জীবনের জন্য ইতিহাসের ব্যবহার-অপব্যবহার

লিখেছেন:ফ্রিদরিখ নিৎশে, বাংলা তর্জমা- বিপ্লব নায়ক
ফ্রিয়েদরিখ নিৎশে (১৮৪৪-১৯০০)-র এই লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিলো ১৮৭৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। নিৎশের বয়স তখন তিরিশের কিছু কম। নিৎশে এখানে ইতিহাসের ব্যবহার-অপব্যবহার বিচার করতে চেয়েছেন ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর জীবনকে প্রতিনিয়ত নতুন প্রাণময় রূপ দেওয়ার পক্ষে/বিপক্ষে তার ভূমিকা দিয়ে। সময়বিরুদ্ধ চিন্তা (Unzeitgemäße Betrachtungen, ইংরেজিতে: Untimely Meditations)-র দ্বিতীয় খণ্ড হিসেবে প্রথমে এটি আলাদাভাবে প্রকাশিত হয়, পরে সময়বিরুদ্ধ চিন্তার অন্তর্ভুক্ত দ্বিতীয় প্রবন্ধ হিসেবে প্রকাশিত হয়ে আসছে।

                    

 

 

পূর্বকথা

‘আমার সক্রিয়তাকে বাড়ানো বা সরাসরি উজ্জীবিত করা ছাড়াই যা আমাকে কেবল নির্দেশ দান করে, তেমন যে কোনো কিছুকেই আমি ঘৃণা করি।’ এই কথাগুলো গ্যেটে-র, আর এই কথাগুলোকেই অকপট মনোভাব হিসেবে গ্রহণ করে ইতিহাসের মূল্য নিয়ে এই নিবিড় চিন্তা-প্রয়াস শুরু করতে হবে। গ্যেটের এই কথাগুলো আমাদের দেখিয়ে দিতে চায় কেন উজ্জীবিত করা ছাড়াই কেবল নির্দেশদান, সক্রিয়তার অনুষঙ্গ ছাড়া কেবল জ্ঞান, যা একরূপ মহার্ঘ বাহুল্য-বিলাসিতা-রূপী ইতিহাসের রূপ নেয়, তাকে অবশ্যই গ্যেটের ভাষায় আন্তরিকভাবে ঘৃণা করা উচিত— ঘৃণা করা উচিত কারণ যা আমাদের দরকার তার থেকে আমরা তা পাই না এবং বাহুল্য সবসময়েই প্রয়োজনের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। ইতিহাস আমাদের অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু জ্ঞানের উদ্যানে সময় অতিবাহিত করা অলসের তা যেজন্য প্রয়োজন পড়ে তার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন কারণে আমাদের তা প্রয়োজন। উদ্যানবিহারী অলস জ্ঞানী হয়তো সম্ভ্রান্ত ভানে আমাদের এই রুক্ষ অমনোমুগ্ধকর প্রয়োজনকে খাটো চোখে দেখতে পারেন, তবে আমাদের তাতে কিছু যায় আসে না। বলতে গেলে, জীবন ও সক্রিয়তার স্বার্থে আমাদের ইতিহাস প্রয়োজন; আত্মমুখী জীবন ও কাপুরুষোচিত ক্রিয়ার ভিত্তির অপরাধকে লঘু করার জন্য তো নয়ই, জীবন ও সক্রিয়তা থেকে আরামপ্রদভাবে মুখ ঘুরিয়ে নেওয়ার জন্যও আমরা ইতিহাসকে কাজে লাগাতে চাই না। আমরা সেই পরিমাণেই ইতিহাসের সেবা করতে চাই যে পরিমাণে ইতিহাস জীবনের সেবা করে। কারণ, আমাদের যুগের কিছু কিছু নজরকাড়া লক্ষণ দেখে যন্ত্রণার সঙ্গে হলেও আজ মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই যে ইতিহাস চর্চার উপর এহেন মাত্রায় মূল্য আরোপিত হওয়া সম্ভব যার ফলে জীবনটাই দরকোঁচা মেরে অধঃপতিত হয়ে যেতে পারে।

আমাকে নিয়ত তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ানো এক অনুভূতি আমি এখানে লিপিবদ্ধ করার চেষ্টা করেছি, সে অনুভূতির উপর একপ্রকার প্রতিশোধ তুলতে তাকে জনসমক্ষে হাজির করতে চেয়েছি। হয়তো এই লিপিবদ্ধকরণ কাউকে না কাউকে এমনটা বলতে অনুপ্রাণিত করতে পারে যে সে-ও এই অনুভূতির সঙ্গে পরিচিত, কিন্তু অনুভূতিটির নিখাদ মৌলিক দশা আমার অনুভবে ধরা পড়েনি এবং পরিপক্ক-অভিজ্ঞতা-প্রসূত নিশ্চয়তার বুননে আমার বর্ণনা গড়ে ওঠেনি। মনে হয় কেউ তেমন বলতেই পারেন। কিন্তু বেশির ভাগ মানুষই আমায় বলবেন যে আমার এই অনুভূতি আদ্যোপান্ত বিকৃতিপ্রসূত, অস্বাভাবিক, ঘৃণ্য ও সম্পূর্ণ অননুমোদনীয় এবং এই অনুভূতি লালন করার মধ্য দিয়ে আমি নিজেকে, বিশেষত গত দুই প্রজন্ম ধরে জার্মানদের মধ্যে বিকশিত হয়ে ওঠা শক্তিমান ঐতিহাসিক আন্দোলনের সাপেক্ষে, চূড়ান্ত অযোগ্য বলে প্রতিপন্ন করেছি। যাই হোক না কেন, স্বীয় অনুভূতি বর্ণনা করার আমার এই প্রয়াস অবশ্য সাধারণ শিষ্টাচারে আঘাত করার বদলে তাকে জোরদারই করবে, কারণ তা বহুজনের কাছে উক্ত ঐতিহাসিক আন্দোলনের প্রতি প্রণতি জানানোর সুযোগ করে দেবে। আর আমার নিজের ক্ষেত্রে এমন প্রাপ্তি ঘটবে যার মূল্য আমার কাছে শিষ্টাচারের চেয়ে অনেক বেশি, যা হলো, আমাদের এই নিজস্ব সময়ের চরিত্র সম্পর্কে জনপরিসর-প্রসূত শিক্ষা আমার ভুল শুধরে দেবে।

এই অভিনিবিষ্ট চিন্তাপ্রয়াসটিও সময়-বিরোধী, কারণ, আমাদের সময় ইতিহাস আবাদ করার যে নিজ কীর্তি নিয়ে ন্যায্যতোই গর্বিত, সেই কীর্তিকেই আমি তার পক্ষে ক্ষতিকর এবং তার একটি ত্রুটি ও খামতি হিসেবে চিহ্নিত করতে চেয়েছি নতুনভাবে বিচার করার পর, কারণ, এই বিশ্বাসে আমি পৌঁছেছি যে আমরা সবাই আজ ইতিহাসের কালাজ্বরে আক্রান্ত এবং এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার স্বীকৃতিটুকু অন্তত জরুরী। গ্যেটে বলেছিলেন যে আমাদের গুণগুলোকে লালন করার সময় আমরা একইসঙ্গে আমাদের দোষগুলোকেও লালন করে থাকি। গ্যেটে যদি ঠিক বলে থাকেন আর সবার জানা মতো এ যদি সত্যি হয় যে অতিবৃদ্ধিপ্রাপ্ত কোনো গুণ— আমাদের যুগের ঐতিহাসিকতার বোধ যেমন— অতিবৃদ্ধিপ্রাপ্ত দোষের মতো একই কুশলতায় একটি জাতিকে ধ্বংস করে দিতে পারে, তাহলে অন্তত এইবারের জন্য আমার এই সময়-বিরোধী উপস্থাপনাকে প্রশ্রয়দানে কোনো ক্ষতি নেই বলেই মনে হয়। আর অংশত নিজ দোষস্খালনের জন্য আমি স্বীকার করে নিচ্ছি যে জ্বালাতনকারী অনুভূতির মূলে থাকা অভিজ্ঞতাগুলো মূলত আমার নিজের এবং কেবলমাত্র তুলনা টানার জন্যই কখনো কখনো আমি অন্যদের অভিজ্ঞতার কথা তুলেছি। তাছাড়া, যে মাত্রায় পূর্বতন সময়কাল, বিশেষত হেলেনিয় যুগের গ্রিসের আমি ছাত্র, সেই মাত্রাতেই বর্তমান সময়ের জাতক হয়েও ওইরূপ সময়-বিরোধী অভিজ্ঞতা আমি লাভ করেছি। ধ্রুপদী বিদ্যাচর্চার পেশা অবলম্বনকারী হওয়ার সুবাদে এইটুকু অন্তত আমি দাবি করতে পারি, কারণ, ধ্রুপদী বিদ্যাচর্চা যদি সময়-বিরোধী না হয়— অর্থাৎ, আমাদের সময়ের উপর আমাদের সময়ের বিপক্ষে অনাগত সময়ের কল্যাণের আশায় কার্যকরী হয়— তাহলে আমাদের সময়ে তার আর কী মানে অবশিষ্ট থাকে!

 

 

এক পাল গরুর কথাই ধরুন, মাঠে চরতে চরতে যারা আপনার পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে: গতকাল বা আজ কী বস্তু তারা জানে না, তারা লাফিয়ে বেড়ায়, খায়, বিশ্রাম নেয়, হজম করে, আবার লাফিয়ে বেড়ায়, খায়, ইত্যাদি, এভাবেই তাদের সকাল থেকে রাত দিনের পর দিন অতিবাহিত হয়ে যায় মুহূর্তের সঙ্গে বাঁধা থেকে, মুহূর্তের আনন্দ বা নিরানন্দের সঙ্গে বাঁধা থেকে, আর তাই তাদের না আছে অবসাদ, না আছে একঘেয়েমি। মানুষের পক্ষে এই দৃশ্য বেশ অস্বস্তিকর, কারণ যে পশুদের থেকে সে নিজেকে মানুষ হওয়ার কারণে উন্নত বলে মনে করে, সেই পশুদের এহেন সুখ-সৌভাগ্যকে সে হিংসা না করে পারে না— এই পশুদের যেমন জীবন, যা একঘেয়েমিতে আক্রান্ত নয়, আবার যন্ত্রণাময়ও নয়, তেমন জীবনই মানুষ চায়, অথচ পশুর মতো হতে অস্বীকার করার কারণেই সে জীবন তার অধরা থেকে যায়। তাই হয়তো মানুষ কোনো পশুকে জিজ্ঞাসা করে বসতে পারে: ‘তোমার সুখ-সৌভাগ্য বিষয়ে তুমি কিছুই কেন আমায় বলো না, শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমার দিকে চেয়ে থাকো?’ পশুটির হয়তো জবাব দিতে ইচ্ছে হবে: ‘কারণ কী বলতে যাচ্ছিলাম তা-ই যে কেবল ভুলে বসি’— কিন্তু তারপর এই জবাবটিকেও মাঝপথে ভুলে বসে সে নির্বাক হয়েই থাকবে আর মানুষটা নিজে নিজে আকাশ-পাতাল ভাবতেই থাকবে।

অবশ্য মানুষের তার নিজেকে নিয়ে ভাবনারও অন্ত নেই, কেন যে সে ভুলে যাওয়া শিখতে পারে না আর তাই নাছোড়ভাবে অতীতের সঙ্গে বাঁধা পড়ে থাকে: যতো জোরে যতো দূরেই সে ছুটে যাক না কেন সেই শৃঙ্খলবন্ধনও তার সঙ্গে সঙ্গে ছুটে চলে। আর এ কি কম আশ্চর্যের কথা: এই আছে আর এই নেই যে মুহূর্ত, যা আসার আগে কিছু ছিল না, আবার যা যাওয়ার পরেও কিছু থাকে না, তবু যা বারবার ভূত হয়ে ফিরে এসে পরবর্তী মুহূর্তগুলোর শান্তি নষ্ট করে। সময়ের গোটানো বাণ্ডিল থেকে একটা পাতা আলগা হয়ে কেঁপে উঠে উড়ে ভেসে যায়— আবার হঠাৎ ভাসতে ভাসতে ফিরে এসে মানুষের কোলের উপর পড়ে। তখন মানুষকে বলতে হয় ‘আমার মনে পড়ছে’ আর সে ঈর্ষান্বিত হয়ে ওঠে সেই পশুদের কথা ভেবে যারা সঙ্গে সঙ্গে ভুলে যেতে পারে, যাদের ক্ষেত্রে প্রতিটি মুহূর্ত রাত্রি ও কুয়াশায় ডুবে চির-নির্বাপিত হয়ে প্রকৃতই মারা যায়। এভাবে পশুরা ইতিহাস-নিরপেক্ষভাবে বাঁচে: যেহেতু তারা অসুবিধাকর ভগ্নাংশ ছাড়া গোটা পূর্ণসংখ্যার মতো গোটাটাই বর্তমানের অন্তর্ভুক্ত; ভান-কারসাজি তাদের অজানা, কোনোকিছু না লুকিয়ে সে যা সেই গোটাটা নিয়েই সে প্রতিটি মুহূর্তে উপস্থিত; তাই তার সৎ না হয়ে উপায় নেই। অন্যদিকে, মানুষ সবসময় যা অতীত তার বিপুল চাপের বিরুদ্ধে ঠেকনা খাড়া করতে ব্যস্ত: তবু সেই চাপ তাকে নীচে পিষতে থাকে অথবা বাঁকিয়ে-চুরিয়ে ত্রিভঙ্গ-মুরারী করে তোলে, প্রতি পদক্ষেপেই অদৃশ্য অন্ধকার ভার হয়ে চেপে বসে তার গতিরোধ করে। কখনও কখনও এই ভারকে অস্বীকার করার ভান সে করতে পারে, তাকে দেখে মতো অন্যদের ঈর্ষা জাগবে এই আশায় সে ভান করতে সে চায়ও বটে। আর এইজন্যই যখন সে গরুর পালকে চরে বেড়াতে দেখে, বা তার আরো কাছাকাছি কোনও শিশুকে দেখে, যার উপর ঝেড়ে ফেলার মতো কোনও অতীতের বোঝা এখনও অবধি জমতে না পারায় অতীত ও ভবিষ্যতের বেড়ার মাঝে আনন্দপূর্ণ অন্ধতা নিয়ে যে খেলে বেড়ায়, তখন তার মনে যেনবা হারিয়ে ফেলা স্বর্গের এক ঝলক সে দেখতে পেলো। তবু তো সেই শিশুর খেলাতেও বাধা পড়ে; খুব তাড়াতাড়িই তাকে তার ভুলে থাকার জগৎ থেকে ডেকে বের করে আনা হয়। তখন সে ‘যা ছিলো’ কথার মানে বুঝতে শেখে: মানুষের উপর সংঘাত, দুর্ভোগ ও অতি-তৃপ্তির প্রভাব বিস্তারের চাবিকাঠি ওই কথাটিই মানব-অস্তিত্বের মৌল চরিত্রকে মনে করিয়ে দেয়, মনে করিয়ে দেয় যে তা সততোই অসম্পন্ন কাল বিশিষ্ট, কখনোই তার সম্পন্ন হয়ে ওঠা হবে না। মৃত্যু যদি শেষাবধি কাঙ্ক্ষিত ভুলে-যেতে-পারা-কে এনে দেয়, সেই এনে দেওয়ার মধ্য দিয়ে একই সঙ্গে সে বর্তমানকে নিভিয়ে দেয়, সমস্ত অস্তিত্বচিহ্নকে নিভিয়ে দেয় এবং তার মধ্য দিয়ে এই জ্ঞানের উপর মোহরচিহ্ন এঁকে দেয় যে অস্তিত্ব কেবলই এমন এক নিরবচ্ছিন্ন ‘যা ছিলো’ যা অস্বীকার, গিলে-নেওয়া ও স্ববিরোধের মধ্য দিয়েই বাঁচে।

সুখ, বা, নতুন সুখের দিকে হাত বাড়ানো যদি কোনো না কোনো ভাবে প্রাণীদের জীবনের সঙ্গে বেঁধে রাখে বা জীবিত থাকতে প্রবৃত্ত করে, তাহলে অসূয়ক (Cynic)-দের থেকে সঠিক আর কোনো দার্শনিক হতে পারে না, কারণ, বিশুদ্ধ অসূয়ক হিসেবে একটি প্রাণীর সুখই অসূয়াবাদের সঠিকতার জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ হয়ে ওঠে। নিরবচ্ছিন্নভাবে উপস্থিত থেকে সুখী করে তোলে এমন কোনো ক্ষুদ্রতম সুখও কেবলমাত্র বিচ্ছিন্ন পর্যায়ক্রমে হাজির হওয়া বৃহত্তম সুখের চেয়ে অতুলনীয় রকম বেশি বলে বোধ হয়, ক্ষণস্থায়ী যে বৃহত্তম সুখ যেন বা নিরানন্দ, ক্লেশ ও অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষার অবিচ্ছিন্নতার মধ্যে এক টুকরো বেপথুতা বা বেআক্কেলেপনা। ক্ষুদ্রতম বা বৃহত্তম, যে কোনো সুখকেই সুখ করে তোলে একটাই পদার্থ: ভুলে যেতে পারার ক্ষমতা, বা বিদ্বজ্জনদের ভাষায় বললে, তার স্থিতিমুহূর্তকে ইতিহাসবিচ্ছিন্নভাবে অনুভব করার সক্ষমতা। যে ব্যক্তি মুহূর্তের চৌকাঠে ডুব দিয়ে সমস্ত অতীত ভুলে যেতে না পারে, মাথা ঘুরে ভয়ার্ত হয়ে না উঠে বিজয়দেবীর মতো সুস্থিত হতে না পারে, সে কোনোদিন সুখ কী বস্তু তা জানতে পারে না— তার চেয়েও বড় কথা, সে কখনও এমন কিছু করতে পারে না যা অন্য কাউকে সুখী করে তোলে। সম্ভাব্য চরমতম উদাহরণটিকে ধরা যাক যেখানে একজন মানুষের ভুলে যাওয়ার কোনো ক্ষমতাই নেই আর তাই সে সর্বত্র হয়ে-ওঠা (becoming)-র দশাকেই একমাত্র বলে দেখায় সীমাবদ্ধ: তেমন একজন মানুষ আর নিজের স্থিতসত্তা (being)-য় বিশ্বাস করতে পারে না, নিজেকে বিশ্বাস করতে পারে না, সবকিছুকেই ধাবমান বিন্দুর মতো ভেসে যেতে দেখে এবং নিজেকে হয়ে-ওঠার স্রোতে হারিয়ে ফেলে: হেরাক্লিটাস-য়ের প্রকৃত শিষ্যের ন্যায় শেষ পর্যন্ত নিজের আঙুলটি নাড়ানোর সাহসও আর তার থাকে না। ঠিক যেমন সমস্ত জৈব বস্তুর জীবনধারণের জন্য কেবল আলো নয়, অন্ধকারও অবশ্য-প্রয়োজন, ঠিক তেমনই যে কোনো ধরনের স্বতঃক্রিয়ার জন্য ভুলে যেতে পারা অবশ্য-প্রয়োজন। আগাগোড়া ইতিহাসানুগভাবে অনুভব করতে প্রয়াসী ব্যক্তি হলো জোর করে কখনও ঘুমোতে না দেওয়া কোনো মানুষের মতো, বা, রোমন্থন-রোমন্থন-কেবলই-রোমন্থনের মধ্য দিয়ে বাঁচতে বাধ্য হওয়া কোনো জন্তুর মতো। সুতরাং, পশুদের দেখে বোঝা যায় যে প্রায় কোনো স্মৃতি ছাড়াই বেঁচে থাকা যায়, তদুপরি সুখে বাঁচা যায়, কিন্তু ভুলে যেতে পারার ক্ষমতা ছাড়া বেঁচে থাকা একেবারেই অসম্ভব। বা, আমার বক্তব্য আরো সরলভাবে বলতে হলে বলি: ঘুমহীনতা, রোমন্থন ও ইতিহাসানুগত্য বোধের এমন এক মাত্রা হতে পারে যা জীবিত যে কোনও বস্তুর পক্ষে ক্ষতিকারক ও শেষাবধি প্রাণঘাতী হয়ে দাঁড়ায়, সে জীবিত বস্তু কোনো মানুষ বা জনগোষ্ঠী বা সংস্কৃতি যা-ই হোক না কেন।

এই মাত্রাটি নির্ধারণ করতে হলে, এবং একইসঙ্গে অতীতকে যে সীমা অবধি ভুলে যাওয়া উচিত যাতে তা বর্তমানের কবরখনক না হয়ে ওঠে তা নির্ধারণ করতে হলে, জানতে হবে যে কোনো মানুষ বা জনগোষ্ঠী বা সংস্কৃতির নমনীয়তার ক্ষমতা ঠিক কতোটা। নমনীয়তার ক্ষমতা বলতে আমি যা বলতে চাইছি তা হলো নিজের মধ্য থেকে নিজের মতো করে বিকশিত হওয়ার সক্ষমতা, যা কিছু অতীত ও অপর তাকে রূপান্তরিত করে নিজ মধ্যে সম্মিলিত করার সক্ষমতা, ক্ষত নিরাময়, হারানো বস্তুকে প্রতিস্থাপন ও ভেঙে যাওয়া ছঁাচকে নতুন করে গড়ার সক্ষমতা। কিছু মানুষের এই ক্ষমতা এতো কম থাকতে পারে যে একটি মাত্র কোনো অভিজ্ঞতা, একটি মাত্র কোনো যন্ত্রণাকর ঘটনা বা প্রায়শই বিশেষ করে একটি মাত্র কোনো সূক্ষ্ম অবিচারই তাকে সামান্য আঁচড় থেকে রক্তক্ষয় হয়ে মরতে বসা মানুষের মতো শেষ করে দিতে পারে। অপরদিকে, এমনও আছে যারা সবচেয়ে খারাপ ও সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দুর্যোগেও এতোটাই কম প্রভাবিত হয়, নিজেদের দুষ্কর্মও তাদের উপর এতোটাই কম ছাপ ফেলে যে সেসবের মধ্যেও বা অন্তত তার অব্যবহিত পরমুহূর্তেই তারা অমলিন বিবেক নিয়ে চলনসই রকমের ভালো থাকতে পারে। একজন মানুষের স্বপ্রকৃতির গভীরতম শিকড়গুলো যতো শক্তপোক্ত হবে, অতীতের বস্তুসকলকে হজম ও আত্মসাৎ করা তার পক্ষে ততো সহজ হবে। সবচেয়ে ক্ষমতাশালী ও প্রচণ্ড যার স্বপ্রকৃতি তার চরিত্রই হবে এমন যে, কোনো সীমা পেরিয়েই ইতিহাসগত বোধ তাকে আচ্ছন্ন করতে পারবে না, সমস্ত অতীতকেই সে নিজের মধ্যে শুষে নিয়ে সম্মিলিত করে নেবে, কী তার আপন ও কী অপর কিছুই যাবে আসবে না, সবকিছুকেই সে নিজ শিরা-ধমনীতে বহমান রক্তে পরিণত করে নেবে। সেই রকম স্বপ্রকৃতি যা বশীভূত করতে পারে না,তা ভুলে যেতে জানে; ফলে তাদের আর অস্তিত্ব থাকে না, দিগন্ত মসৃণ ও ঘনসংবদ্ধ হয়ে ওঠে এবং দিগন্তের ওপারেও যে লোক-আবেগ-উপদেশ-গন্তব্য আছে সেই চিহ্ন নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। আর এ হলো এক সার্বজনীন নিয়ম: কোনো জীবিত বস্তু কেবল তখনই স্বাস্থ্যবান, শক্তিশালী ও ফলপ্রসূ হতে পারে যখন সে একটা দিগন্ত দ্বারা সীমায়িত; সে যদি নিজের চারধারে একটা দিগন্ত টেনে নিতে অপারগ হয় এবং একইসঙ্গে এতোটাই আত্মকেন্দ্রিক হয় যে নিজ দৃষ্টিভঙ্গিকে কখনোই অপরের দৃষ্টিভঙ্গির অন্তর্গত করতে পারে না, তাহলে হয় সে ধীরে ধীরে শুকিয়ে মরে অথবা দ্রুতই সময়োচিত অন্তিম পরিণতির দিকে ধেয়ে যায়। ব্যক্তি বা জাতি, উভয় ক্ষেত্রেই প্রফুল্লতা, উত্তম বিবেকবোধ, আনন্দময় কাজ, ভবিষ্যতে আস্থা— এই সবকিছুই আলোকিত ও অনালোকিত অন্ধকারের বিভাজনরেখার অস্তিত্বের উপর নির্ভর করে; ঠিক সময়ে স্মরণ করতে পারার মতো ঠিক সময়ে ভুলে যেতে পারার উপরও নির্ভর করে; কখন ইতিহাসানুগভাবে আর কখন ইতিহাস- নিরপেক্ষ-ভাবে অনুভব করা প্রয়োজন তা আঁচ করার সহজ প্রবৃত্তির জোরালো উপস্থিতির উপর নির্ভর করে। সংক্ষিপ্ত করে বললে, পাঠকের ধ্যানপূর্ণ বিবেচনার জন্য এখানে এই প্রস্তাবটি হাজির করা হয়েছে: কোনো ব্যক্তি, জাতি/জনগোষ্ঠী বা সংস্কৃতির সুস্বাস্থ্যের জন্য ইতিহাসানুগতা ও ইতিহাস-নিরপেক্ষতা উভয়ই সমান মাত্রায় প্রয়োজনীয়।

প্রথমত, এটা নিশ্চয় সবাই খেয়াল করেছেন যে একটি মানুষের ইতিহাসবোধ ও জ্ঞান অত্যন্ত সীমাবদ্ধ হতে পারে, আল্পস্ পর্বতের কোনো বাসিন্দার মতো সংকীর্ণ হতে পারে তার দিগন্ত, তার সমস্ত বিচারই অবিচার-প্রসূত হতে পারে, আর সে এমন ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হতে পারে যে তার সমস্ত অভিজ্ঞতাই স্বকীয় ও মৌলিক— তবু এই অবিচার ও ভ্রান্তি সত্ত্বেও সে অতি উত্তম স্বাস্থ্য ও প্রাণশক্তি নিয়ে সবার চোখে প্রফুল্লতার প্রতিভূ হয়ে বিরাজ করতে পারে; অথচ তারই পাশে তার থেকে অনেক বেশি বিচারবোধসম্পন্ন ও শিক্ষিত কোনো মানুষ পীড়িত হয়ে ভেঙে পড়তে পারে যেহেতু এই দ্বিতীয় জনের দিগন্তরেখাগুলো অস্থিরভাবে নিয়ত বদলে যাচ্ছে, যেহেতু নিজ সুবিজ্ঞতা ও সত্যের মিহি জাল থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে অভিপ্রায় ও আকাঙ্ক্ষা চালিত সহজ কোনো স্বতঃক্রিয়া করার উপায় আর তার নেই। অন্যদিকে, আমরা পশুদের খেয়াল করেছি, যারা নিতান্তই ইতিহাস- নিরপেক্ষ এবং প্রায় বিন্দুতে সংকুচিত হওয়া এক দিগন্তের মধ্যে তারা বাস করে, তবু তাদের যাপনে একটা মাত্রায় সুখ আছে, বা অন্তত একঘেয়েমি ও কপটতা নেই। সুতরাং একটি মাত্রা অবধি ইতিহাস-নিরপেক্ষ-ভাবে অনুভব করার সক্ষমতাকে তুলনায় বেশি জীবনশক্তিময় ও মৌলিক হিসেবে আমাদের গণ্য করতেই হবে, যে মাত্রায় একমাত্র তার ভিত্তিতেই বলিষ্ঠ, স্বাস্থ্যবান, মহান ও প্রকৃতই মানবিক কিছু গড়ে উঠতে পারে। ইতিহাস-নিরপেক্ষতা হলো এমন এক আবহমণ্ডল স্বরূপ যার মধ্যেই কেবল জীবন অঙ্কুরিত হতে পারে আর যার ধ্বংসের সঙ্গে সঙ্গে জীবনও অন্তর্হিত হতে বাধ্য। এ কথা সত্য যে চিন্তা, বিবেচনা, তুলনা, ফারাক টানা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের মধ্য দিয়ে ইতিহাস-নিরপেক্ষ উপাদানের উপর সীমা আরোপ করে, চারিদিক থেকে ছেয়ে থাকা ঘনকৃষ্ণ মেঘের মতো ইতিহাস-নিরপেক্ষতার বুক চিরে অত্যুজ্জ্বল এক বিদ্যুৎরেখা সঞ্চালনের মধ্য দিয়েই কেবল— অর্থাৎ জীবনের নিমিত্তে অতীতকে নিয়োজিত করার ক্ষমতা ও নিষ্পন্ন বিগত বিষয়কে ইতিহাসের মাধ্যমে পুনরায় প্রবর্তন করার ক্ষমতার মধ্য দিয়েই কেবল— মানুষ হয়ে উঠেছিল মানুষ: কিন্তু ইতিহাসের আধিক্যের মধ্য দিয়ে মানুষের অস্তিত্ব আবার বিলুপ্ত হয়, আর ইতিহাস-নিরপেক্ষতার ওই মোড়ক তাকে ঘিরে না রাখলে সে তার শুরু করার সাহসটুকুও পেত না। প্রথমে ইতিহাস-নিরপেক্ষতার বাষ্পীয় অঞ্চলে যদি সে প্রবেশ না করতো, কোন কাজটাই বা তার পক্ষে সম্ভব হতো? অথবা এই রূপকের ভাষা ছেড়ে উদাহরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করতে হলে বলা যায়: কোনো নারী বা কোনো মহান ধারণার জন্য প্রবল ভাবাবেগে আচ্ছন্ন এক পুরুষকে কল্পনা করা যাক: জগতটা তার কাছে কতোই না বদলে যায়! পিছন ফিরে তাকালে নিজেকে তার অন্ধ মনে হয়, নিজের চারপাশে কান পেতে সে কেবল এক একঘেয়ে অর্থহীন আওয়াজ শুনতে পায়; কিন্তু আগে কখনও যা ধরা দেয়নি তা এখন তার উপলব্ধিতে ধরা দেয়— সবকিছু এত স্পর্শগ্রাহ্য, নিকটবর্তী, অতি রঙিন, উচ্চকিত হয়ে ওঠে যেনবা একইসঙ্গে তার সকল ইন্দ্রিয় দিয়ে সে তা অনুভব করেছে। তার করা সমস্ত মূল্যায়নই কেঁচে গিয়ে আবার নতুন করে শুরু যায়; কতো না বস্তুর মূল্যায়ন করতেই সে আর সমর্থ থাকে না যেহেতু সেগুলোকে সে আর প্রায় অনুভবই করে না: নিজেকেই সে প্রশ্ন করে কেন সে এত দীর্ঘ কাল অন্যদের কথা ও মতের বশে বোকা বনে ছিল; অবাক হয়ে সে দেখে কীভাবে তার স্মৃতি অক্লান্তভাবে একই বৃত্তে পাক খেয়ে যায়, অথচ তা এতই দুর্বল ও অবসন্ন যে সেই বৃত্ত ভেঙে বাইরে একটা লাফ দেওয়ার ক্ষমতাটুকুও তার নেই। এ হলো ন্যায়পরায়ণ হওয়ার পক্ষে সবচেয়ে প্রতিকূল অবস্থা; তমসা ও বিস্মৃতির মরা সাগরে জীবনের ছোট্ট ঘূর্ণিপাক হয়ে সেই সংকীর্ণমনা দশা অতীতের প্রতি অকৃতজ্ঞ, বিপদের প্রতি অন্ধ, সতর্কীকরণের প্রতি বধির: অথচ এই আগাগোড়া ইতিহাস-নিরপেক্ষ, ইতিহাসানুগত্য-বিরোধী অবস্থার গর্ভে কেবল অন্যায়পরায়ণ নয়, প্রতিটি ন্যায়পরায়ণ কাজেরও ভ্রূণ উন্মীলিত হয়; এহেন ইতিহাস-নিরপেক্ষ দশায় প্রাথমিকভাবে তার আকাঙ্ক্ষা-অভিপ্রায় ও কঠোর প্রয়াসকে উন্মীলিত না করে কোনো চিত্রকরই তার ছবি আঁকতে পারে না, কোনো সেনাধ্যক্ষই তার বিজয় লাভ করতে পারে না, কোনো জনগোষ্ঠীই তার স্বাধীনতা অর্জন করতে পারে না। গ্যেটে বলেছিলেন, যে কোনো স্বতঃক্রিয়াকারীই বিবেকহীন। ঠিক তেমনই সে জ্ঞানহীনও বটে; একটা কোনো কাজ করার জন্য সে বাকি বেশির ভাগ কাজ ভুলে যায়, তার পিছনে পড়ে থাকা অতীতের প্রতি সে অন্যায়পরায়ণ, আর ঠিক এই মুহূর্তে যা জন্ম নিতে চলেছে তা ছাড়া আর বাকি কোনো কিছুরই অধিকার সে স্বীকার করে না। তাই যে কোনো স্বতঃক্রিয়াকারী তার নিজের কাজকে যথোপযুক্তের চেয়ে অনেক অনেক বেশি ভালোবাসে: আর সর্বোৎকৃষ্ট স্বতঃক্রিয়াগুলো ভালোবাসার এমন এক অতি-প্রাচুর্যে সংঘটিত হয় যা এমনকি অমূল্য কোনো স্বতঃক্রিয়ার ক্ষেত্রেও নেহাতই বাড়তি বৈ কিছু নয়।

যে কোনো মহান ঐতিহাসিক ঘটনা এই যে ইতিহাস-নিরপেক্ষ আবহমণ্ডলে সংঘটিত হয়, তা যদি কেউ যথেষ্ট সংখ্যক ক্ষেত্রে আঁচ করতে পারে ও ফিরে গিয়ে তার প্রাণস্পন্দন অনুভব করতে পারে, তাহলে প্রত্যক্ষ অনুভূতির গুণে সে নিজেকে ইতিহাসোর্ধ্ব এক সুবিধাজনক অবস্থানে তুলে নিয়ে যেতে পারে। ন্যিবুহর-ও ইতিহাস-চিন্তনের সম্ভাব্য পরিণতি হিসেবে এমন কথা বলেছিলেন।তিনি বলেছিলেন, ‘স্পষ্ট ও বিস্তারিত রূপে আয়ত্ত করা ইতিহাস অন্তত একটা কাজে দেয়: তার মধ্য দিয়েই আমরা বুঝতে পারি আমাদের মানব প্রজাতির সবচেয়ে মহান ও সবচেয়ে উচ্চস্থানীয় আত্মারাও তাঁদের নিজেদের দেখার চোখ ও অন্যদেরও যে চোখে দেখতে তঁারা বাধ্য করেন— বাধ্য করেন তঁাদের সচেতনতার ব্যতিক্রমীভাবে প্রবল প্রাখর্যের জোরেই— সে চোখের ধারণ করা রূপ যে কতোোটাই আকস্মিক চরিত্রের তা সম্পর্কে তঁারা নিজেরাও কতোটা অসচেতন। যেজন এটা নির্দিষ্টভাবে বোঝেনি সেজন বহু ক্ষেত্রেই কোনো না কোনো ক্ষমতাধর আত্মার আবেগদীপ্ত দায়বোধের সর্বোচ্চ তীব্রতা নিয়ে হাজির করা ধাঁচের বাহ্যাড়ম্বরে বশীভূত থেকে যাবে।’ ‘ইতিহাসোর্ধ্ব’ শব্দটা ব্যবহার আমাদের পক্ষে সমীচীন যেহেতু এই সুবিধাজনক অবস্থানে পৌঁছে যাওয়া কোনো দর্শক আর আরো বাঁচার বা ইতিহাসে অংশ নেওয়ার লোভ অনুভব করে না; স্বতঃক্রিয়াকারীর অন্তরে বিরাজমান এই অন্ধতা-অন্যায়পরতা যে সমস্ত ঘটমানতার আবশ্যক শর্ত তা তার কাছে ধরা পড়ে; ইতিহাসকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়ার রোগ তার কেটে যায়, কারণ কীভাবে ও কোন উদ্দেশ্যে জীবন যাপিত হয়, নিজের এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে সে সব রকম মানুষ ও সব রকম অভিজ্ঞতা— গ্রীকদের মধ্য থেকে যেমন, তুর্কীদের মধ্য থেকেও, প্রথম খৃস্টাব্দের কোনো এক প্রহর থেকে যেমন, উনিশ শতক থেকেও— থেকেই নিজেকে শিক্ষিত করে থাকে। যদি আপনার পরিচিতজনেদের জিজ্ঞাসা করেন যে তারা বিগত দশ বা কুড়ি বছর পুনর্বার ফিরে গিয়ে বাঁচতে চায় কি না, সহজেই আপনি বুঝতে পারবেন তাদের মধ্যে কারা ইতিহাসোর্ধ্ব অবস্থানের জন্য প্রস্তুত আর কারা নয়: নিশ্চিতভাবেই তারা প্রত্যেকে ‘না’ বলে উত্তর দেবে, কিন্তু প্রতিটা ‘না’-এর কারণ হবে ভিন্ন ভিন্ন। কেউ হয়তো এই বলে নিজেকে সান্ত্বনা দেবে যে ‘অবশ্য পরের কুড়ি বছর আরো ভালো হবে’, এদের নিয়েই ডেভিড হিউম ব্যঙ্গচ্ছলে লিখেছিলেন:

প্রথম প্রফুল্ল ধাবমানতা যে আশা দিতে পারে নি

তা তবে এবার জীবনের গাদ থেকে নিঙড়ে নিতে হবে।

এদের ইতিহাসস্থ মানুষ বলা যাক; অতীতের দিকে চাউনি এদের ভবিষ্যতের দিকে তাড়িত করে নিয়ে যায়, আরো বেঁচে থাকার সাহসকে উদ্দীপিত করে, তাদের আকাঙ্ক্ষার বস্তু যে এখনও ঘটতে পারে সে আশা প্রজ্জ্বলিত করে রাখে, সামনের পাহাড়টা টপকালেই যে সুখের দেশ হেন নিশ্চয়তাকে মরতে দেয় না। এই ইতিহাসস্থ মানুষরা বিশ্বাস করে যে ইতিহাসস্থ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই অস্তিত্বের অর্থ ক্রমশ আরো বেশি বেশি করে উদ্ঘাটিত হতে থাকবে, তারা কেবল এই কারণেই পিছন ফিরে তাকায় যাতে তদবধি অতিক্রান্ত প্রক্রিয়ার অংশ থেকে বর্তমানকে বোঝার ও আরো তীব্রভাবে ভবিষ্যতের আকাঙ্ক্ষা করার শিক্ষা নেওয়া যায়। এদের কোনো ধারণা নেই যে ইতিহাস নিয়ে সবচেয়ে ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠে তারা প্রকৃতপক্ষে ইতিহাস-নিরপেক্ষভাবে চিন্তা ও কাজ করে; বা ইতিহাস নিয়ে তাদের ব্যতিব্যস্ততা নিখাদ জ্ঞানকে নয়, জীবনকেই সেবা করে।

আমাদের প্রশ্নের উত্তরে একই ‘না’ অবশ্য ভিন্নতর কারণেও আসতে পারে। সেই ‘না’ হতে পারে এমন এক ইতিহাসোর্ধ্ব মানুষের ‘না’, যে ওই প্রক্রিয়ার মধ্যে কোনো পরিত্রাণ-মুখী যাত্রা দেখে না এবং যার কাছে প্রতিটি মুহূর্তেই জগৎ তার সম্পূর্ণ ও চরম রূপে বিদ্যমান। বিগত দশ বছর যা শেখাতে পারে নি এমন নতুন আর কী আরো দশ বছর শেখাতে পারে!

এই শিক্ষার মানে সুখ, নাকি আত্মসমর্পণ, নাকি গুণ নাকি প্রায়শ্চিত্ত, সে বিষয়ে ইতিহাসোর্ধ্ব মানুষরা কখনো একমত হতে পারেনি; কিন্তু অতীতকে বিবেচনা করার সবরকম ইতিহাসস্থ রীতির বিরুদ্ধতায় তারা এই প্রস্তাবে একমত যে: অতীত ও বর্তমান আলাদা কিছু নয়, বা আরো ভেঙে বললে, অতীত ও বর্তমান তাদের সমস্ত বৈচিত্র্য নিয়েও মৌলিক বৈশিষ্ট্যের বিচারে সমরূপ এবং অবিনশ্বর কিছু ধাঁচার সর্বত্র-বিদ্যমানতা রূপে, অপরিবর্তনযোগ্য মূল্যবোধের স্থবির কাঠামো রূপে ও সদাসম তাৎপর্য রূপে বিরাজমান। হাজার হাজার ভিন্ন ভিন্ন ভাষা মানুষের এক ও অপরিবর্তনশীল মৌলিক চাহিদারই অনুবর্তী বলে যে বুঝে নিয়েছে তার কাছে যেমন আলাদা কোনো ভাষা নতুন কোনো শিক্ষা বয়ে আনবে না, ঠিক তেমনই ইতিহাসোর্ধ্ব কোনো ভাবুক জাতিদের ও ব্যক্তিদের ইতিহাসকে তার অভ্যন্তরে বসে দেখে, বিবিধ হিয়েরোগ্লিফিকস-এর আদি অর্থ অলোকদৃষ্টি দিয়ে উদ্ধার করে এবং ধীরে ধীরে ক্লান্তির বশে নতুন নতুন চিহ্নের অন্তহীন প্রবাহকে অগ্রাহ্য করতে শুরু করে: কারণ, নব নব ঘটনার অন্তহীন আতিশয্য হজম করতে করতে ক্রমশ বদহজম থেকে শেষাবধি গা-গোলানো বমি-বমি ভাবের অসুস্থতায় পৌঁছানো ছাড়া আর কী বা পরিণতি হতে পারে! সুতরাং এই ইতিহাসোর্ধ্ব ভাবুকদের মধ্যে সবচেয়ে সাহসীরা হয়তো গিয়াকোমো লিওপার্ডি-র সঙ্গে গলা মিলিয়ে নিজের হৃদয়কে বলতে কুন্ঠিত হবে না:

মূল্যবান কিছুই বেঁচে নেই।

কতো না উতলা তুমি, আর পৃথিবী একটা দীর্ঘশ্বাসেরও যোগ্য নয়।

আমাদের অস্তিত্ব কেবল যন্ত্রণা ও একঘেয়েমি, আর, জগৎ কেবলই জঞ্জাল— তা বৈ কিছু নয়।

শান্ত হও।

ইতিহাসোর্ধ্ব মানুষদের তাদের এই স্বীয় প্রজ্ঞা ও বিবমিষার জগতে ফেলে রেখে এবার অন্যত্র যাওয়া যাক: আজ অন্তত একবারের জন্য হলেও আসুন আমরা আমাদের নির্জ্ঞানতার উদযাপন করি, কীর্তি ও প্রগতিতে বিশ্বাস করা থেকে বিরত হই, প্রদত্ত প্রক্রিয়াকে পুজো করায় ক্ষান্ত হই। ইতিহাসানুগত্যের উপর এই এত মূল্য আরোপ করা হয়তো আমাদের এক পাশ্চাত্য পূর্বসংস্কার ছাড়া আর কিছু নয়: তবু স্থানুবৎ দাঁড়িয়ে না থেকে অন্তত এই পূর্বসংস্কারের মধ্যেই কিছুটা এগোনো যাক! অন্তত এইটুকু শেখার চেষ্টা করা যাক যে কীভাবে জীবন-এর স্বার্থে ইতিহাসকে নিয়োজিত করা যায়! তাহলে মেনে নিতে অসুবিধা হবে না যে ইতিহাসোর্ধ্ব ভাবুকরা আমাদের চেয়ে বেশি প্রজ্ঞাবান, অবশ্য তা কেবল যদি তাদের চেয়ে অধিকতোর জীবনের অধিকারী আমরা হই: কারণ তাহলে তাদের প্রজ্ঞার চেয়ে আমাদের নির্জ্ঞানতার অনেক বেশি ভবিষ্যৎ থাকবে। জীবন ও জ্ঞানের মধ্যে এই বিরোধের অর্থ নিয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ না রাখতে প্রাচীন ও পরীক্ষিত পন্থা অবলম্বন করে আমি এখন সোজাসাপটা একগুচ্ছ পূর্বপক্ষ প্রস্তাব করবো।

স্পষ্ট ও সম্পূর্ণ ভাবে জানা কোনো ঐতিহাসিক প্রপঞ্চ (phenomenon), যা জ্ঞান-প্রপঞ্চ রূপে বিশ্লেষিত হয়েছে, তা সেই প্রপঞ্চ-উপলব্ধিকারীর কাছে মৃতবৎ: কারণ তার মধ্যে সে সেই প্রপঞ্চের প্রবঞ্চনা, অবিচার, অন্ধ ভাবাবেগ ও সাধারণভাবে অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে আসা গোটা পার্থিব দিগন্তটিকে চিনে নিয়েছে, আর সেই সূত্রেই ইতিহাসে ওই প্রপঞ্চের ক্ষমতাকেও বুঝে নিয়েছে। যে পরিমাণে এই উপলব্ধিকারী জ্ঞান-পরিসরের মানুষ, সেই পরিমাণেই ওই ক্ষমতা তার উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে: কিন্তু যে পরিমাণে সে জীবনে লিপ্ত এক মানুষ সে পরিমাণেই হয়তো ওই নিয়ন্ত্রণ আলগা হয়নি।

ইতিহাস যদি খাঁটি সার্বভৌম বিজ্ঞান হয়ে ওঠে, তবে তা মানবপ্রজাতির পক্ষে জীবনের সঙ্গে সব হিসেবনিকেশ চুকিয়ে জীবনে অন্ত টেনে দেওয়ার সামিল হবে। ইতিহাস চর্চা তখনই একমাত্র হিতকর ও ভবিষ্যতের জন্য ফলদায়ী হতে পারে যখন তা জীবনের এক শক্তিশালী নব প্রবাহের অনুগামী হয়, আত্মপ্রকাশমান এক সংস্কৃতির অনুগামী হয়; অর্থাৎ, যখন তা উচ্চতর কোনো বলের দ্বারা শাসিত ও নির্দেশিত হয়, নিজে শাসন ও নির্দেশদানের ভূমিকা নেয় না।

যে মাত্রায় ইতিহাস জীবনের সেবায় নিয়োজিত, সেই মাত্রাতেই তা এক ইতিহাস-নিরপেক্ষ ক্ষমতার সেবাতেও নিয়োজিত, আর এই অধীনস্থ চরিত্রের জন্যই তা কখনও গণিতের মতো খাঁটি বিজ্ঞান হতে পারে না ও তা হওয়া উচিতও নয়। অবশ্য জীবনের কী মাত্রায় ইতিহাসের সেবা দরকার, আদৌ দরকার কিনা, তা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন যা ব্যক্তি-মানুষ, জনজাতি ও তাদের সংস্কৃতির স্বাস্থ্যের সঙ্গে জড়িত। কারণ এই সেবা যখন মাত্রাতিরিক্ত রূপ পরিগ্রহ করে, জীবন অধঃপতিত হয়ে ভেঙে পড়ে, এবং এই অধঃপতনের মধ্য দিয়ে ইতিহাস নিজেও শেষাবধি অধঃপতিত হয়।

 

 

ইতিহাসের সেবা জীবনের প্রয়োজন— এহেন প্রস্তাবের সঙ্গে সমান জোরে অপর একটি প্রস্তাবও ধরে নিতে হবে যার প্রতিপাদন আমরা পরে করবো। সেই অপর প্রস্তাবটি হলো: ইতিহাসের আধিক্য জীবিত মানুষের জন্য ক্ষতিকর। জীবিত মানুষের সঙ্গে তিন দিক থেকে ইতিহাস সংসৃষ্ট হয়: ক্রিয়া ও প্রচেষ্টা করে এমন এক সত্তাধারী মানুষের সঙ্গে তা সংসৃষ্ট হয়, ভক্তি ও সংরক্ষণ করে এমন এক সত্তাধারী মানুষের সঙ্গে সংসৃষ্ট হয়, আর ক্লেশ ভোগ করে ও মুক্তি কামনা করে এমন এক সত্তাধারী মানুষের সঙ্গে সংসৃষ্ট হয়। মানুষ ও ইতিহাস পারস্পরিক সম্পর্কের এই তিনটি ভঁাজ তিন প্রকার ইতিহাসকে চিহ্নিত করে— প্রভেদরেখা যে পরিমাণে টানা সম্ভব সে পরিমাণে এই তিনটি প্রকারকে স্মারকধর্মী, প্রত্নতাত্ত্বিক ও সমালোচনাত্মক অভিধা দিয়ে চিহ্নিত করা যেতে পারে।

ইতিহাস অধিকতো কীর্তিমান ও ক্ষমতাবানের অধিকারভুক্ত, সেই মানুষের অধিকারভুক্ত যে এক মহান সংগ্রাম লড়ার পথে আদর্শ ধাঁচা, গুরুমশায় ও সান্ত্বনাদানকারীদের প্রয়োজন বোধ করে অথচ তার সমসাময়িকদের মধ্যে খুঁজে পায় না। এভাবেই ইতিহাস শিলার-এর অধিকারভুক্ত হয়েছিলো: কারণ আমাদের সময়টা এতই খারাপ, গ্যেটে-র কথায়, যে কবি শিলার আর তঁাকে ঘিরে থাকা মনুষ্যজীবনের মধ্যে এমন কোনো স্বপ্রকৃতির দেখা পাচ্ছেন না যা তিনি নিযুক্ত করতে পারেন। পলিবিয়াস-এর মনেও এই কীর্তিমান মানুষদের কথাই ছিল যখন তিনি বলেছিলেন যে রাজনৈতিক ইতিহাস হলো রাাষ্ট্রশাসনের জন্য উপযুক্ত প্রস্তুতি এবং এমন এক সর্বোত্তম শিক্ষক যে অন্যদের দুর্ভাগ্য সম্পর্কে স্মরণ করিয়ে দিয়ে নিজেদের ভাগ্য-পরিবর্তন স্থিরসংকল্প ভাবে সহ্য করার জন্য আমাদের তৈরি করে তোলে। এর মধ্য দিয়ে যাঁরা ইতিহাসের অর্থ চিনতে শিখেছেন, তাঁরা অতীতের মহৎ যুগগুলোর পিরামিডের গায়ে কৌতূহল-তাড়িত ভ্রমণকারী বা পাণ্ডিত্যাভিমানী অণুবিদ্যাবিশারদদের হামলে-পড়া ছোটাছুটি দেখে যারপরনাই বিরক্ত বোধ করেন; যেখান থেকে তিনি অনুকরণ করার বা আরো ভালো কিছু করার অনুপ্রেরণা খুঁজে পান, সেখানে তিনি এই বিক্ষিপ্ত-চিত্ত উত্তেজনা-ভিক্ষু অলসজনেদের যেনবা-কোনো-চিত্রপ্রদর্শনীতে হামলে বেড়ানোর অবিমৃশ্যকারিতার মাঝে পড়ে যাওয়াকে বরদাস্ত করতে পারেন না। দেখলে অতি সক্রিয় বলে মনে হয়, অথচ আসলে কেবল আকুল হয়ে বৃথা হুড়োহুড়ি করে বেড়ায়, এমন দুর্বল ও অপদার্থ অলসদের মধ্যে পড়ে কাজের মানুষটি নৈরাশ্য ও বীতরাগের কবলমুক্ত হওয়ার জন্য পিছনের দিকে দৃষ্টি ঘোরান এবং নির্ধারিত অভিমুখ মুখে ধেয়ে যাওয়ায় বিরতি টেনে হাঁফ-ধরা অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসেন। তঁার নিজের অভিমুখ অবশ্য সুখ, হয়তো তঁার নিজের সুখ নয়, বরং প্রায়শই জাতিবিশেষের সুখ, বা সমগ্র মানবজাতির সুখ; হতোদ্যম-হতাশার প্রতিষেধক হিসেবে ইতিহাস তঁার প্রয়োজন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই, এমন কোনো পুরস্কার নেই যার হাতছানি তঁাকে চালিত করে নিয়ে যেতে পারে, কেবল যশ-প্রত্যাশা ছাড়া— যশ, অর্থাৎ, ইতিহাসের মন্দিরে এমন এক সম্মানের স্থান যেখান থেকে তিনি তঁার উত্তরসূরীদের কাছে শিক্ষক, সান্ত্বনাদানকারী ও শাসনকারী হয়ে উঠতে পারেন। যে অনুশাসনবিধি তঁাকে শাসন করে তা হলো: যা অতীতে ‘মানুষ’ ধারণাটিকে প্রসারিত ও সুন্দরতর করে তুলতে পেরেছিল, তা সেই ভূমিকা চিরদিনই পালন করে যেতে পারবে, তাই তা চিরঅস্তিত্বমান। স্মারকধর্মী ইতিহাসের এই চাহিদাবোধের মধ্যে কাজ করা মানবতার প্রতি আস্থায় মৌলিক যে ধারণাটি ক্রিয়াশীল, তা হলো: ব্যক্তি মানুষের সংগ্রামের মহা মুহূর্তগুলো একটি শিকল রূপে সংযুক্ত থেকে সহস্রবর্ষের এপার-ওপার মানব প্রজাতিকে একটি পর্বতমালার মতো ঐক্যবদ্ধ করে রাখে, বহু দূর অতীত মুহূর্তের কোনো শৃঙ্গও তাই আজ আমার কাছে এখনও জীবন্ত, উজ্জ্বল ও মহান বোধ হয়। মহত্ত্বকে চিরস্থায়ী হতে হবে, এই দাবিই কিন্তু সবচেয়ে ভয়প্রদ সংঘাতগুলোকে উশকে দেয়। কারণ জীবন্ত অপর সবকিছুই ‘না’ বলে আপত্তি করে ওঠে। স্মারক গড়ে উঠতে দেওয়া যাবে না— প্রতিস্পর্ধী স্বর দাবি করে। নীচ ও ক্ষুদ্র যতো উদাসীন অভ্যাস জগতের প্রতিটি কোণা থেকে উপছে উঠে পৃথিবীর ভারী নিশ্বাসের মতো যা কিছু মহৎ তা ঘেরাও করে ফেনিয়ে ওঠে, মহত্ত্বের অবিনশ্বরতা অর্জনের পথ ছেয়ে ফেলে এবং ক্রমশ মহৎকে শ্লথ, ভ্রান্তিগ্রস্ত, শ্বাসরুদ্ধ ও নির্বাপিত করে তোলে। এই পথ অবশ্য মানুষের মগজের মধ্য দিয়েই বিন্যস্ত! বিন্যস্ত সেইসব ভীরু স্বল্পজীবী প্রাণীর মগজের মধ্য দিয়ে, যারা বারংবার একই অভাব ও দুর্দৈবে ফেঁসে থেকে বহু কষ্ট করেও বিনাশ কেবলমাত্র অল্প কিছুক্ষণের জন্যই ঠেকিয়ে রাখতে পারে। কারণ তারা সর্বোপরি একটা জিনিষই চায়: যে কোনো মূল্যে বেঁচে থাকতে চায়। কে বা তাদের সংযুক্ত করবে স্মারকধর্মী ইতিহাসের সেই কঠোর রিলে-দৌড়ের সঙ্গে কেবল যার মধ্য দিয়েই মহত্ত্বের প্রাণপ্রতিষ্ঠা হয়ে চলে! তবু তো বারংবার এমন কিছুজন জেগে ওঠে যারা অতীত মহত্ত্বের বিবেচনার মধ্য দিয়ে শক্তি জুটিয়ে মনুষ্যজীবনকে গৌরবময় জ্ঞান করে উদ্বুদ্ধ হয়। আর এই তিক্ত লতার সবচেয়ে সুন্দর ফল হলো এই জ্ঞান যে পূর্ববর্তী যুগেও কেউ না কেউ গর্ব ও শক্তি ভরা এই অস্তিত্বের মধ্য দিয়ে নিষ্ক্রান্ত হয়েছে, অপর কেউ গভীর চিন্তামগ্নতায় ডুবে গেছে, আবার অন্য কেউ দয়া ও কল্যাণচেষ্টা প্রদর্শন করেছে— কিন্তু তারা সবাই শিক্ষা রেখে গেছে একটাই: অস্তিত্বকে যে আমল দেয় না, সে-ই সবচেয়ে ভালোভাবে বাঁচে। সাধারণ মানুষ যদি তার প্রতি বরাদ্দ অল্প সময়কে বিষন্ন স্থিরসংকল্পতায় কতো-না-মরীয়া হয়ে আঁকড়ে ধরে থাকে, যে স্বল্পজনার কথা আমরা সদ্য বলেছি, তারা অবিনশ্বরতা ও স্মারকধর্মী ইতিহাস অভিমুখে তাদের যাত্রাপথে জেনে যায় কীভাবে ঐশ্বরিক অট্টহাস্য বা নিদেনপক্ষে তুরীয় উপহাসের সঙ্গে সেরূপ আঁকড়ে-ধরা-কে তুচ্ছ করতে হয়; এই মহাজনেরা প্রায়শই তঁাদের কবরে অবতরণ করেন শ্লেষ ও ব্যঙ্গে পূর্ণ এক বাঁকা হাসি নিয়ে— কারণ কবরস্থ করার মতো কী আর অবশিষ্ট থাকে তঁাদের মধ্যে! অবশিষ্ট থাকলে থাকে শুধু সেই গাদস্বরূপ পরিত্যক্ত দেমাক ও জৈবিকতা যা এই উড্ডীনদের সবসময় ভারের টানে টেনে নামাতে চেয়েছে এবং যা তঁাদের ঘৃণার আগুনে ছাই হয়ে এখন বিস্মরণে তলিয়ে গেছে। কিন্তু একটা জিনিষ ঠিক বেঁচে থাকবে, বেঁচে থাকবে তঁাদের অপরিহার্যতম সত্তার মোহর, কাজ বিশেষ, ক্রিয়া বিশেষ, দুর্লভ আলোকপ্রাপ্তির এক টুকরো, সৃষ্টি বিশেষ: তা বেঁচে থাকবে কারণ ভাবী সময়ের তো তা ছাড়া চলবে না। এই রূপান্তরিত আকারে যশ আমাদের অস্মিতার সুস্বাদুতম টুকরোর চেয়েও অধিক কিছু, যেমন সোপেনহাওয়ার বলেছিলেন, তা হলো সমস্ত যুগের মহত্ত্বের সংহতি ও অনবচ্ছিন্নতার উপর বিশ্বাস, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ভেসে যাওয়া ও বস্তুসমূহের অনিত্যতার বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদ।

বর্তমান মানুষদের জন্য অতীত সম্পর্কে স্মারকধর্মী ধারণা বা পূর্ববর্তী সময়ের ধ্রুপদী-বিরল-এর আকর্ষণে বাঁধা পড়া তবে কী কাজে লাগে? তার থেকে বর্তমান মানুষ সিদ্ধান্ত টানে যে একদা অস্তিত্বমান মহত্ত্ব যখন অতীতে সম্ভব হয়েছিলো, তখন আবারও ভবিষ্যতে সম্ভব হতে পারে; ফলত, অসম্ভবের আকাঙ্ক্ষায় সে বাঁধা পড়েছে কিনা এই সন্দেহ যেভাবে তাকে দুর্বল মুহূর্তে কুরে খাচ্ছিল তার নিরসন করে সে এখন প্রফুল্লতর চিত্তে নিজ পথে গমন করে। ধরা যাক কেউ এমন বিশ্বাস করে যে এখন জার্মানিতে কেতা হয়ে ওঠা ফালতু সংস্কৃতিকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করার জন্য অনধিক একশ জন নবোদ্যমে সক্রিয় শিক্ষিত মানুষই যথেষ্ট; কতো না শক্তি তিনি সঞ্চয় করবেন এই উপলব্ধি থেকে যে নবজাগরণের সংস্কৃতি এহেন শ-খানেক মানুষের কঁাধে চেপেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো!

অথচ— উপরোক্ত উদাহরণটি থেকেই যদি সরাসরি নতুন কোনো শিক্ষা নিতে হয়— ওই তুলনা কতো না অযথার্থ, বায়বীয় ও শর্তসাপেক্ষ হতে বাধ্য! অতীতের কতো বিপুল অংশ দৃষ্টির বাইরে রেখে তবেই না এই শক্তিধর প্রভাব খাটানোর কথা বলা যেতে পারে; তার মধ্যে যা কিছু নিতান্তই বিশেষ, কতো না গা-জোয়ারি করে সেসবের তীক্ষ্ণ কোণ ও কঠিন রূপরেখা ভেঙে সাদৃশ্য-আরোপের জন্য এক সার্বজনীন ধাঁচায় ঠেসে পুরতে হবে! আসলে, একদা যা সম্ভব হয়েছিলো যা আবার দ্বিতীয়বার সম্ভব হতে পারে একমাত্র যদি পীথাগোরীয়দের এই বিশ্বাস সঠিক হয়ে থাকে যে মহাকাশে যখন জ্যোতিষ্কসমূহের অবস্থান পুনরাবৃত্ত হয়, পৃথিবীতেও তখন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সমস্ত ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে হবে: অর্থাৎ, তারাগুলো যখন একে অপরের সাপেক্ষে এক নির্দিষ্ট অবস্থানে আসবে তখন জনৈক স্টোইক১০ জনৈক এপিকুরীয়র১১ সাথে হাত মিলিয়ে আবার সিজারকে হত্যা করবে, তারাগুলো আবার যখন পরস্পর সাপেক্ষে অন্য এক নির্দিষ্ট অবস্থানে আসবে, কলম্বাস তখন পুনর্বার আমেরিকা আবিষ্কার করবে। যদি পৃথিবী-নাট্যের পঞ্চম দৃশ্যের অবসানে গোটা নাটকটি প্রতিবার আবার শুরু থেকে পুনরাবৃত্ত হয়, যদি সংশয়াতীত হয় যে পর্যায়বৃত্তভাবে প্রবর্তনার একই সংযোগ, একই সঞ্চালনাশক্তি, একই বিপর্যয় পুনরাবৃত্ত হবে, তাহলেই কেবল ক্ষমতাচারী মানুষ পূর্ণ সত্যত্বের দেবত্ব আরোপ করে স্মারকধর্মী ইতিহাস কামনা করতে পারতো, অর্থাৎ, প্রতিটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তার মধ্যেই ধরা থাকতো: কিন্তু সন্দেহ নেই যে তা ঘটবে একমাত্র তখনই যখন জ্যোতির্বিদরা আবার জ্যোতিষীতে পরিণত হবে। সেই সময় না আসা অবধি স্মারকধর্মী ইতিহাসের উপর পরম সত্যতা আরোপ করে কাজ নেই: স্মারকধর্মী ইতিহাস কেবল সন্নিকর্ষ ও সাধারণীকরণ নিয়ে কাজ করতে পারে, বিসদৃশ বস্তুকে সদৃশ দেখানোর কাজ করতে পারে, স্মারকসুলভ বিরাট-(প্র)ভাব প্রদর্শন করার জন্য তাকে অভিপ্রায় ও প্রবর্তনার পার্থক্য কমিয়ে দেখাতে হয়, অর্থাৎ, কারণ-বিশ্লেষণ অবহেলা করে দৃষ্টান্তস্বরূপ ও অনুকরণযোগ্য রূপ তুলে ধরতে হয়। তার এই যথাসম্ভব কারণ এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতার কারণেই তেমন কিছু অতিশয়োক্তি হবে না যদি বলা হয় যে স্মারকধর্মী ইতিহাস হলো ‘স্বয়ং-প্রভাবসমূহের’ (‘effects in themselves’) একটি সংকলন, এমন কিছু ঘটনার সংকলন যা সমস্ত ভবিষ্যৎকাল জুড়েই প্রভাব তৈরি করে চলবে। জনপ্রিয় নানা উৎসবে, ধর্মীয় বা সামরিক জয়ন্তীতে যা উদযাপিত হয়, তা প্রকৃতপক্ষে এই ধরনের ‘স্বয়ং-প্রভাব’ বিশেষ: তা এমনকিছু যা উচ্চাকাঙ্ক্ষীদের তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়, সাহসীরা যাকে বুকের উপর রক্ষাকবচের মতো ধারণ করে, কিন্তু যা কখনোই কার্য-কারণের ইতিহাসগত যোগসূত্র নয়। কার্য-কারণের ইতিহাসগত যোগসূত্রের পূর্ণ উপলব্ধি কেবল এটাই প্রতিপাদন করতে পারে যে আকস্মিকতার পাশা-খেলা ও ভবিষ্যৎ কখনোই অতীতে যা ঘটিয়েছিল তার সম্পূর্ণ সমরূপ কিছুকে আবার ফিরিয়ে আনতে পারে না।

ইতিহাসচর্চার আত্মা যতোক্ষণ তা থেকে ক্ষমতাচারী মানুষের লাভ করা মহা উদ্দীপনার মধ্যেই নিহিত থাকবে, যতোক্ষণ অবধি অতীতকে অনুকরণযোগ্য, অনুকরণীয় ও দ্বিতীয়বারের জন্য সম্ভব হিসেবে তুলে ধরার দায় তা স্বীকার করবে, ততোক্ষণই তা কিছুটা বিকৃত ও সৌন্দর্যায়িত হয়ে মুক্ত কাব্যিক উদ্ভাবনের কাছাকাছি পৌঁছে যাবে। বস্তুত, এমন যুগ ছিল যা স্মারকীকৃত অতীত ও অতিকথা-রূপ গল্পের মধ্যে মোটেই ফারাক করতে পারতো না, কারণ উভয়ের থেকেই একই ধরনের উদ্দীপনা পাওয়া যেতো। তাই, ইতিহাস-বিবেচনার স্মারকধর্মী প্রণালী যদি অন্যান্য প্রণালীর— অর্থাৎ, আমি বলতে চাইছি, প্রত্নতাত্ত্বিক ও সমালোচনাত্মক প্রণালীর— উপর শাসন কায়েম করে বসে, খোদ অতীতের অনিষ্ট ঘটতে থাকে: তার খণ্ডের পর খণ্ড গোটাগুটি বিস্মৃত অবজ্ঞাত হয়ে ছেদহীন রঙহীন স্রোতে ভেসে যায়, আর সুশোভিত কিছু বিচ্ছিন্ন তথ্য দ্বীপের মতো জেগে থাকে: কেবল যে কয়টি ব্যক্তিত্ব দৃশ্যমান থাকে তারাও কেমন অদ্ভুত ও অপ্রাকৃত হয়ে ওঠে, ঠিক যেমন পীথাগোরাসের কোমরের নিচের অংশ সোনার তৈরি বলে তঁার শিষ্যরা দেখতেন। স্মারকধর্মী ইতিহাস তুলনার মধ্য দিয়ে বিভ্রম তৈরি করে: মাদকতাপূর্ণ সাদৃশ্য-নির্ধারণের মধ্য দিয়ে তা সাহসীদের হঠকারীতায় প্রলুব্ধ করে ও অনুপ্রাণিতদের ধর্মোন্মত্ততায় প্রবৃত্ত করে; আর মেধাবী অহমসর্বস্ববাদী ও কল্পদৃষ্টি-তুখোড় বদমাশের হাতে ও মগজে যখন এই ধরনের ইতিহাস হাতিয়ার হয়, তখনই দেখি সাম্রাজ্য ধ্বংস হচ্ছে, রাজপুরুষ খুন হচ্ছে, যুদ্ধ ও বিপ্লব ঘোষিত হচ্ছে এবং একগুচ্ছ ঐতিহাসিক ‘স্বয়ং-প্রভাব’, অর্থাৎ, উপযুক্ত কারণ ছাড়াই প্রভাবের আবার বাড়বাড়ন্ত ঘটছে। ভালো হোক বা মন্দ, ক্ষমতাচারী কৃতিত্বশালী মানুষদের হাতে পড়েই যদি স্মারকধর্মী ইতিহাস এমন অনিষ্টকারী রূপ ধারণ করতে পারে, তাহলে অলস হীনবলেরা যখন এর দখল নিয়ে প্রয়োগ করে, তখন আরো কী না ঘটতে পারে!

সবচেয়ে সরল ও পৌনঃপুনিক উদাহরণটিকে ধরা যাক। ধরা যাক সেই অ-শিল্পীসুলভ প্রকৃতির মানুষদের কথা, শিল্পীদের স্মারকধর্মী ইতিহাস দিয়ে যারা নিজেদের কেবল দুর্বলভাবে বিভূষিত, বর্মাচ্ছাদিত ও অস্ত্রসজ্জিত করেছে: তারা এখন কার দিকে তাদের অস্ত্র তাক করবে? তাক করবে তাদের জাত-শত্রু সেইসব সবল শিল্পীসত্তার অধিকারীদের দিকে, যারাই কেবল সেই ইতিহাস থেকে প্রকৃত ও জীবন-উজ্জীবক অর্থে শিক্ষা নিতে সক্ষম এবং গৃহীত শিক্ষাকে উচ্চতর চর্চায় রূপান্তরিত করতেও সক্ষম। এই সবল শিল্পীসত্তাধিকারীদের পথ রুদ্ধ করে আঁধার ঘনিয়ে উঠবে যদি অতীতের কোনো মহা যুগের স্মারককে আধা বুঝে পূজ্যপাদ হিসেবে খাড়া করে তা ঘিরে সদা নাচন-কোঁদন জুড়ে দিয়ে যেনবা দাবি করা হতে থাকে: ‘দেখো হে, ইহাই হইল সত্যিকারের শিল্প: নতুন কিছুর আকাঙ্ক্ষা লইয়া যাহারা বিবর্তনের পথে যাইতেছে, তাহাদের দিকে ফিরিয়াও তাকাইয়ো না’। এহেন নৃত্যরত দঙ্গল ‘সুরুচি’ সংজ্ঞায়িত করার অধিকারী হিসেবেও জাহির হয় যেহেতু সৃজনে লিপ্ত মানুষকে সর্বদাই সৃজনকর্মে-কোনো-অংশ-না-নেওয়া পর্যবেক্ষণ-করেই-মাত-করতে-চাওয়া মানুষদের তুলনায় খাটো ও নিষ্প্রভ বলে মনে হয়; ঠিক যেমন প্রকৃতই শাসনকাজ নির্বাহিত করা রাজনীতিজ্ঞের তুলনায় জনসভায় ভাষণ দিয়ে বেড়ানো রাজনৈতিক নেতাদের সব যুগেই অনেক বেশি সুবিজ্ঞ ও সুবিবেচক বলে মনে হয়। কিন্তু জল যদি এত দূর গড়ায় যে চারুশিল্পের মহলে গণভোট ও সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রয়োগ বিধিবদ্ধ হয় এবং চারুকলাচর্চায় নিষ্ক্রিয়জনেদের সভায় শিল্পীকে আত্মরক্ষার্থে জবাবদিহি করতে বাধ্য করা হয়, তাহলে আগে থেকেই হলফ করে বলে দেওয়া যেতে পারে যে শিল্পীবর বাতিলের স্তূপে নিক্ষিপ্ত হবেন: তঁার বিচারকগণ যে স্মারকোচিত শিল্প-অনুশাসন ধারায় (অর্থাৎ, সংজ্ঞামতে, সর্বযুগে সর্বসময় ‘প্রভাব তৈরি করেছে’ এমন শিল্পের ধারায়) অকৃত্রিম আনুগত্য ঘোষণা করেছেন, তা তঁাকে বাঁচাবে না বরং আরো ফঁাসাবে কারণ সমসাময়িক হওয়ার কারণেই যে শিল্প এখনও স্মারকভুক্ত নয়, তা ইতিহাস-অর্পিত প্রাধিকার সম্পন্ন নয় বলেই বিচারকগণের কাছে অনাকর্ষণীয় ও অপ্রয়োজনীয় বলে বিবেচিত হবে। অপরদিকে আবার এই বিচারকদের স্বজ্ঞাই তাদের হুঁশিয়ারি দেয় যে শিল্পের হাতেই শিল্পের হত্যা ঘটতে পারে: যা স্মারকোচিত, কখনোই আর তার পুনরাবৃত্তি হতে দেওয়া যাবে না, আর তা নিশ্চিত করার জন্যই তারা স্মারকধর্মীর অতীত থেকে লাভ করা প্রাধিকারকে নিযুক্ত করে। তারা সব শিল্পবোদ্ধা কারণ তারা শিল্পকে পুরোপুরি নিকেশ করে দিতে চায়; চিকিৎসকের ভান করে তারা আসলে পানীয়ে বিষ মেশাতে উৎসুক, তাদের রুচি ও জিভকে তারা এমনভাবেই তৈরি করে যাতে এই নষ্ট রুচিকে শিখণ্ডী করে ব্যাখ্যা করা যায় কেন এত দৃঢ়চিত্তে তারা তাদের সামনে হাজির হওয়া সমস্ত পুষ্টিকর চারুকলার ভোগকে প্রত্যাখ্যান করছে। তারা যেহেতু নতুন কোনো মহত্ত্বের উন্মেষ চায় না, তা প্রতিরোধ করতে তাদের মন্ত্র হলো: ‘চেয়ে দেখ, মহত্ত্ব তো ইতিমধ্যেই হাজির হয়ে গেছে!’ আদপে, ইতিমধ্যে অস্তিত্বমান এই মহত্ত্ব তাদের কাছে ততোটুকুই কদর পায় যতোটুকু পায় যে কোনো উন্মেষিত হতে চাওয়া মহত্ত্ব: তাদের যাপিত জীবনই তার প্রমাণ। তাদের নিজেদের যুগের মহৎ ও ক্ষমতাশালীর প্রতি তাদের ঘৃণাকে অতীত যুগের মহৎ ও ক্ষমতাশালীর প্রতি পরিতুষ্ট ভক্তি-শ্রদ্ধার ছদ্মবেশে সাজিয়ে হাজির করার উপায়ই হলো স্মারকধর্মী ইতিহাস, আর এর মধ্য দিয়ে তারা তাদের ইতিহাস-বিবেচনা-প্রণালীর প্রকৃত অর্থটিকেও গোপন করে তার বিপরীতটিকেই জাহির করে; জেনে বা না জেনে তারা যেন এই নীতিবাক্য অনুসরণ করে: মৃতদের দিয়ে জীবিতদের কবর দেওয়া যাক।

ইতিহাসের যে তিন প্রজাতি, তার প্রত্যেকটিই একটি নির্দিষ্ট মাটিতে নির্দিষ্ট আবহাওয়ার ফসল: অন্য যে কোনো মাটি-আবহাওয়ায় তা উৎসন্নকারী আগাছায় পরিণত হয়। মহৎ কিছু করার আকাঙ্ক্ষাসম্পন্ন কোনো মানুষের যদি আদৌ অতীতের দরকার পড়ে, সে তা স্মারকধর্মী ইতিহাসের মাধ্যমে আত্মসাৎ করে। অন্যদিকে, যে পুরানো দিনের পরিচিত ও শ্রদ্ধেয় বস্তুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পছন্দ করে, সে প্রত্নতাত্ত্বিক ইতিহাসবিদের ন্যায় অতীত ঢুঁড়ে বেড়ায়। আর একমাত্র সেই মানুষ, যে কোনো বর্তমান প্রয়োজনের দ্বারা তাড়িত, যে কোনো মূল্যে যে এই বোঝা ছুঁড়ে ফেলতে চায়, তার-ই দরকার সমালোচনাত্মক ইতিহাস, অর্থাৎ এমন ইতিহাস যা বিচার করে, দোষ সাব্যস্ত করে, বাতিলও করে। নির্দিষ্ট মাটি-আবহাওয়ার এই গাছগুলোকে নির্বিচারে অপরাপর মাটি-আবহাওয়ায় পুঁতে দিলে বহু অনিষ্টসাধন হতে পারে: প্রয়োজনহীন সমালোচক, ভক্তিহীন প্রত্নতাত্ত্বিক, মহৎ কিছু করতে অক্ষম মহত্ত্ব-বিশেষজ্ঞ হলো তেমনই অনিষ্টকারী গাছ, নিজ মাটি-আবহাওয়ার লালনভূমি থেকে উচ্ছিন্ন হয়ে তারা আগাছায় অধঃপতিত হয়েছে।

 

 

তাই, দ্বিতীয়ত, ইতিহাস তার সম্পত্তি যে সযত্নে সংরক্ষণ করে, শ্রদ্ধা করে, তার নিজের উৎস বা উৎপত্তিস্থলের দিকে প্রেম-আনুগত্যে দ্রব হয়ে চেয়ে থাকে, আর সেভাবে ভক্তিভরে নিজ অস্তিত্বের জন্য যেন বা ধন্যবাদজ্ঞাপন করে। প্রাচীনের অস্তিত্ব যত্ন করে টিকিয়ে রাখতে চাওয়ার মধ্য দিয়ে সে চায় তার নিজের অস্তিত্বধারণের প্রাকশর্তগুলোকে তার পরবর্তীকালে যারা অস্তিত্বধারণ করতে চলেছে তাদের জন্যও টিকিয়ে রাখতে--- আর এভাবেই সে জীবনের সেবা করে। এহেন সত্তার কাছে পূর্বপুরুষদের জিনিষপত্রের উত্তরাধিকারী হওয়ার অর্থই বদলে যায়--- তারা সেসবের মালিক হয়ে বসে। যা তুচ্ছ, সীমাবদ্ধ, পচন-ধরে-যাওয়া, বা অচল, তা-ও নিজস্ব মর্যাদায় ভাস্বর হয়ে পবিত্র ও অলঙ্ঘ্য হয়ে ওঠে কেবলমাত্র এই কারণেই যে প্রত্নতত্ত্ববাদী কিছু মানুষের ভক্তিপরায়ণ সংরক্ষণসর্বস্ব চিত্ত সেই সব বস্তুর মধ্যে প্রবসিত হয়ে সেগুলোকেই নিজেদের ঘরদুয়ার করে তুলেছে। সেমত মানুষের কাছে নিজ শহরের ইতিহাসই তার নিজের ইতিহাস হয়ে ওঠে; শহরের বিভিন্ন দেওয়াল, তোরণযুক্ত খিলান, বিধিনিয়ম, ছুটি-পরব-কে সে তার যৌবনের ভাস্বর দিনলিপির ন্যায় পাঠ করে এবং তার মধ্যেই আবার নিজেকে, নিজের বল, শ্রমশীলতা, আনন্দ, বিচারবোধ, এমনকি নিজের নির্বুদ্ধিতা ও দোষগুলোকেও সব খুঁজে পায়। সে নিজের কাছে নিজে বলতে থাকে: এখানেই আমরা বেঁচেছি, এখানেই আমরা বাঁচছি, আর এখানেই আমরা বাঁচবো, কারণ আমাদের দম আছে, এক রাতে আমাদের ধ্বংস করে ফেলা যাবে না। আর এভাবেই এই ‘আমরা’-র ঘাড়ে সওয়ার হয়ে সে নিজের প্রাতিস্বিক ক্ষণস্থায়ী অস্তিত্বের সীমার বাইরে দৃষ্টি ছড়িয়ে নিজেকে তার আবাসের, শহরের, জাতির প্রতিভূ বলে বোধ করতে শুরু করে। এমনকি সে কখনো কখনো দীর্ঘ তমসাচ্ছন্ন বিহ্বলতার শতকগুলোর ওপারে তার জাতির প্রাণসত্তাকে নিজের প্রাণসত্তা রূপে অভ্যর্থনা করে নেয়: পথ হাতড়ে ফিরে যাওয়া, অতীতে তখন সব কেমন ছিল আঁচ করা, নির্বাপিতপ্রায় চিহ্নগুলো সন্ধান করা, মুছে যাওয়া লেখার উপর পুনর্লিখন যতোই জটিল-বিজড়িত হয়ে উঠুক না কেন দ্রুত ও নির্ভুলভাবে সেই অতীত পাঠ করে ফেলা--- এগুলোই তার গুণ ও দক্ষতার দিক। এমত গুণ ধারণ করেই গ্যেটে এসে দাঁড়িয়েছিলেন এরউইন ভন স্টেনবাখ১২-এর স্মারকোচিত কীর্তির সামনে; তাঁদের দুজনের ঐতিহাসিক সময়ের মধ্যে জমে থাকা ঐতিহাসিক মেঘের স্তর গ্যেটের অন্তর্গত আবেগঝঞ্ঝায় ছিঁড়েখুঁড়ে বিলীন হয়ে গিয়েছিলো: প্রথম দর্শনেই গ্যেটে চিনে নিয়েছিলেন কীভাবে জার্মান নন্দনশিল্প ‘কড়া কর্কশ জার্মান প্রাণসত্তার মধ্য দিয়ে ক্ষমতা জাহির করেছে’। এই একই প্রবণতা নবজাগরণের যুগের ইতালিয়দের প্রাণিত করেছে, তাদের কবিদের মধ্যে প্রাচীন ইতালির প্রতিভা পুনর্জাগরিত করে তুলেছে, জাকব বুর্কহার্ডের১৩ কথায়, ‘আদিম স্বরতন্তুগুলোকে বিস্ময়কর নতুন স্বরে ধ্বনিত করে তুলেছে’। কিন্তু অতীতের প্রতি এই স্মারকধর্মী শ্রদ্ধাভক্তির সর্বোচ্চ মূল্য তখনই থাকে যখন তা একটি মানুষ বা একটি জাতির সাদামাটা, কর্কশ, এমনকি দীন জীবনাবস্থার উপর আনন্দ ও পরিতৃপ্তির এক সহজ আবেশ বিছিয়ে দেয়। যেমন ধরা যাক, ন্যিবুহর সম্মানজনক অকপটতায় স্বীকার করেছিলেন যে, পতিত প্রান্তর বা গুল্মাচ্ছন্ন অনুর্বর উপত্যকা যেখানেই হোক, কোনো নন্দনশিল্পের অভাব বোধ না করেই তিনি পরিতৃপ্ত জীবন যাপন করতে পারেন যদি কোনো ইতিহাসের অধিকারী মুক্ত কৃষকরা তাঁর সহবাসী হন। জীবনের সেবা ইতিহাস বুঝি তখনই সবচেয়ে ভালো করতে পারে যখন মনুষ্যপ্রজন্ম, ঋদ্ধিতে কম হলেও, নিজেদের বাসভূমি ও রীতি-পরম্পরায় পরিতৃপ্ত হয়ে বাঁচতে পারে, আরো মূল্যবান বলে ভেবে নেওয়া কোনোকিছুর পিছনে ধেয়ে বিদেশবিভুঁইয়ে পাগলের মতো ছুটে বেড়াতে আর যুদ্ধে মত্ত হয়ে উঠতে হয় না। এভাবে নিজেদের পরিবেশ, সঙ্গীসাথী, নিজেদের শ্রান্তিকর প্রথা, নিজেদের আপন পাহাড়ের কোল আঁকড়ে ধরে থাকাকে কখনো কখনো একগুঁয়েমি বা মূর্খতা বলে মনে হতে পারে--- কিন্তু তা অতি হিতকর মূর্খতা, যে মূর্খতা একটি লোকসমাজের স্বার্থ সবচেয়ে বেশি চরিতার্থ করতে পারে: এ কথা যে কারো কাছেই স্পষ্ট হয়ে যায় যখন অভিযান ও দুঃসাহসী যাত্রায় আসক্তি, বিশেষত যখন তা এক দঙ্গল জাতির মাথায় চেপে বসে, তা যে কী ভয়ঙ্কর ফল ফলাতে পারে তা জানা থাকে, আর কাছ থেকে দেখা থাকে কী দুরবস্থায় একটি জাতি পতিত হয় যখন সে তার নিজের উৎসের প্রতি বিশ্বস্ত না থেকে সর্বদা নতুন থেকে নতুনতর বস্তুর সন্ধানে অস্থির বিশ্বজনীন ছটফটানিতে ঠিকরে বেড়ায়। এই অস্থিরতার বিপরীত যে অনুভূতি, নিজ শিকড়ে সন্তুষ্ট গাছের ভাব, সম্পূর্ণ আপতিক ও বেমক্কা হওয়ার বদলে কোনো এক অতীতের উত্তরাধিকারী হিসেবে, তার থেকে বিকশিত ফুল ও ফল হিসেবে নিজেকে উপলব্ধি করার সুখ, অতএব নিজ অস্তিত্ব যে ক্ষমার্হ, এমনকি ন্যায়সংগতও, সেই বোধ--- এই অনুভূতিমালাকেই সাধারণত আজকাল ইতিহাসের প্রকৃত অর্থ বলা হয়ে থাকে।

কিন্তু এতৎসত্ত্বেও, সেমত পরিবেশ মানুষের পক্ষে অতীতকে নিখাদ জ্ঞানে রূপান্তরিত করে নেওয়ার জন্য সবচেয়ে উপযোগী পরিবেশ নয়; তাই, স্মারকধর্মী ইতিহাসের মতো এই ক্ষেত্রেও আমরা দেখি যে ইতিহাসচর্চা যতোক্ষণ জীবনের সেবা করে ও জীবনের প্রণোদনা দ্বারা চালিত হয়, ততোক্ষণই অতীত স্বয়ং দুর্ভোগে পড়ে। একটি আলগা রূপকের সাহায্যে বলা যায়: একটি গাছ যতোটা তার শিকড়কে অনুভব করতে পারে ততোটা তাকে দেখতে পায় না; মাটির উপরে দৃশ্যমান ডালপালাগুলোর জোর ও আকার-আয়তন থেকেই শিকড় কতোটা বড় ও ছড়ানো সে সম্বন্ধে একটা ধারণা করে নেয়। নিজের শিকড় সম্বন্ধে ধারণা করতেই যদি এত ভুলের অবকাশ থাকে, তাহলে তাকে ঘিরে থাকা বাকি অরণ্য নিয়ে ধারণায় না আরো কতো ভুল হতে পারে! কারণ বাকি অরণ্য যেটুকু মাত্রায় তার বাধা হয়ে উঠছে বা সহায় হয়ে উঠছে, সেটুকুই সে অরণ্য সম্পর্কে জানতে পারে, তার বেশি কিছু নয়। কোনো মানুষের, জনসমাজের বা গোটা জনজাতির প্রত্নতাত্ত্বিক বোধ সর্বদাই অতি সংকুচিত দৃষ্টিসীমার অধিকারী; যা অস্তিত্বমান তার বেশিরভাগটাই তার বোধের সীমার বাইরে, আর যেটুকু সে দেখতে পায় তা-ও দেখে অতিরিক্ত কাছ থেকে এবং অন্য সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন করে; যা দেখছে তাকে সে অন্যকিছুর সঙ্গে সম্বন্ধিত করে তুলতে পারে না, আর তাই তার দেখা সবকিছুকেই সমগুরুত্ব দিয়ে বসে এবং আলাদা আলাদা বস্তুগুলোর উপর মাত্রাতিরিক্ত গুরুত্ব আরোপ করে বসে। যে পার্থক্য-সচেতন মাত্রাবোধ ও পরিমাপবোধ অতীত-বস্তুগুলোর যথার্থ সুবিচার করতে পারে, সেই বোধের অভাবে মাত্রা ও পরিমাপ সর্বদাই প্রত্নতাত্ত্বিক জাতি বা ব্যক্তির পিছুদৃষ্টির উপরই নির্ভর করে।

এর ফলে এক আশু বিপদ হাজির হয়: পুরোনো ও অতীতের যা চোখে পড়ে সবকিছুকেই শেষাবধি একইরকম ভক্তিযোগ্য বলে নির্বিচারে ধরে নেওয়া হয়; আর অন্যদিকে, যা যা এহেন শ্রদ্ধা-ভক্তি সহকারে অতীত পানে চেয়ে থাকে না, অর্থাৎ যা কিছু নতুন ও জায়মান, তেমন সবকিছুকেই একলপ্তে বাতিল ও দণ্ডনীয় মনে করা হয়। তাই, এমনকি গ্রিকেরাও তাদের ভাস্কর্যশিল্পে মুক্ত মহৎ শৈলীর পাশাপাশি যাজকীয় শৈলীকেও বরদাস্ত করেছিল; শুধু তাই নয়, পরবর্তীতে তারা এই ঊর্ধ্বনাশা আবেগশূন্য ভঙ্গিকেই পরমপূজ্য করে তুলেছিল। যখন কোনো জনগোষ্ঠীর চেতনা এভাবে শিলীভূত হয়ে যায়, ইতিহাসচর্চা যখন এভাবে অতীতের জীবনকে এমনভাবে সেবা করতে থাকে যে তা বহমান ও বিশেষত উচ্চতর জীবনের ভিত্তিকে আক্রমণ করে বসে, ইতিহাসচেতনা যখন জীবনকে সংরক্ষণ করার বদলে তার শবকে সংরক্ষণ করে, তখন গাছটি অস্বাভাবিকভাবে তার উপরের ডালপালা থেকে নিচের শিকড় অবধি ধীরে ধীরে শুকিয়ে মরতে থাকে--- আর সাধারণত শেষ অবধি শিকড়গুলোও ধ্বংস হয়ে যায়। যে মুহূর্ত থেকে প্রত্নতাত্ত্বিক ইতিহাস বর্তমানের তাজা জীবন থেকে রস ও প্রেরণা গ্রহণ বন্ধ করে দেয়, সেই মুহূর্ত থেকেই তা নিজে অধোগতির পথ ধরে। তার ভক্তিরসের ধারা শুকিয়ে আসে, সে রস বিহনে পণ্ডিতিপনার শুকনো অভ্যাস নিজ অক্ষ ঘিরে আত্মম্ভরি আত্মসন্তুষ্টিতে পাক খেতে থাকে। এর পরেই দেখা দেয় একদা অস্তিত্বমান যথাসর্বস্বকিছু কুড়িয়ে-বাড়িয়ে সংগ্রহ করার অন্ধ তাড়নাতাড়িত জমক। শ্যাওলা আর ছাতা-পড়া দুর্গন্ধে আটকে পড়া মানুষ প্রত্নতাত্ত্বিক ছাঁচের মধ্য দিয়ে এমনকি সৃজনশীল ও উন্নততর আকাঙ্ক্ষাগুলোকেও নিত্যনতুন প্রত্নের জন্য চিরঅতৃপ্ত তৃষ্ণায় পরিণত করে, সে তৃষ্ণাই সর্বময় হয়ে ওঠে; প্রায়শই তার অধঃপতন এ মাত্রায় পৌঁছয় যে গ্রন্থতালিকাগত খুঁটিনাটি ধুলোবালিও সে সন্তুষ্টিসহকারে পরম খাদ্য বলে গিলতে থাকে।

কিন্তু অধঃপতনের ওই শেষ মাত্রায় না পৌঁছলেও, প্রত্নতাত্ত্বিক ইতিহাস যখন জীবনের উপকারে আসার মতো ভিত্তি-সংযোগ হারিয়ে ফেলেনি, তখনো যথেষ্ট বিপদের সম্ভাবনা থেকে যায় যদি তা অতি শক্তিশালী হয়ে উঠে অতীত-বিচারের অন্যান্য সব পন্থাগুলোকে পরাভূত করে দেয়। কারণ, প্রত্নতাত্ত্বিক ইতিহাস জীবন সংরক্ষণ করতেই জানে, জীবন জনন করতে জানে না; যা হয়ে উঠছে তাকে সর্বদা অবমূল্যায়িত করে প্রত্নতাত্ত্বিক ইতিহাস, যেহেতু হয়ে-উঠতে-থাকা বস্তুকে অনুমানে ধরার প্রবৃত্তিগত সক্ষমতা তার নেই, যা স্মারকধর্মী ইতিহাসের মতো অন্যান্য ধারার আছে। তাই নতুন কিছু করার প্রয়াসের সংকল্পকে তা বাধা দেয় ও দুর্বল করে তোলে, পক্ষাঘাতে বাঁধে কাজের মানুষকে যেহেতু নতুন কোনো কাজ করতে গেলে পুরোনো কারো না কারো ভক্তি-বিশ্বাসে আঘাত করতেই হয়। কোনো কিছু পুরোনো হয়ে উঠলেই দাবি ওঠে তাকে অমর অবিনশ্বর করে তোলার--- পূর্বপুরুষদের কোনো প্রাচীন আচার-অভ্যাস হোক ধর্মীয় বিশ্বাস হোক বা পরম্পরাগতভাবে চলে আসা রাজনৈতিক সুবিধা হোক, সেই প্রাচীন বস্তুটি তার দীর্ঘ অস্তিত্বকালে যে পরিমাণ ভক্তি-শ্রদ্ধা-মান্যতা পেয়ে এসেছে, তার মোট যোগফলের বিপুলত্বের সামনে নতুন কিছু দিয়ে তাকে প্রতিস্থাপিত করার ভাবনা কতোই না দুর্বিনীত ঔদ্ধত্যজাত, এমনকি শয়তানি, বলে মনে হতে পারে! অতীত থেকে কাঁড়ি কাঁড়ি এনে পরিমাণে বিপুল করে তোলা এই শ্রদ্ধাভক্তির পাহাড়ের সামনে কতো না তুচ্ছাতিতুচ্ছ বোধ হতে পারে সদ্য আবির্ভূত হওয়া এখনও জায়মান কোনও নতুনত্বকে!

এর মধ্য দিয়েই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে স্মারকধর্মী ও প্রত্নতাত্ত্বিক রীতিপ্রণালী ছাড়াও অতীত সম্পর্কে ভাবার তৃতীয় একটি রীতিপ্রণালীও কতো জরুরী হয়ে ওঠে। তৃতীয় এই রীতিপ্রণালীটি হলো সমালোচনাত্মক প্রণালী, এবং তা-ও জীবনের সেবায় নিযুক্ত রূপেই। জীবিত থাকতে হলে কখনো কখনো অতীতের একটি অংশকে ভেঙে ধ্বংস করে দেওয়ার শক্তি নিয়োগ করার সক্ষমতা থাকতে হয়, মানুষ তা করে থাকে অতীতের সেই অংশকে কাঠগড়ায় তুলে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিচার করে শেষাবধি অনুপযুক্ত বলে ঘোষণা করার মধ্য দিয়ে। যে কোনো অতীতই অনুপযুক্ত বলে ঘোষিত হওয়ার যোগ্য হতে পারে--- কারণ মনুষ্য-সংযুক্ত বস্তুর প্রকৃতিই হলো তাই: মানুষের সহিংসতা ও দুর্বলতা চিরকালই এতে প্রবল ভূমিকা পালন করে এসেছে। এমনটা নয় যে ন্যায়পরতা এখানে বিচারকের আসনে উপবিষ্ট; এমনটা তো আরোই নয় যে দয়া বা ক্ষমার প্রবৃত্তি বিধান প্রদান করছে: জীবন, কেবল জীবন রূপী এই তামসিক তাড়িয়ে-নিয়ে-বেড়ানো শক্তিই এভাবে তার চির-অতৃপ্ত আত্মতৃষ্ণা প্রকাশ করে চলে। তার প্রদান করা বিধান সর্বদা নির্দয়, সর্বদা অবৈধ, কারণ তা কখনোই জ্ঞানের কোনো খাঁটি উৎস থেকে নিঃসারিত নয়; কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে, স্বয়ং ন্যায়পরতা যদি বিধান প্রদান করত, তাহলে সে-ও এই একই বিধান দিত। ‘যা কিছু অস্তিত্বমান তা ধ্বংসযোগ্য, তাই কোনোকিছুর অস্তিত্ব না থাকলেই হতো ভালো।’ বেঁচে থাকা এবং ন্যায়ানুগ না হওয়া (বা বিধির বিপরীতে যাওয়া) যে কী মাত্রায় একই বস্তু তা ভুলে বেঁচে থাকতে পারা বিশাল শক্তিসামর্থ্যের ব্যাপার। স্বয়ং লুথার১৪ একবার বলেছিলেন যে ঈশ্বরের এক ফালি বিস্মরণপ্রবণ অবহেলার জন্যই কেবল বিশ্ব অস্তিত্বমান, কারণ ঈশ্বর যদি ‘ভারী যুদ্ধকামান’ পূর্বানুমান করতে পারতো তাহলে বিশ্ব সৃষ্টি করতো না। আবার কখনো, এই যে জীবনের বিস্মরণপ্রবণতা প্রয়োজন, সেই জীবনই বিস্মরণপ্রবণতার সাময়িক মুলতুবি দাবি করে; স্পষ্ট করে বুঝে নিতে চায় কোনোকিছু--- তা কোনো সুবিধা হোক, জাত বা শ্রেণি হোক, বা কোনো রাজবংশ হোক--- তার অস্তিত্ব কতোটা অন্যায়পর এবং কতোই না উচিত তার ধ্বংসসাধন। তখন নিজ অতীতকে সে সমালোচনাত্মকভাবে দেখে, নিজ শিকড় কাটতে ছুরি শানায়, সবরকম শ্রদ্ধাভক্তিকে নির্দয়ভাবে পায়ে দলে চলে। এই প্রক্রিয়া সর্বদাই বিপজ্জনক, বিশেষ করে স্বয়ং জীবনের জন্য তো বিপজ্জনক বটেই: যেসব মানুষ বা যেসব যুগ কোনো এক অতীতকে বিচার করা ও ধ্বংস করার মধ্য দিয়ে জীবনের সেবা করে, সেই মানুষরা বা যুগগুলো সবসময়েই বিপজ্জনক ও বিপর্যস্ত দুইই হয়ে থাকে। যেহেতু আমরা পূর্ববর্তী প্রজন্মগুলোর ফসল, আমরা সেই প্রজন্মদের ভ্রম, আবেগ, ভ্রান্তি, এমনকি অপরাধগুলোরও ফসল; তাই এই শৃঙ্খল থেকে নিজেদের পুরোপুরি মুক্ত করা সম্ভব নয়। পূর্ববর্তী ভ্রামগুলোকে চিহ্নিত ও নিন্দা করে নিজেদের তা থেকে মুক্ত ঘোষণা করলেও, সেই সমস্ত ভ্রম থেকেই যে আমাদের উৎপত্তি তার কোনো ব্যত্যয় হয় না। সবচেয়ে ভালো যা আমরা করতে পারি, তা হলো আমাদের জ্ঞান দিয়ে আমাদের এই উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত বংশগত প্রকৃতির বিরোধিতা করা, নতুন এক কঠোর নিয়মানুবর্তিতার মধ্য দিয়ে আজন্ম উত্তরাধিকারের বিরুদ্ধে লড়াই করা এবং নিজেদের মধ্যে নতুন এক অভ্যাস, নতুন এক প্রবৃত্তি, এক দ্বিতীয় প্রকৃতির বীজ বুনে এমনভাবে লালন করা যাতে আমাদের প্রথম প্রকৃতিকে শুকিয়ে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া যায়। এ হলো কার্য থেকে কারণ নির্মাণ করার অভিপ্রায় নিয়ে নিজেকে এমন এক অতীত প্রদান করার চেষ্টা, নিজ উৎসমূলের অতীতের তুলনায় বিকল্প যে অতীত আমার পছন্দসই--- এ প্রয়াস সর্বদাই বিপজ্জনক কারণ উৎসমূলের অতীত অস্বীকার করার সীমাকে জানা খুব কঠিন এবং দ্বিতীয় প্রকৃতি সাধারণত প্রথম প্রকৃতির থেকে দুর্বলতর হয়ে থাকে। অতি প্রায়শই এমন ঘটে থাকে যে ভালোটা কী তা জেনেও আমরা তা করি না, কারণ তার থেকেও ভালো কী সেটাও আমরা জেনে গেছি কিন্তু তা করার উপায় আমাদের নেই। কিন্তু এসব সত্ত্বেও এখানে-সেখানে কোনো-না-কোনো বিজয় হাসিল হয়, আর জীবনের স্বার্থে সমালোচনাত্মক ইতিহাস অস্ত্র করে যুযুধান যোদ্ধাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি সান্ত্বনাও বজায় থাকে: এটা জানার সান্ত্বনা যে এই প্রথম প্রকৃতিটিও একদা দ্বিতীয় প্রকৃতি ছিলো এবং প্রতিটি বিজয়ী দ্বিতীয় প্রকৃতিই একটি প্রথম প্রকৃতি হয়ে ওঠে।

 

 

জীবনের জন্য এই সেবাগুলোই ইতিহাস করতে পারে। প্রতিটি মানুষ এবং প্রতিটি জাতির নিজের লক্ষ্য, জীবনশক্তি ও চাহিদা অনুযায়ী অতীত সম্পর্কে এক বিশেষ ধরনের জ্ঞান প্রয়োজন হয়, কখনও তা স্মারকধর্মী ধাঁচার, কখনও প্রত্নতাত্ত্বিক ধাঁচার, আবার কখনও সমালোচনাত্মক ধাঁচার। কিন্তু এই প্রয়োজন এমন কোনো বিশুদ্ধ চিন্তকদের দঙ্গল দিয়ে মিটতে পারে না যারা কেবল দর্শক হিসেবে জীবনের উপর নজর রেখে যায়, জ্ঞান-চাতক হিসেবে কেবল জ্ঞানের মধ্যেই তৃপ্তি খুঁজে পায় আর জ্ঞান সঞ্চয় করাই যাদের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। বরং এই প্রয়োজন সর্বদা কেবলমাত্র জীবনের চাহিদা মেটানোর মধ্য দিয়েই মিটতে পারে, আর তাই জীবনের চাহিদা মেটানোর সর্বোচ্চ লক্ষ্য দ্বারা চালিত হলে তবেই কার্যকরী হয়। একটি যুগ, সংস্কৃতি বা জাতির তার ইতিহাসের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক যে এটাই, সেই সম্পর্ক যে ক্ষুধার দ্বারা উদ্দীপিত, চাহিদার ব্যাপ্তির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, তার সহজাত নমনীয় ক্ষমতাগুলোর দ্বারা গণ্ডীবদ্ধ--- অতীত সম্পর্কে জ্ঞান যে সর্বদাই ভবিষ্যৎ ও বর্তমানকে সেবা করার জন্যই কাঙ্খিত হয়েছে, বর্তমানকে কমজোরী করা বা ভবিষ্যতের শিকড় কেটে তার প্রাণশক্তির উৎস কেড়ে নেওয়ার জন্য কাঙ্খিত হয়নি: এ সবই অতি সরল কথা, সত্য যেমন সরল হয়ে থাকে, ঐতিহাসিক প্রমাণ দিয়ে প্রতিষ্ঠা না করলেও তা যে কোনো কারও কাছে স্বতঃসিদ্ধ বলেই মনে হবে।

তবে এখন আমাদের নিজেদের সময়কালের উপর একবার দ্রুত চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক! আমরা হতচকিত, আমরা কুঁকড়ে-গুটিয়ে থাকি: জীবন ও ইতিহাসের মধ্যে সম্পর্কের সেইসব স্বচ্ছতা, স্বাভাবিকতা ও শুদ্ধতা আমরা কোথায় হারিয়ে বসলাম? আমাদের চোখের সামনে এই সমস্যা কতো না অস্থির অতিরঞ্জিত চেহারায় ফুলেফেঁপে উঠছে!  গলদটা কী আমাদের নিজেদের মধ্যেই, যারা আমরা এভাবে দেখছি? নাকি জীবন ও ইতিহাসের তারাগুলোর অবস্থান ও সম্পর্ক তাদের মধ্যে এক মহাশক্তিধর বৈরী তারার অনুপ্রবেশের মধ্য দিয়ে প্রকৃতই পাল্টে গেছে? কেউ যদি পারে তো দেখাক যে আমাদের দেখাটাই গলদপূর্ণ, তা না হলে আমাদের দিক থেকে আমরা যা দেখছি বলে মনে করি তা-ই আমরা বলব। আর আমরা দেখছি যে সত্যিই একটি তারা, ঝলমলে গৌরবোজ্জ্বল এক তারা, তারামণ্ডলে অনুপ্রবেশ করে তারামণ্ডলটিকেই একেবারে পাল্টে দিয়েছে--- পাল্টে দিয়েছে বিজ্ঞানের নাম করে, এই দাবির মধ্য দিয়ে যে ইতিহাসকে একটি বিজ্ঞান হয়ে উঠতে হবে। অতীত সম্পর্কে জ্ঞানের উপর এখন আর কেবল জীবনের চাহিদাগুলোই শাসন করে না বা সীমা বেঁধে দেয় না: সমস্ত বাঁধ এখন ভেঙে ফেলা হয়েছে, আদৌ অস্তিত্বমান যতো কিছু যা কিছু সব ধেয়ে এসে মানবপ্রজাতিকে ঢেকে দিচ্ছে। পরিপ্রেক্ষিতকে সর্বত্র পিছু হটাতে হটাতে সমস্ত স্থিতসত্তার একেবারে সূচনাকালে নিয়ে গিয়ে ফেলা হয়েছে, পিছু ঠেলে অসীমে সেঁধিয়ে দেওয়া হয়েছে। সর্বজনীন স্থিতসত্তার বিজ্ঞানের রূপ ধরে ইতিহাস আজ যে বিশাল হতভম্বকারী প্রদর্শনী মেলে ধরেছে, তা এর আগে পূর্ববর্তী কোনো প্রজন্ম চাক্ষুষ করেনি; যদিও এই প্রদর্শনী সগর্বেই তার সর্বনাশা নীতিবাক্য সর্বসমক্ষে ঝুলিয়ে রেখেছে: fiat veritas, pereat vita (সত্যের জয় হোক, জীবন উচ্ছন্নে গেলে যাক)।

আর এইসব ব্যাপার আধুনিক মানুষের আত্মার মধ্যে যে আধ্যাত্মিক ঘটনাগুলো ঘটাতে শুরু করে দিয়েছে সেদিকে এবার ফিরে তাকানো যাক। অনিঃশেষ্য সব কুয়ো থেকে ঐতিহাসিক জ্ঞানের প্লাবনধারা অবিরত বয়ে চলেছে, অদ্ভুত ও অসংলগ্ন যাকিছু সব গায়ের জোরে এগিয়ে চলেছে, স্মৃতি তার সব দরজা খুলে দেওয়ার পরও যেনও আরো খুলে দেওয়া বাকি পড়ে আছে, এইসব আজব অতিথিদের গ্রহণ-আপ্যায়ন-বন্দোবস্ত করতে গিয়ে প্রকৃতি হাঁফিয়ে উঠছে, কিন্তু এইসব অতিথিরা নিজেদের মধ্যেই কোন্দলে ব্যস্ত, আর তাদের এই ঝগড়া কোন্দলের পাকে পড়ে নিজের অস্তিত্বটাই যদি হারিয়ে বসতে না হয়, তাহলে অতি প্রয়োজনীয় হলো তাদের ধরেবেঁধে নিয়ন্ত্রণ করা। এমন এক অবিন্যস্ত, ঝঞ্ঝাকুল এবং দ্বন্দ্বদীর্ণ পরিবারে অভ্যস্ত হয়ে ওঠা প্রায় দ্বিতীয় প্রকৃতি হয়ে দাঁড়ায়, যদিও এই দ্বিতীয় প্রকৃতি প্রশ্নাতীতভাবেই অনেক বেশি দুর্বল, অনেক বেশি অস্থির এবং প্রথম প্রকৃতির তুলনায় অনেক কম মৌলিক। শেষাবধি, আধুনিক মানুষ এক বিপুল পরিমাণ জ্ঞানের অপাচ্য নুড়ি-পাথর নিজের সঙ্গে ছেঁচড়ে বয়ে নিয়ে বেড়ায়, যেগুলোকে, সেই রূপকথার গল্পের মতো, তার ভিতরে গুড়গুড় শব্দ করতে শোনা যায়। আর এই গুড়গুড়ানি শব্দই আধুনিক মানুষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যটিকে প্রকাশ করে দেয়, সেই বৈশিষ্ট্যটি হলো: ভিতরের তল যা কোনো বাইরের তলের অনুরূপ হয়ে উঠতে পারে না, আর বাইরের তল যা কোনো ভিতরের তলের অনুরূপ হয়ে উঠতে পারে  না--- ভিতর ও বাইরের তলের এই বৈপরীত্য পূর্ববর্তী যুগের মানুষদের কাছে অজানা ছিল। কোনো রকম জ্ঞানক্ষুধা ছাড়াই এবং সম্পূর্ণ অদরকারে, বা নিজের দরকারের বিপরীতে, এখন বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মানুষ জ্ঞান গিলে চলেছে, এভাবে গলাধঃকরণ করা জ্ঞান আর এখন বহির্বিশ্বকে রূপান্তরিত করার উপায় হিসেবে কাজ করে না, বরং এক বিস্রস্ত অন্তর্জগতে মুখ লুকিয়ে পড়ে থাকে, আর এই বিস্রস্ত অন্তর্জগতটিকেই আধুনিক মানুষ নিজের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ অন্তর্মুখিনতা বলে অবাক-করা গর্বের সঙ্গে বর্ণনা করে যেতে থাকে। তখন বলা হতে থাকে যে আধেয়টা দখলেই রয়েছে, কেবল আধারটারই অভাব; কিন্তু জীবন্ত প্রাণীদের ক্ষেত্রে এমন এক বিরোধাভাস প্রযুক্ত হওয়ারই উপযুক্ত নয়। আর ঠিক এই কারণেই আমাদের আধুনিক সংস্কৃতি জীবন্ত নয়, ওই বিরোধাভাস ছাড়া তা চলতে পারে না, প্রকৃত সংস্কৃতি হওয়ার বদলে তা কেবল সংস্কৃতি সম্পর্কে এক ধরনের জ্ঞানরূপ হয়েই থাকে, সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা ও অনুভূতি তার থাকে কিন্তু তা থেকে কোনো প্রকৃত সাংস্কৃতিক অর্জন উৎসারিত হতে পারে না। বরং অন্যদিকে, যা তাকে অনুপ্রাণিত করে ও তারপর ক্রিয়ারূপে দৃশ্যমানও হয়ে ওঠে, তার তাৎপর্য প্রায়শই নির্বিকার প্রথানুগমন, হতশ্রী অনুকরণ বা এমনকি কাঁচা ব্যঙ্গচিত্র-এর পর্যায় পেরোতে পারে না। অতএব সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতা নীরবে গা এলিয়ে ভিতরে পড়ে থাকে, যেনবা বহু খরগোশ গিলে ফেলা এক সাপ সমস্ত অতিরিক্ত নড়াচড়া এড়িয়ে রোদে গা মেলে পড়ে আছে। ভিতরের প্রক্রিয়াটাই তখন আসল জিনিস হয়ে ওঠে, প্রকৃতার্থে তা-ই হয়ে ওঠে ‘সংস্কৃতি’-র উপাদান। তাকে দেখতে দেখতে যে কারও মনে একটাই আর্তি জেগে উঠবে: বেচারা সংস্কৃতি যেন বদহজমের প্রকোপে মারা না যায়! কল্পনা করে নেওয়া যাক যে ধ্রুপদী কালের কোনো গ্রিক এহেন এক সংস্কৃতি পর্যবেক্ষণ করছেন: তাঁর কাছে মনে হবে আধুনিক মানুষের কাছে ‘শিক্ষিত’ এবং ‘ইতিহাসে শিক্ষিত’ এতোই একসাথে মিশে গেছে যে তাদের অর্থ একই দাঁড়িয়ে গেছে, উচ্চারণের ফারাকটুকুই কেবল পড়ে আছে। তখন যদি সেই গ্রিক বলে বসেন যে একজন ইতিহাসে সম্পূর্ণ অশিক্ষিত হয়েও খুবই শিক্ষিত হতে পারে, আধুনিক মানুষেরা ভুল শুনছে ভেবে কেবল মাথা নাড়তে থাকবে। এই যে সুপ্রসিদ্ধ জাতি--- খুব একটা দূর অতীতের নয়, আমি এই গ্রিকদের কথাই বলছি--- তাদের সর্বোচ্চ শক্তির পর্যায়ে তাদের ইতিহাস-নিরপেক্ষ স্বজ্ঞাকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে রেখেছিলো; জাদুবলে কোনো আধুনিক মানুষ যদি তাদের জগতে গিয়ে উপস্থিত হয়, তবে সেই আধুনিকের কাছে গ্রিকদের নেহাতই ‘সংস্কৃতিহীন অসভ্য’ বলে মনে হতে পারে। আর এর মধ্য দিয়েই আমাদের এত যত্ন করে লুকিয়ে রাখা আধুনিক সভ্যতার গোপন কথাটা লজ্জাকরভাবে ফাঁস হয়ে যাবে: কারণ আমাদের, আধুনিকদের, তো এমন কিছুই নেই যা আমরা আমাদের নিজেদের স্বকীয় বলতে পারি; অপরদের যুগ, রীতি, কলা, দর্শন, ধর্ম এবং আবিষ্কার প্রতিনিয়ত আহরণ করে ও ঠেসে নিজেদের মধ্যে পুরেই কেবল আমরা লক্ষ্যণীয় হয়ে উঠি, অর্থাৎ, বলতে গেলে, চলমান বিশ্বকোষ হয়ে উঠি--- আমাদের যুগে জাদুবলে হাজির হওয়া কোনো প্রাচীন গ্রিকও হয়তো আমাদের চলমান বিশ্বকোষ হিসেবেই দেখতো। বিশ্বকোষের সমস্ত মূল্য নিহিত তার আধেয়তে, অর্থাৎ তার ভিতরে যা আছে তাতে, বাইরের চেহারায় নয়, বাঁধাই বা প্রচ্ছদে নয়; আর সেইজন্যই আধুনিক সংস্কৃতির গোটাটাই অন্তর্মুখী; তার মলাটে বাঁধাইখানা থেকে এমন এক শিরোনামা ছেপে দেওয়া হয়েছে: ‘বহির্মুখে যারা বর্বর তাদের জন্য অন্তর্মুখী সংস্কৃতির সারগ্রন্থ’। ভিতর ও বাহিরের এই বিরোধ বাহিরকে কার্যত আরো বর্বর করে তোলে; যদি একটা রূঢ় জাতি কেবলমাত্র নিজেদের বিতিকিচ্ছিরি চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই নিজে থেকে বিকশিত হয়ে উঠতো, এমনকি তার চেয়েও বর্বর। কারণ, তার উপর এহেন মহা বাহুল্যে যা চেপে বসেছে, তা কাটিয়ে ওঠার জন্য কী উপায় প্রকৃতির কাছে থাকতে পারে? একটাই উপায়:  যতো আলতো করে পারা যায় তাকে ধরে যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি আবার বাইরে নিক্ষেপ করা। এর থেকেই বাস্তব বিষয়আশয়কে আর গুরুত্ব সহকারে না নেওয়ার অভ্যাস জন্মায়, এর থেকেই সেই ‘দুর্বল ব্যক্তিত্ব’ গড়ে ওঠে যার উপর বাস্তব-অস্তিত্বমান কেবলমাত্র একটি হালকা ছাপই ফেলে যেতে পারে; এভাবে নিজের বাইরের উপস্থিতি ক্রমাগত আরো অবহেলার বিষয় হয়ে ওঠে, আর, স্মৃতি যদি জানার যোগ্য নতুন বিষয়আশয়ের ধারায় অনবরত উদ্দীপিত হতে থাকে, যে বিষয়আশয়গুলোকে আবার সাজিয়েগুছিয়ে সিন্দুকবন্দি করে রাখা যায়, তাহলে কেউ আধার এবং আধেয়র অন্তর্বর্তী অনিশ্চিত খাদটিকে বর্বরতার প্রতি চূড়ান্ত সংবেদনহীনতা অবধি প্রশস্ত করে ফেলতে পারে। একদা এই বর্বরতার বিরোধী জনসংস্কৃতি রূপে জনমানুষের জীবনের অভিব্যক্তিতে নান্দনিক শৈলীর ঐক্য সংজ্ঞাত করা হয়েছিলো, আমার মনে হয় এই সংজ্ঞায়ন কিছুটা যথার্থই ছিল, কিন্তু এই সংজ্ঞায়নকে ভুলভাবে বুঝে বর্বরতা এবং উত্তম শৈলী-র মধ্যে সদাবিরোধ কল্পনা করে বসা উচিত হবে না; এখানে এটাই বোঝানো হচ্ছে যে সংস্কৃতির ধারক হতে পারে এমন মানুষদের সর্ববাস্তবতায় একটি একক প্রাণময় ঐক্য হতে হবে, শোচনীয়ভাবে ভেঙে পড়ে ভিতর ও বাহির, আধার ও আধেয় আলাদা হয়ে পড়ে থাকলে হবে না। জনগণের সংস্কৃতিকে তুলে ধরার জন্য যদি কেউ অভিপ্রায়ী ও উদ্যোগী হয়, তাহলে তাকে এই উচ্চতর ঐক্যের জন্য অভিপ্রায়ী ও উদ্যোগী হতে হবে এবং একটি প্রকৃত সংস্কৃতির স্বার্থে আধুনিক মেকি সংস্কৃতিপরায়নতাকে ধ্বংস করার কাজে হাত লাগাতে হবে; ইতিহাস পাঠ ও চর্চা করতে করতে স্বাস্থ্য খুইয়ে ফেলা মানুষজনের স্বাস্থ্যোদ্ধার কীভাবে করা যায়, কীভাবে এই জনগণ তার প্রবৃত্তি ও স্বজ্ঞা পুনরুদ্ধার করে তার ফলস্বরূপ আবার নিজ সততা ফিরে পায়---  ভাবতে হবে সেই ভাবনাও।

এবার বরং সোজাসুজি আমাদের নিজেদের, অর্থাৎ, হাল আমলের জার্মানদের কথা বলা যাক। অন্য যে কোনো জাতির চেয়ে আমরা, এই হাল আমলের জার্মানরা, ওই ব্যক্তিত্বের দুর্বলতা ও আধার-আধেয় দ্বন্দ্বের দ্বারা অনেক বেশি পীড়িত। সাধারণত আমাদের কাছে আধার (form) একটি প্রথা, একটি আনুষ্ঠানিক পোশাক বা ছদ্মবেশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে, আর সেইজন্যই, ঘৃণার পাত্র যদিবা না-ও হয়, ভালোবাসার পাত্র হয় না মোটেই। আরো বুঝি সঠিকতোর হবে যদি বলা হয় যে ‘প্রথা’ শব্দটি এবং বস্তুটিকে নিয়েও আমাদের মধ্যে এক অদ্ভুত ভয় কাজ করে চলে। এই ভয়ের তাড়নাতেই জার্মানরা ফরাসীদের পাঠশালা ত্যাগ করেছিলো: সে চেয়েছিল আরো স্বাভাবিক এবং তার মধ্য দিয়ে আরো বেশি জার্মান হয়ে উঠতে। কিন্তু এই ‘তার মধ্য দিয়ে’ হিসাবটাতেই ভুল হয়ে গিয়েছিলো: প্রথার পাঠশালা থেকে পালানোর পর সে তার খামখেয়ালমতো যেভাবে খুশি ভেসে চলল। প্রকৃত অর্থে যা ঘটলো তা এই: আগে যা সে চরম নিষ্ঠাভরে, কখনো কখনো সাফল্যের সঙ্গে, অনুকরণ করত, এখন সেটাই সে ঢিলেঢালাভাবে আধো বিস্মৃতিতে ডুবে করে চললো। তার ফলস্বরূপ এটাই ঘটেছে যে অতীত যুগের তুলনায় আজও আমরা ফরাসী প্রথার বাজে-ভাবে-করা ভুলে-ভরা এক প্রতিলিপির মধ্যে বাস করে চলেছি: আমাদের সমস্ত যাওয়া-আসা, কথাবার্তা, পোশাক-আশাক, হাবভাব, ঘর-বার তার সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। আমরা ভেবেছিলাম যে আমরা স্বাভাবিকতার মধ্যে ফিরে যাচ্ছি, কিন্তু প্রকৃত অর্থে আমরা আত্মসংযমকে ছিটে-ফোঁটায় কমিয়ে এনে আরাম-আয়াসে গা ভাসিয়েছি। যে কোনো একটা জার্মান নগরের মধ্য দিয়ে খানিক পায়চারি করে দেখুন--- বিদেশের যে কোনো শহরে পরিব্যপ্ত হয়ে থাকা বৈশিষ্ট্যপূর্ণ জাতীয় সূচকগুলোর তুলনায় এখানকার প্রথাগুলো সব-ই নেতিবাচক; সবকিছুই যেন রঙচটা, ক্ষয়ধরা, অবহেলার ছাপে ভরা বাজে প্রতিলিপি; সবাই যা খুশি তাই করছে, কিন্তু তার এই ‘খুশি’ কখনোই সুবিবেচিত নয়, জবরদস্তও নয়, বরং ম্রিয়মানভাবে সেইসব নিয়মের অনুসারী, যে নিয়মগুলো পর্যায়ক্রমে সর্বগ্রাসী তাড়াহুড়ো এবং আয়াস-আরামের জন্য সর্বগ্রাসী হ্যাংলামো থেকে তৈরি হয়েছে। যে পোশাকের নকশা তৈরি করতে কোনো বুদ্ধিবৃত্তির দরকার পড়ে না আর গায়ে চরিয়ে নিতেও কোনো সময়ই প্রায় লাগে না, অর্থাৎ, এমন এক পোশাক যা বিদেশ থেকে ধার করে এনে যতোটা হেলাফেলায় সম্ভব অনুকরণ করে নেওয়া হয়েছে, তা-ই এখন জার্মানদের কাছে তাদের নিজস্ব জাতীয় পোশাক নির্মাণে একটি অবদান রূপে বিবেচিত হচ্ছে। আধারের বোধ বিন্দুমাত্র সংশয় ছাড়াই পরিত্যাগ করা হয়েছে--- কারণ আমরা যে আধেয়-র বোধের অধিকারী: কারণ, আর যাই হোক না কেন, জার্মানরা তো তাদের প্রগাঢ় অন্তর্মুখীনতার জন্যই প্রসিদ্ধ!    

কিন্তু এই অন্তর্মুখীনতার সঙ্গে একটি প্রসিদ্ধ বিপদও জড়িয়ে থাকে: স্বয়ং আধেয়, যা বাইরে থেকে দেখা যায় না বলে ধরে নেওয়া হয়, তা মাঝেমধ্যে উবে যেতে পারে এবং বাইরে থেকে তার সেই পূর্ব উপস্থিতি ও বর্তমান অনুপস্থিতি কিছুই দেখা যায় না। এই বিপদ থেকে বর্তমানের জার্মান মানুষদের দূরত্ব বা নৈকট্য যা-ই আমরা কল্পনা করি না কেন, বিদেশীরা যদি দাবি করে যে আমাদের ভিতরটা এতই দুর্বল ও অগোছালো যে বাইরে কোনো প্রভাব ফেলা বা স্বকীয় একটি আধার অর্জন করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়, তাহলে সেই বিদেশীদের কথার মধ্যে কিছুই সারবত্তা নেই বলা যাবে না। জার্মানদের ভিতরটা ব্যতিক্রমী রকমেই গ্রহিষ্ণু: তা ঐকান্তিক, ক্ষমতাশালী, সুগভীর এবং হয়তো বা অন্য অনেক জাতির মানুষদের চেয়ে সমৃদ্ধও, কিন্তু সামগ্রিকভাবে তা দুর্বল কারণ ওই সমস্ত সুন্দর সুতোগুলো একসঙ্গে করে একটা জোরদার গিঁট দিয়ে বাঁধা নেই--- এর ফলে দৃশ্যমান ক্রিয়া আর ক্রিয়া হয়ে ওঠে না, ভিতরকে সম্যকভাবে আত্মপ্রকাশিতও করে না, বরং অগ্রন্থিত কোনো না কোনো সুতোর একার নিজেকে সমগ্র বলে হাজির করার আস্ফালন আকাঁড়া দুর্বলভাবে প্রতীয়মান হয়। এই জন্যই কোনো জার্মানকে তার কাজ দিয়ে বিচার করা সম্ভব নয় এবং ক্রিয়া করার পরও সে পুরোপুরি অন্তরালেই থেকে যায়। এটা এখন সুপ্রসিদ্ধ হয়ে গেছে যে একজন জার্মানকে বিচার করতে হবে তার চিন্তা ও অনুভূতি দিয়ে, আর আজকাল সে এটাই তার বইপত্রেও প্রকাশ করে চলেছে। আর এই বইপত্রগুলোই এখন, আগের যেকোনো সময়ের থেকে অনেক বেশি, এই সন্দেহ জাগিয়ে তোলে যে সেই প্রসিদ্ধ গুপ্ত অন্তর্মুখীনতা সত্যিই কি তার সেই ধরা-ছোঁয়ার-বাইরে ক্ষুদ্র মন্দিরে এখনও অবশিষ্ট আছে? এই সন্দেহকে ধর্তব্যের মধ্যে না আনলেও এই ভয়ানক চিন্তা এড়িয়ে যাওয়া যায় না যে কোনো একদিন হয়তো সেই গুপ্তবস্তু উধাও হয়ে যাবে এবং জার্মানদের কাছে আত্মচিহ্ন হিসেবে তার গর্বোন্মত্ত আনাড়ী অথচ বশংবদ অলস বাইরেটাই কেবল পড়ে থাকবে। বুঝি বা সেই গুপ্ত অন্তর্মুখীনতা মিথ্যায় পরিণত হয়ে ভেক ধরে রঙ চড়িয়ে ঘাপটি মেরে বসে আছে, ভণ্ড অভিনেতায় পরিণত হয়েছে, যদি বা আরো খারাপ কিছু না হয়ে থাকে--- এ এমনই এক ভয়ের কথা। গ্রিলপার্জার, একজন স্বাধীন পর্যবেক্ষক হিসেবে, থিয়েটারের জগতে তাঁর অভিজ্ঞতা থেকে এমনই সারসংকলন করেছেন। তিনি বলেছেন: ‘আমাদের অনুভূতি বিমূর্ততায় বিচরণ করে, আমাদের সমকালীনদের মধ্যে অনুভূতি প্রকৃতই কীভাবে নিজেকে প্রকাশ করে তা আমাদের কাছে প্রায় অজানা হয়ে উঠেছে, আজকাল আর যে সমস্ত ক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সে প্রকাশিত হয় না সেগুলো অভিনয় করার মধ্য দিয়েই আমরা অনুভূতি প্রকাশ করার চেষ্টা করে যাই। শেক্সপিয়র আমাদের আধুনিকদের ধ্বংস করে ছেড়েছে।’

একক উদাহরণ থেকে হয়তোবা এখানে অতি দ্রুততায় সাধারণীকরণ করা হয়েছে, কিন্তু এই সাধারণীকরণ যদি যথার্থ হয়ে থাকে, আলাদা আলাদা ঘটনাগুলো যদি পর্যবেক্ষকের উপর দঙ্গল বেঁধে চেপে বসে, তবে কী ভয়ানকই না তা হবে, কতো না বিষাদময় তা হবে যদি বলতে হয়: আমরা জার্মানরা বিমূর্ততা দিয়েই অনুভব করি, ইতিহাস আমাদের সবাইকে ধ্বংস করেছে--- এ হবে এমন এক ঘোষণা যা ভবিষ্যৎ কোনো জাতীয় সংস্কৃতির আশাকে শিকড়মূলেই ধ্বংস করে দেবে, কারণ তেমন কোনো আশা তো জার্মান অনুভূতির অকৃত্রিমতা ও প্রত্যক্ষতার উপরই নির্ভর করে, প্রকৃত ও অখণ্ড অন্তর্মুখীনতায় বিশ্বাসের উপর নির্ভর করে। আশা ও বিশ্বাসের উৎস যদি কাদায় ভরে যায়, অন্তর্মুখীনতা যদি কেবল বিমূর্ততার ভাষাতেই হিসাব কষে লাফিয়ে, নেচে, নিজেকে অতিরঞ্জিত করে আত্মপ্রকাশ করা শিখে ফেলে এবং তার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে নিজেকে হারিয়ে ফেলতে থাকে, তাহলে আর আশা বা বিশ্বাস করার মতো কী-ই বা পড়ে থাকে! একতায় বাঁধা অন্তর্মুখীনতার নিরাপদ আশ্রয় যে খুইয়ে বসেছে, একদিকে অপশিক্ষিত ও বিপথে-চালিত অন্তর্মুখীনতা প্রসূত এক মার্জিত পরিসরে আর অপরদিকে অনধিগম্য অন্তর্মুখীনতার অমার্জিত পরিসরের মধ্যে টুকরো টুকরো হয়ে যে ভেঙে পড়েছে, সেই জনমানুষের মধ্যে মহান জননক্ষম আত্মা কী করেই বা আর টিকে থাকতে পারে! জনমানুষের মধ্যে অনুভূতির ঐক্য যদি হারিয়ে যায়, আর তার উপরে যদি এটা জানা হয়ে গিয়ে থাকে যে জাতীয় নান্দনিক চৈতন্যের অধিকারী হওয়ার দাবিদার স্বঘোষিত সংস্কৃতিবান জনগোষ্ঠীর মধ্যেই এই অনুভূতি মেকী ভুয়ো চেহারা নিয়ে বসে আছে, তাহলে সেই জননক্ষম আত্মা টিকে থাকবেই বা কী করে? এমনকি যদি হেথায় হোথায় কোথাও কোনো এক ব্যক্তির রুচি ও বিচারশক্তি তুলনায় সূক্ষ্মতর ও পরিশোধিত হয়ে ওঠে, তাতেও তার কোনো সুবিধা হয় না: সে যে আর তার জাতির দেহমধ্যে আর প্রয়োজনীয় নয় এবং তার স্বর যে কোনো ক্ষুদ্র উপদল বা সম্প্রদায়ের মধ্যেই বন্দী, এই বোধ তাকে নিষ্পেষিত করতে থাকে। তার হৃদয় যখন সবার জন্য সহানুভূতিতে ভরা, তখন ক্ষুদ্র এক উপগোষ্ঠীর দ্বারা দর্পিত পৃষ্ঠপোষকতার পাত্র হয়ে থাকার অনীহা হয়তো তাকে তার রত্নগুলো সর্বসমক্ষে না এনে নিজের মধ্যেই পুঁতে রাখার দিকে ঠেলে দেয়। জাতির স্বজ্ঞা আর দুহাত বাড়িয়ে তাকে অভ্যর্থনা করতে এগিয়ে আসে না, সে নিজে সাধ করে দুহাত বাড়িয়ে এগিয়ে গেলেও তা পণ্ডই হয়। তার জাতির তথাকথিত সংস্কৃতিতে এই যে বেড়াগুলো বাঁধা হয়েছে, বাধা নির্মাণ করা হয়েছে, যা প্রাণের সৃষ্টিময়তা ও উচ্ছলতাকে ধ্বংস-অধঃপতনের দিকে নিয়ে যায়, সেসবের বিরুদ্ধে তার উদ্দীপিত ঘৃণাবর্ষণ করা ছাড়া তখন আর তার কী-ই বা করার থাকে! আর সেভাবেই সে গভীর অন্তর্দৃষ্টিতে ফুটে ওঠা নিয়তির আদলের বিনিময়ে সৃষ্টি-নির্মাণের ঐশ্বরিক আনন্দ আহরণ করে নেয় এবং প্রজ্ঞাবান তৃপ্ত তাপসের একাকীত্বে অবসিত হয়। এই দৃশ্য যার চোখে ধরা পড়ে, তার কাছে এর থেকে যন্ত্রণাময় আর কিছু হতে পারে না, এক পবিত্র তাড়না তাকে অস্থির করে তোলে: এর কিছু বিহিত করতেই হবে, প্রকৃতি ও জনমানুষের আত্মার মধ্যে উচ্চতর সেই বন্ধনটিকে ফের কষে বাঁধতে হবে, প্রয়োজনের হাতুড়ি-ঘা মেরে ভিতর ও বাহিরের মধ্যে হাঁ-করে-ওঠা ফাটলটিকে আবার জুড়ে দিতে হবে। কিন্তু কী হাতিয়ার সে এজন্য ব্যবহার করতে পারে? কী-ই বা তার আছে কেবল তার গভীরতম অন্তর্দৃষ্টি ছাড়া? দুই হাতে সেই অন্তর্দৃষ্টির বীজ ছড়িয়ে বপন করতে করতে সে কেবল একটি চাহিদা রোপণ করার আশাই করতে পারে: আর তেজীয়ান এক প্রয়োজনের মধ্য থেকেই কোনোদিন হয়তো জোরালো কোনো আয়োজন উঠে আসবে। আর সেই প্রয়োজন, চাহিদা, উপলব্ধির উৎস সম্পর্কে আমার দেওয়া উদাহরণ নিয়ে কোনো ধোঁয়াশা না রাখার জন্য, বলে নেওয়া যাক যে সর্বোচ্চ অর্থের জার্মান ঐক্যের জন্যই আমরা চেষ্টা করে চলেছি, রাজনৈতিক পুনর্ঐক্যসাধনের থেকেও এর গুরুত্ব আমাদের কাছে বেশি, আধার এবং আধেয়র বিরোধ বা অন্তর্মুখীনতা এবং প্রথার বিরোধ--- এহেন বিরোধগুলোকে লুপ্ত করে জার্মান চৈতন্য ও জীবনের ঐক্য অর্জন করাই আমাদের অভিপ্রায়।

 

 

কোনো একটি কালপর্যায় ইতিহাস দিয়ে অতি পরিপৃক্ত হয়ে উঠলে তা পাঁচ ভাবে জীবনের জন্য বিপদজনক হয়ে ওঠে বলে আমার মনে হয়: এহেন বাহুল্য ভিতর ও বাহিরের মধ্যে সেই বিরোধ তৈরি করে যা আমরা সদ্য আলোচনা করেছি এবং তার মধ্য দিয়ে ব্যক্তিত্বকে দুর্বল করে তোলে; তা সেই সময়কালকে এমন এক আত্মম্ভরীতায় মগ্ন করে তোলে যেনবা অন্য যেকোনো যুগের তুলনায় বিরলতম গুণাবলী ও ন্যায়পরতা অধিকতর পরিমাণে তারই অধিগত; জনমানুষের স্বজ্ঞাকে তা ব্যাহত করে এবং গোষ্ঠীর মতো ব্যক্তির পরিপক্কতা-অর্জনের পথেও বাধা হয়ে দাঁড়ায়; তা সবসময়ে ক্ষতিকর এই বিশ্বাস রোপণ করে চলে যে মানবপ্রজাতি তার বৃদ্ধাবস্থায় আগত, আমরা কেবল দেরি করে আসা নিকৃষ্ট অনুকরণকারী মাত্র; তা একটি যুগকে নিজেকে নিয়ে ব্যঙ্গ-শ্লেষ করার বিপজ্জনক অভ্যাসে মজে গিয়ে আরো বিপজ্জনক সর্বনিন্দাপরায়ণতায় ডুবে যেতে প্রবৃত্ত করে, এই ডুবে যেতে যেতে অবশ্য এমন এক বিচক্ষণ ব্যবহারিক আত্মসর্বস্বতাবাদ ক্রমশ দানা বাঁধতে থাকে যা জীবনকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত করে অচিরেই ধ্বংস করে।

এখন আবার আমাদের প্রথম প্রস্তাবটায় ফিরে যাওয়া যাক: দুর্বল ব্যক্তিত্ব হলো আধুনিক মানুষের রোগ। সাম্রাজ্যের যুগের রোমানরা যেমন তার সামনে প্রণিপাত করে থাকা বিশ্বের সাপেক্ষে অ-রোমান হয়ে উঠেছিলো, বন্যার মতো ধেয়ে আসা বিদেশীদের প্লাবনে নিজেদের হারিয়ে ফেলেছিলো, ঈশ্বর-নান্দনিকতা-আচার-এর বিশ্বজনীন প্রমোদমেলায় গেঁজে পচে যেতে থেকেছিলো, সেই একই পরিণতি অপেক্ষা করে আছে সেইসব আধুনিক মানুষদের জন্য যারা হালের ইতিহাস-বিষয়ক কলাবিদদের বিশ্ব-প্রদর্শনী আয়োজন করায় উৎসাহিত করে চলেছে। এহেন আধুনিক মানুষ যেন হালকা মেজাজে ভ্রাম্যমান এক দর্শকে পরিণত হয়েছে, তার দশা এমন হয়েছে যে বিরাট যুদ্ধ ও বিপ্লবের প্রভাবও তার মনে এক পলকের বেশি স্থায়ী হতে পারে না। যে কোনো যুদ্ধ এমনকি শেষ হওয়ার আগেই হাজার হাজার ছাপা কাগজে রূপান্তরিত হয়ে ইতিহাস-বুভুক্ষুদের ক্লান্ত রসনা তৃপ্ত করার জন্য সর্বশেষ স্বাদু-খাদ্য হিসেবে পরিবেশিত হয়। যেনবা বাদ্যযন্ত্রটির এমন হাল হয়েছে যে যতো প্রাণপণেই তা বাজাও না কেন তা আর কোনো ঝঙ্কার তুলতে পারে না: মৃদুতান অবিলম্বে নিঃশেষিত হয়ে গিয়ে এক দুর্বল ইতিহাসগত প্রতিধ্বনিতে মিইয়ে যায়। বস্তুত, মহৎকে ধরে রাখার ক্ষমতা তোমার আর নেই, তোমার সব কাজই এখন ক্ষণস্থায়ী বিস্ফোরণমাত্র, কোনোটাই আর ঘূর্ণমান বজ্রনির্ঘোষ নয়। সবচেয়ে বড় আর সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনাও যদি ঘটে যায়, তারও অনিবার্য গতি হবে নিস্তব্ধ অখ্যাতির নরকে পতন। কারণ, তুমি যখন ইতিহাসের শামিয়ানার নিচে তোমার সব কান্ডকারখানা তক্ষুনি লুকিয়ে ফেলো, শিল্পকলা তখন সেখান থেকে পালিয়ে বাঁচে। যে অবোধ্য মহত্ত্বের মুখোমুখি সমীহভরে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, তাকে এক মুহূর্তে বুঝে নিয়ে করায়ত্ত ও মূল্যায়ন করতে চায় যেজন, তাকে কেউ যুক্তিবাদী বলতে পারে, কিন্তু তা হবে কেবল সেই অর্থেই বলা যে অর্থে শিলার যুক্তিবাদী মানুষের যুক্তিবাদিতা নিয়ে বলেছিলেন: শিশুও দেখতে পায় এমন জিনিস সে দেখতে পায় না, শিশুও শুনতে পায় এমন জিনিস সে শুনতে পায় না, আর ঠিক যে জিনিসগুলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেই জিনিসগুলোকেই সে বোঝে না, তাই তার বোঝাবুঝি শিশুর চেয়েও শিশুসুলভ, সরলতার চেয়েও সরল--- যতোই সে তার কাগুজে পুঁথিকে চালাকি করে ভাঁজ করুক না কেন, আর জট ছাড়ানোর কুশলতায় আঙুলগুলোকে দক্ষ করে তুলুক না কেন! কারণ সে তার স্বজ্ঞাকে ধ্বংস করে বসেছে এবং যুক্তি যখন হোঁচট খেয়ে পড়ে আর তার অবলম্বিত পথ মরুভূমিতে পাক খায়, তখনও সে ‘ঈশ্বরী জীব’-এর প্রতি আস্থা হারিয়ে বসার ফলে তার লাগাম আলগা করতে পারে না। সুতরাং সেই ব্যক্তি দুর্বলচিত্ত ও আস্থাহীন হয়ে পড়ে, নিজেকেও ভরসা করতে পারে না, নিজের অন্তর্গহনে নিজেই ডুবে মরে। তার নিজের অন্তর্গহন বলতে এখানে তার ভিতরে স্তূপীকৃত হয়ে জমে ওঠা সেইসব শিক্ষার কথা বলা হয়েছে যাদের বহির্জগতে কোনো তাৎপর্য নেই, সেইসব প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অভ্যাসের কথা বলা হয়েছে যেগুলো জীবন হয়ে উঠতে পারেনি। যদি কেউ তাকে বাইরে থেকে খেয়াল করে, দেখতে পাবে কীভাবে ইতিহাসের দ্বারা প্রবৃত্তির বিতাড়ন মানুষকে কেবলমাত্র একটা বিমূর্তায়ন বা ছায়াবিশেষে পরিণত করেছে, সেই মানুষের সাহস নেই নিজ স্বরূপে হাজির হওয়ার, সে কেবল একের পর এক মুখোশ বদলে যায়--- কখনও সংস্কৃতিবান মানুষের মুখোশ, কখনও বিদ্বানের মুখোশ, কখনও কবির মুখোশ, আবার কখনও রাজনীতিবিদের মুখোশ। যদি কেউ একবার এইসব মুখোশখেলাকে মুখোশখেলা না ভেবে সে খেলার ঐকান্তিকতার ভান বিশ্বাস করে বসে মুখোশগুলোকে হাতে ধরে, তখুনি সেই মুখোশগুলোয় আর ছেঁড়া নেকড়া ও দড়িদড়া ছাড়া আর কিছু অবশিষ্ট থাকে না। তাই ওদের ভড়ং-এ আর বিশ্বাস না করে সোজাসুজি আদেশ করা উচিত: ‘সাজগোজ খোলো তো বাপু, তুমি যা তা-ই হও এবার!’ এটা আর সহ্য করে যাওয়া যায় না যে উচ্চমার্গীয় আন্তরিকতা সম্পন্ন সব মানুষই কেবল ডন কিহোতে১৫ হয়ে উঠবে কারণ ওই রকম ভ্রান্ত বাস্তবতার পিছু ধাওয়া করে হেদিয়ে বেড়ানোর চেয়ে অনেক ভালো কিছু সে করতে পারে। কিন্তু তার জন্য তাকে বিচক্ষণ খেয়াল রাখতে হবে, যখনই কোনো মুখোশ তার সামনে এসে ‘কে যায়? থামো বলছি!’ বলে হুকুম ছুঁড়বে, তখনই সেই মুখোশ ছিঁড়ে মুখটাকে আদুল করে দিতে হবে। লোকে ভাবে যে ইতিহাস মানুষকে সততার দিকে ঠেলবে--- কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো যে সৎ হলেও, তা কেবল সৎ নির্বোধ-ই করে তোলে, এখনও অবধি এটাই তার প্রভাব দাঁড়িয়েছে। কিন্তু আর তা হতে দেওয়া যায় না। ইতিহাস-শিক্ষা এবং বুর্জোয়াদের অন্তঃসারশূন্য সাজ-বহর একই কথা। ‘মুক্ত ব্যক্তিত্ব’এতো সরবে প্রশংসিত হতে আগে কখনও দেখা যায়নি, অথচ চারধারে আর কোথাও কোনো ব্যক্তিত্বেরই দেখা মেলে না, মুক্ত ব্যক্তিত্ব তো দূরের কথা, চারধারে কেবল অতি সাবধানে চাপাচুপি দেওয়া সমসত্ত্ব মানুষের ভিড়। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য যে ভিতরে কোথায় গিয়ে মুখ লুকিয়েছে, বাইরে থেকে তাকে দেখাই যায় না--- এর থেকে এই প্রশ্নই জাগে যে প্রভাব ছাড়া কোনো কারণ হতে পারে কি না। নাকি মহান ঐতিহাসিক বিশ্ব-হারেম দেখভাল করার জন্য খোজাদের এই দঙ্গল দরকার হয়ে পড়েছে? নিখাদ বিষয়গত নির্ধারণ তেমন এক দঙ্গল-চরিত্রকেই হাজির করবে। কারণ ব্যাপারটা প্রায় এমন দাঁড়িয়েছে যে ইতিহাসের উপর নজরদারি কায়েম করা কর্তব্য হয়ে উঠেছে যাতে ইতিহাসের মধ্য থেকে একইরকম আরো ইতিহাস ছাড়া আর কিছু বের না হতে পারে, আর প্রকৃত যতো ঘটনা তা যেন কখনোই সামনে না আসে, ইতিহাস যেন কোনো ব্যক্তিত্বকে ‘মুক্ত’ হওয়ার ইন্ধন না দিয়ে বসে, অর্থাৎ, কথায় ও কাজে নিজের প্রতি ও অপরদের প্রতি সত্যনিষ্ঠ হওয়ার ইন্ধন না দিয়ে বসে। অথচ কেবল তেমন সত্যনিষ্ঠার মধ্য দিয়েই আধুনিক মানুষের দুর্গতি ও অন্তর্বেদনা উন্মোচিত হতে পারে, সেই দুর্গতি ও অন্তর্বেদনাকে প্রথা ও মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে না রেখে শিল্প ও ধর্মের প্রকৃত সকল অনুষঙ্গের সঙ্গে মিলিত হয়ে এমন এক সংস্কৃতি রোপণ করতে পারে যা মানুষের প্রকৃত প্রয়োজন মেটাবে, আজকালকার শিক্ষার মতো প্রকৃত প্রয়োজন সম্পর্কে প্রতারণা করে চলমান মিথ্যা হয়ে ওঠার দিকে ঠেলে দেবে না।

এহেন সার্বজনীন শিক্ষার প্রকোপে যে যুগ আক্রান্ত, সেই যুগে সমস্ত বিজ্ঞানের মধ্যে সবচেয়ে সত্যপরায়ণ যে দর্শন নামক সৎ নগ্ন দেবী, তাকে কতো না অস্বাভাবিক, কৃত্রিম ও যারপরনাই অনুপযুক্ত অবস্থায় এনে ফেলা হয়েছে! জোর করে বেঁধে দেওয়া বাহ্যিক সমসত্ত্বতার এহেন জগতে দর্শনকে কেবলমাত্র একলা-চলা পথিকের বিজ্ঞ স্বগত-সংলাপ, ব্যক্তিমানুষের হঠাৎ-উপলব্ধি, কুঠুরিগত গোপন কথা, অথবা জ্ঞান-প্রতিষ্ঠানের বৃদ্ধ ও শিশুদের নখদন্তহীন কচকচিতে রূপান্তরিত হয়ে থাকতে হয়। কেউই সাহস করে দর্শনের নীতিটিকে নিজমধ্যে পূর্ণ প্রকাশিত করার চেষ্টার দিকে যায় না। প্রাচীন কালের কোনো মানুষ যেমন একবার স্টোয়া-র দর্শনের কাছে নিজ আনুগত্য নিশ্চিত করার পর যেখানেই সে থাকুক, যা-ই সে করুক, সবেতেই স্টোইক হয়ে উঠতে চেষ্টা করতো, তেমনভাবে আজ আর কেউ সেই সহজ আনুগত্য নিয়ে দর্শনানুসারী জীবন যাপন করে না। সমস্ত আধুনিক দর্শনচর্চাই হলো রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক, তা সরকার, চার্চ, জ্ঞান-প্রতিষ্ঠান ও রীতি-রেওয়াজের গণ্ডির মধ্যে সংকুচিত, বৃত্তি বা জলপানির মুখ চেয়ে থাকা লালায়িত মানুষদের ভীরুতা দিয়ে চিহ্নিত, সেখানে কেবল ‘যদি এমন হতো’ বলে ফোঁসফাঁস দীর্ঘশ্বাস পড়ে, বা ‘একসময় এমন ছিলো’ আউড়ানো হয়, আর কোনো কাজ সেখানে হয় না। কোনো ঐতিহাসিক সংস্কৃতির মধ্যে দর্শনের কোনো স্থান পাওয়ার অধিকার থাকে না যখনই তা কেবলমাত্র নিজের-পায়ে-নিজে-বেড়ি-বাঁধা জ্ঞান-কুড়ানো হিসেবে নিজেকে গুটিয়ে না রেখে কোনো সক্রিয় কর্মের কথা বলতে চায়। আধুনিক মানুষের যদি আদৌ কোনো সাহস ও সংকল্পের জোর থাকতো, এমনকি শত্রুতাগিরিতেও সে যদি কেবল এক অধ্যাত্মিক ভাবাচ্ছন্ন জীব হয়ে না থাকতো, সে তাহলে ঘাড় ধরে দর্শনকে বিদায় করতো; যেহেতু তা নয়, তাই আধুনিক মানুষ এখন দর্শনের নগ্নতা ঢেকে শ্লীলতা উৎপাদন করতেই নিয়োজিত হয়েছে। যে কেউ দর্শন ভাবতে পারে, লিখতে পারে, মুদ্রণ করতে পারে, বলতে পারে, শেখাতেও পারে--- এই অবধি মোটামুটি সবকিছুর অনুমতি আছে; কেবলমাত্র যখনই সক্রিয়ভাবে করার কথা আসে, অর্থাৎ তথাকথিত জীবনটাকে যাপন করার কথা আসে, তখনই ব্যাপারটা অন্যরকম হয়ে যায়: সেখানে কেবল একটি মাত্র জিনিসেরই অনুমতি থাকে আর বাকি সবকিছু সর্বসময়ের জন্য নেহাতই অসম্ভব হয়ে যায়: ইতিহাসানুগ সংস্কৃতি এভাবেই নিজেকে সাজিয়ে-গুছিয়ে রাখতে চায়। তাই প্রশ্ন করতেই হয়, তাহলে সত্যিই কি এখনও কোথাও মনুষ্যপ্রাণী অবশিষ্ট আছে, নাকি কেবলমাত্র ভাবুক-লেখক-বাচক-যন্ত্রে সব ছেয়ে গেছে?

গ্যেটে একবার সেক্সপিয়র সম্পর্কে বলেছিলেন: ‘বাইরের সাজপোষাককে সেক্সপিয়রের চেয়ে বেশি আর কেউ ঘৃণা করতেন না; তিনি খুব ভালোভাবে জানতেন যে মানুষের ভিতরের সাজপোষাকটা কেমন, আর সেখানে সব মানুষই একরকম। ওরা বলে যে উনি রোমানদের আচ্ছা করে ধোলাই করেছিলেন, কিন্তু আমি তো তেমন খুঁজে পাইনি, তিনি যাদের ধোলাই করেছিলেন তারা রক্তমাংসের ইংরেজ ছাড়া আর কিছু নয়, কিন্তু তারা নিশ্চিতভাবেই মনুষ্যপ্রাণী, পা থেকে মাথা অবধিই তারা মানুষ, আর রোমান আলখাল্লাটা তাদের গায়ে একদম ঠিকঠাক মানিয়ে গিয়েছিলো।’ এখন আমার প্রশ্ন হলো এই যে আমাদের সমসাময়িক শিক্ষিত লোক, নামজাদা লোক, আধিকারিক বা রাজনীতিবিদদের কি রোমান হিসেবে হাজির করা যায়? আমার মনে হয় যে মোটেই তা যায় না, কারণ তারা মানুষই নয়, তারা কেবল রক্তমাংসের একটা পিণ্ড এবং মূর্ততার নামে চলা বিমূর্ততা। যদি আদৌ তাদের স্বকীয় কোনো চরিত্র থেকে থাকে, তবে তা এতো কিছুর তলে গভীরে চাপা পড়ে আছে যে কখনোই তা সূর্যের মুখ দেখতে পায় না: ‘গভীর অতলে অনুসন্ধান করে’ এমন কারো কাছেই কেবল তাদের মানুষ বলে মনে হতে পারে। অন্য যে কারো কাছে তাদের মানুষ, ঐশ্বর বা প্রাণী ছাড়া আলাদা বস্তু বলে মনে হবে, এমন বস্তু যা ইতিহাসানুগ সংস্কৃতির সৃষ্টি, যার পুরোটাই প্রামাণিক অন্তঃসার বিহীন কেবলই এক কাঠামো, ছবি বা আকার, অসন্তুষ্টি নিয়ে বাজে ভাবে গড়া এক আকার, আর তার উপরে, সর্ব-সমসত্ত্ব। আর তাই আমার এই প্রস্তাবটি ভেবে দেখা হোক: সবল ব্যক্তিত্বরাই ইতিহাসের ভার বইতে পারে, দুর্বলরা সেই ভারে সম্পূর্ণ নির্বাপিত হয়ে যায়। স্বকীয়ভাবে অতীতকে বিচার করার মতো শক্তি যার নেই, তার অনুভূতি ও সংবেদনশীলতাকে ইতিহাস গুলিয়ে বিভ্রান্ত করে দেয়। যেজন নিজের উপর ভরসা করার সাহস ধরে রাখতে না পেরে ইতিহাসের মুখাপেক্ষী হয়ে খালি জিগ্যেস করতে থাকে ‘এই বিষয়টা আমার কীভাবে নেওয়া উচিত?’, ক্রমশ তার ভীরুতা তাকে এমন এক অভিনেতায় পর্যবসিত করে যে কেবল এক প্রদত্ত ভূমিকায় অভিনয় করে যাচ্ছে, সাধারণত এমন বহু প্রদত্ত ভূমিকায় তাকে অভিনয় করে যেতে হয় আর তাই তার অভিনয়টাও ক্রমশ মেকী ও নিকৃষ্টমানের হয়ে পড়ে। মানুষ ও তার ইতিহাসগত অস্তিত্বক্ষেত্রের মধ্যে সংগতি ধীরে ধীরে লোপ পায়; এমনকিছু অকালপক্ক বামনদের আবির্ভাব ঘটে যারা প্রাচীন রোমানদের কাঁধে হাত রেখে তাদের সমান সাজার চেষ্টা করে, প্রাচীন গ্রিক কবিদের অবশিষ্টাংশে হুমড়ি খেয়ে পড়ে খোঁড়াখুঁড়ি করার চেষ্টা করে যেনবা সেগুলোও তাদের নিজেদের জঘন্য লেখালেখিগুলোর মতোই তাদের হাতে শব-ব্যবচ্ছেদের যোগ্য। ধরা যাক তেমন কোনো বামন ডোমোক্রিটাস১৬ নিয়ে খুব মেতে উঠেছে, আমার সব সময় মনে হয় যে প্রশ্ন করি: বাপু, হেরাক্লিটাস১৭ নয় কেন? ফিলো১৮ নয় কেন? বেকন১৯ নয় কেন? দেকার্তে২০-ই বা নয় কেন? বা, অন্য আর যে কোনো কেউ নয় কেন? তাছাড়াও, একজন দার্শনিককেই কেন ধরতে হবে? কোনো কবি বা বাগ্মীকে ধরছো না কেন? আর, বেছে বেছে একজন গ্রিককেই বা পাকড়াও করা কেন? কেন একজন ইংরেজ বা তুর্কি-কে নয়? যাদের তুলনায় তোমাদের এতোই বামনাকৃতি লাগে, তাদের ছাড়া আর কাউকে খুঁজে পাও না, অতীত কি তোমাদের জন্য এতোটাই সংকীর্ণ হয়ে গেছে? কিন্তু, আমি আগেই বলেছি, এরা হলো খোজার দল, আর একজন খোজার কাছে সমস্ত নারীই একই রকম ধরাছোঁয়ার বাইরে, তাই সমস্ত নারীই কেবলমাত্র স্পর্শাতীত বস্তু রূপে একইরকম। তাই কাকে তারা ধরবে, কী তারা করবে, তা দিয়ে তাদের কিছু যায় আসে না, যতোক্ষণ অবধি স্বয়ং ইতিহাস নামক বস্তুটিকে বেশ মনোরম, পরিচ্ছন্ন ও ‘বিষয়গত’ করে রাখা যাচ্ছে, আর এ কথাটাও মনে রাখা দরকার যে যারা ইতিহাসকে এমন সাফ-সুতরো রাখতে চায় তারা চিরদিনের জন্য নিজেরা ইতিহাস তৈরিতে অক্ষম হয়ে যায়। গ্যেটে লিখেছিলেন, ‘Das Ewig-Weibliche/ Zieht uns hinan’২১ (চিরন্তন নারীত্ব/ আমাদের উপর দিকে টেনে আনে), তা হওয়ার নয়, তুমিই তাকে নীচে তোমার দিকে টেনে আনো, খোজারাও তেমন ইতিহাসকে খোজা করে তোলে। ইতিহাসকে অবশ্য আমি চিরন্তন নারীত্বের সঙ্গে তুলনা করছি না, আমি বরং তাকে চিরন্তন পুরুষত্বের সন্নিবর্তী বলেই মনে করি: যদিও এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে ‘ইতিহাসে যারপরনাই শিক্ষিত’ মানুষজনেদের তাতে কিছু যায় আসে না কারণ সেই মানুষজনরা তো নিজেরা পুরুষও নয়, নারীও নয়, এমনকি উভলিঙ্গও নয়, বরং কেবলমাত্র খোজা, বা শালীন উচ্চারণে বললে, চিরন্তনভাবে বিষয়গত।

উপরের বর্ণনানুযায়ী যদি কোনো ব্যক্তিত্বকে ফাঁকা করে চিরায়ত বিষয়ীশূন্য করে দেওয়া হয়, বা, চালু ভাষায় বললে, বিষয়গত করে তোলা হয়, তাহলে কোনোকিছুই আর তার উপর কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না; ভালো ও সঠিক বস্তু তাদের সামনে কর্ম বা কাব্য বা সঙ্গীত হিসেবে কৃত হতে থাকলেও সেই ভিতর-ফাঁকা পরিশীলিত মানুষগুলো নিমেষেই কাজটির থেকে চোখ সরিয়ে তার স্রষ্টার ইতিহাস জানতে আগ্রহী হয়ে পড়ে। সেই স্রষ্টা যদি এর আগে আরো বেশ কিছু কাজ করে থাকেন, তাহলে তাঁকে ঘাড় ধরে শুনিয়ে দেওয়া হবে অতীতের কাজগুলোর মধ্য দিয়ে কী বিকাশপ্রক্রিয়া আসলে কাজ করছে এবং সম্ভাব্য কোন ভবিষ্যৎ প্রগতির দিকে তা আসলে ধাবমান, তাঁকে অন্যান্য স্রষ্টাদের সঙ্গে তুলনা করে আলোচনার হাট বসবে, তাঁর বিষয় বাছাই নিয়ে সমালোচনা বাঁধা হবে, কীভাবে তিনি সেই বিষয় বিস্তারিত করেছেন তা ছুরি-কাঁচি দিয়ে কেটে টুকরো টুকরো করে আবার সাবধানে জুড়ে এক করা হবে এবং সাধারণভাবে স্রষ্টাকে কিছু বকা-ঝকা করে ভুল পথ থেকে সঠিক পথে নিয়ে আসার জন্য উপদেশ বর্ষিত হবে। এর মধ্য দিয়ে সবচয়ে আশ্চর্যের বস্তু যা ঘটতে পারে তা হলো: স্রষ্টা বহু দূরে অবস্থান করলেও ইতিহাসানুগত্যে নিরপেক্ষদের বিরাট দঙ্গল সর্বদাই তৈরি হয়ে আছে কীভাবে স্রষ্টার উপর তদারকি-তত্ত্বাবধান জারি করা যায়। কোনো সৃষ্টি হাজির হলে সেই মুহূর্তে প্রতিধ্বনি বেজে ওঠে: সমালোচকরা তাঁদের সমালোচনা ঘোষণা করতে থাকেন, যদিও ঠিক এক মুহূর্ত আগে অবধিও এই সমালোচকরা স্বপ্নেও ভাবতে পারতো না যে এমন একটা সৃষ্টি সম্ভব। তাই কোনো সৃষ্টিই কোনো প্রভাব ফেলে না, কেবল আরেক ‘জ্ঞানী সমালোচনা’-র জন্ম দেয়; আর সেই ‘জ্ঞানী সমালোচনা’ও কোনো প্রভাব ফেলে না, কেবল আরেকটি ‘জ্ঞানী সমালোচনা’-র পথ তৈরি করে। তাই এমন এক সাধারণ সহমত গড়ে উঠেছে যে কোনো সৃষ্টির যতো বেশি এহেন ‘জ্ঞানী সমালোচনা’ হতে থাকবে তা ততো বেশি সফল, আর অতি অল্প বা কোনো ‘জ্ঞানী সমালোচনা’ না হওয়া হলো ব্যর্থতার লক্ষণ। তা এই ‘জ্ঞানী সমালোচনা’-র ঘনঘটা যখন চলে, তখনও তলে তলে সবকিছু একইরকম থেকে যায়: কয়েকদিনের জন্য বকবক করার একটা নতুন বিষয় মানুষ পায়, তারপর সেটা পুরোনো হয়ে হারিয়ে গিয়ে আরো নতুন একটা বিষয় হাজির হয়, এমন চলতেই থাকে, আর এই সময় জুড়ে তারা কাজেকর্মে চিরকাল যা করে আসছিলো সেটারই পুনরাবৃত্তি করে যেতে থাকে। আমাদের জ্ঞানী সমালোচককুলের ইতিহাসগত সংস্কৃতি আর প্রকৃত অর্থে কোনো প্রভাব ফেলা বরদাস্ত করে না, কারণ সেই প্রকৃত প্রভাব তো জীবন ও স্বতঃক্রিয়াকে বদলে দিতে পারে: এই জ্ঞানী সমালোচককুলের হাতে থাকা শোষণপত্রটি নিমেষে কৃষ্ণতম লেখাটির উপরও চেপে বসে আর শ্রীমণ্ডিত নকশা বরাবর তাঁদের টানা মোটা দাগগুলো সংশোধন হিসেবে সবকিছু ছেয়ে দেয়: ব্যস, এখানেই সবকিছুর ইতি ঘটে। কিন্তু জ্ঞানী সমালোচককুলের কলম কখনও থেমে থাকে না, কারণ তারা সেই কলমের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে, কলমকে তারা নিয়ন্ত্রণ করার বদলে কলমই এখন তাদের নিয়ন্ত্রণ করে। আর ঠিক এই জ্ঞানী সমালোচনার বর্ষণ-ঘনঘটা, এই আত্মনিয়ন্ত্রণের অভাব, এই অনুর্বরতা যাকে রোমানরা ‘impotentia’ বলতো, এগুলোই আধুনিক ব্যক্তিত্বের দুর্বলতার চিহ্ন।

 

 

তবে, এখন সরিয়ে রাখা যাক এই দুর্বলতার কথা। বরং ফিরে তাকানো যাক আধুনিক মানুষের সেই বহু-প্রশংসিত শক্তিমত্তার দিকে। যন্ত্রণাদায়ক হলেও এই প্রশ্নটি করা যাক যে তার এই সুবিখ্যাত ঐতিহাসিক ‘বস্তুনিষ্ঠতা’-র সুবাদেই কি আধুনিক মানুষের হক জন্মে যায় অন্য সমস্ত যুগের মানুষদের থেকে নিজেকে বেশি শক্তিমান ও বেশি ন্যায়পর বলে মনে করার? সত্যিই কি ন্যায়পরতার আরো বেশি প্রয়োজন ও চাহিদা বোধ থেকেই এই বস্তুনিষ্ঠতার উৎপত্তি? নাকি সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনো কারণের প্রভাবে এর জন্ম, আপাতভাবেই কেবল মনে হয় যে ন্যায়পরতার আকাঙ্ক্ষা এর জন্মদাতা? আর তার ফলে কি আধুনিক মানুষের সুগুণ সম্পর্কে অতিরঞ্জিত ধারণা প্রসূত অহমিকার ক্ষতিকর মোহে আমরা জড়িয়ে পড়ি? সক্রেটিস মনে করতেন যে এমন সুগুণ, যা আমার নেই, তার অধিকারী বলে নিজেকে ভ্রম করা হলো উন্মাদ হয়ে যাওয়ার কাছাকাছি একটা অসুখ: আর ওই সুগুণের-অধিকারী-হওয়ার-ভ্রান্তিবিলাস তার বিপরীত, অর্থাৎ, কোনো অক্ষমতা বা দোষের শিকার হওয়ার ভ্রমের চেয়ে নিশ্চিতভাবেই অনেক বেশি বিপদজনক। কারণ দ্বিতীয় ক্ষেত্রে মানুষের ভ্রম কাটিয়ে ওঠার সম্ভাবনা থাকে, কিন্তু প্রথম ভ্রমটি নাছোড়ভাবে মানুষকে প্রত্যহ আরো খারাপ, মানে, আরো ন্যায়বিরুদ্ধ করে তুলতে থাকে।

সত্যি কথা বলতে, ন্যায়ের প্রতি স্বাভাবিক প্রবণতা ও ন্যায়পরতা ধরে রাখার জোর যার আছে, সে-ই আমাদের সবচেয়ে বেশি শ্রদ্ধার পাত্র। অতল সমুদ্র যেমন চারিদিক থেকে আসা নদীনালাকে গ্রহণ করে ও নিজমধ্যে আত্মস্থ করে নেয়, ঠিক তেমনই ন্যায়পরতার মধ্যেও সবচেয়ে বিরল ও সবচেয়ে সমুচ্চ সুগুণগুলো মিলেমিশে এক হয়ে অন্তর্লীন হয়ে থাকে। বিচারের দাঁড়িপাল্লা ধরার সময় বিচারের দায়িত্বে আসীন ন্যায়পর মানুষের হাত কখনও কাঁপে না, নিজের প্রতি চূড়ান্ত নির্দয় থেকেই সে পাল্লায় একটার পর একটা ওজন চাপিয়ে যেতে পারে, পাল্লার ওঠাপড়া দেখতে দেখতে তার দৃষ্টি কখনও আচ্ছন্ন হয়ে ওঠে না, আর যখন সে বিচার ঘোষণা করে, তার কন্ঠে কোনো রোষ বা অশ্রুর লেশ থাকে না। সে যদি জ্ঞান-সর্বস্ব শীতল দানব হতো, সে তাহলে নিজের চারপাশে এমন এক ভয়ঙ্কর মানবোর্ধ্ব মহারাজকীয় বরফশীতল পরিবেশ ছড়িয়ে রাখতো, যার সামনে শ্রদ্ধায় নয়, ভয়ে আমাদের নত হতে হতো। কিন্তু সে তো এক মানুষই বটে, যদিও সে প্রশ্রয়দায়ী সন্দেহ থেকে দৃঢ় নিশ্চয়তায় আরোহণ করতে চায়, সহনশীল মানিয়ে নেওয়া থেকে নির্দেশাত্মক আদেশ দেওয়ার জায়গায় যেতে চায়, উদারতার বিরল গুণ পেরিয়ে বিরলতম ন্যায়পরতার গুণে অধিষ্ঠিত হতে চায়, তবু, ওই জ্ঞান-সর্বস্ব দানবের মতো দেখতে হলেও শুরু থেকে শেষ অবধি সে তো কেবল একটি অভাগা মানুষ বৈ আর কিছু নয়। আর এই মানুষ হওয়ার মূল্য তো এক অসম্ভব সুগুণের গ্রাসে পতিত হওয়ার বিয়োগাত্মক পরিণতির মধ্য দিয়ে তাকে প্রতি মুহূর্তে চুকিয়ে যেতে হয়। এসবকিছু তাকে এক নিঃসঙ্গ উচ্চতায় মানব প্রজাতির সর্বোচ্চ সম্মানীয় আদর্শ হিসেবে স্থাপন করে, কারণ সত্য তার কাছে শীতল প্রভাবহীন জ্ঞান হিসেবে অভিপ্রেত নয়, বরং এক নিয়ন্ত্রক শাস্তিদানকারী বিচারক হিসেবে অভিপ্রেত; সত্য তার কাছে কোনো ব্যক্তিগত অহংকারে সম্পত্তি নয়, বরং ব্যক্তিগত অহংকারের সম্পত্তির সমস্ত সীমাফলকগুলোকে উপড়ে ফেলার পবিত্র অধিকারের সূচক। অন্যভাবে বললে, সত্য তার কাছে কোনো উৎফুল্ল শিকারীর করা শিকার নয়, সত্য তার কাছে একটি চূড়ান্ত বিচারপ্রক্রিয়া। যে মাত্রায় কোনো সত্যবান মানুষ শর্তহীনভাবে ন্যায়ের জন্য আকাঙ্ক্ষার অধিকারী, সেই পরিমাণেই সত্যানুসন্ধানের মধ্যে তেমন মহৎ কিছু থাকতে পারে যার জয়গান সর্বত্র এতো নির্বিচারে গাওয়া হয়ে থাকে। অপরদিকে, যে কোনো স্পষ্টদ্রষ্টা মানুষের চোখেই সত্যানুসন্ধানের প্রণোদনা হিসেবে বিভিন্ন বিবিধ কিছু ফুটে উঠতে পারে, যেমন: ঔৎসুক্য, একঘেয়েমি কাটানোর চেষ্টা, ঈর্ষা, আত্মগর্ব, আমোদ পাওয়ার চেষ্টা, ইত্যাদি নানা কিছু যেগুলোর সঙ্গে ন্যায়পরতায় শিকড় গাড়া সত্যের কোনো সম্পর্কই নেই। তাই জগৎ যেন এমন মানুষে ভরা যারা সবাই ‘সত্যের সেবা’ করতে উন্মুখ, অথচ ন্যায়পরতার সুগুণ খুবই দুর্লভ। শুধু তাই নয়, ন্যায়পরতার সুগুণ যখন কদাচ দেখা যায়, খুব বিরলতম ক্ষেত্রেই তা স্বীকৃতি পায় এবং প্রায় সবসময় তাকে ঘৃণাই করা হয়ে থাকে। অপরদিকে, যারা কেবল পোষাকী কেতাতেই সুগুণসম্পন্ন, সর্বদাই তাদের উপর জমকদার সম্মান বর্ষিত হয়। এটাই সত্য যে খুব কম লোকই সত্যের সেবা করে থাকে কারণ সত্যের নিখাদ আকাঙ্ক্ষা খুব কম জনেরই থাকে, আর তাদের মধ্যেও আরো অল্প কয়েকজনেরই প্রকৃত অর্থে ন্যায়পরায়ণ হওয়ার শক্তি থাকে। আর আকাঙ্ক্ষার অধিকারী হওয়াটাই তো যথেষ্ট নয়: ন্যায়পরতার আকাঙ্ক্ষার অধিকারী হলেও বিচারশক্তির অভাব যাদের রয়েছে, ঠিক তাদের থেকেই মানবপ্রজাতির সবচেয়ে ভয়ানক দুর্ভোগগুলো তৈরি হয়েছে, যে কারণে সাধারণ কল্যাণের জন্য সঠিক বিচারের বীজ যতোটা সম্ভব ছড়িয়ে বপন করার থেকে গুরুত্বপূর্ণ আর কিছু হতে পারে না যাতে অন্ধবিশ্বাসীদের থেকে বিচারকদের আলাদা করা যায়, বিচারক হয়ে ওঠার অন্ধ আকাঙ্ক্ষা থেকে বিচার করার সচেতন সক্ষমতার পার্থক্য টানা যায়। কিন্তু এই বিচার করার সক্ষমতা রোপণ করার উপায় কোথায়ই বা খুঁজে পাওয়া যাবে! যখন কেউ সত্য ও ন্যায়বিচারের দোহাই দিয়ে ভাষণ দেবে, কম্পিত বক্ষে মানুষকে এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই দুলতে হবে যে তাদের সামনের বক্তামহাশয় একজন অন্ধবিশ্বাসী নাকি একজন বিচারক। তাই কোনো দোষ দেওয়া যায় না যদি দেখা যায় যে মানুষ সবসময় সবিশেষ আন্তরিকতার সঙ্গে সেইসব ‘সত্যের সেবক’-দের অভ্যর্থনা জানিয়ে এসেছে যাদের বিচার করার মতো আকাঙ্ক্ষা বা সক্ষমতা কোনোটাই নেই, কেবল এক ‘বিশুদ্ধ ও স্বনির্ভর’ জ্ঞান বা ঘটনা-নিরপেক্ষ সত্য নির্ধারণের দায়িত্ব নিজেরা নিয়ে নিয়েছেন। এমন বহু সত্য আছে যা পূর্ণ অনাসক্তির বিষয়, এমন নানা সমস্যা আছে যার যথার্থ সমাধান ত্যাগ-তিতিক্ষা তো দূরের কথা, প্রয়াস-প্রচেষ্টাও দাবি করে না। নির্লিপ্তির বিপদহীন এই পরিসরে একজন মানুষ খুব সহজেই জ্ঞানের শীতল পিশাচ হয়ে উঠতে পারে। সুবিধামতো কাঁড়ি কাঁড়ি বিদ্যাচর্চক ও অণ্বেষক ওইরকম পিশাচ রূপ ধারণ করলেও, সৌভাগ্যবশত, ন্যায়পরতার মহান কঠোর বোধের অভাব রোগচিহ্ন হয়ে বোধহয় ফুটে বেরোবেই, অর্থাৎ, তথাকথিত সত্যাকাঙ্ক্ষার পবিত্র কেন্দ্রের ব্যাধি ফুটে বেরোবে।

এখন সমকালের ইতিহাসানুগ সর্বগুণসম্পন্ন কোনো ব্যক্তির আদল মনশ্চক্ষে অবলোকন করা যাক: সে কি তার সময়ের সবচেয়ে ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি? ধরে নেওয়া যাক যে তিনি নিজের মধ্যে অনুভূতির এহেন সূক্ষ্মতা ও সংবেদনশীলতা বিকশিত করেছেন যে মানবিক কোনোকিছুই আর তাঁর অপর নয়, তাঁর বীণার তারে মৈত্রীবোধক অসংখ্য সুর-লয়-তান-এ যতো বিভিন্ন যুগ ও মানুষেরা এখনও বাঙ্ময় হয়ে ওঠে: তিনি এমন এক নিষ্ক্রিয় অনুনাদকে পরিণত হয়েছেন যাতে প্রতিফলিত ধ্বনি সমরূপ অন্যান্য অনুনাদকের উপর কাজ করে চলে, যতোক্ষণ না এ যুগের গোটা বায়ুমণ্ডল সেইসব প্রতিধ্বনির মিশ্রিত বিভ্রান্ত গুনগুনানিতে ভরে ওঠে। তবু আমার মনে হয় যে আদি অকৃত্রিম ইতিহাসগত স্বরটির সুরকম্পনই বুঝি বা কিছু শোনা যায়, আদি মূল স্বরটির ঘনিমা, ঘাত, ক্ষমতা কিছুই আর ওই বীণার তারের বুদবুদ-সূক্ষ্ম উচ্চকিত কম্পনরাজি থেকে বোঝা সম্ভব নয়। মূল আদি স্বরটি কতো না ক্রিয়া, বেদনা, আতান্তর, ত্রাসের স্মৃতি বহন করে; আর এই বীণার স্বর আমাদের মজিয়ে রেখে পোষ-মানা দর্শকে পরিণত করে; যেনবা বিঠোফেন-এর ‘ইরোয়িকা’ সিম্ফনি২২-কে গাঁজার-নেশায়-ঝিমন্ত কিছু শ্রোতার জন্য দুটি বাঁশিতে সীমাবদ্ধ রেখে বাজানো হচ্ছে। এর মধ্য দিয়েই আর বুঝতে বাকি থাকে না যে ওই সর্বগুণসম্পন্নজনেদের শিখণ্ডী করে আধুনিক মানুষদের ন্যায়পরতার উচ্চতর ও শুদ্ধতর বোধের দাবির হালে কতোটা পানি চলাচল করে, গুণ বলে অভিষিক্ত এই বস্তুর মধ্যে প্রীতিকর কিছুই নেই, নেই কোনো সজীব কম্পন, আছে কেবল ভয়-দেখানো কঠোরতার ভান। আর এর তুলনায় গুণাবলীর ক্রমসারণিতে উদারতাকে কতো না তলায় রাখা হয়ে থাকে, অতি বিরল কয়েকজন মাত্র ইতিহাসবিদই উদারতার অধিকারী হন! বেশিরভাগ ইতিহাসবিদই আসলে এক ধরনের সহনশীলতা প্রদর্শন করেন মাত্র, যা ঘটেছে বলে অস্বীকার করা যায় না তার প্রতি এক প্রকার মান্যতার অনুমতি দিয়ে থাকেন, তারপর এমনভাবে ব্যাখ্যার জালে জড়িয়ে ফেলেন যাতে তার গুরুত্ব যথাসম্ভব কমিয়ে ফেলা যায়। এই পূর্বানুমানের উপরে দাঁড়িয়ে তারা কাজ করেন, যা হয়তো বা সঠিকও, যে, তাঁদের উপস্থাপনায় অতীতের কর্কশ কঠোর নিন্দা গরহাজির রাখতে পারলেই অনভিজ্ঞদের চোখে তা ন্যায়সঙ্গত উপস্থাপনা বলে প্রতিভাত হবে। কিন্তু বিচার তো একমাত্র উচ্চতর কোনো শক্তিই করতে পারে, দুর্বলের কাছে কেবল সহে যাওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকে না, যদি না তা শক্তিমত্তার ধূর্ত ভেক ধরে বিচারকের আসনে বসা ন্যায়কে কেবলমাত্র একটা অভিনেতায় পরিণত করে। এর পরও আরেক ভয়ানক প্রজাতির ইতিহাসবিদ থাকে, যারা দক্ষ, কঠোর ও সচ্চরিত্র, কিন্তু ভারী সংকীর্ণমনা। তাদের মধ্যে ন্যায়পরায়ণ হওয়ার অভিপ্রায় থাকে, বিচারকের পদে বসার জ্বালা-যন্ত্রণার অনুভূতিও তাদের আছে, কিন্তু তাদের সমস্ত নিদানই ভ্রান্ত, মোটামুটি সেই একই কারণে ভ্রান্ত যে কারণে কোনো সাধারণ আদালতের জুরি-দের নিদান ভ্রান্ত হয়ে থাকে। সুতরাং, ইতিহাসের ক্ষেত্রে প্রতিভার ছড়াছড়ি পড়ে যাবে তা ঘটা কতোই না অসম্ভব! আত্মগর্বলেহনকারী ও দলদাস, যারা তাদের ধূর্ত মতলবের খেলা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ফন্দিতে বস্তুনিষ্ঠতা জাহির করে, তাদেরই ভিড় লেগে থাকে। আর থাকে সেইসব চিন্তাশূন্য মানুষদের ভিড় যারা এই অতিসরল বিশ্বাস নিয়ে ইতিহাস লিখতে বসে যে ঠিক তাদের সময়কার জনপ্রিয় ধারণাগুলোই হলো সব চেয়ে সঠিক ও ন্যায়নিষ্ঠ ধারণা এবং ওই ধারণামতে লিখে গেলেই ন্যায়পরায়ণ হওয়া যাবে--- এই অতিসরল বিশ্বাসের জমিতেই যে-কোনো ধর্ম নিজ ঘর বাঁধে আর ধর্মের ক্ষেত্রে তা কী রূপ নেয় সে নিয়ে এখানে আর মন্তব্য না বাড়ালেও চলে। এই অতিসরল ইতিহাসবিদরা বর্তমান মুহূর্তের দৈনন্দিন মাপকাঠি অনুযায়ী অতীতের ধ্যানধারণা ও কীর্তিকলাপ বিচার করাকেই ‘বস্তুনিষ্ঠতা’ বলে থাকে, যে ‘বস্তুনিষ্ঠতা’-র ভিতরেই তারা সমস্ত সত্য বিষয়ক ধর্মশাস্ত্র আবিষ্কার করতে থাকে, আর তাদের কাজ হয়ে দাঁড়ায় সমকালীন ক্ষুদ্রতার মাপে ছেঁটেকেটে অতীতকে হাজির করা। আর এরাই আবার জনপ্রিয় মাপকাঠিকে ধর্মশাস্ত্র- হিসেবে-গ্রহণ-না-করা যে-কোনো ইতিহাস-উপস্থাপনাকে ‘বিষয়ীগত’ বলে গাল পাড়ে।

‘বস্তুনিষ্ঠতা’ শব্দটিকে যদি তার সর্বোচ্চ অর্থেও ধরা হয়, তা হলেও কি তার মধ্যে চুপিসারে ভ্রম ঢুকে বসে থাকে না? এই সর্বোচ্চ অর্থ-ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ‘বস্তুনিষ্ঠতা’ শব্দটি ইতিহাসবিদদের এমন এক অবস্থান বোঝায় যে অবস্থান থেকে সে যে কোনো ঘটনাকে তার সমস্ত প্রণোদনা ও প্রভাব সহ এমন নিখাদভাবে দেখতে সমক্ষ হয় যা সেই ইতিহাসবেত্তার নিজ বিষয়ীভাবকে কোনোভাবেই প্রভাবিত করে না। এর সঙ্গে তুলনীয় হতে পারে ব্যক্তিস্বার্থ থেকে বিচ্ছিন্নতার সেই নান্দনিক প্রতীতি যা নিয়ে একজন চিত্রকর বজ্রবিদ্যুতের ঝলকানিতে ভরা ঝড়ের আবহ বা উত্তাল সমুদ্র দেখে কেবলমাত্র তাদের চিত্ররূপের মধ্যেই নিজেকে নিবিষ্ট রেখে। বস্তুর মধ্যে এভাবে সম্পূর্ণ বিশোষিত হয়ে যাওয়ার প্রতীতি আসলে একটি অন্ধবিশ্বাস ছাড়া কিছু নয়। এহেন বস্তুতে বিশোষিত হওয়ার মধ্য দিয়ে মানুষের মধ্যে বস্তুটি সম্পর্কে যে ছবিটি তৈরি হয় তা সেই বস্তুর অভিজ্ঞতালব্ধ প্রকৃতির সত্য অনুকৃতি ছাড়া আর কিছু নয়--- এমন ধারণাকে অন্ধবিশ্বাস ছাড়া আর কী বলা যায়? নাকি এমনটা ধরে নিতে হবে যে সেই মুহূর্তটিতে বস্তুরাজি তাদের প্রকৃত অবস্থাকে নিজেদের সক্রিয়তা দিয়ে নিখাদ এক নিষ্ক্রিয় মাধ্যমের উপর যেনবা খোদাই করে, প্রতিরূপ তৈরি করে বা আলোকছাপ ফেলে দৃশ্যমান করে তোলে?

এটা নেহাতই এক কল্পকথা হয়ে উঠবে, তা-ও খুবই নিকৃষ্ট মানের এক কল্পকথা। আর তাছাড়াও তা হলে একথা ভুলে বসা হবে যে একজন শিল্পীর গভীরে সেই মুহূর্তটিই সবচেয়ে জোরালো ও সবচেয়ে স্বতঃস্ফূর্ত সৃষ্টিমুহূর্ত হয়ে ওঠে যে মুহূর্তের সৃষ্টিফলটি নান্দনিক সত‍্যে উজ্জ্বল হলেও ঐতিহাসিকভাবে সত্য না-ও হতে পারে। পূর্বে বর্ণিত ‘বস্তুনিষ্ঠতা’ নিয়ে ইতিহাসকে ভাবা হলো নাট্যকারের নীরব কাজ, যে নাট্যকার সমস্ত বস্তুকে পরস্পর-সম্বন্ধিত করে ভেবে বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলোকে একটা অখণ্ড সমগ্র আকারে বুনে হাজির করে, সবসময় যার মাথায় এই পূর্বধারণা বিরাজ করে যে বস্তুরাজির মধ্যে যদি কোনো পরিকল্পনার ঐক্য না-ও থাকে, তবু ওপর থেকে এক পরিকল্পনার ঐক্য আরোপ করাই হলো তার কর্তব্য। এভাবেই মানুষ তার নিজের বোনা ঊর্ণজালে জড়িয়ে ফেলে অতীতকে পোষ মানায়, এভাবেই হয়তো সে তার শিল্পপ্রবৃত্তিরও প্রকাশ ঘটায়--- কিন্তু সেই প্রবৃত্তি মোটেই সত্য বা ন্যায়পরতার জন্য প্রবৃত্তি নয়। ন্যায়পরতা ও বস্তুনিষ্ঠতার মধ্যে কোনো সম্পর্কই নেই। এমন কোনো ইতিহাস-উপস্থাপনা কল্পনা করা যেতেই পারে যার মধ্যে একফোঁটা সাধারণ অভিজ্ঞতালব্ধ সত্য নেই, অথচ যা সর্বোচ্চ মাত্রার বস্তুনিষ্ঠতার দাবিদার। এমনকি, গ্রিলপার্জার২৩ তো এমনটাও ঘোষণা করে বসেছেন যে, ‘ইতিহাস আর কী-ই বা হতে পারে যদি না তা মানবচেতনার কাছে অভেদ্য ঘটনাবলী বোঝার জন্য নেহাতই মানবিক একটি উপায় হয়; যে ঐক্যের কথা একমাত্র ঈশ্বরের অবগত সেই ঐক্যে অন্বিত করে বস্তুরাজিকে দেখার একটা চেষ্টা হয়; অবোধ্যকে বোধ্য দিয়ে প্রতিস্থাপিত করার এক প্রয়াস হয়; যা হাজার হাজার ক্ষুদ্র কারণের ঠেলায় ঘটনাচক্রের অনির্দিষ্টতায় বিন্যস্ত, তার অভিপ্রায়, যদি বা থাকে, কঠোরভাবেই অন্তর্লীন হয়ে তাকে, তার উপর সামগ্রিকভাবে অভিপ্রায়ের একটি ধারণা আরোপ করার পদ্ধতি হয়! একই সময়ে সমস্ত মানুষেরই নিজ নিজস্ব বাধ্যবাধকতা থাকে, যে কারণে কোটি কোটি পথরেখা, এঁকেবেঁকে বা সোজা, পরস্পরের সমান্তরালে ধাবিত হয়, একে অপরকে পণ্ড করে বা এগিয়ে দেয়, সমুখপানে বা পিছনপানে যেতে চেষ্টা করে, আর এভাবেই একে অপরের সাপেক্ষে অনির্ণেয় অনির্দিষ্টতা হয়ে ওঠে। তাই প্রকৃতির ঘটমানতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে সমস্ত ঘটনাবলীর নিয়ন্ত্রক হিসেবে সর্বাত্মক বাধ্যবাধকতা প্রতিষ্ঠা করতে পারে এমন কোনো বিষয় অনুমান করা অসম্ভব।’ কিন্তু ঠিক এই ধরনের বাধ্যবাধকতাকেই বস্তু সম্পর্কে ‘বস্তুনিষ্ঠ’ দৃষ্টিভঙ্গির ফলস্বরূপ জাজ্বল্যমান করে তোলার কথা ভাবা হয়ে থাকে! এ এমন এক পূর্বানুমান যা কোনো ইতিহাসবিদের দ্বারা বিশ্বাসের বস্তু হিসেবে গৃহীত হলে অদ্ভূত রূপ ধারণ করে; এই পূর্বানুমানের নিখাদ বিষয়ীগত চরিত্র নিয়ে শিলার কোনো ধোঁয়াশা রাখেননি যখন তিনি ইতিহাসবিদদের নিয়ে বলেছিলেন: ‘একের পর এক প্রতীতি অন্ধ আপতিকতা ও সীমাহীন স্বাধীনতার জগৎ পরিত্যাগ করে এমন এক সুসঙ্গত সমগ্রের মানানসই অংশ হিসেবে নিজ স্থান করে নিতে থাকে যে সমগ্রের অস্তিত্ব কেবলমাত্র ইতিহাসবিদের নিজ কল্পনাতেই আছে’। কিন্তু একজন সর্বগুণধারী প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ যখন অনুলাপ ও আজগুবি-কথনের মাঝে পাক খেতে খেতে দাবি করে বসেন: ‘আসল কথাটা হলো এই যে মানুষের সমস্ত ক্রিয়াই বস্তুনিচয়ের শক্তিশালী অপ্রতিরোধ্য গতিমুখের অধীন, যদিও অনেকসময়ই তা দৃষ্টিগোচর না-ও হয়ে উঠতে পারে’--- তখন কী আর করার থাকে? মনে হতে পারে যে এহেন উক্তি সেইসব রহস্যময় প্রজ্ঞার মোড়কে হাজির হওয়া নিখাদ মূর্খতার শামিল, যার উদাহরণ গ্যেটে-র রাজবাগানের মালি-র এহেন উক্তি: ‘প্রকৃতি নিজেকে অন্যের হাতে বাধ্য হতে দিতে পারে কিন্তু প্রকৃতিকে বাধ্য করা যায় না’, বা জোনাথন সুইফ্ট মেলামাঠের যে বিজ্ঞাপনের কথা লিখেছিলেন: ‘এখানে দেখতে পাওয়া যাবে সেই হাতি যা তাকে নিজেকে বাদ দিলে পৃথিবীর বৃহত্তম’। কিন্তু এমনটা মনে হলেও ঠিক তা নয়। কারণ, মানুষদের ক্রিয়া এবং বস্তুনিচয়ের গতিমুখ--- এই দুইকে একে অপরের থেকে আলাদা করা যায় কীভাবে? আমার মনে হয়, সাধারণভাবে এটা বলা যায় যে, সদ্য উদ্ধৃত করা সর্বগুণধরের মতো ইতিহাসবিদরা যখনই সাধারণীকরণ করতে শুরু করেন, তখনই তাঁরা তাঁদের অনচ্ছ পরিভাষার অন্তর্গত দুর্বলতাগুলোকে আর ঢেকে রাখতে পারে না। অন্য সব বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে সাধারণীকরণ হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বস্তু, যে মাত্রায় তা নিয়মগুলোকে প্রকাশ করে। কিন্তু এখানে উদ্ধৃত ইতিহাসবিদের উদ্ধৃতিটিকে যদি আমরা নিয়ম বলে গণ্য করতে যাই, তাহলে ধরে নিতে হয় যে ইতিহাসবিদদের কাজ পণ্ডশ্রম বৈ আর কিছু নয়, কারণ ওই উক্তি থেকে অনচ্ছ পরিভাষার জঞ্জাল সরিয়ে ফেললে সম্পূর্ণ চেনা তুচ্ছ কিছু বিষয় ছাড়া আর কিছু পড়ে থাকে না, এমনকি সবচেয়ে ছোটোখাটো সমেত সব রকমের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই যা অতি স্বাভাবিক বলে মনে হবে। একাধিক জাতিদের হয়রান করে বছরের পর বছর ক্লান্তিকর খাটুনি খেটে পরীক্ষানিরীক্ষার পাহাড়ের উপর আরো পরীক্ষানিরীক্ষা স্তূপীকৃত করতে থাকা, কিন্তু তার থেকে যে নিয়ম নিষ্কাশিত হওয়ার কথা তা নাকি বহু আগেই নিষ্কাশিত হয়ে যথাযথেষ্ট পরিমাণে প্রমাণিত ও প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে--- পরীক্ষানিরীক্ষার এই উপছে-পড়া অর্থহীনতা সেই জোলনার২৪-এর সময় থেকেই প্রকৃতিবিজ্ঞানের কাঁধে ভূতের মতো চেপে বসেছে। কোনো নাটকের মূল্য যদি শুধুমাত্র তার উপসংহারের উপরই নির্ভর করে, তাহলে নাটকটি হয়ে উঠবে সেই উপসংহারে পৌঁছানোর সবচেয়ে ক্লান্তিকর ঘুরপথ। তাই আমি কামনা করি যে এমনটা ভেবে নেওয়া হবে না যে সাধারণীকরণের মধ্য দিয়ে পৌঁছানো প্রস্তাবগুলোর মধ্যেই ইতিহাসের তাৎপর্য নিহিত আছে, সেই সাধারণীকরণগুলোকেই গোটা প্রচেষ্টার অন্তিম ফুল ও ফল হিসেবে গণ্য করা হবে না, বরং ওই বিমূর্ত জাঁকজমকের পরিবর্তে চেনা প্রাকৃত বিষয়গুলো অবলম্বন করে প্রাত্যহিকতার সুরের উপরই অনুপ্রাণিত বৈচিত্র্য রচনা করে তাকে একটা বুদ্ধিগম্য সংকেত রূপে ফুটিয়ে তোলা হবে, আর সেভাবেই মূল সুরসংকেতের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা, গভীরতা ও সৌন্দর্যের গোটা এক জগতকে উন্মোচিত করা হবে।

এর জন্য অবশ্য সব থেকে বেশি দরকার বিপুল পরিমাণ নান্দনিক বোধ, সৃজনশীল দৃষ্টিভঙ্গি, অভিজ্ঞতালব্ধ তথ্য সাদরে শুষে নেওয়ার ক্ষমতা, যে কোনো প্রদত্ত ধাঁচাকে আরো বিকশিত করার মতো কল্পনাশক্তি--- আর যারপরনাই বস্তুনিষ্ঠতাও প্রয়োজন, তবে তা অবশ্যই সদর্থক চরিত্র হয়ে ওঠে এমন বস্তুনিষ্ঠতা। প্রায়শই বস্তুনিষ্ঠতা কেবল একটি কথার কথা থেকে যায়। শিল্পীর চোখ বাইরে প্রশান্ত হলেও তার ভিতরে সদা ঝলক কাটতে থাকে, অথচ বস্তুনিষ্ঠতার নামে তার বদলে এক ধরনের মেকী প্রশান্তির খোলস তৈরি হয়, ঠিক যেমন সংবেদনহীনতা ও নৈতিক দুর্বলতাকে সর্বভেদী নিরুত্তাপ ও নির্লিপ্তি বলে চালানো হয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভাবনাচিন্তা কেবল তুচ্ছতার মধ্যেই ডুবে থাকে, ক্লান্তিকর কিছু দৈনন্দিনতাকেই স্থির প্রশান্ত প্রজ্ঞা বলে ভ্রম করা হয়, তাকেই নান্দনিকতা বলে হাজির করা হয়, আর বিষয়ী বোবা হয়ে অনুভববেদ্যতার বাইরে নির্বাসিত হয়। তখন ব্যাপারটা দাঁড়ায় এমন: সেই বুলিই ঠিক, যে বুলি একেবারে রসকষহীন, কোনোভাবেই যা কোনো আবেগ উসকে দেয় না। এমনকি এতদূর অবধি তা বিস্তৃত হয় যে মনে করা হয়ে থাকে সেই ব্যক্তিই অতীত কোনো মুহূর্তকে বর্ণনা করার জন্য সবচেয়ে বেশি যোগ্য যার কাছে সেই মুহূর্তটি নিয়ে কিছুই এসে যায় না। ধ্রুপদীবিদ এবং তাদের চর্চার বিষয় প্রাচীন গ্রিকদের মধ্যে সম্পর্ক প্রায়শই ঠিক এমন হয়: একে অপরকে নিয়ে তাদের কিছু যায় আসে না--- আর এই অবস্থাটিকেই ‘বস্তুনিষ্ঠতা’ নাম দেওয়া হয়েছে! উচ্চতম ও বিরলতম বস্তুকে যখন উপস্থাপিত করার পালা আসে, ঠিক তখনই এই আড়ম্বরপূর্ণ নির্লিপ্তি সবচেয়ে অসহ্য হয়ে ওঠে, কারণ ইতিহাসবিদের অসার অহংকারই তার মধ্য দিয়ে ফুটে বের হয়। এই সব ইতিহাসলেখকদের দেখলে মনে হয় যে মানুষ যতো নির্বোধ হয়, তার অহংকার ততো বাড়তে থাকে। এসবে ক্ষান্ত দিয়ে অন্তত সৎ হওয়ার চেষ্টাটাতো করো! ন্যায়নিষ্ঠতার ভয়ংকর বৃত্তি যদি তোমায় আকর্ষণ না করে থাকে, তবে মিছেই ন্যায়ের স্বরূপ খুঁজে বেড়ানোর ভান কোরো না, এমন প্রহসন তৈরি কোরো না যেনবা প্রতিটি যুগের অবশ্যকর্তব্য হলো আদি-অনন্ত-কাল ধরে অস্তিত্বমান সমস্তকিছুর প্রতি ন্যায়নিষ্ঠ হওয়া! এমনকি হয়তো এতো দূর অবধি বলা যায় যে কোনো যুগ বা সে যুগের প্রজন্মের অন্য কোনো যুগ বা সেই যুগের প্রজন্মের বিচার করতে বসার অধিকার নেই: সেই অতি অস্বস্তিকর দায়িত্বটি অতি বিরল গুণের কিছু ব্যক্তিই পালন করতে পারে। কে তোমাদের সবাইকে এই বিচার করতে বসার জন্য মাথার দিব্যি দিয়েছে? আর তাছাড়া, আগে একবার নিজেরা নিজেদের একটু পরীক্ষা করে দেখো তো ইচ্ছে করলেই তোমরা নিজেরা একেবারে ন্যায়নিষ্ঠ হয়ে যেতে পারো কিনা! যদি বিচারক হতে চাও, যার বিচার করছো তার থেকে উচ্চতর অবস্থানে তোমায় দাঁড়াতে হয়; অথচ যার বিচার করতে যাচ্ছো তার সমস্তরেই কি তুমি দাঁড়িয়ে নেই? কোনো আহারসভায় শেষে যারা আসে তাদের শেষদিকের আসনগুলিতে বসেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়, আর তোমার কি একেবারে প্রথম সারির আসনটি ছাড়া চলবে না? তাহলে অন্তত কোনো মহান উচ্চ কাজ আগে করে দেখাও; তাহলে হয়তো তুমি দেরিতে এলেও প্রথমসারির কেউ তোমার জন্য জায়গা ছেড়ে দিলেও দিতে পারে! 

অতীত ব্যাখ্যা করার উদ্যোগ নিলে তা কেবলমাত্র বর্তমানের প্রাণশক্তির পূর্ণতম নিয়োগের মাধ্যমেই সম্ভব: তুমি তোমার মহত্তম গুণগুলো সর্বশক্তিতে নিয়োগ করলে তবেই তুমি বুঝতে পারবে অতীত থেকে কী জানা দরকার ও কী সংরক্ষণ করা প্রয়োজনীয়। নয়তো সবই সমান-সমান, অতীতকেও তুমি হেঁচড়ে নামিয়ে আনবে তোমার স্তরে। বিরলতম চিন্তকদের মস্তিষ্ক থেকে উৎসারিত হয়নি যে ইতিহাস-বর্ণনা, তা বিশ্বাস কোরো না। বিরলতম চিন্তকের গুণ তুমি চিনতে পারবে যখন তাকে সার্বজনীন কিছু প্রকাশ করতে হয় বা কোনো সর্বজনজ্ঞাত বস্তুকে পুনরাবৃত্ত করতে হয়: প্রকৃত ইতিহাসবিদের সেই ক্ষমতা থাকে যার মাধ্যমে সে সর্বজনজ্ঞাত বস্তুকে অশ্রুতপূর্ব কোনো বস্তুতে রূপান্তরিত করতে পারে, সার্বজনীনকে এতো গভীর ও সরলভাবে প্রকাশ করতে পারে যে সরলতা ও গভীরতা একে অপরের মধ্যে মিশে এক হয়ে যায়। অগভীরে বিচরণকারী কোনো ব্যক্তি কখনোই মহান ইতিহাসবিদ বা শিল্পী হতে পারে না। অবশ্য যাদের পক্ষে নিশ্চিতভাবেই কোনোদিন মহান ইতিহাসবিদ হওয়া সম্ভব নয়, সেই পরিশ্রমকারীদের এদিক থেকে ওদিকে সরানোর কাজ বা বহনের কাজকে খাটো করা কখনোই উচিত নয়, কিন্তু তার থেকেও বেশি উচিত নয় মহান ইতিহাসবিদদের সঙ্গে তাদের গুলিয়ে ফেলা, বরং যথাযোগ্য সম্মান দিয়েই তাদের সেই প্রয়োজনীয় শিক্ষানবিশ বা সাহায্যকারী হিসেবে গণ্য করা উচিত যারা ওস্তাদের অধীনে কাজ করে চলেছে। ফরাসিরা যখন historiens de M. Thiers বলে, তখন তারা জার্মানদের থেকে অনেক সাদাসিধেভাবে এ ব্যাপারটা প্রকাশ করে থাকে। এই পরিশ্রমকারীরা ধীরে ধীরে বড়ো পণ্ডিত হয়ে উঠতে পারে, কিন্তু তা বলে কখনোই ওস্তাদ ইতিহাসবিদ হয়ে উঠতে পারে না। বড়ো পণ্ডিত আর বড়ো অগভীরচারী--- একই টুপির নীচে এই দুই মাথা বেশ ভালোভাবে সেঁটে যায়।

সারসংকলন করে বললে বলতে হয় যে অভিজ্ঞ ও মহত্তর ব্যক্তির দ্বারাই ইতিহাস লেখা হতে পারে। অন্যদের চেয়ে মহত্তর ও উচ্চতর অভিজ্ঞতা যার হয়নি, সে কখনোই অতীতের মহত্তর ও উচ্চতর বিষয়গুলোকে ব্যখ্যা কীভাবে করা যায় তা জানতে পারে না। অতীত যখন কথা বলে, তখন তা দৈববাণীর স্বরেই কথা বলে: যদি বর্তমান তোমার জানা হয় এবং তুমি ভবিষ্যতের কারিগর হও, তবেই তুমি সেই বাণী বুঝতে পারবে। প্রাচীন গ্রিসে ডেলফি মাত্রায় ও ব্যাপ্তিতে যে অসাধারণ প্রভাব বিস্তার করতো, আজ তা ব্যাখ্যা করা হয় প্রধানত এই বলে যে অতীতের নির্ভুল জ্ঞান ডেলফির পুরোহিতদের করায়ত্ত ছিলো। এখন এটা বলা সমীচীন হবে যে অতীতকে বিচার করার অধিকার একমাত্র তারই আছে যে ভবিষ্যতকে গঠন করছে। যদি তুমি সামনের দিকে তাকিয়ে নিজের জন্য একটি মহান লক্ষ্য স্থির করো, তাহলে তার মধ্য দিয়েই তুমি আসলে বর্তমানকে ঊষর মরুভূমি হিসেবে দেখার প্রবণতাকে এবং সব প্রশান্তি, শান্তিপূর্ণ বৃদ্ধি বা বিকাশকে অসম্ভব ঘোষণা করার গড়পড়তা বিশ্লেষণী প্রবণতাকে সংযত করছো। নিজের চারপাশে মহান সর্বতোচারী আশার এক বেড়া বাঁধো, আশাপূর্ণ প্রচেষ্টার বীজ বপন করো। উত্তরাধিকারের শিকলে হাত-পা বাঁধা পড়ে থাকার কুসংস্কার ভুলে নিজের ভিতরে সেই ছবি রচনা করো যা অনুযায়ী ভবিষ্যৎ মূর্ত হয়ে উঠবে। ভবিষ্যতের জীবন নিয়ে ভাবতে গেলে ভাবার ও উদ্ভাবন করার মতো বিষয়ের অভাব ঘটবে না, কিন্তু ইতিহাসকে কখনো সেই জীবনের দিশা ও পন্থা নিয়ে প্রশ্ন করো না, ইতিহাস তা বলতে পারে না। মহৎ মানুষদের ইতিহাস সম্পর্কে প্রাণময় জ্ঞান যদি অর্জন করতে পারো, তা তোমায় এই সর্বোচ্চ নির্দেশিকাটি দেবে: তোমাকে অবিকশিত অবস্থায় রেখে যাতে তোমাকে সম্পূর্ণত শাসন ও শোষণ করে যাওয়া যায় তার জন্য বর্তমান যুগ তোমার উপর যে পক্ষাঘাত-বিস্তারকারী পালনপ্রক্রিয়া আরোপ করে রেখেছে, তা থেকে নিজেকে মুক্ত করো এবং পরিপক্ক হয়ে ওঠো! আর যদি মানুষের জীবনীর খোঁজ করো, তাহলে যেগুলোর মলাটে লেখা আছে ‘মহাশয় অমুক-তমুক এবং তাঁর সময়’ সেগুলোকে ছুঁয়েও দেখো না, বরং যার মলাট বলছে ‘নিজের সময়ের বিরুদ্ধে লড়াই করে যাওয়া এক মানুষ’ সেই বই বেছে নাও। প্লুটার্ক২৫ দিয়ে নিজের আত্মার ক্ষুধা নিবৃত্ত করো, আর যখন তাঁর দ্বারা বর্ণিত নায়কদের বিশ্বাস করবে, তখন একইসঙ্গে নিজের উপরও বিশ্বাস রেখো। এই অনাধুনিক উপায়ে, অর্থাৎ, পরিপক্ক হয়ে বীরত্বপূর্ণ প্রচেষ্টায় অভ্যস্ত হয়ে ওঠার পালনপ্রক্রিয়ায় যদি একশো জন মানুষও আজ বড়ো হয়ে ওঠে, তাহলে আমাদের এই বর্তমান যুগের ঢক্কানিনাদ-সর্বস্ব মেকী সংস্কৃতিকে চিরদিনের মতো স্তব্ধ করে দেওয়া যাবে।

 

 

ইতিহাসানুগত্যের বোধ যখন লাগামছাড়া কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে আর তার সমস্ত প্রভাবগুলো ডাগর হয়ে ওঠে, তখন তা ভবিষ্যতকে উচ্ছিন্ন করে দেয়। কারণ, তখন তা মায়াবিভ্রম ধ্বংস করার মধ্য দিয়ে একমাত্র যে মায়া-পরিবেশে অস্তিত্বমান বস্তুরা জীবনধারণ করতে পারে তা কেড়ে নেয়। তাই যথার্থতম হলেও, বা পবিত্রতম উদ্দেশ্যে প্রযুক্ত হলেও, ইতিহাসানুগ ন্যায়বিচার একটি ভয়ঙ্কর গুণ--- তা সবসময় প্রাণময় বস্তুদের দাঁড়ানোর জমি কেড়ে নিয়ে পতন ডেকে আনে: তার বিচার সবসময় প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। ইতিহাসানুগত্যের প্রয়াসের সঙ্গে নবনির্মাণের প্রয়াসও যদি মিশে না থাকে, ধ্বংস ও সাফাই করা যদি ইতিমধ্যেই আগাম প্রাণ-ইশারা জানানো কোনো ভবিষ্যতকে বসতভিটা প্রস্তুত করে দেওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে না হয়, ন্যায়পরতাই যদি একাধিপত্য বিস্তার করে, তাহলে সৃজন-প্রবৃত্তি নিস্তেজ শক্তিহীন হয়ে মুখ লুকোবে। যেমন ধরা যাক, যে ধর্ম নিখাদ ইতিহাসগত ন্যায়বিচারের শাসন কায়েম করে ইতিহাসগত জ্ঞান হিসেবে নিজেকে রূপান্তরিত করে নেওয়ার উদ্দেশ্য দ্বারা চালিত, যে ধর্ম আদ্যোপান্ত বিজ্ঞান ও পাণ্ডিত্যের বস্তু হিসেবে নিজেকে হাজির করে, সে নিজের এই অভিপ্রেত প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করার মধ্য দিয়েই নিজেকে ধ্বংস করে। কারণ, ইতিহাসানুগ যাচাই-প্রক্রিয়া সবসময় এতো বিপুল পরিমাণ মিথ্যা, স্থূলতা, অমানবিকতা, অর্থহীনতা ও হিংসা উন্মোচিত করতে থাকে যে পবিত্র মায়াবিভ্রমের যে আবেশমাঝেই একমাত্র প্রাণধারণেচ্ছুরা প্রাণ যাপন করতে পারে সেই আবেশটা বাধ্যতামূলকভাবে ভেঙে পড়ে। একমাত্র প্রেমের মধ্যে, প্রেমের দ্বারা উৎপাদিত মায়াবিভ্রমের ছায়ায়, মানুষ সৃজনশীল হয়ে উঠতে পারে। নিঃশর্তভাবে প্রেম করায় যেকোনোরূপ বাধা মানুষের আত্মশক্তির শিকড়গুলোকেই উচ্ছিন্ন করে দেয়, মানুষ শুকিয়ে মরে, অর্থাৎ, অসৎ হয়ে ওঠে। এই প্রভাব বিস্তারের দিক থেকে দেখলে, ইতিহাস হলো নন্দনকলার হদ্দ বিপরীত, আর একমাত্র যদি ইতিহাসকে একটি নন্দনকলাজাত বস্তুতে রূপান্তরিত করার পরও তাকে ইতিহাস বলা যায়, তবেই তা হয়তো প্রাণপ্রবৃত্তিগুলোকে বাঁচিয়ে রেখে উদ্দীপিতও করতে পারে। তেমন কোনো ইতিহাসরচনা-প্রচেষ্টা অবশ্য আমাদের এই সময়ে কেতা হয়ে ওঠা বিশ্লেষণাত্মক ও নন্দনবোধহীন প্রবণতাগুলোর সম্পূর্ণ বিপরীত হবে, আর আজকের কেতাধারী পণ্ডিতরা তাকে মিথ্যা বলে ঘোষণা করবে। কিন্তু আভ্যন্তরীণ প্রবণতার তাগিদে ভাস্বর সৃজনদিশা যে ইতিহাসের নেই, যে ইতিহাস সেই কারণেই ধ্বংস ছাড়া আর কিছু করতে পারে না, তা দীর্ঘমেয়াদে নিজের হাতিয়ারগুলোকেই অপ্রকৃতিস্থ করে তোলে: কারণ সেমত মানুষ মায়াবিভ্রম ধ্বংস করে চলে আর ‘নিজের ও অন্যদের ভিতরের মায়াবিভ্রমগুলো ধ্বংস করে যারা, তারা শাস্তি পায় প্রকৃতির হাতে, যে প্রকৃতির চেয়ে নিষ্ঠুরতর স্বেচ্ছাচারী আর কেউ হতে পারে না’। অবশ্য এটা সত্য যে, বেশ এক দীর্ঘ সময় ধরেই কেউ সম্পূর্ণ নির্মল ও নিরীহ ভাবে নিজেকে ইতিহাস নিয়ে ব্যাপৃত রাখতে পারে, যেনবা তা অন্য যেকোনো বৃত্তির মতোই আরেকটি বৃত্তি মাত্র। বিশেষত, সাম্প্রতিক ধর্মতত্ত্ব যেনবা অনাবিল নিষ্পাপ ভাবে ইতিহাসের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেছে, আর এখনও সে প্রায় দেখেও না দেখার ভান করে চলেছে যে এর মধ্য দিয়ে হয়তো নিজের অভিপ্রায়ের বিরুদ্ধেই সে নিজেকে ভলতেয়রিয় écrasez২৬-এর সেবায় নিযুক্ত করেছে। এর মধ্যে কোনো ক্ষমতাশালী নতুন সৃজনশীল প্রবৃত্তি লুকিয়ে আছে বলে ভাবার কোনো কারণ নেই, যদি না কেউ তথাকথিত ‘প্রোটেস্টান্ট ইউনিয়ন’২৭-কে একটি নতুন ধর্মের পত্তন বলে মনে করেন, বা, আইনজ্ঞ হোল্টজেনডর্ফ-কে (যিনি আরো বেশি সমস্যাপূর্ণ প্রোটেস্টান্ট বাইবেল-এর সম্পাদক ও ভূমিকা-লেখক) জর্ডান নদীতীরের জন দি ব্যাপটিস্ট-এর নতুন অবতার বলে ধরে নেন। এখনও কিছু দিনের জন্য হয়তো প্রবীণতর মস্তিষ্কগুলোর মধ্যে ধিকিধিকি জ্বলতে থাকা হেগেলিয় দর্শনের অঙ্গারগুলো এহেন হাবাগবা ভাবনা ছড়ানোর কাজ করে যাবে: হয়তো তারা শেখাতে চেষ্টা করে যাবে কীভাবে খ্রিস্টধর্মের বহুবিধ ত্রুটিপূর্ণ ‘প্রতীত রূপ’-এর মধ্য থেকে ‘খ্রিস্টধর্মের ধারণা’-র নিখাদ অন্তঃসারটিকে আলাদা করে নেওয়া যায়, এমনকি নিজেকে এটা বুঝিয়ে সন্তুষ্ট রাখা যায় যে ‘পরমভাব-এর বেছে নেওয়া পথ’-ই হলো খাঁটি থেকে আরো খাঁটি রূপ ধরে নিজেকে উন্মোচিত করতে করতে যাওয়া, আর সর্বশেষে তা সমকালের স্থূলবুদ্ধি উদারপন্থী ধর্মতাত্ত্বিকদের মগজেই সবচেয়ে খাঁটি, সবচেয়ে স্বচ্ছ, অদৃশ্যপ্রায় চেহারায় নিজেকে উন্মোচিত করবে। কিন্তু যখন এই খাঁটির-চেয়ে-আরো-খাঁটি খ্রিস্টানরা পূর্ববর্তী অ-খাঁটি খ্রিস্টানদের নিয়ে আলোচনা করে, যে কোনো নিরপেক্ষ শ্রোতারই মনে হবে যে অধিকাংশ সময় তারা যা নিয়ে কথা বলছে তার সঙ্গে খ্রিস্টধর্মের কোনো যোগাযোগ নেই। কী তার মানে? ‘এই শতকের সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্মতত্ত্ববিদ’ উপাধিতে অভিষিক্ত ব্যক্তিটি২৮ যখন খ্রিস্টধর্মের চরিত্রায়ন করেন এমন এক ধর্ম হিসেবে যা ‘সমস্ত অস্তিত্বমান ধর্ম এবং লেশমাত্র-সম্ভব অন্য সমস্ত ধর্মের মধ্যেই নিজেকে আবিষ্কার করতে পারে’, যখন তাঁর ধারণামতে ‘প্রকৃত চার্চ’-কে হয়ে উঠতে হবে ‘এমন এক বহমান গণপিণ্ড যেখানে কোনো সীমারেখা নেই, যেখানে প্রতিটা অংশই কখনও এখানে তো কখনও ওখানে, আর সবকিছু যেখানে নিবিড় প্রশান্তিতে একে অপরের সঙ্গে মিশে যায়’--- তখন, আবারও, এর মাথামুণ্ডু বোঝা যায় কীভাবে?

খ্রিস্টধর্মের ক্ষেত্রে দেখা যায় যে ইতিহাসানুগ রূপান্তরের মধ্য দিয়ে ক্রমশ স্বপ্রকৃতি ধ্বংস হয়েছে, অবশেষে সম্পূর্ণ ইতিহাসগত, অর্থাৎ, ন্যায়বিচারগত বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে তা হয়ে উঠেছে খ্রিস্টধর্ম সম্পর্কিত খাঁটি জ্ঞান, আর এর মধ্য দিয়েই তা ধ্বংস হয়েছে। এই যা খ্রিস্টধর্মের ক্ষেত্রে ঘটেছে, প্রাণময় যে কোনো বস্তুর ক্ষেত্রেই তা দেখা যায়: সম্পূর্ণ বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে যাওয়ার পর তা মৃত বস্তুতে পরিণত হয়, তাকে নিয়ে যখন ইতিহাসগত কাটাছেঁড়া চলতে থাকে তখন তা যন্ত্রণাপূর্ণ মুমূর্ষু জীবন যাপন করে। এমন কিছু মানুষ আছেন যাঁরা মনে করেন যে জার্মানদের রূপান্তর ও সংস্কারসাধনে জার্মান সঙ্গীত ভূমিকা নিতে পারে, যখন তাঁরা দেখেন মোৎজার্ট ও বিঠোফেন-এর মতো মানুষদের পণ্ডিত-লিখিত জীবনীর ধুলোয় ঢেকে ফেলে ইতিহাসানুগ সমালোচনার পীড়নযন্ত্রগুলো প্রয়োগ করে হাজার হাজার অপ্রাসঙ্গিক বেহায়া প্রশ্নের উত্তর-নিষ্কাশন করা হচ্ছে, তখন তাঁরা আমাদের সংস্কৃতির এই সবচেয়ে প্রাণময় অংশটির উপর এহেন অন্যায় পীড়ন দেখে যৎপরনাই ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠেন। যার প্রাণময় প্রভাব এখনও নিঃশেষিত হয়ে যায়নি, তার জীবন ও ক্রিয়াকে যখন অতিকৌতূহলী বিচারপ্রক্রিয়ায় অগুন্তি খুঁটিনাটি ছেঁড়াকাটায় ছিন্নভিন্ন করা হয় এবং সব সমস্যাকে অগ্রাহ্য করে কীভাবে বাঁচতে হয় তা শেখার বদলে জ্ঞানোৎপাদন-সমস্যা নিরসন করতে চাওয়া হয়, তখন কি সেই প্রাণময় বস্তুগুলোর অকালমৃত্যু বা পক্ষাঘাত ঘটানো হয় না? কল্পনা করে নেওয়া যাক যে এহেন কিছু আধুনিক জীবনীকারকে তুলে নিয়ে গিয়ে খ্রিস্টধর্মের জন্মের স্থান-কাল-এ বা লুথারীয় সংস্কার-আন্দোলনের জন্মের স্থান-কাল-এ ছেড়ে দেওয়া হয়েছে--- তাদের অপ্রমত্ত বাস্তববাদী কৌতূহলই যথেষ্ট হয়ে উঠবে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন যে কোনো কর্মকে অসম্ভব করে তোলার জন্য: ঠিক যেমন অতি ক্ষুদ্র বেচারা কোনো প্রাণীও ওক ফল, ওক বীজ খেয়ে সাবাড় করে দেওয়ার মধ্য দিয়ে সবলতম বিরাট ওক গাছের অস্তিত্বধারণের সম্ভাবনাকেই শেষ করে দিতে পারে। সমস্ত প্রাণময় বস্তুর লালনের জন্যই তার চারদিকে রহস্যময় কুয়াশাচ্ছন্ন বাষ্পের মতো এক বায়ুমণ্ডল দরকার হয়, যদি তা থেকে তাদের বঞ্চিত করা হয়, যদি কোনো ধর্ম, নন্দনকর্ম বা প্রতিভাধারীকে কোনো তারার মতো বায়ুমণ্ডলহীন পরিসরে পাক কাটতে বাধ্য করা হয়, তবে অতি দ্রুতই তারা ক্ষয়ে শুকিয়ে শক্ত হয়ে নিষ্ফলা হয়ে ওঠে। সব মহান বস্তুর ক্ষেত্রেই এ কথা প্রযোজ্য, মেইস্টারসিঙ্গার অপেরায় যেমন হান্স স্যাক‌স২৯ বলেছেন: ‘কিছু মায়াবিভ্রম ছাড়া কখনো সাফল্য আসে না।’

আর একইভাবে প্রতিটি জাতি, এমনকি প্রতিটি মানুষেরও পরিপক্ক হয়ে ওঠার জন্য এমনই এক পরিবেষ্টনকারী মায়াবিভ্রম প্রয়োজন, যা মেঘের মতো আচ্ছাদিত করে রেখে তাকে রক্ষা করবে। আজকালকার দিনে অবশ্য পরিপক্কতাকে ঘৃণার চোখে দেখা হয়, কারণ জীবনের থেকে অনেক বেশি সম্মান দিয়ে ইতিহাসের আসন পাতা হয়েছে। বাস্তবিকপক্ষেই এখন উল্লাস প্রকাশ করা হয়ে থাকে যে ‘বিজ্ঞান অধুনায় জীবনের উপর আধিপত্য ফলাতে শুরু করেছে’। হয়তো সত্যিই সেই আধিপত্য ফলানো শুরু হয়েছে, কিন্তু সেহেন আধিপত্যে বাঁধা জীবনের খুব কিছু মূল্য নেই। জ্ঞানের আধিপত্যে বাঁধা না পড়ে যে জীবন প্রবৃত্তি ও ক্ষমতাশালী মায়াবিভ্রম দ্বারা চালিত ছিলো, সেই জীবনের তুলনায় এই বিজ্ঞানচালিত জীবনে যাপনের পরিসর অনেক কম এবং ভবিষ্যতের পথেও জীবনের ধারা ক্রমশ শুকিয়ে যেতে থাকে। কিন্তু আগেই বলেছি যে এই বর্তমান যুগ সম্পর্কে ধরে নেওয়া হয়েছে যে তা সম্পূর্ণ, পরিপক্ক ও সুসঙ্গত ব্যক্তিত্বদের যুগ নয়, যথাসম্ভব সর্বোচ্চ সাধারণ উপযোগিতার যুগ। তার মানে অবশ্য দাঁড়ায় এই যে যুগের উদ্দেশ্যগুলোর সঙ্গে খাপ খাইয়ে মানুষদের যতো দ্রুত সম্ভব নিয়োগযোগ্য করে তুলতে হবে: পরিপক্ক হয়ে ওঠার আগেই তাদের সাধারণ কল্যাণের কারখানাগুলোয় শ্রম করাতে হবে, এমনকি সেজন্য খেয়াল রাখা হবে যাতে তারা সত্যিই পরিপক্ক না হয়ে ওঠে, কারণ পরিপক্কতা তো এক ধরনের বিলাসবস্তু যাতে মজে ‘শ্রম-বাজার’ থেকে বড়ো পরিমাণ শ্রমশক্তি গায়েব হয়ে যেতে পারে। কিছু কিছু পাখিকে অন্ধ করে দেওয়ার রেওয়াজ আছে যাতে তারা আরো সুন্দর করে গান গাইতে পারে; এমনটা আমার মনে হয় না যে আজকের মানুষরা তাদের পূর্বপুরুষদের চেয়ে ভালো গাইতে পারে, কিন্তু আমি জানি যে তাদের অন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। যে উপায়ে, কুখ্যাত যে উপায়ে, তাদের অন্ধ করা হয়েছে তা হলো অতি অতর্কিতে অতি উজ্জ্বল, অতি অসমঞ্জস তীব্র আলো তাদের চোখে ফেলা। একজন তরুণকে সহস্র সহস্র বছরের কালপ্রবাহের ঘূর্ণিস্রোতের মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়: যুদ্ধ, কূটনৈতিক কার্যকলাপ, বাণিজ্যিক নীতি সম্পর্কিত অ-আ-ক-খ-টুকু যারা বোঝে না, ধরে নেওয়া হয় যে তারা রাজনৈতিক ইতিহাস পড়া শুরু করার জায়গায় আছে। এই নাকাল যুবরা ইতিহাসপাঠের ঘূর্ণিপাকের মধ্য দিয়ে প্রাণপণ ছুটতে থাকে, যেমন আমরা সমস্ত আধুনিক মানুষরা নন্দনকেন্দ্রগুলোর চিত্রপ্রদর্শনী বা সঙ্গীতসভার মধ্য দিয়ে ছুটতে থাকি। কোন ধ্বনিটি কার থেকে আলাদা, কীভাবে ভিন্ন ভিন্ন প্রভাব সঞ্চারিত করে ভিন্ন ভিন্ন বস্তু--- এভাবে ভিন্নতা-অপরত্ব চেনার মতো বোধ ক্রমশ খুইয়ে ফেলতে ফেলতে আমরা আর কোনো কিছুতেই খুব বিস্ময় খুঁজে পাই না, শেষাবধি সবকিছুতেই আমরা একইরকমভাবে সন্তুষ্ট বোধ করি--- আর তাকেই তখন আমরা ইতিহাসগত বোধ বা ইতিহাসগত সংস্কৃতি নামে গৌরবাণ্বিত করি। আর মোলায়েম শব্দ দিয়ে শ্রুতিকটুত্ব এড়ানোর চেষ্টা না করলে বলতে হয়: এতো বিপুল এই নিরন্তর আমদানীর ভর, এতো দুর্বহভাবে আজব বর্বর হিংসাত্মক বস্তুগুলো তরুণ সত্তার উপর চেপে বসতে থাকে যে উদ্দেশ্যমূলকভাবে বোকার ভান করা ছাড়া কোনো উপায় পড়ে থাকে না। সচেতনতা আরো কিছুটা প্রখর ও সূক্ষ্ম হলে নিঃসন্দেহে আর একটি প্রতিক্রিয়া মাথাচাড়া দেয়: তা হলো নিখাদ বিতৃষ্ণা। তরুণ মানুষটি এতোই আশ্রয়হীন হয়ে পড়ে যে সমস্ত ধারণা ও প্রথাকেই সন্দেহ করতে থাকে। সে তখন জেনে যায়: প্রতিটি যুগই ভিন্ন, তুমি নিজে কেমন তা দিয়ে কিছু এসে যায় না। বিষাদময় নির্লিপ্তি নিয়ে সে মতামতের স্রোতকে বয়ে যেতে দেয় আর অনুভব করতে পারে প্রাচীন গ্রিক দার্শনিকদের জীবন ও শিক্ষা নিয়ে ডায়োজিনিস লয়েরসিয়াস৩০-এর লেখা পড়তে পড়তে হেল্ডারলিন৩১-এর যা অনুভূতি হয়েছিলো: ‘আগেও অনেকবার যা আবিষ্কার করেছি এখানে আবার তা খুঁজে পেলাম--- যে ভবিতব্যগুলোকে সাধারণত একমাত্র বাস্তব বলা হয়ে থাকে, সেসব থেকেও আমার কাছে প্রায় বেশি বিয়োগান্তক বলে ঠেকছে মানুষের চিন্তা ও তন্ত্রগুলোর ক্ষণস্থায়িত্ব ও পরিবর্তনীয়তা’। প্রাচীনজনেরা দেখিয়ে গেছেন যে ইতিহাসের দ্বারা এভাবে ভারাক্রান্ত ও ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা তরুণদের জন্য দরকারী কোনো অভিজ্ঞতা নয় তো বটেই, বরঞ্চ সর্বোচ্চ মাত্রায় বিপজ্জনকও বটে, আর এই বিপদের দিকটাই আধুনিকজনেদের মধ্য দিয়ে ফুটে বেরোচ্ছে। একজন রক্তমাংসের ইতিহাস-পড়ুয়াকে খেয়াল করলে দেখা যাবে যে কৈশোর কাটার আগেই তার মধ্যে দুর্বলতার উত্তরাধিকারচিহ্নগুলো ফুটে ওঠে। সে তার নিজের কাজ করার জন্য ‘পদ্ধতিগুলো’ রপ্ত করেছে, ওস্তাদ-সুলভ ঠাঁটবাঁট ও যথাযথ কৌশলগুলো আয়ত্ত করেছে, সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে আনা অতীতের একটি ছোট্ট অধ্যায়কে সে তার শেখা পদ্ধতি ও চতুরতার ঘায়ে কুপোকাত করেছে এবং তার মধ্য দিয়ে সে ইতিমধ্যেই কিছু উৎপাদন করে বসে আছে, বা আরো অহমিকাপূর্ণ শব্দটি ব্যবহার করলে, সে ইতিমধ্যেই কিছু ‘সৃষ্টি’ করে ফেলেছে। ফলস্বরূপ সে এখন ‘সত্য’-র সক্রিয় সেবক এবং ইতিহাসের জগৎজোড়া সাম্রাজ্যে জনৈক ভূস্বামী হয়ে উঠেছে। কৈশোর থেকেই ‘পক্ক’ হওয়ার অভ্যাস করতে করতে সে এখন অতিপক্ক হয়ে উঠেছে: কেবল তাকে ধরে একটু ঝাঁকানি দিলেই ঝনঝনিয়ে প্রজ্ঞা ঝরে পড়ে, কিন্তু সে প্রজ্ঞাফল পচে গেছে, প্রতিটি ফলেই পোকা ধরেছে। বিশ্বাস করুন, কোনো রসিকতা নয়: বিজ্ঞান উৎপাদনের কারখানাগুলোয় মানুষদের যদি পরিপক্ক হওয়ার আগেই শ্রমিক হিসেবে ঢুকিয়ে উৎপাদনশীল করে তোলা হয়, একদিকে যেমন এই শ্রমদাসদের সর্বনাশ করা হবে, অন্যদিকে ঠিক তেমনভাবে বিজ্ঞানকেও অচিরেই ধ্বংসাবশেষে পরিণত করা হবে। যে বস্তুগুলো উপযোগিতা বিচারের ঊর্ধ্বে ও জীবনের নিত্যপ্রয়োজনীয়তারও ঊর্ধ্বে বলে গণ্য হওয়া উচিত, সেগুলো সম্পর্কে বলতে গিয়ে দাসমালিক বা শ্রমিকদের নিয়োগকর্তাদের মুখের বুলি ব্যবহার করতে হওয়ায় আমি যারপরনাই অনুতপ্ত, কিন্তু পণ্ডিতকুলের এই সর্বশেষ প্রজন্মকে বর্ণনা করতে গেলে এই ‘কারখানা’, ‘শ্রমবাজার’, ‘চাহিদা-যোগান’, ‘মুনাফাদায়ী করা’ এবং আরো যা সব সহায়ক ক্রিয়াসকল অধুনা চূড়ান্ত অহংবোধ ব্যবহার করে থাকে সেগুলো আপনা থেকেই ঠোঁটে চলে আসে। নিখাদ মাঝারিয়ানা আরো বেশি করে মাঝারিয়ানার মধ্যে মুখ গোঁজে, অর্থনৈতিক মাপকাঠিতে বিজ্ঞান আরো বেশি বেশি করে মুনাফাদায়ী হয়ে উঠতে থাকে। সত্যি কথা বলতে কী, আমাদের সাম্প্রতিকতম পণ্ডিতরা একদিক থেকে খুব সেয়ানা, আর আজ অবধি এক্ষেত্রে তাদের চেয়ে বেশি সেয়ানা যে আর কেউ হয়ে উঠতে পারে নি তা মানতেই হবে, কিন্তু আর সবক্ষেত্রেই পুরাতনী পণ্ডিতদের চেয়ে (খুব সাবধানতা বজায় রেখে বললে) তারা সীমাহীনরূপে আলাদা। যাই হোক না কেন, তারা নিজেদের জন্য সম্মান ও সুবিধা দাবি করায় খুবই তৎপর, যেনবা তাদের আমদানী করা সমস্ত নতুন মুদ্রাকেই পুরাতন মুদ্রাগুলোর সমান মূল্য দিতে রাষ্ট্র ও জনমানস দায়বদ্ধ। গাড়োয়ানদের দল নিজেদের মধ্যে শর্ত করে নিজেরাই নিজেদের মহা প্রতিভাধর বলে চিহ্নিত করেছে এবং একই সঙ্গে প্রতিভা হলো অনাবশ্যক বাহুল্য বলে বিধান জারী করেছে; হয়তো কোনো ভাবীকাল দেখতে পাবে যে তাদের খাড়া করা বস্তুগুলো সব একে অপরের গায়ে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, কোনোটাই সে অর্থে কোনো নির্মাণ নয়। ‘শ্রমবিভাজন চলছে! সারিতে দাঁড়াও!’--- যুদ্ধ ও বলিদানের এই আধুনিক হুঙ্কারটি যারা অক্লান্তভাবে পুনরাবৃত্ত করে চলে তাদের অন্তত একবার সোজাসাপটাভাবে বলে দেওয়া দরকার: বিজ্ঞানকে যদি তোমরা যথাসম্ভব তড়বড়িয়ে ঠেলে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাও, যথাসম্ভব দ্রুত তার ধ্বংস ডেকে আনতেই তোমরা সফল হবে, ঠিক যেমন একটা মুরগিকে অতি তাড়াতাড়ি ডিম পাড়তে বাধ্য করলে তার মৃত্যু ঘটে। এই পণ্ডিতপ্রবরেরা যে খুব ঐকতানে বাঁধা থাকে তা অবশ্য নয়, তাদের কলকলানি অভূতপূর্বভাবে অনেক বেশি শোনা যায় যেহেতু তারা অনেক ঘন ঘন ডিম পেড়ে চলে; যদিও নিশ্চিতভাবেই তাদের ডিমের আকার ছোটো থেকে আরো ছোটো হয়ে চলেছে (যদিও প্রণীত পুস্তকগুলো মোটা থেকে আরো মোটা হয়ে চলেছে)। এর চূড়ান্ত ও স্বাভাবিকতম ফলশ্রুতি রূপে আমরা এখন পাচ্ছি বিজ্ঞানের সর্বপ্রশংসিত ‘জনপ্রিয়করণ’ (একই তোড়ায় বেঁধে ‘নারীবাদীকরণ’ ও ‘বালখিল্যকরণ’): অর্থাৎ, কাটছাঁট করে এমন এক সাইজের ‘বিজ্ঞান’ তৈরি করা যা ‘আমজনতা’-র শরীরে বেশ আঁটোসাঁটোভাবে খাপ খেয়ে যায়। গ্যেটে এই কর্মকাণ্ডকে বিজ্ঞানের অপব্যবহার বলে চিহ্নিত করে দাবি করেছিলেন যে বহির্জগতে বিজ্ঞানের প্রভাব বিস্তৃত করতে হলে তা কেবলমাত্র উন্নত ব্যবহারিক প্রয়োগের মাধ্যমেই করার চেষ্টা করা উচিত। তাছাড়াও, পণ্ডিতদের প্রবীণতর প্রজন্ম এহেন বিজ্ঞান-জনপ্রিয়করণের প্রচেষ্টাকে কঠিন, দুর্বহ ও বিপরীত-ফল-সম্ভব সঙ্গত কারণেই মনে করতেন, আবার তরুণতর প্রজন্মের পণ্ডিতরা যে তা সহজসাধ্য বলে মনে করে তা-ও খুব সঙ্গত কারণেই, যেহেতু জ্ঞানের ওই এক ক্ষুদ্র কণা করায়ত্ত করা ব্যতিরেকে তারা নিজেরা অতি মাত্রাতেই ওই ‘আমজনতা’-র অংশ, আমজনতাদের নিত্য প্রয়োজনগুলো তাদেরও নিত্য প্রয়োজন। যেন একবার এই অধুনা পণ্ডিতরা আয়েস করে বসলেই তাঁদের বিশেষ চর্চার ক্ষুদ্র জগতটিকে আমজনতার কৌতূহলের বিষয় করে একেবারে খুলেমেলে ধরতে পারবেন! এই আয়েস করে বসাটাকেই এরপর ‘পণ্ডিতমহাশয়ের সংবেদনশীলভাবে তাঁর নিজের মানুষদের সঙ্গে বিনয়ে মিলিত হওয়া’ বলে গৌরবাণ্বিত করে হাজির করা হবে; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এখানে যা ঘটে থাকে তা হলো এই যে পণ্ডিতমহাশয়টি যে মাত্রায় জ্ঞানগগনবিহারী পণ্ডিত নন, বরং, আমজনতার দঙ্গলভুক্তই একজন, সেই মাত্রাতে তিনি তাঁর নিজের প্রকৃত স্তরেই আসলে থিতিয়ে আসেন। তুমি যখন নিজের সামনে ‘আমজনতা’-র একটা ধারণা তৈরি করতে বসো, সেই ধারণা কখনোই অতি সমুচ্চ বা অতি মহান হয়ে উঠতে পারে না। যদি সত্যিই তুমি মানুষদের শুভাকাঙ্ক্ষী হও, তুমি অন্তত তাদের প্রতি এইটুকু সহানুভূতিশীল হবে যে তোমার হাতে তৈরি ইতিহাস নামক সর্ব-ক্ষয়কারক অম্লটিকে অমৃত নাম দিয়ে তাদের হাতে তুলে দেবে না। কিন্তু হৃদয়গহনে তুমি আসলে তাদের ঘৃণা করো, অকপটভাবে তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো দায় তুমি বোধ করো না, তোমার আচরণ একজন বাস্তবতাবাদী নিরাশাবাদীর মতো, অর্থাৎ, ঘনিয়ে আসা মহাবিপর্যয়ের আশঙ্কা দ্বারা চালিত হয়ে অপরের মঙ্গল সম্পর্কে নিষ্ক্রিয় নির্লিপ্তি তোমাকে নিজের মঙ্গল সম্পর্কেও নির্লিপ্ত করে তুলেছে। মাটি যদি আমাদের ভার বহন করে চলে তো ভালো, আর যদি না-ই বা বইতে চায়, তো আরো ভালো--- এই অনুভব নিয়ে বিদ্রূপ ও শ্লেষে তিক্ত হয়ে ওঠা অস্তিত্ব নির্বাহ করে যাওয়াই তখন তোমার নিয়তি।

 

 

এমন একটা যুগ, যে নিজের ইতিহাসগত সংস্কৃতি নিয়ে কতো না নির্মল হর্ষে সোচ্চারে ফেটে পড়তে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে, তার চরিত্র বিশ্লেষণ করতে গিয়ে আমি যখন এক প্রকার শ্লেষ-তিক্ত আত্মসচেতনতা চিহ্নিত করছি, আর বলছি যে তার মধ্যে এই আশঙ্কা গেঁড়ে বসেছে যে আসলে উৎফুল্ল হওয়ার মতো কিছুই আর নেই এবং এই ভয়ে তার বুক ধুকপুক করছে যে ইতিহাসগত জ্ঞান নিয়ে এতো সব মাতামাতি হয়তো অচিরেই সব নিভে আসবে, তখন পাঠক হয়তো অবাক হতে পারেন, কিন্তু এর মধ্যে কোনো স্ববিরোধিতা নেই। গ্যেটে নিউটনের ব্যক্তিচরিত্রের যে উল্লেখযোগ্য বর্ণনা রেখে গেছেন, তাতে তিনি তুলনীয় এক ধাঁধা হাজির করেছিলেন: নিউটনের স্থিতসত্তার ভিত্তিমূলে (বা, সঠিকতোরভাবে বললে, সর্বোচ্চ শিখরে) ‘ভ্রান্ত হওয়ার নাছোড় আশঙ্কা’ দানা বেঁধে ছিলো বলে গ্যেটে আবিষ্কার করেছিলেন, আবার সেই আশঙ্কাই ছিলো নিজ স্বপ্রকৃতি সম্পর্কে এক প্রকার শ্লেষ-তিক্ত সারসংকলনে পৌঁছানো উচ্চতর সচেতনতার ক্ষণিক অভিব্যক্তি। এভাবেই সবচেয়ে মহান ও সবচেয়ে বিকশিত ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের মধ্যেই এমন এক চেপে-রাখা সচেতনতার সন্ধান আমরা পাই, প্রায়শই যা সাধারণ সংশয়বাদের রূপ নেয়, যে কোনো জাতির শিক্ষা এখনকার মতো এতো প্রবলভাবে ইতিহাসগত হতে হবে বলে মাথা-চাড়া-দেওয়া অন্ধবিশ্বাসটির অবাস্তবতা মাপতে গিয়ে যা থৈ পায় না। সবচেয়ে প্রাণবান জাতিগুলো, কর্মে ও কীর্তিতে সর্বোচ্চ প্রাণশক্তির প্রকাশ যারা ঘটিয়েছিলো, তারা অন্যকরমভাবে বাঁচতো, অন্যরকমভাবে তাদের শিশুদের লালন করতো, এই অন্ধবিশ্বাসের পাকে বাঁধা ছিলো না। কিন্তু এই অবাস্তবতা ও অন্ধবিশ্বাস আমাদের সঙ্গে বেশ খাপ খেয়ে গেছে, কারণ, নিন্দুকরা হয়তো বলবেন, পূর্বের সবলতর ও সুখীতর জাতিদের তুলনায় আমরা নিতান্তই পরাগত অন্তিম বিবর্ণ প্রজন্ম। আমাদের মধ্যে দিয়েই হয়তো হেসিয়দ৩২-এর সেই ভবিষ্যদবাণী ফলতে চলেছে: হেসিয়দ বলেছিলেন যে একদিন আসবে যখন মানুষ জন্মাবে পক্ককেশ বিগতযৌবন হয়ে, আর দেবরাজ জিউস যখনই এই চিহ্ন ফুটে উঠতে দেখবেন তখনই তিনি মানবপ্রজাতিকে ধ্বংস করে ফেলবেন। ইতিহাসগত সংস্কৃতি আসলে এক প্রকার জন্মগত পক্ককেশপ্রাপ্তি, আর যারা শৈশব থেকেই সেই চিহ্ন বহন করে বেড়ায় তারা সহজাত প্রবৃত্তিগতভাবেই বিশ্বাস করে যে মানবপ্রজাতি এখন বৃদ্ধ হয়েছে: আর বৃদ্ধ হওয়া মানে বার্ধক্যজীর্ণতার সঙ্গে মানায় এমন কাজকর্মই এখন দস্তুর, যেমন বারবার পিছু ফিরে দেখা, স্মৃতিরোমন্থন করা, হিসেব চুকোনো, অর্থাৎ সংক্ষেপে বললে, ইতিহাসগত সংস্কৃতিতে ডুব দেওয়া। কিন্তু মানবপ্রজাতি এমনই এক বিষম নাছোড়বান্দা বস্তু যে তার যাত্রাকে--- সে সমুখপানেই হোক বা পিছুপানে--- সে কিছুতেই এক সহস্র বা এমনকি শত সহস্র বছরের খাপে পুরে নিটোলভাবে দেখতে দেয় না; অর্থাৎ তার ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অণু ব্যক্তিমানুষের চোখে সে কখনোই সামগ্রিকতায় ধরা পড়ে না। কয়েক হাজার বছর (বা ষাট বছরের এক-একটি প্রজন্ম ধরে পরপর চৌত্রিশটি প্রজন্ম)-এর মধ্যে কী এমন আছে যার জোরে আমরা শুরুতে মানবপ্রজাতির ‘যৌবন’ এবং শেষে তার ‘বার্ধক্য’ চিহ্নিত করতে পারি? এহেন পক্ষাঘাতে ন্যুব্জ করে দেওয়া স্থিরবিশ্বাসের ভিতরে কি আসলে লুকিয়ে বসে আছে মধ্যযুগ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া এই খ্রিস্টধর্মীয় তত্ত্ববিশ্বাস যে গোটা জগতের শেষ ঘনিয়ে এসেছে আর আমরা ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে চূড়ান্ত ঈশ্বরনিদান (Last Judgment)-এর জন্য অপেক্ষা করছি? ইতিহাসগত নিদান ঘোষণা করার ক্রমবর্ধমান তাড়নাও কি ওই একই ভাবনাকে নতুন সাজপোষাকে হাজির করা নয়? যেনবা আমাদের এই যুগ অন্তিম যুগ হওয়ার কারণে তার পূর্ববর্তী সমস্ত যুগ, অর্থাৎ, গোটা অতীতকে বিচার করে সেই সার্বজনীন নিদান ঘোষণা করতে সক্ষম, এমনকি খ্রিস্টধর্মতত্ত্বও যে সক্ষমতা মানুষদের থাকতে পারে বলে বলেনি বরং ‘ঐশ্বরিক মানবপুত্র’ (‘the Son of Man’)-র সক্ষমতা বলে কল্পনা করেছিলো। আগেকার দিনে সামগ্রিকভাবে মানবপ্রজাতির উদ্দেশ্যে, এবং প্রতিটি ব্যক্তিমানুষের উদ্দেশ্যেও, উচ্চারিত ‘মরণের কথা মনে রেখো’ অনুজ্ঞাটি একটি সদাযন্ত্রণাকর গুঁতো হিসেবে কাজ করতো এবং মধ্যযুগীয় বিদ্যাচর্চা ও বিবেকবোধের শীর্ষবিন্দু রূপে গণ্য হতো। তার আধুনিক বিরুদ্ধভাবনাটি, অর্থাৎ, ‘বাঁচার কথা মনে রাখো’ অনুজ্ঞাটি, অকপটভাবে বললে, এখনও খোলা-গলার আওয়াজ হয়ে ওঠে নি, জড়োসড়ো মৃদু ধ্বনি হয়ে আছে, কিঞ্চিৎ অসততাও তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বলা যায়। কারণ মানুষ ‘মরণের কথা মনে রেখো’ অনুজ্ঞাটিকে এখনও সাদরে বরণ করে রেখেছে, ইতিহাসের সার্বজনীন প্রয়োজনীয়তার মধ্য দিয়ে সেটাই উন্মোচিত হয়ে চলেছে: জ্ঞান, তার কতো না সবলতম ডানা-ঝাপটানি সত্ত্বেও ডানা মেলে আকাশে উড়তে পারেনি, এক গভীর নৈরাশ্য ছেয়ে বসেছে এবং ইতিহাসগত অনুরঞ্জনের মতো সমস্ত উচ্চতর শিক্ষা ও সংস্কৃতিকে গাঢ় বিষাদাচ্ছন্ন করে তুলেছে। যদি কোনো ধর্ম মানুষের জীবনের সমস্ত প্রহরের মধ্যে শেষ প্রহরটিকেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে ঠাওর করে বসে, পৃথিবী থেকে সব জীবনের বিলুপ্তির আগাম ঘোষণা করে রাখে, বিয়াগান্তক এক নাটকের অন্তিম দৃশ্যের কুশীলব হিসেবে বর্তমানে জীবিত সবাইকে সাব্যস্ত করে, তাহলে তা হয়তো গভীরতম ও মহত্তম ক্ষমতাসকলের উদ্বোধন ঘটাতে পারে, কিন্তু তা যে কোনো নতুন বীজরোপণ, সাহসী পরীক্ষানিরীক্ষা ও মুক্ত অভিপ্রায়ের বিরোধী। অজানার মধ্যে অভিযানকে তা প্রাণপণে আটকাতে চায় যেহেতু সবকিছু জানা হয়ে গেছে বলে আশা করতেই তা ভালোবাসে। যা ক্রমশ হয়ে উঠছে, প্রথমে যদি বা অতি অনিচ্ছাসত্ত্বেও তাকে কিছুটা ছাড় দেয়, কিন্তু অপেক্ষায় থাকে কখন সময় বুঝে তাকে বলি দেওয়া যায় বা অস্তিত্বের শুচিতা ও মূল্যের দোহাই পেড়ে নির্বাসিত করা যায়। সাভোনারোলা৩৩-র ধর্মপ্রচারে প্রভাবিত হয়ে ফ্লোরেন্স-বাসীরা ছবি, পাণ্ডুলিপি, আয়না ও মুখোশ ধ্বংস করার যে বিখ্যাত যজ্ঞ সংঘটিত করেছিলো, তেমনই ধ্বংসকার্য খ্রিস্টধর্মও চালাতে অভিলাষী সেইসব বিবিধ সংস্কৃতির মধ্যে যেখানে ‘বাঁচার কথাটা মনে রেখো’ অনুজ্ঞাটিকেই এখনও প্রাধান্য দেওয়া হয়ে থাকে। আর যদি এই ধ্বংসকার্য খোলাখুলি প্রত্যক্ষ বলপ্রয়োগে করা না যায়, তখন সে ইতিহাসগত সংস্কৃতিকে দোসর করে নিয়ে লক্ষ্যপূরণে নামে, সরাসরি টেরও পেতে দেয় না, ইতিহাসগত সংস্কৃতির স্বর ধার করে ঘাড় ঝাঁকিয়ে এখনও-হয়ে-উঠতে-থাকা বিকাশমান সবকিছুকে বাতিল পরিত্যাজ্য বলে ঘোষণা করে, পরাগত হওয়ার অভিযোগ তুলে পক্ককেশ নিয়ে জন্মানোর দোষ দিয়ে দাবিয়ে রাখতে চায়। যা কিছু ঘটে গেছে সেসবের মূল্যহীনতা বিষয়ে অনাড়ম্বর ও গভীর ঐকান্তিক চিন্তার বদলে, বিচারজগতের পরিপক্কতা নিয়ে ভেবে দেখার বদলে, এমন এক ছন্নছাড়া মনোভাবের কাছে আত্মসমর্পণ করা হয় যেনবা কী অতীতে ঘটে গেছে তা কেবল জেনে নিতে পারলেই হলো যেহেতু সেসবের চেয়ে আরো ভালো কিছু করার মতো সময় আর অবশিষ্ট নেই। তাই ইতিহাসগত বোধ তার সেবকদের নিষ্ক্রিয় ও অতীতবিলাসী করে তোলে, আর এই ইতিহাস-জ্বরে কাবু রোগীরা কেবলমাত্র তখনই কিছুটা সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে যখন মুহূর্তের বিস্মরণপ্রবণতার মধ্য দিয়ে এই জ্বরের ভার কিছুটা লাঘব হয়--- যদিও সেই বিরল মুহূর্তগুলোতেও তাদের সেই ক্রিয়া শেষ হতে না হতেই তারা আবার তা কাটাছেঁড়া করতে বসে যায়, বিশ্লেষণের নিঙড়ানি দিয়ে নিশ্চিত করে যাতে সক্রিয়তাসঞ্চারী কোনো প্রভাব আর জিইয়ে না থাকে এবং তারপর ছাল-চামড়া ছাড়িয়ে তাকে ‘ইতিহাসগত পাঠচর্চা’-র বিষয় করে তোলে। এই দিক থেকে দেখলে, আমরা এখনও মধ্যযুগেই বাস করে চলেছি এবং ধর্মতত্ত্বই ছদ্মবেশ ধারণ করে ইতিহাস রূপে আবির্ভূত হয়েছে: ঠিক যেমন আগেকার দিনে পাদরীবর্গের প্রতি অশিক্ষিত সাধারণ মানুষদের ভক্তি-শ্রদ্ধা বর্তমানে শিক্ষিত শ্রেণির প্রতি ভক্তিশ্রদ্ধায় রূপান্তরিত হয়েছে। আগে মানুষরা যা চার্চের প্রতি নিবেদন করতো, এখন কিছুটা পরিমিত হারে হলেও তা শিক্ষাদীক্ষার প্রতি নিবেদিত হয়ে চলেছে: চার্চের পূর্বতন প্রভাবের রেশেই এই নিবেদন আদৌ এখনও টিকে আছে, কারণ কে না জানে যে বদান্যতার মহৎ গুণের বিচারে আধুনিকতা যথেষ্টই কৃপণ ও আনাড়ি।

আমার এই পর্যবেক্ষণ, আর তার সঙ্গে সঙ্গে এহেন যুক্তিতর্ক যে সেই মধ্যযুগীয় ‘মরণের কথা মনে রেখো’ ও খ্রিস্টধর্মের বুকে ধুকপুক করতে থাকা সমস্ত অনাগত যুগের মানব-অস্তিত্ব নিয়ে নিরাশা থেকে প্রবাহিত হয়ে ইতিহাস-বাহুল্য আমাদের ছেয়ে ফেলেছে---  এসব অনেকের খুব গ্রহণযোগ্য বলে মনে না-ও হতে পারে। যদি তাই হয় তাহলে আমার এই সসঙ্কোচে হাজির করা ব্যাখ্যা সরিয়ে রেখে আপনারা এর চেয়ে ভালো কোনো ব্যাখ্যা হাজির করুন কীভাবে ইতিহাসগত সংস্কৃতির উৎপত্তি ঘটলো--- যে কোনো ‘নতুন যুগ’, যে কোনো ‘আধুনিক সচেতনতা’-র সর্বাত্মক বিরোধিতায় তা কীভাবে প্রবৃত্ত হলো--- এই উৎপত্তির কথাটাও তো ইতিহাসগতভাবে জানতে হবে, ইতিহাসের সমস্যা তো ইতিহাসকে নিজেকেই সমাধান করতে হবে, জ্ঞানের হুল জ্ঞান নিজের গায়ে ফোটাবে না তা তো হতে পারে না--- ‘নতুন যুগ’-কে যদি সত্যিই নতুন, শক্তিশালী, মৌলিক এবং ঋদ্ধতর জীবনের জন্য প্রতিশ্রুতিময় হতে হয়, তাহলে এগুলো তার ক্ষেত্রে নিতান্তই অত্যাবশ্যকতা হয়ে উঠেছে। নাকি আমরা জার্মানরা--- রোমান্স জাতিগুলোর কথা ধরা হচ্ছে না--- সংস্কৃতির উচ্চতর ক্ষেত্রগুলোতে কেবলমাত্র ‘উত্তরাধিকার’-এর বোঝাই বয়ে চলবো, সেইটুকুই আমাদের সক্ষমতার দৌড়, যা উইলহেল্ম ওয়্যাকারঅ্যাঞ্জেল৩৪ একবার স্মরণীয়ভাবে অভিব্যক্ত করেছিলেন: ‘আমরা জার্মানরা হলাম একটি উত্তরাধিকার-বাহক জাতি। আমাদের উচ্চতর জ্ঞান, এমনকি আমাদের বিশ্বাসগুলোও প্রাচীন জগতের উত্তরাধিকার মাত্র ছাড়া আর কিছু নয়। এমনকি যা কিছুটা বিরোধাভাবসম্পন্ন, সেগুলোর শ্বাসপ্রশ্বাসেও ধ্রুপদী সংস্কৃতির অমর সত্তাই প্রবাহিত হয়ে চলে খ্রিস্টধর্মীয় সত্তার পাশাপাশি। আর কেউ যদি কখনও এই দুটি উপাদানকে আমাদের অন্তর্জগৎ-পরিবেষ্টনকারী বায়ুমণ্ডল থেকে নিষ্কাশিত করে নিতে সমর্থ হয়, তাহলে আর খুব বেশি কিছু অবশিষ্ট পড়ে থাকবে না যা আমাদের প্রাণসত্তাকে বিস্তৃত করতে পারে।’ আর যদিবা আমরা জার্মানরা ওই উত্তরাধিকার-বাহক বৈ আর কিছু না-ও হই--- এহেন উত্তরাধিকারের দাবি করতে পারাও ‘উত্তরাধিকারী’ তকমাটিকে সব চেয়ে বড় ও সব চেয়ে গর্বের বিষয় বলে গণ্য করে থাকে: তবু এই প্রশ্ন উঠতে বাধ্য যে পড়ন্ত পুরাকালের ছাত্র হয়ে থাকাই কি আমাদের চিরন্তন নিয়তি? কোনো এক সময়ে এসে আরো উঁচুতে ও আরো দূরে আমাদের অভিপ্রেত লক্ষ্য স্থাপন করার অনুমতি কি আমরা পাবো না? কোনো না কোনো সময়ে এসে তো আমাদের সার্বজনীন ইতিহাস সহ আরো নানা উপায় সহযোগে আলেকজান্দ্রিয়-রোমান সাংস্কৃতিক মর্মবস্তুটিকে অতো পরিশীলিত ও ফলদায়ক ভাবে গড়ে তোলার জন্য কিছু কৃতিত্ব আমাদের জন্য বরাদ্দ হওয়াই উচিত, আর তার পুরস্কার স্বরূপ এই আলেকজান্দ্রিয় জগতের গণ্ডির বাইরে বেরিয়ে প্রাচীন গ্রিসের মহত্ত্ব, স্বাভাবিকতা ও মানবতার মৌলিক জগতের মধ্যে নিজেদের অভিপ্রেত লক্ষ্য সাহসভরে অনুসন্ধান করার কঠিনতর কাজের অনুমতি নিশ্চয়ই আমাদের দেওয়া হবে! কিন্তু প্রাচীন গ্রিসের সেই জগতে আবার আমরা এমন এক সংস্কৃতির বাস্তবতা আবিষ্কার করি যা সারবস্তুতে ইতিহাসানুগ নয়, কিন্তু তা সত্ত্বেও, বা বলা ভালো তার জন্যই, তা প্রাণশক্তিতে ও ঋদ্ধিতে অবর্ণনীয় রকমের সমৃদ্ধতর। আমরা জার্মানরা যদি নিছক উত্তরাধিকার-বাহক বৈ আর কিছু না-ও হয়ে থাকি, তাহলেও সেই অবর্ণনীয় রকমের সমৃদ্ধতর সংস্কৃতি উপযোজন করে নিয়ে তার উত্তরসূরি হতে পারলেও তার চেয়ে মহত্তর ও গর্বের বিষয় আর কিছু হতো না।

আমি যা বলতে চাইছি--- এবং এইটুকুই বলতে চাইছি--- তা হলো: ক্ষয়িত মর্যাদার উত্তরসূরি হওয়ার ভাবনা প্রায়শই যন্ত্রণাকর হতে পারে, তবু তা কোনো ব্যক্তিবিশেষ বা জাতিবিশেষের মধ্যে ভবিষ্যতের জন্য বিরাট প্রভাব ও মহান আশা সঞ্চারিত করতে পারে যদি আমরা নিজেদের পুরাকালের ক্ষমতাবলীর উত্তরাধিকারপ্রাপ্ত বলে নিজেদের গণ্য করি এবং তার মধ্যেই নিজেদের উদ্দীপনা ও গর্বের উৎস খুঁজে পাই। সুতরাং, আমি এমন কথা বলতে চাইছি না যে শক্তিশালী জাতির বিবর্ণ খর্বিত পরাগত উত্তরসূরি হিসেবে প্রত্নবিদ ও কবরখনক রূপে অতি শৈত্যে হিমায়িত জাতিজীবন প্রলম্বিত করে নিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়েই আমাদের বেঁচে থাকতে হবে। ওইরকম পরাগত উত্তরসূরিদের অস্তিত্ব তিক্ত হেঁয়ালিপূর্ণ হয়ে ওঠে: তাদের জীবনের খুঁড়িয়ে চলার প্রতি পদক্ষেপের পিছু পিছু বিনাশ ধেয়ে চলে; অতীত নিয়ে উল্লাস করতে গিয়েও তারা শিউরে ওঠে কারণ মূর্তিমান স্মৃতি হয়ে উঠেও তারা টের পায় যে তাদের সব স্মৃতিচারণই অর্থহীন যদি তাদের আর কোনো উত্তরাধিকারীই অবশিষ্ট না থাকে। তাই তাদের মধ্যে এই দুশ্চিন্তা জেঁকে বসে যে তাদের জীবন অবিচারের শিকার হয়ে উঠেছে যেহেতু কোনো ভবিষ্যৎ জীবনই আর তাদের হয়ে সওয়াল করার জন্য থাকবে না।

কিন্তু ধরা যাক আমরা কল্পনা করে নিলাম যে এহেন পরাগত প্রত্নবিদরা তাদের যন্ত্রণাকর শ্লেষপূর্ণ বিনয় ঝেড়ে ফেলে হঠাৎই লাজলজ্জাহীন হয়ে উঠেছে; ধরা যাক খনখনে গলায় তারা ঘোষণা করছে: ‘আমাদের জাতি এখন তার শিখরবিন্দুতে পৌঁছেছে, কারণ অবশেষে এখনই সে তার নিজের সম্পর্কে জ্ঞানের অধিকারী হয়ে উঠেছে, কেবলমাত্র এই এখনই সে নিজেকে নিজের কাছে উন্মোচিত করতে পেরেছে’--- তাহলে আমরা কল্পচক্ষে সেই জাঁকালো আড়ম্বর দেখতে পাবো যার মধ্য দিয়ে, নীতিগর্ভ রূপককাহিনীতে যেমন হয়, তেমনই জার্মান সংস্কৃতির সাপেক্ষে একটি বিশেষ অতি-প্রশংসিত দর্শনমতের রহস্যঘন তাৎপর্যের পরতগুলো উন্মোচিত হবে। জার্মান সংস্কৃতির বিপজ্জনক দ্বিধা-দ্বন্দ্ব-সংকটকে আরো বিপজ্জনক করে তোলার ক্ষেত্রে এই শতকে এই বিশেষ দর্শনটির বিপুল ও এখনও অব্যাহত প্রভাব যা করেছে ও করে চলেছে, তার ধারে-কাছেও অন্য আর কিছু আসতে পারবে বলে আমার মনে হয় না। এই বিশেষ দর্শনটি হলো হেগেল-এর দর্শন। কালের ধারায় পরাগত হওয়ার বোধ এমনিতেই বিষণ্নতায় অসাড় করে দেয়, কিন্তু সেই বোধকে অকুতোভয়ে হেঁটমুণ্ড-ঊর্ধ্বপদ করে দিয়ে একদিন যদি সেই পরাগত লতিফটিকে ঈশ্বরের আসনে অধিষ্ঠিত করা হয়, ঘোষণা করা হয় সমস্ত পূর্বতন ঘটনাবলীর লক্ষ্যমুখ ও প্রকৃত তাৎপর্য এই নব-উপলব্ধ-ঐশ্বরের মধ্য দিয়েই প্রকাশিত হচ্ছে, ঈশ্বরে রূপান্তরিত সেই লতিফের দুর্দশাপূর্ণ অবস্থার সঙ্গে বিশ্ব-ইতিহাস-এর সমাপনবিন্দুর সমীকরণ টানা হয়, তাহলে তার চেয়ে ভয়ঙ্কর ও বিধ্বংসী আর কী হতে পারে! এমনই এক বিশ্বাসমতে নিমজ্জিত হয়ে জার্মানরা কথায়-কথায় ‘বিশ্ব-প্রক্রিয়া’ নিয়ে আলোচনা করতে এবং সেই বিশ্ব-প্রক্রিয়ার অত্যাবশ্যক পরিণতি হিসেবে নিজেদের সমসময়ের যথার্থতা প্রতিপাদন করতে অতি-অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে; এহেন দৃষ্টিতে ইতিহাস যেহেতু ‘নিজেই নিজেকে বাস্তবায়িত করতে থাকা পরমভাব’, ‘মানুষদের অন্তরাত্মার দ্বান্দ্বিকতা’ ও ‘বিশ্ব-বিচারসভা’, তাই অন্যসব আধ্যাত্মিক শক্তি, ললিতকলা ও ধর্মকে প্রতিস্থাপিত করে ইতিহাস-ই একমাত্র সার্বভৌম ক্ষমতা রূপে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

এহেন হেগেলিয় রীতিতে বোঝা ইতিহাসকে রসিকতা করে পৃথিবীতে ঈশ্বরের অচিরপ্রবাস বলে বলা হয়েছে, যদিও সে ঈশ্বর ইতিহাসের নিজের হাতেই তৈরি। হেগেলিয় করোটির মধ্যেই এই ঈশ্বর নিজের কাছে বোধ্য ও স্বচ্ছ হয়ে উঠেছিলো এবং নিজ বিবর্তনের দ্বন্দ্বতত্ত্ব-সম্ভব সবকটি ধাপ আরোহণ করে আত্মউন্মোচনে এসে পৌঁছেছিলো: ফলত হেগেলের কাছে বার্লিন শহরে তাঁর নিজের অস্তিত্বটাই বিশ্ব-প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত পরিণতি-বিন্দু হয়ে উঠেছিলো। হেগেলের অবশ্য এই কথা বলে যাওয়া উচিত ছিলো যে তাঁর পরবর্তী আর সবকিছুই বিশ্ব-ঐতিহাসিক ঐকতানে মূল সুরের অন্তিম চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটে যাওয়ার পর প্রতিধ্বনিমূলক কিছু সুর মাত্র, বা আরো খুলে বললে, নিতান্তই নিষ্প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত মাত্র। তিনি তা বলে যান নি, পরিবর্তে বরং তিনি তাঁর দ্বারা সম্পূর্ণ গেঁজে যাওয়া প্রজন্মটির মধ্যে ‘ইতিহাসের ক্ষমতা’-র প্রতি সেই ভক্তি গুঁজে দিয়ে গেছেন যা ব্যবহারিকতায় প্রতিটি মুহূর্তকে সাফল্যের নগ্ন তারিফে পরিণত করে এবং তথ্যমূলকতার পায়ে প্রণত করে রাখে: যে প্রণত অবস্থাকে আবার এখন ‘তথ্যের সঙ্গে নিজেকে মানানসই করে নেওয়া’ বলে বাগ‌্ধারা-আশ্রয়ী অতিকথায় মহিমাণ্বিত করার চল হয়েছে। কিন্তু একবার যে ‘ইতিহাসের ক্ষমতা’-র সামনে শিরদাঁড়া বেঁকিয়ে মাথা ঝোঁকাতে শিখে নিয়েছে, সে শেষাবধি চীনা ঘাড়-নাড়া-পুতুলের মতো যান্ত্রিকতায় সব ক্ষমতার সমুখেই সায় দিয়ে চলে--- সে ক্ষমতা সরকার বা জনমত বা সংখ্যাধিক্যের চাপ যেভাবেই হাজির হোক না কেন--- আর নিজ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সেই ‘ক্ষমতা’-র হাতে বাঁধা সুতোর টানে নিপুণভাবে নাচিয়ে চলে। প্রতিটি সাফল্যই যদি যৌক্তিক আবশ্যকীয়তা হয়, প্রতিটি ঘটনাই যদি যুক্তিসঙ্গতি বা মহামান্য ‘পরমভাব’ (‘Idea’)-এর বিজয়চিহ্ন হয়, তাহলে বিলম্ব না করে নতজানু হয়ে বসে ‘সাফল্য’-এর গোটা মইটির ভজনা করা ছাড়া আর কী করার থাকে! সব অতিকথাই কি মৃত নাকি? কে বললো যে সব ধর্মই শুকিয়ে যাচ্ছে? একবার ‘ইতিহাসের ক্ষমতা’ নামক ধর্মমতটির দিকে চেয়ে দেখুন, ‘পরমভাব’-এর অতিকথা-পূজারীদের লক্ষ্য করুন, নতজানু হয়ে থাকতে থাকতে মাটি-কাঁকরের ঘষটানিতে ছাল-চামড়া-উঠে-যাওয়া তাদের হাঁটুগুলোর দিকে একবার তাকান! তাদের এই নয়া ধর্মমতই এখন সকল গুণের দাবিদার বললে কি কোনো অতিশয়োক্তি হবে? ইতিহাসানুগ মানুষ যখন নিজেকে অশেষে রিক্ত হয়ে যেতে দেয় যতোক্ষণ না এক ঘষা-কাচের পাতের চেয়ে আর বেশি কিছু পড়ে না থাকে, তখন তা কি নিঃস্বার্থপরতা নয়? প্রতিটি বলের অভ্যন্তরস্থ বলনির্যাস পুজো করার অছিলায় কেউ যখন নিজের সমস্ত বলকে স্বর্গে-মর্ত্যে সর্বত্র বিসর্জন দেয়, তখন তা কি মহানুভবতা নয়? ক্ষমতার হরেক দাঁড়িপাল্লা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে কোনটির জোর ও ভার বেশি তা মেপে চলা-ই কি ন্যায়পরতা নয়? আর এইভাবে ইতিহাস নিয়ে চিন্তা-অনুশীলন করার কতো না শোভন-সম্ভ্রান্ত ধারা তৈরি হয়েছে! সমস্তকিছুকেই বস্তুনিষ্ঠভাবে গ্রহণ করা, কোনো কিছুতেই ক্রুদ্ধ না হওয়া, কোনো কিছুকেই না ভালোবাসা, সমস্তকিছুই বুঝে ফেলা--- এর মধ্য দিয়ে জ্ঞানচর্চক কতো না কোমল ও পেলব হয়ে ওঠে! আর এই ধারায় প্রশিক্ষিত কোনো ব্যক্তি যদি কখনও লোকসমক্ষে ক্রোধ প্রকাশ করে ফেলে, তা-ও তো এক মহা উদযাপনের বিষয়, কারণ বুঝে নিতে হবে যে তা কেবল নান্দনিক প্রভাব তৈরির জন্যই করা হয়েছে তা ira ও stadium হলেও সবেমিলে sine ira et studio।৩৫

এহেন এক অতিকথা-সমাহারের বিরুদ্ধে আমার তোলা আপত্তিগুলো কতোই না অচল ও সেকেলে বলে মনে হতে পারে! তবু লুকোছাপা না করে সেসব আমায় ব্যক্ত করতেই হবে, তাতে কারও হাসির উদ্রেক হলে হোক গে যাক। তাই বলে ফেলা যাক যে: ইতিহাস সর্বদা এভাবে ভাবায় যে ‘অতীতে একদা এমন ছিলো’, আর নৈতিকতা বলে চলে ‘তোমার এমন করা উচিত হয়নি’ বা ‘এমন হওয়া উচিত হয়নি’। এভাবে ইতিহাস তথ্যমূলক অনৈতিকতার কোষ হয়ে ওঠে। ইতিহাসকে যদি একইসঙ্গে এইসব তথ্যমূলক অনৈতিকতার বিচারক বলে কেউ ভেবে বসে, সে কতোই না ভুল করে বসবে! যেমন ধরা যাক, রাফায়েল৩৬-কে যে ছত্রিশ বছর বয়সেই মরতে হয়েছিলো সেই তথ্যে নৈতিকতা ক্ষুব্ধ না হয়ে পারে না কারণ তেমন মানুষের তো মরারই কথা নয়। এই ক্ষোভের মুখে দাঁড়িয়ে আপনি যদি ইতিহাসের সপক্ষে তথ্যমূলকতার হয়ে সওয়াল করতে চান, আপনি হয়তো বলবেন: তাঁর মধ্যে প্রকাশ করার মতো যা ছিলো, সবই তিনি প্রকাশ করে ফেলেছিলেন, আর বেশিদিন বাঁচলে তিনি কেবল ইতিমধ্যেই সৃষ্টি করে ফেলা সৌন্দর্যগুলোর পুনরাবৃত্তিই করে চলতেন, ইত্যাদি, ইত্যাদি…। আর এই ভাবে আপনি হয়ে উঠবেন শয়তানের উকিল: সাফল্য, যা তথ্যমূলক, তাকেই আপনি বিগ্রহ রূপে পুজোর বেদিতে প্রতিষ্ঠিত করে বসবেন, যখন প্রকৃত বাস্তবতায় যা তথ্যমূলক তা কখনোই বেকুব ছাড়া আর কিছু নয় এবং ঠাকুরের থেকে বাছুরের সঙ্গেই তার মিল বেশি। তাছাড়া, ইতিহাসের হয়ে ওকালতি করতে গিয়ে কথা যোগানোর জন্য অজ্ঞতার উপরই আপনাকে ভরসা করতে হবে: রাফায়েল-এর মতো একজন natura naturans৩৭ যে কী তা আপনার জানা নেই বলেই কেবল আপনি বিনা প্রকোপে মেনে নিতে পারেন যে সে একদিন ছিলো ও আর কোনোদিন তেমনটি ফিরে আসবে না। সম্প্রতি আমাদের জানানো হয়েছে যে বিরাশি বছর বাঁচা গ্যেটে তাঁর শ্রেয় জীবনকালের চেয়ে কিছু বছর বেশি বেঁচে গিয়েছেন: কিন্তু আমি সানন্দে বর্তমান জীবনযাপনের কাঁড়ি কাঁড়ি তাজা বছরের বিনিময়ে গ্যেটে-র ওই ‘বাড়তি’ জীবনকালের গুটিকয় বছরকেই চাইবো যাতে গ্যেটে-একারমান সংলাপের৩৮ মতো সংলাপগুলোয় অংশগ্রহণ করে এই মুহূর্তের অক্ষৌহিনীচালকদের দ্বারা বর্ষিত রাশি রাশি হালনাগাদ নির্দেশাবলী থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারি। রাফায়েল বা গ্যেটে-র মতো মৃতজনদের তুলনায় জীবিতদের মধ্যে কতো অল্প কয়েকজনেরই না আসলে বাঁচার অধিকার আছে! এই যে রাশি রাশি মানুষ বেঁচে আছে অথচ ওই গুটিকয় মানুষ বেঁচে নেই তা একটি নির্দয় সত্য বৈ আর কিছু নয়, অর্থাৎ, তা একটি সংশোধনাতীত নির্বুদ্ধিতা, নৈতিকতার ‘এমনটা হওয়া উচিত নয়’-এর বিপরীতে এক ভোঁতা ‘এমনটাই হয়’। হ্যাঁ, তা নৈতিকতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকে। কারণ, ন্যায়, মহানুভব, সাহস, প্রজ্ঞা, সংবেদন, মানুষের এহেন যে কোনো গুণের কথাই ধরা যাক না কেন, প্রতিটি ক্ষেত্রেই তা গুণ হয়ে ওঠে কেবলমাত্র তথ্যমূলকতার অন্ধ ক্ষমতার বিরুদ্ধে যুদ্ধঘোষণার মধ্য দিয়ে, প্রকৃত-র নামে চলা স্বৈরশাসন অমান্য করে এবং নেহাত ইতিহাসের ওঠা-নামা-র লেজুড়বৃত্তি নয় এমন নিয়ম দাখিল করে। নিজ অস্তিত্বের আশু মূঢ় তথ্য স্বরূপ নিজ আসক্তিগুলোর সঙ্গে যোঝার মধ্য দিয়ে বা চারিদিকে ঘনিয়ে ওঠা ঝকঝকে মিথ্যার জালের মধ্যেও সত্যানুগত্যে অবিচল থাকার মধ্য দিয়ে সবসময় তা ইতিহাসের স্রোতের বিরুদ্ধে সাঁতার কাটে। সাধারণভাবে ইতিহাস যদি ‘আসক্তি ও ভুল-এর বিশ্ব-ব্যবস্থা’ ছাড়া আর কিছু না হতো, গ্যেটে যেভাবে তাঁর ‘তরুণ ওয়েরদার-এর বিষাদগুচ্ছ’ উপন্যাসটি পড়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন, ইতিহাসকেও সেভাবে পড়া ছাড়া আর উপায়ান্তর থাকতো না: ধরে নিতে হতো যে তার বার্তা হলো, ‘মানুষ হয়ে ওঠো আর তাই আমাকে অনুসরণ কোরো না!’ তবে আশার কথা যে ইতিহাস নিজ মধ্যে ইতিহাসের বিরুদ্ধে লড়াই করা মহান যোদ্ধাদের কথাও সংরক্ষিত করে রাখে, সেই যোদ্ধাদের কথা যারা প্রকৃতপক্ষের অন্ধ ক্ষমতার বিরুদ্ধে যুযুধান। আর এভাবে যে মানুষরা ‘এমনটাই হয়’-কে থোড়াই তোয়াক্কা করে উৎফুল্ল দর্পের সঙ্গে ‘এমনটাই ভবিষ্যতে হবে’-র পিছু ধাওয়া করেছে, তাদেরই আসল ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব বলে প্রশংসিত করার মধ্য দিয়ে ইতিহাস নিজেই নিজেকে হাড়িকাঠে তুলেছে। নিজের জাতিগোষ্ঠীকে কবরে নিয়ে গিয়ে শোয়ানো নয়, বরং নতুন সজীব প্রজন্ম তৈরি করে যাওয়ার অভিপ্রায়-ই এই ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের নিরন্তর সম্মুখে ঠেলে নিয়ে চলে। যদি বা তাঁরা পরাগত প্রজন্মের সদস্যও হন, তাঁদের জীবন-যাপন-পদ্ধতিই এমন যা তা ভুলিয়ে দেয় এবং পরবর্তী প্রজন্মরা তাঁদের সর্বাগ্রজ হিসেবেই চিহ্নিত করে।

 

 

আমাদের যুগ কি তেমন এক সর্বাগ্রজ যুগ? এই যুগের ইতিহাসানুগত্য- বোধের উগ্রতা এতোই তীব্র এবং এমন সর্বজনীন ও লাগামছাড়া ভঙ্গিতে তার প্রকাশ ঘটে থাকে যে তার বিচারে যে কোনো ভবিষ্যৎ যুগ বস্তুতই আমাদের সর্বাগ্রজ বলে চিহ্নিত করবে--- অবশ্য যদি এটা ধরে নেওয়া হয় যে সাংস্কৃতিক অর্থে ভবিষ্যৎ কোনো যুগ সত্যিই কোনোদিন আসবে। কিন্তু ওই শেষোক্ত বিষয়টি নিয়েই তো আমাদের মধ্যে গভীর সন্দেহ বাসা বেঁধেছে। আধুনিক মানুষের আত্ম-অহংকারের খুব গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকে তার নিজেকে নিয়ে তির্যক বিদ্রূপ, এই বোধ তাকে কুরে খায় যে ইতিহাস-বানিয়ে-চলা গোধূলি-মেজাজ নিয়েই তাকে বেঁচে থাকতে হবে, তরতাজা আশা বা জীবনীশক্তি কিছুই আর ভবিষ্যৎ অবধি টিকে থাকবে না। কখনো সখনো আরো এগিয়ে গিয়ে সে অসূয়াপন্ন (cynic) হয়ে ওঠে এবং আধুনিক মানুষের স্বার্থে আরো ব্যবহারযোগ্য করে তোলার মতো করে ইতিহাসের, এমনকি গোটা বিশ্বজগতের, বিবর্তনকথার যাথার্থ্য প্রতিপাদন করে, অসূয়ক অনুশাসন জারি করে বলে: বস্তুসকল যেমন আছে তেমনটাই তাদের থাকার কথা, মানুষ এখন যেমন তেমনটাই তার হয়ে ওঠার ছিলো, এই অনিবার্যতাকে কেউ আটকাতে পারে না। এহেন অসূয়াবস্থায় নিমজ্জনের মধ্য দিয়ে পাওয়া সুখানুভূতি তার-ই আশ্রয় হয়ে ওঠে যে বিদ্রূপতির্যক অবস্থাটিকে সহ্য করতে পারে না। তাছাড়া, তাদের হাতে পুরস্কার স্বরূপ গত দশক তুলে দিয়েছে তার সুন্দরতম উদ্ভাবনগুলোর একটি, সেই উদ্ভাবন হলো এই অসূয়াভাব বর্ণনা করার মতো এক পূর্ণ নিটোল বুলি: ‘বিশ্ব-প্রক্রিয়ার কাছে ব্যক্তিত্বকে পূর্ণ সমর্পণ করা’, যে বুলি এহেন বাঁচার ধরনকে নির্দ্বিধভাবে এই সময়ের কেতা করে তুলেছে। ব্যক্তিত্ব এবং বিশ্বপ্রক্রিয়া! বিশ্বপ্রক্রিয়া এবং মাছির ব্যক্তিত্ব! অতিশয়োক্তির অতিশয়োক্তি ‘বিশ্ব, বিশ্ব, বিশ্ব’ নিয়ে নাগাড়ে ঘ্যানঘ্যানানি শুনতে বাধ্য হওয়ার বদলে যদি সত্যিই যা দরকার সেই ‘মানুষ, মানুষ, মানুষ’ নিয়ে সৎভাবে আরো কথা বলা যেতো! কী? গ্রিক ও রোমানদের উত্তরসূরি? খৃস্টানত্বের উত্তরসূরি? এসব নিয়েও অসূয়াবাদীরা বিশ্বপ্রক্রিয়ার উত্তরাধিকার ছাড়া আর কিছু ভাবার আছে বলে মনে করেন না! সবই তাঁদের কাছে বিশ্বপ্রক্রিয়ার শিখর ও চাঁদমারি! বিবর্তনের সমস্ত ধাঁধার সমাধান ও সম্যকার্থ যেন এই জ্ঞানবৃক্ষের পক্কতম ফল আধুনিক মানুষের মধ্য দিয়েই প্রতিভাত হয়ে উঠেছে! এই ভান-ভনিতাকে আমি গর্বোন্মাদনায় আত্মহারা হওয়া বলে থাকি; আর এই চিহ্ন দিয়েই সমস্ত যুগের সর্বাগ্রজদের চিহ্নিত করা যায়, এমনকি যদি তারা সবার শেষে এসে থাকে তাতেও কিছু যায় আসে না। ইতিহাস নিয়ে অনুধ্যান এত দূর অবধি আর কখনো উড়ান দেয়নি, এমনকি স্বপ্নেও; কারণ একমাত্র এখনই মানুষের ইতিহাস অন্যসব গাছপালা-জীবজন্তু-র ইতিহাসের সম্প্রসারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে; এমনকি সমুদ্রের গভীরতম তলদেশেও সর্বজনীন ইতিহাসবিদ জ্যান্ত পাঁকালের মধ্যে নিজের অংশচিহ্ন খুঁজে পেয়ে থাকেন; বিস্ময়ে আঁখি মেলে তিনি মানবপ্রজাতির ইতিমধ্যেই পার হয়ে আসা পেল্লায় পথরেখা পানে হাঁ করে চেয়ে থাকেন, আধুনিক মানুষ যে এই পথরেখা পর্যবেক্ষণ করতে সক্ষম হয়ে উঠতে পেরেছে সেই আরো বিস্ময়কর অলৌকিকতার কথা ভেবে তাঁর দৃষ্টি শিউরে শিউরে ওঠে। বিশ্বপ্রক্রিয়ার সুউচ্চ শিখরে তিনি গর্ব-আভিজাত্যে মশগুল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন, সেই শিখরে তাঁর জ্ঞানের পরশপাথরটি স্থাপন করতে করতে চারপাশের প্রকৃতিকে উদ্দেশ্য করে হেঁকে বলেন: ‘আমরা চূড়ান্ত লক্ষ্যটিতে পৌঁছে গেছি, এখন আমরাই চূড়ান্ত লক্ষ্য, আমরাই পূর্ণতাপ্রাপ্ত প্রকৃতি।’

হে উনিশ শতকীয় অতি-দর্পিত ইউরোপীয় মানুষ, তুমি প্রলাপ বকে চলেছো! তোমার জ্ঞান প্রকৃতিকে বিশুদ্ধ পূর্ণ রূপে পৌঁছে দেয় না, বরং তোমার জ্ঞান কেবল তোমার প্রকৃতিকেই ধ্বংস করে। জ্ঞান-আহরণে তোমার সক্ষমতার শিখরকে একবার অন্তত স্বতঃক্রিয়ায় তোমার অতল অক্ষমতার সঙ্গে তুলনা করে দেখো। জ্ঞানের সূর্যকর বেয়ে স্বর্গে আরোহণ করেছো সত্য, কিন্তু একইসঙ্গে তুমি অব্যবস্থার চোরাবালিতেও ডুবে গেছো। তোমার এই চলার কৌশল, জ্ঞানের মই বাওয়ার এই অভ্যাস-ই তোমার ঘাতক হয়ে উঠেছে; তোমার পায়ের নীচ থেকে জমি সরে গিয়ে ডুবে যাচ্ছে অজানায়; তোমার জীবনকে ঠেক দিয়ে ধরে রাখার মতো আর কিছু নেই কেবল মাকড়সার জালের মতো কিছু তন্তু ছাড়া আর সেই তন্তুগুলোও নবোত্থিত জ্ঞানের প্রতিটি দমক-এ ছিঁড়ে ছিঁড়ে পড়ছে।… যাক, এসব গুরুগম্ভীর কথা এই অবধিই থাক, কারণ আরো অনেক হালকা-প্রফুল্ল-মেজাজেও এসব বিষয় দেখা যেতে পারে।

ক্ষিপ্ত চিন্তাহীনতায় সমস্ত ভিত্তিকে ভেঙেচুরে খুলে ফেলা, অনবরত বয়ে চলে এমন এক নিরন্তর বিবর্তনে সেইসব দ্রবীভূত করে ফেলা, যা কখনো কোথাও ছিলো বা আছে সবকিছুর পাক খুলে অক্লান্তভাবে ইতিহাসীভূতকরণ করে চলা--- আধুনিক মানুষ মহাবিশ্বজোড়া ঊর্ণজালের গ্রন্থিতে বসে থাকা মহান ঊর্ণনাভের মতো এই যে সমস্ত কীর্তি করে চলেছে তা নীতিবাগীশ, শিল্পী, ধার্মিক, এমনকি রাজনীতিকদেরও উৎকন্ঠা ও আতঙ্কের কারণ হয়ে উঠতে পারে; কিন্তু আমরা অন্তত একবার এর আমোদটি নিতে ছাড়বো না। এই আমোদিত হয়ে ওঠার জন্য জনৈক দর্শন-লালিকা রচয়িতার ঝকঝকে জাদু-আয়নায় চোখ রেখে সবকিছু দেখতে হবে। এই দর্শন-লালিকা রচয়িতার মগজ-মাঝারেই এই যুগ নিজ ব্যাজস্তুতিপূর্ণ আত্মোপলব্ধিতে উপনীত হতে সমর্থ হয়েছে, আর সে আত্মোপলব্ধির স্বচ্ছতা এমন নিদারুণ যে তা (গ্যেটে-র কথা ধার করলে বলতে হয়) ‘কলঙ্কের প্রান্ত ছুঁয়ে যায়’। হেগেল একদা আমাদের শিখিয়েছিলেন: ‘নিহিতাত্মা (spirit) যখন দিক বদল করে, আমরা দার্শনিকরাও সেখানে হাজির থাকি’; আমাদের যুগ দিক বদল করে আত্ম-ব্যাজস্তুতির পথ ধরেছে, আর দেখো না কেন ই ভন হার্টমান৩৯-ও সেখানে হাজির ছিলেন এবং রচনা করে ফেলেছেন তাঁর বহু-প্রশংসিত অসচেতনতার দর্শন বা--- আরো যথার্থভাবে বললে--- অসচেতন ব্যাজস্তুতির দর্শন। হার্টমান-এর এই উপস্থাপনার চেয়ে প্রফুল্লতর উদ্ভাবন বা দার্শনিক বদমায়েশি আমরা খুব কমই খুঁজে পাবো। এই উপস্থাপনা পাঠ করে যিনি হয়ে-ওঠা(becoming)-র প্রকৃতি বিষয়ক জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হয়ে উঠবেন না, অন্তর প্রক্ষালিত হয়ে যিনি একেবারে সাফসুতরো হয়ে যাবেন না, নিশ্চিতভাবে ধরে নিতে হবে যে তিনি সত্যিই পরিপক্ক হয়ে যাওয়ার দুর্ভাগ্যফলে সেকেলে হয়ে ওঠার মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। বিশ্ব-প্রক্রিয়ার সূচনা ও লক্ষ্য, সচেতনতার প্রথম কোপ থেকে শুরু করে শূন্যতার মধ্যে আবার সচেতনতাকে ছুঁড়ে ফেলা, তৎসঙ্গে এই বিশ্ব-প্রক্রিয়ার মধ্যে আমাদের প্রজন্মের কর্তব্য সম্পর্কে এক যথাযথ বিবরণ--- অনুপ্রেরণার যে উৎসকূপটিকে অতি বুদ্ধিমত্তার সাথে আবিষ্কার করা হয়েছে, সেই অবচেতনা থেকে তুলে এনে সরাসরি যখন সব হাজির করা হয়, রহস্য-উন্মোচক আলো ঝিলিক মেরে ওঠে, অতি গম্ভীর মুখে সত্যিকারের ঐকান্তিক দর্শনচর্চার ভান করে যখন এসব আউড়ে যাওয়া হয় যেনবা দর্শনের নামে কোনো ঠাট্টাতামাশা আসলে করা হচ্ছে না--- তখন এহেন উপস্থাপনা তার উপস্থাপককে সর্বকালের অন্যতম সর্বাগ্রজ দার্শনিক লালিকাকার রূপে প্রতিষ্ঠিত করে দেয়। প্রকৃত সর্বজনীন মহৌষধের আবিষ্কারক এই মহাজনের প্রতিষ্ঠাবেদীতে আসুন আমরা আমাদের শ্রদ্ধার্ঘ্য--- এক গাছা চুল (শ্লেয়ারমাখার৪০-এর শ্রদ্ধানিবেদনের পথগুলোর একটি অনুকরণ করে) নিবেদন করি। কারণ, ঐতিহাসিক সংস্কৃতির অত্যধিক বাড়বাড়ন্তের প্রতিষেধক হিসেবে হার্টমান-রচিত বিশ্ব-ইতিহাস-লালিকা-র চেয়ে অমোঘ আর কী হতে পারে?

বাক্যালঙ্কার সরিয়ে রেখে দেখলে, হার্টমান তাঁর অচেতন ব্যাজস্তুতির ধোঁয়ায় ঢাকা তেপায়ার উপর থেকে আমাদের উদ্দেশ্যে যা ঘোষণা করে চলেছেন তার সারবত্তা দাঁড়ায় এরকম: তিনি বলছেন আমাদের সমসময় যেরকম ঠিক সেরকম থাকাই যথেষ্ট, তাতেই তা শেষাবধি এমন এক অবস্থা তৈরি করবে যখন মানুষের কাছে এই অস্তিত্ব অসহ্য ঠেকবে: একথা আমরা প্রকৃতই বিশ্বাস করে থাকি। আমাদের যুগসময়ের এই ভয়ঙ্কর অশ্মীভবন, হাড়গোড়ের এ বিরামহীন খটখটানি--- যাকে ডেভিড স্ত্রাউস৪১ অতিসারল্যে ‘ন্যায্যতম বাস্তবিকতা’ বলে বর্ণনা করেছেন--- হার্টমান তার যাথার্থ্য প্রতিপাদন করেছেন। আর এই যাথার্থ্য প্রতিপাদন করেছেন কেবল পিছন থেকেই নয়, অর্থাৎ ex causis efficientibus৪২ নয়, বরং, বা, এমনকি, সামনে থেকেও, অর্থাৎ, ex causa finali৪৩; শেষের সেই দিন--- তার আলোতেই দুরাত্মা মহাশয় আমাদের যুগকে আলোকিত করেছেন, আর তাতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে আমাদের  যুগ বেশ উত্তম বটে, বিশেষ করে যারা জীবনকে হজম করতে না পারার রোগে যথাসম্ভব পীড়িত হয়ে থাকতে চান আর তাই শেষের সেই দিনটির জন্য যাদের আর তর সয় না তাদের জন্য এই যুগের তো কোনো তুলনাই হয় না। এ কথা সত্য যে এখন মানবপ্রজাতির জীবন যে পর্যায়ে এসে উপনীত হচ্ছে সেই পর্যায়কে হার্টমান তার ‘পৌরুষের বছরগুলো’ বলে অভিহিত করেছেন। কিন্তু তা বলতে তিনি সেই আনন্দময় অবস্থাটিকেই বুঝিয়েছেন যখন ‘জমাট-বাঁধা মাঝারিয়ানা’ ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই, যখন শিল্প মানে কেবল ‘বার্লিনের ব্যবসায়ীদের সান্ধ্য মনোরঞ্জনের সামগ্রী’, যে যুগে ‘যুগন্ধর প্রতিভাদের আর দরকার নেই, যেমন উলুবনে মুক্তোর দরকার হয় না, যেহেতু প্রগতির ঘাড়ে চেপে যুগ সেই পর্যায় পেরিয়ে গেছে যখন সেই প্রতিভাদের প্রয়োজন পড়তো আর তা পেরিয়ে গিয়ে আরো গুরুত্বপূর্ণ এক পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে’--- সমাজ-বিবর্তনের এমনই এক পর্যায়ে এসে যুগ পৌঁছেছে যেখানে প্রতিটি শ্রমিক ‘তার শ্রমদিবসের শেষে বুদ্ধিবৃত্তিগত প্রশিক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত অবসর সময় পায় ও আরামপ্রদ অস্তিত্ব যাপন করে’। দুরাত্মাকুল-শিরোমণি মহাশয়, আপনি ঠিক আমাদের সমকালীন মানবজাতির একান্ত সাধটিকে ভাষা দিয়ে দিয়েছেন, কিন্তু এই জমাট-বাঁধা মাঝারিয়ানায় বাঁধা বুদ্ধিবৃত্তিগত প্রশিক্ষণের কী পরিণতি এই পৌরুষের বছরগুলোর অন্তে হতে চলেছে তা-ও নেহাত আপনার অজানা নয়। সেই পরিণতি হলো নিখাদ বিতৃষ্ণা। ব্যাপারস্যাপার এমনিতেই দৃশ্যত খুব খারাপ অবস্থায় চলে গেছে, কিন্তু আরো খারাপ অবস্থায় যেতে চলেছে, ‘অপখ্রিস্ট (Anti-Christ) দৃশ্যতই তার প্রভাব বিস্তৃত থেকে বিস্তৃততর করে চলেছে’--- কিন্তু সেটাই তো হওয়ার কথা, সেটাই তো চূড়ান্ত পরিণতি, কারণ আমাদের অবলম্বন করা পথ তো কেবল সকল অস্তিত্বের প্রতি চূড়ান্ত বিতৃষ্ণাতে গিয়েই শেষ হতে পারে! ‘ঈশ্বরের আঙুর-বাগানের শ্রমিক হিসেবে বিশ্ব-প্রক্রিয়া-কে তাই সর্বশক্তি দিয়ে ঠেলে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যাক, কারণ একমাত্র সেই প্রক্রিয়াই তো মুক্তির পথ দেখাতে পারে!’

ঈশ্বরের আঙুর-বাগান! প্রক্রিয়া! মুক্তি! এসবের মধ্য দিয়ে কেবলমাত্র ‘হয়ে-ওঠা’ জানে-বোঝে যে ঐতিহাসিক সংস্কৃতি তা কীভাবে জেনেবুঝে এক লালিকারূপী বিকৃতির ভেক ধারণ করে বসে, কীভাবে এক বিকট মুখোশের আড়াল থেকে তা নিজ সম্পর্কে দুষ্টতম আবোলতাবোল বকে যেতে থাকে--- তা দেখতে ও শুনতে কি আর কারও বাকি থাকে? কারণ, আঙুর-বাগানের শ্রমিকদের প্রতি এই শেষোক্ত ছলনাময় আহ্বান আসলে তাদের কাছ থেকে কী দাবি করছে? সর্বশক্তি দিয়ে ঠেলে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য তাদের ঠিক কী করতে হবে? বা, প্রশ্নটিকে অন্যভাবে রাখলে: হয়ে-ওঠা-র প্রবাহে সাঁতার-প্রক্রিয়া ও ভরাডুবির নেশায় মত্ত অধুনার ঐতিহাসিক সংস্কৃতিতে লালিত মানুষের করতলে যখন এই আঙুর-বাগান-এর সূক্ষ্মতম আঙুর, অর্থাৎ, যে বিতৃষ্ণার কথা আমরা বলেছি, তা ছাড়া আর কিছুই না পড়ে থাকে, তখন তার আর কী করার থাকতে পারে? ---কিছুই আর তার করার থাকে না, কেবল যেভাবে এযাবৎ বেঁচে এসেছে সেভাবেই বেঁচে চলা ছাড়া, যাকিছু এযাবৎ ভালোবেসে এসেছে সেগুলোকেই ভালোবেসে যাওয়া ছাড়া, যাকিছু এযাবৎ ঘৃণা করে এসেছে সেগুলোকেই ঘৃণা করে যাওয়া ছাড়া, আর যেসব সংবাদপত্র এযাবৎ পড়ে এসেছে সেগুলোকেই পড়ে যাওয়া ছাড়া; তার কাছে তখন পাপ বলতে একটাই--- এযাবৎ যেভাবে বেঁচে এসেছে তার অন্যথা করাই তার কাছে পাপ। যেভাবে এযাবৎ সে বেঁচে এসেছে, তা অবশ্য বিরাট জাঁকালো স্মারকের মতো অক্ষরে সেইসব সুপ্রসিদ্ধ পৃষ্ঠায় নথিভুক্ত করে ফেলা হয়েছে যা এখনকার সংস্কৃতিবান হুজুগে দঙ্গলকে একেবারে আনন্দে আত্মহারা করে দিয়েছে যেহেতু এর মধ্য দিয়েই তারা নিজেদের যাথার্থ্য প্রতিপাদন করার যুক্তি সর্বনাশা আলোয় ঝলমলে হয়ে উঠতে দেখেছে। তাই আমাদের অচেতন লালিকাবাগীশ প্রতিটি ব্যক্তির কাছে দাবি করেছেন যাতে তারা ‘বিশ্ব-প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত লক্ষ্য, আর্থাৎ নিখিল বিশ্বের মুক্তি, তার স্বার্থে ওই বিশ্ব-প্রক্রিয়ার কাছে ব্যক্তিত্বকে পুরোপুরি আত্মসমর্পণ’ করে; বা আরো স্পষ্ট করে বললে: ‘বেঁচে থাকার অভিপ্রায়ের স্বীকৃতিদানই বর্তমানের জন্য একমাত্র সঠিক পন্থা; যেহেতু জীবন ও তার দুঃখ-যন্ত্রণার কাছে পুরোপুরি আত্মসমর্পণ করার মধ্য দিয়েই বিশ্ব-প্রক্রিয়ার জন্য কিছু অর্জন করা যেতে পারে, কাপুরুষের মতো তা পরিত্যাগ করে বা তার থেকে সরে গিয়ে কিছুই অর্জন করা যায় না’ , ‘ব্যক্তি-অভিপ্রায়কে অস্বীকার করার চেষ্টা আত্মহননের মতোই, বা তার চেয়েও বেশি মূর্খামি ও বেকার কাজ’। ‘আর কোনো বিশদীকরণ ছাড়াই চিন্তাশীল পাঠক নিশ্চয়ই বুঝতে পারবেন যে এই সমস্ত নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত ব্যবহারিক দর্শন কী চেহারা ধারণ করতে পারে, আর সেই দর্শন জীবনের সঙ্গে পূর্ণতম পুনর্মিলনকেই মূর্ত করে তুলবে, জীবন থেকে কোনোরূপ বিচ্ছিন্নতাকে প্রশ্রয় দেবে না।’

চিন্তাশীল পাঠক নিশ্চয়ই বুঝতে পারবেন--- হার্টমানকে না বুঝে কোনো উপায় আছে নাকি! কিন্তু কী যে মজার কথা যে কেউ কেউ তাঁকে ভুল বুঝে বসে! এই সময়ের জার্মানরা কি মানুষ হিসেবে খুবই পরিশীলিত? জনৈক যথোচিত ইংরেজ সমকালীন জার্মানদের মধ্যে ‘সূক্ষ্ম উপলব্ধি’-র অভাব খুঁজে পেয়ে এমনকি বলে বসেছেন, ‘জার্মান মগজে সবকিছু কেমন চ্যাটালো, ভোঁতা, অসুবিধাকর, অসুষ্ঠ’৪৪--- আমাদের মহান জার্মান লালিকাকার মহাশয় কি এটা অস্বীকার করবেন? এটা সত্য যে এই মহান জার্মান লালিকাকার মহাশয়ের কথা অনুযায়ী, আমরা জার্মানরা সেই আদর্শ অবস্থায় উপনীত হতে চলেছি যেমতাবস্থায় ‘মনুষ্যপ্রজাতি পূর্ণ সচেতনতা ও সজাগতায় নিজ ইতিহাস নিজেই তৈরি করে’: কিন্তু স্পষ্টতই আমরা সেই আদর্শতর অবস্থা থেকে এখনও অনেক দূরে রয়ে গেছি যে অবস্থায় কোনো মানুষ হার্টমান-এর বইটি পূর্ণ সচেতন সজাগতা নিয়ে পড়তে পারে। যদি সেভাবে কেউ পড়তে পারতো তাহলে কদাচ আর কেউ না হেসে ‘বিশ্ব-প্রক্রিয়া’ শব্দটি উচ্চারণ করতে পারতো না; কারণ তার মনে ভেসে উঠতো সেই সময়কাল যখন হার্টমান-এর গসপেল-লালিকাটিকে শ্রবণ করা হতো, আত্মস্থ করা হতো, আক্রমণ করা হতো, শ্রদ্ধা করা হতো, প্রচার করা হতো এবং তার উপর মাহাত্ম্য আরোপ করা হতো, এবং এই সব-ই করা হতো ‘জার্মান মগজ’-এর সরল সততা সহকারে, বস্তুত গ্যেটের ভাষা ধার করে বললে, ‘পেঁচার তেরছা ব্যগ্রতা’ নিয়ে। কিন্তু বিশ্ব তো আর থেমে থাকবে না, সেই আদর্শ অবস্থাও বসে বসে স্বপ্ন দেখে তৈরি করে ফেলা যাবে না, সেই আদর্শ অবস্থার জন্য খেটেখুটে লড়তে হবে, আর একমাত্র উৎফুল্লতার পথ ধরেই এই পেঁচার ব্যগ্রতা থেকে মুক্তি পাওয়া যেতে পারে। এমন সময় একদিন আসবে যখন মানুষ বুদ্ধিমানের মতো সব রকম বিশ্ব-প্রক্রিয়া নির্মাণ থেকে বিরত হবে, এমনকি মানুষের ইতিহাস নির্মাণ থেকেও বিরত হবে, যখন আঁটি করে বেঁধে মানুষ বোঝার চেয়ে ব্যক্তি-একক হিসেবে বোঝার চেষ্টা করা হবে, যে ব্যক্তি-এককরা হয়ে-ওঠা-র উত্তাল স্রোতের উপর এক ধরনের সেতু হয়ে উঠবে। সেই ব্যক্তি-এককরা কোনো ধরনের প্রক্রিয়াকে ঠেলে এগিয়ে নিয়ে চলে না, বরং একে-অপরের সঙ্গে সমসাময়িকভাবে বেঁচে থাকে, ইতিহাসকে ধন্যবাদ কারণ ইতিহাস-ই এমন সহাবস্থান-সহযোগিতা অনুমোদন করে, সোপেনহাওয়ার একদা যে প্রতিভাশালীদের প্রজাতন্ত্রর (republic of genius) কথা বলেছিলেন তারা তা গঠন করে বেঁচে থাকে; মরুবিরামকালগুলোর এপার থেকে ওপারে এক মহৎ প্রতিভা আরেক মহৎ প্রতিভাকে আহ্বান করে চলে, তাদের অনেক তলায় হামাগুড়ি-কেটে-চলা বামনদের উত্তেজিত কিচির-মিচির তাদের স্পর্শ করে না, তাদের সমুচ্চ আত্মিক কথোপকথন জারি থাকে। ইতিহাসের কাজ হলো এই মহৎ প্রতিভাদের মধ্যে মধ্যস্থতার কাজটি করে যাওয়া যাতে মহৎ মানুষদের তৈরি হওয়ায় বারংবার শক্তি ও প্রণোদনা যুগিয়ে যাওয়া যায়। না, মনুষ্যপ্রজাতির লক্ষ্যস্থল তার যাত্রার শেষবিন্দুটি নয়, বরং লক্ষ্যস্থল হলো তার সর্বোচ্চ দৃষ্টান্তগুলি।

আমাদের লালিকাকারের দৃষ্টিভঙ্গি অবশ্য ভিন্ন। সেই ধন্য দ্বান্দ্বিকতা, যা ঠিক ততোটাই খাঁটি যতোটা তার চাটুকাররা সাধুবাদের যোগ্য, তার প্রয়োগ ঘটিয়ে তিনি আমাদের বলেন: ‘বিশ্ব-প্রক্রিয়া অনন্ত অতীত ধরে লাগু আছে বলে অনুমান করে নিলে তা বিবর্তনের ধারণার সঙ্গে খাপ খায় না, কারণ তাহলে ধরে নিতে হয় যে সমস্ত সম্ভাব্য বিবর্তন প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই বলবৎ হয়ে গেছে, যা হতে পারে না (শঠতার পরাকাষ্ঠা!); তাই একইভাবে ভবিষ্যতেও অনন্তকাল ধরে এই বিশ্ব-প্রক্রিয়া লাগু থাকবে বলে আমরা ধরে নিতে পারি না, কারণ আগেরটির মতো এই ধরে নেওয়াটিও নাকচ করে দেবে যে বিশ্ব-প্রক্রিয়া একটি চূড়ান্ত লক্ষ্যের দিকে ধাবমান (শঠতা পুনর্বার!) আর বিশ্ব-প্রক্রিয়া তখন অনেকটা দানাইদ-দের কলসিগুলোর৪৫ চরিত্র ধারণ করবে। অযুক্তির উপর যুক্তির পূর্ণ বিজয় (শঠকূল চূড়ামণি!) হাসিল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিশ্ব-প্রক্রিয়ার সাময়িক অবসান ঘটবে, সেটাই হবে অন্তিম দিন।’ না, হে সজাগ লালিকাকার, বর্তমানের মতোই যতোদিন অযুক্তি রাজ করে যাবে, আপনাদের বহুকথিত ‘বিশ্ব-প্রক্রিয়া’ নিয়ে কচকচানি ও সর্বজন-প্রশংসা ধ্বনিত হতে থাকবে, ততোদিন অন্তিম সে দিন অনেক দূরেই রয়ে যাবে: কারণ পৃথিবী তখনও অতিমাত্রায় উৎফুল্লকর রয়ে যাবে, বহু ভ্রম তখনও পল্লবিত হতে থাকবে, যেমন ধরা যাক আপনাকে নিয়ে আপনার সমসাময়িকদের লালন করা ভ্রম, আর আপনার উদ্দিষ্ট শূন্যতায় নিক্ষিপ্ত হতে আমরা তখনও রাজি হবো না: কারণ একবার মানুষ আপনাকে বুঝতে শুরু করলে পরিস্থিতি উৎফুল্লতর হয়ে উঠবে বলেই আমাদের বিশ্বাস, অচেতনকে যারা পাঠ করে তাদের আপনি ঠিক বুঝতে পারেন নি। যদি অবশ্য, পাঠকদের কাছে পেশ করা আপনার ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী, বিতৃষ্ণাই ক্ষমতার দোসর হয়, আপনার বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আপনার বিবরণই যদি সত্য প্রমাণিত হয়--- আপনার চেয়ে অধিক বিতৃষ্ণা নিয়ে তো আর কেউ তাদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেনি--- তাহলে যেভাবে আপনি প্রস্তাব করেছেন সেভাবেই সংখ্যাধিক্যের সঙ্গে মিলে এর পক্ষে ভোট দিতে আমি নিঃসংশয়ে তৈরি থাকবো যে পরের রবিবার রাতে ঠিক যখন বারোটা বাজবে তখনই বিশ্বজগতের ধ্বংস হয়ে যাওয়া উচিত আর আমাদের সেই ফরমানের শেষ সিদ্ধান্ত হবে: কাল থেকে সময় বলে আর কিছু থাকবে না এবং কোনো সংবাদপত্রও আর প্রকাশিত হবে না। কিন্তু আমাদের ফরমানে হয়তো কোনো কাজ হবে না: সেক্ষেত্রে অবশ্য আমরা অন্তত একটা চমৎকার পরীক্ষানিরীক্ষা করার অবকাশ পেয়ে যাবো। আমরা একটা দাঁড়িপাল্লা জোগাড় করে তার একদিকের পাল্লায় রাখবো হার্টমান-এর অচেতন-কে, আর অন্য পাল্লায় রাখবো হার্টমান-এর বিশ্ব-প্রক্রিয়া-কে। কেউ কেউ আছেন যারা মনে করেন যে দুটোর ওজন ঠিক সমান না হয়ে যায় না: কারণ, দুটোর মধ্যেই সম পরিমাণ বাজে অভিব্যক্তি ও সম পরিমাণ ভালো তামাশা রয়েছে। একবার হার্টমান-এর তামাশাকে যদি কেউ ধরে ফেলে, হার্টমান-এর ‘বিশ্ব-প্রক্রিয়া’ অভিব্যক্তিটিকে তামাশায় ছাড়া অন্য কোনো হেতু আর কেউ ব্যবহার করবে না। ঐতিহাসিক বোধের যেসব বাড়াবাড়ি, যেমন: স্থিতসত্তা ও জীবনকে কোনো আমল না দিয়ে প্রক্রিয়া নিয়ে সীমাতিরিক্ত মাতামাতি, সমস্ত পরিপ্রেক্ষিত নির্বোধের মতো সরিয়ে ফেলা--- সেসবকে যথাসম্ভব তীব্র ব্যঙ্গবিদ্বেষে আক্রমণ করার সময় অনেকদিনই হয়ে গেছে; আর সেই সূত্রেই আমাদের এই অচেতনের দার্শনিক মহাশয় চিরদিন প্রশংসিত হবেন এই হিসেবে যে তিনিই প্রথম অনুভব করেছিলেন ‘বিশ্ব-প্রক্রিয়া’ ধারণাটি কতো হাস্যকর এবং তাঁর উপস্থাপনার ঐকান্তিক আন্তরিকতার মাধ্যমে অন্যদেরও তা আরো জোরালোভাবে অনুভব করতে সাহায্য করেছিলেন। কী চূড়ান্ত লক্ষ্য নিয়ে ‘বিশ্ব’ অস্তিত্বমান, কী চূড়ান্ত লক্ষ্য নিয়ে মানবপ্রজাতি অস্তিত্বমান, সেসবকে তামাশার বস্তু ছাড়া আর অন্য কোনোভাবে ভাবার বিষয় করে তোলার দরকার আর আমাদের নেই এই মুহূর্তে: কারণ, বিশ্বজগতের মঞ্চে ক্ষুদ্র মনুষ্যকীটটির বিপুল আত্মম্ভরীতার চেয়ে তামাশাকর বস্তু বর্তমানে আর কিছু হতে পারে না। অপরপক্ষে, নিজেকে অবশ্যই আপনি জিজ্ঞাসা করুন কেন ব্যক্তি-একক রূপে আপনি অস্তিত্বমান, যদি সেই প্রশ্নের আর কোনো উত্তর খুঁজে না পান তাহলে একবার অন্তত নিজের সামনে একটা লক্ষ্য খাড়া করে আরোহী প্রণালীতে (a posteriori) নিজের অস্তিত্বের যাথার্থ্য প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করে দেখুন, সে লক্ষ্য যেন সমুচ্চ ও মহিমাণ্বিত এক লক্ষ্য হয়, যার জন্য সব কিছু নিবেদন করা সমীচীন হয়। সেই লক্ষ্যের পিছনে ছুটে নিজেকে ধ্বংস করুন, আর, animae magnae prodigus৪৬, মহান অসম্ভব কিছুর পিছনে ছুটে নিজেকে ধ্বংস করার চেয়ে উত্তমতর জীবনের লক্ষ্য কিছু হতে পারে বলে আমার জানা নেই। অন্যথায়, যদি, সেই মতবাদ যা হয়ে-ওঠা-র সার্বভৌমত্বের কথা বলে, সমস্ত ধারণা/ধরণ/প্রজাতি-র তরলতার কথা বলে, মানুষ ও পশুর মধ্যে কোনো অত্যাবশ্যক প্রভেদের কথা অস্বীকার করে--- যে মতবাদ সত্য কিন্তু মারাত্মক বলে আমি মনে করি--- তা যদি আরো এক প্রজন্ম মানুষের উপর অধুনা-প্রচলিত ধরে-বেঁধে-শিক্ষিত-করে-তোলার রোষ নিয়ে চাপিয়ে দেওয়া হয়, অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না যে মানুষ সংকীর্ণ আত্মসর্বস্বতার প্রকোপে ধ্বংস হয়ে যাবে, লোভ-লালসায় শিলীভূত হয়ে যাবে, চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে ভেঙে পড়বে এবং মানুষ আর মানুষ থাকবে না, তার জায়গায় আত্মসংকীর্ণতাবাদী নানা তন্ত্র, হিংস্র লালসায় অপরদের শোষণ করার জন্য গড়ে ওঠা নানা ভ্রাতৃসঙ্ঘ, উপযোগিতাবাদী অশিষ্টতার এহেন নানা উদ্ভাবন ভবিষ্যতের আঙিনাকে হয়তো ছেয়ে ফেলবে। এসব গজিয়ে ওঠার পথ করে দেওয়ার জন্য আর কিছু লাগবে না, কেবল জনতার দৃষ্টিকোণ থেকে ইতিহাস লিখে গেলেই হবে, ইতিহাস-নিয়ন্ত্রণকারী নিয়মগুলোকে জনতার চাহিদা থেকে তুলে আনলেই হবে, অর্থাৎ, সমাজের সর্বনিম্ন মাটি-কাদার-স্তর যে নিয়মে চলে তাকেই ইতিহাসের নিয়ম করে তুললেই হবে। আমার মনে হয় যে তিনটি দিক থেকে জনতাকে গণ্য করা প্রয়োজন: প্রথমত, বাজে কাগজে ক্ষয়গ্রস্ত ছাপাযন্ত্রে তোলা মহান মানুষদের বিবর্ণ প্রতিরূপ হিসেবে; দ্বিতীয়ত, মহান মানুষদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী বল হিসেবে; আর তৃতীয়ত, মহান মানুষদের দ্বারা চালিত হাতিয়ার হিসেবে; এই তিনটে দিক বাদ দিলে জনতা কেবল শয়তান ও পরিসংখ্যান-এর আবাদক্ষেত্র। কী যেন বলা হয়? পরিসংখ্যান নাকি প্রমাণ করতে পারে যে ইতিহাস কিছু নিয়ম অনুযায়ী চলে? নিয়ম? সন্দেহ নেই যে পরিসংখ্যান তুলে ধরে যে জনতা কতোটা স্থূল ও বমনোদ্রেককর রকমের সমরূপ--- কিন্তু জাড্য, নির্বুদ্ধিতা, নকলনবিশি, প্রেম ও ক্ষুধার ফলাফলগুলোকেই কি আমরা নিয়ম বলে অভিহিত করতে পারি? যদি তাই-ই হয় তাহলে এই প্রস্তাবটিকেই সত্য বলে ধরে নিতে হবে যে ইতিহাসের যদি নিয়ম থাকে, তাহলে সেই নিয়মগুলো ফালতু আর সে ইতিহাস আরো ফালতু। অথচ বর্তমানে যে ধরনের ইতিহাসের কদর সর্বত্র, তা ঠিক সেই ধরনের ইতিহাস যা জনতার তীব্রতম চাহিদাগুলোকেই ইতিহাসের প্রধান ও সবচেয়ে ওজনদার তথ্য হিসেবে গণ্য করে এবং মহান মানুষদের কেবলমাত্র সেসবেরই সবচেয়ে স্পষ্ট অভিব্যক্তি বলে ধরে নেয়, যেনবা তারা বন্যাস্রোতের উপরে ভাসমান কিছু বুদবুদ বৈ আর কিছু নয়। এহেন প্রতর্কে মতত্ত্ব হলো জনতাদের দ্বারা উৎপাদিত একটি বস্তু, যার মানে দাঁড়ায়, শৃঙ্খলা হলো বিশৃঙ্খলা দ্বারা উৎপাদিত বস্তু, আর তার ফলে সবশেষে এটাই স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়ায় .এ মহত্ত্বের উৎপাদক জনতার জয়গান গাইতে হবে। যা এমত জনতাকে কোনো এক সময়কালের জন্য তাড়িত-চালিত করে ‘ইতিহাসের শক্তি’ হয়ে উঠেছে, তার উপরই ‘মহান’ শিরোপাটি লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে কি গুণ-এর সঙ্গে পরিমাণকে খুব ইচ্ছাকৃতভাবেই গুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে না? রূঢ় জনতা যখন তাদের পছন্দমতো কোনো ভাবনা খুঁজে নেয়, যেমন ধরা যাক কোনো ধর্মীয় ভাবনা, আর প্রাণপণে তার সমর্থনে দাঁড়িয়ে শতকের পর শতক তা টেনে-হিঁচড়ে বয়ে নিয়ে চলে, তখনই নাকি সেই ভাবনার উদ্গাতা বা আবিষ্কর্তাকে মহান বলতে হবে! কিন্তু কেন? সবচেয়ে উদার ও উচ্চ ভাবনাগুলো তো জনতার উপর সেভাবে কোনো প্রভাবই বিস্তার করতে পারে না। যেমন ধরা যাক খ্রিস্টধর্মের ঐতিহাসিক সাফল্যের কথা। ইতিহাসে খ্রিস্টধর্মের শক্তি, সংসক্তি ও স্থায়িত্ব তার প্রতিষ্ঠাতার মহত্ত্ব সম্পর্কে কিছুই পরিচয় দেয় না--- পরিচয় যে দেয় না সেটাই সুখের কথা, কারণ যদি পরিচয় দিতো তাহলে তা তাঁর মহত্ত্বকেই নাকচ করতো। খ্রিস্ট স্বয়ং এবং খ্রিস্টধর্মের ঐতিহাসিক সাফল্যের অন্তর্বর্তী জায়গাটিতে দাঁড়িয়ে আছে একটি অতি অন্ধকার ও জাগতিক কালস্তর যা অন্ধ আসক্তি, ভ্রান্তি, ক্ষমতার লোভ, মর্যাদার লোভ দিয়ে গাঁথা, রোমান সাম্রাজ্যের শক্তির ধারাবাহিকতায় বাঁধা; আর এই অন্ধকার স্তরটি থেকেই খ্রিস্টধর্ম তার জাগতিক অবশিষ্ট ও স্বাদটি আহরণ করেছে যা তাকে তার তথাকথিত সংসক্তি প্রদান করে এই জগতে তার টিকে থাকা সম্ভব করে তুলেছে। মহত্ত্ব কখনো সাফল্য দিয়ে প্রমাণিত হয় না: ডেমোসথেনেস৪৭ মহত্ত্বের অধিকারী ছিলেন, যদিও তিনি কোনো সাফল্য পাননি। খ্রিস্টধর্মের সবচেয়ে খাঁটি ও প্রকৃত অনুসারীরা সর্বদাই খ্রিস্টধর্মের জাগতিক সাফল্য ও তথাকথিত ‘ইতিহাসগত শক্তি’-কে প্রশ্ন করেছেন এবং বিরোধিতা করেছেন, তার পৃষ্ঠপোষণা করেননি, কারণ তাঁরা ‘জগত’-এর বাইরে নিজেদের অবস্থিত করতেই অভ্যস্ত ছিলেন এবং ‘খৃস্ট-ধারণার প্রক্রিয়া’ নিয়ে তাঁদের কোনো মাথাব্যথাও ছিলো না, আর সেই কারণেই সাধারণত তাঁরা ইতিহাসে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত ও অপরিচিত থেকে গেছেন। খ্রিস্টীয় ভাষায় বললে: শয়তান-ই হলো এই জগতের শাসনকর্তা, শয়তান-ই হলো সাফল্য ও প্রগতির মনিব; সমস্ত ইতিহাসগত শক্তির মধ্যে শয়তান-ই আসল শক্তি, আর মূলগতভাবে কখনো এর কোনো ব্যত্যয় হবে না--- ইতিহাসে সাফল্য ও আধিপত্যকারী শক্তিকে দেবরূপে ভজনা করতে শেখা প্রজন্মের কানে এ কথা অতি কটু শোনালেও, এটাই সত্যি। এমন এক যুগ এখন চলছে যা বস্তুর উপর নতুন নাম আরোপ করায় হাত পাকিয়ে ফেলেছে এবং শয়তানকেও ধর্মীয় দীক্ষা দিয়ে পবিত্র করে নিয়েছে। প্রকৃতই এ এক মহা সর্বনাশের প্রহর: মনুষ্যপ্রজাতি এখন আবিষ্কার করতে বসেছে যে ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা জনতার আত্মসর্বস্বতাবাদ-ই চিরদিন কলকাঠি নেড়ে ইতিহাসকে চালিয়ে নিয়ে গেছে; আর একইসঙ্গে এই আবিষ্কার তার মনে কোনো কাঁপুনি ধরায় নি, বরং সে এহেন অধ্যাদেশ জারি করে বসেছে যে আত্মসর্বস্বতাবাদ-ই হবে আমাদের ঈশ্বর। এই ধর্মমতে দীক্ষিত হয়ে মানুষ এখন ভেবেচিন্তে ঢাক-ঢোল-পিটিয়েই আত্মসর্বস্বতাবাদের ভিতের উপর ভবিষ্যতের ইতিহাস নির্মাণ করতে কোমর-বেঁধে লেগে পড়েছে: কেবল বলা হচ্ছে যে এ আত্মসর্বস্বতাবাদ অতীতের আত্মসর্বস্বতাবাদের চেয়ে বেশি বিচক্ষণ হবে, কিছু সংযমের বেড়িতে বেঁধে নিজেকে টেকসই করে তুলবে, আগেকার বিচক্ষণতাহীন আত্মসর্বস্বতাবাদ-এর করা ভুলগুলো আবারও যাতে না হয় তার জন্য সে ইতিহাস পাঠ করে শিক্ষা নেবে। এই শিক্ষা নেওয়ার প্রক্রিয়ায় জানা গেছে যে আত্মসর্বস্বতাবাদের বিশ্ব-ব্যবস্থা স্থাপনের কাজে একটি অতি বিশেষ ভূমিকা পালন করে রাষ্ট্র: সমস্ত বিচক্ষণ আত্মসর্বস্বতাবাদের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে অবশ্যই রাষ্ট্রকে ভূমিকা নিতে হয় যাতে সে অবিচক্ষণ আত্মসর্বস্বতাবাদের স্বভাবজ ভয়ংকর প্রাদুর্ভাব থেকে সেনাবাহিনী-পুলিশ-সহযোগে বিচক্ষণ আত্মসর্বস্বতাবাদদের রক্ষা করতে পারে। এই একই লক্ষ্যপূরণের অভিপ্রায়ে ইতিহাসকে--- অর্থাৎ, পশু ও মানুষের বিবর্তনমূলক ইতিহাসকে--- অতি সন্তর্পণে জনতা ও শ্রমিকশ্রেণির অবিচক্ষণতা-হেতু-বিপজ্জনক পরিসরের মধ্যে নিয়ে এসে স্থাপন করা হয়েছে: কে না জানে যে ইতিহাসগত সংস্কৃতির কয়েক চূর্ণ বটিকাই তাদের রূঢ় ভোঁতা প্রবৃত্তি ও বাসনাগুলোকে বিগলিত করে বিচক্ষণ আত্মসর্বস্বতাবাদের পথে ঠেলে দিতে পারে। অতএব সারসংক্ষেপ করলে দাঁড়ালো যে, ভন হার্টমান মহাশয়ের কথা অনুযায়ী, মানবপ্রজাতি এখন ‘ভবিষ্যতের দিকে চিন্তাশীল ভাবে তাকিয়ে পার্থিব ভিটেয় একটি কার্যকরী গার্হস্থ্য প্রতিষ্ঠানের কথা বিবেচনা করছে’। এই একই লেখক এই পর্যায়টিকে ‘মানবপ্রজাতির পৌরুষকাল’ বলে অভিহিত করেছেন এবং এর মধ্য দিয়ে ‘পুরুষ’ শব্দটিকে উপহাসের পর্যায়ে নামিয়ে এনেছেন, যেনবা, ওই শব্দটি কেবলমাত্র শীতল আত্মসর্বস্ব স্বার্থান্বেষী জীব বোঝাতেই ব্যবহৃত হয়। ঠিক একইভাবে তিনি এই অধুনা পৌরুষপূর্ণ যৌবনকালের পরে এক বৃদ্ধাবস্থা আসার কথাও পূর্বাভাস করেছেন, যদিও তিনি আমাদের সমকালীন পক্ককেশদের ব্যঙ্গবিদ্রূপের বস্তু করে তুলতে চেয়েছেন এই বলে যে তারা তাদের পরিপক্ক ভাবুকপনায় ‘নিজেদের অতিবাহিত জীবনের উচ্ছৃঙ্খল ভোগান্তিগুলোর কথা পর্যালোচনা করে উপলব্ধি করে যে লক্ষ্যগুলোর পিছনে এযাবৎ তারা ছুটে এসেছে সেসবই আদতে কতো তুচ্ছ ছিলো’। না, ব্যাপারটা ঠিক এরকম নয়। ইতিহাসের জমিতে আবাদ করা আত্মসর্বস্বতাবাদ এবং ধূর্ততায় পূর্ণ যে যৌবনকাল, তার পরে আসে সেই অমর্যাদাকর বৃদ্ধকাল যা গা-ঘিনঘিনে লালসা নিয়ে জীবনকে আঁকড়ে ধরে থাকে, আর তারও পরে শেষাঙ্কে উপস্থিত হয়:

সেই সর্বশেষ দৃশ্য,

যা এই অাজব ঘটনাবহুল ইতিহাসে দাঁড়ি টানে,

যা আবার দ্বিতীয় শৈশব, নিখাদ বিস্মৃতি,

দন্তহীন, চক্ষুহীন, রুচিহীন, সর্বস্বহীন।৪৮

আমাদের জীবন ও সংস্কৃতি এইসব উচ্ছৃঙ্খল দন্তহীন রুচিহীন পক্ককেশদের দ্বারা বা হার্টমান-এর তথাকথিত ‘পুরুষ’-দের দ্বারা যদি বিপদের মুখে পড়ে, তাহলে ওই উভয় গোত্রের চোখে চোখ রেখে নিজেদের যৌবনের অধিকারকে কামড়ে ধরে থাকা যাক, ভবিষ্যৎকে চুলোর দ্বারে পাঠানো ওই সব অপদার্থদের মোকাবিলায় যৌবনের উদ্যমকে বিন্দুমাত্র অবসন্ন হতে দেওয়া চলবে না। এই লড়াইয়ে আমাদের অবশ্য বিশেষ একটি অপ্রীতিকর সত্যকে উদ্ঘাটিত করে নিতে হবে, যা হলো: বর্তমান সময় যে ইতিহাসগত বোধের বাড়বাড়ন্তের প্রকোপে জর্জরিত তা ইচ্ছাকৃতভাবেই উসকে বাড়িয়ে তুলে প্রয়োগ করা হচ্ছে।

তা বিশেষ ভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে যুবদের বিরুদ্ধে, যাতে তাদের ওই সর্বত্র অভিপ্রেত করে তোলা তথাকথিত পরিপক্ক পৌরুষের ধর্মে প্রশিক্ষিত করে তোলা যায়; তা প্রয়োগ করা হচ্ছে আত্মসর্বস্বতাবাদকে বিজ্ঞানের জাদু-আলো মাখিয়ে হাজির করে যাতে ওই পৌরুষেয়-অপৌরুষেয় আত্মসর্বস্বতাবাদের প্রতি যৌবনের স্বাভাবিক বিমুখতাকে ভাঙা যায়। ইতিহাস একবার মাথায় চড়ে বসলে যে কী করতে পারে তা আমরা খুব ভালোই জানি: তা যৌবনের প্রবলতম প্রবৃত্তিগুলোকে, যৌবনের আগুনকে, পোষ-না-মানা মনোভাবকে, নিঃস্বার্থতাকে, প্রেমকে একদম শিকড় থেকে উপড়ে দিতে পারে; ন্যায়বোধের উত্তাপকে নিভন্ত করে দিতে পারে; ধীরে ধীরে পরিপক্কতা অর্জনের বাসনাকে যথাসম্ভব অতি দ্রুত প্রস্তুত, উপযোগী ও ফলবান হয়ে ওঠার তাড়াহুড়ো দিয়ে প্রতিস্থাপিত করে; অনুভূতির সততা ও সাহসিকতাকে সন্দেহের ছায়ায় ম্লান করে দেয়; আর, বাস্তবত, যৌবনের যে সর্বোত্তম গুণের কারণে যৌবন নিজ মধ্যে মহান কোনো ভাবনাকে বপন করতে পারে ও আরো মহান কোনো রূপে তাকে পল্লবিত করে তুলতে পারে, সেই সর্বোত্তম গুণটিকেও ইতিহাসগত বোধ ধ্বংস করে দিতে পারে। ইতিহাসের বাড়তি বোঝা একটা মাত্রা ছাড়িয়ে গেলে এই সবই করতে পারে, তা করতে আমরা তাকে দেখেছিও: অনবরত দিগন্তগুলোকে সরিয়ে দিতে থাকার মধ্য দিয়ে, সংরক্ষণমূলক বাতাবরণ ধ্বংস করে এবং তার মধ্য দিয়ে মানুষ যাতে ইতিহাস-নিরপেক্ষ ভাবে বোধ ও ক্রিয়া না করতে পারে তা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে এই কাজ সে করেছে। এর ফলে মানুষ তার অনন্ত দিগন্ত ফেলে  নিজের মধ্যে, ক্ষুদ্রতম আত্মসর্বস্বতাবাদের ঘেরাটোপের মধ্যে ফিরে গেছে, আর সেখানেই এখন তাকে শুকিয়ে ক্ষয়প্রাপ্ত হতে হবে: হয়তো সে ধূর্ত হয়ে উঠবে, কিন্তু প্রজ্ঞার নাগাল পাবে না। সে এখন ‘যুক্তির কথা মেনে চলে’, হিসাবনিকাশ কষে আর তথ্যের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেয়, ঠান্ডা হয়ে থাকে, চোখ পিটপিট করে ইদিক-উদিক দেখে আর অপরদের অসুবিধা করে কীভাবে নিজের বা নিজের দলের/পার্টির সুবিধা করে নিতে হয় তা জানে; বাহুল্য বিচারে সে বিনয় বিসর্জন দিয়ে ধাপের পর ধাপ পেরিয়ে প্রথমে হার্টমানীয় ‘পুরুষ’ ও তারপরে ‘পক্ককেশ’ হয়ে উঠেছে। কিন্তু তাকে তো এটাই হয়ে উঠতে বলা হয়েছিলো, ‘বিশ্ব-প্রক্রিয়ার কাছে ব্যক্তিত্বের সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ’-এর অসূয়ক দাবি র মধ্য দিয়ে তার চূড়ান্ত লক্ষ্য, অর্থাৎ বিশ্ব-মুক্তি-তে পৌঁছানোর এটাই পথ বলে তো ওই বদমাশ হার্টমান আমাদের আশ্বস্ত করে রেখেছেন! যাই হোক না কেন, এই হার্টমানীয় ‘পুরুষ’ ও ‘পক্ককেশ’-দের অভিপ্রায় ও চূড়ান্ত লক্ষ্যকে কদাচই বিশ্ব-মুক্তি বলা যায়: বিশ্ব বরং আরো পুনরুজ্জীবিত হবে যদি তা এইসব পুরুষ ও পক্ককেশদের থেকে রেহাই পায়, কারণ তখন যৌবনের রাজত্ব কায়েম হতে পারবে।  

 

 

১০

এই যে পরিস্থিতিতে যৌবন ফেঁসে গেছে তা খেয়াল করেই আমি হাঁক পাড়ি: পারে ভেড়ো! পারে ভেড়ো! বিকট অন্ধকার সাগরে ভুলে-ভরা উন্মত্ত পাড়ি যথেষ্ট কেন, যথেষ্টর চেয়েও বেশি হয়েছে! অবশেষে একটা পারের রেখা চোখে পড়ছে, সে পার যেমনই হোক না কেন সেখানেই আমাদের নোঙর ফেলতে হবে, সংশয়বাদের অনন্তে ঘুরপাক খাওয়ায় ফিরে যাওয়ার চেয়ে নিকৃষ্টতম বন্দরটিতে অবতীর্ণ হওয়াও ভালো! এখন কেবল পারে ভেড়া যাক; পরে আমরা ঠিক খুঁজে-পেতে ভালো ভালো সব বন্দর বের করবো, আর আমাদের পরে যারা আসছে তাদের পারে-ভেড়া সহজতর করে দিতে পারবো।

এই যাত্রা ছিলো বিপদসঙ্কুল ও রোমাঞ্চকর। যে শান্ত ভাবুকতা নিয়ে আমরা আমাদের জাহাজগুলোকে প্রথম নোঙর তুলতে দেখেছিলাম, তার থেকে কতো দূরেই না এখনো আমরা রয়ে গেছি। ইতিহাসের বিপদগুলোর পিছু ধাওয়া করতে গিয়ে আমরা নিজেরাই সেইসব বিপদের মুখে বেআব্রু হয়ে গেছি; বাড়তি ইতিহাসের ফলে এখনকার মানুষ যেসব রোগ-জ্বালা-য় আক্রান্ত, আমাদের মধ্যেও তার প্রকোপ ফুটে উঠেছে। আর, নিজের কাছ থেকেও লুকানোর কোনো ইচ্ছাই আমার নেই যে এই বর্তমান নিবন্ধটি তার সমালোচনার আতিশয্যে, মনুষ্যতার অপরিপক্কতায়, প্রায়শই ব্যঙ্গ-তির্যকতা থেকে অসূয়ায় পিছলে গিয়ে, গর্ব থেকে সংশয়বাদে পিছলে গিয়ে নিজের আধুনিক চরিত্রটিকেই উন্মোচিত করেছে, যে আধুনিক চরিত্রের চিহ্নায়ক হলো ব্যক্তিত্বের দৌর্বল্য। কিন্তু তবুও আমি ভরসা করি সেই প্রণোদনাকারী বলের উপর, যা মহান প্রতিভার অনুপস্থিতিতে, আমার তরীর হাল বেয়েছে; আমি ভরসা করি যে যৌবন আমায় সঠিক দিকেই চালিত করেছে যখন তা আমায় বাধ্য করেছে আধুনিক মানুষের ইতিহাসগত শিক্ষার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে ও এহেন দাবি  তুলতে যে সবার আগে মানুষের বাঁচতে শেখা দরকার এবং তারপরে সেই বাঁচার সাহায্যকারী হিসেবে যতোটুকু ইতিহাস প্রয়োজন তা নিয়োগ করলেই হবে। এই প্রতিবাদটিকে বুঝতে হলে তরুণ হতে হবে। আমাদের এখনকার তরুণদের অকালপক্ক বুড়োটেপনা দেখলে অবশ্য আশঙ্কা হয় যে কী নিয়ে এখানে প্রতিবাদ করা হচ্ছে সেটুকু বোঝার মতো যথেষ্ট তরুণ হওয়া বেশ কঠিন। একটা উদাহরণ দিলে কী বলতে চাইছি তা হয়তো একটু পরিষ্কার হবে। একশো বছরের খুব বেশি সময় আগে হবে না যখন জার্মানির তরুণদের মধ্যে যাকে আমরা কাব্য বলে থাকি তার প্রতি একটা স্বাভাবিক প্রবৃত্তি জেগে উঠেছিলো। তা বলতে কি এমনটা ধরে নেওয়া হচ্ছে যে তাদের পূর্ববর্তী বা বয়স্কতর সমকালীন প্রজন্ম এই শিল্পরূপটিকে আজব জ্ঞানে উল্লেখমাত্রও করেনি? না, বরঞ্চ বিপরীতটাই সত্য: পূর্বজ ও বয়স্করা ‘কাব্য’ নিয়ে মহা সোৎসাহে চিন্তাভাবনা-লিখনপঠন-তর্কাতর্কি করে এসেছে, আর তা করতে গিয়ে শব্দ নিয়ে শব্দ, শব্দ নিয়ে শব্দ নিয়ে শব্দ,… উৎপাদন করে গেছে। এভাবে একটা শব্দে প্রাণ সঞ্চারিত করার মানে এই নয় যে সঞ্চারণকারীদের মরণ ঘটেছে, এক অর্থে তারা এখনো জীবিত। কারণ, গীবন৪৯ যদি বলে থাকেন যে একটা জগতের ধ্বংস হতে কেবল সময়, বেশ অঢেল সময়, লাগে; তাহলে বলা যায় যে জার্মানির মতো ‘ধীরে বহে চলার দেশ’-এ ভ্রান্ত ধারণাগুলোর ধ্বংস হতে আরো সময়, আরো অনেক অনেক বেশি সময়, লেগে যাবে। এতৎসত্ত্বেও, জার্মানিতে এখন একশো বছর আগের তুলনায় হয়তো একশো জন বেশি মানুষ আছে যারা জানে যে ‘কাব্য’ বস্তুটি কী; হয়তো আরো একশো বছর পরে আরো একশোজন বেশি থাকবে যারা এটাও জেনে যাবে যে ‘সংস্কৃতি’ বস্তুটি কী এবং জার্মানরা যতোই বুক ফুলিয়ে বড়ো বড়ো কথা বলে আসুক না কেন তদোবধি তারা আসলে কোনো ‘সংস্কৃতি’-র অধিকারী ছিলো না। আর সেই মানুষদের কাছে জার্মান ‘সংস্কৃতি’ নিয়ে জার্মানদের সর্বজনীন আত্মতৃপ্তি তেমনই অবিশ্বাস্য ও বোকাটে বলে মনে হবে যেমন আজ আমাদের কাছে গটসছেদ৫০ বা রামলের৫১-কে জার্মান পিন্ডার৫২ বলে ধ্রুপদী সাজানোর একদা বহুল-প্রচলিত চেষ্টাকে মনে হয়। সেই মানুষজনদের কাছে হয়তো এমনটা ঠেকবে যে এই সংস্কৃতি আসলে সংস্কৃতি সম্পর্কে এক ধরনের জ্ঞান বৈ আর কিছু নয়, আর সেটাও খুবই ভ্রান্ত ও অগভীর জ্ঞান। ভ্রান্ত ও অগভীর জ্ঞান এই কারণেই যে জীবন ও জ্ঞান-এর দ্বন্দ্বে পড়ে তা প্রকৃতই সংস্কৃতিবান মানুষদের সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য যে কী তা বুঝতে সম্পূর্ণ অক্ষম হয়েছে: কেবলমাত্র জীবনের মধ্য থেকেই সংস্কৃতি বিকশিত ও প্রস্ফুটিত হতে পারে; অথচ জার্মানদের ক্ষেত্রে সংস্কৃতি নামক অলঙ্কারটিকে একটি কাগজের ফুলের মতো গুঁজে দেওয়া হয়েছে, অথবা ওপর থেকে এক পাতলা চিনির আস্তরণের মতো লেপে দেওয়া হয়েছে, আর তাই তা চিরকালের জন্য প্রতারণাপূর্ণ ও নিষ্ফলা হয়ে থাকার অভিশাপ বহন করে চলেছে। আর সংস্কৃতি সম্পর্কে ঠিক এই ভ্রান্ত ও নিষ্ফলা ধারণাটাই জার্মান যুবদের শিক্ষার নামে গেলানো হয়: কোনো মুক্ত মার্জিত মানুষ তৈরি  করা সেই শিক্ষার লক্ষ্য নয়, বরং তার লক্ষ্য হলো দ্রুত নিয়োগযোগ্য এমন সব পণ্ডিত বিজ্ঞানবিশারদ তৈরি করা যারা জীবনকে নির্বাধে জানার জন্য জীবন থেকে সরে দূরে দাঁড়িয়ে থাকে। বাস্তবত এই শিক্ষারই ফসল সেইসব ইতিহাসগত-রুচিধারী সংস্কৃতিগতভাবে সংকীর্ণমনা লোকজন যারা ইঁচড়ে পক্ক ভাবভঙ্গি নিয়ে রাষ্ট্র, চার্চ ও শিল্পকলা বিষয়ে হাতে-গরম বকবকানি বকে যায়, সবকিছু সম্পর্কে যাদের মতামত তৈরি আছে, নিরন্তর সবকিছু যারা গিলে চলেছে অথচ সত্যিকারের ক্ষুধা বা তৃষ্ণা কাকে বলে তা তাদের অজানা। এই শিক্ষার যন্ত্রে এখনও প্রক্রিয়াজাত হয়ে যায়নি যে জন, তার বোধেই একমাত্র ধরা দিতে পারে যে এহেন লক্ষ্য ও ফলাফল বিশিষ্ট শিক্ষা হলো প্রকৃতি-বিরুদ্ধ, যৌবনের স্বজ্ঞাই কেবল তা অনুভব করতে পারে কারণ শিক্ষার ঘায়ে জোর করে ভেঙে চূর্ণ করে না দেওয়া অবধি এই স্বজ্ঞা প্রকৃতিগতভাবেই যৌবনে অটুট থাকে। উল্টোদিকে, এই শিক্ষাকে ভেঙে চূর্ণ করে দিতে চাইলে যৌবনকে নিজের কথা খোলাখুলি বলতে সাহায্য করতে হবে। যৌবনের অচেতন প্রতিরোধ এখনও অবধি যে পথ নিয়েছে তাকে ধ্যানধারণার বিচ্ছুরণে আলোকিত করে সচেতন ও জোরগলার অধিকারী করে তুলতে হবে। কিন্তু কীভাবে এই অদ্ভুত কাজ করা যেতে পারে?

তা করা যেতে পারে সবচেয়ে আগে শিক্ষাদীক্ষাগত কার্যকলাপের আবশ্যকীয়তা বিষয়ক কুসংস্কারটিকে নির্মূল করার মধ্য দিয়ে। সাধারণত মনে করা হয়ে থাকে যে বর্তমানের অতি বেতালা বাস্তবতাটিই একমাত্র সম্ভব। একথা মাথায় নিয়ে গত কয়েক দশক ধরে আমাদের উচ্চ বিদ্যালয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় চালু পাঠবস্তুগুলোকে পরখ করে দেখলে ক্রুদ্ধ ও বিস্মিত হতে হবে, দেখা যাবে যে নানা প্রকার বিস্তর প্রস্তাবাদি ও তর্ক-বিতর্ক সত্ত্বেও শিক্ষার আসল লক্ষ্যকে সর্বত্রই একইভাবে ভাবা হয়েছে: বর্তমানে ‘শিক্ষিত ব্যক্তি’ বলতে যা বোঝানো হয়, সেই বস্তুটি উৎপাদন করে যাওয়াই সমস্ত ভবিষ্যৎ শিক্ষাব্যবস্থার আবশ্যক ও যুক্তিসম্মত ভিত্তি হিসেবে নির্দ্বিধায় ধরে নেওয়া হয়েছে। সর্বজনমান্যতা পেয়ে আসছে এই ধারণা যে একজন তরুণকে শুরুই করতে হবে সংস্কৃতি সম্পর্কে জ্ঞান রপ্ত করে, এমনকি জীবন সম্পর্কে জ্ঞানের কথাও ভাবা হয় না, প্রত্যক্ষ জীবন অভিজ্ঞতা তো অনেক দূরের কথা। আর সংস্কৃতি সম্পর্কে এই জ্ঞান তরুণটিকে গলাধঃকরণ করানো হয় ইতিহাসগত জ্ঞান রূপে। অর্থাৎ, তার মাথায় ঠেসে ভরে দেওয়া হয় বিপুল সংখ্যায় এমন সব ধ্যানধারণা যা অতীত যুগ ও মানুষদের সম্পর্কে অতীব মাত্রায় পরোক্ষ জ্ঞান থেকে নিষ্পাদিত, জীবনকে প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণ থেকে নিষ্পাদিত নয়। প্রত্যক্ষভাবে নিজে অভিজ্ঞতালাভ করার বাসনা এবং নিজের মধ্যে নিজ অভিজ্ঞতাসমূহের প্রাণময় মিশ্রণকে ক্রমসংহতির মধ্য দিয়ে বিবর্তিত রূপ গ্রহণ করতে দেখার বাসনা--- যে কোনো তরুণের এই দুই স্বাভাবিক বাসনাকে মত্ত-বিভ্রান্ত করে দেওয়া হয় এই বুজরুকি দিয়ে যে আগের যুগের একেবারে সর্বোচ্চ ও সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অভিজ্ঞতাগুলোকে অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই একদম সারসংকলন করে আত্মস্থ করে নেওয়া যায়। এই একই বুজরুকিপূর্ণ পদ্ধতির বশবর্তী হয়েই এখনকার তরুণ চিত্রকররা কোনো ওস্তাদ চিত্রকরের কর্মশালায় না গিয়ে বা ওস্তাদদের মধ্যে অনন্যতম স্বয়ং প্রকৃতির অনন্য কর্মশালায় না গিয়ে কেবল চিত্র-প্রদর্শনশালাগুলোয় ভিড় করেই ভাবে সব হয়ে যাবে। যেনবা, অতীত দিনের জীবন-অভিজ্ঞতার আসল ফসল যে অতীত দিনের শিল্পকলা ও বিজ্ঞান, তা কেবল মাত্র অবরে-সবরে একবার ইতিহাসের প্রদর্শনশালার মধ্য দিয়ে ঘুরে এলেই আত্মস্থ করে ফেলা যায়! আমাদের খেয়ালই নেই যে জীবন খোদ এমন একটা শিল্পকলা যা একদম গোড়া থেকে নিরন্তর খেদহীন চর্চার মধ্য দিয়ে শিখতে হয়, আর নয়তো বাজে বকবক করা আনাড়ীদেরই ভিড় বাড়ানো হয়।

প্লেটো আবশ্যক মনে করেছিলেন যে তাঁর নতুন সমাজে (বা নিখুঁত সমাজে) প্রথম প্রজন্মকে একটি আবশ্যক মিথ্যা-র সাহায্যে শিক্ষিত করতে হবে: শিশুদের এই বিশ্বাস শেখাতে হবে যে তারা সবাই আগে মাটির নীচে ঘুমন্ত অবস্থায় বাস করতো, যেখানে প্রকৃতির কারিগর তাদের আকার দিয়েছে। এহেন এক অতীতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ অসম্ভব! ঈশ্বরের হাতের এহেন কাজের বিরুদ্ধাচরণও অসম্ভব! প্রকৃতির অলঙ্ঘ্য নিয়ম হিসেবেই তা গণ্য করতে হবে: দার্শনিক হয়ে যে জন্মেছে তার দেহে আছে সোনা, যে জন্মেছে সেনা হয়ে তার দেহে কেবল রুপো, আর শ্রমিক হয়ে যে জন্মেছে তার দেহে আছে লোহা ও তামা। এরপর প্লেটো ব্যাখ্যা করেছিলেন যে ওইসব ধাতুগুলোকে যেমন একসঙ্গে মেশানো অসম্ভব, ঠিক তেমনই এই জাত(পেশা)গত অনুক্রমকেও মেশানো বা এদিক-ওদিক-করা চির অসম্ভব। এই চিরসত্য (aeterna veritas)-এ বিশ্বাস উৎপাদনই নয়া শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি, এবং একইসঙ্গে নয়া রাষ্ট্রেরও ভিত্তি। এখন, আমাদের আধুনিক জার্মানরাও তাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও সংস্কৃতিরূপের aeterna veritas-এ একই রকম ভাবে বিশ্বাস করে থাকে। কিন্তু প্লেটো-র রাষ্ট্রের মতো আধুনিক জার্মানদের এই বিশ্বাসও ভেঙে পড়বে যদি আবশ্যক মিথ্যা-টির বিরুদ্ধে একটি আবশ্যক সত্যকে এনে দাঁড় করানো যায়: সত্যটি হলো এই যে জার্মানরা কোনো সংস্কৃতিরই অধিকারী নয় কারণ তাদের শিক্ষায় সংস্কৃতির কোনো ভিত উপস্থিত নেই। শিকড় ও কাণ্ড ছাড়াই ফুলের আবদার করলে যা হয়, ফুল পাওয়া যায় না। কর্কশ ও বিরস হলেও এটা সরল সত্য, সত্যিকারের এক আবশ্যক সত্য।

আমাদের প্রথম প্রজন্মকে এই আবশ্যক সত্যটিই শেখাতে হবে। এতে নিশ্চিতভাবেই তাদের প্রভূত ভোগান্তি হবে, কারণ এর মধ্য দিয়ে তাদের নিজেদেরই নিজেদের শিক্ষিত করে তুলতে হবে, শুধু তাই নয়, নিজেদের বিরুদ্ধেই নিজেদের শিক্ষিত করে তুলতে হবে, পুরোনো প্রথম স্বভাব ও আচার-আচরণের খোলস ভেঙে বেরিয়ে এসে নতুন আচার-আচরণ ও স্বভাবে শিক্ষিত হয়ে উঠতে হবে: যাতে তাদের মধ্যে ধ্বনিত হয় প্রাচীন স্প্যানিশ ভাষার সেই প্রার্থনা: Defienda me Dios de my, ঈশ্বর আমাকে আমার নিজের থেকে রক্ষা করো, অর্থাৎ, যে স্বভাব শিক্ষার মধ্য দিয়ে আমার মধ্যে গেঁথে দেওয়া হয়েছে তার থেকে আমাকে রক্ষা করো। এই সত্যের স্বাদ তাকে দিতে হবে ফোঁটা ফোঁটা করে, তিক্ত খর ওষুধ যেভাবে দিতে হয়, আর এই প্রজন্মের প্রত্যেককে সেই মাত্রাতেই নিজেকে অতিক্রম করে যেতে হবে যাতে গোটা যুগের সম্পর্কে যেকথাটা বলা সহজতর সেই কথাটাই সে নিজের সম্পর্কে বলতে পারে--- আমাদের কোনো সংস্কৃতি নেই, তাছাড়া আমরা এতোটাই নষ্ট হয়ে গেছি যে যাপন করা, সঠিক সহজ দেখা ও শোনা, সবচেয়ে কাছের ও স্বাভাবিকতোম বস্তুটিকে আনন্দে জড়িয়ে ধরা, এই কিছুই আর আমরা করতে পারি না, আর যেহেতু আমরা নিজেদের মধ্যে খাঁটি জীবন আর টিকে আছে কিনা তা নিয়েই সন্দিহান, তাই আমাদের মধ্যে সংস্কৃতির ভিত্তিটুকুও এখনো তৈরি হয়নি। ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে থাকায়, প্রায় যান্ত্রিকতায় ভিতর ও বাহির বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকায়, ড্রাগনের দাঁতের মতো সব ধারণা বিঁধে থাকায়, ফলস্বরূপ, ধারণাগুলোই ড্রাগনের বেশ ধরে আসে, শব্দসর্বস্বতার রোগে ভুগে শব্দ দিয়ে ধরা যায় না এমন যেকোনো নিজ অনুভূতিকে আমরা সন্দেহ করতে থাকি: এভাবে আমরা এমনই এক প্রাণহীন অথচ আজগুবিভাবে সক্রিয় ধারণা ও শব্দের কারখানা হয়ে উঠেছি যে হয়তো এখনো cogito, ergo sum (চিন্তা করি, তাই আমার অস্তিত্ব আছে) বলার হকদার হলেও vivo, ergo cogito (বাঁচি, তাই চিন্তা করি) বলার হক আর আমাদের নেই। আমাদের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে শূন্য ‘স্থিতসত্তা’, বরাদ্দ করা হয়নি পূর্ণ ও সবুজ ‘জীবন’। অস্তিত্বমান হওয়ার অনুভূতি কেবল এইটুকু বলে যে আমি একটি চিন্তাশীল জীব, বলে না যে আমি প্রাণময় জীবন্ত; বড়জোর আমার অস্তিত্বকে জানান দেয়, কিন্তু আমার জীবরূপের জানান দেয় না। আমাকে কেবল জীবন দাও, তাহলেই  তার থেকে তোমার জন্য একটা সংস্কৃতি আমি তৈরি করে দেবো!--- এভাবেই আর্তনাদ করে উঠছে এই প্রজন্মের প্রতিটি ব্যক্তি এবং এই আর্তনাদ থেকেই তারা একে অপরকে চিনে নিচ্ছে। কিন্তু কে তাদের এই জীবন ফিরিয়ে দেবে?

কোনো ঈশ্বর দেবে না, কোনো মানুষও দেবে না, দিতে পারে একমাত্র তাদের নিজেদের যৌবন: নিজ যৌবনকে শৃঙ্খলমুক্ত করো, তাহলেই তোমার জীবন শৃঙ্খলমুক্ত হবে। কারণ, জীবন এখনও শুকিয়ে যায়নি, শুকিয়ে মরে যায়নি, জীবন কেবল কারাগারের অন্তরালে লুকোনো আছে--- নিজেদেরই প্রশ্ন করে দেখো সত্যিই তাই কি না!

কিন্তু এই জীবন শৃঙ্খলমুক্ত হলেও রোগে আক্রান্ত, তার রোগ সারিয়ে তুলতে হবে। তার রোগ হরেক রকমের, শৃঙ্খলিত থাকার স্মৃতিভার-ই কেবল তার একমাত্র রোগ নয়--- যা আমাদের এখন প্রধান মাথাব্যথার কারণ তা হলো তার ইতিহাস-প্রকোপ-জনীত রোগ। ইতিহাস-আতিশয্য তার নমনীয়তাকে আক্রান্ত করেছে, তা এখন অতীতকে একটি পুষ্টিকর খাদ্য হিসেবে নিয়োগ করতে ভুলে গেছে। অমঙ্গল ভয়াবহ আকার নিয়েছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও তরুণরা যদি প্রকৃতির আলোকদৃষ্টির উপহার নিজ চেষ্টায় অধিকার না করতে পারে কারও হুঁশও ফিরবে না যে অমঙ্গল সমাগত এবং স্বাস্থ্যের স্বর্গ আমরা খুইয়ে বসেছি। এই তরুণরাই এই প্রকৃতির উপশমকারী প্রবৃত্তির সাহায্যে নির্ণয় করতে পারে কীভাবে সেই স্বর্গকে আবার ফিরে পাওয়া যায়; ইতিহাস-ব্যামোর বিরুদ্ধে, ইতিহাস-আতিশয্যের বিরুদ্ধে ওষুধ ও মলম তরুণরাই জানে: কিন্তু সেই ওষুধের নাম কী?

এখন, বিস্ময়ের কিছু নেই যে সেই ওষুধকে বিষের নামে ডাকা হয়ে থাকে: ইতিহাসগত ভাবের প্রতিষেধককে ইতিহাস-নিরপেক্ষ বা অতি-ঐতিহাসিক বলা হয়। আর এই নামগুলোর মধ্য দিয়েই আমরা আমাদের আলোচনার সূচনায় ও সেই সূচনা অংশের ধ্যাননিষ্ঠ প্রশান্তিতে ফিরে আসতে পারি।

‘ইতিহাস-নিরপেক্ষ’ শব্দটি দিয়ে আমি ভুলে যেতে পারার শৈলী ও সক্ষমতাকে এবং নিজেকে একটি সীমাবদ্ধ দিগন্তের মধ্যে স্থাপন করাকে বোঝাতে চাই; আর ‘অতি-ঐতিহাসিক’ শব্দটি দিয়ে আমি সেই সমস্ত শক্তিকে বোঝাতে চাই যা হয়ে-ওঠা-র থেকে দৃষ্টিকে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে যা অস্তিত্বকে চিরায়ত ও সুস্থিত চরিত্র দেয়, যেমন শিল্পকলাধর্ম, তার উপর নিবদ্ধ করে। শিল্পকলা ও ধর্ম শুনলেই বিজ্ঞান--- কারণ বিজ্ঞানই এখানে কোনটা বিষ আর কোনটা নয় তা বাছাবাছি করে--- এই শক্তিগুলোকে শত্রুতাকারী শক্তি বলে ধরে নেয়। এই ধরে-নেওয়া-টা এই কারণেই যে বিজ্ঞান মনে করে যে কোনো বস্তুকে দেখার বা বিচার করার এক ও একমাত্র সঠিক ও সত্য উপায়, যা-ই কিনা বৈজ্ঞানিক উপায়, তা হলো সর্বত্র বস্তুকে সে যা ছিলো, অর্থাৎ ইতিহাসগত বস্তু হিসেবে দেখা এবং কখনোই বস্তু এখন যা আছে, অর্থাৎ চিরায়ত বস্তু হিসেবে না দেখা। তাই শিল্পকলা ও ধর্মের চিরায়ত-রূপ-সৃষ্টিকারী ক্ষমতার সঙ্গে গভীর বৈরিতাতেই বিজ্ঞানের অস্তিত্ব, বিজ্ঞান ভুলে যাওয়াকে ঘৃণা করে কারণ এই ভুলে-যাওয়া-র মধ্যেই আছে জ্ঞানের মৃত্যু, আর তাই বিজ্ঞান দিগন্তের সমস্ত সীমাকে অপসারণ করে মনুষ্যপ্রজাতিকে এমন এক অনন্ত অসীম সাগরে পাড়ি দেওয়ায়, যে সাগর হলো সমস্ত হয়ে-ওঠা-র জ্ঞানের আলোকসাগর।

কেবলমাত্র সেই অসীম অনন্ত আলোকসাগর যদি মানুষের বসবাসের যোগ্য হতো! ভূমিকম্পে যেমন শহর ধ্বসে পড়ে ও ঊষর হয়ে ওঠে, আর তাই ভূমিকম্পপ্রবণ মাটিতে মানুষ বাসা বানাতে পারে কেবল স্বল্পদিনের জন্য এবং তা-ও তাকে সারাক্ষণ ভয়ে-আশঙ্কায় কম্পিত হয়ে থাকতে হয়, ঠিক তেমনই বিজ্ঞানের ধারণা-কম্প যখন মানুষের সমস্ত ভিত্তিপ্রস্তর উড়িয়ে দিয়ে তার সকল বিশ্রাম-নিরাপত্তা, স্থায়ীত্বে ও চিরায়তে তার সকল বিশ্বাসকে ধ্বংস করে, তখন মানুষের জীবনও দুর্বল ও শঙ্কাপ্রবণ হয়ে ধ্বসে পড়ে। জ্ঞান ও বিজ্ঞানের উপর কি জীবন আধিপত্য করবে, নাকি জীবনের উপর জ্ঞান আধিপত্য করবে? এই দুই বলের মধ্যে কোনটি উচ্চতর, কোনটি বেশি নির্ণায়ক? এ নিয়ে তো কোনো সন্দেহ থাকতে পারে না: জীবন-ই হলো উচ্চতর ও আধিপত্যকারী বল, কারণ যে জ্ঞান জীবনকে ধ্বংস করে তা সেই সঙ্গে সঙ্গে নিজেকেও ধ্বংস করে থাকে। জীবনের পূর্ব-অস্তিত্ব ধরে নিয়ে তবেই জ্ঞান সম্ভব, তাই যে কোনো জীব যেমন তার অস্তিত্ব বজায় রাখা নিয়ে আগ্রহী হয়, জ্ঞানও একইরকমভাবে জীবন বজায় রাখায় আগ্রহী। তাই বিজ্ঞানের উপর তদারকি ও তত্ত্বাবধান প্রয়োজন; বিজ্ঞানের খুব কাছাকাছি ও পাশাপাশি জীবনের জন্য স্বাস্থ্যবিধির অবস্থান এবং সেই স্বাস্থ্যবিধির একটি ধারা এইরকম হওয়া উচিত: ইতিহাসানুগত্য যেভাবে জীবনকে শুকিয়ে মারে, সেই ইতিহাস-রোগের স্বাভাবিক প্রতিষেধক হলো ইতিহাস-নিরপেক্ষতা ও অতি-ঐতিহাসিকতা। আমরা যারা ইতিহাস-রোগে আক্রান্ত, সম্ভবত তাদের ওই দুই প্রতিষেধকের কোপেও ভুগতে হবে। কিন্তু ভোগান্তি হলেও তা ওই প্রতিষেধকদ্বয়ের প্রয়োজনীয়তা বা যাথার্থ্যকে বিন্দুমাত্র নাকচ করে না।

আর ঠিক এইখানেই সেই তরুণদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ যাদের কথা আমি আগে বলেছি, তারা লড়াকু ড্রাগন-সংহারকদের সেই প্রথম প্রজন্ম যাদের মধ্য দিয়ে বোধন ঘটবে পরবর্তী শুভতর সংস্কৃতি ও মনুষ্যপ্রজাতির, যদিও সেই ভবিষ্যৎ সুখ ও সৌন্দর্য্যের ক্ষীণ কিছু পূর্বাভাস ছাড়া আর কিছুই তাদের কাছে থাকবে না। এই তরুণরা ইতিহাস-রোগ ও তার প্রতিষেধক উভয়ের জ্বালাতেই জ্বলবে, তবু তাদের এই বিশ্বাসে কোনো খামতি থাকবে না যে তাদের পূর্বজদের (অর্থাৎ, আজকের দিনের সংস্কৃতিবান ‘পুরুষ’ বা ‘পাকাচুল’-দের) থেকে অনেক পাকাপোক্ত স্বাস্থ্য ও অনেক স্বাভাবিক স্বভাবের তারা অধিকারী। অবশ্য, বর্তমানে ‘স্বাস্থ্য’ ও ‘সংস্কৃতি’-র নামে যে ধারণাগুলো চালু আছে, সেগুলোর ভিত নাড়িয়ে দেওয়া, এই পাঁচমিশেলী ধারণা-বিপর্যয়গুলোর বিরুদ্ধে বিদ্রূপ ও ঘৃণা প্ররোচিত করা হলো এই তরুণদের কাজ। এই তরুণরা যে চলতি শব্দ ও ধারণার মুদ্রা ব্যবহার করে নিজেদের স্বভাব বর্ণনা করার মতো কোনো ধারণাবলী বা স্লোগান আবিষ্কার করতে পারবে না, সেটাই তাদের নিজেদের শ্রেয়তর স্বাস্থ্য-পোক্ততার চিহ্ন ও প্রত্যাভূতি হবে। নিরন্তর তীব্রতর হতে থাকা জীবনের অনুভূতি এবং এক সক্রিয় অন্তঃশীলা শক্তি যা নিরন্তর লড়াই করে, বাদ দেয় ও বিভক্ত করে, তা তাদের রসদ যোগাবে। কেউ বলতে পারেন যে এই তরুণরা তো তখনও কোনো সংস্কৃতির-ই অধিকারী হয়ে ওঠেনি--- বেশ, কিন্তু কোনো তরুণদের পক্ষে কি তা কখনো নিন্দার বিষয় হতে পারে? কেউ এই তরুণদের অপরিশীলিত অসংযমের দিকে আঙুল তুলতে পারেন--- কিন্তু ঠিক সেই জন্যই তা তারা তাদের দাবিপত্রকে সংযমের শৃঙ্খলে বাঁধার মতো বৃদ্ধ ও প্রাজ্ঞ হয়ে ওঠেনি, কোনো স্বয়ংসম্পূর্ণ সংস্কৃতিকে ছলচাতুরিময় ওকালতি করে টিকিয়ে রাখার দায় তাদের নেই, আর সেইজন্যই তারা তারুণ্যের সুযোগ-সুবিধাগুলোর অধিকারী, বিশেষ করে সাহসী নির্দ্বিধ সততার তারা অধিকারী এবং আশার রসে জারিত হওয়ার উপশম তাদের আছে। আশাপূর্ণ এই তরুণদের সম্পর্কে এটুকু আমি জানি যে তারা এই সাধারণ বিষয়গুলোকে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিগত আভিজ্ঞতার আখরেই বোঝে এবং নিজেদের জন্য শিক্ষা তারা এর থেকে তর্জমা করে নেবে। অন্যরা অবশ্য ঢাকা দেওয়া বাসন দেখে সেগুলো ফাঁকা বলেই এখনও মনে করতে পারে, যতোদিন না ঢাকা সরে সেগুলোর পরিপূর্ণতা তাদের অবাক করছে: ভিতরের সেই সাধারণ বিষয়গুলোর মধ্যে নানা আক্রমণ, দাবি, জীবন-প্রণোদনা ও তীব্র আবেগ মিলেমিশে পরস্পর-পিষ্ট হয়ে রয়েছে এবং তাই তারা খুব বেশি দিন ঢাকা পড়ে থাকতে পারে না। তাই আজকে যারা সব খালি মনে করছেন সেই সন্দেহবাগিশদের সর্বউন্মোচনকারী সময়প্রবাহের অপেক্ষায় ফেলে রেখে আলোচনায় ইতি টানতে আমি সেই আশাপূর্ণজনেদের সাহচর্যে ফিরে এসে একটা গল্প শোনাতে চাইবো। গল্পটা এই নিয়ে যে তাদের সেরে ওঠা, ইতিহাস-রোগ থেকে মুক্তি এবং তারই সঙ্গে তাদের নিজেদের ইতিহাস থেকেও মুক্তির পথ-প্রগতি কীরূপ হবে যাতে তারা পুনর্বার প্রকৃতই ইতিহাস চর্চা করতে পারে এবং জীবনের প্রয়োজনে অতীতকে ব্যবহারের যে সব উপায়--- অর্থাৎ, স্মারকধর্মী, প্রত্নতাত্ত্বিক ও সমালোচনাত্মক উপায়--- তা নিয়োগ করার সামর্থ্য ফিরে পায়। অবশ্য সেই মুহূর্তে তারা বর্তমান সময়ের ‘সংস্কৃতিবান’ লোকজনদের চেয়ে অনেক মূর্খ হবে, কারণ তারা বহু শিক্ষাই ভুলে যেতে সমর্থ হয়েছে, এমনকি আজকের সংস্কৃতিবানেরা যা কিছু জানতে সবচেয়ে উদগ্রীব সেগুলোর দিকে ফিরে তাকানোর বিন্দুমাত্র ইচ্ছাও তাদের আর থাকবে না। আজকের দিনের সংস্কৃতিবান মহাশয়দের দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের এই ‘অসংস্কৃতি’-কেই তাদের পরিচয়চিহ্ন বলে ধরা যেতে পারে। যা কিছু আজ অতি সম্মানীয়, অনেক কিছু যার মধ্যে হয়তো বা সত্যিই ভালো, সে সবের প্রতিই তাদের চূড়ান্ত অনাসক্তি ও অনাকর্ষণ। কিন্তু উপশমলাভের এই মুহূর্তেই তারা মানুষ হয়ে উঠবে, মনুষ্যোচিত গুণাবলীর গড় ভাণ্ড হয়ে থাকার অভিশাপ থেকে মুক্ত হবে--- সে কি কম বড়ো কথা! সে তো বহুকাঙ্ক্ষিত এক অর্জন! আশাপূর্ণ হে তরুণরা, তোমরা যখন আশা করো, তোমাদের হৃদয় কি হেসে ওঠে না?

প্রশ্ন করবে: কিন্তু কীভাবে এই লক্ষ্যে আমরা পৌঁছাবো? ওই লক্ষ্যের দিকে যাত্রার শুরুতে কান পেতে শোনো ডেলফির দৈবাদেশ৫৩ তোমাদের উদ্দেশ্যে বলছে: ‘নিজেকে জানো’। এ কথা খুব কঠিন কথা, কারণ, হেরাক্লিটাস যেমন বলেছিলেন, ওই দৈবাদেশকারী ‘কিছুই লুকোয় না, আবার কিছুই বলে দেয় না, কেবল ইশারা করে’। তিনি তোমাদের কী ইশারা করছেন?

এমন বহু শতক গেছে যখন প্রাচীন গ্রিকরা তেমনই এক বিপদের মুখে পড়েছিলো যেমনটা আজ আমরা পড়েছি: বিপদটা হলো যা কিছু অতীত ও বিদেশী তার দ্বারা ভারাক্রান্ত হয়ে ‘ইতিহাস’-এর চাপে পিষে মরা। তখন তারা গর্বিত অলঙ্ঘনীয়তায় বাঁচতো না: তাদের ‘সংস্কৃতি’ বলতে দীর্ঘদিন ধরে জেঁকে বসে ছিলো বিদেশী, সেমিটিক, ব্যাবিলোনিয়ার, লিডিয়ার বা মিশরের নানা ভাবনা ও রূপকল্পনার এক জগাখিচুড়ি; তাদের ধর্মও ছিলো প্রকৃতপক্ষে পূর্বের সমস্ত দেবতাদের এক রণক্ষেত্র; ঠিক যেমন আজকের ‘জার্মান সংস্কৃতি’ ও ধর্ম হলো সমস্ত পাশ্চাত্যের সমস্ত অতীত যুগের ধ্যানধারণার এক বিবদমান বিশৃঙ্খলা। তবু, সেই অতীতে, সেই অ্যাপোলোর দৈবাদেশের সহায়তায়, ধ্রুপদী গ্রিক (হেল্লেনিক) সংস্কৃতি কেবলমাত্র টুকরো জিনিষের গড় যোগফল হয়ে থকেনি। সেই গ্রিকরা ডেলফির দৈবাদেশ মেনে নিজেদের দিকে ফিরে চিন্তা করার মাধ্যমে, আর্থাৎ, তাদের প্রকৃত প্রয়োজনের দিকে ফিরে মিথ্যা প্রয়োজনগুলোকে ঝরে পড়তে দেওয়ার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে সেই বিশৃঙ্খলাকে সাজিয়ে তুলতে শিখলো। সেভাবে তারা আবার নিজেরা নিজেদের উপর অধিকার ফিরে পেলো; আর বেশিদিন তাদের গোটা প্রাচ্যের ভারে-নুয়ে-পড়া উত্তরাধিকারী ও মানহীন অনুকরণকারী হয়ে থাকতে হলো না। নিজের সঙ্গে নিজের কঠিন সংগ্রাম এবং ওই দৈবাদেশের লম্বা টানা প্রয়োগের মধ্য দিয়ে তারা এমনকি তাদের উত্তরাধিকারে পাওয়া  সম্পদকে গুণে-মানে-পরিমাণে বড়িয়ে সুখশীর্ষে উঠতে পেরেছিলো এবং ভবিষ্যতের সমস্ত সংস্কৃতিবান জাতিদের কাছে প্রথম-জন্ম-নেওয়া আদর্শরূপ হয়ে উঠেছিলো।

এই গল্প আমাদের প্রত্যেকের জন্যই এই সারকথা হাজির করে: আমাদের প্রত্যেককেই নিজের প্রকৃত প্রয়োজনগুলো নির্দিষ্ট করার জন্য ফিরে ভাবার মধ্য দিয়ে নিজের ভিতরের বিশৃঙ্খলাটাকে কাটিয়ে উঠতে হবে। এতাবৎ শুনে আসা সবকিছুকে আবার পুনরাবৃত্ত করা, এতাবৎ যা জানা হয়ে গেছে তাকেই পাখিপড়া করে শেখা, এতাবৎ যা অস্তিত্বধর সেগুলোরই অনুকরণ করে যাওয়া--- নিজের এই হালের বিরুদ্ধে নিজের সততা ও চরিত্রের দৃঢ়তা এবং সত্যপরতা কোনো না কোনো সময়ে বিদ্রোহ করবেই; তখন আমরা বুঝতে শুরু করবো যে সংস্কৃতি কেবল জীবনের বাইরেটাকে সাজিয়ে রাখার কিছু অলঙ্কার নয়, সমস্ত অলঙ্কারই আসলে যাকে অলঙ্কৃত করছে তাকে ঢেকে রাখে, সমস্ত অলঙ্কারই শেষ বিচারে এক প্রকার কপটবেশ বা ছদ্মবেশ, আর সংস্কৃতি তার চেয়ে আলাদা ও বেশি কিছু। এভাবে তখন আমাদের কাছে সংস্কৃতি সম্পর্কে ধ্রুপদী গ্রিক ধারণাটি ক্রমউন্মোচিত হবে। সে ধারণা রোমান ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত ও বিরোধী। সে ধারণামতে সংস্কৃতি হলো নতুন ও আরো ভালো মৌল ভিত্তিমূলক প্রকৃতিগত স্বভাব (physis) , ভিতর বা বাহির যার নেই, কপটসাজ-ধারণ বা প্রথানুগত্য যাতে নেই। জীবন, চিন্তা, চেহারা ও অভিপ্রায়ের ঐক্যমত্যই তখন সংস্কৃতি। তখন আমরা নিজের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে শিখবো যে ধ্রুপদী গ্রিকরা নিজেদের নৈতিক প্রকৃতির উচ্চতর বলের জোরেই অন্য সমস্ত সংস্কৃতির উপর নিজেদের জয় হাসিল করেছিলো, শিখবো যে সত্যপরতার প্রতি কণা বৃদ্ধি প্রকৃত সংস্কৃতি গঠনেও সহায়ক হয়ে ওঠে: যদিও এই সত্যপরতা এখনকার দিনের বহুবন্দিত সংস্কৃতিবানতাকে কখনো কখনো ভেঙেচুরে খাক করে দেবে, যদিও তা আজকের দিনের অলঙ্কারস্বরূপ প্রদর্শিত সংস্কৃতির গোটা আদরাটাকেই ভেঙে ধুলোয় মিশিয়ে দেবে।

 

 

 

টীকা-টিপ্পনী

১। হেরাক্লিটাস (সম্ভবত খৃস্টপূর্ব ষষ্ঠ বা পঞ্চম শতক) হলেন সক্রেটিস-পূর্ব এক গ্রিক দার্শনিক। এফেসাস-এর বাসিন্দা। তঁার রচনার খুব অল্প অংশই অবশিষ্ট আছে। প্রাচীনকালেও তঁার রচিত বই দুর্বোধ্যতার জন্য খ্যাত ছিল বলে জানা যায়। বর্তমান আলোচনার সাপেক্ষে উল্লেখযোগ্য যে হেরাক্লিটাস হয়ে-ওঠা-কেই (becoming) সর্বময় বলে সিদ্ধান্তে এসেছিলেন, স্থিতসত্তাকে (being) নস্যাৎ করেছিলেন। ‘সবকিছু বহমান’, ‘একই নদীতে কেউ দুবার পা রাখতে পারে না’— এগুলো তঁার উদ্ধৃতি হিসেবে বিখ্যাত।

২। বার্থোল্ট গিয়র্গ ন্যিবুহর (১৭৭৬–১৮৩১) আধুনিক ইতিহাসচর্চার অন্যতম স্থপতি। ১৮১০ সালে বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়াদের কাছে হাজির করা প্রাচীন রোমের উপর তঁার বক্তৃতামালা একদিকে যেমন প্রাচীন রোমের অর্থনীতি ও প্রশাসন-ব্যবস্থা সম্পর্কে অতিকথার কুয়াশা মুক্ত একটি ছবি তুলে ধরেছিলো, তেমনই অন্যদিকে সমসাময়িক পরিপ্রেক্ষিতে জার্মান দেশাত্মবোধের বীজ বপন করেছিলো। অতীত কালের ভাষ্য রচনায় সংশয়ী চোখে বিভিন্ন খুঁটিনাটি বিশ্লেষণ, ভাষাতত্ত্বের ব্যবহার, সাধারণের পাশাপাশি বিশেষেও সমান জোর দেওয়া— তঁার কাজের মধ্য দিয়ে ইতিহাস-রচনার পাথেয় হিসেবে এগুলি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো। তঁার রচিত রোমান ইতিহাস মূল জার্মান ভাষায় ও একাধিক অন্য ভাষায় অনুবাদের মধ্য দিয়ে ইতিহাসচর্চা মহলে সুপরিচিত।

৩। ডেভিড হিউম (১৭১১–১৭৭৬) স্কটল্যান্ডের একজন দার্শনিক ও ইতিহাসবিদ। তঁার প্রবর্তিত অভিজ্ঞতাবাদী সংশয়বাদী দর্শনপন্থা ইউরোপীয় এনলাইটেনমেন্টের যুগে প্রভাব বিস্তার করেছিলো। সহজাত কোনো ধারণার অস্তিত্ব অস্বীকার করে তিনি মনে করতেন যে মানুষের সকল জ্ঞান কেবলমাত্র তার অভিজ্ঞতা থেকেই জন্ম নেয়।

৪। গিয়াকোমো লিওপার্ডি (১৭৯৮–১৮৩৭) ইতালির একজন দার্শনিক, কবি ও ভাষাবিদ। তঁার দার্শনিক ভাবনায় অধুনিক মানুষ চিহ্নিত হয়েছে প্রকৃতির আদি নিষ্পাপ সুখী অবস্থা থেকে অধঃপতিত এমন এক জীব হিসেবে যে যুক্তির উপর অতিরিক্ত গুরুত্ব আরোপ করে অতিকথা ও ধর্মের প্রয়োজনীয় অধ্যাসগুলো পরিহার করে বসে আছে, ফলে ধ্বংস ও শূন্যতার অন্ধকার বাস্তবতা থেকে তার পরিত্রাণ নেই। তঁার রচিত প্রধান গ্রন্থের নাম জিবালদোনে।

৫। শিলার: জোহান ক্রিস্তোফ ফ্রিয়েদরিশ ভন শিলার (১৭৫৯-১৮০৫) একজন জার্মান দার্শনিক, কবি ও নাট্যকার যিনি ইমানুয়েল কান্ট-এর নীতিশাস্ত্র ও নন্দনশাস্ত্রের উপর ভিত্তি করে উত্তর-কান্টীয় আদর্শবাদ-মুখী চিন্তার বিকাশ ঘটিয়েছিলেন। তাঁর প্রসিদ্ধ প্রস্তাবনা হলো: প্রতীতিগত উপস্থিতিতে স্বাধীনতাই হলো সৌন্দর্য্য; কোনো একটি বস্তুকে নান্দনিকভাবে ধ্যানের বিষয় করে তোলার মানে এমনটা নয় যে আমরা জ্ঞানচর্চাগতভাবে তাকে বুঝতে চাইছি, আমরা তার হেতুগত স্থিতি বোঝার জন্য ধারণা প্রয়োগ করছি না, সে যেনবা স্বাধীন এভাবে তাকে দেখছি।

৬। গ্যেটে: জোহান উল্ফগ্যাঙ গ্যেটে (১৭৪৯-১৮৩২) একজন জার্মান কবি ও চিন্তক। প্লেটো ও বিশেষ করে স্পিনোজা-র দার্শনিক চিন্তার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তিনি কাব্যে ও গদ্যে এক সমৃদ্ধ সর্বেশ্বরবাদী ভাবনার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। তিনি প্রকৃতিকে এমন এক জৈবিক প্রাণোচ্ছল ঐক্য হিসেবে দেখেছিলেন যেখানে বস্তু ও চৈতন্য একে অপরের মধ্যে অবিচ্ছেদ্যভাবে সম্পৃক্ত হয়ে আছে।

৭। পলিবিয়াস: গ্রিক ইতিহাসবিদ। দ্বিতীয় ও তৃতীয় খ্রিস্টপূর্বাব্দে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে রোমান সাম্রাজ্যের উত্থান নিয়ে লেখা তাঁর ‘ইতিহাস’ গ্রন্থের জন্য তিনি প্রসিদ্ধ।

৮। সোপেনহাওয়ার: আর্থার সোপেনহাওয়ার (১৭৮৮-১৮৬০) একজন জার্মান দার্শনিক। প্লেটো ও কান্টের পাশাপাশি উপনিষদ ও বৌদ্ধ দর্শন থেকে তিনি তাঁর দার্শনিক চিন্তার রসদ পেয়েছিলেন। তাঁর দর্শনচিন্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিপাদ্যটি হলো এই যে মানুষ এবং বাকি প্রকৃতি উভয়ক্ষেত্রেই চিন্তাভাবনা (thought)-র চেয়ে আরো প্রাথমিক ও মৌলিক প্রণোদনা হলো অভিপ্রায় (will)।

৯। পীথাগোরীয়: পীথাগোরাস খুব সম্ভবত ৫৫০ খৃস্টপূর্বাব্দ থেকে ৫০০ খৃস্টপূর্বাব্দ সময়কালে জীবিত ছিলেন। তাঁর জীবন ও কাজ অধিকাংশই এখন অতিকথার আচ্ছাদনে অস্পষ্ট হয়ে গেছে। শোনা যায় যে সামোস-এ তাঁর জন্ম, সেখান থেকে তিনি দক্ষিণ ইতালিতে অভিবাসী হন এবং সেখানেই তাঁকে এবং তাঁর দার্শনিক-ধর্মীয়-গাণিতিক চিন্তাকে ঘিরে একটি গোষ্ঠী গড়ে ওঠে যাদের আদি পীথাগোরীয় বলা যেতে পারে। ফিলোলাউস (৪৭০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে জন্ম) পীথাগোরীয় ভাবনাচিন্তার একটি সংহিতা তৈরি করেছিলেন যার সামান্য কিছু অংশ এখনও টিকে আছে। তার থেকে কিছু ধারণা করা যেতে পারে। যেমন, পীথাগোরীয়দের সিদ্ধান্ত ছিল যে সমস্ত বস্তুর স্থিতসত্তা (being) হলো চিরায়ত এবং মনুষ্যজ্ঞানে তা ধরা যায় না, কেবলমাত্র ঐশ্বরিক জ্ঞানেই তা ধরা যায়। মনুষ্যজ্ঞান কেবলমাত্র সেইসব বস্তুকেই ধরতে পারে যেসব বস্তুকে সংখ্যা দিয়ে চিহ্নিত করা যায়, যেসব বস্তু সসীম এবং অপরাপর বস্তু থেকে স্পষ্ট বিভাজনরেখায় বিচ্ছিন্নকৃত। এভাবে পীথাগোরীয়রা মানুষের জ্ঞানের একটি আবশ্যিক সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করেছিলেন বোধহয়।

১০। স্টোইক: প্রাচীন গ্রিসে উদ্ভূত দার্শনিক চিন্তার একটি ধারা স্টোইকবাদ (Stoicism) নামে পরিচিত। এই ধারার জনক হিসেবে সিতিয়াম-এর জেনো এবং প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে ক্লিনথিস ও খ্রিসিপাস প্রসিদ্ধ; আথেনস-এর যে ‘stoa poikile’ (চিত্রিত দেউড়ি)-তে বসে তাঁরা তাঁদের দর্শনচিন্তার পাঠ দিতেন, তার থেকেই ‘স্টোইক’ নামটি এসেছে। স্টোইক ধারণামতে, বিশ্বজগৎ সম্পর্কে সামগ্রিক উপলব্ধির প্রেক্ষিতেই ন্যায়-নৈতিকতা নির্ধারিত হতে পারে। মানুষের আচরণ থেকে শুরু করে মহাকাশের গ্রহ-নক্ষত্র-মণ্ডলীর আচরণ—সবই যুক্তি দিয়ে বাঁধা বলে তাঁদের ধারণা। আর এই সমগ্র বিশ্বজগতের মধ্যেই সর্ববস্তুর আত্মারূপে ছড়িয়ে আছে ঈশ্বরের অস্তিত্ব, ঘটমানতার যুক্তি সেই ঐশ্বরিক অস্তিত্বের অভিপ্রায়ের প্রকাশ। ঘটমানতার যুক্তি মানুষ বোঝার চেষ্টা করতে পারে, কিন্তু প্রায়শই সেই চেষ্টা যথেষ্ট হয়ে উঠবে না, ফলে প্রায়শই তা মানুষের কাছে প্রতীয়মান হয়ে উঠবে না। কিন্তু প্রতীয়মান হয়ে না উঠলেও তা নিয়ে বিক্ষুব্ধ বা দুঃখ-ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠা অজ্ঞানীর লক্ষণ, যে জ্ঞানী সে তার নিজ ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা-অভিপ্রায়ের বিপরীতগামী ঘটমানতার মধ্যেও ঐশ্বরিক যুক্তির প্রণোদনা স্বীকার করে নিয়ে দুঃখ-যন্ত্রণা-ক্ষোভ-এর মতো আবেগের প্রকোপ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে পারে। সংক্ষিপ্তসারে, এই ছিল স্টোইক মত।

১১। এপিকুরীয়: ৩০৬ খৃস্টপূর্বাব্দে এপিকুরাস আথেনস শহরের নগরপ্রাচীরের ঠিক বাইরে একটি বসবাস-বাড়ি কেনেন, সেই বাড়ির বাগানে জড়ো হওয়া মানুষদের নিয়ে তাঁর পরিচালিত দার্শনিক আলাপ-আলোচনা থেকে এপিকুরীয় ভাবনা ও চর্চার সূত্রপাত হয়। জগতের সবকিছুই জড় অণু দিয়ে গঠিত--- এই জড়বাদী প্রতিজ্ঞা ছিল তাঁদের দর্শনচিন্তার ভিত্তিমূল। কেবল দর্শনচিন্তা নয়, জীবনযাপনের শৈলীর উপরও প্রাধান্য দিয়ে গড়ে উঠেছিল এপিকুরীয় চর্চা। অতিলৌকিক বা পরলৌকিক কোনো জগতের ভাবনা অস্বীকার করে ইহজাগতিক সুখসাধনকেই জীবনযাপনের লক্ষ্য করেছিলেন তাঁরা। রাষ্ট্রের (নগর-রাষ্ট্রের) রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বৃত্ত থেকে সম্পূর্ণরূপে বেরিয়ে এসে সহমর্মী মানুষদের নিয়ে ছোটো-ছোটো স্বাধীন সমাজমণ্ডলী গড়ে তুলে বন্ধুত্বের ভিত্তিতে স্বশাসন গড়ে তুলে বাঁচাই ছিল তাঁদের আদর্শ।

১২। এরউইন ভন স্টেনবাখ (১২৪৪-১৩১৮) একজন জার্মান স্থপতি। তিনি স্ট্রাসবুর্গের বিখ্যাত নোতর দাম ক্যাথিড্রাল-এর স্থাপত্য-নকশা করেছিলেন বলে মনে করা হয়।

১৩। জাকব বুর্কহার্ড (১৮১৮-১৮৯৭): সুইজারল্যান্ডের একজন ইতিহাসবিদ। কেবলমাত্র অর্থনৈতিক-রাষ্ট্রনৈতিক বিবরণ-বিশ্লেষণই যে ইতিহাস পদবাচ্য হতে পারে না, মানুষের প্রাত্যহিক জীবন-সংস্কৃতি ও শিল্পকলাও যে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, তা তিনি তাঁর কাজের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। ইতালির রেনেসাঁ-কালীন সমাজ নিয়ে তাঁর বই ইতিহাসের একটি আকরগ্রন্থের মর্যাদা পেয়েছে। বাসেল বিশ্ববিদ্যালয়ে নিৎশে যখন শিক্ষকতা করতে যান, বুর্কহার্ড ছিলেন তাঁর সহকর্মী। দুজনের মধ্যে প্রগাঢ় বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, বৌদ্ধিক আদানপ্রদানের পথও প্রশস্ত হয়ে উঠেছিল।

১৪। লুথার: মার্টিন লুথার (১৪৮৩-১৫৪৬) একজন জার্মান ধর্মতত্ত্ববিদ ও দার্শনিক, যিনি খৃস্টধর্মে প্রোটেস্টান্ট সংস্কার আন্দোলনের জনক হিসেবে প্রখ্যাত। দর্শনচিন্তায় যুক্তির আধিপত্যের বিরোধিতা হলো তাঁর ভাবনার অন্যতম প্রধান দিক। তিনি যুক্তিকে ‘শয়তানের পোষা বেশ্যা’ বলেছিলেন। তাঁর মতে, যুক্তি কখনোই ঈশ্বর ও মানুষের সম্পর্কটিকে সঠিকভাবে অনুধাবনের উপায় হতে পারে না, কারণ যুক্তি নিজ প্রকৃতিগতভাবেই ঐশ্বরিক জগৎ থেকে মানুষের বিচ্ছিন্নতার চরিত্রবৈশিষ্ট্য দিয়ে নির্মীত।

১৫। ডন কিহোতে: মিগুয়েল ডি সেরভান্তেস-এর বিখ্যাত একই নামের উপন্যাসের প্রধান চরিত্র। চরিত্রটি আদর্শবান, আত্মত্যাগী, কিন্তু মধ্যযুগীয় ইউরোপের নাইটহুড-এর আদর্শকে জীবনের ধ্রুবতারা করার মধ্য দিয়ে প্রকৃত বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন এক ভ্রান্ত বাস্তবতায় বন্দী হয়ে যায় এবং গোটা জীবন সেই ভ্রান্তিবিলাসেই অপচয় করে।

১৬। ডেমোক্রিটাস: আনুমানিক ৪৬০ থেকে ৩৭০ খৃস্টপূর্বাব্দ তাঁর জীবনকাল। লিউসিপ্পাস-এর সঙ্গে যৌথভাবে তিনি প্রাচীন অণুবাদী দর্শন প্রবর্তন করেন বলে মনে করা হয়। তাঁর প্রত্যক্ষ কাজ কিছুই অবশিষ্ট নেই, বিভিন্ন সূত্রে তাঁর কাজের উদ্ধৃতি যা পাওয়া যায়, তা থেকেই তাঁর সম্পর্কে ধারণা করতে হয়।

১৭। হেরাক্লিটাস: টীকা ১ দ্রষ্টব্য।

১৮। ফিলো: চতুর্থ-তৃতীয় খৃস্টাব্দের একজন গ্রিক দার্শনিক। বচনের যুক্তিবিন্যাস এবং তার সঙ্গে বাস্তব ঘটনার সম্পর্ক বিষয়ে ভাবনা তিনি সূত্র আকারে হাজির করেছিলেন।

১৯। বেকন: ফ্রান্সিস বেকন (১৫৬১-১৬২৬ খৃস্টাব্দ) একজন আইনপ্রণেতা, রাজনীতিবিদ ও দার্শনিক যিনি ইংলন্ডে এলিজাবেথ টুডর ও জেমস স্টুয়ার্টের রাজত্বকালে রাজসভার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের প্রণালীবদ্ধ নিয়মতন্ত্রের ভিত্তিতে জ্ঞানকে পুনর্সংজ্ঞায়িত করাই ছিলো তাঁর দার্শনিক অভিপ্রায়।

২০। দেকার্তে: ১৫৯৬ থেকে ১৬৫০ খৃস্টাব্দ হলো এই যুগান্তকারী ফরাসী দার্শনিকের জীবনকাল। এঁকেই ১৭ শতকের ইউরোপীয় বৌদ্ধিক জগতের বিপ্লবের প্রবর্তক বলে ধরা হয়ে থাকে। ধর্মীয় ও অধ্যাত্মবিদ্যার পরিবর্তে যুক্তিভিত্তিক জ্ঞানের প্রাধান্য নির্মাণের ভিত্তি তাঁর দার্শনিক কাজগুলোর মধ্য দিয়েই গড়ে উঠেছিলো।

২১। গ্যেটে-র ফাউস্ত-II-এর অন্তিম পঙক্তি।

২২। ইরোয়িকা সিম্ফনি: বিঠোফেনের সবচেয়ে বিখ্যাত সিম্ফনিগুলোর মধ্য একটি, তিন নম্বর সিম্ফনি নামেও তা পরিচিত। ১৮০৩-১৮০৪ সালে বিটোফেন এই সুবিস্তৃত জটিল তীব্র আবেগদীপ্ত সঙ্গীতটি রচনা করেন। পাশ্চাত্য সঙ্গীতের ইতিহাসে ধ্রুপদ যুগ থেকে রোমান্টিক যুগে প্রবেশের অন্যতম দিক-চিহ্নায়ক হিসেবে এই সিম্ফনিটিকে যুগান্তকারী বলেও গণ্য করা হয়ে থাকে। এই সিম্ফনিটি উপস্থাপিত করতে গেলে লাগে: ফ্লুট, ওবোয়, ক্লারিনেট ও বাসুন দুটো করে; তিনটে হর্ন, দুটো ট্রাম্পেট, টিমপানি (পারকাশান), দুটো ভায়োলিন, একাধিক ভায়োলা, চেলো ও বাস যন্ত্র। দুটো বাঁশিতে সীমাবদ্ধ করে তা বাজানোর কথা বলে নিৎশে যে শ্লেষ করেছেন তা এর থেকে কিছুটা স্পষ্ট হতে পারে।

২৩। গ্রিলপার্জার: ফ্রানজ গ্রিলপার্জার (১৭৯১-১৮৭২) একজন অস্ট্রিয়ার নাট্যকার। তাঁর রচিত বিয়োগান্তক নাটকগুলোয় ব্যক্তিসত্তার বিভিন্ন গভীর দ্বন্দ্ব চিত্রিত ও বিশ্লেষিত হয়েছিলো। শিল্পীজীবন এবং সুখী জীবনের মধ্যে দ্বন্দ্ব, আদর্শ ও জীবনের মধ্যে দ্বন্দ্ব, ব্যক্তিসত্তা ও সামাজিকতার মধ্যে দ্বন্দ্ব: এগুলোই তাঁর নাটকে ফিরে ফিরে এসেছে, নানা দিক থেকে উপস্থাপিত হয়েছে। তাঁর রচিত ইতিহাস-আশ্রিত নাটকগুলো মেটারনিখ-জমানার সেনসর-ব্যবস্থার প্রকোপে বারবার মঞ্চ থেকে অপসারিত হয়েছিলো।

২৪। জোলনার: জোহান কার্ল ফ্রিয়েদরিশ জোলনার (১৮৩৪-১৮৮২) একজন জার্মান জ্যোতির্বিজ্ঞানী যাঁর মহাবিশ্ব সংক্রান্ত চতুর্মাত্রিক পরিসরের মডেল এবং দৃষ্টিভ্রম সংক্রান্ত কাজ তাঁকে খ্যাতি এনে দিয়েছিলো। খ্যাতির চূড়ায় থেকে তিনি ঘোষণা করেন যে তাঁর তত্ত্বগুলো সবই হেনরি স্লেড নামক এক প্রেততত্ত্ববিদের সঙ্গে করা অদৃশ্য আত্মাদের ডেকে আনার বৈঠকের মধ্য দিয়ে প্রাপ্ত, পরীক্ষানিরীক্ষা সেগুলোকে প্রমাণিত করেছে মাত্র।

২৫। প্লুটার্ক: আনুমানিক দ্বিতীয় খ্রিস্টাব্দের প্রথম দিকে প্লুটার্ক আটচল্লিশ জন গ্রিক ও রোমানদের জীবন নিয়ে একটা বই লিখেছিলেন, যা ‘সমান্তরাল জীবন’ নামে পরিচিত। এই বইয়ে জোড়ায় জোড়ায় পাশাপাশি দুটো করে জীবন রেখে তাদের নৈতিক গুণের শক্তি ও অপর্যাপ্ততা দুটোকেই ভাস্বর করে তুলতে চাওয়া হয়েছিলো। প্লুটার্কের উদ্দেশ্য ছিলো যাতে পাঠকরা বিরাট ঐতিহাসিক মানুষদের ছায়ায় নিজেদের অকিঞ্চিৎকর বলে ভেবে নেওয়ার অভ্যাস কাটিয়ে উঠে নিজেরা বিরাট মানুষ হয়ে ওঠার পাথেয় ও আত্মশক্তি এই বই পাঠের মধ্য দিয়ে অর্জন করতে পারে।

২৬। ভলতেয়রিয় écrasez: ভলতেয়র-এর বিখ্যাত নীতিবাক্য ‘écrasez l’infame!’ (অর্থাৎ, ‘কুখ্যাত বস্তুটিকে ধ্বংস করো!’ যেখানে কুখ্যাত বস্তু বলতে চার্চ-কে বোঝানো হয়েছে)-এর প্রতি এখানে ইঙ্গিত করা হয়েছে।

২৭। প্রোটেস্টান্ট ইউনিয়ন: ১৬০৮ থেকে ১৬২১ খৃস্টাব্দ কালপর্বে জার্মানির প্রোটেস্টান্ট রাজকুমারদের মধ্যে তৈরি হওয়া একটি সামরিক জোট।

২৮। নিৎশে এখানে ফ্রিয়েদরিশ দানিয়েল আর্নস্ট স্কেলেইরমাখার (১৭৬৮-১৮৩৪)-এর কথা বলছেন। স্কেলেইরমাখার আধুনিক প্রোটেস্টান্ট ধর্মতত্ত্বের জনক রূপে প্রসিদ্ধ হয়েছিলেন।

২৯। হান্স স্যাকস (১৪৯৪—১৫৭৬) ছিলেন একজন জার্মান দক্ষ জুতো-নির্মাতা, গীতিকাব্য ও নাটক রচয়িতা যাঁর রচনার নান্দনিকতা ছিলো অসামান্য, আবার জনপ্রিয়তা ও ধর্মীয় প্রভাবও ছিলো ব্যাপক। রিচার্ড ওয়াগনারের অপেরা ‘ডাই মেইস্টারসিঙ্গার ভন নুরনবার্গ’-এ তাঁকে আদর্শ হিসেবে দেখানো হয়েছে।

৩০। ডায়োজিনিস লয়েরসিয়াস: ১৮০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ২৪০ খ্রিস্টাব্দ ছিলো তাঁর জীবনকাল, যদিও তাঁর জীবন সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানা যায় না। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিকদের জীবনীকার হিসেবেই তাঁর খ্যাতি।

৩১। হেল্ডারলিন: জোহান খ্রিস্টান ফ্রিয়েদরিশ হেল্ডারলিন (১৭৭০ খ্রিস্টাব্দ—১৮৪৩ খ্রিস্টাব্দ) জার্মান রোমান্টিক ধারার অন্যতম প্রধান কবি ও দার্শনিক। প্রাকৃতিক জগৎ, ঈশ্বরত্ব ও নির্বাসনকে বিষয়মুখ করে তাঁর লেখাগুলোয় জার্মান ভাষার সঙ্গে প্রাচীন গ্রিক ভাষারূপ ও অতিকথার মিথষ্ক্রিয়া অনন্যতা তৈরি করেছে।

৩২। হেসিয়দ: ৭৭৬ খৃস্টপূর্বাব্দে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। হোমারের সমসাময়িক গ্রিক কবি হিসেবে পরিচিত।

৩৩। সাভোনারোলা: খ্রিস্টধর্মের প্রচারক, জীবনকাল ১৪৫২-১৪৯৮ খ্রিস্টাব্দ। ইতালির ফ্লোরেন্স শহরে খুব প্রভাব ছিলো। নগররাষ্ট্রের গৌরব ও ধর্মীয় পুনর্নবীকরণের জন্য তিনি সমস্ত ধর্মনিরপেক্ষ শিল্প-সংস্কৃতি ধ্বংস করার ডাক দিয়েছিলেন।

৩৪। উইলহেল্ম ওয়্যাকারঅ্যাঞ্জেল (১৮০৬- ১৮৬৯ খৃস্টাব্দ): জার্মান-সুইস ভাষাতাত্ত্বিক, ধ্রুপদী ও জার্মান সাহিত্য-সংস্কৃতি ছিলো তাঁর চর্চার বিষয়।

৩৫। রোমান ইতিসবিদ ও রাজনীতিবিদ টেসিটাস (৫৬ খৃস্টপূর্বাব্দ থেকে ১২০ খৃস্টাব্দ) তাঁর নিজের ইতিহাস-রচনা-শৈলী বর্ণনা করেছিলেন এই ‘sine ira et studio’ শব্দগুলো দিয়ে যার মানে: ‘ক্রোধ ছাড়া ও পক্ষপাতিত্ব ছাড়া’। লাতিন ‘studium’ শব্দটির মানে ‘পাঠ-অনুশীলনের প্রণালী’।

৩৬। রাফায়েল: ইতালির বিখ্যাত চিত্রকর, জীবনকাল ১৪৮৩ থেকে ১৫২০ খৃস্টাব্দ। ইতালির রেনেসাঁ-র তুঙ্গ মুহূর্তে তাঁর অবিস্মরণীয় সৃষ্টিগুলোর মধ্য দিয়ে নিওপ্লেটোনিক দার্শনিক দৃষ্টিতে মানবমহিমার অপরূপ প্রকাশ ঘটেছিলো। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে যে ‘রাফায়েল’ একটি হিব্রু শব্দ, যার আদি মানে হলো ‘ঈশ্বর নিরাময় করে দিয়েছেন’--- নিৎশে এই আদি মানেটির দিকেও তির্যক ইঙ্গিত করেছেন।

৩৭। natura naturans: দার্শনিক স্পিনোজা-র ব্যবহার করা পরিভাষা। এর মধ্য দিয়ে স্পিনোজা যেমন ঈশ্বরকে বুঝিয়েছেন, তেমনই ঈশ্বর সম্পর্কে তাঁর স্বতন্ত্র ধারণাটিকেও প্রকাশ করেছেন। বিশ্বপ্রকৃতির নিরন্তর বহমান সৃষ্টিপ্রক্রিয়ায় বিষয়ী যে সে natura naturans, সে-ই ঈশ্বর, সে-ই সমস্ত বস্তুর অস্তিত্বের পিছনের কারণ। সৃষ্ট কোনো প্রাকৃতিক বস্তুর মধ্যে ঈশ্বরকে কল্পনা করার বিপরীতে দাঁড়িয়ে এই ভাবনা।

৩৮। গ্যেটে-একারমান সংলাপ: গ্যেটে-র জীবনের শেষ নয় বছর জোহান পিটার একারমান তাঁর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে কাজ করেছিলেন। এই পর্যায়ে গ্যেটের সঙ্গে তাঁর সংলাপসমূহকে একারমান ‘Gespräche mit Goethe’ নামে বইয়ের আকারে প্রথমে ১৮৩৬ সালে ও পরবর্তীতে আরো পরিবর্ধিত আকারে ১৮৪৮ সালে প্রকাশ করেন। নিৎশে এই বই সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন: ‘জার্মান ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ বই’। এই বইয়ে গ্যেটের কথাবার্তার মধ্য দিয়ে তৎকালীন জার্মান সমাজের বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে তাঁর সমালোচনা ও পুরোনোকে অতিক্রম করে নতুনের জন্য ভাবনা প্রকাশ পেয়েছিলো।

৩৯। ই ভন হার্টমান (১৮৪২- ১৯০৬): জার্মান দার্শনিক। ১৮৬৯ সালে তাঁর ‘অচেতনের দর্শন’ নামক বইটি প্রকাশিত ও সমাদৃত হয়। নিৎশে এখানে এই বইটিরই সমালোচনা করেছেন।

৪০। শ্লেয়ারমাখার: ফ্রিয়েদরিখ শ্লেয়ারমাখার (Friedrich Schleiermacher) (১৭৬৮- ১৮৩৪) একজন জার্মান ধর্মতত্ত্ববিদ ও দার্শনিক। ইউরোপীয় এনলাইটেনমেন্ট-জাত সমালোচনাগুলোর সঙ্গে প্রটেস্টান্ট ধর্মমতের মিলন ঘটানোর উদ্যোগ তিনি নিয়েছিলেন। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা এবং স্বজ্ঞা-প্রণোদিত ব্যাখ্যার উপর ভিত্তি করে বাইবেল-পাঠ-এর প্রবক্তা ছিলেন তিনি।

৪১। ডেভিড স্ত্রাউস (১৮০৮-১৮৭৪): জার্মান প্রটেস্টান্ট ধর্মতত্ত্ববিদ। ১৮৩৫-এ তাঁর বিখ্যাত বই ‘Das Leben Jesu, kritisch bearbeitet’ (যিশু-র জীবন বা তাঁর ইতিহাসের একটি সমালোচনাত্মক বিচার) প্রকাশিত হয়। ধর্মীয় অতিকথার বাইরে এনে যিশুকে একটি ঐতিহাসিক চরিত্র হিসেবে বিচার করার প্রচেষ্টা ইউরোপের চিন্তাজগতে গভীর ছাপ ফেলে যায়। বাইবেল-এর নিউ টেস্টামেন্ট-এর বিবরণ ঐতিহাসিক বাস্তবতার প্রকৌশল ব্যবহার করে সমালোচনাত্মক ভঙ্গিতে পাঠ ও ব্যাখ্যা করার সঙ্গেই ‘ন্যায্যতম বাস্তবিকতা’ (‘fairest factuality’) শব্দবন্ধটি যুক্ত।

৪২। ex causis efficientibus: একটি লাতিন শব্দবন্ধ, যার অর্থ: যে প্রভাবশালী কারণগুলোর জন্য।

৪৩। ex causa finali: একটি লাতিন শব্দবন্ধ, যার অর্থ: যে চূড়ান্ত কারণ বা লক্ষ্য অভিমুখে ধাবিত হওয়ার কারণে সবকিছু ঘটছে।

৪৪। ইংরেজ লেখক ও সমালোচক গিলবার্ট কিথ চেস্টারটন ১৯২৫ সালে প্রকাশিত তাঁর বই ‘The Everlasting Man’ বইতে এই মন্তব্যটি করেছিলেন, মূল মন্তব্যটি এরকম: ‘…in the German mind there does seem to be something splay, something blunt-edged, unhandy and infelicitous…’।

৪৫। দানাইদ-দের কলসিগুলো: গ্রিক পুরাকথায় লিবিয়ার রাজা দানাউস-এর পঞ্চাশজন কন্যা দানাইদ নামে পরিচিত। দানাউস-এর ভাই ঈজিপ্তাস-এর ছেলেদের বিয়ে করতে এই দানাইদ-দের বাধ্য করা হয়। ক্ষিপ্ত দানাউস তাঁর কন্যাদের হুকুম দেন যে তারা যেন তাদের স্বামীদের হত্যা করে। হাইপারমেন্সট্রা নামে একজন দানাইদ ছাড়া বাকিরা পিতার আদেশ মেনে স্বামীদের হত্যা করে। এর শাস্তিস্বরূপ এই দানাইদদের বাকি অনন্তকাল ধরে অসংখ্য ফুটোয় ভর্তি কলসি করে জল বয়ে নিয়ে আসার শাস্তি দেওয়া হয়েছিলো।

৪৬। animae magnae prodigus (Horace, Odes I.xii.38): মহান আত্মার অপচয়ী ব্যবহার।

৪৭। ডেমোসথেনেস: প্রাচীন আথেনস-এর একজন রাজনীতিবিদ ও বক্তা, তাঁর জীবনকাল ৩৮৪ খৃস্ট-পূর্বাব্দ থেকে ৩২২ খৃস্ট-পূর্বাব্দ। গভীরসঞ্চারী চিন্তাভাবনা ও বিশ্লেষণীক্ষমতার অধিকারী ছিলেন, কিন্তু তুতলে কথা বলতেন।

৪৮। শেকসপীয়র-এর As You Like It (Act II, Scene vii) থেকে উদ্ধৃত, বঙ্গানুবাদ বর্তমান তর্জমাকারের।

৪৯। গীবন: এডওয়ার্ড গীবন (১৭৩৭- ১৭৯৪ খৃস্টাব্দ) একজন ব্রিটিশ প্রাবন্ধিক, ইতিহাসবিদ ও রাজনীতিবিদ। তাঁর লেখা রোম সাম্রাজ্যের ইতিহাস, The History of the Decline and Fall of the Roman Empire, আজও পঠিত হয়।

৫০। গটসছেদ: জোহান ক্রিস্তোফ গটসছেদ (১৭০০-১৭৬৬ খৃস্টাব্দ) একজন জার্মান লেখক, সামালোচক ও তাত্ত্বিক যিনি আঠারো শতকের ফরাসি ধ্রুপদী আঙ্গিকের অনুকরণে জার্মান কাব্যের প্রমিত রূপ গঠন করতে চেয়েছিলেন। প্রাথমিক আলোড়ন তুললেও তাঁর সেই ধ্রুপদী আঙ্গিক গঠনের চেষ্টা অচিরেই বিস্মৃতিতে হারিয়ে গিয়েছিলো।

৫১। রামলের: কার্ল উইলহেল্ম রামলের (১৭২৫-১৭৯৮ খৃস্টাব্দ) একজন জার্মান কবি।

৫২। পিন্ডার: ৫১৮ বা ৫২২ খৃস্টপূর্বাব্দ নাগাদ থিবস-এ জন্মগ্রহণ করা এই কবিকে ধ্রুপদী গ্রিসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি ও ভাবুক রূপে গণ্য করা হয়।

৫৩। ডেলফির দৈবাদেশ: গ্রিক অতিকথা অনুযায়ী পারনাসাস পাহাড়ের মন্দিরে অবস্থিত দৈবাদেশজ্ঞাপক নারী একদম আদিকালে গেইয়া মাতা (ভূমি/পৃথিবী মাতা)-র নির্দেশ ও ভবিষ্যৎবাণী জ্ঞাপন করতেন। পরে দেবতা অ্যাপোলো তাঁকে হরণ করেন, তার পর থেকে অ্যাপোলোর নির্দেশ ও ভবিষ্যৎবাণী তাঁর মুখ থেকে শোনা যেত।

 

 

 

0 Comments
Leave a reply