দস্তয়েভস্কি: সংশয়ী যন্ত্রণার সিম্ফনি

লিখেছেন:বিপ্লব নায়ক
ঠিক সাহিত্য-আলোচনা নয়, দর্শনের আলোচনা। দস্তয়েভস্কির দর্শন, যে দর্শনকে লেভ শেস্তভ 'The Philosophy of Tragedy' বলেছেন: যন্ত্রণা যেখানে জীবনের আখর, সংশয় যেখানে স্বাধীনতার চাবিকাঠি।

 

১৮৭৩ সালে দস্তয়েভস্কি তাঁর ডায়েরিতে লিখেছিলেন: ‘আমার বিশ্বাসের পুনর্জন্মের গল্প বলা আমার পক্ষে অত্যন্ত কঠিন, বিশেষত যেহেতু তা তেমন আগ্রহোদ্দীপক না-ও হতে পারে’।

আবার এর পাশেই রাখা যাক ১৮৬৪-তে প্রকাশিত দস্তয়েভস্কি-র ‘নোটস ফ্রম দি আন্ডারগ্রাউন্ড’-এর মূল চরিত্রের (যার মুখ দিয়ে দস্তয়েভস্কি তাঁর নিজের ভাবনা প্রকাশ করিয়েছেন বলে ধরা হয়) এই কথাগুলো: ‘একজন সৎ লোক সবচেয়ে আনন্দের সঙ্গে কী নিয়ে কথা বলতে পারে? উত্তরটা হলো, তাকে নিজেকে নিয়ে। সুতরাং আমি নিজেকে নিয়েই কথা বলবো।’

প্রথম বক্তব্যটি থেকে আমরা আঁচ পাই যে দস্তয়েভস্কির জীবনে কোনো এক সময়ে তাঁর লালিত বিশ্বাসগুলোর মৃত্যু ঘটেছিলো, আবার কোনো এক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নতুন বিশ্বাসের জন্ম হয়েছিলো। কিন্তু এই বিশ্বাসের মৃত্যু ও পুনর্জন্মের আখ্যান সরাসরি দস্তয়েভস্কি বলতে চাননি, কারণ একদিকে যেমন তা অত্যন্ত কঠিন বলে তাঁর মনে হয়েছিল, অন্যদিকে তেমনই তা অন্যদের আগ্রহের বিষয় না-ও হতে পারে বলে তিনি বোধ করেছিলেন। কঠিন হওয়ার কথাটি মেনে নিতে কোনো অসুবিধা হয় না, কারণ লালিত বিশ্বাস দিয়েই আমাদের দাঁড়াবার জায়গাটি তৈরি হয়, সেই বিশ্বাস ভেঙে যাওয়া পায়ের নিচে থেকে মাটি সরিয়ে দেয়, শূন্যে তলিয়ে যাওয়ার বা অবাধে পতনশীল এক অনুভূতি অস্তিত্বকে ছেয়ে ফেলে, তীব্র সন্দেহ সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্নতা তৈরি করে, তার মধ্য দিয়ে আবার নতুন বিশ্বাসের ভিটে তৈরি করা এক যন্ত্রণাকর অভিজ্ঞতা, সে অভিজ্ঞতা পুরোটা জ্ঞান ও সচেতনতার আখরে ধরা থাকে না, স্বজ্ঞা ও প্রবৃত্তির আলো-আঁধারির মধ্যেই তা বেশিটা নিমজ্জিত থাকে, ফলে তা বর্ণনা করার প্রয়াসও অতি যন্ত্রণাকর এবং প্রয়াস নিলেও তা বারবার অসফল হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি, এমনকি দস্তয়েভস্কির মতো প্রতিভাবানের ক্ষেত্রেও। কিন্তু, অন্যদের পক্ষে তা আগ্রহের বিষয় না-ও হয়ে উঠতে পারে, এমনটা দস্তয়েভস্কির কেন মনে হলো? বিশ্বাস ভেঙে যাওয়ার যন্ত্রণা পেরিয়ে নতুন বিশ্বাস অর্জনের উচ্চভূমিতে পৌঁছতে পারার আখ্যান তো ধ্রুপদী অন্ধকার-থেকে-আলোয়-পৌঁছানোর আখ্যান, তার প্রতি আগ্রহ মানুষের অবচেতনার অংশ, সেকথা দস্তয়েভস্কির অজানা ছিলো বলে মনে হয় না। তাহলে বিষয়টি কী? বিষয়টি কি এরকম যে দস্তয়েভস্কি যে বিশ্বাসের পুনর্জন্মের প্রক্রিয়ার কথা বলেছেন তা ঠিক অন্ধকার থেকে আলোয় যাত্রার মতো সরলনৈতিক কোনো বর্ণনায় বাঁধা যায় না? বোধহয় তাই, কারণ সযত্নে লালিত বিশ্বাস যখন ভেঙে পড়ে, তখন কেবল নির্দিষ্ট বিশ্বাসগুলোর উপরই কেবল আস্থা সরে যায় না, সাধারণভাবে বিশ্বাস বিষয়টিই প্রশ্নচিহ্নের মুখে পড়ে। অর্থাৎ, কোনো একটি বিশ্বাস আসলে ভুল কিনা সে প্রশ্নে থেমে থাকে না, বিশ্বাসের উচ্চ কুলুঙ্গিতে সংশয়-সন্দেহের ধরাছোঁয়ার বাইরে অনেক উপরে কোনো ধারণাকে স্থাপন করার কর্মটিই ভুল কিনা, প্রশ্ন সেই অবধি গিয়েও পৌঁছায়। তাই নতুন কোনো বিশ্বাস গড়ে উঠতে চাইলেও, সে বিশ্বাসে আর আগের মতো নিঃসন্দিগ্ধ ভরসা রাখা যায় না, তাকে ভিত্তি করে আর আগের মতো আত্মসত্তা ও আত্মপরিচয়ের অমলিন সৌধ নির্মাণ করা যায় না। বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের মধ্যে চুলের ফারাক থাকে, বিশ্বাসের ভাঁজে ভাঁজেই অবিশ্বাসের সম্ভাবনা চাউর হতে থাকে। প্রাথমিক পবিত্র বিশ্বাস আর তার ভাঙনকাল পরবর্তী পুনর্জন্মের বন্ধুর প্রক্রিয়ায় জায়মান বিশ্বাস তাই মেজাজে-চরিত্রে আলাদা, প্রথমটির উজ্জ্বলতা সর্বজনীন আদর্শ হিসেবে সবার সামনে তুলে ধরে আলোকদর্শী মহাপুরুষ হওয়া যায়, কিন্তু দ্বিতীয়টির আলো-অন্ধকার পতন-অভ্যুদয় যে যাপনযন্ত্রণা বিধৃত করে, তার কোনো সর্বজনীনতা নেই, জ্ঞানের আলো সেখানে দূরাগত, তা কেবল ব্যক্তিবিশেষের স্বজ্ঞা ও প্রবৃত্তির মৃদু সংশয়ী বিচ্ছুরণ ছড়াতে থাকে। ফলে পাঠক এখানে অন্ধকার থেকে আলোয় যাত্রার কোনো ধ্রুপদী আখ্যান খুঁজে পাবেন না, বরং ‘যতবার আলো জ্বালাতে যাই, নিভে যায় বারে বারে’-সদৃশ এক নাছোড় বেদনা ও অসম্পূর্ণতার বোধ পাবেন। সাধারণ পাঠকরুচি তো তাকে আগ্রহের বিষয় বলে ঠাউর না-ই করতে পারে।

এবার আসা যাক দস্তয়েভস্কি পাতালপুরী (underground)-র চরিত্রটির মুখ দিয়ে যা বলিয়েছেন সেই কথায়। পবিত্র বিশ্বাস লালনকারী প্রথম পর্যায়ে কোনো মানুষ যদি আলোকদর্শী মহাপুরুষদের রীতি অনুসরণ করে সর্বজনীন মূল্যবোধ ও মঙ্গলভাবনার প্রচারক হিসেবে সাহিত্যরচনার কাজ অবলম্বন করে থাকেন, তাহলে বাভনকাল পরবর্তী এই দ্বিতীয় পর্যায়ে তিনি কী করবেন?  এমন হতে পারে যে তিনি আর সাহিত্য রচনা করবেন না। কিন্তু সাহিত্য রচনাই যদি তাঁর উপার্জনের প্রধান উপায় হয়, আর তাছাড়াও, সাহিত্য রচনাই যদি অপরাপরের সঙ্গে তাঁর নিজের আত্মের সংযোগের প্রায় একমাত্র উপায় হয়, তাহলে সাহিত্য রচনা না করে তিনি পারবেন না। তাহলে তিনি কী করবেন? তিনি কি তাঁর মধ্যের সমস্ত ভাঙন, আস্থা-বিসর্জন ভিতরেই গোপন করে রেখে সাহিত্যকর্মকে কেবলই একটি বাইরের কাজ হিসেবে সম্পাদন করে যাবেন, সেই বাইরের কাজে তিনি তাঁর ভিতরের সমস্ত উতরোল অনুসন্ধানকে অপ্রকাশিতব্য করে রেখে স্থির-পবিত্র-বিশ্বাসধারী মহাপুরুষের ভূমিকায় অভিনয় করে যাবেন? যেতে পারেন, অনেকে এমনটাই করে থাকেন, কিন্তু পাতালপুরীর চরিত্রটি (এবং দস্তয়েভস্কি) তাঁকে অসৎ বলবেন। তাঁদের কাছে সততার নৈতিকতা মানে: আমি যা, সেভাবেই আমাকে হাজির করা। সেই সততার নৈতিকতা থেকে তাঁকে নিজেকে নিয়েই কথা বলতে ঙবে, বিকল্প কোনো আদর্শ পবিত্র চরিত্র নিয়ে নয়, তাঁকে নিজেকেই প্রকাশ করতে হবে, পরিশুদ্ধ কোনো আদর্শ সত্তাকে নয়। তাই ভাঙনকাল পরবর্তী দস্তয়েভস্কির রচনা প্রায় গত্যন্তরহীনভাবেই তাঁর বিশ্বাস-পুনর্জন্ম-প্রক্রিয়ার আলো-আঁধারিকেই অভিব্যক্তি দিতে চাইবে, এমনটাই হওয়ার কথা। লেখকের পক্ষে তা যন্ত্রণাকর, পাঠকের পক্ষে তা আগ্রহের বিষয় নাও হতে পারে, কিন্তু দস্তয়েভস্কির লেখকসত্তার স্বতঃক্রিয়া এভাবেই সাহিত্য রচনা না করে পারে না।

দস্তয়েভস্কি কীভাবে এই বিশ্বাস-মূল্যবোধ-নৈতিকতা ভাঙা-গড়ার আখ্যান বুনেছেন তা বোঝার চেষ্টা হিসেবেই আমি এখানে একটি দস্তয়েভস্কি-পাঠ হাজির করছি।

দস্তয়েভস্কির লেখক-জীবনের প্রথম পর্বকে ভাঙন-পূর্ববর্তী পবিত্র বিশ্বাসের কাল হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। এই পর্ব মোটামুটি ১৮৪৫ সালে প্রকাশিত ‘পুওর ফোক’ থেকে ১৮৬১-৬২ সালের ‘দি হাউজ অফ দি ডেড’ বিস্তৃত বলে বলা যায়। এই পর্বের শুরু তৎকালীন রুশ সমাজে ভিসারিয়োঁ বেলিনস্কি-র হাজির করা মতাদর্শিক বাতাবরণের মধ্য দিয়ে। বেলিনস্কি-র নির্ধারণ ছিলো যে সাহিত্যের ভূমিকা হওয়া উচিত শোষিত-নিপীড়িত-অবদমিত-দের সংকট ও সংগ্রামের অভিব্যক্তি রচনা করে তাদের উত্তরণের সহযোগী হওয়া। জ্ঞান ও যুক্তি দ্বারা চালিত সংবেদনশীল এক রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্য দিয়েই এই উত্তরণ ঘটতে পারে বলে তাঁর বিশ্বাস ছিলো, সেই বিশ্বাস থেকে তিনি পাশ্চাত্য আধুনিকতাকে শ্রেয় ও কাম্য বলে মনে করতেন। বেলিনস্কি ছিলেন এক ধরনের মানবতাবাদ (Humanism)-এর প্রবক্তা, যা মনে করতো যে প্রতিটি মানুষের মধ্যে শুভ ভাবনা ও সৃষ্টিশীলতা উদ্বোধনের এক অপার সম্ভাবনা রয়েছে, কিন্তু সামাজিক বিধি-নিষেধ-কাঠামো তাকে অবদমিত ও খণ্ডিত করে রাখে, ফলে সামাজিক বদ্ধতা ভেঙে মানুষের স্বাধীনতার অধিকারের ঘোষণা (ফরাসি বিপ্লবের মধ্য দিয়ে উঠে আসা  ‘দি রাইটস অফ ম্যান’ যার একটি আদর্শ নমুনা) অপার মুক্তি ও মঙ্গলের পথ খুলে দিতে পারে। সামাজিক রীতি-নীতি-ক্ষমতাকাঠামোর জন্যই তলাকার যে মানুষরা লাঞ্ছিত-বঞ্চিত-অবদমিত হয়ে মনুষ্যেতর জীবন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে, গভীর মমত্ববোধ ও সংবেদনশীলতা নিয়ে তাদের মনুষ্যত্বের অপমানটিকে তুলে ধরতে পারলে তাদের প্রতি নৈতিক দায়িত্বটি পালন করা যাবে, সেটাই শিল্পীর কর্তব্য।  বেলিনস্কি-অনুগামী-মহলে দস্তয়েভস্কির ‘পুওর ফোক’ অত্যন্ত সমাদৃত হয়েছিলো। কেবল ‘পুওর ফোক’ নয়, ‘পুওর ফোক’ থেকে ‘দি হাউজ অফ দি ডেড’ পর্যন্ত সমস্ত লেখাতেই দস্তয়েভস্কি লাঞ্ছিত-বঞ্চিত-অবদমিত-দণ্ডিত-দের জীবনছবি এঁকেছেন, তাদের মধ্যের মনুষ্যত্ব ও সেই মনুষ্যত্বের অপমানকে ডাগর করে তুলতে চেয়েছেন, স্রষ্টা হিসেবে তাঁর সমস্ত আবেগ তিনি এর মধ্যেই নিয়োজিত করেছেন। প্রায় চল্লিশ বছর বয়স অবধি দস্তয়েভস্কির সাহিত্যসৃষ্টি এই ধারাতেই বয়েছে।

এই পর্বে লেখক হিসেবে নিজের কাজের সঙ্গে তাঁর আবেগগত সম্পৃক্তির ধরনটি বোঝার জন্য আবার তাঁর ডায়েরির একটি অংশের সাহায্য নেওয়া যায়। ১৮৬১ সালে মাসিক পত্রিকা ‘ভ্রেমিয়া’-য় যখন তাঁর ‘দি হিউমিলিয়েটেড অ্যান্ড ইনসাল্টেড’ উপন্যাসটি ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে, সেই সময়ে দস্তয়েভস্কি তাঁর ডায়েরিতে এটি লিখেছিলেন। দস্তয়েভস্কি আলোচনা করেছেন যে এই পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি আনন্দ তিনি কখন পেয়েছেন--- যখন লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হলো তখন নয়, যখন তিনি শুনতে পেলেন যে সমসময়ের সেরা লেখকরা ও সাহিত্যবোদ্ধারা লেখাটির ভূয়সী প্রশংসা করছে তখনও নয়। তিনি ডায়েরিতে লিখেছেন যে সর্বোচ্চ আনন্দ তিনি পেয়েছেন সবার চোখের আড়ালে লেখাটি লেখার সময়, যখন নিপীড়িত-নির্যাতিত সরকারি কেরানি মকর দেভুশকিন চরিত্র ও জীবন-ইতিবৃত্ত বানানোর পাশাপাশি তিনি তাঁর এই বানানো চরিত্রের দুর্ভাগ্য নিয়ে নীরব অশ্রুপাত করে গেছেন। এই নীরব অশ্রুপাতের মধ্য দিয়ে সর্বোচ্চ আনন্দ পাওয়ার বিষয়টিকে একটু ভেঙে বোঝার চেষ্টা করা যাক। দুটি পরস্পরনির্ভর অথচ বিপরীত বিষয়কে দুদিকে স্থাপন করা যাক। একদিকে বর্তমান সমাজজীবন যা শোষণ-বঞ্চনা-বিকৃতি-কলুষতা-কদর্যতা-য় ভারাক্রান্ত ও ন্যুব্জ, অন্যদিকে এক উজ্জ্বল আদর্শ ভবিষ্যতের স্বপ্ন যা এহেন শোষণ-বঞ্চনা-বিকৃতি-কলুষতা-কদর্যতা থেকে মুক্ত হয়ে পবিত্র নৈতিকতার পাখায় ভর করে উড্ডীন। যত অন্ধকার সব ঘনিয়ে উঠেছে এই বর্তমান যাপনের বুকে আর যত আলো সব জ্বলে উঠেছে সেই ভবিষ্যৎ যাপনের স্বপ্নে। বর্তমানের কলুষ-কদর্য-অন্ধকারকে যত নিবিড়ভাবে দেখানো যাবে, সেই নিবিড়তায় দেখানোর মধ্য দিয়ে যত তাকে অসহ্য করে তোলা যাবে, মানুষের অন্তর্গত মঙ্গলবোধ ততো বিব্রত অনুভব করবে, বিবমিষা প্রকট হবে, আর তার ফলেই উজ্জ্বল আদর্শের দিকে আকর্ষণ ততোই বৃদ্ধি পাবে, পতিত বর্তমানকে উৎক্রমণ করে উজ্জ্বল আদর্শের নৈতিকতাকে বাস্তব করে তোলার স্বতঃক্রিয়া ততোই জেগে উঠবে। লেখক তাই মকর দেভুশকিন-কে যত দুর্ভোগ-অপমানের মধ্যে নিমজ্জিত করছেন, ততো তিনি পাঠককে তেমন এক সমাজ-নৈতিকতার দিকে আকর্ষণ করছেন যেখানে কোনো দেভুশকিন থাকবে না। নীরব অশ্রুপাত তাই লেখক হিসেবে এক দায়িত্বপালনের সাফল্যের এই বোধকেও বয়ে আনে যে হৃদয় নিঙড়ে উত্তরণের পথে পাঠককে ঠেলে দেওয়া গেলো। সেটাই বোধহয় লেখক হিসেবে তদানীন্তন দস্তয়েভস্কির সর্বোচ্চ আনন্দ।

এই সূত্রেই এই পর্যায়ে দস্তয়েভস্কির আরেকটি কথা বিচার করে দেখা যাক: ‘সবচেয়ে পদদলিত যে মানুষ তলাকার স্তরেও সবচেয়ে তলায় পড়ে আছে, সে-ও যে একজন মানুষ এবং তাকেও যে তোমার ভাই বলা হয়, সেই উপলব্ধি হৃদয়কে গভীরে নাড়া দেয়’। হৃদয়কে নাড়া দেওয়া এই উপলব্ধি করছেন যে জন আর পদদলিত তলারও তলায় পড়ে থাকা মানুষজন--- এই দুটি কি দুটি পৃথক বর্গ নয়? সমাজে মান ও মান্যতার নিরিখে যাঁদের ‘মনুষ্যত্ব’ প্রশ্নাতীত, নৈতিকতার প্রতিষ্ঠিত মতাদর্শিক রূপের ধারক-বাহক যাঁদের হওয়ার কথা, তাঁদের মধ্যেই কি এই উপলব্ধিকারীর অবস্থান নয়? অনেক উপরে বাঁধা মাচা থেকে তিনি তলাকারও তলায় পড়ে থাকা, প্রায় ব্যক্তিস্বাতন্ত্রহীন এক দলা প্রাণীদের দেখছেন, যাদের ‘মনুষ্যত্ব’ প্রশ্নাতীত নয়, মান-সম্মান নেই, নৈতিকতার পরাকাষ্ঠা বলেও যাদের ধরা হয় না। এই এক দলা-পাকানো প্রাণীদের মধ্যে ‘মনুষ্যত্ব’ আবিষ্কার করে তিনি নাড়া খাচ্ছেন, তাঁর মধ্যের শোভন গুণাবলী ওই অশোভনদের মধ্যেও খুঁজে পেয়ে ভ্রাতত্ব বোধ করছেন, আর কীভাবে ওই তলাকার মানুষকে নিজের মাচার স্তরে তুলে এনে সমমর্যাদা দেওয়া যায়, তার জন্য ব্যাকুল হচ্ছেন। ফলে এ দিগদর্শন হলো মাচার উপর থেকে মাচার তলাকে দেখার দিগদর্শন। মাচার তলাকার মানুষরা তাদের নিজস্ব মনুষ্যত্বের প্রকাশদীপ্তি নিয়ে এখানে হাজির নয়, মাচার উপর থেকে আরোপিত মনুষ্যত্বের জোব্বায় তাদের দেহ-মন ঢাকা পড়েছে।

বিমূর্ত মানবতাবাদকে সাহিত্যরীতির বাস্তববাদ (realism) দিয়ে মূর্ত ভ্রমে কীভাবে হাজির করা যায়, এই পর্যায়ে দস্তয়েভস্কি ক্রমশ তাতে হাত পাকিয়েছেন। এর সম্পূর্ণ বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে পাতালবাসী দস্তয়েভস্কি, এবার সেইদিকে চোখ ফেরানো যাক।

‘নোটস ফ্রম দি আন্ডারগ্রাউন্ড’ যখন প্রথম ১৮৬৪ সালে ‘ইপক’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়, তখন দস্তয়েভস্কি তার নাম দিয়েছিলেন ‘এ কনফেশন’। পাতালবাসী নায়কটির আড়ালে দস্তয়েভস্কি যেন নিজেই হাজির, এ যেন তাঁর একপ্রকার আত্মসমালোচনা। আবার কেবল আত্মসমালোচনাই নয়, এ যেন নিষ্ঠুরভাবে নিজেকে খুলে-মেলে দেখা, নৈতিকতা-আদর্শবোধের সাজপোষাকগুলোকে খুলে রেখে নগ্ন হয়ে আয়নার সামনে দাঁড়ানো।

পাতালবাসী নামহীন আত্মকথকটি সাহিত্যসেবক, সে গল্প লেখে, শিল্পচর্চা করে। গল্পলেখক হিসেবে তার ঐকান্তিক ইচ্ছা হলো নিঃসহায় ভগ্নমনের একটি সার্বিক ছবি ফুটিয়ে তোলা। কেবল সেই তাড়নাতেই সে লিজার উপর অকারণ অত্যাচার চালিয়ে যায়, লিজা তার কাছে কোনো গুরুত্ব পায় না, লিজাকে দুমড়ে-মুচড়ে একটা ভগ্নমন তৈরি করা ও সাহিত্যে তার প্রতিরূপ ধরে রাখাতেই তার সর্বস্ব নিয়োজিত। নিজের স্রষ্টাসত্তার মোহে সে এমনভাবে বন্দি যে অন্য আর কিছুর সঙ্গেই সে সম্পর্ক পাততে পারে না, তার আত্মসত্তা চরম বিযুক্তি (alienation)-এর মধ্যে গ্রানাইটের দেবমূর্তি হয়ে নিজেই নিজের পুজো করে চলে। জ্ঞানের জন্য তার আকাঙ্ক্ষা--- নিঃসহায় ভগ্নমনকে সার্বিকভাবে জানার আকাঙ্ক্ষা--- তাকে এমন এক অন্ধগলিতে এনে দাঁড় করিয়ে দেয় যেখানে পরহিতাকাঙ্ক্ষার অভিপ্রায় নিয়ে যে ভগ্নমনধারীর সেবাকে সে নৈতিক কর্তব্য বলে ঠাউর করেছিলো, সেই ভগ্নমনধারীকেই সে কেবল তার জ্ঞানচর্চার একটি নির্জীব উপকরণে পরিণত করেছে। নানাভাবে আঘাত করে সে কেবল সেই নির্জীব বস্তুটি থেকে উত্থিত ধ্বনি থেকে নির্জীব বস্তুটির গুণাবলীর একটি তথ্যতালিকা নিবন্ধিত করতে চায়। লিজাকে সে ভালোবাসা দিতে পারে না, লিজার ভালোবাসাও সে গ্রহণ করতে পারে না। প্রেম নয়, সহমর্মিতা নয়, লিজার প্রতি অকারণ নিষ্ঠুরতাই তার প্রায় প্রবৃত্তিগত আচরণ হয়ে দাঁড়ায়। মনুষ্যত্বের উপলব্ধি নয়, আত্মসত্তার সংকীর্ণ-করে-বাঁধা ঘেরাটোপের বাইরে আর সমস্ত কিছু থেকেই মনুষ্যত্ব-হরণ হয়ে দাঁড়ায় তার কাজ, আর তা চলে মনুষ্যত্ব-উপলব্ধির নামেই।

‘দি হিউমিলিয়েটেড অ্যান্ড ইনসাল্টেড’-এর যে লেখক নীরব অশ্রুপাতের মধ্য দিয়ে সর্বোচ্চ আনন্দ পেয়েছিলেন, পাতালবাসের আখ্যান রচয়িতা এই লেখক কি ঠিক তার বিপরীত নয়? পাতালবাসী লেখক যেন নিজের কবুলনামা (confessions)-র মধ্য দিয়ে দেভুশকিনের রচয়িতারই তীক্ষ্ণ সমালোচনা করছেন। বা, অন্যভাবে বলা যায়, দেভুশকিনের রচয়িতার বিশ্বাসের জগতটা যেন হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়েছে: যা তিনি মানবিক পরহিতাকাঙ্ক্ষার পরাকাষ্ঠা বলে ভেবেছিলেন তা এখন অপর থেকে এমন এক আত্মসর্বস্ব বিচ্ছিন্নতা বলে প্রমাণিত হয়েছে যার প্রকোপে মনুষ্যত্ব আরোপ করার নামে অপরের মনুষ্যত্ব হরণ করা হয় এবং সমস্ত মনুষ্যত্বের আধার হিসেবে সংকীর্ণ-করে-বাঁধা আত্মকেই গরিমাণ্বিত করা হয়। তলাকার স্তরেও সবচেয়ে তলায় পড়ে থাকা যে জীবনগুলোকে মনুষ্যত্বের আলোয় গৌরবাণ্বিত করে ‘তুলে আনা’-র মহান নৈতিক কর্তব্য পালন করছিলেন বলে তাঁর বিশ্বাস ছিলো, হঠাৎই তা ভ্রম ও আত্ম-অহংকারের সুতোয় বোনা এক মিথ্যা চেতনা বলে সাব্যস্ত হয়েছে। নৈতিকতা ও উচ্চ ভাবাদর্শের বাহক হিসেবে মহান কাজে নিরত বলে তাঁর নিজের সম্পর্কের ধারণাটাও ভেঙে গেছে, নিজের মধ্যের অনালোকিত অভ্যন্তরটি হঠাৎ আলোকিত হয়ে উঠে সংকীর্ণ স্বার্থভাবনা, সংবেদনহীনতা ও নিষ্ঠুরতার সরীসৃপগুলোকে পাক খেতে দেখা যাচ্ছে। এই সংকটের মুহূর্তে হৃদয়-নিঙড়ানো এক আর্তচিৎকারই পাতালবাসীর বয়ানে উঠে এসেছে।

নৈতিকতা-মতাদর্শ-উচ্চভাব-এর পোষাকগুলো আর পাতালবাসীর গায়ে নেই। সে এখন নিজের দিকে তাকিয়ে নিজের বিবরণ দিচ্ছে। সে বলছে যে মহান সব ধ্যানধারণা ফলপ্রসূ হোক গে যাক, একবার নয় হাজারবার ফলপ্রসূ হোক, কৃষকরা বন্ধনমুক্ত হোক, ন্যায়নিষ্ঠ ও দয়াপরবশ বিচারব্যবস্থা গড়ে উঠুক, সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক অংশগ্রহণের নিয়ম বাতিল হোক, ইত্যাদি, ইত্যাদি, তাতে তার কিছু যায়-আসে না, তার সুখ তাতে বাড়বে না, তার হৃদয়ও তাতে হালকা হবে না; আর এইসব অতি বিরাট সৌভাগ্যের ঘটনাগুলো না ঘটে যদি দুর্ভাগ্যের পাকে পড়ে গোটা রাশিয়া, তাহলেও সে এখনের চেয়ে খারাপ কিছু থাকবে না, বরং হয়তোবা আর একটু ভালোই থাকবে। কথায় কথায় সে লিজাকে নির্দ্বিধায় বলে: ‘গোটা বিশ্ব জাহান্নামে গেলেও আমার কিছু যায় আসে না, যতক্ষণ আমি আমার চা-টা সময়মতো পেয়ে যাচ্ছি’।

১৮৮২ সালে দস্তয়েভস্কির মৃত্যুর এক বছর পর রুশ সমাজতাত্ত্বিক নিকোলাই কে মিখাইলোভস্কি ‘দস্তয়েভস্কির নিষ্ঠুর প্রতিভা’ নামে এক প্রবন্ধে লিখেছিলেন: ‘উনিশ শতকের বেশিরভাগ শিক্ষিত মানুষের সঙ্গে দস্তয়েভস্কির পাতালবাসী মানুষের তফাৎ শুধু এটুকুই যে পাতালপুরীর মানুষ তার আক্রোশ উপভোগ করতে জানে, আর অন্যান্যরা জানে ফায়দা তুলতে।… সেই মানুষটি ততোধিক নোংরা নয় যতটা বাদবাকিরা। সে তাদের তুলনায় সবচেয়ে সাহসী ও বুদ্ধিমান। আসুন, উনিশ শতকের যে কোনো মানুষ চেষ্টা করুন তার দিকে ঢিল ছুঁড়ে মারতে।’

সমস্ত শোভন সংস্কৃতি ও পবিত্র মূল্যবোধ এমন ঠুনকো বাহারী আবরণমাত্র বলে প্রতিভাত হওয়া, চরম আক্রোশে সে আবরণ ছিঁড়ে ফেললে তার অভ্যন্তরে ক্ষমতার লালসা ও আত্মসংকীর্ণতার সরীসৃপগুলোর অবাধ গতিবিধি প্রকট হয়ে ওঠা, জ্ঞান ও নৈতিকতা সেই লালসা ও সংকীর্ণতারই ছদ্মরূপ হিসেবে জাহির হওয়া--- এই মৌলিক সংকটের গহ্বরে ‘দি হিউমিলিয়েটেড অ্যান্ড ইনসাল্টেড’-এর সেই আদর্শবাদী লেখক এসে পৌঁছলেন কীভাবে? অতর্কিত কোনো বজ্রাঘাতের মতো তা ঘটেনি, দীর্ঘ টানাপোড়েন-উথালপাতাল-এর মধ্য দিয়েই নিশ্চয় তা ধীরে ধীরে শক্তিসঞ্চয় করে সর্বাত্মক হয়ে উঠেছে। তার প্রত্যক্ষ কোনো বিবরণ দস্তয়েভস্কি রেখে যাননি, পরোক্ষ চিহ্নের মধ্য দিয়ে তার কিছু আঁচ পাওয়ার চেষ্টা করা যাক।

১৮৪৭ থেকে ১৮৪৯ (২৬ থেকে ২৮ বছর বয়স তখন তাঁর) দস্তয়েভস্কি সেন্ট পিটার্সবার্গ-এর পেত্রাসেভস্কি গোষ্ঠীর আলোচনায় অংশ নিতে শুরু করেন। এই গোষ্ঠী সাধারণভাবে রাশিয়ার ভূমিদাসত্ব (serfdom) প্রথা উচ্ছেদ করে কৃষকদের মুক্ত করার লক্ষ্যে নানা আলোচনা ও রাজনৈতিক পদক্ষেপ সম্পর্কে পরিকল্পনা করতো। চরম জঙ্গী ও কম্যুনিস্ট পথের প্রস্তাবক থেকে ধীর সংস্কারের পথের প্রস্তাবক অবধি নানা ধারার মতাবলম্বী এর মধ্যে ছিলো, দস্তয়েভস্কি এর গুপ্ত কেন্দ্রীয় সমিতির সদস্য ছিলেন। ১৮৪৯ সালের ২৩শে এপ্রিল জার-এর পুলিশবাহিনী দস্তয়েভস্কি ও পেত্রাসেভস্কি গোষ্ঠীর আরো কিছু সদস্যকে গ্রেফতার করে। তাঁদের অপরাধ জারে বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা। তাঁদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ২২শে ডিসেম্বর সেমিয়োনোভস্কি স্কোয়ার-এ নিয়ে এসে সেই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার জন্য তাঁদের সার দিয়ে দাঁড় করানো হয়, উল্টো দিকে দাঁড়ানো বন্দুকধারী পুলিশরা তাদের বন্দুক উঁচিয়ে ধরে। কিন্তু নাটকীয়ভাবে ঠিক গুলি ছোঁড়ার আগের মুহূর্তে জার নিকোলাস-১-এর পক্ষ থেকে একটি ক্ষমা করে দেওয়ার বার্তা পড়ে শোনানো হয় যার মধ্যে মৃত্যুদণ্ড মকুব করে সাইবেরিয়ায় নির্বাসনের দণ্ড দেওয়া হয়েছে। এভাবে মৃত্যুর গন্ধ শুঁকে ফিরে আসার পরবর্তী চার বছর দস্তয়েভস্কি কাটান সাইবেরিয়ার বন্দিশালায়, তারপর বাধ্যতামূলকভাবে সামরিক বাহিনীতে বেগার কাটার পর মুক্তি পান।

২৮ বছর বয়সে মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়া ও তারুণ্যের চারটি বছর সাইবেরিয়ার বন্দীশালার অন্ধকারে ডুবে যাওয়ার ধাক্কা তরুম দস্তয়েভস্কির চোখ থেকে স্বপ্ন-আদর্শ-নৈতিকতার কাজল মুছে দিয়েছিলো বলে মনে হতে পারে, কিন্তু না, ব্যাপারটা এতো সরলভাবে ঘটেনি। দস্তয়েভস্কি তাঁর ডায়েরিতে লিখেছেন: ‘আগেই আমাদের পড়ে শোনানো হয়েছিলো গুলি করে মৃত্যুদণ্ডের নির্দেশ, সমস্ত গুরুত্ব দিয়েই তা পড়ে শোনানো হয়েছিলো; শাস্তিপ্রাপ্ত আমরা প্রায় সবাই নিশ্চিত ছিলাম যে মৃত্যুদণ্ড বলবৎ হবে, বন্দুকের সামনে দাঁড়িয়ে আমরা মৃত্যুর প্রতীক্ষায় অন্তত দশটি মিনিট কাটিয়েছিলাম যা ভয়াবহ, ভয়ঙ্কর রকমের ভয়াবহ। সেই সম্ভাব্য অন্তিম মুহূর্তগুলোয়, আমাদের মধ্যে কেউ কেউ (এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত) প্রবৃত্তিগতভাবেই নিজের মধ্যে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলো আর নিজেদের তখনও তরুণ জীবনটাকে দ্রুত ফিরে বিচার করে নিচ্ছিলো, আমাদের কোনো গুরুতর কাজের জন্য আমরা হয়তো কেউ অনুশোচনা বোধও করছিলাম (যে ধরনের কাজের দাগ গোটা জীবনজুড়ে বিবেকে লেগে থাকে); কিন্তু যে কাজের জন্য আমাদের শাস্তি দেওয়া হয়েছে, আমাদের মস্তিষ্ক অধিকার করে থাকা যে চিন্তা-ভাবনা-ধারণার জন্য আমাদের দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে, তা কোনো অনুশোচনা দাবি করে বলে আমাদের মনে হয়নি, কেবল তাই নয়, তা যেন আমাদের পরিশুদ্ধ করে তুলেছে বলে আমাদের মনে হয়েছিলো, মনে হয়ছিলো যে তা আমাদের এমন এক শহিদত্ব দান করেছে যার জন্য আরো অনেক কিছুই হয়তো ক্ষমা করে দেওয়া হবে! একটা দীর্ঘ সময় ধরেই এই বোধ টিকে ছিলো। বন্দীশালায় নির্বাসনের বছরগুলো সেই বোধকে ভাঙতে পারেনি, চরম দুর্ভোগও তা ভাঙতে পারেনি। কোনো কিছুই সেই বোধকে ভাঙতে পারেনি, বরং এই প্রত্যয় আমাদের উজ্জাবিত করেছে যে আমাদের দায়িত্ব আমরা পালন করতে পেরেছি।’ সুতরাং, মৃত্যুর মুখোমুখি হোয়া বা বন্দীত্ব-নির্বাসনের অভিজ্ঞতা এক ধাক্কায় আদর্শ, নৈতিকতা ও পবিত্র কর্তব্যের বোধকে ভেঙে দেয়নি, বরং আপাতভাবে তাকে আরো জোরদারই করেছিলো। ডায়েরির একাধিক জায়গায় দস্তয়েভস্কি লিখেছিলেন যে বন্দীত্বকালে এই আশা তাঁকে উজ্জীবিত রেখেছিলো যে মুক্তি একদিন আসবেই, আর তখন তাঁর আদর্শনৈতিকতা নিয়ে পবিত্র করতব্যপালনে আরো কার্যকরী ভূমিকা নেওয়ার সুযোগ তাঁর সামনে আসবে।

মুক্তি পাওয়ার পর দস্তয়েভস্কি বিপুল উদ্যমে আবার লেখা শুরু করলেন। এই সময়ে তাঁর লেখাগুলোর মধ্যে প্রধান একটি হলো ‘দি ভিলেজ অফ স্তেপানচিকোভো অ্যান্ড ইটস ইনহ্যাবিট্যান্টস’ (১৮৫৯)--- সেখানেওআদর্শ, নৈতিকতা ও মঙ্গলবোধের জয়ের সরল উপাখ্যানই শোনানো হলো। উপাখ্যানটির খলনায়ক ফোমা ওপিস্কিন একজন চতুর, স্বার্থপর, ষড়যন্ত্রী বুদ্ধিজীবী যে স্তেপানচিকোভো গ্রামটির প্রধান অভিজাত পরিবারটিতে আশ্রয় নিয়ে দুরভিসন্ধিমূলক নানা ছক কষে ছদ্ম-নৈতিকতার আবরণের আড়ালে ক্ষমতা ও আধিপত্য বিস্তার করতে চাইছিলো। নির্ধারক এক মুহূর্তে পরিবারের সরল দয়ালু কাকা তার জড়তা ঝেড়ে ফেলে এক ধাক্কায় ফোমা ওপিস্কিন-কে সেই বাড়ি এবং সেই গ্রাম থেকেই বের করে দেয়। সবচিছুর মধুর পরিসমাপ্তি ঘটে। কিছুদিন পর ফোমাও তার চরিত্র কিছুটা শুধরে সেই গ্রামে ফিরে এসে আবার আশ্রয় পায়। সরল দয়ালু মানুষের আত্মশক্তি জাগরণের মধ্য দিয়ে সমস্ত ছদ্ম-নৈতিকতা ছদ্ম-জ্ঞানের নাগপাশ ছিঁড়ে সর্বমঙ্গলের এমন আশা দস্তয়েভস্কি-র রচনাজগতে একটি বিরল ব্যতিক্রম, আগে বা পরে তা আর ফিরে আসেনি। তাই মনে হয় না যে দস্তয়েভস্কির ভিতরের কোনো সবল বিশ্বাস এখানে ব্যক্ত হচ্ছে। বরং, মনে হয় যে এটা বুঝি এক ধরনের পরীক্ষানিরীক্ষা, নিজের মধ্যের বিশ্বাসজগতে তৈরি হওয়া জটিলতাগুলো উপেক্ষা করে সরল আশার একটি অবস্থানে থাকা যায় কি না তার পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় যে দস্তয়েভস্কি টিকতে পারেননি, তা তো তাঁর পাতালবাসীর আর্তচিৎকারের মধ্য দিয়ে আমরা আগেই দেখেছি। কিন্তু বিশ্বাসের জগতে তৈরি হওয়া এই জটিলতাগুলো কী, যেগুলো স্তেপানচিকোভোর কাল্পনিক সরল ছবির নীচে তিনি ঢেকে রাখতে চেয়েছিলেন? খুঁজে দেখার জন্য দস্তয়েভস্কি-র ‘দি হাউজ অফ দি ডেড’ (১৮৬০ থেকে ১৮৬২ সাল সময়পর্যায়ে ‘ভ্রেমিয়া’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিলো) লেখাটির শরণাপন্ন হওয়া যাক, যেখানে তিনি তাঁর বন্দীশিবিরের অভিজ্ঞতার প্রতিরূপ নির্মাণ করেছেন।

‘দি হাউজ অফ দি ডেড’ শেষ হচ্ছে এই কথাগুলো দিয়ে: ‘এইসব দেওয়ালগুলোর ভিতরে বিনা প্রয়োজনে কতো না যৌবনকে কবর দেওয়া হয়েছে, বিনা প্রয়োজনে কতো না সবল ক্ষমতাকে বরবাদ করা হয়েছে! সবশেষে, সত্যের গোটাটাই বলা উচিত; ওই চাপা-পড়া মানুষগুলো ছিলো ব্যতিক্রমী মানুষ। সম্ভবত তারা ছিলো আমাদের দেশের লোকেদের মধ্যে সবচেয়ে প্রতিভাধর, সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিনিধি সব। কিন্তু তাদের বিপুল শক্তি অপব্যয়িত হয়েছে; অস্বাভাবিকভাবে, অন্যায়ভাবে, পুনরুদ্ধারের কোনো সম্ভাবনা না রেখে অপব্যয়িত হয়েছে।’ কাদের দস্তয়েভস্কি তাঁর সমসময়ের সবচেয়ে প্রতিভাধর ও শক্তিশালী প্রতিনিধি বলছেন? বন্দীশিবিরের রাজনৈতিক বন্দীদের, নাকি, খুন-চুরি-র মতো অপরাধ করা সাধারণ বন্দীদের। অসতর্ক পাঠে মনে হতে পারে যে দস্তয়েভস্কি রাজনৈতিক বন্দীদের কথাই বলছেন, কারণ তিনি নিজে ছিলেন সেই রাজনৈতিক বন্দীদের একজন এবং কিছুক্ষণ আগেই দেখেছি যে তিনি হাজার দুর্ভোগ সত্ত্বেও আদর্শনৈতিক কর্তব্য পালনে তাঁদের অটল সংকল্প ও অনড় প্রত্যয়ের কথা বলেছেন তাঁর ডায়েরিতে। কিন্তু ‘দি হাউজ অফ দি ডেড’ একটু নিবিড়ভাবে পড়লে বোঝা যায় যে তা নয়, তিনি তাঁর মতো রাজনৈতিক বন্দীদের কথা এখানে বলছেন না, তিনি খুন-চুরি-করে আসা সাধারণ বন্দীদেরকেই ব্যতিক্রমী, সবচেয়ে প্রতিভাধর ও শক্তিশালী বলছেন। কেন একথা বলছি তা আরেকটু খুলে বলা যাক।

‘দি হাউজ অফ দি ডেড’-এ রাজনৈতিক বন্দীদের যে প্রতিরূপ দস্তয়েভস্কি এঁকেছেন তা তাদের কোনোভাবেই মহিমাণ্বিত করে না। বারবার দেখা যায় যে নিজের মত ও অধীত আদর্শকে অভ্রান্ত ও সর্বশ্রেষ্ঠ হিসেবে জাহির করার জন:, এবং সেই সুবাদেই সে নিজে যে জ্ঞান-ন্যায়বোধ-কর্তব্যবোধের পরাকাষ্ঠায় উচ্চস্থানীয় তা নিশ্চিত হোয়ার জন্য তারা ছোটোখাটো প্রসঙ্গ ধরেও নিজেদের মধ্যে অন্তহীন ঝগড়াঝাটিতে জড়িয়ে যাচ্ছে, একে অপরকে আড়চোখে মাপছে, দুর্বলতা খুঁজে নিয়ে ঘায়েল করার জন্য মুখিয়ে থাকছে, অতি সাধারণ সহযোগিতার দিকগুলো থেকেও নিজেদের গুটিয়ে রাখছে। সাধারণ বন্দীরাও এই কারণে এই রাজনৈতিক বন্দীদের ভালো চোখে দেখে না, বলা যায়  ঠিক সইতে পারে না, মনে করে যে তারা কেবল অকম্মার ঢেঁকি, জীবনের সাধারণ কাজগুলো নিষ্পন্ন করার প্রাথমিক ক্ষমতাটুকুও তাদের নেই। একজন রাজনৈতিক বন্দী হিসেবে দস্তয়েভস্কিকেও যে সাধারণ বন্দীরা এই চোছেই দেখতো, তার নানা নিদর্শন ‘দি হাউজ অফ দি ডেড’ জুড়ে ছড়িয়ে আছে। এছাড়াও ছিলো আরেকটি বিষয়। রাজনৈতিক বন্দীরা নিজেদের দেখতো উচ্চমার্গের প্রতিনিধি হিসেবে এবং সেই উচ্চ স্থান থেকে তলাকারও সবচেয়ে তলার হতভাগা বা মনুষ্যেতরতে পরিণত হওয়া অভাগা হিসেবে সাধারণ বন্দীদের দেখতো। আদর্শনৈতিকতার বিধান মেনে দয়া-অনুকম্পার চোখে এই তলাকার মানুষদের উদ্ধার করার কর্তব্য তাদের উপরই বর্তেছে, তলাকার অভাগাদের নিজেদের মঙ্গল নিজেরা করার মতো কোনো শক্তি-বুদ্ধি-ক্ষমতা নেই, রাজনৈতিক বন্দীদের সাধারণ মনোভঙ্গি ছিলো এইরকম। এই দয়া-অনুকম্পার মধ্যে যে ঘৃণা মিশে আছে তা সাধারণ বন্দীরা স্বাভাবিকভাবেই টের পেতো আর তাই তারাও ঘৃণাভরে এই উপর-থেকে-বাড়ানো দয়া-অনুকম্পার হাত প্রত্যাখ্যান করতো। ‘দি হাউজ অফ দি ডেড’-এ দস্তয়েভস্কির এই পর্যবেক্ষণও উঠে এসেছে। ফলে দস্তয়েভস্কি-র নিজের ভিতরের রাজনৈতিক-সম্ভ্রান্ত-সত্তাটি ধাক্কা খাচ্ছিলো। যে তলাকারও সবচেয়ে তলার মানুষদের জন্য শিক্ষিতজনেদের চক্ষে অশ্রু সঞ্চার করে, দয়া-অনুকম্পা-জারিত ভ্রাতৃত্ববোধ জাগিয়ে উদ্ধারকাজের মহান নৈতিকতায় তিনি নিজ আত্মসত্তার কৌলীণ্য নির্মাণ করেছিলেন, সেই নির্মিতিতে ফাটল দেখা দিচ্ছিলো। সেই তলাকার তলার মানুষজনরা কীভাবে তাঁদের মতো কুলীনদের দেখে ও কার্যত প্রত্যাখ্যান করে, এই বুঝি প্রথম তা তিনি বুঝতে শুরু করলেন এই সাধারণ বন্দীদের সঙ্গে সহবাসের সুবাদে। আর, তাঁর মধ্যের কৌলীণ্য-নির্মিতিতে ফাটল ধরেছিলো বলেই দয়া-অনুকম্পা-মুক্ত খোলা চোখে তিনি সাধারণ বন্দীদের দেখতে শুরু করলেন। তিনি দেখলেন যে তারা নিজেদের হতভাগা-অভাগা বলে মনে করে না, তাদের আত্মসত্তা-নির্মাণেও নিজস্ব কৌলীণ্যের ছাপ আছে, অপরাধ করার ঘটনাগুলোকে জীবনের দু-একটি ঘটনা/দুর্ঘটনা-মুহূর্ত হিসেবে তারা দেখে যা কোনোভাবেই তাদের গোটা জীবন ও জীবনবোধকে নিয়ন্ত্রিত করে না, জীবন সবসময় যে অতর্কিত চমক নিয়ে হাজির হয় তার মুখোমুখি হতে তারা দ্বিধা করে না, যন্ত্রণা যে জীবনযাপনেরই একটি অংশ এই দার্শনিক বোধ নিয়ে তারা যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাওয়ার শক্তি আহরণ করেছে, অকারণ কান্নাকাটি করে সর্বমঙ্গল বা সর্বসুখের কল্পনায় ভর করে তারা জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে না। দস্তয়েভস্কির মনে হয়েছিলো যে জীবনের মুখোমুখি হওয়ার জন্য এরাই বেশি সক্ষম, জীবনযাপনের রুক্ষ প্রান্তরে একে অপরের হাত ধরা, প্রকৃতই জীবনলগ্ন প্রীতি-সহানুভূতি-ভালোবাসার প্রকাশ ঘটাতেও এরাই বেশি সক্ষম। দস্তয়েভস্কির চোখ থেকে যেন জ্ঞান-আদর্শ-নৈতিকতার ঠুলি খসে পড়েছিলো, ‘মানবতাবাদ’-এর অবরোহমার্গী (a priori) স্থির গুণাবলীর খাপে পুরে মানুষকে দেখা নয়, এই প্রথম যেন তিনি খোলা চোখে খোলা মনে প্রত্যক্ষ সংসর্গের মধ্য দিয়ে মানুষ দেখলেন। আর তাঁর মনে হলো যে তাঁর মতো যারা আদর্শনৈতিক কৌলীণতা দিয়ে আত্মসত্তার প্রাসাদ নির্মাণ করেছে, তারা আসলে সেই প্রাসাদে বন্দী হয়ে নিজেদের পক্ষাঘাতগ্রস্ত করে ফেলেছে, জীবনের অনির্দিষ্ট অহৈতুকী বন্ধুরতার মুখোমুখি হয়ে আপন সক্রিয়তার ক্ষমতাকে জাহির করার শক্তি তাদের নেই, তাদের জীবন সর্বঅর্থেই শুকিয়ে গিয়েছে। দস্তয়েভস্কি তাই এতোদিন যাদের তলাকার তলার অভাগা হিসেবে চিত্রিত করে এসেছিলেন, আজ তাদেরই তিনি মানবসমাজের সবচেয়ে প্রতিভাধর, সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিনিধি হিসেবে চিহ্নিত করলেন।

সাধারণ বন্দীদের মানবসমাজের সবচেয়ে শক্তিশালী ও প্রতিভাধর প্রতিনিধি হিসেবে চিহ্নিত করার মধ্য দিয়ে দস্তয়েভস্কি কি তাঁর আদর্শের স্থানে পুরোনো নায়ক (আদর্শনৈতিকতার কৌলীণ্যে উজ্জ্বল বুদ্ধিজীবীদের) সরিয়ে নতুন নায়ক (তলাকার প্রবৃত্তি ও আবেগ তাড়িত মানুষ) বসালেন? মানবতাবাদী অবরোহমার্গী দৃষ্টিভঙ্গিকে বিসর্জন দিয়ে জীবন সম্পর্কে নতুন ও সঠিকতর দৃষ্টিভঙ্গিতে উপনীত হলেন? না, বিষয়টি এতো সরল নয়. পুরোনো ভেঙে পড়লেও, তখনই তা বিসর্জিত হয়ে যায় না। নতুনও মুহূর্তেই স্বয়ংসম্পূর্ণ রূপ ধরে সামনে এসে হাজির হয় না। পুরোনো বিশ্বসমতে তৈরি এতদিনকার নিরাপদ দাঁড়াবার জায়গা ধ্বসে যায়, কিন্তু জাদুবলে কোনো নতুন নিরাপদ দাঁড়াবার জায়গা তৈরি হয় যায় না। পায়ের নীচের মাটি সরে যাওয়ার পর সংশয়যন্ত্রণা ঘিরে ধরে, কখনও চোরাবালি গিলতে আসে, কখনও রুক্ষ পাথরে পা রক্তাক্ত হয়, কখনও অবারিত পতনের ভরহীনতা আতঙ্ক ধরায়। পুরোনো বিশ্বাসগুলো ভেঙে যাওয়ার পর, কোনোকিছুতে বিশ্বাস করা নয়, সবকিছুকে সন্দেহ করাই প্রবৃত্তি হয়ে ওঠে। সর্বমঙ্গল, সর্বসুখ, দয়া, আত্মত্যাগ--- পুরোনো এই স্বর্ণখণ্ডগুলো যখন নকল বলে প্রমাণিত হয়, মহত্ত্বের এই আভরণগুলোর নীচ থেকে ক্রূর আত্মকেন্দ্রীক অপরবিদ্বেষী ক্ষমতার নখ-দাঁতগুলো বেরিয়ে আসে, তখন ক্রূরতা-হিংসা-কেই মৌলিক বলে মনে হয়, আবার তা সম্পূর্ণ মেনেও নেওয়া যায় না। সন্দেহ হতে থাকে, ভুল করছি না তো? সংশয়ীর এই আর্তচিৎকার আমরা ‘নোটস ফ্রম দি আন্ডারগ্রাউন্ড’-এই দেখেছি। আর এই সংশয়ী যন্ত্রণা জবর সিম্ফনির মতো বহুস্বরে বেজে উঠলো দস্তয়েভস্কির পরবর্তী মহান উপন্যাসগুলোয়। এবার সেই যন্ত্রণার শিল্পরূপগুলোর দিকে চোখ ফেরানো যাক।

১৮৬৬ থেকে ১৮৮০--- এই ১৫ বছরের মধ্যে দস্তয়েভস্কি-র চারটি মহান উপন্যাস ‘দি রাশিয়ান মেসেঞ্জার’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিলো। প্রথমে ১৮৬৬ সালে ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’, তারপর ১৮৬৮-৬৯ সালে ‘দি ইডিয়ট’, তারপর ১৮৭১-৭২ সালে ‘দি পজেজড’, আর ১৮৭৯-৮০ সালে দস্তয়েভস্কি-র শেষ উপন্যাস ‘দি ব্রাদারস কারামাজভ’।

‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’ উপন্যাসে কেন্দ্রীয় চরিত্র রাসকোলনিকভ, পারিবারিক অর্থনৈতিক অসঙ্গতির টানাপোড়েনে নাজেহাল এক ছাত্র, অন্যদিকে সে নিজ আদর্শবোধের গরিমায় আত্মগর্বী। ফরাসি ইউটোপিয় সমাজবাদ এবং বেন্থামের উপযোগিতাবাদের উপর ভর করে যুক্তি-বিজ্ঞান-প্রগতির জয়গান গেয়ে সমাজের হিতসাধন করার যে অভিপ্রায় প্রবৃত্তিগত আবেগ-সহানুভূতি-দয়া-কে পশ্চাৎপদের দুর্বলতা বলে চিহ্নিত করে সমাজ-পরিবর্তনের বৈজ্ঞানিক মতবাদ হিসেবে নিজেকে জাহির করছিলো, তা রাসকোলনিকভ-কে অধিকার করে বসেছে। উচ্চ জ্ঞান ও বিপ্লবী অভিপ্রায়ের বাহক হিসেবে তার বেঁচে থাকার অধিকার সাধারণ এক বন্ধকী-কারবারি বুড়ির বা বুড়ির ধর্মপ্রাণা বোনের চেয়ে অনেক বেশি, তাই সেই বুড়ি ও তার বোনকে হত্যা করে তাদের জমানো অর্থ গায়েব করে নিজের স্বাধীন সক্রিয় জীবন যাপনের ব্যবস্থা করার মধ্যে কোনো নৈতিকতার স্খলন নেই, বরং নৈতিকভাবে উচ্চতর অধিকারসম্পন্নের অধিকারপ্রতিষ্ঠার অনাবেগী প্রয়াস আছে। রাসকোলনিকভ এভাবে তার আদর্শনৈতিক আত্মগরিমাকে অনাবেগী নির্ধারণে জীবনের উপর অধিক অধিকার দাবির যুক্তি করে তুলতে চেয়েছে। উপন্যাসটির একটি জায়গায় রাসকোলনিকব যার কাছে ধীরে ধীরে তার খুনকে যুক্তিযুক্ত বলে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, সেই জেরাকারী পরফরি পেত্রোভিচ মজা করে বলেন যে সৌভাগ্যবশত রাস্কোলনিকভের তত্ত্বটি তুলনায় নিরাপদ, কারণ একজন (বা দুজন) বৃদ্ধা খুন হয়েছে মাত্র, আরো সাধারণিকৃত হয়ে এর প্রয়োগ হলে তো মারাত্মক…। এই সাধারণিকৃত প্রয়োগ ছিলো পেত্রোভিচের আশঙ্কার বিষয়, কিন্তু তারপর পৃথিবী বারবার তা নিষ্ঠুর বাস্তব হয়ে উঠতে দেখেছে। শ্রমিকশ্রেণির বৈজ্ঞানিক মতবাদ রূপায়িত করার নামে স্তালিন জমানার গুলাগ বা ইউক্রেনিয়দের উপর চাপানো হোলোদোমোর (খাদ্য কেড়ে নিয়ে গণনিধন), জাতিশ্রেষ্ঠত্বের বৈজ্ঞানিক মতবাদ রূপায়নের নামে হিটলারের ইহুদিনিধন ও কনসেনট্রেশন কা্যম্পের মৃত্যুশিবির, ‘বিকাশ’ (‘development’) ঘটানোর বৈজ্ঞানিক নিদানপত্র হাতে নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একের পর এর দেশে চালানো সন্ত্রাস ও গণহত্যা, অধুনা ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে প্রবতিবাদী লড়াইয়ের নামে ইজরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গাজায় চালানো গণহত্যা… এ তালিকা শেষ হওয়ার নয়। এর বীজ ব্যক্তিমানুষের চেতনায় ও আত্মসত্তা-নির্মাণে কীভাবে সেঁধিয়ে থাকে, কীভাবে মতবাদিক শ্রেষ্ঠত্বের মধ্য দিয়ে ক্ষমতার যুক্তি নির্মাণের মধ্য দিয়ে তা ডালপালা ছড়ায়, দস্তয়েভস্কি তা রাসকোলনিকভের মধ্য দিয়ে এঁকেছেন। একই সঙ্গে তিনি এঁকেছেন যে এই মতবাদিক দর্প এক আঘাতে জীবনের সমস্ত যন্ত্রণা-অসঙ্গতি দূর করে স্বপ্নের জীবন বানানোর বড়াই করলেও, তা কেবলমাত্র বড়াই-ই বটে, জীবনের কোনো যন্ত্রণা-অসঙ্গতিকে তা দূর করতে পারে না, বরং সংকটরেখাগুলোকে আরো ব্যাপক, আরো গভীর করে তোলে। রাসকোলনিকভ তার আত্মশ্রেষ্ঠত্বের বড়াই সত্ত্বেও তার বোন দুনিয়া বা তার প্রেমাস্পদ সোনিয়া কারো জীবনেরই কোনো সমস্যায় নিরসন বা উপশমের কোনো পথ দেখাতে পারে না, বরং যাকে সে তার করুণার পাত্র বলে ভেবেছিলো, যার ধর্মাশ্রয়ী মনোজগৎ নিয়ে তার নাক-সিঁটকানো ছিলো, সেই অভাগী পতিতা সোনিয়ার সমবেদনা-সহানুভূতিই তাকে শেষাবধি নিজের মনোবিকার থেকে বেরিয়ে আসার পথ করে দেয়।

‘ইডিয়ট’-এ সম্পূর্ণ বিপরীত একটি চরিত্র, সোজা কথায় যাকে সদর্থক বা ভালো মানুষ বলা যায়, তাকে ঘিরে দস্তয়েভস্কি তাঁর অনুসন্ধান চালিয়েছেন। চরিত্রটি প্রিন্স মিশকিন। অভিজাত বংশের, কিন্তু বর্তমানে রোগ ও অর্থসংকটে বিব্রত এই চরিত্রটি গভীরভাবে ধার্মিক, খ্রিস্টিয় আদর্শের প্রেম-সহানুভূতি-আত্মদান-কেই সে ব্রত হিসেবে অবলম্বন করেছে, মতাদর্শিক শ্রেষ্ঠত্বের উচ্চ মাচায় গর্বিত আত্মসত্তা নির্মাণের কোনো চেষ্টা তার নেই, তার সংস্পর্শে এলে অন্যরা যেন সহমর্মিতা ও সহিতত্বের কোমল চোঁয়া পায়। খ্রিস্টের আদর্শ যেভাবে রোম-সাম্রাজ্যের ক্ষমতাবিস্তারের হাতিয়ার হয়ে উঠে তার আদি রূপ হারিয়েছে মিশকিন তার বিরোধী, খ্রিস্টের ধর্মকে সে প্রাতিষ্ঠানিকতার নিগড়ে দেখতে চায় না, সহজ জীবনপ্রবৃত্তির মধ্যে পুনরাবিষ্কার করতে চায়। তার চারপাশের যে সমাজ অর্থ ও ক্ষমতার দাপটকেই নিয়ম বলে মেনে নিয়ে তার মাধ্যমেই জীবনের সমস্ত কামনা-বাসনা-কে দখল করে নিতে উদগ্র হয়ে উঠেছে, সেই সমাজের চোখে মিশকিন ক্রমশ নির্ধারক ভূমিকা নিতে অক্ষম এক ‘নির্বোধ’ রূপে প্রতিপন্ন হয়, তার গুণগুলোই যেন তার অপারগতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু এই অপারগতা কি কেবল অর্থ ও ক্ষমতার পাকে বিকৃত হয়ে যাওয়া সমাজের চোখেই প্রতিপাদিত বিষয়? মিশকিন-এর নিজের অনুভব কী? অভিভাবকের যৌনলালসার শিকার হওয়া নাসতাসিয়া ফিলিপোভনা, সমাজের চোখে পতিতা বলে চিহ্নিত হয়ে যাওয়া নাসতাসিয়া ফিলিপোভনা যখন বিমূর্ত প্রেম-দয়া নয়, তার জীবনাকাঙ্ক্ষাকে মর্যাদা দিতে পারে এমন প্রেম-এর প্রত্যাশী হয়ে তার মুখের দিকে চাইলো, তখন মিশকিন কেন কেবল উদ্ধারকারীর দয়া ছাড়া আর কিছু দিতে পারলো না? আবেগ ও প্রবৃত্তির প্রকাশলাভের সহজ পথগুলো কি সব আদর্শনৈতিক করতব্যবোধের পলি জমে রুদ্ধ হয়ে রইলো না? বারবার কি তাই নাসতাসিয়ার কাছে রোগোঝিন-এর আবেগী অকপট আগ্রাসী ভালোবাসাই শ্রেয় বলে মনে হলো? একইভাবে, আদর্শনৈতিক কর্তব্যবোধের নির্দেশ-অনুসরণের তাড়সে জবুথবু হয়ে যাওয়া স্বতঃক্রিয়া, বা পক্ষাঘাতগ্রস্ত স্বতঃক্রিয়ার ক্ষমতাই আগলায়া ইভানোভনা-র সঙ্গে তার সম্পর্ককেও দরকোঁচা মেরে দিলো। মিশকিন-এর বিপরীত ছায়া হিসেবে এই উপন্যাসে দস্তয়েভস্কি হাজির করেছেন ইপোলিত চেরেনতিয়েভ-এর চরিত্রটি, যে নিরীশ্বরবাদ ও ধ্বংসাত্মকতায় (nihilism) বিশ্বাসী। বিশ্বাসের বৈপরীত্য সত্ত্বেও ইপোলিত ও মিশকিন দুজনেই আদি সমাজ ও জীবন রূপের ক্ষয়ের প্রশ্নটি বিচার করছে এবং দুজনেই এই ক্ষয়ের সামনে সমানভাবে অক্ষম, আদর্শের বাতিস্তম্ভে রূপান্তরিত হয়ে তারা জীবনের অনির্দিষ্ট অহৈতুকী প্রবাহ থেকে বিচ্ছিন্ন, এই বিচ্ছিন্নতাই অসুখ হয়ে তাদের ঘাড়ে চেপে বসেছে।

‘ইডিয়ট’-এর বছর দুয়েক পরেই দস্তয়েভস্কি লেখেন ‘দি পজেজড’। ‘পজেজড’ বা ‘ভরগ্রস্ত’ কারা--- নব প্রজন্মের এক দল যারা রাজনৈতিক পথে সমাজ বদলে দেওয়ার নামে ষড়যন্ত্র-হিংসা-আস্ফালন-অহংকার-এর পাঁকে ডুবে গিয়ে সেটাকেই স্বর্গের স্বর্ণদ্বার মনে করছে। দস্তয়েভস্কি দেখান যে একদিকে পরম্পরাগত মূল্যবোধ, সমাজবন্ধন, পরিবার-সম্পর্ক ক্ষয় পেয়ে প্রায় শূন্যতায় এসে দাঁড়িয়েছে, আর এই শূন্যতার মধ্যে পশ্চিমী বিজ্ঞান-যুক্তিবাদের নেশা নব প্রজন্মের শিক্ষিত অংশকে মাতাল করে দিয়েছে। এই নব প্রজন্ম ঠাউর করে বসেছে যে বিজ্ঞান, যুক্তিবাদ ও বৈপ্লবিক মতবাদের অধিকারী হওয়ার কারণে তারাই অভ্রান্তভাবে সমাজ, দেশ, পৃথিবী, এমনকি বিশ্বের বিবর্তনের নিয়ম জেনে ফেলেছে; ফলে তাদের অভিপ্রায় অনুযায়ী সমাজ-দেশ-পৃথিবী-বিশ্ব-কে বদলানো যাবে, এবং তাদের অভিপ্রেত এই পথটিই একমাত্র পথ। সুতরাং রাজনৈতিক সক্রিয়তার নামে তারা সোজা বা বাঁকা, খারাপ বা ভালো, যে কোনো উপায়ে বর্তমান ব্যবস্থাকে ধ্বংস করা, নিজেদের হাতে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা নিয়ে আসা এবং নিজেদের নির্দেশ মেনে অন্যদের চলতে বাধ্য করার একটা ব:বস্থা তৈরি করতে চায়। নিজেদের অভিপ্রায়ের ন্যায্যতা তাদের কাছে এতোই প্রশ্নাতীত যে তা পূরণের জন্য নিকৃষ্টতম উপায়টি অবলম্বন করাও তাদের কাছে আদর্শে অটল থাকার পরিচয়। একটি কাল্পনিক রুশ শহরে রাজনৈতিক আদর্শবাদী পিওতোর ভেরখোভেনস্কি ও তার সংগঠনের ধ্বংসাত্মক ও ট্রাজিক কার্যকলাপের ছবি আঁকার মধ্য দিয়ে দস্তয়েভস্কি মতবাদিক শ্রেষ্ঠত্বের নেশায় আচ্ছন্ন বিপ্লবী প্রচেষ্টা পরবর্তী এক শতক জুড়ে গোটা পৃথিবীতেই যে ট্রাজেডি দেগে যাবে, তার যেন এক আগাম পূর্বাভাস রচনা করে গিয়েছিলেন।  

আদর্শনৈতিক মূল্যবোধের বিবিধ বিপরীত ধরন কীভাবে অহংসর্বস্ব ইঁদুরের গর্তে মানুষকে সেঁধিয়ে দেয়, আবেগ-প্রবৃত্তিকে হয় পক্ষাঘাতগ্রস্ত করে নয়তো নেশাতুর ভরগ্রস্ত অতিসক্রিয় করে তোলে, সর্বমঙ্গলের ঘোষক সেজে ট্রাজেডিকে গভীরতর করে--- এই ধূসর অথচ বহুমাত্রিক ছবিগুলো আঁকতে আঁকতে দস্তয়েভস্কি এসে পৌঁছন তাঁর শেষ কাজ ‘দি ব্রাদারস কারামাজভ’-এ। তাঁর সংশয়ী যন্ত্রণার সিম্ফনির এই শেষ বিস্তার (last movement)। আগের বিস্তারগুলোর সুরের রেশ ধরে পূর্ণাঙ্গতর পুনর্উপস্থাপনা এখানে রয়েছে। যেমন, আলিওশা বা আলেক্সেই ফিওদোরোভিচ কারামাজভ-কে মিশকিন-এর এক পূর্ণতর রূপ বলা যায়, দিমিত্রি ফিওদোরোভিচ কারামাজভ-কে রোগোঝিন বা সাইবেরিয়ার বন্দীশালার সাধারণ বন্দীদের একজনের পুনর্উপস্থাপনা বলা যায়, গ্রুশেঙ্কা-র মধ্যে সোনিয়া ও নাসতাসিয়া-র ছায়া খেলা করে। কিন্তু সম্পূর্ণ নতুন একটি স্বর এখানে দস্তয়েভস্কি হাজির করেছেন ইভান ফিওদোরোভিচ কারামাজভ-এর মধ্য দিয়ে, এবং এই নতুন স্বরটি সিম্ফনির এই শেষ বিস্তারটিকে প্রভাবিত করার মধ্য দিয়ে গোটা সিম্ফনিটিকেই যেন অন্য মাত্রা প্রদান করেছে। ইভান ফিওদোরোভিচ কারামাজভ মঙ্গলময় ঈশ্বরে বিশ্বাস করে না, মানুষের মধ্যেও মৌলিক কোনো মঙ্গলাকাঙ্ক্ষার অস্তিত্বে বিশ্বাস করে না। সবকিছুকে সে সংশয়ের চোখে দেখে। বিশ্বজগৎ বা মানবজীবন কোনো পূর্বনির্দিষ্ট বিকাশ বা ক্ষয়ের গতিপথে ধাবিত বলে সে মনে করে না, উগৎ ও জীবনে কোনো সার্বিক নিয়ম কাজ করছে না বলে সে মনে করে। ঈশ্বর নেই, সার্বিক মঙ্গলময়তার কোনো পূর্বনির্দিষ্ট নির্ধারণ নেই, তাই নৈতিকতা (morality)-রও কোনো স্থির নির্ধারণ থাকতে পারে না। সবকিছুই তাই সম্ভব, সবকিছুই অনুমোদনযোগ্য। পূর্বনির্দিষ্ট মঙ্গলধারণা নীতি-নৈতিকতার রূপ ধরে আসলে ক্ষমতা-আধিপত্যের-ই কাঠামো বাঁধতে চায়। মানুষের মুক্ত অভিপ্রায় (free will) চর্চা করতে পারা যদি স্বাধীনতা হয়, তাহলে নীতি-নৈতিকতা কেবল বেড়ি মাত্র। সুখ বা মঙ্গল নয়, মুক্ত অভিপ্রায় চর্চার মধ্য দিয়ে যন্ত্রণার বন্ধুর পথে যাত্রাই স্বাধীন মানুষের নিয়তি। নিরন্তর ঘাত-প্রতিঘাতে এই ভাবনাগুলোই ইভানকে আলোড়িত করে। নিজের প্রক্ষিপ্ত প্রচ্ছায়া-র সঙ্গে যখন তার নিজের মধ্যে তর্ক চলে (ইভানের সঙ্গে শয়তানের সংলাপ বর্ণনাকারী অধ্যায়টি দ্রষ্টব্য), তখন নিজের প্রক্ষিপ্ত প্রচ্ছায়াকেই তার শয়তান (devil) বলে মনে হতে থাকে, ঈশ্বরহীন নিভু-আলোর নিমীলিত প্রান্তরে কেতাদুরস্ত সাজে সজ্জিত অমায়িক স্বভাবের এক শয়তান। মনে হয় দস্তয়েভস্কির নিজের বিশ্বাস-ভাঙন-পরবর্তী অনুসন্ধান তাঁর মৃত্যুর আগে এই ইভান কারামাজভের ভাবনাজগতে এসেই থেমেছিলো।

ইভান কারামাজভের বলা একটি আখ্যান বিধৃত করেই আমরা আপাতত এই আলোচনা শেষ করার দিকে যাব। ‘মহান দণ্ডমুণ্ডের কর্তা’ (The Grand Inquisitor’) নামে এই আখ্যানটি পরিচিত, যা ইভান একটি কবিতা হিসেবে লিখে আলিওশাকে শুনিয়েছিলো। কাল্পনিক আখ্যানটি ঘটছে স্পেন দেশে, যখন সেখানে ক্যাথলিক ধর্মে বিশ্বাসী নয় এমন সবাইকে ধর্মদ্রোহী বলে চিহ্নিত করে দণ্ডপ্রদান (খুন, নির্বাসন) করার জন্য ‘মহান দণ্ডমুণ্ডের কর্তা’ নিয়োগ করে সন্ত্রাস-বিভীষিকা কায়েম করা হয়েছে। যিশু তখন আবার স্পেনের সেভিল প্রদেশে ফিরে এসেছেন। তাঁর নানা জাদুকরী কাজ থেকে সেভিলবাসীরা বুঝতে পেরেছে যে ইনিই প্রভু যিশু। সাধারণজনেরা মহা আহ্লাদে তাঁকে সেভিল ক্যাথিড্রালে নিয়ে গিয়ে আদর-আপ্যায়নের বন্দোবস্ত করে, কিন্তু সেখানে এসে হাজির হয় মহান দণ্ডমুণ্ডের কর্তার পাঠানো বাহিনী, তারা ধর্মদ্রোহের অভিযোগে যিশুকে বন্দী করে নিয়ে যায়। দণ্ডমুণ্ডের করতা বিচার করে যিশুর  ধর্মদ্রোহ সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে দণ্ড ঘোষণা করেন যে পরের দিন যিশুকে পুড়িয়ে মারা হবে। তার আগের রাত যিশুকে বন্দীশালায় রাখা হয়। সেই রাতে মহান দণ্ডমুণ্ডের কর্তা যিশু-র সঙ্গে দেখা করতে আসেন। তিনি বলেন যে যিশুকে আর তাঁদের চার্চের দরকার নেই, বরং যিশু এখন আবার ফিরে এলে তা তাঁদের চার্চের কাজেই বিঘ্ন হয়ে উঠবে। তাঁদের চোখে কোথায় যিশুর পতন ঘটেছে তা-ও তিনি ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন যে গত জীবনে মরুভূমিতে শয়তান এসে যিশুর সামনে তিনটে প্রলোভন তুলে ধরেছিলো: পাথরকে খাওয়ার রুটিতে পরিণত করার ক্ষমতার প্রলোভন, দেবদূতদের হাতে পরিত্রাণ পাওয়ার প্রলোভন এবং গোটা পৃথিবীর উপর শাসন কায়েম করার প্রলোভন। যিশু এই তিনটি প্রলোভনই প্রত্যাখ্যান করে তার পরিবর্তে স্বাধীনতা বেছে নিয়েছিলেন এবং মানুষদের কেও সেই স্বাধীনতাই অর্পণ করেছিলেন। দণ্ডমুণ্ডের করতার মতে এখানেই যিশু ভয়ঙ্কর ভুল করেছিলেন, মানুষের প্রকৃতি-প্রবৃত্তি তিনি বোঝেননি, ভোগ-পরিতৃপ্তি-ক্ষমতা প্রত্যাখ্যান করে স্বাধীনতাকেই গ্রহণ করার সহনক্ষমতা মানুষের নেই, ফলে তাঁর অর্পিত বস্তু যারা গ্রহণ করেছে চরম যন্ত্রণাভোগই হয়েছে তাদের নিয়তি। চার্চ তাই আর এখন যিশুর সঙ্গে নেই, যিশুকে ছেড়ে তারা এখন শয়তানের অনুসারী হয়েছে, শয়তানই চার্চের হাতে তুলে দিয়েছে সেইসব হাতিয়ার যা দিয়ে তারা মানুষকে চার্চের ধ্বজার নীচে জমায়েত করতে পেরেছে, সবার উপর এখন আর স্বাধীনতার ভার বহন করার দুর্বহ চাপ নেই, শক্তিমান চার্চ সেই ভার তাদের কাঁধ থেকে সরিয়ে নিয়েছে। দণ্ডমুণ্ডের কর্তার মতে এর ফলে মানুষ হয়তো অজ্ঞান অসার রয়ে যাবে, কিন্তু তাদের যন্ত্রণা ভোগ করতে হবে না, তাদের বিবেকও আর রক্তাক্ত হবে না, সুখে ও আনন্দে থাকবে তারা। দীর্ঘ বক্তব্য যখন শেষ হলো, এতোক্ষণ চুপ করে শ্রোতার ভূমিকায় থাকা যিশু নিঃশব্দে দণ্ডমুণ্ডের কর্তার বয়স্ক রক্তহীন ঠোঁটদুটোয় চুমো খেলেন। এই চুমো দণ্ডমুণ্ডের কর্তার হৃদয়টাকে আগুনের মতো ঝলসে দিলো, কিন্চতু সেই বৃদ্ধ কর্তা তাঁর ধ্যানধারণায় অটল থাকলেন। যিশুকে জেল থেকে বের করে ছেড়ে দিয়ে বললেন যে যিশু যেন আর কখনও না ফিরে আসেন।  যিশু নিঃশব্দে শহরের অন্ধকার গলিঘুঁজির মধ্যে মিলিয়ে গেলেন।

এই গল্প বলার পর ইভান প্রশ্ন করে আলিওশাকে: আলিওশা কি ইভানের ভাবনাজগতের জন্য ইভানকে পরিত্যাগ করতে চায়? আলিওশা কথায় কোনো উত্তর না দিয়ে ইভানের ঠোঁটে আলতো এক চুলো দিলো। খুশিতে ডগমগিয়ে উঠে ইভান বললো, ‘এটা টুকলিবাজি হলো, তবু ধন্যবাদ, অনেক ধন্যবাদ’। দুই ভাই এরপর বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো।

কখনও মৃত্যুর মতো শুকনো ঠোঁটে চুমো দিয়ে, কখনও অসেতুসম্ভব প্রেমের চুমো ঠোঁটে নিয়ে শিহরিত হয়ে জনপদের অন্ধকারে মিলিয়ে যাওয়াই দস্তয়েভস্কিদের জীবননাট্যের শেষ দৃশ:, তাঁদের কন্ঠ তখন নীরব থাকলেও মঞ্চ গমগম করে ওঠে অলক্ষিত থেকে ভেসে ওঠা তাঁদের স্বরে, নিৎশে সে স্বর বসিয়ে দিয়েছিলেন তাঁর সৃষ্টি জরাথুষ্ট্রের মুখে:

‘…বিরাট যে পাপ, তা-ই আমার বিরাট সান্ত্বনা, আর তাতেই আমার আনন্দ। এসব অবশ্য লম্বা কানেদের জন্য নয়। সব মুখেরও অধিকার নেই এ কথা আওড়ানোর। এসব অতি দূরবর্তী মিহি বস্তু। ভেড়াদের পা যেন তাদের কখনও ছুঁতে না পারে। উচ্চাসনের মানুষরা, তোমরা কি ভেবেছো যে তোমাদের হাতে যা বরবাদ হয়েছে তা আবার ঠিক করে দেওয়ার জন্য আমি এসেছি? নাকি দুর্দশাগ্রস্তরা ভেবেছো যে তোমাদের জন্য আরামদায়ক বিছানার ব্যবস্থা করার জন্য আমি এসেছি? অথবা সহজতর পথে ভুল করে যে পথ হারিয়েছো, তুমি কি ভেবেছো আমি তোমায় পথ দেখাবো? না! না! বারবার তিনবার--- না! আরো ঘন ঘন, আরো বেশি করে, তোমাদের মধ্যে যারা তুলনায় ভালো, তারা ধ্বংস হবে, সবকিছু আরো আরো কঠিন হয়ে উঠবে তোমাদের জন্য।…’

যন্ত্রণাই এখানে জীবনের আখর। সংশয়ই এখানে স্বাধীনতার চাবিকাঠি।

 

 

[দস্তয়েভস্কি-র বইগুলো আমি ইংরেজি অনুবাদে পড়েছি, তাই নামগুলো ইংরেজিতেই দিলাম। দস্তয়েভস্কি-র ডায়েরি থেকে উদ্ধৃত অংশগুলোর জন্য আমি লেভ শেস্তভ-এর কাছে ঋণী। লেভ শেস্তভ এই অংশগুলো, আরো এনেক অংশের সঙ্গে তাঁর লেখা ‘দস্তয়েভস্কি অ্যান্ড নিৎশে: দি ফিলোজফি অফ ট্রাজেডি’ (১৯০৩)-তে উদ্ধৃত করেছেন। লেভ শেস্তভের এই লেখাটির কাছে আমি আরো নানাভাবে ঋণী, কারণ এই লেখাটির সঙ্গে পক্ষে-বিপক্ষে বাদানুবাদ করতে করতেই আমার দস্তয়েভস্কি-পাঠ গড়ে উঠেছে। একদম শেষের জরাথুষ্ট্র-উক্তিটি নিৎশে-র ‘দাস স্পোক জরাথুষ্ট্র’ থেকে নেওয়া। সমস্ত উদ্ধৃতির বাংলা অনুবাদ আমার করা।--- বিপ্লব নায়ক।]

 

0 Comments
Leave a reply