জখম তখনও নিয়মিত চলছে। সত্যি হোক, মিথ্যা হোক, কলকাতার লোকের ধারণা ছিল সুরাহবর্দি সাহেবই দাঙ্গার জন্য দায়ী। তিনি (অবিভক্ত বাংলার) প্রধানমন্ত্রী (এখনকার রেওয়াজ অনুযায়ী মুখ্যমন্ত্রী) থাকায় হিন্দুরা যথার্থভাবে প্রতিরোধ করতে বা প্রতিশোধ নিতে পারেনি। সরকারি ক্ষমতা তাঁর হাত থেকে চলে গেলে পরিস্থিতি কী ভয়ানক হবে তা অনুমান করে তিনিও গান্ধীজিকে চেপে ধরলেন কলকাতায় শান্তি না ফেরা পর্যন্ত থাকার জন্য। গান্ধীজি জানান, শান্তি-সম্প্রীতি পুনরুদ্ধারের জন্য সুরাহবর্দি সাহেব তাঁর সঙ্গে পুলিশ বা মিলিটারির সুরক্ষা ছাড়া উপদ্রুত এলাকায় এক বাড়িতে বাস করে কাজ করতে রাজি থাকলে তিনি থেকে যাবেন। পরের দিন সুরাহবর্দি ওসমান সাহেবের হাত দিয়ে সম্মতিপত্র পাঠালে গান্ধীজি নোয়াখালি যাত্রা অনির্দিষ্ট কালের জন্য পিছিয়ে দিয়ে যতোদিন দরকার ততোদিন কলকাতায় থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত করেন। এই সিদ্ধান্ত অনুসারে পরের দিন ১৩ আগস্ট দুপুরে গান্ধীজি সদলবলে খাদি প্রতিষ্ঠান ছেড়ে দাঙ্গা-বিধ্বস্ত বেলেঘাটার নোংরা পরিবেশে ‘হায়দারি ম্যানসন’ নামে গণি মিঞার দেশলাই ফ্যাক্টরির একটি পরিত্যক্ত পুরোনো বাড়িতে গিয়ে ওঠেন। ঢোকার মুখেই কয়েকজন উত্তেজিত যুবক ক্রুদ্ধ কণ্ঠে জানতে চান এখন কেন এসেছেন? আমরা যখন বিপন্ন ছিলাম তখন কোথায় ছিলেন? এক বছর ধরে মুসলমানরা হিন্দুদের উপর যে নৃশংস অত্যাচার করেছে, তার প্রতিশোধ গ্রহণের অন্তরায় সৃষ্টি করতে এসেছেন? আপনি ফিরে যান… ইত্যাদি। ইতিমধ্যে সুরাহবর্দি সাহেব এসে পড়েন। তাঁকে দেখে যুবকগুলি আরও উত্তপ্ত হয়। গান্ধীজির সঙ্গে থাকবেন বলে অল্পক্ষণের মধ্যে কোয়েকার অধ্যাপক হোরেস আলেকজেন্ডার সাহেবও এসে পড়েন। তিনিও বাধাপ্রাপ্ত হন। কয়েকজন বিক্ষুব্ধ যুবককে গান্ধীজি ডেকে নিয়ে দীর্ঘক্ষণ কথা বলেন। দিনের পর দিন ঘৃণা-বিদ্বেষ-হিংসা-প্রতিহিংসার আগুনে দগ্ধ এই যুবকেরা গান্ধীজির যুক্তিতর্কে কর্ণপাত করেননি। অবশেষে রাত আটটার সময় তিনি জানিয়ে দিলেন--- তোমরা আমাকে বাধা দিতে পারো, তোমরা আমাকে এই বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিতে পারো, আমি পুলিশ ডাকবো না। কিন্তু তার জন্য আমাকে হিন্দুর শত্রু বলে অভিহিত করার দরকার কী? এটা কি তোমাদের অসহিষ্ণুতা নয়? এই কথা শেনার পর যুবকেরা একটু নমনীয় হন। একজন বলেন, ‘তাহলে আমরা এখন উঠি?’ গান্ধীজি বললেন, ‘হ্যাঁ, অনেক রাত হয়েছে, এসো। বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করো। কাল আবার এসো।’
যুবকেরা পরের দিনও এসেছিলেন। গান্ধীজি ওদের সঙ্গে সুরাহবর্দি সাহেবের সামনে খোলামেলা কথা বলেন। কলকাতায় তখন হিন্দু পাড়ার মুসলমানরা ও মুসলমান পাড়ার হিন্দুরা ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে গেছেন। হিন্দু পাড়ায় মুসলমানরা এবং মুসলমান পাড়ায় হিন্দুরা যেতে পারেন না। গান্ধীজি বললেন শান্তি চাইলে বেলেঘাটার ঘরছাড়া মুসলমানদের ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা হিন্দুদের করতে হবে। মুসলমান এলাকার ঘরছাড়া হিন্দুদের ফিরিয়ে আনতে হবে মুসলমানদের। এই প্রক্রিয়ার প্রথম পদক্ষেপ নেবে বেলেঘাটা।
গান্ধীজির সঙ্গে দেখা করার পর কারও পক্ষেই অপরিবর্তিত থাকা সম্ভব নয়। বেলেঘাটার যুবকেরাও পারেননি। তাঁরা গান্ধীজির সঙ্গে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ফিরে যান। এঁদের কেউ কেউ পরে হায়দারি ম্যানসনের পাহারাদার-স্বেচ্ছাসেবক হয়েছিলেন। ওইদিন হায়দারি ম্যানসনের প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত প্রার্থনাসভায় দশ হাজারেরও অধিক মানুষ উপস্থিত ছিলেন। ক্রুদ্ধ জনতার সামনে পড়ে সুরাহবর্দি সাহেব কলকাতার দাঙ্গার দায়িত্ব স্বীকার করেন। জনতার ক্ষোভ কিছুটা প্রশমিত হয়। গান্ধীজি বলেন, ‘মোড় ঘুরছে’। এই ঘটনার সময় হাজার পাঁচেক হিন্দু-মুসলমান মানুষের যুক্ত মিছিলের খবর আসে।…
স্বাধীনতার দিন (১৫ই আগস্ট, ১৯৪৭) হাজার হাজার মানুষ গান্ধীজির দর্শনের জন্য হায়দারি ম্যানসনে সমবেত হন। তিনি মধ্যে মধ্যে ঘর থেকে বেরিয়ে তাদের দর্শন নেন। কলকাতার পথে আনন্দোজ্জ্বল হিন্দু-মুসলমান জনতার সম্মিলিত মিছিল থেকে ‘হিন্দু-মুসলমান এক হো’, ‘হিন্দু-মুসলমান ভাই ভাই’, ‘জয় হিন্দ’, ইত্যাদি ধ্বনি ওঠে। গান্ধীজি দিনটা উপবাস করে কাটান। সুরাহবর্দি সাহেবও উপবাস করেন। বিকেলের প্রার্থনা সভায় ত্রিশ হাজার নরনারী যোগদান করেন।…
(৩১ আগস্ট, ১৯৪৭) প্রার্থনাসভায় গান্ধীজি ঘোষণা করে দেন ১ সেপ্টেম্বর তিনি নোয়াখালি যাত্রা করবেন।… ওইদিন কোনও ঘটনায় একজন হিন্দু আহত হলে হায়দারি ম্যানসন আক্রান্ত হয়। সেখানে দুষ্কৃতীদের নিক্ষিপ্ত ইটের আঘাতে একজন জখম হন, গান্ধীজি অল্পের জন্য রক্ষা পান। স্বগতভাবে গান্ধীজি বলেন--- এই কি ১৫ আগস্টের শান্তির আসল রূপ? পুলিশ এসে পরিস্থিতি সামাল দেয়। সংবাদ পেয়ে মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ এসে পড়েন। তিনি গান্ধীজির নিকট জানতে চান হিন্দু মহাসভার নেতৃবৃন্দকে গ্রেফতার করা হবে কিনা। গান্ধীজি বলেন, ‘গ্রেফতার না করে তাদের উপর শান্তি রক্ষার দায়িত্ব দাও। তাদের সহযোগিতা চাও আর জিজ্ঞাসা করো তোমরা শান্তি চাও কিনা?’… গান্ধীজি নোয়াখালি যাত্রা আবার স্থগিত রাখেন।
পরের দিন… বেলা দুটো নাগাদ শহরের নানা স্থান থেকে হিংস্র সংঘর্ষের খবর আসতে থাকে। গান্ধী বললেন, গুণ্ডাদের উপর দোষ চাপিয়ে হাত ধুয়ে বসে থাকলে চলবে না। You should go in the midst of flames and prevent them from spreading or get killed in the attempt. দাঙ্গাকারীদের মধ্যে গিয়ে তাদের নিরস্ত করতে হবে। দরকার হলে সেজন্য প্রাণ দিতে হবে।… ১ সেপ্টেম্বর রাত ৮টা থেকে তিনি অনশন শুরু করেন।… বিজ্ঞপ্তিতে তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, উপবাসের ফলে সংঘর্ষকারীদের হৃদয়ের পরিবর্তন হবে, দাঙ্গা বন্ধ হবে। অন্তরঙ্গজনের নিকট বলেছিলেন, ‘অন্ধকারে আমি হাতড়ে চলেছি। পুণ্য ভারতভূমিকে হিন্দু-মুসলমানের রক্তে কলঙ্কিত দেখবার চেয়ে মরণ ভালো।’…
অনশনের তৃতীয় দিনে মুসলিম বন্ধুদের সঙ্গে শান্তিযাত্রায় নোয়াখালি মিশনের অন্যতম কর্মী শচীন মিত্র ও তার বন্ধু স্মৃতিশ বন্দ্যোপাধ্যায় মধ্য কলকাতায় নাখোদা মসজিদের নিকটে ছুরিকাহত হয়েছিলেন। পরে শচীন মিত্রের মৃত্যু হয়। প্যারেলালজির নিকট ঘটনাটি জানার পর গান্ধীজি শচীনবাবুর স্ত্রী অংশুরানি মিত্রকে লেখেন--- ‘এই ঘটনা দুঃখের নয়, আমাদের শচীন অমর হয়েছে। তুমি শোক করবে না। শচীনকে অনুসরণ করে সেবার কাজে আত্মসমর্পণ করো।‘
শচীনের মৃত্যুতে ‘গুণ্ডামি চাই না’ ধ্বনি দিয়ে কলকাতার ছাত্রসমাজ বড় আকারে পথে নেমে আসে। বহু স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা শান্তির সপক্ষে বড় বড় মিছিল করে নগর পরিক্রমা করে।
অনশনের চতুর্থ দিন (৪ঠা সেপ্টেম্বর) দুষ্কৃতকারীদের অনেকে গান্ধীজির সঙ্গে দেখা করে অনুশোচনা ব্যক্ত করেন। গান্ধীজির ইচ্ছানুসারে ওইদিনই তারা আত্মরক্ষার এবং আক্রমণের জন্য সংগৃহীত গ্রেনেড ও অন্য অস্ত্রশস্ত্র লরি বোঝাই করে এনে হায়দারি ম্যানসনে গান্ধীজির নিকট সমর্পণ করে। পরের দিনও অনুরূপভাবে আরও কয়েক গাড়ি অস্ত্র জমা করা হয়েছিল। ইতিমধ্যে কলকাতার সকল সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিবর্গ গান্ধীজির নিকট আসেন… গান্ধীজিকে অনশন প্রত্যাহারের অনুরোধ জানান।… আলোচনার পর গান্ধীজি অনশন প্রত্যাহারের ইঙ্গিত দিয়ে বলেন: My blood will be upon your head if you say one thing and mean another. প্রতিনিধি দলের পক্ষ থেকে জানানো হয় পুনরায় দাঙ্গা শুরু হলে তা নিবারণ করার জন্য তাঁরা জীবন উৎসর্গ করবেন।…
রাত ৯টা ১৫মিনিটে এক গ্লাস জলমিশ্রিত কমলালেবুর রস পান করে গান্ধীজি অনশন ভঙ্গ করেন। পরে সংক্ষিপ্ত প্রার্থনা হয়। রবীন্দ্রনাথের ‘জীবন যখন শুকায়ে যায় করুণাধারায় এসো’ গানটি দিয়ে ৭৩ ঘন্টার অনশনের ইতি ঘটে।
কলকাতায় শান্তি ফেরার পর মাউন্টব্যাটেন গান্ধীজিকে পত্রে লিখেছিলেন:
…In the Punjab we have 55 thousand soldiers and large scale rioting in our hands. In Bengal our force consists of one man, and there is no rioting….
হায়দারি ম্যানসনের প্রায়ান্ধকার ভগ্ন ঘরে সেদিন হিংসার বিরুদ্ধে অহিংস প্রতিরোধ ও সত্যাগ্রহের শক্তি উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা হয়ে জ্বলে উঠেছিল।
৩
দোসরা অক্টোবর, ২০২৬। মহাত্মা গান্ধীর ১৫৭-তম জন্মদিন। গান্ধীর শান্তি ও অহিংস প্রতিরোধের দর্শনকে তুলে ধরার জন্য জাতিসংঘের পক্ষ থেকে এই দিনটিকে আন্তর্জাতিক অহিংসা দিবস হিসেবে যে ঘোষণা করা হয়েছে, তা-ও উনিশ বছর হয়ে গেল। দিবসগুলি পালিত হয়ে চলেছে, শপথগুলি নয়। আজ সকাল সাড়ে-আটটা নাগাদ পৌঁছে গেছি বেলেঘাটার গান্ধীভবন-এর সামনে। এখানেই ১৯৪৭ সালে ছিল ভাঙাচোরা প্রায়ান্ধকার হায়দারি ম্যানসন। সেই ভেঙে-পড়া-বাড়ি-র জায়গায় আজ এই ঝকঝকে গান্ধীভবন গড়ে তোলা হয়েছে, সরকারী নিয়ন্ত্রণাধীনে সেখানে গান্ধী মিউজিয়াম গড়ে তোলা হয়েছে। মিউজিয়াম ব্যাপারটি আমরা ঔপনিবেশিক প্রভুদের কাছ থেকে শিখেছিলাম। যে বস্তু বর্তমানে আর টিকে নেই, বিলুপ্ত অতীতের যা স্মারক, সেসবকে মৃত-দেখতে-কৌতূহলী চোখের কৌতূহল মেটানোর জন্য প্রদর্শনকক্ষে সাজিয়ে রাখা হলো মিউজিয়ামের কাজ। সরকারী ব্যবস্থাপনায় গান্ধীর জীবন ও দর্শনকে এখন এই মিউজিয়ামের সামগ্রী করা হয়েছে। নকশা করে সাজানো গাছ, মার্বেল বাঁধানো চত্বর, উপবিষ্ট গান্ধীর একটি মূর্তি--- সেখানে চলছে গান্ধীজয়ন্তী পালনের তোড়জোড়, কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই দলের নেতাবাবুরা চলে আসবেন, যে দল মুসলমান-বিদ্বেষকে হাতিযার করে হিংস্র সন্ত্রাসী শাসন কায়েম করতে চাইছে এই বাংলায়, সেই নেতাবাবুরা গান্ধীর গলায় মালা দেবেন, গান্ধীর দর্শন নিয়ে বক্তৃতা দেবেন, গান্ধীকে আরও মিউজিয়ামের সামগ্রী করে তুলবেন। তাঁরা হাজির হওয়ার আগেই আমরা ওখান থেকে বেরিয়ে পড়লাম। আমরা মানে প্রায় জনা-সত্তর মানুষ। বাংলার মানুষ তো আছেই, তার সঙ্গে আছেন ভারতের আরো চোদ্দটা রাজ্য (রাজস্থান, হরিয়ানা, দিল্লি, মহারাষ্ট্র, তামিলনাডু, মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ, ঝাড়খণ্ড, আসাম, ওড়িশা, বিহার ইত্যাদি) থেকে আসা মানুষজন। মিউজিয়াম দেখতে নয়, বা, গান্ধীকে কোনো মিউজিয়ামে গচ্ছিত রাখতে নয়, আমরা জড়ো হয়েছি গান্ধী ও রবীন্দ্রনাথের দর্শন নিয়ে বর্তমানে পথ চলার চেষ্টার অঙ্গীকারে নিজেদের বাঁধার জন্য। মিউজিয়ামের অনুষ্ঠান শুরু হোয়ার আগেই আমরা তাই একসঙ্গে সর্ব-ধর্ম-প্রার্থনা সেরে আমরা মিছিলের আকারে আমাদের পদযাত্রা শুরু করে দিলাম। স্লোগান উঠল: ‘এক কদম গান্ধী কে সাথ’, সমবেত কণ্ঠ জবাব দিল: ‘হাম চলে হ্যায়, হাম চলেঙ্গে’। চলতে চলতে যখন প্রায় শিয়ালদার কাছাকাছি, মিছিলে তখন বেশ কিছু কণ্ঠ একসাথে গেয়ে চলেছে ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলো রে…’।
৪
আমরা হাঁটছি শান্তি ও ভালোবাসার আহ্বান নিয়ে। জাত ও ধর্মের পার্থক্যের চেয়ে অনেক শক্তিশালী পরস্পরের পড়শি হিসেবে, পরস্পরের প্রতি দায়বদ্ধ ও পরস্পরের উপর নির্ভরশীল মানুষ হিসেবে মানুষের সঙ্গে মানুষের সমাজবন্ধন--- এই প্রত্যয় নিয়ে আমরা হাঁটছি। রবীন্দ্রনাথ বারবার আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে আমাদের এই সমাজ দীর্ঘ ঐতিহ্য-পরম্পরার পথ ধরে গড়ে উঠেছে নানা জাতের নানা ধর্মের নানা উৎস থেকে আসা মানুষকে একই পরিসরে স্থান দিয়ে, পরস্পরের পার্থক্যগুলোকে সম্মান করে ঐক্যধারা গড়ে তুলে, পড়শিবোধের দায়-দায়িত্ব-ভালোবাসা ফুটিয়ে তুলে। এখানেই আমাদের আত্মশক্তি। এই আত্মশক্তির রসায়নেই আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতির বুনট গড়ে উঠেছে। আজ এই আত্মশক্তি ধ্বংস করে সমাজকে ভেঙে টুকরো-টুকরো করার উপক্রম হয়েছে ধর্মের নামে হিংসা-প্রতিহিংসা আমদানি করার মধ্য দিয়ে, তাই আমরা হাঁটছি।
রবীন্দ্রনাথ তাঁর প্রবন্ধগুলোয় বারবার রাষ্ট্র ও সমাজকে আলাদা করেছেন। এমনকি এমন পার্থক্যও টেনেছেন যে পাশ্চাত্য হলো রাষ্ট্রভিত্তিক সভ্যতা ও প্রাচ্য হলো সমাজভিত্তিক সভ্যতা। রাষ্ট্র মানেই শাসন, শাসক তার নিজ পরিচয়কে সর্বোচ্চ আসনে বসিয়ে অপর পরিচয়ধারী সবাইকে দমন করতে চায়, অথবা শাসনে বেঁধে পদানত করে রাখতে চায়, জাতিরাষ্ট্র এর সর্বোচ্চ ভয়ানকতম রূপ হাজির করে চলেছে, দ্বেষ-হিংসা-যুদ্ধোন্মাদনার আবর্তকে সর্বগ্রাসী রূপ দিয়েছে। অন্যদিকে সমাজ মানে বিবিধ অপরের একত্র যাপনপ্রক্রিয়া, তা জীবনের প্রবহমানতায় বিভিন্ন-বিবিধ-কে স্থান করে দেয়, আত্মীয়তাবন্ধনে বাঁধে, আত্মীকরণও করে, অপর সম্পর্কে কৌতূহল ও জ্ঞানপূর্ণ স্বজ্ঞা এখানে সমস্ত অপরের সঙ্গে মিলিত হয়ে সেই মিলনের মধ্য দিয়েই সমগ্রের রূপ অনুধাবন করার চেষ্টা করে। রাষ্ট্রভিত্তিক সভ্যতার প্রাবল্যে তাই পাশ্চাত্যে যখন রাষ্ট্রগঠনবিদ্যা ও যুদ্ধবিদ্যার প্রবল (ভয়াবহ) বিকাশ ঘটেছে, তখন প্রাচ্যে সমাজভিত্তিক সভ্যতার প্রাণরস হিসেবে বিচিত্রের মিলনের মধ্য দিয়ে আত্মের পূর্ণতাসন্ধানের অভিযান ধর্মনৈতিকতার নানা ধারা জুড়ে বিকশিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ যে জাতীয়তাবাদের তীক্ষ্ণ বিরোধিতা করেছেন, ঔপনিবেশিক শাসনে পদানত হয়ে প্রাচ্য তার আত্মাকে হারিয়ে পাশ্চাত্যের হিংসা-বৈরিতা-র বিষবটিকাকেই অমৃত বলে গ্রহণ করছে কিনা তা নিয়ে যে উদ্বিগ্ন হয়ে বারবার সচেতন করার চেষ্টা করেছেন, তা এই ভাবনা থেকেই উৎসারিত হয়েছিল। আজ হিন্দুত্ববাদীরা এমন এক সর্বাত্মক জাতিরাষ্ট্র গড়ে চলেছে যা চরম শক্তিশালী রাষ্ট্রের দাপটে সামাজিক মিলন-পরিসরটিকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চায়, হিংসা-বৈরিতা-বিদ্বেষকেই সর্বময় করে তুলতে চায়। তাই রবীন্দ্রনাথের সাবধানবাণীগুলো আজ আরো অর্থময় হয়ে আমাদের অন্তরে বেজে উঠেছে, তাই আমরা পথ হাঁটছি।
৫
প্রথম দিনে মধ্য ও উত্তর কলকাতা এবং তার উত্তরের শহরতলির মধ্য দিয়ে প্রায় ১৬ কিলোমিটার হেঁটে ডানলপ-এর উপান্তে এসে রাত্রিবাসের জন্য থামা হলো। বেশিরভাগের আশ্রয় হলো একটি আশ্রমে, কয়েকজন কিছু চাছে-পিঠে থাকা কিছু পরিচিত ব্যক্তির বাড়িতে আশ্রয় নিলেন। পরের দিন, অর্থাৎ, ৩-রা অক্টোবর, সকাল সাটে আটটার মধ্যে প্রাতঃরাশ ও সর্বধর্মপ্রার্থনা সেরে আমরা আবার রওনা হলাম। আজকে আমরা সংখ্যায় কিছুটা কম, চল্লিশ জনের মতো হবে। বাকিরা আগের দিনই ফিরে গেছে, আবার যাত্রাপথে কোথাও হয়তো এসে যোগ দেবে বলে জানিয়ে গেছে। দুপুরবেলার আগেই আমরা সোদপুরের গান্ধী-আশ্রমে পৌঁছে গেলাম।
সোদপুর গান্ধী-আশ্রম বলে অনেকের কাছে পরিচিত হলেও এইটি আসলে সতীশ চন্দ্র দাশগুপ্ত দ্বারা প্রতিষ্ঠিত খাদি প্রতিষ্ঠান। এর ইতিহাস বিস্মৃতপ্রায়। তাই প্রথমে এই প্রতিষ্ঠান ও তার প্রতিষ্ঠাতার কথা কিছুটা বলে নেওয়া যাক। সতীশ চন্দ্র দাশগুপ্তের মৃত্যুর পর তাঁর উদ্দেশ্যে একটি শ্রদ্ধাঞ্জলি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৮৯ সালের ডিসেম্বর মাসে। তা সম্পাদনা করেছিলেন বিধুভূষণ দাশগুপ্ত। সম্পাদকীয়-তে তিনি লিখেছিলেন:
সতীশচন্দ্র ছিলেন বাংলার মনীষী বিশ্ববিশ্রুত বৈজ্ঞানিক আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের বৈজ্ঞানিক গবেষণাগার বেঙ্গল কেমিক্যালের অন্তরালে ধ্যানমগ্ন। সূর্যসম উজ্জ্বল মহাত্মার প্রদীপ্ত আলোকরশ্মি গবেষণাগারের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়ে তাঁকে হাতছানি দিয়ে আহ্বান জানালো। সে আহ্বানে ব্যাকুল হয়ে বেরিয়ে এলেন সতীশচন্দ্র। মহাত্মার পদপ্রান্তে নিজেকে সমর্পণ করে সুখদুঃখের সঙ্গী হয়ে গেলেন চিরজীবনের মতো। মহাত্মার সত্যাগ্রহে যোগদান করে বারবার কারাবরণ করতে লাগলেন তিনি, আবার বেরিয়েই গ্রামীণ শিল্পের গবেষণায় আত্মনিয়োগ করতে লাগলেন। তাঁর সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক প্রতিভা তিনি উজাড় করে দিলেন গ্রামীণ শিল্পের বিকাশের জন্য। চরখার বহু রকমের মডেল তৈরি করতে লাগলেন--- কাঠের চরখা, বাঁশের চরখা, কিসান চরখা, ধনুষ তকলী, তকলী, মগন চরখা, বাক্স চরখা, প্রভৃতি। গ্রামে গ্রামে তাঁত শিল্পের বিকাশও তাঁর বৈজ্ঞানিক প্রতিভার ছোঁয়ায় উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। ধানভানা ঢেঁকি, তেল পেষার ঘানি, তালগুড়, নীড়া, গো-দুগ্ধ-জাত যাবতীয় খাদ্য পদার্থ, হাতে কাগজ তৈরি, গ্রামে গ্রামে সাবান তৈরি, দেশলাই তৈরি, চামড়া পাকাই--- সবক্ষেত্রেই তিনি তাঁর প্রতিভার স্বাক্ষর রাখতে লাগলেন। স্বাধীনতার পর মহাত্মার তিরোধানের ১৮ বছর পর ৮৫ বছর বয়সের সময় তিনি ভারতের খাদ্যাভাব মেটাবার জন্য পতিত জমি উদ্ধারের কাজে নিজেকে উৎসর্গ করে দিলেন। তিনি তাঁর আশ্রম ও ট্যানারী পরিত্যাগ করে পতিত জমি উদ্ধারের কাজে সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন।…
এই শেষ লাইনে যে আশ্রমের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেটাই এই সোদপুরের আশ্রম। তা সম্পর্কে ওই শ্রদ্ধাঞ্জলিতেই অন্যত্র লেখা হয়েছে:
…সহকর্মীদের মায়া কাটিয়ে এক রাতের অন্ধকারে তিনি সপরিবারে বেঙ্গল কেমিক্যালের বাসভবন ছেড়ে চলে এলেন সোদপুরে। আবিষ্কারক-বিজ্ঞানীর প্রাপ্য ‘ফায়ার কিং’ (অগ্নিনির্বাপক)-এর দুই লাখ টাকা তিনি গান্ধীজির হাতে সমর্পণ করে দিলেন। গান্ধীজি ওই অর্থ খাদি ও কুটির শিল্পের উন্নতিতে খরচ করতে নির্দেশ দিলেন। সৃষ্টি হলো ‘খাদি প্রতিষ্ঠান’। বহুমুখী কর্মযজ্ঞ শুরু হলো বহু কর্মকেন্দ্রের মাধ্যমে। শিক্ষণ-প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রও সুবিস্তৃত হলো। সোদপুরের কেন্দ্র ‘গান্ধী আশ্রম’ নামে পরিচিত হলো এবং সেখানে তিনি পত্নী হেমপ্রভা দেবী, তিন পুত্র ও এক কন্যা সহ কঠোর আশ্রম জীবন যাপন করতে লাগলেন। অল্পদিনের মধ্যেই কঠোর পরিশ্রমে প্রথম ও মধ্যম পুত্র গত হলেন। কিন্তু কোনো কিছুতেই দমবার পাত্র ছিলেন না তিনি। আশ্রমের কঠোরতা হ্রাস পেল না এতটুকুও! কিছু দিনের মধ্যে গান্ধীজি ওই আশ্রমকে তাঁর ‘বাংলার বাসগৃহ’ বলে অভিহিত করলেন। কুটির শিল্পের বিস্তৃতি ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা, চর্মশিল্প স্থাপন, কর্মী প্রশিক্ষণ--- বিচিত্র গতিতে সতীশচন্দ্রের জীবনের স্রোতধারা প্রবাহিত হতে থাকে।
স্বাধীনতার পর সরকার যখন কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে খাদি-উৎপাদন পরিচালনার দায়িত্ব নিলো তখন সতীশচন্দ্র তাঁর নিজের খাদি-প্রতিষ্ঠান চালানো আর আনাবশ্যক মনে করেছিলেন, তাছাড়া পতিত জমি উদ্ধারের কাজে বাঁকুড়ার এক প্রত্যন্ত গ্রামে গিয়ে স্থায়ীভাবে থাকতে শুরু করেন, ফলে এই সোদপুরের খাদি-প্রতিষ্ঠান তার অভিভাবক হারিয়ে ক্রমশ ক্ষয়ের পথ ধরে। আজ, এই ২০২৬ সালের ৩-রা অক্টোবর আমরা যখন এই পূর্বতন খাদি-প্রতিষ্ঠানে এসে পৌঁছলাম, তখন সেই খাদি বা কুটিরশিল্প বা গ্রামীণ অর্থনীতির স্বনির্ভর বিকাশের লক্ষ্যে বহুমুখী কর্মোদ্যোগের ছিটেফোঁটাও আর অবশিষ্ট নেই। একটি আয়তক্ষেত্রের তিন বাহু বরাবর আশ্রমের প্রায় খান-দশেক ঘর, মাঝখানে গাছপালা ও ঘাসের উঠোন। ঘরগুলোর অবস্থা খুব কাহিল, অযত্ন ও দীর্ঘদিন অব্যবহারের চিহ্ন সর্বত্র। চালের টালি অনেক জায়গায় ভেঙে গেছে, কিছু রাজমিস্ত্রী আজ তা সারাই করার কাজ চালাচ্ছে। সকাল থেকে মাঝেমধ্যেই বৃষ্টি হচ্ছে আজ, তাই মাঝের উঠোনটি কাদায় নরম ও পিছল হয়ে উঠেছে, কয়েকটা ইঁট ফেলে তার উপর দিয়ে যাতায়াতের অস্থায়ী বন্দোবস্ত করা হয়েছে। একসময় আশ্রমের ঘরগুলোতে ছিলো, এমন বহু সামগ্রী ভাঙাচোরা, পরিত্যক্ত অবস্থায় উঠোনের কাদার মধ্যে পড়ে আছে, তার মধ্যে সবচেয়ে চোখে লাগে রবীন্দ্রনাথের একটি ছোটো আবক্ষ মূর্তি। ধ্বংস ও ক্ষয়ের এই আতাবরণে মন খারাপ হয়ে যায়। সে স্বাধীন সরকারের উপর ভরসা করে সতীশচন্দ্র খাদি-প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্ব ছেড়েছিলেন, তারা যে চাদি বা কুটিরশিল্পকে কোন খাদের কিনারায় এনে দাঁড় করিয়েছে তার একটা চিত্ররূপের মধ্যে যেন দাঁড়িয়ে আছি। অবশ্য কেবল সরকারই নয়, আমরা নাগরিকরাও তো কেউ সতীশচন্দ্রের উদ্যমের চার-আনা নিয়েও গ্রামীণ শিল্পের স্বনির্ভর বিকাশের জন্য পথ খুঁড়তে এগিয়ে আসিনি, বরং ক্ষয়রোগ-ধরে-যাওয়া গ্রামগুলোর দেহ ‘উন্নয়ন’-এর জোব্বায় ঢেকে শহরের নকল করে তোলার চেষ্টা করে গেছি।
একটি ঘরে সাজিয়ে গুছিয়ে এলাকার কিছু ‘গুণীজন’ সমবেত হয়ে আমাদের পদযাত্রীদের সঙ্গে আলাপরত হয়েছিলেন। এই এক ক্ষয়ের চিত্রের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকার যন্ত্রণা সেখানে খুব একটা প্রকাশ পাচ্ছিলো না। কেবল পুনে থেকে আসা প্রসন্ন, জাতীয় নাট্য স্কুলের প্রধানশিক্ষক, তিনি সেই আলাপচারিতার মেজাজের সঙ্গে বেখাপ্পাভাবে বলে উঠলেন: একটা চরকাও তো এখানে সুতো কাটছে না, একটুকরো খাদিবস্ত্রও তৈরি হচ্ছে না, গান্ধীর আদর্শকে বর্তমানে বাস্তব রূপ দেওয়ার কাজ তাহলে কীভাবে হবে? প্রসন্নর বক্তব্য ওই ঘরের আলাপচারিতার সুশান্ত জলে কোনো ঢেউ তৈরি করতে পারলো না, খানিক্ষণ পর তিনি ওই ঘর ছেড়ে বাইরের উঠোনে একটা গাছের নিচে এসে বসলেন একা। আমি তাঁর পাশে গিয়ে বসে ইংরেজিতে কিছু কথাবার্তা বলার চেষ্টা করলাম. প্রসন্নর মন তকনো অস্থির। তিনি বলছিলেন: গান্ধীকে নিয়ে বড় বড় বক্তৃতা দিয়ে, সাজানো কথা বলে বা বই লিখে কী হবে, কিচ্ছু হবে না; গান্ধীর অহিংসা আর গ্রাম-স্বরাজের ভাবনাকে আজ বর্তমানে রূপ দেওয়ার কোনো কাজ যদি হয় সেটাই দরকার…। প্রসন্ন গোটা পদযাত্রাটাই থাকবেন বলে এসেছিলেন, কিন্তু এই সোদপুরের অভিজ্ঞতা তাঁকে এমন ঘা দিয়েছিল যে পরদিন উনি পদযাত্রা ছেড়ে ফিরে যান।
সোদপুর থেকে বেরিয়ে সেষ-বিকেলে আমরা পৌঁছলাম ব্যারাকপুর। আজ প্রায় সতেরো কিলোমিটার হাঁটা হয়েছে। ব্যারাকপুরের চিড়িয়া মোড়ে এক বিরাট গান্ধী-মূর্তি আছে। আমাদের পদযাত্রা যখন ওই চিড়িয়া মোড় পৌঁছলো, তখন এক নাটকীয় কাণ্ড ঘটলো। রাস্তার পাশে দোকানগুলোর সামনে সাইকেল-রিক্সা-বাইক-এর ভিড়ে অবিন্যস্ত চেহারার একজন পুরুষ বসেছিলো, সারা চেহারাতেই অভাবের ছাপ, আমাদের মিছিল-স্লোগান-কথাবার্তা শুনে হঠাৎ এক বিস্ফোরণের মতো সে বলে উঠলো: ছোঃ আজ সব মিছিল করতে এসেছে, গতকাল একটা মালা দিয়েছিলে গলায়? রাস্তার অপরপারে মাল্যহীন গান্ধীমূর্তি সামনে ঝুঁকে আগে পা বাড়ানোর ভঙ্গিমায় স্তব্ধ।
বারাকপুর গান্ধী আশ্রম, যা এখন কেন্দ্রীয় সরকারী এক প্রতিষ্ঠান, সেখানে আমাদের পদযাত্রীদের অভ্যর্থনা জানানোর এক আনুষ্ঠানিকতায় আড়ষ্ট অনুষ্ঠান হলো। তারপর স্থানীয় এক গুরদোয়ারায় হলো রাতের আশ্রয়।
৬
রাতের অন্ধকার ধীরে ধীরে মুছে ভোরের হালকা আলো ফুটে উঠছে। পদযাত্রীদের ঘুম ভাঙছে। আজকের হাঁটার জন্য তৈরিও হতে শুরু করে দিয়েছে কেউ কেউ। অস্থায়ী দড়ি টাঙিয়ে কাচা কাপড়-চোপড় মেলে দিয়েছে কয়েকজন। কয়েকজন আবার কাপড়চোপড় ধোয়ার ঝামেলায় যাচ্ছে না। একজন-দুজন বেরিয়ে গেছে ভোরে কোনো চায়ের দোকান কাছেপিঠে খোলা পাওয়া যায় কিনা তার খোঁজে। এমনই ছাই-রঙা পরিবেশে বাতাসে মৃদু সুর ভাসছে। ভরাট এক পুরুষ গলার রেওয়াজ, সঙ্গে মোবাইল থেকে বাজানো তানপুরার তান। সুরের ভাঁজে ভাঁজে কবীরের দোঁহা ফুটে উঠছে, তার ভাবার্থ মনকে সচকিত করে তুলছে, যেমন:
আগুন লেগেছে মহীরুহে, পুড়ে যাচ্ছে পাতা-ডাল-কাণ্ড, এ বুঝি আর নেভার নয়, উপরের ডালে একটা ছোটো পাখি বসে আছে নির্বিকারে, কবীর তাকে জিজ্ঞাসা করলো: তুমি উড়ে যাচ্ছ না কেন? পাখি উত্তর দিলো: এ গাছের ফল-ফুল খেয়ে আমি বড় হয়েছি, এ গাছের পাতায়-ডালে বাসা বেঁধেছি, আমার ধর্ম উড়ে যাওয়া নয়, আমার ধর্ম এই গাছের সঙ্গেই পুড়ে যাওয়া।
অথবা:
কোমর বেঁধে বের হয়েছি বদ-নোংরা খুঁজে বের করার জন্য, হন্যে হয়ে ঘুরেও কোথাও তা খুঁজে পেলাম না, ফিরে এসে নিজের অভ্যন্তরে তাকালাম, দেখলাম আমার চেয়ে বদ-নোংরা আর কেউ নেই।
না, কোনো ভাব-সম্প্রসারণ করার চেষ্টা আমি করবো না। হীরকখণ্ডের যেমন বহু ছটা, এই দোঁহাগুলোও তেমনই বহু ব্যঞ্জনাময়। আমাদের পরম্পরা-ঐতিহ্যের অন্তর্গত সমাজ-পরিসরে সাধারণ মানুষের আঙিনায় গভীর দর্শন ও জীবনবোধের কথা কীভাবে লোকমুখের ভাষাতেই সহজরূপে উচ্চারিত হয়েছে কবীর, লালন, বুল্লে শা, দুদ্দু শা-দের মতো মাটির মানুষদের মুখে ও কীভাবে তা সাধারণ লোকের মনে আসন পেতেছিল, তা বেশ বিভোর হয়েই ভাবতে হয়।
যাত্রাপথে আমাদের বেশিরভাগ সকাল শুরু হচ্ছে এভাবেই। জিতেনদা (জিতেন নন্দী) রোজ সকালে রেওয়াজে বসেন। কবীরের গান ভালোবেসে তা নিভৃতে গাওয়ার জন্যই ষাটোর্ধ্ব বয়সে তিনি ছোটবেলায় সেখা সংগীতচর্চাকে আবার নতুন করে বহাল করেছেন। যেখানেই রাতে থাকা হোক না কেন, ভোরে মেঝের উপর পা মুড়ে পিঠ সোজা করে বসে, মোবাইলে তানপুরার তান চালিয়ে, গলা সাধেন। তখন চুপ করে তাঁর কাছাকাছি বসে পড়লেই হলো। কয়েকদিন পর নানাজনের উনুরোধে হাঁটা শেষ হওয়ার পর সন্ধ্যা-রাতেও তাঁকে গান গাইতে বসতে হতো। তখন দেখা গেলো আরেকটি আশ্চর্য বিষয়। রাজস্থানের কোটা থেকে এসেছে জগদীশ, ঝাড়খণ্ড থেকে এসেছে উমেশ, তারাও কখনো জিতেনদার গলায় গলা মিলিয়ে দিচ্ছে, কখনও নিজেরাই কোনো কবীরের গান ধরছে, এমনকি জগদীশ তো একদিন কবীরের গান গাইতে গাইতে ব্যাখ্যা করতে লাগলো এই গানের অর্থ তার কাছে কী। জগদীশের সঙ্গে কথা বলে জেনেছিলাম যে সে এইসব গান শুনে আসছে ছোটবেলা থেকে, শুনে শুনেই তার মনে গেঁথে গেছে, কাগজে-কলমে এসব গানের সুর বা কথা তার কাছে লেখা নেই। জগদীশ প্রাণবন্ত এক যুবক, তিরিশের কাছাকাছি বয়স হবে, কোটায় গ্রামাঞ্চলে কৃষকদের সংগঠিত করার কাজ করে, কৃষক-ঘরেরই ছেলে। কবীরের গানের মধ্যে নিহিত ছড়িয়ে পড়ার ও টিকে থাকার এই অভাবনীয় শক্তির সামনে বিস্ময় নিয়েই দাঁড়াতে হয়, বিশেষ করে আজকে আমরা যখন প্রিন্টিং প্রেস ও ইন্টারনেট-এর যন্ত্রশক্তির মাধ্যমে ছড়িয়ে যেতে ও টিকে থাকতে উদগ্রীব হয়ে উঠে ভাবনাচিন্তার জগতটাকে জঞ্জালে ও আগাছায় ভরিয়ে দিয়েছি।
৭
পদযাত্রার তৃতীয় দিন ব্যারাকপুর থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এখন আমরা জগদ্দলের মধ্য দিয়ে চলেছি। দুপাশে জুটমিল, আর জুটমিল শ্রমিকদের থাকার কুলি-লাইন। সমরেশ বসুর ‘জগদ্দল’ উপন্যাসটা পড়লে জানা যায় আজ থেকে দুশো বছরেরও আগে এখানে ইউরোপীয় উপনিবেশ-বিস্তারকারীদের উদ্যোগে কীভাবে প্রথম জুটমিল চালু হয়েছিল এবং তৎকালীন গ্রামীণ সমাজের ভাঙনে তা কী ভূমিকা নিয়েছিল। তারপর একের পর এক জুটমিলকে ঘিরে গড়ে উঠেছে শ্রমিকদের কুলি-লাইন: সে-ও আজকের কথা নয়। সেই উনিশ শতকের ইউরোপে শিল্পবিপ্লবের ফলে শিল্পশ্রমিকদের দৈনিক জীবনযাপনের দুর্দশা যখন অতি প্রকট, তখন শ্রমিকদের শুভানুধ্যায়ীরা কারখানা-সংলগ্ন অঞ্চলেই শ্রমিকদের জন্য বাসস্থানের নকশা তৈরি করে শ্রমিকদের অবস্থার উন্নতি ঘটাতে চেয়েছিলেন। বাংলায জুটমিলের কুলি-লাইনগুলো গড়ে উঠেছিল সেই নকশা অনুসারেই। ছোট ছোট আয়তাকারের মতো নাতি-উচ্চ ঘর, সামনে একটুকরো ঘেরা বারান্দা: একে-অপরের গায়ে সেঁটে লম্বা লাইন তৈরি করেছে, এমন দুটি লাইনের মাঝে খোলা ড্রেন ও সরু পথ। বারোয়ারি পায়খানা-ঘর আলাদা করে তৈরি করা: একটা ড্রেনের উপর সারি দিয়ে পায়খানায় বসার জন্য দুই পা রাখার জায়গা। চানের ব্যবস্থাও এমনই বারোয়ারি: সার দেওয়া কল লাগানো একটা লম্বা জায়গা। অনেক সময় এই পায়খানায় বসার পাদানির সারি ও কলের সারি সমান্তরাল মুখোমুখি একটাই বড় ঘরের মধ্যে। বিহার, উত্তরপ্রদেশ, ওড়িশা এবং বাংলারও দূর গ্রাম থেকে আসা শ্রমিকদের পরিবারসহ থাকার জায়গা এই কুলি-লাইন। এই কাঠামোটা আজও মোটামুটি একই রকম আছে। গ্রামের খোলা মাঠ-বন-বাদাড়-এ ঘেরা বাসা থেকে শ্রমিকরা যখন পরিবারসহ এই গায়ে-গায়ে-সাঁটা খোপগুলোর মধ্যে এসে সেঁধাতে বাধ্য হয়, তখন যে বন্দীত্বের বোধ ক্রমশ তাকে অসাড় করে তোলে তার নানা প্রকাশ আমি দেখেছি যখন প্রায় বছর-পনেরো বজবজ অঞ্চলে জুটমিল-শ্রমিকদের মধ্যে রাজনৈতিক প্রচারকের কাজ করেছি। শুভানুধ্যায়ীদের করা উন্নতির নকশা কীভাবে শ্রমিকদের গলায় নতুন ফাঁস হয়ে চেপে বসে তা তখন দেখেছি। এখন হাঁটতে হাঁটতে দেখছি দুপাশে সেই একই রকম কুলি-লাইনের সারি, উপছানো ড্রেন, অপরিষ্কার পথ, আর মাঝেমধ্যে কোনো মোটা গাছের গুঁড়ির গায়ে সিঁদুর লেপে, তাকে ঘিরে কংক্রিটের বেদি তৈরি করে, গুটিকয় মূর্তি বসিয়ে পুজোর হিন্দু আচার পালনের বন্দোবস্ত।
এই এলাকা পেরিয়ে ভাটনগরে একটা অনুষ্ঠান-ঘরে এসে আমরা দুপুরে থামলাম। এখানে আমাদের দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করেছেন এই জুটমিল এলাকার শ্রমিক ও শ্রমিক পরিবারের মেয়েদের একটি সংগঠন, যার নাম ‘Bengal Peace Committee’। দুপুরে খাওয়ার আগে তাঁদের সঙ্গে আলাপচারিতারও একটা অবকাশ ছিল। জানা গেলো যে এই কমিটি গড়ে উঠেছে বছর চারেক হলো, তার মূল উদ্দেশ্য হলো শ্রমিক মহল্লায় দাঙ্গাসূচক ধর্মীয় বিদ্বেষের পরিস্থিতি মোকাবিলা করে শান্তি ও সদ্ভাব বজায় রাখা। ২০১৮ সালে এই জগদ্দল-ভাটনগর এলাকায় হিন্দুত্ববাদী পার্টি ও সংগধনগুলোর লাগাতার উশকানি ও ব্যবস্থাপনায় ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ চূড়ান্ত রূপ নেয়। কুলি-লাইনে দীর্ঘদিনের সহাবস্থানে চিড় ধরিয়ে হিন্দুত্ববাদী দাঙ্গাকারীদের হামলা সংগঠিত হয়। বেশ কিছু প্রাণ যায়। অনেক মুসলমান বাসা ছেড়ে পালায়। এই অবস্থায় পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্যানুসন্ধান করতে এসেছিলেন ‘আমরা এক সচেতন প্রয়াস’ সংগঠনের মোহিত ও শুভপ্রতিম। কেবল তথ্য সংগ্রহ করেই তাঁরা তাঁদের কাজ চুকে গেছে বলে মনে করেননি, এলাকায় এই বিদ্বেষ-ছড়িয়ে পড়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ কীভাবে করা যায় তাও তাঁরা ভেবেছিলেন। তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন স্থানীয় যুবক বিজয় রজক। এলাকার সবার সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তোলার ক্ষমতা বিজয়ের আছে, মূলত তার উদ্যোগের ফলশ্রুতি হিসেবে প্রথমে এলাকার হিন্দু ও মুসলমান মেয়েদের নিয়ে গড়ে ওঠে Peace Committee। এই মেয়েদের মধ্যে আলোচনা হয় যে বাড়ির পুরুষগুলোকে তারা দাঙ্গা ও বিদ্বেষে জড়াতে দেবে না, নিজেরাই সে পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে, তাহলেই চাঙ্গা বাঁধানো আটকানো যাবে। এই কাজ করতে করতে এখন এই মেয়েরা নিজেদের একটি সমবায় গড়ে তুলেছে, পাটের নানা জিনিস বানিয়ে তারা এই সমবায়ের মাধ্যমে বিক্রি করে, তাছাড়া ঘরের ছোট ছেলেমেয়েদের নিয়ে তারা পড়াশোনা ও গান শেখার মতো উদ্যোগও এখন নিচ্ছে। সেখানে শেখা একটা গান কচিকাঁচা ও বড়োরা মিলে আমাদের গেয়ে শোনালো: ‘না হিন্দু বনেগা, না মুসলমান বনেগা, ইনসান কি অওলাদ ইনসান বনেগা…’।
৮
তৃতীয় দিন ব্যারাকপুর থেকে ভাটপাড়া হয়ে নৈহাটি, নৈহাটিতে গঙ্গা পেরিয়ে চুঁচুড়ায় রাত্রিবাস; চতুর্থ দিন চুঁচুড়া থেকে ব্যাণ্ডেল হয়ে ত্রিবেণী; পঞ্চম দিন ত্রিবেণী থেকে খন্যান-এ পৌঁছে রাত্রিবাস। এভাবে এই তিনদিনে ৫০ কিলোমিটারের মতো পথ পেরিয়ে এসেছি আমরা। দিনের বেলায় হাঁটার সময় গনগনে রোদ উঠছে। অনেকের মাথায় গান্ধীটুপি, কেউ কেউ আবার গামছা বা সাদা কাপড় পেঁচিয়ে নিয়েছে মাথায়। পথে নাগরিক অধিকার আন্দোলনের বেশ কিছু কর্মী আশ্রয় ও খাওয়ার ব্যবস্থা করে সহযোগ করেছেন। সামনে একটা মাঝারি লরিতে সবার ব্যাগপত্র, পানীয় জলের বোতলের ক্রেট, বইপত্র-প্রচারপত্রের বাণ্ডিল আর একটা সাউন্ড-বক্স। তারহীন মাইক নিয়ে তার পিছন পিছন বক্তব্য রাখতে রাখতে যাচ্ছি কখনো, কখনো আবার স্লোগান ও গান হচ্ছে সমবেতভাবে। বাকিরা হাঁটছে তার পিছনে, নানাজনের হাঁটার গতির তারতম্যে মিছিলের দৈর্্ঘ্য কখনো বাড়ছে, কখনো বা গুটিয়ে আসছে ঘন হয়ে। ছাপানো প্রচারপত্র বিলি করে চলেছে কয়েকজন। আর দুটি গাড়িও সঙ্গে চলেছে, যারা হাঁটতে পারবেন না, বা হাঁটতে হাঁটতে সাময়িক অসুস্থ বোধ করবেন তাঁদের জন্য। এই মোট পাঁচদিনের যাত্রায় চলতে চলতে প্রত্যেকেই যৌথতার অংশ হিসেবে নিজের নিজের ভূমিকাটা নিজের মতো করে ঠিক করে নিয়েছে। একটা বাঁধনও গড়ে উঠছে সবার মধ্যে, একে অপরকে চেনা-জানার পরিধিটাও বাড়ছে। আমার সঙ্গে যাঁদের আলাপ-পরিচয় কিছুটা জমে উঠেছে তাংদের কথা কিছু বলি।
জগদীশের কথা কিছু আগেই বলেছি। রাজস্থানের কোটা থেকে আসা এই যুবকটি পদযাত্রার সবচেয়ে প্রাণবন্ত চরিত্র। রোগা লম্বা চেহারা, লম্বাটে দাড়িভরা মুখ, হাসিমুখে সবচেয়ে বেশি দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিচ্ছে। সকালে সবাইকে সময় মতো হাঁটা শুরুর জন্য প্রস্তুত হওয়ার তাগাদা দেওয়া, সবকিছু গোছগাছ করা, হাঁটার সময় মাইক ঠিকঠাক কাজ করছে কিনা নজর রাখা, কারও সমস্যা হলে সাহায্যে এগিয়ে আসা, রাতে সবার শোওয়ার জায়গা টিকমতো হলো কিনা, সবাই তোষক আর বালিশ পেলো কিনা--- সবকিছু দেখভাল করার দায়িত্ব যেন খুব স্বাভাবিকভাবেই জগদীশের ছাড়া আর কারো নয়। পদযাত্রায় ওর হাঁটা, স্লোগান তোলা, গান গাওয়ার মধ্যেও তাজা আবেগের বিচ্ছুরণ টের পাওয়া যায়। একমাত্র ও গোটা পদযাত্রাটা খালি পায়ে হাঁটছে--- হাঁটা বাদ দিয়ে বাকি সময় জুতো পড়ছে, কিন্তু হাঁটার সময় নয়--- কেন তার কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা ওর কাছ থেকে পাওয়া যাবে না, কিন্তু কারণটা যে ওর নিজের কাছে খুব জোরালো তা নিয়েও কোনো সন্দেহ থাকতে পারে না। জগদীশ বাংলা ভাষা জানে না, আমার হিন্দি জানা বেশ নড়বড়ে--- তবু ওই নড়বড়ে হিন্দি সম্বল করেই ওর সাথে ফাঁকে-ফোকরে কিছু কথাবার্তা শুরু হলো, তখন বোঝা গেলো ওর মতো আড্ডাবাজও পাওয়া কঠিন। জগদীশের বাবা ছিলেন জয়প্রকাশ নারায়ণ-এর ঘনিষ্ঠ যহযোদ্ধা। জয়প্রকাশ নারায়ণ-এর সর্বোদয়-এর আদর্শ বা ‘সম্পূর্ণ ক্রান্তি’ (বাংলায় কি ‘সার্বিক বিপ্লব’ বলা যায়?)-র আহ্বান নিয়ে আন্দোলনে তিনি ছিলেন প্রথম সারির একজন। সেই আদর্শ সামনে রেখেই জয়পুরের কোটা অঞ্চলের গ্রামগুলোয় কৃষকদের সংগঠন গড়ে তোলেন তিনি। পঞ্চাশ-ষাট-টা গ্রামে এখন ছড়িয়ে আছে সে সংগঠন। জগদীশ সেই সংগঠনেরই সংগঠক-কর্মী। বাবা ওকে খুব ছোটবেলাতেই বলেছিল: ‘আমি তোর বাবা নই, আমি তোর সাথী’; জগদীশ এখনও বাবাকে সাথী বলেই ডাকে--- লড়াইয়ের সাথী, স্বপ্ন গড়ে তোলার সাথী। ২০২০-২১ থেকে উত্তর ভারতে ঘনিয়ে ওঠা যে কৃষক-আন্দোলন কৃষি-বিল পাশ করানোর ক্ষেত্রে সরকারকে পিছু হঠতে বাধ্য করেছিল, সেই আন্দোলনে ও তার রেশ ধরে চলা আজকের সংযুক্ত কৃষক আন্দোলনগুলোতেও জগদীশদের সংগঠন অংশিদার ছিলো, জগদীশের বাবা অনেকসময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও পালন করেছেন, জগদীশও নিবিড়ভাবে তাতে জড়িয়ে আছে, কিন্তু জগদীশের (ও তার বাবার) এই আন্দোলনগুলো নিয়ে একটা গভীর সমালোচনাও আছে। সেই সমালোচনাটা এইরকম: আন্দোলনগুলো ‘এম-এস-পি’-র উপর কেবল জোর দিচ্ছে, কিন্তু এম-এস-পি দিয়ে কী লাভ হবে, আজকে যে এম-এস-পি যথেষ্ট মনে হবে কাল সেটাই অপর্যাপ্ত হয়ে উঠবে, তাছাড়া এম-এস-পি তো বাজারের উপরই কৃষকদের আরও নির্ভরশীল করে তুলছে, কৃষকদের মুক্তি তো সে পথে নেই, কৃষকদের মুক্তি গান্ধীজির বলা গ্রাম-স্বরাজের স্বপ্নকে বাস্তব করে তুলে আত্মনির্ভর স্বশাসন গড়ে তোলার মধ্য দিয়েই তো একমাত্র সম্ভব, এই আন্দোলনগুলো অনেক আত্মত্যাগ অনেক সাহসী লড়াই সত্ত্বেও সেই গ্রাম-স্বরাজের কথাটাকে তো তুলছে না। জগদীশ প্রত্যয় ব্যক্ত করলো: গান্ধী গ্রাম-স্বরাজের পথের কথা বলেছিলেন, পুরোটা যেতে পারেননি, গান্ধীজির পরে বিনোবা ভাবেজি ও জয়প্রকাশজি সেই পথে আরো এগিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁরাও পুরোটা যেতে পারেননি, আজ জগদীশরাও সেই পথে এগোনোর চেষ্টা করছে, তারাও যদি না পারে ভবিষ্যতের সন্তান-সন্ততিরা কেউ পারবে, নইলে জগৎ বাঁচবে না। জগদীশ বিয়ে করেনি কেন, গান্ধীজির ব্রহ্মচর্যের আদর্শ কি সে অনুসরণ করে? না, না, জগদীশ বিয়ে করেনি এখনও, তবে বিয়ে করায় তার আপত্তি নেই, মনের মতো কোনো লড়াইয়ের সাথীকে যদি পায় যে তারই মতো লড়াইয়ের পথে পথে ঘুরবে তারই সঙ্গে, ঘরের টানে বাঁধতে চাইবে না, তাহলে বিয়ে করবে সে। মেজাজে জগদীশ এবার গলা ছেড়ে কবীরের একটা ভজন শুরু করে, সে ভজনের ভাব আমাদের বাংলার বাউলগানের দেহতত্ত্বের গানের খুব কাছাকাছি…।
বিহার থেকে এসেছে কীর্তি। পর্বতারোহী মেয়ে। তিরিশের নিচে বয়স মনে হয়। খুব একটা লম্বা নয়, কিন্তু টানটান কর্মঠ চেহারা। সর্ব সেবা সংঘের বইপত্রের বাণ্ডিলটার দায়িত্বে আছে সে। হাঁটার শেষে সন্ধ্যায় কোথাও যদি লোকালয়ে রাস্তার ধারে বইপত্রগুলো মেলে বসে কিছু বিক্রি ও প্রচারের বন্দোবস্ত করা যায়, সেদিকে সে নজর রাখছে। তার সঙ্গেও এক ফাঁকে কথাবার্তা এগোলো কিছু দূর। গান্ধীজির গ্রাম-স্বরাজ-এর স্বপ্নকে সে এক মহান আদর্শ বলে মনে করে, কিন্তু আজ কীভাবে সে পথে এগোনো যাবে? বিভিন্ন সেবার কাজে বা দুর্যোগের সময় পরিত্রাণের কাজে সে নানাসময় নানা গ্রামে ঘুরেছে, কাজ করেছে। তার অভিজ্ঞতাটা এইরকম: গরিব-বড়লোকের ভাগাভাগি এখন গোটা দুনিয়া জুড়ে সবখানে প্রবল হয়ে উঠেছে, গ্রামও বদলে গেছে, গ্রামেও অনেকে ধনী হয়ে উঠেছে, টাকা ছড়িয়ে কিনে নেওয়ার চল হয়েছে, এখন গ্রামে গিয়ে মানুষদের নিজেদের মত জিজ্ঞাসা করলে বেশির ভাগ-ই নিজেদের মত বলতে চায় না, বলে যে তাদের ‘লিডার’ বলবে, আর কোনো পার্টি যদি টাকা-সুযোগ-সুবিধা দিয়ে কোনো ‘লিডার’-কে কিনে নেয় তাহলে তাকে অনুসরণ করে বেশিরভাগ মানুষও সেদিকে চলে যায়, মানুষের যদি এই অবস্থা হয় তাহলে প্রত্যেকের স্বাধীন অংশগ্রহণের ভিত্তিতে গণতান্ত্রিক স্বশাসন গড়ে উঠবে কীভাবে? গান্ধীর গ্রাম-স্বরাজ তো তেমনই এক গণতান্ত্রিক স্বশাসন ছাড়া আর কিছু নয়। তার সঙ্গে আমার আলোচনায় অসমাধিত প্রশ্নগুলোই থেকে যায় বেশি। সে বলে: এগুলো নিয়ে আরো আলোচনা করতে হবে, তোমার সঙ্গে আলোচনা করে আমার বেশ ভালো লাগছে।
দিল্লি থেকে এসেছেন অনুপকুমার, বয়স ষাটের কাছাকাছি। বাংলা বলতে পারেন না, খুব একটা বোঝেনও না। কিন্তু হাঁটার সময় আমি যে মাইকে আমাদের হাঁটার উদ্দেশ্য বাংলায় বলতে বলতে যাচ্ছি, তার জন্য উনি বারবার এসে আমাকে ধন্যবাদ দিচ্ছিলেন, বলছিলেন মানুষকে যতোটা পারা যায় আমাদের কথাগুলো বলা জরুরী, আর তা তো তাদের নিজেদের ভাষাতেই হতে হবে। রোগা-পাতলা চেহারা, মুখে ছুঁচাল গাড়ি-গোঁফে পাক ধরেছে। দিল্লির যন্তর-মন্তরে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া সরকার-বিরোধী যুবসমাজের বিক্ষোভে তিনি রোজ হাজির ছিলেন, যতোটা সম্ভব যুবক-যুবতীদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেছেন, তাদের বারবার বলার চেষ্টা করেছেন যে একজন-দুজনের পদত্যাগ দিয়ে কিছু হবার নয়, গণতন্ত্র বলে যা চলছে তা গণতন্ত্র নয়, গ্রামে-শহরে ছড়িয়ে গণতন্ত্রের ভিতটা তৈরি করতে হবে, সব মানুষ যাতে চাইলে সবকিছু ঠিক করায় অংশ নিতে পারে তার ব্যবস্থা করতে হবে…। এতো যুবক-যুবতী যে রাস্তায় নেমেছে তাতে তিনি খুব আনন্দিত হয়েছেন, কিন্তু এতো মানুষ নামার পরও যদি আসল কথাগুলো উঠে না আসে… তাঁর ভাবনা এখন তাই নিয়ে। নিজের পরিবারের কথা বলতে গিয়ে বললেন যে তাঁর নিজের ছেলে এখন প্রাপ্তবয়স্ক, তার ভাবনাচিন্তা তাঁর উল্টো পথেই চলে, এমনকি মুসলমানদের সম্পর্কে হিন্দুত্ববাদীদের নানা প্রচারও সে গিলে বসে আছে--- একটা ব্যর্থতাবোধ তাঁকে কুরে কুরে খায়। তিনি আমাকে বন্ধু মেনেছেন, দিল্লিতে তাঁর বাড়িতে সাদর আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।
আরো অন্যদের কথা আবার পরে বলবো, এখন আমাদের পদযাত্রা-বর্ণনায় আবার ফিরে আসি।
৯
পদযাত্রার ষষ্ঠ দিন। খন্যান থেকে হাঁটা শুরু করে জি.টি. রোড ধরে এগিয়ে আমরা তখন পাণ্ডুয়ার বাজার এলাকায় এসে পৌঁছেছি। বক্তব্য রাখা ও প্রচারপত্র বিলি চলছে। সকালবেলা, বাজার তখন জমে ওঠার পথে। একজন বৃদ্ধ, বয়সের ভারে দেহ ঝুঁকে পড়েছে, চোখে মোটা লেন্সের চশমা, লাঠিতে ভর করে হেঁটে এলেন আমাদের কাছে, সর্ব সেবা সংঘ-এর সংগঠক অশীতিপর চন্দন পাল-এর হাত ধরে কী যেন বলছেন তিনি। চন্দন পাল আমাদের সবাইকে কাছে ডাকলেন। তাঁর হাতে তখনও সেই বৃদ্ধের দুই হাত ধরা। বৃদ্ধের ঘোলাটে চোখ দুটো আমাদের উপর দিয়ে ঘুরে ঘুরে ঠাওর করার চেষ্টা করছে, মুখে তাঁর অদ্ভুত তৃপ্তির হাসি। চন্দন পাল বললেন: এই বৃদ্ধের বয়স নব্বইয়ের কাছাকাছি, তিনি আমাদের কথা শুনে মনে শান্তি পেয়েছেন, চারদিকে ধর্মের নামে হিংসা ও বিদ্বেষ ছড়ানোর প্রবল আবর্ত তাঁর বেঁচে থাকার ইচ্ছাটাই কেড়ে নিচ্ছিলো, এই রকম সময়েও যে আমাদের মতো এমন মানুষ আছে যারা সব সন্ত্রাস উপেক্ষা করে শান্তি ও ভালোবাসার আহ্বান নিয়ে পথে নামতে পারে তা দেখে আবার তাঁর যেন প্রাণ ফিরে আসছে, তাই তিনি আমাদের ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাতে এসেছেন। বৃদ্ধ এবার আমাদের দিকে মুখ তুলে আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন: বাবারা, নজরুলের একটা গান করো, একটু শুনি। আমাদের সঙ্গে হাঁটছিলেন দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার গণ-সাংস্কৃতিক আন্দোলনের তিনজন কর্মী। তাঁরা গান ধরলেন: আমরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু মুসলমান…। বৃদ্ধের ঘোলাটে চোখদুটো তখন সজল হয়ে উঠেছে…
পাণ্ডুয়া পেরিয়ে আরো কিছুটা হেঁটে আমরা দেবীপুর মোড়-এ এসে পৌঁছেছি। চা-খাওয়ার জন্য থামা হয়েছে। সঙ্গের মাইকে বাংলায় বক্তব্য রাখছিলাম আমাদের ভাবনা ও উদ্দেশ্য পথের মানুষদের জানানোর জন্য। মোড়ের কাছেই নিত্যব্যবহার্য নানা জিনিসের একটা দোকান। দোকানের সামনে বেরিয়ে এসে দোকানদার অনেকক্ষণ ধরে আমাদের দেখছিলেন, আমাদের কথা শুনছিলেন, প্রচারপত্রটাও হাত বাড়িয়ে নিলেন। চা-খাওয়ার বিরতির শেষে আমরা যখন আবার হাঁটা শুরু করার তোড়জোড় করছি, তিনি তখন তাঁর দোকান থেকে এক ক্রেট পানীয় জলের বোতল এনে আমাদের হাতে তুলে দিলেন, বললেন: এইটুকু গ্রহণ করে আমরা যেন তাঁকে আমাদের প্রয়াসের সামান্যতম অংশীদার হতে দিই।
চোদ্দ কিলোমিটার হেঁটে সেদিন বৈঁচিগ্রামে এসে রাত্রিবাস করা হলো। পরের দিন সকালে আবার জি.টি. রোড ধরে আমরা এগোলাম মেমারির দিকে। এইদিন রাস্তায় একটা অদ্ভুত কাণ্ড ঘটলো। সর্ব সেবা সংঘ-এর এক বয়স্ক সংগঠক, বারানসীবাসী এক অবসরপ্রাপ্ত স্কুল-শিক্ষক, আমাদের সঙ্গে হাঁটছিলেন, তাঁর মাথা চুলহীন, চোখে চশমা, একটা সাদা কাপড় দেহের ওপরের দিকে জড়ানো, আর নিচে একটি খাটো ধুতি। দেখে তাঁকে অনেকটা গান্ধীর প্রতিরূপ বলে মনে হচ্ছিল বটে। গ্রামের মধ্যে রাস্তার ধার থেকে হঠাৎ একটি নয়-দশ বছরের কিশোর ছুটে এসে তাঁর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে বললো: তোমার কথা শুনে আমি বড় হয়েছি। কিশোরটি ভেবেছিলো জীবিত গান্ধীর দেখা সে পেয়েছে। আমরা সবাই বেশ মজা পেয়েছিলাম। আর মনে হয়েছিলো: আমাদের কিশোর-কিশোরীরা যেন গান্ধীর কথা শুনতে শুনতে বড়ো হয়; গান্ধীকে নয়, গান্ধীর ভাবনাকে যেন তারা জীবিত বলে অনুভব করে।
মেমারি ছেড়ে এসে নিমো মোড়ে পৌঁছে আবার একটু থামা হয়েছে, রোদের দহন থেকে কিছুক্ষণ নিস্তার পেতে একটা গাছের নিচের ছায়ায় সবাই বসা হয়েছে। মাইকে বক্তব্য রাখা ও প্রচারপত্ত বিলি অবশ্য চলছিলো। কাছেই একটা লটারির দোকানের সামনে পাতা বেঞ্চে বসে একজন বছর পঞ্চাশের লোক হঠাৎ চিৎকার করে বলতে লাগলো, ‘গান্ধী-গান্ধী করছে, গান্ধীর জন্যই তো দেশটার এই হাল! সারাজীবন তো মুসলমানদের হয়ে ষড়যন্ত্র করে গেলো, গান্ধী আবার দেশের জন্য লড়েছে কবে?...’ জিতেনদা তাঁর পাশে গিয়ে বসে তাঁর সঙ্গে কথা-বিনিময় করতে চাইলেন। জিতেনদা জিজ্ঞাসা করছিলেন তাঁর কথাগুলোর ভিত্তি কী, কোন ঐতিহাসিক ঘটনার উপর দাঁড়িয়ে তিনি এমন বলছেন। মাঝবয়সী মানুষটি জিতেনদার সঙ্গে কোনো কথার বিনিময়ে না গিয়ে কেবল একই কথা চিৎকার করে বলে যাচ্ছিলেন। লটারির দোকানের সামনে টুলে বসা আর এক যুবক বলে উঠলো: হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমরা ফরিদপুর থেকে এসেছি আমরা সব জানি। জিতেনদা প্রশ্ন করলো: কতোদিন আগে ফরিদপুর থেকে এসেছেন? দুজনেই কোনো উত্তর দিলো না, কেবল যুবকটি আক্রমণাত্মকভাবে বলে উঠলো, ‘এখন বিজেপি চলছে, বিজেপি-ই চলবে। আপনারা তো সব গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন…’। জিতেনদা একটু রেগে গিয়ে বললো, ‘বেশ তো, আমরা রাস্তার একধার দিয়ে হাঁটছি, আসুন আপনিও রাস্তার অন্য ধার দিয়ে হেঁটে চলুন, আমরা গান্ধীর কথা বলছি, আপনি গান্ধীর বিরুদ্ধে কথা বলতে বলতেই চলুন, দেখা যাক এই রোদে কেমন গায়ে হাওয়া লাগে…’। যুবকটি আর কথা না বাড়িয়ে সামনে রাখা বাইক চড়ে চলে গেলো। মাঝবয়সী লোকটি বেশ তৃপ্তিভরে একটা বিড়ি জ্বালালো, তার যেন যা করার করা হয়ে গেছে, বেঞ্চের উপর পা তুলে বসে সে চুপচাপ বিড়িতে সুখটান দিতে লাগলো।
এর আগে জগদ্দলের রাস্তাতেও আমাদের মিছিলের পাশ দিয়ে দ্রুতগতিতে পেরিয়ে যাওয়া এক টোটো-রিক্সা থেকে মুখ বাড়িয়ে এক কপালে গেরুয়া তিলক কাটা ষণ্ডা চিৎকার করে গিয়েছিলো: এখানে হাঁটছো কেন, মুর্শিদাবাদে গিয়ে হাঁটো। তার ধারণা মুর্শিদাবাদে হিন্দুদের উপর মুসলমানরা চড়াও হচ্ছে। বড়ো ভুল ধারণা নিয়ে সে বসে আছে। কয়েক সপ্তাহ আগে মুর্শিদাবাদের সুতি ব্লকের পাঁচ-ছয়টা গ্রামে আমি ঘুরে এসেছি, দেখেছি সেখানে হিন্দুত্ববাদী সরকার মুসলমানদের উপর কী সন্ত্রাসের রাজ কায়েম করেছে, কীভাবে বাংলাভাষী মুসলমানদের বাংলাদেশী বলে ধরে হোল্ডিং সেন্টারে পুরে তারপর বিলকুল গায়েব করে দিচ্ছে।
এই দুটি ক্ষেত্রেই যে হিন্দুত্বভক্তরা আমাদের গালিগালাজ করতে এগিয়ে এলো, তারা চিৎকার করে তাদের বিষটা উগরে দিতে পারলেই খালাস, কোনো আলাপ-আলোচনায় ঢুকতে তারা রাজি নয়, মিথ্যা ও বিকৃত তথ্য দিয়ে গড়া এক ঘৃণার জগতে তারা বন্দী হয়ে আছে।
যাই হোক, নিমো মোড় ছেড়ে কিছুটা এগোতেই আবার একজন বয়স্ক মানুষ এগিয়ে এসে আমাদের বললেন যে খুব জরুরী ও গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ আমরা নিয়েছি, কিছুটা পথ তিনি আমাদের সঙ্গে পা মিলিয়ে হাঁটলেন।
জি.টি রোড ধরে শক্তিগড় অবধি এসে আমরা এবার ওই বড় রাস্তা ছেড়ে গ্রামের দিকে ঢোকার রাস্তা ধরলাম। পাল্লা রোড রেল-স্টেশনের পাশ দিয়ে বাঁক নিয়ে চলা রাস্তা ধরে হেঁটে পৌঁছলাম কলানবগ্রাম। আজ কুড়ি কিলোমিটারের উপর হাঁটা হয়েছে। কলানবগ্রামেই আজকের রাত্রিবাস।
১০
গান্ধীভাবনা অনুসারী গ্রামগঠনের পরীক্ষানিরীক্ষার এক গভীর ও উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত এই কলানবগ্রামে গত ৭৫ বছর ধরে রচিত হয়ে চলেছে, যার কেন্দ্রে আছে ‘শিক্ষা-নিকেতন’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলেছিলেন বিশিষ্ট গান্ধীবাদী বিজয় কুমার ভট্টাচার্য। বিজয় কুমার ভট্টাচার্যের জন্ম ১৮৯৫ সালে বাদুলিয়া গ্রামে, যা বর্তমানে পূর্ব বর্ধমান জেলার অন্তর্গত। ১৯২১ সালে মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনের ডাকে সাড়া দিয়ে তিনি তাঁর তৎকালীন স্কুলের প্রধানশিক্ষকের পদে ইস্তফা দিয়ে সর্বতভাবে স্বাধীন দেশ গড়ার আন্দোলনে যোগ দেন। বাংলার রাঢ় অঞ্চল জুড়ে তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন ‘রাঢ়ের গান্ধী’ নামে। একাধিকবার কারাবাস করেছেন। ১৯৪২-এর ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনে এই অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছেন। ব্রিটিশ শাসকরা যখন ক্ষমতা হস্তান্তর করে ভারত ছেড়ে যাচ্ছে, তখন গান্ধীজী আহ্বান করেছিলেন: ইলেকশনের লড়াইয়ে ডুবে ক্ষমতা হাতে নিয়ে সরকার চালোনো এখন কাজ নয়, রাজনৈতিক দল হিসেবে কংগ্রেসকে ভেঙে দেওয়া হোক, দেশগঠন অর্থাৎ গ্রামগঠনের কাজে করমীরা আত্মনিয়োগ করুক, গ্রামগুলোকে আত্মনির্ভর বিকাশের পথে নিয়ে গিয়ে জনগণের স্বশাসনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে না পারলে কেবল শাসক-বদল-ই হবে, স্বাধীনতা আসবে না। কংগ্রেসের বড় বড় নেতারা এই আহ্বানে সাড়া দেননি। গান্ধীজির গ্রাম-স্বরাজ-এর আদর্শে উদ্বুদ্ধ যে কর্মীরা সাড়া দিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে বিজয় কুমার ভট্টাচার্য একজন। ১৯৪০-এর দশকের শেষদিক থেকে কাজ শুরু করে ১৯৫১ সালে তিনি এই কলানবগ্রামে শিক্ষা-নিকেতন প্রতিষ্ঠানটি শুরু করেন। মহাত্মা গান্ধীর ‘বুনিয়াদী শিক্ষা’-র ধারণার উপর ভিত্তি করে এলাকার কৃষক, মেহনতী ও আদিবাসী ঘরের শিশুদের জন্য এমন শিক্ষা-প্রক্রিয়া কীভাবে গড়ে তোলা যায় যা বিভিন্ন বিদ্যাচর্চাকে তাদের প্রাত্যহিক কাজ ও জীবনচর্যার বিকাশের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে, আত্মনির্ভর করতে পারে, গ্রামের বারোয়ারি কাজ পরিচালনায় প্রত্যয়ী অংশগ্রহণে সক্ষম করে তুলতে পারে--- তা নিয়ে এক নিবিড় অনুশীলন শুরু করেন তিনি। তাঁর স্ত্রী সাধনা গুহ রায়-ও এই ব্রতে শামিল হন। শামিল হন আরো বেশ কিছু সহকর্মী। ১৯৪৭ সালের পর পশ্চিম বাংলায় পরপর যে কংগ্রেস সরকারগুলো গঠিত হয়েছিল, তার নেতারা নানা সময় বিজয়বাবুকে অনুরোধ-উপরোধ করেছেন ভোটে জিতে এসে শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব নিতে, কখনোই তিনি তাতে কর্ণপাত করেননি। বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাঁকে সাম্মানিক ডি.লিট. উপাধি প্রদান করে অনুরোধ করা হয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যাচর্চার মহলে উচ্চ আসনে বসতে, তাতেও তিনি কর্ণপাত করেননি। তাঁর একমাত্র সাধনা ছিল এই কলানবগ্রামের ‘শিক্ষা-নিকেতন’ প্রকল্পটির মধ্য দিয়ে বুনিয়াদী শিক্ষা ও আত্মনির্ভর গ্রাম গঠনের আদর্শটিকে যথাসম্ভব বাস্তব রূপ দেওয়া। ক্রমে তিনি এখানে ২০০ জনের উপর ছাত্রছাত্রীদের বিনামূল্যে পড়াশোনার ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন, যার অংশ হিসেবেই ছিল জমিতে চাষ করা, গ্রামীণ কারিগরিবিদ্যা শেখা, গ্রামীণ সমাজের বিপদে-আপদে সক্রিয় ভূমিকা নেওয়া, ইত্যাদি। তিনি গ্রামের সচ্ছল পরিবারদের কাছে আবেদন করেছিলেন যে রোজ যেন তারা একমুঠো চাল অথবা এক টাকা গ্রামের জন্য দান করে--- শিক্ষা-নিকেতন-এর ছাত্র, শিক্ষক ও করমীরা প্রতিদিন গ্রামে ঘুরে এই দান সংগ্রহ করতেন এবং তা দিয়ে গড়ে উঠেছিল গ্রামের অতি গরিবদের অভাবমোচনের প্রকল্প। ১৯৯৯ সালে মারা যাওয়ার আগে অবধি বিজয় কুমার ভট্টাচার্য এই গোটা প্রকল্প পরিচালনার কাজেই তাঁর সমস্ত মেধা, অভিজ্ঞতা ও উদ্যম নিয়োগ করে গেছেন।
আজ ৭৫ বছর পরও সেই প্রতিষ্ঠান পথ অতিক্রম করে চলেছে। আমাদের পদযাত্রা যখন বিকেলের নিভে-আসা রোদের আলোয় ভাসা চাষের ক্ষেতগুলোর মধ্য দিয়ে হেঁটে এই প্রতিষ্ঠানের দরজায় এসে দাঁড়াল, মনে হল যেন এক তীর্থক্ষেত্রে পৌঁছলাম। এখানেই আমাদের রাতে থাকার বন্দোবস্ত। আর তার থেকেও বড় কথা, আজ এই প্রতিষ্ঠান কীভাবে চলছে তা দেখার ও জানার অভুতপূর্ব সুযোগ।
প্রথমেই চোখে পড়ে যে পাঁচিলঘেরা তিন-চার-তলা স্কুলবাড়ির কোনো আদল এখানে নেই। গাছপালা, মাঠ, চাষের ক্ষেত, পুকুর--- এইসবের সঙ্গে মিলেমিশে ছড়ানো-ছেটানো নাতিবৃহৎ কতগুলো বাড়ি: কোনোটা পাঠগৃহ, কোনোটা ছাত্র-আবাস, কোনোটা ছাত্রী-আবাস, কোনোটা নাচ-গান-নাটক করার মঞ্চঘর…। উঁচু পাঁচিলের লক্ষণরেখা খুব একটা চোখে পড়ে না। স্থাপত্যগতভাবেই এই শিক্ষা-নিকেতন যেন তার চারপাশের সঙ্গে মিলেমিশে এক হয়ে আছে।
এখানে কাজ করছেন এমন দুজন শিক্ষিকা, একজন শিক্ষক, একজন কর্মী এবং কিছু ছাত্রছাত্রীদের সাথে কথা বলে জানা গেলো যে বর্তমানে এখানে এই বিভাগগুলো চালু রয়েছে:
১। শিশুপালন কেন্দ্র (crèche): গ্রামের যে মায়েদের সারাদিনের জন্য মাঠের কাজ বা অন্য কাজে বেরিয়ে যেতে হয়, তাঁরা তাঁদের তিন বছরের কম বয়সী শিশুদের এখানে রেখে যেতে পারেন সকাল সাতটা থেকে বিকেল চারটে অবধি। তার জন্য কোনো টাকা-পয়সা লাগে না। এখানে রেখে-যাওয়া শিশুদের খাওয়া-দাওয়া, স্নান, প্রয়োজন হলে চিকিৎসা, সু-অভ্যাস তৈরি ও প্রাথমিক কিছু শিক্ষা দেওয়ার জন্য দুজন শিক্ষিকা ও আরো দুজন সহায়িকা আছেন। তিরিশজন মতো শিশুকে এভাবে রাখার বন্দোবস্ত আছে। মূলত আদিবাসী পরিবারের ক্ষেতমজুর মায়েরাই তাঁদের শিশুদের এখানে রেখে যান।
২। মঞ্জুষা তরঙ্গিনী শিশু ভবন: তিন বছরের বেশি কিন্তু ছয় বছরের কম শিশুদের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষার ব্যবস্থা আছে এখানে। সর্বাধিক ষাটজন মতো শিশুর জন্য এই ব্যবস্থা।
৩। আচার্য প্রমথনাথ বুনিয়াদী বিদ্যালয়: ছয় বছর থেকে ১৪ বছরের শিশুদের জন্য শিক্ষার ব্যবস্থা। ছাত্র ও ছাত্রীদের জন্য আলাদা আবাস আছে, সুন্দর পাঠাগার আছে, লাগোয়া চাষের মাঠে সবজি ও ধানের চাষ শেখা আছে। এছাড়াও ছাত্রছাত্রীদের চরকায় সুতো কাটা, মাটি দিয়ে কুমোরের কাজ, সেলাইয়ের কাজ শেখানো ও অভ্যাস করানো হয়। নাচ, গান, আবৃত্তি, নাট্যাভিনয় শেখানো হয়। মাতৃভাষার মাধ্যমে শেখানো হয়। তাছাড়া ইংরেজি ও হিন্দি ভাষাও শেখানো হয়। এখানে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা দুশোর বেশি। চোদ্দজন শিক্ষক-শিক্ষিকা আছেন।
৪। স্বনির্ভর কৃষির জন্য উদ্যোগ: বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহায়তা নিয়ে প্রয়াস নেওয়া হয়েছে যাতে বহুজাতিক কোম্পানীদের বিক্রি করা বীজের উপর নির্ভরশীলতা কাটিয়ে পরমপরাগত ধানের বীজ থেকে চাষ আবার ফিরিয়ে আনা যায়। প্রথমে তিন-চার মরশুম ধরে এই পরম্পরাগত বীজগুলো দিয়ে কয়েকটি জমিতে চাষ করে তা যে আবারও করা সম্ভব এবং কার্যকর তা এলাকার চাষীদের দেখানো হয়েছিল। তারপর সেই চাষীদের বলা হয়েছিল তারা চাষের জন্য এই বীজ নিতে পারে, কোনো পয়সা দিতে হবে না, কেবল ফলন হওয়ার পর দ্বিগুণ পরিমাণ বীজ ফিরে দিতে হবে। তিন বছরের মধ্যে প্রায় দুশো জন চাষী এই বন্দোবস্তের অধীনে তাদের জমিতে পরম্পরাগত বীজে ধানের চাষ করে: নিজেদের খাওয়া বাদ দিয়ে স্থানীয় বাজারে তারা সরাসরি কিছু ধান বেচতেও পেরেছে এবং আগে হাইব্রিড বীজ চাষ করে যা রোজগার হতো তার থেকে বেশি রোজগার করতে পেরেছে। এখন এই ধানের চাষ সহ কিছু সবজির চাষও এমন দুটো আলাদা প্লটে করা শুরু হয়েছে যেখানে কোনো রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব:বহার করা হচ্ছে না, কেবল ঘরোয়া জৈব সার ও কীটনাশকই ব্যবহার করা হচ্ছে। বহুজাতিক সার ও বীজের কোম্পানি এবং বড় ব্যবসায়ীদের মুঠোয় থাকা বাজারের কবলে না পড়ে চাষীরা যাতে চাষের কাজকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে, সেই লক্ষ্য নিয়েই এই পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে।
এখানে একটা বৃদ্ধাবাসও সদ্য গড়ে তোলা হয়েছে, যদিও সেখানে কোনো আবাসিক এখনও আসেনি: আমাদের থাকার জন্য সেটাই আজ খুলে দেওয়া হয়েছে। বৃদ্ধাবাসটির সামনের রাস্তার ওপারে একটা বড়ো মাঠ, মাঠের একধার ঘেঁষে একটা বিরাট অশত্থ গাছ ঘিরে বাঁধানো বেদি। নানা বয়সের প্রচুর ছেলেমেয়ে এই শেষ বিকেলে নানা খেলায় মগ্ন, উচ্ছাস ও কলরোলের একটা ঢেউ উঠছে-নামছে। ক্রমে সন্ধ্যা নেমে এলো। শিক্ষা-নিকেতন-এর কয়েকজন ছাত্র-ছাত্রী এসে জানালো যে পদযাত্রীদের জন্য তারা এক অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে তাদের মঞ্চঘরে, সেখানে এখন আমাদের যেতে হবে।
মঞ্চঘরটা বেশ বড়ো। মঞ্চটাকে ফাঁকা রেখে তার সামনে সতরঞ্চি পেতে ছাত্রছাত্রীরা ও আমরা সবাই বসলাম, শারীরিক কারণে নিচে বসতে যাদের অসুবিধা তাঁরা কয়েকটা চেয়ারে বসলেন। ছাত্রছাত্রীরা তাদের আপন শ্ক্ষা-নিকেতন নিয়ে লেখা গান আমাদের গেয়ে শোনালো সমবেতভাবে। বিভিন্ন বয়সের প্রায় সত্তর জন ছাত্রছাত্রী সেখানে সমবেত হয়েছিল। তারপর আমাদের পদযাত্রীদের পক্ষ থেকেও কিছু গান তাদের শোনানো হলো। শুরু বলো কিছু কথাবার্তার আদানপ্রদান। চন্দন পাল তাঁদের কাছে সহজ করে বললেন আমরা কেন হাঁটছি সেই কথা। সবশেষে সেখানেই ছাত্রছাত্রী ও কয়েকজন শিক্ষক-শিক্ষিকা মিলে অতি আন্তরিকতার সঙ্গে আমাদের পদযাত্রীদের সবার রাতের খাদ্য পরিবেশন করলেন।
মঞ্চঘর থেকে রাতে শোওয়ার জায়গায় ফিরছিলাম অন্ধকারে ডুবে থাকা মাঠের পাশ দিয়ে, ভাবছিলাম: লোভ-হিংসা-ক্ষয়-বিদ্বেষ যখন চারদিকের আলো একে একে নিভিয়ে দিতে থাকে, আবার আলো জ্বালার জন্য কী করা যায় তা ভেবে কুল-কিনারা করা যায় না, এমনই এক সময়ে এই কলানবগ্রামের শিক্ষা-নিকেতন অনেকগুলো আলোর পথের ইঙ্গিত যেন তুলে ধরছে সামনে, কাল সকালেই তো এখান থেকে বেরিয়ে পড়তে হবে যাত্রায়, কিন্তু আবার ফিরে আসতে হবে, অনেক কিছু করার আছে তা করার জন্য ফিরে আসতে হবে।
১১
পরদিন, ১০ই অক্টোবর, ভোরে কলানবগ্রাম থেকে বেরিয়ে আবার জি.টি. রোডে ফিরে এসে তা ধরে বর্ধমানের দিকে হাঁটা শুরু হলো। সতেরো কিলোমিটার হেঁটে বর্ধমান শহরের কার্জন গেটের লাগোয়া এলাকায় আমরা পৌঁছলাম বিকেল নাগাদ। বর্ধমান জেলা কংগ্রেসের একটি ভবনে এখানে রাত কাটানোর ব্যবস্থা হয়েছে। পরের দিন, ১১ই অক্টোবর, জয়প্রকাশ নারায়ণের ১২৪-তম জন্মদিন। ভোরের সর্বধর্মপ্রার্থনার পর তাই আমরা পদযাত্রীরা সবাই জয়প্রকাশ নারায়ণ নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনার জন্য বসলাম।
এই আলোচনায় মূল বক্তব্য রাখলেন সর্ব সেবা সংঘের দুই প্রধান সংগঠক চন্দন পাল ও অরবিন্দ অঞ্জুম। ১৯৭০-এর দশকে জয়প্রকাশ নারায়ণের নেতৃত্বাধীন আন্দোলনে সক্রিয় অংশ নিয়েছিলেন চন্দন পাল, তাঁর সেই অভিজ্ঞতার কিছু কিছু টুকরো তিনি বলছিলেন। ১৯৭৯ সালের ৮ই অক্টোবর মারা যাওয়ার কয়েক সপ্তাহ আগে, জয়প্রকাশজি যখন গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় অত্যন্ত কাহিল, তখন চন্দন পাল তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে অন্যদের জন্য কী পরামর্শ তিনি রেখে যাবেন। জয়প্রকাশজি উত্তর দিয়েছিলেন: মানুষের কাছে যাও, মানুষকে তোমার কথা বলো, মানুষ কী বলছে শেনো। পার্তি-নেতা-আমলা-দের পাকে বাঁধা সরকারের পরিবর্তে লোকতন্ত্রের যে ধারণা জয়প্রকাশজি নানাভাবে হাজির করেছিলেন, সেখানে প্রত্যাহারের অধিকার (right to recall) জনগণের একটি আবশ্যক অধিকার বলে তিনি মনে করতেন: জনগণ তাদের নিজেদের মধ্যে পৌঁছানো ঐকমত্য অনুযায়ী কাজ করার জন্য যে প্রতিনিধিদের নিজেদের মধ্য থেকে বাছবে, তাদের কেউ যদি সেই অনুসারে কাজ না করে তাহলে তখনই তাকে ফিরিয়ে এনে নতুন প্রতিনিধি বাছার অধিকার, ও সেই অধিকার কার্যকর করার প্রণালী থাকতে হবে, নইলে গণতন্ত্রের বাইরের খোলটাই কেবল থাকবে, শাঁস কিছু থাকবে না। চন্দন পাল আলোচনা করতে করতে বলছিলেন যে এই প্রত্যাহারের অধিকারের চাহিদা ও তা বাস্তবে কার্যকর করার চাহিদাই আজ আমরা দিল্লির যন্তর-মন্তর যহ দেশজুড়ে স্বতঃস্ফূর্ত যুব-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও নির্বাচন কমিশনের আধিকারিকদের পদত্যাগের দাবির মধ্য দিয়ে দেখছি।
অরবিন্দ অঞ্জুম জামশেদপুরে থাকেন। জয়প্রকাশ নারায়ণের ভাবনাদর্শে অনুপ্রাণিত ছাত্র আন্দোলন ও তার পরবর্তীতে বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তিনি উঠে এসেছেন। আমাদের এই পদযাত্রায় প্রাত্যহিক সমস্ত খুঁটিনাটি ব্যবস্থাপনায় তাঁর ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি বলে মনে হয়, অথচ কখনোই নেতা হিসেবে নিজেকে সামনে হাজির করার কোনো ঝোঁক তাঁর মধ্যে আমি দেখিনি। জয়প্রকাশ নারায়ণ স্বাধীনতা আন্দোলনে ও তারপর স্বাধীনতা-পরবর্তী ভারতে বিভিন্ন সন্ধিক্ষণে কী রাজনৈতিক ভূমিকা পালন করেছিলেন, তার একটা সংক্ষিপ্ত বিবরণ তিনি দিলেন। কিন্তু তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণভাবে তিনি জয়প্রকাশ নারায়ণের ভাবনার কিছু মূল দিক আলোচনার মধ্য দিয়ে তুলে ধরলেন যে ‘সার্বিক বিপ্লব’ (সম্পূর্ণ ক্রান্তি/ total revolution)–এর ধারণা এবং তার মধ্য দিয়ে ‘পার্টিহীন গণতন্ত্র’ (partyless democracy) ও ‘রাষ্ট্রহীন সমাজ’ (stateless society) গড়ে তোলা অভিমুখে যাত্রার নিশানা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তিনি বললেন যে জরুরী-অবস্থা-বিরোধী লড়াইয়ে জয়প্রকাশজি যে জনসঙ্ঘ (আর.এস.এস.-এর তৎকালীন রাজনৈতিক শাখা)-র সঙ্গে জোট বেঁধেছিলেন, সেই রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে নানা সমালোচনা বা ব্যাখ্যা হতে পারে, কিন্তু তাঁর পূর্বোক্ত রাজনৈতিক ভাবনা-নিশানা আজও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও প্রয়োজনীয়।
অরবিন্দ অঞ্জুম-এর বক্তব্য আমার নিজের মধ্যে বেশকিছু ভাবনাপ্রবাহের জন্ম দিয়েছিল, সংক্ষেপে তা নিয়ে কিছু কথা এখানে বলার তাগিদ বোধ করছি। আমি নিজে মার্কসবাদী-লেনিনবাদী যে চর্চাধারার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছি, সেই মহলে জয়প্রকাশ নারায়ণ বলতে ওই জনসংঘের সঙ্গে জোটের কৌশলের তীব্র সমালোচনা ছাড়া আর খুব কিছু আলোচনা হয় না। জয়প্রকাশ নারায়ণের কাজ ও ভাবনার বিপুল পরিধি থেকে কেবলমাত্র এই একটি বিন্দুকেই বেছে নিয়ে তাকেই নির্ণায়ক বলে হাজির করা যে হয় মূর্খতা নয়তো রাজনৈতিক শঠতা (নিন্দা করার জন্য দরকারি অংশটুকু বিচ্ছিন্ন করে এনে বড়ো করে দেখিয়ে বাকি পুরোটাকে ভ্যানিশ করে দেওয়া), তা আজ আমার পক্ষে অস্বীকার করা মুশকিল, কারণ মার্কসবাদী-লেনিনবাদী ঘরানার এককালের স্থির-বিশ্বসগুলো যখন আজ নিজের মধ্যেই প্রশ্নের মুখে পড়ে যাচ্ছে, তখন জয়প্রকাশ নারায়ণ যে প্রশ্নগুলো তুলেছিলেন, সেগুলোর গুরুত্ব ও গভীরতা ক্রমশ আমার কাছে আরো স্পষ্ট হয়ে উঠছে। অরবিন্দ অঞ্জুম-এর বক্তব্য যেন সেখানেই ঘা মেরে কতগুলো ভাবনাকে একেবারে সামনে এনে দিলো। ভাবনাগুলো সংক্ষেপে এরকম:
১। জয়প্রকাশ নারায়ণ প্রথমে মার্কসবাদী-লেনিনবাদী পথের অনুসারী ছিলেন, অর্থাৎ, বিপ্লবী পার্টির নেতৃত্বে হিংসাত্মক কঅষমতা-দখলের লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল ও বিপ্লবী রাষ্ট্র গঠনের মধ্য দিয়ে সমাজতান্ত্রিক সমাজে উত্তরণের পথকেই একমাত্র সঠিক বলে মনে করতেন। কিন্তু, বিশেষ করে রাশিয়ার বিপ্লব-পরবর্তী অবস্থার ক্রমপরিণতি তাঁকে ক্রমশ এই হিংসাত্মক পথ সম্পর্কে সংশয়ী করে তোলে। রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের জন্য বিপ্লবী পার্টি যে হিংসাত্মক শক্তিকে নিজ নিয়ন্ত্রণে সংহত করে তুলছে, ক্ষমতা দখল সম্পন্ন হওয়ার পর সেই হিংসাত্মক শক্তি নয়া বিপ্লবী রাষ্ট্রের মধ্যেও নিয়ন্ত্রক চালিকাশক্তি হয়ে বসছে এবং রাষ্ট্রশক্তিকে ক্রমশ কেন্দ্রীভূত করে তুলে যে জনগণের (বা শ্রেণির) নামে সে ক্ষমতাদখল করেছে তার স্বাধীন স্বশাসনের ক্ষমতাকেই হরণ করছে। এক হিংসার প্রতিক্রিয়ায় আরেক হিংসার যে অলাতচক্র তা গণতন্ত্রকে পূর্ণতার দিকে নিয়ে না গিয়ে তাকে আরও খর্বিত করে দেওয়ার দিকেই এগোচ্ছে। এই ভাবনা থেকে বিকল্প পথের খোঁজে জয়প্রকাশ নারায়ণ গান্ধীজির অহিংসা ও সত্যাগ্রহের আদর্শ এবং তা আরো বিস্তৃতকরণে বিনোবা ভাবে-র ভাবনা অনুসরণ করে হিংসাত্মক পথকে সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করে অহিংস পথে ‘সর্বোদয়’-এর কল্পনা সামনে আনেন।
২। রাশিয়া ও অন্যত্র অনুসৃত মার্কসবাদী-লেনিনবাদী পথের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমালোচনা (যা আগেরটির সঙ্গে যুক্ত) জয়প্রকাশ নারায়ণ করেছিলেন, তা হলো এই যে, ওই হিংসাত্মক পথ আবশ্যিকভাবেই রাষ্ট্রকেন্দ্রীক, রাষ্ট্রের ভূমিকাকেই সে নির্ধারক বলে মনে করে এবং বিপ্লবী উত্তরণের পর্যায়েও রাষ্ট্রের ভূমিকাকে নির্ধারক করে তুলতে চায়। এই রাষ্ট্র-কেন্দ্রীকতা আবশ্যিকভাবে ক্ষমতার কেন্দ্রীভবনের ঝোঁকের জন্ম দেয়, কার্যকরীভাবে সাধারণ মানুষের হাতে ক্ষমতা নিয়ে আসার বিকেন্দ্রীভবনের বিরুদ্ধে কাজ করে। তাই জয়প্রকাশ নারায়ণ রাজনীতির (রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল ও প্রয়োগ অর্থে) বদলে লোকনীতি-র (লোকসমাজকে স্বশাসন চর্চা করার শক্তিতে বলীয়ান করে গড়ে তোলার অর্থে) স্লোগান এনেছিলেন। গান্ধীজি ও বিনোবা ভাবে-র গ্রাম-স্বরাজ-এর আদর্শকে এই লোকনীতির মধ্য দিয়ে মূর্ত করে তুলতে চেয়েছিলেন।
৩। গণতন্ত্রের যে রূপ বর্তমানে বিদ্যমান, সেখানে গণ বা মানুষের হাতে তন্ত্র চালানোর কোনো ক্ষমতাই নেই, নিয়ম করে কিছু প্রতিনিধি বেছে দেওয়া ছাড়া, যে প্রতিনিধিরা কোনোভাবেই তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে না, তাদের মতের প্রতিনিধিত্ব করে না। ফলে গণতন্ত্রের বদলে লোকতন্ত্রের স্লোগান আনার মধ্য দিয়ে জযপ্রকাশ নারায়ণ এমন এক সর্বজনের অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের ধারণা নিয়ে আসতে চেয়েছিলেন যেখানে ক্ষমতা এক চুড়ো-করে-বাঁধা কাঠামোয় ক্রমশ উপর দিকে কেন্দ্রীভূত হতে থাকবে না, বরং স্বশাসিত সমাজগুলোর সহায়-সমন্বয়-এর মধ্য দিয়ে আলিঙ্গনাবদ্ধ হয়ে থাকবে। পার্টিহীন গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রহীন সমাজ-এর স্লোগান এমন একটা ্র্থকেই স্পষ্ট করে তুলতে চেয়েছিল। আগে রবীন্দ্রনাথের যে ভাবনার কথা বলেছি, অর্থাৎ সমাজ ও রাষ্ট্র-এর মধ্যে তফাত করার ভাবনা, তা যদি গান্ধী-বিনোবা-জয়প্রকাশের এই ভাবনার পাশে এনে রাখা যায়, তাহলে চিন্তা ও চর্চার আরো গভীর কিছু ইশারা ফুটে ওঠে।
৪। নেহাতই রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রনৈতিক কোনো বিপ্লব তাই লোকতন্ত্রের পথ তৈরি করতে অপারগ, তার জন্য চাই এক সার্বিক বিপ্লব যা একইসঙ্গে অনেকগুলো পরস্পর-সম্পর্কিত ক্ষেত্রে রূপান্তরের প্রক্রিয়া চালাবে, যে ক্ষেত্রগুলো হলো: সামাজিক, আর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, আদর্শনৈতিক/বৌদ্ধিক, শিক্ষা এবং আধ্যাত্মিক। অহিংসা ও সত্যাগ্রহের পথে এই বহুস্তরীয় যুগপৎ রূপান্তরকরণ ছাড়া লোকসমাজকে স্বশাসন চর্চার শক্তিতে বলীয়ান করে তোলা অসম্ভব।
জনসঙ্ঘ-এর সঙ্গে জোট বেঁধে ভারতীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে জনসঙ্ঘের ও তার নামান্তরের মধ্য দিয়ে আসা বি.জে.পি.-র (ও সেই অর্থে তার পিছনে থাকা আর.এস.এস.-এর) গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করে দেওয়ায় জয়প্রকাশ নারায়ণের কী ভূমিকা ছিল তা নিয়ে অবশ্যই নানা আলোচনা হতে পারে, কিন্তু একইসঙ্গে, আজ বি.জে.পি. (আর.এস.এস.)-র পৌরোহিত্যে চলা উগ্র হিন্দুত্ববাদী (ও রাষ্ট্রবাদী) আগ্রাসন যেভাবে গণতন্ত্রের শেষ প্রাণবায়ুটুকুকেও নিঃশেষ করে দিতে বসেছে, তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ও বিপরীত-যাত্রা শুরু করার জন্য জয়প্রকাশ নারায়ণের উপরোক্ত ভাবনাগুলোকে নতুন করে পাঠ ও প্রয়োগ করার প্রয়াসকে মনে হয় আমরা এড়িয়ে যেতে পারি না।
১২
১১ই অক্টোবর সকালে বর্ধমান শহর ছেড়ে আমাদের পদযাত্রা এগোলো তালিত-এর দিকে। বর্ধমান শহরের একদম শেষপ্রান্তে ১০৮ শিবের মন্দির চত্বরে এসে কিছুক্ষণের জন্য থামা হলো চা খাওয়ার জন্য। মন্দির চত্বরে কয়েকজন ভিখারিণী ভিক্ষা করছিলেন। তাঁদের একজন চম্পা হাজরা, ষাটের কাছাকাছি বয়স হবে নিশ্চয়। আমাদের কয়েকজনের দিকে তাঁর ভিক্ষাপাত্র এগিয়ে দিলে তাঁর সঙ্গে কিছু কথাবার্তা শুরু হয়। আমরা যে বিভিন্নজনের দেওয়া চাঁদা-দান-সমর্থন-এর উপর দাঁড়িয়েই এই যাত্রাপথে দিন নির্বাহ করছি, হেঁটে চলেছি যাতে বিদ্বেষ-বিভেদ অতিক্রম করে শান্তি ও ভালোবাসার এক সমাজে বাঁচতে পারি, সেই কথা শুনে তিনি অতি আগ্রহে আরো নানাকিছু জানতে চাইছিলেন। কথা বলতে বলতে প্রথমে তিনি তাঁর ভিক্ষাপাত্র থেকে একটা দশ টাকার নোট তুলে আমাদের হাতে তুলে দিতে চাইলেন, তারপর কী ভেবে যেন ওই দশ টাকার নোটটা রেখে একটা কুড়ি টাকার নোট আমাদের দিকে বাড়িয়ে দিলেন। অপ্রত্যাশিত এই ঘটনায় আমরা অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছিলাম, তাঁকে বলার চেষ্টা করেছিলাম যে, টাকাটা তো তাঁর লাগবে, আমাদের চেয়ে তাঁর প্রয়োজন তো কম নয়…। তাঁর বাড়িয়ে দেওয়া টাকাটা নিতে আমরা দ্বিধা করছিলাম। তিনি তখন বললেন: তোমরা ভালোবাসার কথা বলছো বাবা, ভালোবাসা দিলে তবেই ভালোবাসা পাওয়া যায়…। ভালোবাসার সমাজের জন্য তাঁর এই দান, ভালোবাসার পথের পথিকদের জন্য তাঁর এই ভালোবাসা যে আমাদের একটি পবিত্র প্রাপ্তি সেই বোধ আমাদের হলো। আমরা মাথা ঝুঁকিয়ে তাঁর দান গ্রহণ করলাম।
তালিত-এ এসে সেদিন আমাদের হাঁটা শেষ। রাস্তার ধারে একটা বড় বেসরকারি স্কুলে সেখানকার এক মাস্টারমশাইয়ের সৌজন্যে আমাদের রাত্রিবাসের ব্যবস্থা হলো, সেখানকার ক্যান্টিনেই খাওয়া-দাওয়াও হলো। পরের দিন সকালে স্কুলের ক্লাস শুরুর আগেই আমাদের বেরিয়ে যাওয়ার পালা। ভোরবেলা উঠে স্কুলের সামনের চত্বরে নেমে দেখি এক কোণে দাঁড়িয়ে আমাদের এক সহ-পদযাত্রী ছোট্ট একটা বই হাতে নিমগ্ন হয়ে পড়ছেন। সবাই তাঁকে ‘আন্না’ বলে ডাকে, সত্তরোর্ধ এই মানুষটি তামিলনাডু থেকে এসেছেন, সেখানকার এক স্কুলে দীর্ঘদিন পরিয়ে এখন অবসরপ্রাপ্ত। বাংলা বলতে বা বুঝতে পারেন না, হিন্দিতেও সচ্ছন্দ নন। তাঁর মাতৃভাষা তামিল, আর ইংরেজি কিছুটা বলতে ও বুঝতে পারেন। অন্যদের সঙ্গে ভাববিনিময়ে ভাষার এই বাধা সত্ত্বেও পদযাত্রীদের সবার কাছেই তিনি প্রিয় হয়ে উঠেছেন অন্যদের প্রতি তাঁর নীরব সেবার মনোভাবের জন্য। প্রতিদিন হাঁটার শেষে, সবাই যখন ক্লান্ত হয়ে ক্ষণেক জিরিয়ে নিতে উদগ্রীব, তিনি তখন ঘর্মাক্ত মুখে হাসি নিয়ে সটান উঠে যান আমাদের সঙ্গে চলা ছোট ট্রাকের পিছনে--- একের পর এক সবার ব্যাগ ও সুটকেস টেনে টেনে নামিয়ে সবার হাতে তুলে দিয়ে তবে তাঁর কাজ শেষ হয়। যেখানে পানীয় জলের সংকট, সেথানে একাধিক বোতল নিয়ে তিনি সবার জন্য জল জোগাড় করে নিয়ে আসেন। রাতে শোয়ার সময়ে নিজের ছাড়াও আরো একাধিক জনের জন্য তোষক ও বালিশ বয়ে আনেন। কারো কোনো ধন্যবাদ প্রত্যাশা করেন না, এটা যেন তাঁর স্বাভাবিক করতব্য। তিনি এই বোরবেলা এতো নিমগ্ন হয়ে কী পড়ছেন তা জানার জন্য তাঁর পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমাকে দেখে তিনি হাসিমুখে পাতলা বইটি আমার দিকে বাড়িয়ে দিলেন। বইটি তামিল ভাষায়, তাই আমার পড়ে বোঝার উপায় নেই। তাঁকেই জিজ্ঞাসা করলাম বইটা সম্পর্কে। তিনি বললেন: বইটি তামিল সাধকদের রচিত স্তবের সংকলন, সপ্তাহে সাতদিনের প্রার্থনার জন্য সাতটি ভাগে বিভক্ত। কথা বলতে বলতে আরো জানা গেলো যে চোদ্দ শতক থেকে উনিশ শতক অবধি গুরু-শিষ্য পরম্পরায় বাঁধা আটজন তামিল সাধক এই স্তবগুলোর রচয়িতা; চোদ্দ-পনেরো শতকে রচিত স্তবগুলো প্রাচীন তামিল ভাষায় রচিত, আন্না তা পড়তে পারলেও সব কথার অর্থ বুঝতে পারেন না, প্রাচীন ভাষার বিশেষজ্ঞ যাঁরা তাঁরাই পুরোটা অর্থ ব্যাখ্যা করতে পারেন; পরের দিকের স্তবগুলো বুঝতে আন্নার মতো আধুনিক তামিল ভাষার বাচকদের কোনো অসুবিধা হয় না। এই স্তবগুলোতেও অহিংসা, সত্য অনুসন্ধান করা ও সত্যের পথে থাকা, নিঃস্বার্থে অপরকে সেবা করার কথা বলা হয়েছে। সপ্তাহে সাতদিন এই স্তবগুলো পাঠ করা আন্নার দীর্ঘদিনের অভ্যাস, তা তাঁকে অন্তরের শক্তি যোগায়। আন্নার কথা শুনতে শুনতে তাংর মধ্যে আমি এক মহীরুহের আদল দেখতে পাচ্ছিলাম, মাটির উপরে তা সবাইকে ছায়া দেওয়ার জন্য তার ডালপালা ছড়িয়ে দিয়েছে, আর মাটির নিচে সুদীর্ঘ পরম্পরা থেকে তার শিকড় রস সঞ্চয় করে আনছে।
১৩
১২-ই অক্টোবর তালিত থেকে রওনা হয়ে কয়েরাপুর হয়ে বনপাস-এ এসে রাত্রিবাস, ১৩-ই অক্টোবর বনপাস থেকে শুরু করে গুসকরা-য় এসে রাত্রিবাস, ১৪-ই অক্টোবর গুসকরা থেকে যাত্রা করে ভেদিয়া-য় এসে রাত্রিবাস: এভাবে এই তিনদিনে আমাদের পদযাত্রা গ্রামীণ বাংলার মধ্য দিয়ে চল্লিশ কিলোমিটারের উপর পথ অতিক্রম করলো। অবশ্য খন্যান-এর পর থেকেই আমরা মূলত গ্রামাঞ্চলের মধ্য দিয়ে এসেছি। পথে বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে কথা হয়েছে। মেমারিতে জি.টি. রোড-এর মোড়ে এক চায়ের দোকানীর সঙ্গে কথা হয়েছিল, সে জমি বিক্রির দালালের কাজও করে। সে বলছিল যে মেমারির আশে পাশে চাষিরা এখন তাদের জমি বেচে দিচ্ছে, চাষ করে তো তেমন লাভ হচ্ছে না, তার চেয়ে জমি বিক্রির টাকা মূলধন করে অন্য ব্যবসাপাতির ধান্দা যদি কিছু করা যায়, কন্ট্রাক্টরি-প্রমোটারির ব্যবসায় এখন অনেক লাভ। বনপাস-এ পঞ্চায়েত অফিসের কাছে এক চায়ের দোকানের সামনে কালভার্টের উপর বসে ভোরবেলা বেশ কিছু স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তাঁরা বলছিলেন, আলুর চাষ এখন আর কেউ খুব করতে চাইছে না, কারণ আলু চাষ করে দাম পাওয়া যাচ্ছে না। তাঁরা হিসাব দিচ্ছিলেন: সার-বীজ-কীটনাশক-এর খরচ হিসেবের বাইরে রেখেই এক বস্তা আলু চাষের খরচ ১৫০ টাকা প্রায়, আর এক বস্তা আলুর দাম পাওয়া যাচ্ছে ২০০ টাকা। তাহলে রোজগার তো দূরের কথা, চাষের খরচই উঠছে না। ধান এখানে বছরে একবার হয়, কারণ দামোদর থেকে আসা খাল সংস্কারের অভাবে মজে যাওয়ায় জল পাওয়া যায় না। ধান বিক্রি করতে গেলেও নানাভাবে ছাঁটকাট করে ধানের দাম কমায়। চাষের উপর নির্ভর করে সংসার চালানো দুষ্কর হয়ে উঠেছে, বাধ্য হয়ে অন্য পথ খুঁজতে হচ্ছে, ছেলে-মেয়েদের রোজগারের ধান্দায় বাইরে পাঠাতে হচ্ছে।
এদিকে জাতীয় সড়ক ধরে হাঁটতে হাঁটতে দুপাশেই চোখে পড়ছিল বড় বড় কোম্পানির মালিকানাধীন বিরাট বিরাট আলুর গুদাম। সেখানে আলু বাছার কাজে ঢুকছে গ্রামের নানা বয়সের মহিলারা, তেমন একজন মহিলার সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, চুক্তিভিত্তিক পিস-রেট-এ তাঁরা পয়সা পান, তিনি তাঁর গ্রামের আরো পাঁচজন মহিলাকে নিয়ে এসেছেন তাঁর অধীনে দল হিসেবে কাজ করবে বলে, ফলে তিনি কিছু বেশি পাবেন। সকালে কাজে ঢুকছেন, তাঁর হাতে থলিতে দুপুরের খাওয়ার, বললেন: দিন চালানোর মতো রোজগার করতে হলে ঘন্টা-বারো টানা কাজ করতে হয় দিনে, খাওয়া বা বিশ্রামের ফুরসত থাকে না। আর এইসব আলুর গুদামের সামনে হা-পিত্যেশ করে বসে আছে আরো বেশ কিছু গ্রামের মহিলা, তাঁদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেলো যে তাঁরা বসে আছেন বাছাইয়ের পর বাতিল হয়ে যাওয়া দাগি বা ধসা-পচা আলুগুলো বাইরে ফেলে দেওয়া হবে, সেগুলো কুড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য তাঁরা বসে আছেন, সেগুলো পেলে বাড়িতে উনুন জ্বলবে।
কৃষকরা চাষের খরচ ওঠাতে পারছেন না, গ্রামের অন্যান্যদের ঘরেও অভাবের ছায়া আরো ঘন হচ্ছে, আর তার উপর দাঁড়িয়ে জাতীয় সড়কের পাশের এই কৃষি-ব্যবসায়ী কোম্পানিগুলোর দপ্তর ও গুদাম লাভের ছটায় আরো উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। এইসব কোম্পানি আরো লাভের লোভে আরো কতো বিনিয়োগ করলো তাকেই দেখানো হচ্ছে দেশের উন্নয়ন বলে।
কলানবগ্রামে দেখে আসা স্বাধীন স্বনির্ভর কৃষি নিয়ে পরীক্ষা-নিরাক্ষার কথা আরো বেশি করে মনে পড়ে যাচ্ছিল। কিন্তু কলানবগ্রাম তো একটা বিন্দুর মতো! কীভাবে বিস্তৃত গ্রামাঞ্চল জুড়ে বাজার-বাণিজ্য-মুনাফার যক্ষপুরীর আগ্রাসনের সামনে কৃষকদের নিঃশব্দ আত্মসমর্পণের বদলে কৃষিকাজের উপর কৃষকদের স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ আবার ফিরিয়ে আনা যায়, গ্রামীণ স্বশাসনের কাঠামোর মধ্য দিয়ে তা কৃষকদের জীবনের আরো প্রতিটা ক্ষেত্রে বিস্তৃত করা যায়, তা নিয়ে আমরা মাথা ঘামাতে শুরু করবো আর কবে?
জাতীয় সড়কের একটি মোড়ে একসঙ্গে দাঁড়িয়ে আমাদের বক্তব্য রাখা হচ্ছিল, চারপাশ ঘিরে অনেক গ্রামীণ মানুষ শুনছিলেন, বক্তার বক্তব্য শেষে জগদীশ স্লোগান দিতে দিতে এই স্লোগানটাও বলে উঠলো: ‘সম্পূর্ণ ক্রান্তি অব নাড়া হায়’, সমবেত কণ্ঠে কয়েকজন তা পূর্ণ করলো: ‘ভাবি ইতিহাস হামারা হায়’। এটা ১৯৭৪ সালের সর্বোদয় আন্দোলনের স্লোগান। কিন্তু কেবল স্লোগান নয়, গ্রাম-স্বরাজ-কে পার্টিহীন গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রহীন সমাজের পথ ধরে পূর্ণতার দিকে নিয়ে যাওয়ার যাত্রা বাস্তবে তার প্রথম কদম ফেলবে কীভাবে? প্রশ্নটা প্রবল হয়ে উঠলো, উত্তর এখনও জানা নেই।
১৪
পদযাত্রায় হাঁটতে হাঁটতে ভাবছিলাম: এখন পশ্চিমবঙ্গে যেভাবে হিন্দু ও মুসলমান মানুষদের মধ্যে আড়াআড়ি বিভাজন ঘটিয়ে পরস্পরের প্রতি সন্দেহ, অবিশ্বাস, ঘৃণা ও হিংসাকে নির্ধারক ভূমিকায় এনে দাঁড় করানো হয়েছে, তা আসলে আমাদের সমাজের বাঁধুনিগুলোকেই ছিন্ন করে দিয়েছে। বিভিন্ন ধর্ম-বর্ণ-জাত-গোত্র-এর মানুষরা তাদের একে অপরের মধ্যের পার্থক্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে যদি পারস্পরির দায়িত্ববোধ ও পড়শীবোধে স্থিত না হয়, একে অপরকে বিশ্বাস না করে, তাহলে বহু বিবিধের মিলনের মধ্য দিয়ে সমাজের যে নবসৃষ্টি ও বিকাশের আত্মশক্তি, তা গড়ে ওঠে না। মানুষরা তখন নিজেদের সম্মিলনের শক্তির উপর ভরসা হারায়। টুকরো টুকরো হতে হতে অপরবিদ্বেষী মানুষ বিচ্ছিন্ন ছড়ানো-ছিটানো বিন্দুর মতো কিছু নিঃসঙ্গ ক্ষমতাহীন এককে পরিণত হয়, আর তার উপরে বিরাট বিপুল চেহারা ধরে সর্বক্ষমতাধর হিসেবে রাষ্ট্র ঝুঁকে পড়ে সমস্ত আকাশটাকেই অবরুদ্ধ করে দেয়। সমাজের আত্মশক্তিতে আস্থা হারানো মানুষ তখন ক্ষ্দ্র স্বার্থাণ্বেষী গোষ্ঠী বা পার্টি-দের শিবিরগুলোয় ভাগ হয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে নিজেদের ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর স্বার্থে ব্যবহার করে উতরোতে চায়, বিদ্বেষের সাগর পাড়ি দিতে চায় সবচেয়ে বিদ্বেষী হয়ে, মারের সাগর পাড়ি দিতে চায় সবচেয়ে মারমুখী হয়ে। সমাজ তখন আত্মশক্তিহীন, রাষ্ট্রই সর্বশক্তিধর। আমরা এখন বোধহয় এই সর্বনাশা কালচক্রে পতিত হয়েছি। এর থেকে উঠে এসে সমাজকে নতুন ভাবে বেঁধে তার আত্মশক্তিতে বলীয়ান হয়ে ওঠার দিকে যেতে হলে, এখন বুঝি সবার প্রথম এই হিন্দু-মুসলমান পারস্পরিক ভাগাভাগি ও দ্বেষ শেষ করতে হবে, আচারধর্মের এই পার্থক্যের অনেক উপরে মানুষ হিসেবে যে ঐক্য তার নিবিড় বন্ধনটিকে বাঁধতে হবে।
ভেদিয়া ঢোকার আগে আলমপুরে মসজিদের সামনে এক মুসলমান পাড়ায় প্রায় জনাকুড়ি মহিলা ও শিশু বেরিয়ে এসে আমাদের পদযাত্রীদের সামনে দাঁড়িয়েছিলো। তাদের চোখেমুখে চাপা ভয়ের চিহ্ন, একে-অপরের গা ঘেঁষে প্রায় একটা নিরেট পাথরখণ্ডের মতো তারা খাড়া হয়ে ছিল, নির্বাকে বুঝে নিতে চাইছিল আমাদের থেকে কোনো বিপদের সম্ভাবনা নাকি কোনো সহায়তার সম্ভাবনা। বেশ কিছু পুরুষ মসজিদের দিকেই চলে গেল বা তার মধ্যেই দাঁড়িয়ে রইলো, আমাদের কয়েকজনের আহ্বান সত্ত্বেও কথা বলতে এগিয়ে এলো না। আমাদের পোষাক-আষাক দেখে তারা আমাদের ‘হিন্দু’ বলেই বুঝে নিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে একটা দূরত্ব তৈরি হয়ে গেছে। আমাদের শান্তি ও ভালোবাসার আহ্বান সেই দূরত্বে কোনো আঁচড় কাটতে পারলো বলে মনে হলো না। বর্তমান হিন্দুত্ববাদী শাসন মুসলমান মানুষদের মধ্যে যে সন্ত্রাসের রাজ কায়েম করেছে তার একটা খণ্ডচিত্র আমাদের সামনে উপস্থিত হলো। পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাস ফিরিয়ে আনার, সংকটমুহূর্তে একে-অপরের হাত ধরার আরো নানা উপায় আমাদের ভাবতে হবে।
ভেদিয়ায় রাত্রিবাসের পর পরদিন সকালে হাঁটা শুরু করে অজয় নদী পেরিয়ে প্রায় ১২ কিলোমিটার অতিক্রম করে আমরা পৌঁছলাম বোলপুর-শান্তিনিকেতন। সেইদিন বিকেলবেলা আমরা সবাই গেলাম প্রায় আট কিলোমিটার দূরে তিলুটিয়া গ্রামে আচার্য় শূদ্রোত্তম প্রতিষ্ঠিত গান্ধী-আশ্রম দেখতে। তিলুটিয়া গ্রাম মুসলমান-প্রধান, সেখানে এক মুসলমান পরিবারেই ১৯১৯ সালে জন্ম হলেও ইনি তাঁর জন্মগত নাম ত্যাগ করে শূদ্রোত্তম নাম নেন তাঁর জীবনাদর্শ প্রকাশ করার জন্য । তিনি মনে করতেন, এবং আমৃত্যু সকলকে এই শিক্ষা দিয়ে গেছেন, যে মানুষদের ধর্ম একটাই, তা হলো মানবধর্ম। গান্ধী ও রবীন্দ্রনাথের গ্রাম-পুনর্গঠনের ডাকে সাড়া দিয়ে সেই কাজ পরিচালনার জন্য তিনি গান্ধী-আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরে উদয়ন কল্যাণ আশ্রম নামে পরিচিত হয়। ১৯৯৩ সালে তাঁর মৃত্যু হলেও তাঁর উত্তরসুরিরা এখনও সেই আশ্রমএর কাজ চালাচ্ছে, আশ্রম-পরিচালিত একটি স্কুলে গ্রামের ছেলেমেয়েদের নিখরচায় শিক্ষার ব্যবস্থা হয়ে চলেছে। সন্ধ্যাবেলা একটা ঝাঁকড়া গাছের নিচে প্রাকৃতিক মঞ্চে সেই স্কুলের ছাত্রছাত্রী গ্রামের ছেলেমেয়েরা আমাদের সামনে রবীন্দ্রনাথের ‘বাল্মীকি প্রতিভা’ নৃত্যনাট্য অভিনয় করে দেখালেন--- পদযাত্রীরা সবাই তার ভাষা বুঝলো না, কিন্তু ভাষার বাধা টপকে তা সবার মন ভিজিয়ে দিলো।
পরের দিন ভোরবেলা উঠে আমরা হাঁটতে হাঁটতে এলাম শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতী আশ্রমের ছাতিমতলার সামনে। রবীন্দ্রনাথ এই আশ্রমকে গড়ে তুলেছিলেন মুক্ত মিলনের ক্ষেত্র হিসেবে, তাঁর মৃত্যুর পর ক্রমশ সে আদর্শে ক্ষয় ধরেছে, এখন তা এক সরকারী প্রতিষ্ঠান, সেই প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিরা মোটা তারের উঁচু বেড়া বসিয়ে, উর্দিধারী পাহারাদার নিয়োগ করে, সকলের থেকে বিচ্ছিন্ন করে এক প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতাকেন্দ্রে পরিণত করেছেন তাকে। তাই আমরা ছাতিমতলার নিচে গিয়ে দাঁড়াতে পারলাম না, তারের বেড়ার এধারে রাস্তার ধারে এসে দাঁড়ালাম। আজ ১৬ই অক্টোবর। ১৯০৫ সালে এই দিনেই তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথ রাখি-বন্ধন ও অরন্ধনের ডাক দিয়েছিলেন। ব্রিটিশরা হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে বিভেদবোধকে উশকে দিয়ে যেভাবে বাংলাকে দু-টুকরো করতে চেয়েছিল, তার বিরুদ্ধে সব ধর্মের মানুষ রাস্তায় নেমে নগর-পরিক্রমা করেছিল রবীন্দ্রনাথের লেখা গান গেয়ে, একে অপরের হাতে রাখি বেঁধে বিভেদবোধের বিরুদ্ধে নিজেদের একতাবোধের জানান দিয়েছিল। তা স্মরণে রেখে আজকের আগ্রাসী বিঝেদবোধের বিরুদ্ধে একতাবোধের অঙ্গীকার নিতে আমরা আজ জড়ো হয়েছি, এর মধ্য দিয়েই গান্ধী-রবীন্দ্রনাথের পথে এক কদম ফেলার এই পদযাত্রা আপাতত শেষ হবে। পুরুলিয়ার মাঝিহিরার গান্ধীজির ‘নয়ি তালিম’-এর ছাত্রছাত্রীরা রাত জেগে রাখি বানিয়ে পাঠিয়েছে--- সেই রাখি একে অপরের হাতে আমরা বাঁধলাম। মনীষা ব্যানার্জি ও তাঁর আরও কিছু সঙ্গী রবীন্দ্রনাথের গান গাইলেন, আমরা অনেকেই গলা মেলালাম।
ভোরের নরম আলো তীব্র হয়ে তখন প্রখর রোদের দিকে এগোতে শুরু করেছে। প্রায় ২৫০ কিলোমিটার অতিক্রম করে, বেশকিছু নতুন বন্ধুত্ব ও সহগামীতার জন্ম দিয়ে, অসমাধিত বেশ কিছু প্রশ্নকেও সামনে তুলে ধরে আমাদের এই এক কদম ফেলা ভবিষ্যতে আরও অনেক কদম এগোনোর চাহিদা নিয়ে শেষ হলো।
পুনশ্চ: গোটা পদযাত্রার কোনো পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন এটা নয়। একজন পদযাত্রী হিসেবে যে যে ঘটনা-ভাবনা-বন্ধুসঙ্গ আমার মন ছুঁয়ে গেছে সেগুলো প্রকাশ করার জন্যই এই লেখা। তাই এই পদযাত্রার অনেক সংগঠক ও অংশগ্রহণকারীদের নাম বা ভূমিকার কথা এখানে আসেনি, তাঁদের সবার ভূমিকাই ছিল গুরুত্বপূর্ণ, সবকিছু মিলেই পদযাত্রা তার নিজস্ব রূপ ধারণ করতে পেরেছিল।