ব্যাকরণ/ক্ষমতা এবং তার শাসনে বাংলা ভাষার দুর্গতি প্রসঙ্গে কিছু কথা

লিখেছেন:বিপ্লব নায়ক
ফুকো knowledge/power যৌগ নিয়ে আলোচনা করেছেন, তারই ছায়ায় এখানে ভারতীয় উপমহাদেশের ভাষা-পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাকরণ/ক্ষমতা যৌগের কুলজি (genealogy) আলোচনা করা হয়েছে এবং দ্বাংবিতীয় পর্লাবে ভাষার উপর এই যৌগের প্রভাব খতিয়ে দেখা হয়েছে।

 

 

ভূমিকা ওরফে কৈফিয়ত

আমি ভাষাবিজ্ঞানী/ভাষাবিদ/ভাষাতাত্ত্বিক কিছুই নই। সুতরাং ভাষা নিয়ে কোনো বিশেষজ্ঞ-জ্ঞান আমার নেই। আমি একজন ভাষা-ব্যবহারকারী মাত্র: লিখতে-পড়তে-শুনতে-বলতে আমায় ভাষা ব্যবহার করতে হয়। বানানের শুদ্ধতা বা সমতা নিয়ে বিধি নির্মাণ, বা, বর্তমান বিধির অসঙ্গতি-অসুবিধা নির্ণয় করে তার সংস্কার-সাধন, ব্যাকরণ তৈরি: এসব অতি বিশেষজ্ঞদের কাজ তা আমি মানি, সে কাজে মাথা গলাতেও আমি চাই না। ভাষার কালানুক্রমিক বা বিবর্তনমূলক চরিত্র নিয়ে যে ডায়াক্রোনিক তত্ত্ব অধুনা পশ্চিম থেকে আমদানি হয়েছে, তা যেমন আমার আয়ত্ত করে ওঠা হয়নি, তেমনই ভাষার সমকালীনতা বা এককালীনতা নিয়ে যে সিনক্রোনিক তত্ত্বের সমাহার তা-ও আমার আয়ত্তের বাইরে, মহামতি চমস্কি সাহেব-এর ‘সার্বজনীন ব্যাকরণের’ সার্বজনীনতা নিয়েও সন্দেহ আমার কিছুতেই কাটে না, আর এসব হদ্দমুদ্দ আয়ত্ত না করতে পারলে বানানবিধি-ব্যাকরণ নিয়ে যে বিদ্বজ্জনসমাজে মুখ খোলাই উচিত নয় তা আমি হাজারবার মানি। কিন্তু ভাষা-ব্যবহারকারী হিসেবে বিশেযজ্ঞ-জ্ঞানে ভূষিত বিধিনির্মাণোদ্যোগীদের সামনে নেহাত-ই বাচাল স্বরে কিছু অনধিকারীর উৎপাত তো করা যেতেই পারে, সেই বেদ-পুরাণ-মহাকাব্যের কালে মহর্ষি ঋষিদের ধ্যানভঙ্গ বা যজ্ঞ নষ্ট করার অধম পিশাচ-দানবরাও তো তেমন করতো। তেমনই এক অভিপ্রায় নিয়ে এই নিবন্ধের অবতারণা। মহর্ষি ঋষিরা চোখ না খুলে ধ্যানেই নিবিষ্ট থাকতে পারেন, আর নেহাত যদি চোখ খুলে দেখে/পড়ে-ই ফেলেন তো অগ্নিদৃষ্টি নাকি শাপাগ্নি নাকি খণ্ডনকারী ত্রিশূল--- কী নিক্ষেপ করেন তা দেখারও তো এক রোমাঞ্চ আছে! যাই হোক, এবার তাহলে শুরু করি। প্রথমে আমি আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশের কুলজি ঘেঁটে ব্যাকরণ/ক্ষমতা-র উদ্ভব নিয়ে যে-কটা কথা আমি জানি তা বলবো। তারপর যদি আপনাদের ধৈর্য টিকে থাকে, তাহলে এই ব্যাকরণ/ক্ষমতা-র দাপটে আমার মাতৃভাষা বাংলা ভাষার উপর ঘটা অনাচার নিয়ে কিছু বলার চেষ্টা করবো।

ভারতীয় উপমহাদেশে উচ্চারণ ও ব্যাকরণের শুদ্ধতা-সমতা নির্মাণ করে ভাষার একটি শুদ্ধ-প্রমিত রূপ নির্মাণের চেষ্টা অতি আদি কাল থেকেই শুরু হয়েছিলো বলে শোনা যায়। অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণ লিখেছেন:

আর্যদিগের প্রাচীনতম কালের প্রায় সমুদয় গ্রন্থই ছন্দোগ্রথিত। বেদের ব্রাহ্মণ প্রভৃতিতে সংস্কৃত-ভাষা-বিষয়ে ছন্দঃশাস্ত্র যে আবশ্যক তাহা উক্ত হইয়াছে। এই সময়ে শব্দশাস্ত্রেরও যে কিছু কিছু আলোচনা হইয়াছিলো ঐ সকল গ্রন্থে তাহারও যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। এদিকে বৈদিক সূত্রসমূহ এতোই জটিল ও সূক্ষ্মাকারবিশিষ্ট যে ‘পরিভাষা’ নামক পৃথক সূত্র ব্যতীত কেহই ইহার সম্যক অর্থগ্রহণে সক্ষম (সমর্থ) হন না। বিশেষত ইহাদের ব্যাখ্যায় ‘অনুবৃত্তি’ ও ‘নিবৃত্তি’ সূত্রেরও সাহায্য যথেষ্ট আবশ্যক। বোধ হয়, বিভিন্ন পথাবলম্বনবসত বৈদিক ক্রিয়াকলাপের ব্যাখ্যায় ধাতুপ্রত্যয়াদি-বিষয়ে ইতঃপূর্বেই শব্দের অর্থ লইয়া বেদশাস্ত্রকারদিগের মধ্যে নানা মত উপস্থিত হইয়াছিলো। ইহাদের মধ্যে যে কয় জন স্বীয় মত প্রতিপন্ন করিবার জন্য প্রকৃষ্ট পথ আবিষ্কার করিয়াছিলেন তাঁহাদিগকেই শব্দশাস্ত্রের আবিষ্কর্তা (আবিষ্কারক) বলা যাইতে পারে। ক্রমশ পদযোজনা-সম্বন্ধে বাদানুবাদের সূত্রপাত হয়। এইরূপে যখন ঋষিগণ দেখিলেন যে, বৈদিক সূত্রসমূহ (গ্রন্থসমূহ) ক্রমেই পরিবর্তিত হইতে লাগিলো, তখন তাঁহারা সূত্রসকল রক্ষার জন্য নিতান্ত সচেষ্ট হইলেন। বৈদিক সূত্রের প্রকৃত অর্থ নির্ণয়ের জন্য একদিকে তাঁহারা শব্দবিশ্লেষণ-ব্যাপারে নিরত হইলেন। পক্ষান্তরে বোধ হয়, তাঁহাদের শব্দসকলের বিশুদ্ধ উচ্চারণের কোথাও কোথাও ব্যতিক্রম হইয়া থাকিবে; তজ্জন্য তাঁহারা কণ্ঠ, তালু প্রভৃতি উচ্চারণস্থানের দিকে যথেষ্ট মনোযোগ দিয়াছেন। তাঁহাদের এই সমস্ত চেষ্টার ফলে বোধ হয় ‘ব্যাকরণ’ নামক ‘বেদাঙ্গ’-এর (বেদাঙ্গ বেদের অংশ নহে--- বেদের পরিশিষ্ট, বেদাঙ্গের সাহায্যেই বেদের অর্থ সুগম হয়) উৎপত্তি হইয়াছিলো। ঋগ্বেদ-প্রাতিশাখ্যের চতুর্দশ অধ্যায় পাঠ করিলে এ বিষয়টি স্পষ্টই জানিতে (বুঝিতে) পারা যায়।

[অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণ রচনাবলী, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষদ, প্রথম খণ্ড, ১৯৮২, পৃঃ ৪০৪-৪০৫]

ঋগ্বেদ সংহিতা সংকলনের সময়কাল সাধারণত ৭০০-৮০০ খৃস্টপূর্বাব্দ বলে ধরা হয়ে থাকে। তবে এই সংকলনকালেরও বহু পূর্ব থেকে বেশ কয়েক প্রজন্মের রচয়িতারা মুখে-মুখে এই স্তোত্রগুলো রচনা করেছিলেন এবং মুখে-মুখেই তা এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মের মধ্যে সঞ্চারিত হয়ে আসছিলো। আনুমানিক ৭০০-৮০০ খৃস্টাব্দের মধ্যে বেশ কিছু সংকলক উদ্যোগ নিয়ে এই স্তোত্রগুলোর সংহিতা রচনা করেন। এখন যে ঋগ্বেদ সংহিতার সঙ্গে আমরা পরিচিত তা সাকল্য দ্বারা সম্পাদিত সংহিতা। এছাড়াও শোনা যায় যে বাশ্কল, মণ্ডুকেয়, ইত্যাদি আরো একুশজন পৃথক পৃথক সংহিতা সম্পাদনা করেছিলেন, যা সাকল্যের সম্পাদিত সংহিতার চেয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রেই আলাদা। প্রাচীন পণ্ডিত পতঞ্জলি সাকল্য-সম্পাদিত সংহিতাটিকেই ‘সুকৃত’ আখ্যা দিয়েছিলেন, ফলে সেটিই ক্রমশ মান্য রূপে গৃহীত হয় বলে মনে হয়। এই সংকলন করার সময় সংকলকরা মৌখিকভাবে সংরক্ষিত স্তোত্রগুলোর প্রতিটি শব্দের উচ্চারণগত বিশ্লেষণ করে ‘পদ-পাঠ’ নির্ধারিত করার প্রয়াস নেন। লোকমুখে বহু দিন ঘুরতে ঘুরতে যে শব্দের উচ্চারণ পাল্টে গেছে বা আদিতে ছিলো না এমন ধ্বনি ঢুকে গেছে, সেগুলোর সংস্কারসাধন করে আবার আদি রূপে ফিরে যাওয়াই ছিলো অভিপ্রায়। এই উচ্চারণ-পরিবর্তন বা অনাদি ধ্বনির অনুপ্রবেশ এতোই গভীরসঞ্চারী ছিলো যে ‘সুকৃত’ সংহিতাকরণের মধ্য দিয়েও তা বিতাড়িত করা যায়নি। এর নানা উদাহরণ ভাষাতাত্ত্বিক পেগ্গি মোহন তাঁর ‘Wanderers, King, Merchants: The Story of India through Its Languages’ (Penguin/Viking, 2021) বইয়ে তুলে ধরেছেন, তার একটা দেখা যাক।

সাকল্য সম্পাদিত ঋগ্বেদ সংহিতার প্রথম মণ্ডলের প্রথম সূক্তের প্রথম পঙক্তিটি এইরকম:

অগ্নিমীলে পুরোহিতং যজ্ঞস্য দেবমৃত্বিজম। হোতারং রত্নধাতমম্।।

(বাংলায় অর্থ: অগ্নি যজ্ঞের পুরোহিত এবং দীপ্তিমান, অগ্নি দেবগণের আহ্বানকারী ঋত্বিক এবং প্রভূত-রত্নধারী, আমি অগ্নির স্তুতি করি।)

পেগ্গী মোহন দেখিয়েছেন (পূর্বোক্ত বই, পৃঃ ৪৮) যে অগ্নিমীলে (agnimīḷe) শব্দটির মধ্যে যে ḷ-ধ্বনিটি আছে, তা পাণিনি-র ব্যাকরণে আমরা যে সংস্কৃত ধ্বনিমূল (স্বনিম/phoneme)-এর তালিকা পাই, তার মধ্যে নেই, বরং অনার্য দ্রাবিড় ভাষাগুলোর মধ্যে এমন ধ্বনিমূল আমরা খুঁজে পাই। পাণিনিকে এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়ে থাকে যে তিনি তাঁর পূর্ববর্তী সমস্ত উৎস বিচার করে সংস্কৃত ভাষার রূপ ও কাঠামো প্রমিতিবদ্ধ করেছিলেন। তাহলে সাকল্য-এর ঋগ্বেদ সংহিতায় এই ḷ ধ্বনিমূলটি এলো কীভাবে?

কেবল এই একটি নয়, এমন আরো ধ্বমিমূল-এর অনুপ্রবেশ আমরা দেখতে পাবো। যে আর্যরা ভারতীয় উপমহাদেশে এসে বাস শুরু করেছিলেন, মূলগতভাবে তাঁদের বচনে ত, থ, দ, ধ, ন, স-এর মতো দন্ত্যধ্বনি ছিলো, কিন্তু ট, ঠ, ড, ঢ, ণ, ষ-এর মতো মূর্ধন্যধ্বনি ছিলো না। অথচ ঋগ্বেদ সংহিতা সংকলনের কালে দেখা গেলো যে এই মূর্ধন্যধ্বনিগুলোও আর্য-বংশীয়দের বচনে অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছে। এই মূর্ধন্যধ্বনিগুলো মূলগতভাবে ভারতীয় উপমহাদেশের অনার্য বা দ্রাবিড় ভাষাগুলোর মধ্যে ছিলো। এখন, একটি ভাষা থেকে আরেকটি ভাষায় কোনো শব্দ ঋণ (loan-word) হিসেবে আসতেই পারে, কিন্তু ধ্বনিমূল অতো সহজে আসে না। ইংরেজরা যেমন ‘লাঠি’ শব্দটাকে ঋণ হিসেবে তাদের ভাষায় নিয়ে নিয়েছিলো, কিন্তু তার উচ্চারণ করতো ‘লাতি’ বা ‘লাত্তি’ হিসেবে, ‘ঠ’ ধ্বনিমূল তারা কখনোই আয়ত্ত করতে পারেনি। ভারতীয় ভাষার স্বতন্ত্র ধ্বনিমূল আয়ত্ত না করতে পারার জন্যই তাদের ভারতীয় ভাষায় বচন-প্রচেষ্টা আমাদের কাছে এতো কৌতুকাবহ হয়ে ওঠে। ধ্বনিমূল যেহেতু উচ্চারণের সময় জিভ কীভাবে অবস্থান করবে সেই অভ্যাস/প্রতিবর্ত-ক্রিয়ার উপর নির্ভর করে, যে কোনো শিশুর জন্মের পর প্রথম পাঁচ বছরেই যেহেতু এই অভ্যাস শিলীভূত হয়ে যায়, তাই সাধারণত মাতৃভাষা নয় এমন অন্য ভাষার স্বতন্ত্র ধ্বনিমূল আয়ত্ত করা প্রায় অসম্ভব। অন্য ভাষায় বাচকতা আয়ত্ত করা যায়, কিন্তু সেই বাচকতা মাতৃভাষার ধ্বনিমূল উচ্চারণের অভ্যাসের উপরই দাঁড়িয়ে থাকে। আমরা ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের মানুষরা ইংরেজি ভাষা রপ্ত করলেও, তা নিজেদের উচ্চারণ-অভ্যাস অনুযায়ী বলতেই বাধ্য হই, সাহেবসুবোরা আমাদের উচ্চারণ শুনে কৌতুক পায়। তাহলে ঋগ্বেদ-এর সংস্কৃত ভাষায় অনার্য ধ্বনিমূল ঢুকলো কী করে? এই রহস্যের উত্তর হিসেবে পেগ্গী মোহন ‘মায়ের জিভ, বাবার ভাষা’ বলে এক অনুমান হাজির করেছেন।

পেগ্গী মোহন- এর অনুমান হলো এই যে আর্যরা যখন প্রথম এ-দেশে আসে, তখন তারা পশুচারণকারী-শিকারী-সংগ্রাহক ছোটো ছোটো দল হিসেবে এক লম্বা সময় জুড়ে খেপে খেপে এসেছিলো, আর তাদের এই দলগুলো ছিলো মূলত পুরুষদের দল। ভারতীয় উপমহাদেশের যে অঞ্চলে তারা প্রথম এসেছিলো, সেই উত্তর-পশ্চিম কোণে (মূলত বর্তমান আফগানিস্তান, পাকিস্তান) তখন তার আগের গৌরবোজ্জ্বল সিন্ধু সভ্যতা তখন অস্তগামী। সিন্ধু সভ্যতার পুরাতাত্ত্বিক যে অবশেষ আবিষ্কৃত হয়েছে, তা থেকে আমরা জানতে পাই যে সেই সভ্যতা ছিলো কৃষিকাজে উন্নত, নগর-পরিকল্পনায় উন্নত, লেখার চল সেখানে ছিলো সম্ভবত, সামাজিক যৌথতার উপর ছিলো তার ভিত্তি, কিন্তু যুদ্ধবিদ্যা বা অস্ত্রবিদ্যার নিদর্শন সেখানে পাওয়া যায়নি। এই সভ্যতার অস্তগামী প্রভায় আলোকিত যে মানুষদের এখানকার আদি বাসিন্দা হিসেবে নবাগত আর্যরা দেখেছিলো, অনুমান করা যায় যে তারা কৃষি, নগরপত্তন, যৌথতায় আর্যদের থেকে অনেক উন্নত হলেও, যুদ্ধবিদ্যায় অপটুতার জন্য আর্যদের সামনে কিছুটা অরক্ষিত ছিলো। দ্রুতগামী ঘোড়ার ব্যবহার ও উন্নত যুদ্ধাস্ত্রের ব্যবহারের মধ্য দিয়ে আর্যরা তাদের পরাভূত করে ক্রমশ নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। এই আর্য পুরুষ হানাদাররা একেকটি এলাকা অধিকার করে সেখানকার পুরুষদের অধিকাংশকে হয় হত্যা নয়তো দাসে পরিণত করলেও, নারীদের একটা বড়ো অংশকে নিজেদের যৌনসঙ্গী ও সন্তান-উৎপাদকের ভূমিকায় ন্যস্ত করে। আর্য-অধীনতার মাসুল হিসেবে কৃষি উৎপাদন ও আর্য-সন্তান উৎপাদন হয় এই অনার্য নারীদের বাধ্যতামূলক ভূমিকা। সুতরাং এখানে জন্মগ্রহণ করা আর্যবংশীয়রা ছিলো আর্য বাবার ঔরসে কিন্তু অনার্য মায়ের গর্ভে জাত (এটা কেবল আষাঢ়ে অনুমান নয়, DNA-ভিত্তিক নৃবিজ্ঞানের অনুসন্ধান এই দিকেই ইঙ্গিত করছে, দ্রষ্টব্য: ১) মারিনা সিলভা, মারিসা অলিভিয়েরা, দানিয়েল ভিয়েইরা ও অন্যান্য, ২০১৭, ‘A Genetic Chronology for the Indian Subcontinent Points to Heavily Sex-biased Dispersals’, BMC Evolutionary Biology, Vol. 17, Article No. 88; ২) বসন্ত শিণ্ডে, ভাঘীশ নরসিমহা, নীরজ রায়, ডেভিড রিখ ও আরো ২৪ জন, ২০১৯, ‘An Ancient Harappan Genome Lacks Ancestry from Steppe Pastoralists or Iranian Farmers, Cell, Vol. 179, No. 3, পৃঃ ৭২৯-৭৩৫)।

ঐতরেয় ব্রাহ্মণ-এ কবশ নামে এক ব্রাহ্মণসন্তান-দাসীপুত্র-এর আখ্যান পাওয়া যায়। কবশ দাসীপুত্র বলে তার বাবা ব্রাহ্মণ হওয়া সত্ত্বেও আর্য ব্রাহ্মণরা তাকে সরস্বতীর তীরে যাগযজ্ঞ করায় বাধা দেয়। অপমানিত ও ক্ষিপ্ত হয়ে কবশ পিছু ফিরে সরস্বতী-বন্দনা গাইতে গাইতে হাঁটতে শুরু করে। সরস্বতীও তার বন্দনায় সাড়া দিয়ে তাকে অনুসরণ করে চলতে শুরু করে। এতক্ষণ যে ব্রাহ্মণরা কবশকে অপমান ও তুচ্ছতাচ্ছিল্য করছিলো, এখন তারা হতচকিত ও অভিভূত হয়ে গিয়ে কবশের পিছনে ছুটে যায় এবং কবচের গুণ গেয়ে তাকেই ব্রাহ্মণশ্রেষ্ঠ বলে স্বীকার করে নেয়। কথিত আছে যে এই কবশ ঋগ্বেদ-এর দশম মণ্ডল-এ সংগৃহীত বেশ কিছু সূক্তের আদি রচয়িতা। সুতরাং, এই আখ্যান থেকে এমন ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে প্রথমাগত আর্য পুরুষদের দঙ্গল যে অনার্য নারীদের যৌনসম্ভোগ ও সন্তানোৎপাদনের জন্য ব্যবহার করেছিলো, সেই প্রক্রিয়ায় জন্ম নেওয়া সন্তানরা পিতৃতান্ত্রিক আর্যদের রীতি অনুযায়ী পিতৃবংশের পরিচয় পেলেও, অন্যান্য আর্যদের থেকে মানে খাটো বলে পরিগণিত হতো, যতক্ষণ না তারা আর্যভাষা আয়ত্ত করে তা ব্যবহারে (ব্রাহ্মণদের ক্ষেত্রে সূক্ত রচনায় ও গাওয়ায়) আর্যদের সমরূপ দক্ষতা দেখাতে পারতো। অর্থাৎ, আর্যভাষা রপ্ত করা ছিলো এই আর্য বাবা ও অনার্য মায়েদের সন্তানদের কাছে এক ধাপবন্দি সমাজে নিচু থেকে উঁচু ধাপে ওঠার মই-স্বরূপ।

প্রথম জন্মের পর এই শিশুদের ভাষা-অভ্যাস তৈরি হতো তাদের মায়েদের কাছ থেকেই কারণ মায়েরাই সদ্যোজাতদের লালনপালন করে। তাদের মায়েরা ছিলো অনার্যভাষী, অর্থাৎ, এই উপমহাদেশের আরো পুরোনো ভাষা যেগুলো, যেমন আদিবাসী মুণ্ডারীদের ভাষা, বিভিন্ন দ্রাবিড়ীয় ভাষা, সেই ভাষা ছিলো মায়েদের ভাষা। ফলে প্রথম পাঁচ বছরের মধ্যে সেইসব ভাষার স্বনিম/ধ্বনিমূল উচ্চারণের অভ্যাসেই তাদের জিভ তৈরি হয়ে উঠতো। আরো বড়ো হয়ে পিতৃকুলের আর্যভাষার বাচকতা রপ্ত করার সময় সেই জিভ তো আর নতুন করে তৈরি করে নেওয়া সম্ভব নয়, ফলে অার্যভাষার শব্দ উচ্চারণে অনার্য ধ্বনিমূলের প্রবেশ ঘটতে থাকতো। সুতরাং আর্যরা যে ভাষা নিয়ে এখানো এসেছিলো, তা অপরিবর্তিত থাকেনি, ক্রমাগত তার ধ্বনিমূলগত পরিবর্তন ঘটতে থেকেছে, যে পরিবর্তন অন্যান্য ভাষা থেকে শব্দ গ্রহণ করার মতো বদলের চেয়ে অনেক ব্যাপ্ত ও গভীর পরিবর্তন।

ঋগ্বেদের সূক্তগুলোর রচনাকালের ব্যাপ্তি আন্দাজ করতে গেলে প্রায় সাতশো বছরের এক সময়পর্যায় ধরতে হয়। সিন্ধুসভ্যতার অবসানের পর থেকে, অর্থাৎ, খৃস্টপূর্ব ১৯০০ থেকে আর্যদের আসার শুরু বলে যদি ধরা হয়, তাহলে শুরু করতে হয় সেখান থেকে। আর ঋগ্বেদ-এর পরবর্তী অথর্ববেদ-এ প্রথম লোহার ব্যবহারের উল্লেখ আছে যা এই ভারতীয় উপমহাদেশে ১২০০ খৃস্টপূর্বাব্দে প্রথম শুরু হয়েছিলো বলে মনে করা হয়, ফলে ঋগ্বেদ-এর সূক্তগুলোর রচনাকালের শেষসীমা এই ১২০০ খৃস্টপূর্বাব্দেই ধরতে হয়। এই সাতশো বছর সময়কাল ধরে আর্যরা দফায় দফায় এসেছে এবং তাদের আধিপত্যাধীন এলাকা বাড়াতে থেকেছে। ভাষার মানচিত্র এই কালপ্রবাহে কীভাবে বদলাতে থেকেছে তার একটা সংক্ষিপ্ত বিবরণ পেগ্গী মোহন দিয়েছেন এইভাবে:

… এক পুরুষ-প্রধান অভিপ্রয়াণ (migration): আচম্বিতে একদিন উত্তরের দেশ থেকে আসা পুরুষের দল, তাদের নারীরা তাদের সঙ্গে নেই, তারা এসে ভিটে গাড়লো, এলাকার নারীদের সঙ্গে সন্তানের জন্ম দিলো, এমন এক নতুন দ্বিভাষিক প্রজন্ম তৈরি হলো যারা তাদের মাতৃভাষা জানে, আবার তাদের ‘পিতৃভাষা’ সংস্কৃত-ও জানে। কিছু বালক সংস্কৃত এতোটাই ভালো রপ্ত করলো যে বৈদিক সূক্ত রচনার পরম্পরা কাঁধে তুলে নিলো। কিন্তু বাকি বালকরা, তাদের মা-বোনেদের সঙ্গে, এবং আরো কিছু উপরে-ওঠার-সুযোগ-সন্ধানী এলাকাবাসীদের সঙ্গে, সংস্কৃত-ভাষা-বাচকতার কাছাকাছি পৌঁছলেও যথেষ্ট কাছে পৌঁছতে পারলো না--- তাদের মুখের ভাষাকে ‘প্রাকৃত’ নাম দেওয়া হলো, যে ভাষাগুলো সংস্কৃতর-ই এক প্রভেদ-বিশেষ, সংস্কৃতের ব্যাকরণের অনুগামী, কিন্তু তীব্র আঞ্চলিক স্বাদে ভরা।

ইতিহাসের মধ্যযুগ-পর্বে এসে এই প্রাকৃতগুলো ক্ষমতার আঞ্চলিক ভাষা হযে উঠলো, সংস্কৃত থেকে তাদের পার্থক্য মূলত স্বরাঘাত/বাচনভঙ্গি ও আঞ্চলিক খুঁটিনাটি থেকে আসা, ঠিক যেভাবে পশ্চিম আফ্রিকার দোভাষীরা যখন পর্তুগিজ, ইংরেজি বা ফরাসি বলে, তাদের সেই ভাষা মূলদেশের শহরনিবাসী অভিজাতদের বলা ভাষা থেকে আলাদা হয়।

উপমহাদেশের ইন্দো-আর্য (Indo-Aryan) ভাষাগুলো, যা প্রকৃত মিশ্রণ বলা যায, তা সঙ্গে-সঙ্গে তৈরি হয়ে যায়নি। বহু বহু শতাব্দী ধরে প্রাচীনতর আঞ্চলিক ভাষাগুলো, যাদের মধ্যে কিছু-কিছু হয়তো হারিয়ে-যাওয়া সিন্ধু সভ্যতার ভাষাগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত ছিলো, সেগুলো এইসব ইন্দো-আর্য প্রাকৃতগুলোর পাশাপাশি চালু ও জীবিত ছিলো (ঠিক যেমন পশ্চিম আফ্রিকার আদি ভাষাগুলো এখনও অবধি টিকে আছে সেখানকার ইংরেজি বা ফরাসি-র প্রাকৃত রূপগুলোর পাশাপাশি)। ভারতীয় উপমহাদেশে কেবলমাত্র দশম বা দ্বাদশ শতাব্দীতে এসেই আমরা এই ইন্দো-আর্য মিশ্র ভাষাগুলোর লিখিত নথিতে চিহ্ন পেতে শুরু করি--- প্রাচীন মায়েদের ও মায়েদের নিজেদের জনজাতির মুখের পুরোনো আঞ্চলিক ভাষাগুলোর বৈশিষ্ট্য তাদের ব্যাকরণের মধ্যে গোঁজা পড়ে থাকে। উত্তর-পশ্চিম প্রদেশে অবশ্য বহু শতকের যাত্রাপথে এই মিশ্র ভাষাগুলো প্রাচীনতম ভাষাগুলোকে সম্পূর্ণ প্রতিস্থাপন করে বসেছে; প্রাচীনতম ভাষাগুলোর রেশ এখন কেবল আমাদের বচনের অসচেতন অন্তঃস্তরে টিকে আছে।

(পেগ্গী মোহন, Father Tongue, Mother Land: The Birth of Language in South Asia, ২০২৫, পেঙ্গুইন/অ্যালেন লেন, পৃঃ ১৬-১৭, মূল ইংরেজি থেকে বাংলা তর্জমা বর্তমান লেখকের করা।)

প্রাচীন সংস্কৃত নাটকে আমরা দেখি যে রাজা, রাজন্য, অভিজাত, ব্রাহ্মণ, এইসব পুরুষদের সংলাপগুলো সব সংস্কৃত ভাষায়, কিন্তু সমস্ত নারী ও সমাজের নীচু ধাপের লোকজনদের সংলাপ প্রাকৃত ভাষায়। সুতরাং ভাষা-বাচকতা ও সামাজিক ক্ষমতা-আভিজাত্যের প্রত্যক্ষ যোগাযোগটি রাখঢাকহীনভাবেই খুব স্পষ্ট। প্রাকৃত ভাষার যে চরিত্র পেগ্গী মোহন বলেছেন, তা যাচাই করার জন্য কালিদাসের বিখ্যাত ‘শকুন্তলা’ নাটক থেকে একটি সংলাপ তিনি যেভাবে বিচার করেছেন তা আমরা দেখতে পারি। শকুন্তলা তার সখী অনসূয়াকে উদ্দেশ্য করে বলছে:

aṇasūe. ahiṇavakusasūīe parikkhadam me ćalaṇam

সঙ্গে নাট্যকার সংস্কৃত রূপটিও লিখে দিয়েছেন:

anasūye. abhinavakuśasūćyā parikșatam me ćaraṇam

বাংলায় এর মানে: অনসূয়া! কচি কুশ ঘাসের ছুঁচ আমার পায়ে ফুটে গেছে! তা এখানে শকুন্তলা-কথিত প্রাকৃতের সঙ্গে সুদ্ধ সংস্কৃত বচনের এই পার্থক্যগুলো পেগ্গি মোহন চিহ্নিত করেছেন:

১) সংস্কৃত মহাপ্রাণ স্বর bh-এর জায়গায় h উচারিত হচ্ছে,

২) সংস্কৃত ś-এর জায়গায় s উচ্চারিত হচ্ছে,

৩) দুটি স্বরধ্বনির মাঝে দন্ত্য ধ্বনি n-এর জায়গায় মূর্ধণ্য ধ্বনি ṇ উচ্চারিত হচ্ছে,

৪) সংস্কৃত ধ্বনি r-এর পরিবর্তে l উচ্চারিত হচ্ছে,

৫) ব্যঞ্জনধ্বনিগুচ্ছ সরল রূপ ধারণ করছে, যেমন, kșa হয়ে যাচ্ছে kkha, আর ćya একেবারে বিলুপ্ত হচ্ছে,

৬) দুটি স্বরধ্বনির অন্তর্বর্তী t পরিণত হচ্ছে d-তে।

(পেগ্গি মোহন, Wanderers, King, Merchants: The Story of India through Its Languages, পেঙ্গুইন/ভাইকিং, ২০২১, পৃঃ ৪০)

সুতরাং, মুখের বচনে শব্দগুলো আসছে সংস্কৃত থেকে, কিন্তু দ্রাবিড় উচ্চারণশৈলীর সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণভাবে, আর এই ভাষাই প্রাকৃত অভিধায় অভিহিত হচ্ছে।

আরেকটা বিষয়ও এখানে খেয়াল করা দরকার। সমস্ত মানুষদের মধ্যে সংস্কৃত ভাষা বাচকতা ছড়িয়ে ছিলো না, তা কেবল বহিরাগত আর্য বসতি-স্থাপনকারী ও তাদের কাছাকাছি আসা মানুষদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলো, তার মধ্যেও আবার কেবল ব্রাহ্মণদেরই এই ভাষার অভিভাবক রূপে ভাবা হতো। আর এর বাইরে বহু আগে থেকে ভারতে বসবাসকারী জনজাতিদের নিজেদের ভাষা ছিলো, দ্রাবিড়ীয় ভাষা বা মুণ্ডা জনগোষ্ঠীদের ভাষা যার উদাহরণ--- এই পরিসরটি ছিলো আগের ওই সংস্কৃত ভাষার পরিসর থেকে অনেক বড়ো ও অনেক বৈচিত্র্যময়। এই দুটি পরিসরের স্পর্শাঞ্চল-জোড়া সীমারেখাঞ্চলে প্রাকৃত ভাষাগুলোর অস্তিত্বরেখা তৈরি হচ্ছিলো।

এবার আবার ওই ঋগ্বেদ-সংকলনের প্রসঙ্গে ও সেই কালে ফিরে গিয়ে ভেবে দেখা যাক যে বহু শতাব্দী ধরে লোকমুখে (মূলত ব্রাহ্মণবংশীয়দের মুখে) প্রবাহিত হয়ে আসার পর নির্দিষ্ট একটি সময়ে এসে সেগুলো সংকলিত করা ও মান্য সংস্করণ নির্মাণ করার প্রয়োজনীয়তার উদ্ভব হলো কেন, অর্থাৎ, সাকল্যের মতো পণ্ডিতরা সূক্ত সংকলনে নামলেন কেন?

ঋগ্বেদ-এ সংকলিত সূক্তগুলো শুরুতে বিভিন্ন অঞ্চলের ব্রাহ্মণ গোষ্ঠীর মধ্যে মৌখিক ভাবে সংরক্ষিত হতো, এই এক-একটি আঞ্চলিক গোষ্ঠীকে এক-একটি ‘শাখা’ বলা হতো। এই বিভিন্ন শাখার ব্রাহ্মণদের মুখে সূক্ত-সংগ্রহের মধ্যে তফাত ছিলো, কোন-কোন সূক্ত সংগ্রহভুক্ত হওয়া উচিত তা নিয়ে শাখাগুলোর মধ্যে মতের ভিন্নতাও ছিলো। এই সংরক্ষণ পদ্ধতির ফলে তরুণ ব্রাক্ষণরা মূলত সুরে আবৃত্তি করা কবিতা হিসেবে সূক্তগুলোকে মুখস্ত করতো। বহু শতাব্দী পেরিয়ে আসা বহু সূক্তের বিভিন্ন শব্দ নতুন মুখস্তকারীর কাছে কোনো অর্থ প্রতিপন্ন করতো না, অর্থ না বুঝেই মুখস্ত করে যাওয়া ছিলো রীতি। সুরে আবৃত্তির একটি বৈশিষ্ট্য এই যে তা বহুক্ষেত্রে পাশাপাশি শব্দগুলোকে একসঙ্গে মিলিয়ে দেয়, ফলে অর্থের দিকে মনোযোগ না দিয়ে সুরে আবৃত্তি রপ্ত করে যাওয়ার দীর্ঘ পরম্পরার ফলে একসময় উচ্চারণ থেকে প্রতিটি শব্দকে আলাদা করে বোঝা দুষ্কর হয়ে দাঁড়ায়। এছাড়া পূর্বে আলোচিত অনার্য ভাষার ধ্বনিমূলের অনুপ্রবেশ তো আছেই। ফলে শতক-পুরোনো এক একটি সূক্ত নিয়ে ব্রাক্ষণ শাখাগুলোর মধ্যে শব্দে ভাঙা ও শব্দের অর্থ নিয়ে মতের বিভিন্নতা তৈরি হয়েছিলো। ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণের এই বিভিন্নতা নিরসন করে একটিই মান্য সংকলন তৈরি করার উদ্যোগ দানা বেঁধেছিলো সামাজিক-রাজনৈতিক কিছু বিশেষ তাগিদের ঠেলায়। এই সামাজিক-রাজনৈতিক ঠেলার প্রসঙ্গটি জার্মান-মার্কিন ভাষাবিদ মাইকেল উইটজেল ব্যাখ্যা করেছেন এইভাবে:

ঋগ্বেদ-এর বেশির ভাগ অংশ পুরু এবং ভরত জনজাতিদের পাঁচটি বা ছয়টি প্রজন্মের রাজা ও তৎকালীন কবিদের প্রতিনিধিত্ব করছে। এই তৎকালীন ‘টেপ-রেকর্ডিং’-এ ধৃত তৎকালীন ঋগ্বৈগিক ইতিহাসের একটি ‘স্ন্যাপশট’-এর বাইরে, তার আগের বা পরের খুব অল্প কিছুই ঋগ্বেদ-এ আছে। অন্যদিকে, গোটা ঋগ্বেদ-এর কাল ছিলো প্রায় ৭০০ বছর জুড়ে: এই উপমহাদেশে ইন্দো-আর্যদের ১৯০০ খৃস্ট-পূর্বাব্দে (এর থেকে আগে হওয়া সম্ভব নয়, কারণ সিন্ধু সভ্যতার ধসে পড়ার সময় এটা) অনুপ্রবেশের ঘটনা থেকে শুরু করে ১২০০ খৃস্ট-পূর্বাব্দ কাল, যখন লোহার প্রবর্তন হলো যার প্রথম উল্লেখ ঋগ্বেদোত্তর অথর্ববেদের সূক্তে আমরা প্রথম পাই। ঋগ্বেদ-এর প্রাথমিক সংকলন… হওয়ার সময় দশ রাজার জোটকে পরাজিত করে সুদাস-এর অধীনে ভরত-দের বিজয়লাভের সময়ের অল্প কিছু পরে হবে, কিন্তু কোনো ভাবেই তা ঋগ্বেদোত্তর কুরু রাজত্বের সময় বা তার পরে হবে না।… সুদাস-পরবর্তী ভরতদের আধিপত্যাধীনে তাদের পূর্বতন শত্রু পুরু জনজাতি সহ অন্য বিভিন্ন জনজাতিদের এবং নিজ জানজাতির মধ্যেও বিভিন্ন উপগোষ্ঠীদের ও কবিবংশ-দের শক্তপোক্ত রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণে পুনর্বিন্যস্ত করার প্রবল প্রয়াস-এর ফলস্বরূপ ঋগ্বেদের প্রথম সংকলন তৈরি করা হয়ে থাকবে।

(মাইকেল উইটজেল, Inside the Texts, Beyond the Texts বইয়ের অন্তর্গত The Development of the Vedic Canon and Its Schools: The Social and Political Milieu প্রবন্ধ, হারভার্ড ওরিয়েন্টাল সিরিজ, ১৯৯৭, পৃঃ ৮১, মূল ইংরেজি থেকে বাংলা তর্জমা বর্তমান লেখকের করা।)

ঋগ্বেদ সংহিতা অবশ্য চূড়ান্ত রূপ নিয়েছিলো আরো পরে, ১২০০ থেকে ১০০০ খৃস্ট-পূর্বাব্দ কালের মধ্যে। আগেই বলেছি যে বিভিন্ন সংহিতাকারের কাজের মধ: একমাত্র সাকল্য-এর কাজটিই টিকে আছে। এই সংহিতা দশটি মণ্ডলে বিভক্ত, তার মধ্যে ২ থেকে ৯ অবধি আটটি মণ্ডল মধ্যে পুরোনো সূক্তগুলোকে সংগ্রহ করে মান্য রূপ দেওয়া হয়েছিলো। পরে ১ ও ১০ মণ্ডল যুক্ত করা হয় সামগ্রিক একটি কাঠামোয় গোটা সংহিতাটিকে বাঁধার জন্য। এই কাজটির পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলো কুরু জনজাতির রাজারা, যে কুরু জনজাতি তখন অন্যান্যদের উপর আধিপত্য বিস্তার করে সবার উপর নিজের অবস্থানকে মজবুত রূপ দিতে চাইছে। এই পরবর্তীকালে সন্নিবেশিত দশম মণ্ডলের শেষ সূক্তটির শেষ ছয়টি পঙক্তি এইরকম:

সং গচ্ছধ্বং সং বদধ্বং সং বো মনাংসি জানতাম্।

দেবা ভাগং যথা পূর্বে সঞ্জানানা উপাসতে।।

সমানো মন্ত্রঃ সমিতিঃ সমানী সমানং মনঃ সহ চিত্তমেষাম্।

সমানং মন্ত্রমভি মন্ত্রয়ে বঃ সমানেন বো হবিষা জুহোমি।।

সমানী ব আকূতিঃ সমানা হৃদযানি বঃ।

সমানমস্তু বো মনো যতা বঃ সুসহাসতি।।

বাংলায় এর অর্থ:

হে স্তবকর্তাগণ! তোমরা মিলিত হও, একত্রে স্তব উচ্চারণ করো, তোমাদের মন পরস্পর একমত হোক। অধুনাতন দেবতাগণ প্রাচীন দেবতাদের ন্যায় একমত হয়ে যজ্ঞ ভাগ গ্রহণ করছেন। এ সকল পুরোহিতদের মন্ত্রোচ্চারণ এক প্রকার হোক, এঁর সঙ্গে সমাগত হোন, এঁদের মন, চিত্র সকলই একপ্রকার হোক। হে পুরোহিতগণ! আমি তোমাদের একই মন্ত্রে মন্ত্রিত করছি, তোমাদের সর্বসাধারম দ্বারা হোম করছি। তোমাদের অভিপ্রায় এক হোক, অন্তঃকরণ এক হোক, মন এক হোক, তোমরা যেন সর্বাংশে সম্পূর্ণরূপে একমত হও।

এর মধ্য দিয়ে নব-প্রতিষ্ঠিত কুরু রাজবংশ সমস্ত ব্রাহ্মণদের তার পৃষ্ঠপোষকতায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে মন্ত্র-রীতি-আচার-উপাসনা-র এমন এক সমসত্ত্ব নির্বিকল্প রূপ নির্মাণ করতে বলছে যা বিবিধ বৈচিত্র্যময় জনজাতিগোষ্ঠীগুলোর উপর কেন্দ্রীভূত রাজতন্ত্র কায়েমের যৌক্তিকতা বিধান করবে ও সহায়ক হবে। শ্রৌত আচারের ‘পরিশুদ্ধ’ নির্বিকল্প রূপ এখন সামাজিক-রাজনৈতিক ক্ষমতার আভরণ হয়ে উঠলো, রাজতন্ত্র ও ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের মধ্যে গাঁটছড়া বাঁধা হলো। মাইকেল উইটজেলের মতেও:

… মোটের উপর, বিরাট সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনগুলোর অভিঘাতে এমন এক নতুন জটিল আচার-কাঠামো দরকার হয়ে পড়েছিলো যা নতুন কুরু রাজবংশের শাসনে শক্তি যোগাবে, নেতৃস্থানীয় ক্ষত্রিয়দের ও তার পরের সারির অভিজাতদেরও শক্তি যোগাবে এবং যা ‘সংস্কৃতকরণ’ (‘Sanskritization’)-এর মধ্য দিয়ে ক্ষমতার ধাপবন্দি কাঠামোয় উপরের ধাপে চড়ার এক সম্ভাব্য পথও কিছু মাত্রায় খুলে রাখবে। আচার এখন সমাজের মই বেয়ে উপরে চড়ার উপায় হয়ে উঠলো। কুরু রাজত্ব হয়ে উঠলো ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দু। কুরুক্ষেত্র হয়ে উঠলো সঠিক/শুদ্ধ আচরণ বিষয়ক ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রী বিধি-বিধান-এর পরম্পরা-কেন্দ্র।

(মাইকেল উইটজেল, Inside the Texts, Beyond the Texts বইয়ের অন্তর্গত The Development of the Vedic Canon and Its Schools: The Social and Political Milieu প্রবন্ধ, হারভার্ড ওরিয়েন্টাল সিরিজ, ১৯৯৭, পৃঃ ২৬৭, মূল ইংরেজি থেকে বাংলা তর্জমা বর্তমান লেখকের করা।)

একপাথুরে অভিন্নতায় ঢালাই করা এক সর্বাত্মক শাসনের রূপ এখানে ঝিলিক দিচ্ছে। এই একপাথুরে নির্ধারণে সত্য একমাত্র একটাই, ঈশ্বরও একটাই, সত্যের অধিকার আছে বাকি সমস্ত মিথ্যাকে ধ্বংস করার, আলোর অধিকার আছে সমস্ত অন্ধকারকে ধ্বংস করার। ঈশ্বর, যিনি সবচেয়ে করুণাময়, সর্বজ্ঞ ও সর্বশক্তিমান, তিনি তাঁর প্রতিনিধি রাজা ও ব্রাহ্মণদের মাধ্যমে জানা জগতের প্রায় গোটাটাই বিজয় করে নেবেন এবং তাঁর অনুগামী বাধ্য প্রজাদের জয়োদ্ধত উল্লাস-উন্মত্ত চিৎকারের মাঝে দাঁড়িয়ে তাঁরা তাঁদের ঐশ্বরিক কথা যারা মানে না সেই সব শয়তানদের তাড়া করে খেদিয়ে তাঁদের দখলীকৃত ভূমি থেকে বের করে দেবেন। আর্য-শাসনের এই আক্রমণাত্মক আদরাটি কীভাবে গড়ে উঠলো তা সম্পর্কে একটা ধারণা তৈরি করার জন্য বেদগুলোকে আরেকটু ঘেঁটে দেখা যাক।

ঋগ্বেদে রাজন্ বা রাজা শব্দের ব্যবহার দেখে প্রাথমিক ভাবে মনে হতে পারে যে সেই সময়ে আগাগোড়া রাজতন্ত্রের প্রচলন ছিল। কিন্তু সতর্ক পাঠে ধরা পড়ে যায় যে তা নয়। দেখা যায় যে, রাজাকে বলা হয়েছে ‘গণ’-এর সেনানী এবং ‘ব্রাত’-এর প্রথম (ঋগ্বেদ, ১০.৩৪)। ‘গণ’ ও ‘ব্রাত’ শব্দদুটির অর্থ এখানে ‘সমূহ'। অর্থাৎ, রাজা বলতে এখানে রাষ্ট্রের অধিপতি বোঝানো হচ্ছে না, রাজা বলতে বোঝানো হচ্ছে জনগোষ্ঠীর কোনও প্রধান জনকে। সামূহিক ব্যপারে সিদ্ধান্তগ্রহণের জন্য, সামূহিক কাজকর্ম পরিচালনার জন্য সেই সময় ‘সভা’ ও ‘সমিতি’ নামক দুটি প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা লক্ষ্য করা যায়। বৈদিক সাহিত্যে বহু জায়গায় কোনও এক গোষ্ঠীর আভ্যন্তরীণ সভা ও সমিতিতে বহু রাজার আগমন ও উপস্থিতির কথা বলা হয়েছে। এ রাজতন্ত্রে সম্ভব নয়, কারণ রাজতন্ত্রের মূল কথাই হচ্ছে রাজার একত্ব বা অনন্যত্ব। রাজতন্ত্র নয় এমন কোনও রাজনৈতিক ব্যবস্থাতেই একই জনগোষ্ঠীতে বহু রাজা সম্ভব। দেখা যাক বৈদিক সাহিত্যে এই রাজনৈতিক ব্যবস্থার কী ছবি পাওয়া যায়।

বৈদিক সাহিত্যে জনগোষ্ঠীর সামূহিক বিষয়াদি পরিচালনার জন্য যে চার প্রকার জনগণের সংস্থার উল্লেখ আছে, অর্থাৎ, সভা, সমিতি, বিদথ ও পরিষদ, সেগুলো সম্বন্ধে যা জানা যায়, তা হলো:

সভা: সভা বলতে একটি সমাবেশ বা সমাবেশ-গৃহ বুঝিয়েছে যেখানে জনগোষ্ঠীর প্রধান ব্যক্তিরা সমবেত হয়ে তঁাদের কাজকর্ম নিয়ে আলোচনা করতেন (ঋগ্বেদ, ৬.২৮.৬, ৮.৪.৯, ১০.৩৪.৬, অথর্ববেদ, ৫.৩১.৬, ৭.১২.১, ৭.১২.২, ৮.১০.৫, ১২.১.৫৬, ১৯.৫৫.৬)। সভার বিকল্প একটি শব্দও পাওয়া যায়, তা হলো ‘নরিষ্ঠা’। ‘নরিষ্ঠা’-র ব্যাখ্যা করে টীকাকার সায়নাচার্য বলেছেন যে সেখানে অনেকে মিলে সিদ্ধান্ত নেন এবং সেই সিদ্ধান্ত সবাইকে মেনে চলতে হয়, এই অলঙ্ঘনীয়তার তাৎপর্য্য বহন করছে ‘নরিষ্ঠা’ শব্দটি। এমন সভায় রাজার নিজস্ব মত এবং ইচ্ছা অতিক্রম করে সংখ্যাধিক মানুষের মত বা ইচ্ছাই সিদ্ধান্ত হয়েছে এমন উদাহরণ বহু পরবর্তীকালের ‘মহাভারত’-এও প্রচুর পাওয়া যায়। সভায় আলোচনার ক্ষেত্রে যাঁরা প্রধান ভূমিকা নিতেন, তঁাদের বলা হতো সভাসহ (ঋগ্বেদ ১০.৭১.১০)। সভায় মত-উপস্থাপনার ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট মান বজায় রাখার দিকে নজর দেওয়া হতো, বিশিষ্ট সদস্যদের ‘সভেয়’ (সভার যোগ্য), ‘রয়িঃ সভাবান্’, সভার সম্পদ আখ্যা দেওয়া হতো (ঋগ্বেদ, ২.১৪.১৩, ৪.২.৫)। এছাড়াও সভার সদস্যদের বোঝানোর জন্য ‘সভাচর’ ও ‘সভাসদ’ শব্দদুটির ব্যবহার আছে। ঋগ্বেদে (১.১৬৭.৩) ‘সভাবতী’ শব্দটি পাওয়া যায়, যা সম্ভবত নারী সদস্যদের বোঝাতে ব্যবহৃত হতো, সেখানে বলা হয়েছে যে সভাস্থিতা নারী সভার উপযোগী বাক্য প্রয়োগ করে। ঋত বা নিয়মরক্ষাকারী নারীর তিনবার সভায় আগমনের কথা ঋগ্বেদে (৩.৫৬.৫) বলা হয়েছে। সভাগৃহ অক্ষক্রীড়া (পাশাখেলা)-র জন্য ব্যবহৃত হতো (ঋগ্বেদ, ১০.৩৪.৬, অথর্ববেদ, ৫.৩১.৬, ১২.৩.৪৬), অক্ষক্রীড়ার পরিচালককে বলা হতো ‘সভাস্থানু’। বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে ধন-বন্টনের উদ্দেশ্যেও অক্ষক্রীড়া ব্যবহৃত হতো। সভায় অনেক কাজের মধ্যে একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল ধনবন্টন— ধন বলতে শুধু গবাদি পশু ও মূল্যবান সামগ্রীই নয়, এমন কি জল ও খাদ্যও বোঝাত (ঋগ্বেদ, ১.১৬৪.২১, ২.১.৪, ৭.৪০.১, ১০.১১.৮)। বাজসনেয় সংহিতা, ২০.১৭-র টীকায় মহীধর বলেছেন যে সভায় নানা ধরনের বিবাদ-বিসংবাদও মেটান হতো। ঋগ্বেদ (৬.২৮.৬, ৮.৪.৯) থেকে জানা যায় যে সভায় গোধন ও সম্পত্তিসংক্রান্ত বিষয়সমূহ আলোচিত হতো, অথর্ববেদ (৭.১২.৩) জানায় যে গভীরতর বিষয়ের আলোচনাও বাদ পড়ত না।

বিদথ: বিদথ শব্দটির ব্যবহার ঋগ্বেদে পাওয়া যায় প্রাচীনতর গণপ্রতিষ্ঠান হিসাবে। এটি ছিল নীতিনির্ধারক প্রতিষ্ঠান যা জনজীবনের সাধারণ বিষয়াবলী (ঋগ্বেদ, ২.১.৪, ২.১৭.২২, ৩.৩৮.৫৬, ৫.৬৩.২, ৭.৬৬.১০, ৮.৩৯.১, ১০.১২.৭, অথর্ববেদ, ১৭.১.১৫) ছাড়াও ধর্মীয় (ঋগ্বেদ, ১.৬০.১, ২.৪.৮, ২.৩৯.১, ৩.১.১, ৩.৫৬.৮) ও যুদ্ধসংক্রান্ত (ঋগ্বেদ, ১.১৬৬.৬, ৫.৫৯.২) বিষয় নিয়ে আলোচনা করত। রাজাকে বলা হয়েছে ‘বিদথ্য’, যা থেকে অনুমান করা যায় যে রাজাকে বিদথের অধীনে, বিদথের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে কাজ করতে হতো। বিদথে যে নারীরাও উপস্থিত থাকতেন, তার প্রমাণ আছে অথর্ববেদ (৭.৩৮.৪)-এ ও মৈত্রায়ণী সংহিতা (৪.৭.৪)-য়।

সমিতি: সভার মতো সমিতিও সর্বসাধারণের সমাবেশস্থল ছিল এবং বহু ক্ষেত্রে সভা ও সমিতি একসঙ্গে উচ্চারিত হয়েছে (অথর্ববেদ, ৭.১২.১, ১২.১.৫৬, ১৫.৯.২, ১৫.৯.৩)। বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বিষয়, যেমন যুদ্ধের মতো বিষয়, আলোচনার জন্য সভার চেয়ে সমিতি অধিকতর দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিল (ঋগ্বেদ, ১.৯৫.৮, ৯.৯২.৬, ১০.১৭.৬, ১০.১৬৬.৪, অথর্ববেদ, ৫.২৯.১৫, ৬.৮৮.৩, ৭.১২.১, ১২.১.৫৬)। ঋগ্বেদের একটি বিখ্যাত মন্ত্রে পাওয়া যায়— ‘সমানো মন্ত্রঃ সমিতিঃ সমানী/ সমানং মনঃ সংচিত্তসেষাম্’। এর অর্থ এই যে, সমিতিতে সমস্ত মানুষ তাদের মন্ত্রণাকে মিলিয়ে দিতে চায়, সেখানে মানুষ তাদের আলাপ-আলোচনাকে একসুরে বাঁধতে চায় এবং একাগ্রচিত্ত হওয়ার জন্য প্রার্থনা করে। সমিতির আলোচনায় অংশ নেওয়ার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে হতো। সকলে যেখানে তর্ক-যুক্তি দিয়ে মতপ্রকাশ করছে, সেখানে নিজের তর্ক-যুক্তি অপরের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্য মানুষের যে চেষ্টা ও আকুতি ছিল, তা বোঝা যায় এই শ্লোক থেকে— ‘যে সংগ্রামা সমিতয়স্তেষু চারু বদেম তে'। রাজার সঙ্গে সমিতির সদস্যদের যাতে মতের মিল হয় এবং সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যায়, সেজন্য বিশেষ চেষ্টা চলত (ঋগ্বেদ, ১০.১৬৬.৪, অথর্ববেদ, ৬.৮৬.৯)।  সমিতিতে রাজাকে নির্বাচন করার উল্লেখ পাওয়া যায় (ঋগ্বেদ, ১০.১৭৩.১, অথর্ববেদ, ৬.৮৭.৮৮), অপদার্থ ও স্বেচ্ছাচারী রাজাকে বিতাড়ন করার নজিরও পাওয়া যায় (কাঠক সংহিতা, ২৭.১, তৈত্তিরীয় সংহিতা, ২.৩.১, মৈত্রায়ণী সংহিতা, ২.২.১, পঞ্চবিংশ ব্রাহ্মণ, ১২.১২.৬, শতপথ ব্রাহ্মণ, ১২.৯.৩.১)। টীকাকার সায়ণ সমিতিকে সংগ্রাম ও যুদ্ধ সংক্রান্ত বিষয়াবলী আলোচনার ক্ষেত্র বলে ব্যাখ্যা করেছেন। একই সমিতিতে বহু রাজা অর্থাৎ বহু গোষ্ঠীর প্রধানদের উপস্থিতির বহু নজির আছে।

পরিষদ: বৈদিক যুগের শেষ পর্যায়ের রচনায় ‘পরিষদ’ নামক প্রতিষ্ঠানের উল্লেখ আছে (বৃহদারণ্যক, ৬.১.১, গোভিল গৃহ্যসূত্র ৩.২.৪০)। এই ‘পরিষদ’ কখনও গণপ্রতিষ্ঠান ছিল কি না তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ আছে। রাজসভায় রাজাকে নানা বিষয়ে উপদেশ দেওয়াই এই সংস্থার কাজ। জৈমিনীয় উপনিষদ ব্রাহ্মণ (৬.৮৮.৩)-এ পরিষদ, সভা ও সংসদের উল্লেখ আছে যেখানে জনসাধারণ সমবেত হতো, বাদবিসংবাদ ঘটত, নানা বিষয়ে সাক্ষ্যপ্রমাণ (‘উপদ্রষ্টৃ’) নেওয়া হতো। তবে সাধারণভাবে অনুমান করা যায় যে বৈদিক যুগের শেষ পর্বে (খৃস্টপূর্ব ৮০০ অব্দ থেকে খৃস্টপূর্ব ৬০০ অব্দ বা তারও পরে) ব্রাহ্মণ গ্রন্থগুলি যখন লেখা হচ্ছে, তখন বহু জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রেই বিদথ-সভা-সমিতির মধ্য দিয়ে গণ-অংশগ্রহণের মাধ্যমে রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার অভ্যাস ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে এবং রাজকীয় কর্তৃত্ব ও তদনুরূপ রাষ্ট্রশক্তি গড়ে উঠেছে, সেই পরিপ্রেক্ষিতেই কর্তৃত্ববান রাজাকে কেন্দ্র করে স্থিত অভিজাতবর্গের মন্ডলীকেই পরিষদ বলত।

বৈদিক সাহিত্য থেকে জনগোষ্ঠীর সামূহিক বিষয়াদি পরিচালনার যে ইতিবৃত্ত-আভাস উপরোক্ত আলোচনার মধ্য দিয়ে ফুটে ওঠে, তার উপর দাঁড়িয়ে কয়েকটি বিশেষ দিকের উপর মনোনিবেশ করা যাক।

প্রথমত, সভা-বিদথ-সমিতি সমন্বিত যে রাজনৈতিক কাঠামোর পরিচয় পাওয়া যায়, সেখানে রাজনৈতিক শক্তি উৎপাদিত হচ্ছে বহু মানুষের একত্র সমাবেশের মধ্য দিয়ে। কারণ, এই সমাবেশে বহু পক্ষের মতপ্রকাশ, যুক্তি-তর্ক ও আলোচনার মধ্য দিয়ে অপরাপরের কাছে গ্রহণীয় যে জায়গা তৈরি হচ্ছে, তা সংহতির বিন্দু ও সংহত যৌথক্রিয়ার উৎসারণবিন্দুকে চিহ্নিত করছে। সুতরাং, রাজনৈতিক শক্তি এখানে সর্বসাধারণের সম্মিলন ও স্বতঃক্রিয়ার পরিসরে সদা-জায়মান অবস্থায় রয়েছে। এহেন অবস্থাকে বহুত্বের রাজনীতির স্ফূরণভূমি বলা যায়। বিষয়টিকে আরও স্পষ্ট করার জন্য বলা যায় যে, এখানে রাজনৈতিক শক্তি কোনও উচ্চাবচ ধাপবন্দি দৃঢ়সংবদ্ধ রাষ্ট্রকাঠামোয় অপরাপরের কাঠামো-নির্ধারিত অসমতা থেকে উৎসারিত নয়। তেমন এক ধাপবন্দি কেলাসিত রাষ্ট্রকাঠামোয় রাজনৈতিক শক্তি সদা-জায়মান অবস্থায় থাকে না, শিলীভূত অবস্থায় থাকে।

দ্বিতীয়ত লক্ষ্যণীয় সভায় অক্ষক্রীড়া (পাশাখেলা)-র মাধ্যমে বন্টনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ঋগ্বেদের অক্ষসূক্তে অক্ষকে সম্বোধন করে ‘ঋত’-এর দোহাই দিয়ে ধনসম্পদ মুক্ত করে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে (১.১৩২.৩, ১.১৪১.১, ১.১৫১.৩-৮, ২.২৭.১২, ৩.২০.৪, ৩.৫৪.৩, ৩.৫৬.২)। ‘ঋত’ শব্দটির মানে হলো স্বাভাবিক যুক্তি ও ন্যায়ের পরিপূরক চিরন্তন জাগতিক নিয়ম। তাই বোঝা যায় যে ধনের বন্টনকে ‘রুদ্ধ’ করা ‘চিরন্তন জাগতিক নিয়ম’-এর পরিপন্থী বলে ভাবা হতো, কোনওরকম ধন সঞ্চয় বা মজুত করাকে ‘অস্বাভাবিক’ বলে ভাবা হতো। বন্টনের জন্য অক্ষক্রীড়া (পাশাখেলা)-কে ব্যবহার করা দেখায় যে সবার প্রয়োজন মেটানোর মতো ভোগ্যবস্তু ছিল না, তাই, কেউ পাবে, কেউ পাবে না। কে পাবে আর কে পাবে না তা পূর্বনির্ধারিত নয়, তৎক্ষণাৎ দৈবক্রমে নির্ধারিত। এই প্রক্রিয়া তখনই বলবৎ হতে পারে যখন সামাজিক-রাজনৈতিক ক্ষমতার কোনও উচ্চাবচ নির্মাণ নেই, কারণ তেমন কোনও নির্মাণ থাকলে একটি সুবিধাভোগী অংশ থাকা অবশ্যম্ভাবী, যে সুবিধাভোগী অংশ পূর্বনির্ধারিতভাবেই অন্যদের সাপেক্ষে বন্টনে অধিক সুবিধা পাবে।

খৃস্টপূর্ব ১০০০ অব্দের পরবর্তী কালে, বৈদিক যুগের পরবর্তী ভাগে যখন ব্রাহ্মণ গ্রন্থগুলো লেখা হচ্ছে, তখন বহু জনগোষ্ঠীর মধ্যে সভা-বিদথ-সমিতি-র রাজনৈতিক পরিসরের ক্ষয় ও রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার উদ্ভবের কারণ কী ছিল? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজলে তিনটি তত্ত্বের হদিস পাওয়া যায়:

১। সামরিক প্রয়োজনের তত্ত্ব: ঐতরেয় ব্রাহ্মণ (১.১.৮.৪)-এ বলা হয়েছে যে দেবতা ও অসুরেরা দীর্ঘকালীন সংগ্রামে লিপ্ত ছিল এবং এই যুদ্ধে দেবগণের বারবার পরাজয় ঘটছিলো। তখন দেবগণ নিজেদের পরাজয়ের কারণ খুঁজতে গিয়ে সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে নেতার অভাবেই তঁাদের বারবার পরাজয় ঘটছে। তখন তঁারা সর্বসম্মতিক্রমে ইন্দ্রকে সার্বভৌম রাজা হিসাবে নির্বাচিত করেন। এর মধ্য দিয়েই রাজকর্তৃত্ব ও রাজতন্ত্রের শুরু।

২। দৈব উদ্ভব তত্ত্ব: শতপথ ব্রাহ্মণ (১১.১.৬.২৪)-এ হাজির করা এই তত্ত্বের মূলে আছে ‘অরাজকতা’ বা ‘মাৎস্যন্যায়’-এর ধারণা। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, অরাজকতা বা মাৎস্যন্যায়ের প্রতিকারের জন্য, দুর্বলের উপর সবলের উৎপীড়ন প্রতিহত করার জন্য সর্বকর্তৃত্বের অধিকারী করে রাজার সৃষ্টি। পরবর্তীকালে, এই মতকে আরও পরিপুষ্ট করে মনু হাজির করেন মনুস্মৃতি (৭.৩)-তে। মনুর মতে, পরমেশ্বর রাজাকে সৃষ্টি করেন ইন্দ্র, বায়ু, যম, সূর্য, অগ্নি, বরুণ, চন্দ্র ও কুবের, এই অষ্টদেবতার সারভূত অংশ আকর্ষণ করে।

৩। সামাজিক চুক্তির তত্ত্ব: এই তত্ত্বের কথা কৌটিল্য বলেছেন। তঁার মতে, মাৎস্যন্যায়ে নাজেহাল হয়ে জনগণ বৈবস্বত মনুকে নিজেদের রাজা নির্বাচিত করে এবং নিয়ম করে যে তিনি ফসলের ষষ্ঠাংশ, পণ্যের দশমাংশ ও হিরণ্য ভাগধেয় (কর) রূপে গ্রহণ করে প্রজাদের সুরক্ষা, যোগ ও ক্ষেমের ভার বহন করবেন।

প্রথম তত্ত্বে যে দেবতা ও অসুরদের দীর্ঘকালীন সংগ্রামের কথা বলা হয়েছে, সেই দেবতা ও অসুর কারা? দেবতা= বাইরে থেকে আসা আর্য জনগোষ্ঠী, অসুর= আগে থেকে বসবাসকারী অনার্য জনগোষ্ঠী— বহুজন এমন অনুমান করেছেন। কিন্তু ঋগ্বেদের সাক্ষ্য বিচার করলে দেখা যাবে যে ঋগ্বেদে অসুর বলতে ইরান অঞ্চলে বসবাসকারী আর্যভাষী মানুষদের বোঝানো হয়েছে যারা ভারতবর্ষেও বিপুল সংখ্যায় বাস করত। ঋগ্বেদের বহু জায়গায় অসুর শব্দটি সম্ভ্রমসূচক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ঋগ্বেদে বলা হয়েছে যে অসুররাজ বিরোচন দেবরাজ ইন্দ্রের সঙ্গে একইসঙ্গে ব্রক্ষ্মবিদ্যালাভের জন্য সচেষ্ট হয়েছিলেন। দেবতা বরুণেরও উপাধি ছিল অসুর। ফলে, অনুমান করা যায় যে ‘অসুর’ শব্দের অর্থের অবনতি ও ‘দেবতা’ শব্দের অর্থের মহিমায়ন পরবর্তীকালে ঘটেছে, ঋগ্বেদের সময়ে দেবতা ও অসুর বলতে অপরাপর দুই জনগোষ্ঠী ছাড়া অন্য কিছু বোঝাত না। অসুর ছাড়াও বৈদিক সাহিত্যে এমন আরও কিছু জনগোষ্ঠীর পরিচয় পাওয়া যায় যারা ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির থেকে পৃথক সংস্কৃতির ধারক ছিলেন, যেমন:

দাস: ঋগ্বেদ থেকে দাসদের সম্পর্কে জানা যায় যে তারা সুরক্ষিত দুর্গে (আয়সীঃ পুরঃ) বাস করত এবং অনেকগুলো গোষ্ঠী (বিশঃ)-তে বিভক্ত ছিল। তাদের সভ্যতা ছিল নাগরিক ও সমৃদ্ধিশালী। তাদের দেহ ছিল কালোরঙা (কৃষ্ণত্বচ্), নাক ছিল ছোট (ক্ষুদ্রনাসা)। তাদের ভাষা আর্যভাষীদের কাছে সহজবোধ্য ছিল না। ইলিবিশ, ধুনি, চুমুরি, শম্বর, বর্চী, পিপ্রু প্রভৃতি দাসরাজাদের উল্লেখ ঋগ্বেদে আছে।

দস্যু: ঋগ্বেদে দস্যুদের বলা হয়েছে আচারবিহীন (অকর্মন্), দেবগণের প্রতি উদাসীন (অদেবয়ু), ভক্তিবিহীন (অব্রক্ষ্মণ), যজ্ঞবিহীন (অযজ্বন), ব্রতবিহীন (অব্রত), ভিন্ন বিধির অনুসারী (অন্যব্রত) এবং দেববিদ্বেষী (দেবপীয়ু)। অনুমান করা যায় যে দেবগণ নামক জনগোষ্ঠীর থেকে ভিন্ন আচার-বিশ্বাস সম্পন্ন ও দ্বন্দ্ব-সম্পর্কে যুক্ত এক বড় জনগোষ্ঠীর কথা এখানে বলা হচ্ছে।

পণি: ঋগ্বেদের সূত্রে জানা যায় যে পণিরাও দাস ও দস্যুদের মতো ব্রাহ্মণ্যসংস্কৃতির অপর ছিল। তাদের প্রচুর গরু (গোধন) ছিল। বল নামে তাদের একজন গোষ্ঠীপ্রধান-এর কথা ঋগ্বেদ-এ আছে। পণিদের কাছ থেকে গরু লুঠ করার সময় ইন্দ্র এই বল-কে বিদ্ধ করেছিল।

অন্যান্য: ঋগ্বেদ-পরবর্তী সংহিতা ও ব্রাহ্মণ গ্রন্থগুলোয় আর্য জনগোষ্ঠীর অপর জনগোষ্ঠী হিসাবে অন্ধ্র, পুন্ড্র, মুতিব, নিষাদ, কিরাত, শবর, পুলিন্দ ইত্যাদির উল্লেখ পাওয়া যায়।

সুতরাং, অনুমান করা যায় যে আর্য সংস্কৃতির ধারক বহু জনগোষ্ঠীর মধ্যে দেবগণ একটি জনগোষ্ঠী ছিল, আর, অসুর-দাস-দস্যু-পণি-র মতো বহু অনার্য সংস্কৃতির ধারক জনগোষ্ঠীও ছিল। আচার-ব্যবহার-সংস্কৃতি-র সঙ্গে বস্তু-সম্পদ (যার মধ্যে একটি প্রধান সম্পদ ছিল গরু) আয়ত্ত করার বিষয়েও তাদের মধ্যে পার্থক্য ছিল এবং এই পার্থক্য উপজাত বিরোধ-সংঘাতও ছিল। দেবতা ও অসুরদের মধ্যে দীর্ঘকালীন সংগ্রাম বলতে ঐতরেয় ব্রাক্ষ্মণে অপরাপর জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই বিরোধ-সংঘাতের কথাই বলা হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যায়। এই বিরোধ-সংঘাতে নিজেদের উপর্যুপরি ব্যর্থতা কাটিয়ে সফলতা অর্জন, কর্তৃত্ব বিস্তার ও বস্তু-সম্পদের উপর দখলবৃদ্ধির উপায় নির্ধারণের জন্য দেবগণ চিন্তিত হয়ে উঠেছিল। উপায় নির্ধারণও করেছিল। এই উপায় হলো গণ-বিদথ-সমিতি-র ভূমিকা খর্ব করে ইন্দ্রের হাতে কিছুটা একনায়কসুলভ ক্ষমতা তুলে দেওয়ার মধ্য দিয়ে অপরের উপর আধিপত্য করার শক্তি বৃদ্ধি করা। পণিদের থেকে গরু লুঠে নেতৃত্ব দেওয়া ও সেই সময় পণিদের প্রধান যোদ্ধা বল-কে বিদ্ধ করার আখ্যান দেখায় যে অপরকে দমন ও অপরের সম্পদ দখল করার জন্য হিংসাত্মক উপায় অবলম্বনে ইন্দ্র কুশলী ও নির্দ্বিধ ছিল, বা এভাবেও বলা যায় যে, নির্দ্বিধভাবে এই হিংসাত্মক পন্থা অবলম্বনের মতধারী ছিল ইন্দ্র। গোষ্ঠীগতভাবে অপর হিসেবে চিহ্নিত জনেদের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নির্দ্বিধ হিংসার বাখানের বিকল্প নানা মতও নিশ্চয়ই ছিল জোরালো, তাই দেবগণের সভা-বিদথ-সমিতি নিঃসংশয়ভাবে এই আক্রমণাত্মক কর্তৃত্ববাদী পথের পক্ষে সবসময় দাঁড়াচ্ছিল না। ইন্দ্রকে একনায়ক করার মধ্য দিয়ে এই আক্রমণাত্মক কর্তৃত্ববাদী পথকে বহু বিকল্প বিবেচনার মধ্য দিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার ‘বিড়ম্বনা’ থেকে ‘মুক্ত’ করা হয়েছে। আর, গোষ্ঠীর বাইরে অপরদের সঙ্গে সম্পর্কে যদি কর্তৃত্ববাদী মনোভাব শিরোধার্য হয়, তাহলে গোষ্ঠীর অভ্যন্তরেও অপরদের প্রতি সেই মনোভাবের ক্রমপ্রসারণ ঘটতে বাধ্য। গোষ্ঠীর বাইরের অপরদের উপর কর্তৃত্বস্থাপনের সংগ্রামে গোষ্ঠীর আত্মশক্তি উৎপাদনের জন্য যে সামরিক ঐক্য-শৃঙ্খলা গোষ্ঠীর অভ্যন্তরে প্রতিষ্ঠা করতে হয়, তা গোষ্ঠীর অভ্যন্তরের যে কোনও অপরকে, যে কোনও বিকল্প প্রস্তাবকে শৃঙ্খলা-চ্যুতি বা শৃঙ্খলার জন্য সমস্যা হিসেবেই দেখে এবং যত দ্রুত সম্ভব তা দমন করে শৃঙ্খলা পুনরুৎপাদিত করতে চায়। ফলে সভা-বিদথ-সমিতি-র পরিসর, অর্থাৎ, বহু মতের উপস্থাপনা-তর্ক-বিতর্ক-সংশ্লেষ-এর পরিসরকে ধ্বংস করে গড়ে ওঠে রাজকীয় কর্তৃত্বের পরিসর, যেখানে অপরাপর বহু মতের প্রকাশ ও চর্চাকে পরিসর না দিয়ে সর্বমঙ্গলের জন্য নির্দিষ্ট একটি নির্বিকল্প মতের উৎপাদন- পুনরুৎপাদন-কর্তৃত্বস্থাপনকেই নির্বাধ করা হয় । ফলে, জন্ম নেয় পরিষদ-এর পরিসর, যেখানে সব রাজন্যর (সর্বসাধাণের) রাজনৈতিক স্বতঃক্রিয়ার অধিকার আত্মসাৎ করে গড়ে ওঠে সার্বভৌম রাজা ও তাকে ঘিরে থাকা অভিজাতমণ্ডলীর একচেটিয়া রাজনৈতিক ক্ষমতা। এই ক্ষমতার যৌক্তিকতা-উৎপাদককারী হিসেবে ব্রাহ্মণরা বাক-রীতি-আচার-আচরণে একমেবাদ্বিতীয়ম শুদ্ধতার মান রূপ হাজির করেন। রাজন্য-ব্রাহ্মণ সন্ধিবলে শৃঙ্খলার শৃঙ্খল দিয়ে বেঁধে নিষ্পেষণের মাধ্যমে সমস্ত বৈচিত্র্য-বহুত্ব-কে পিষে মারার ব্যবস্থা তৈরি হয়।

আরও একটা বিষয় এখানে খেয়াল করা যেতে পারে। হিংসার একটা চরিত্র আছে। সেই চরিত্র হলো এই যে, যার উপর হিংসা প্রয়োগ করা হয়, সমসম্মানের অবস্থান থেকে তার অবনমন ঘটানো হয়। কোনও বস্তুকে নির্গুণ, ইতর বা দুর্বৃত্ত হিসেবে হাজির করার মধ্য দিয়ে তার উপর হিংসা প্রয়োগের পথ প্রস্তুত হয়। দেব-ভাষ্যে বা প্রমিত আর্য-ভাষ্যে ‘অসুর’, ‘দাস’ ও ‘দস্যু’ শব্দগুলির অর্থের অবনমন এইভাবেই সাধিত হয়েছে বলে মনে হয়। আর্য-বাচ্য শুদ্ধ সংস্কৃত ছাড়া বাকি সব আঞ্চলিক ভাষাকে অশুদ্ধ, বিকৃত, অক্ষমতা-জাত, অপবিত্র বলে প্রতিষ্ঠা করাও এই সমসম্মানের অবস্থান থেকে অবনমনের উপায় বিশেষ।

এবার বিচার করা যাক মাৎস্যন্যায়ের আখ্যানটি, যা শতপথ ব্রাক্ষ্মণে ও কৌটিল্য ভাষ্যে উপস্থাপিত হয়েছে। মাৎস্যন্যায় শব্দস্থিত ধারণাটি একটি পূর্বাপর ধাপবন্দী ক্ষমতা-পরিসরে হিংসার অবারিত দৌরাত্মের আভাস নিয়ে আসে। বড়ো মাছ গিলছে মেজো মাছকে, মেজো মাছ গিলছে সেজো মাছকে, সেজো মাছ গিলছে ছোটো মাছকে... এইভাবে সর্বোচ্চ থেকে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অবধি হিংস্র আধিপত্যবিস্তারের ছেদহীন প্লাবন যখন রীতি-আচার-নিয়ম-এর সমস্ত গণ্ডীকে ভাসিয়ে দেয়, মানুষ তখনই না তার এই পতনকে মৎস্যধর্মের প্রকোপ বলে নিরাময়ের পথ খোঁজে! সর্বোচ্চ থেকে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অবধি আধিপত্যবিস্তারের এই ছেদহীন হিংস্রতা অসমান অবস্থানের এক ধাপবন্দী পরিসর ছাড়া অনর্গল হতে পারে না। অপরাপর বহুর মধ্যে পরস্পরকে সম্মান করার সম্পর্ক যখন অবসিত হয়, সহমর্মিতার পরিসর গঠনের যৌথক্রিয়া যখন পরিত্যক্ত হয়, তখনই এমন ধাপবন্দী পরিসর গড়ে উঠতে পারে। এই পরিসরে মানুষ একে অপরের উপর ভরসা হারায়, সবাই সবাইকে সন্দেহের চোখে দেখে, ফলে গণ-এর কোনও রাজনৈতিক যৌথক্রিয়া সম্ভবপর হয় না। এই অবস্থাতেই ভরসার স্থল হয়ে ওঠে ‘উপকারী স্বৈরতন্ত্র’। অপরাতঙ্ক, ভরসাহীনতা, সন্দেহের আবর্তে ঘেরা বিচ্ছিন্ন দ্বীপ হয়ে ওঠে প্রতিটি মানুষ। উঁচুতে মাচা বেঁধে তার উপর কোনও প্রাধিকারকে স্থাপন করে তার হাতে শাসনভার তুলে দেয় বিচ্ছিন্ন মানুষ, প্রার্থনা করে যে মাচানবাবার স্বৈরতন্ত্র আপদরূপী অপরদের নিয়ন্ত্রণে বা শাসনে বেঁধে তার স্বার্থ রক্ষা করবে। তখন সার্বভৌম রাজাকে প্রাকৃতিক শক্তির মতো অমোঘ করে কল্পনাবিভ্রমে মানসজগত ছেয়ে যায়। আর অনুরূপভাবেই সমস্ত কাজে প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে বিশেষজ্ঞদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ-আধিপত্য: শিক্ষা ও জ্ঞান পণ্ডিতমশায়দের কুলুঙ্গিতে রক্ষিত সম্পদ হয়ে ওঠে, ভাষা হয়ে ওঠে বৈয়াকরণ ও ভাষাপণ্ডিতদের বাপকেলে সম্পত্তি, কারণ এই সমস্তও শৃঙ্খলাশৃঙ্খল কষে বাঁধার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে ওঠে।

এই পটভূমিতে ব্যাকরণের উদ্ভব কেমনভাবে ঘটলো তা এবার দেখা যাক। পূর্বে উদ্ধৃত অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণ-এর লেখায় আমরা দেখেছি যে বেদের অর্থ স্পষ্টীকরণের জন্য বেদাঙ্গ-এর অংশ হলো ব্যাকরণ। বেদাঙ্গ মোট ছয়টি--- শিক্ষা, কল্প, ব্যাকরণ, নিরুক্ত, জ্যোতিষ, ছন্দঃ। ভাষার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত বেদাঙ্গ এদের মধ্যে তিনটি--- শিক্ষা, ব্যাকরণ, নিরুক্ত।

 শিক্ষাগ্রন্থগুলোর উদ্দেশ্য হলো উচ্চারণের সঠিকতা নির্ধারণ করা আর সেজন্য ভাষাগত ধ্বনিসমূহের, স্বরসমূহের, বর্ণসমূহের বর্গীকরণ করা, বর্ণমালা বেঁধে দেওয়া। এই শিক্ষাগ্রন্থগুলোর চেয়ে প্রাচীনতর হলো প্রআতিশাখ্যগুলো যার মধ্যেও পদপাঠ প্রভৃতির বিবরণ পাওয়া যায়। প্রত্যেক বৈদিক শাখার নিজস্ব শিক্ষা অথবা নিজস্ব প্রাতিশাখ্য তৈরি হয়েছিলো, ক্রমশ তার মধ্য থেকেও সঠিকতমের দিকে কেন্দ্রীভবনের প্রবণতা তৈরি হলো।

প্রতিটি বৈদিক বাণীর ব্যাখ্যান করা, অর্থাৎ সেই বাণীর এক-একটা খণ্ডকে খুলে দেখিয়ে সবিস্তারে বোঝানোর যে কাজ, তার সূত্রে প্রত্যেকটা শব্দের অর্থ ভেঙে বলা বা স্পষ্টীকরণ করাই হলো ব্যাকরণ অঙ্গের অভিপ্রায়। আর, কোনো না কোনো ধাতুর সঙ্গে যুক্ত করে প্রত্যেক শব্দের ব্যুৎপত্তি যেখানে নির্ধারণ করা হয়েছে, সেই বেদাঙ্গগুলোই হলো নিরুক্ত।

এখন এই প্রশ্নটা করা যাক: শুদ্ধ উচ্চারণ এতো জোর পেয়েছিলো কোন যুক্তির বলে? না, শ্রুতিমাধুর্য বা পরম্পরা-রক্ষা মূল যুক্তি ছিলো না। যুক্তির নিগড় তৈরি হয়েছিলো মানুষের ইহকাল-পরকাল-এর কামনা-বাসনা-আকাঙ্ক্ষার প্যাঁচ কষিয়ে। ব্রাক্ষ্মণেরা ঘোষণা করেছিলেন: বৈদিক পাঠই (অবশ্যই শুদ্ধ পাঠ) একদিকে যেমন স্বর্গলাভের একমাত্র উপায়, অন্যদিকে তেমনই সঠিক উচ্চারণে বৈদিক মন্ত্রপাঠই হলো যজ্ঞের সাধন ও তার মদ্য দিয়ে ইহজাগতিক সাফল্য ও বৈভব অর্জনের একমাত্র উপায়। দ্বিতীয়ত, ব্রাহ্মণ পণ্ডিতেরা ঘোষণা করলেন যে বেদ অপৌরুষেয়, অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ বেদ রচনা করেননি, বেদ অনাদি, তাই বেদ নিত্য। যা অনাদি ও নিত্য, তা তো পরিবর্তমান হতে পারে না, বহু বিকল্প রূপও তার হতে পারে না, সুতরাং একটাই পবিত্র নির্বিকল্প রূপ তার থাকতে হবে। কোনো অনিত্য লৌকিক ভাষার ছোঁয়া থেকে কোনোরকম দূষণ যেন বেদের নিত্যতার গায়ে না লাগে সেই রক্ষাকবচ তৈরি করতে তাই তাঁরা লৌহকঠিন বিধিবিধান তৈরি করতে বসলেন।

ইহজগত-পরজগত-অভিব্যক্তকারী নির্বিকল্প শব্দসমূহের অর্থোৎপাদনপ্রক্রিয়াকে পূর্বপ্রদত্ত নীতি-নিয়মে বেঁধে একটিই সঠিক ভাষা নির্ধারণ করা ও তার মধ্য দিয়ে অন্যতর ভাষাসমূহকে বিকলাঙ্গ অপভ্রংশের নরককূণ্ডে নিক্ষেপ করার অভিপ্রায় ব্যাকরণ নামক ‘শব্দানুশাসন’ বা ‘শব্দশাস্ত্র’-এর জন্ম দিলো। বি+কৃ এবং বি+আ+কৃ এই দুটি ক্রিয়াই বৈদিক সংহিতায় ও সাহিত্যে পাওয়া যায়, প্রথমটি থেকে আমরা ‘বিকরণ’ নামপদ পাই, আর দ্বিতীয়টি থেকে ‘ব্যাকরণ’ নামপদ পাই। সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত মাধব দেশপাণ্ডে এই দুইয়ের ভেদ নির্ণয় করেছেন এইভাবে:

বৈদিক পাঠ্যসমূহের আর সংহিতাসমূহের অনুধাবন করতে গিয়ে সম্ভবত ধরে নেওয়া দরকার যে অবয়ব এবং অবয়বী, অর্থাৎ ভাগ এবং যে-পূর্ণের-সে-অন্তর্গত-সেই-সম্পূর্ণবস্তু, উভয়েই যে যার স্বরূপসত্তায় বাস্তবিক বলে বিবেচ্য। বি+কৃ আর বি+আ+কৃ এই দুটি ক্রিয়া বুঝিয়ে দেয় অবয়বীর অন্তর্গত অবয়ব কী করে আলাদা আলাদা করে চিনতে হয় তার ভিন্ন ভিন্ন রীতি; এতে কিন্তু অবয়বগুলির স্বতন্ত্র অস্তিত্ব অস্বীকার করার কোনো ইঙ্গিত থাকে না।… যে রীতিই ধরি না কেন, বি+কৃ আর বি+আ+কৃ উভয় ক্রিয়াই বিভাজনের প্রক্রিয়াটিকেও শনাক্ত করে। অবয়বীর অবয়বকে ধাপে ধাপে স্পষ্ট তথা আকলনযোগ্য করে তোলে এই প্রক্রিয়া। সৃষ্টির আর নির্মাণের বিবিধ বিবরণে দেখা যায় অবয়বীর ভিতরে যে বিভাজনের প্রক্রিয়া চলছে তার তত্ত্ব (বি+কৃ ধাতুতে এই অর্থ প্রকাশ পায়), এবং যখন বাইরে থেকে এই বিভাজন অবয়বীর উপর চাপিয়ে দেওয়া হয় তখন সেই অর্থ ফুটিয়ে তোলা হয় বি+আ+কৃ ধাতুর মাধ্যমে। ব্যাকরণবিচারের পরম্পরার বিকাশের সমুচিত অভিব্যক্তি পাচ্ছি এই ক্রিয়ায়।

(মাধব দেশপাণ্ডে, ‘Building Blocks or Useful Fictions: Changing View of Morphology in Ancient Indian Thought’ প্রবন্ধ, যা সংকলিত হয়েছে ডিক ভ্যান ডের মেইজ সম্পাদিত ‘In India and Beyond’-এ, ১৯৯৭, লিডেন ও আমস্টারডাম: ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ এশিয়ান স্টাডিজ, পৃঃ ৮১-৮২, মূল ইংরেজি থেকে বাংলা তর্জমা প্রবাল দাশগুপ্ত করেছেন।)

যে দার্শনিক প্রস্থানবিন্দুকে এখানে ভিত্তি বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে, তা এই পূর্বধারণার উপর দাঁড়িয়ে আছে: যে বহু বিভিন্ন বিচিত্র অবয়বসমূহের মধ্য দিয়ে জগৎ আমাদের কাছে প্রতিভাত হয়, সে সবই যে-পূর্ণের-সে-অন্তর্গত-সেই-সম্পূর্ণবস্তু, অর্থাৎ, অবয়বী-র সাময়িক রূপ মাত্র; এই সাময়িক রূপ বিশ্লেষণ করে চিরন্তন অবয়বীর সঙ্গে যোগ স্থাপন করাই বিধেয়। শুদ্ধ সংস্কৃত শব্দই সেই শুদ্ধ রূপ যার বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে এই যোগ স্থাপন সম্ভব। অন্য সমস্ত লৌকিক ভাষার শব্দ শুদ্ধ নয়, বরং বিকৃত, অসম্পূর্ণ, তাই তা এই যোগ-স্থাপক-বিশ্লেষণের যোগ্য নয়। এখন যোগ-স্থাপক-বিশ্লেষণ বিকরণ নাকি ব্যাকরণ? বিকরণে যে বিভাজন প্রক্রিয়ার কথা বলা হচ্ছে সে প্রক্রিয়া অবয়বীর ভিতরে নিজে নিজেই সংঘটিত হচ্ছে, ফলে কেবলমাত্র অবয়বের নয়, অবয়বীর স্বসত্তাও যে নিজ প্রবণতাতেই বহু ও বিভিন্ন হয়ে ওঠে তা স্বীকার করা আবশ্যক করে তুলছে। কিন্তু ব্যাকরণ যে বিভাজন প্রক্রিয়ার কথা বলছে, তা অবয়বীর ভিতরের কোনো বিভাজন নয়, সে বিভাজনটা ঘটানো হচ্ছে বাইরে থেকে, বা বাইরে থেকে তা অবয়বীর উপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ব্যাকরণশাস্ত্রে বিবেচিত এই বিভাজন বৈয়াকরণ রচনা করছেন বাইরে থেকে প্রকৃতিপ্রত্যয়বিভাগের নির্বিশেষ বিভাজন-ধারণা কল্পনা করার মধ্য দিয়ে। এখানে তাই অবয়বীর বিভাজন-অসম্ভব নির্বিকল্প একত্বকে প্রশ্নাতীত করে রেখেই সব কাজ সারা হচ্ছে।

জোট-বাঁধা রাজতন্ত্র-ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের অভিপ্রায় যখন শুদ্ধতা-নৈতিকতা-ঈশ্বরমুখীনতা-র নির্বিকল্প পথের পাহারাদার-পারকর্তা হিসেবে নিজেদের আধিপত্যের যৌক্তিকতা নির্মাণ করা, তখন বিকরণ নয়, ব্যাকরণই তার বেশি সহায় হতে পারবে অবয়বীর নির্বিকল্প একত্বের কল্পনাকে হাতিয়ার করে। বিকরণ নয়, ব্যাকরণই তাই আর্য-জ্ঞানচর্চায় বিকশিত-প্রস্ফুটিত হয়ে উঠলো।

সংস্কৃত ব্যাকরণের প্রধান ধারা হিসেবে পাণিনীয় ব্যাকরণ স্বীকৃত। পাণিনীর সময়কাল সাধারণত খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম বা ষষ্ঠ শতাব্দী বলে ধরা হয়। পাণিনির পূর্বেও বহু বৈয়াকরণ কাজ করেছেন, কিন্তু পাণিনি-ই তাকে সর্বোচ্চ সংহত রূপ দিলেন বলে মনে করা হয়। পাণিনীয় ঐতিহ্যকে আরো সম্প্রসারিত করেছেন তাঁর প্রায় এক শতাব্দী পরে কাজ করা কাত্যায়ন বা বররুচি (যিনি প্রায় পাঁচশোরও বেশি পাণিনিসূত্র ধরে চার হাজার বার্ত্তিক, অর্থাৎ, স্পষ্টীকরণ-হেতু-সংক্ষেপবাক্য লিখে গেছেন) এবং খ্রিস্টপূর্ব ২০০ সালে আবির্ভূত পতঞ্জলি (যিনি বার্ত্তিক ও সূত্রগুলোর ভাষ্য লেখেন)। পাণিনি-র মূল কাজ অষ্টাধ্যয়ী, অর্থাৎ, সূত্রপাঠ-এ পাণিনি যে বর্ণমালা হাজির করেছেন, বলা হয়েছে তা শিব-সূত্র থেকে প্রাপ্ত। কাশিকা নামক এক টীকার আরম্ভে পাওয়া যায়:

নৃত্তাবসানে নটরাজরাজো ননাদ ঢক্কাং নবপঞ্চবারম্।

উদ্ধর্তুকামঃ সনকাদিসিদ্ধান্ এতদ্ বিমর্শে শিবসূত্রজালম্।।

বাংলায় এর অর্থ:

তাণ্ডবনৃত্যের শেষে সনকা ও অন্যান্য ঋষিদের সিদ্ধি ও কামনাপূরণের জন্য শিব চোদ্দবার ডমরু বাজালেন। এইভাবে আবির্ভূত হলো চোদ্দটি শিবসূত্রের এই জাল, অর্থাৎ, শিবসূত্রের আকারে এই বর্ণমালা।

চোদ্দটি শিবসূত্র আকারে এখানে ছাপ্পান্নটি বর্ণের এক বর্ণমালা এখানে হাজির করা হয়েছে। পূর্বে আলোচিত মূর্ধণ্য ধ্বনিমূলগুলো এখানে অনুপস্থিত। এই বর্ণমালাই যে শুদ্ধ বর্ণমালা তার যৌক্তিকতা বিধান করা হয়েছে তা দেবতা শিব দ্বারা প্রদত্ত বলে গল্প তৈরি করে। পাঠকরা যদি ইতিমধ্যেই ধৈর্য হারিয়ে ফেলে না থাকেন, তাহলে একটু খুঁজে দেখা যাক যে অক্ষরমালার মান্যতাকে শিব-এর মহিমা দিয়ে ঠেকনো দেওয়ার তাৎপর্য কী হতে পারে।

ঋগ্বৈদিক যুগের অধিকাংশ পর্যায়ে শিব আর্যদের প্রধান দেবতা ছিলো না। একদম প্রারম্ভকালে প্রধান দেবতা ছিলো বরুণ, তারপর প্রধান দেবতা হিসেবে উঠে আসে ইন্দ্র, অগ্নি, সোম। এছাড়া রুদ্র, মিত্র, বায়ু-র মতো দেবতারা ছিলো দ্বিতীয় সারিতে। বহু শতাব্দী পরে বৈদিক যুগের শেষ পর্যায় এবং তার পরবর্তী উপনিষদ-মহাকাব্য-পুরাণ-এর যুগে এসে আমরা ধীরে ধীরে ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর এই তিনজনাকে আর্য দেবকুলজিতে প্রধান তিন দেবতা হিসেবে উঠে আসতে দেখি। পুরোনো প্রধান দেবতাদের প্রতিস্থাপিত করে নতুন প্রধান দেবতাদের উত্থান ভাবনা-চিন্তার জগতে যেমন, সমাজ-রাজনীতির জগতেও কী পরিবর্তনের হাত ধরে হয়েছিলো তা সুকুমারী ভট্টাচার্য তাঁর গবেষণাগ্রন্থে (Sukumari Bhattacharji, The Indian Theogony: A Comparative Study of Indian Mythology from the Vedas to the Purāṇas, 1970, Cambridge University Press) বিশদ আলোচনা করেছেন, তা উৎসাহী পাঠক পড়ে দেখতে পারেন, আমরা এখানে শুধু তাঁকে অনুসরণ করে শিব-এর উত্থানকাণ্ডটিকে একটু ঘেঁটে দেখবো। একটু দীর্ঘ হলেও সুকুমারী ভট্টাচার্যের লেখা থেকে এই উদ্ধৃতিটিতে একটু মনোযংযোগ করা যাক:

ঋগ্বেদ-এ শিব-এর চরিত্র-রূপরেখাটি যথেষ্ট পরিমাণ অনিবন্ধিত ও বহু-দ্যোতক থাকার ফলে পরবর্তীতে তা সমন্বয়করণের মধ্য দিয়ে বিকশিত হতে পেরেছিলো। যে ঋগ্বেদীয় দেবতাদের চরিত্র রূপরেখা ছিলো অতি নিবন্ধিত, যাদের কীর্তি ছিলো অতি সুপরিচিত, অতি বারংবার যাদের অতি সুস্পষ্ট ও পূর্ণভাবে বর্ণনা করা হয়ে গেছে, তারা আর ভিন্নতর ব্যাখ্যা বা পরবর্তী অদল-বদল-এর জন্য উপযুক্ত ছিলো না, তাই তাদের ক্ষমতা-সম্ভাবনা-ও অতি দ্রুত নিঃশেষিত হয়ে গিয়েছিলো। একটা সময়পর্যায়ের পর তারা নিশ্চল হয়ে গেলো কারণ নতুন কোনো গুণাবলী আর তাদের উপর আরোপ করা সম্ভব নয়, নতুন কোনো আচার-অনুষ্ঠানো তাদের সঙ্গে জোড়া সম্ভব নয়। ইন্দ্র ও অশ্বিনরা তেমন দেবতাদের উদাহরণ। পাশাপাশি, সমাজ যখন বিভিন্ন জনজাতি ও জাতিগোষ্ঠীর ভিন্ন-ভিন্ন আচারগত চাহিদাকে সঙ্গে নিয়ে সচল থাকতে চায়, তার আচার-অনুষ্ঠান-আধ্যাত্মিক প্রয়োজনও রূপান্তরিত হতে-হতে যায়, তার দেবতারাও রূপান্তরিত হয় এবং তাদের দেবকুলের গোটা বিন্যাসটাই বদলে যায়। আশপাশের পড়শি নানা দেবতা তাদের আচার-অনুষ্ঠান-গত দাবি সহ ‘উচ্চবেদির দেবতা’-দের আনুগত্য প্রকাশ করে, একটা জোট তৈরি হয়, নতুন আচার-অনুষ্ঠানের বিধি যুক্ত করে নেওযা হয়, প্রাণময় ব্যবস্থার অংশ হয়ে ওঠে এবং এই প্রক্রিয়া চলতে চলতে উচ্চবেদিস্থ দেবতাটি এতোটাই বদলে যায় যে তাকে আর চেনা যায় না।… …ঋগ্বৈদিক শিবের একদিকে যেমন শক্তি ও ক্ষমতা ছিলো, সে ছিলো উপশমকারী, সীমাহীন দানশীল, অন্যদিকে সে এমনই এক হিংস্র ও ক্রোধ-উত্তপ্ত তীরন্দাজ যার তীরের নাগাল এড়িয়ে চলাই বিধেয়। বাজসনেয়ি সংহিতা ও যজুর্বেদের তৈত্তিরিয় সংহিতা, যেখানে প্রথম অ-ঋগ্বৈদিক শিব-কে দেখা গেলো, সেই উভয় সংহিতাতেই শিবের ওই দ্বৈত সম্ভাবনাকে সবিস্তারে ব্যবহার করা হয়েছে। তাঁর চরিত্র-মধ্যে সমস্ত অন্ধকারের পাতালবাসী দেবতাদের আত্তীকরণ করে নেওয়ার জন্য শিব ধ্বংস ও ক্ষতি সাধনে অপার সম্ভাবনাধর হয়ে উঠলো।… …জনসংখ্যাবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে একের পর এক গ্রাম যখন আর্যায়িত আচার-ব্যবহার-সংস্কৃতি-তে প্রভাবিত হয়ে পড়লো, একের পর এক আঞ্চলিক দেবতা রুদ্র (শিব)-এর মধ্যে আত্তীকৃত হয়ে গেলো--- কেউ কেউ পাহাড়ের দেবতা হওয়ার কারণে, কেউ সাপ বা মোষ বা কপোত বা সিংহের সহ্গে যুক্ত হওয়ার কারণে, আবার কেউ প্রাচীন মাতৃদেবী বা শিকারিনী, কুমারী বা শস্যদেবীর সঙ্গী হওয়ার কারণে; কেউ যোগাভ্যাসের প্রতীক হওয়ার কারণে, আবার কেউ বুনো এবং মাংস-সুরা-নৃত্য-এর অনুরাগী হওয়ার কারণে; কিছু মৃত্যু-ও-ভূত-এর দেবতারাও ঢুকে গেলো, আগুন-ও-বাতাস-এর দেবতারাও এসে যোগ দিলো; যতক্ষণ না বিবিধ ভূমিকাধারী এমন এক যৌগিক ঈশ্বর-মুখ তৈরি হলো যা মানবজীবনের এক অতি বিশাল পাতাল অঞ্চলের প্রতীক হয়ে ওঠে এবং চেতনার অনাবিষ্কৃত গভীরতার দ্যোতনা হয়ে ওঠে।… … পৌরাণিক ত্রয়ী (ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর)  মধ্যে শিব চূড়ান্ত সংহার-এর প্রতীক। সেই চূড়ান্ত সংহার আসে শিবের মহাজাগতিক তাণ্ডব নৃত্যকে অনুসরণ করে। শিব-এর তাণ্ডব নৃত্য একটি কল্প (৪৩.২ কোটি বছর)-র অবসান চিহ্নিত করে। যে দেবতা দণ্ড (শাস্তি), অসি ও মৃত্যু সৃষ্টি করেছে--- যম, অগ্নি, নৈঋতি ও মারুতগণ যার মধ্যে উপাদান রূপে আত্তীকৃত হয়ে গেছে--- সেই দেবতাই তো চূড়ান্ত সংহারের দায়িত্ব নেবে। বস্তুসমূহের গতিতে এ এক অনিবার্য পর্যায়, কারণ সংহারই আবার নতুন সৃষ্টির জায়গা তৈরি করে দেয়, তাই শিব-এর ভূমিকা একান্তই অপরিহার্য। সর্বোচ্চ সংহারক হিসেবে শিব হয়ে ওঠে ব্রহ্মার সহযোগী। মহাজাগতিক পরিকল্পনার অপরিহার্য তৃতীয় অংশ, অর্থাৎ সংহারকাণ্ডের দায়িত্ব মহাকাল ও তাঁর সঙ্গী মহাকালী-র উপরই ন্যস্ত। এভাবেই ঋগ্বেদের একটি অপ্রধান দেবতা যজুর্বেদে এসে অশুভ ও শুভ বৈশিষ্টাবলীর যোগফল হয়ে দাঁড়ায়; ব্রাহ্মণগ্রন্থসমূহে যে দেবতাকে অপর বলে চিহ্নিত করে কোনো যাগযজ্ঞের অর্ঘ্য থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিলো, সে-ই ধীরে ধীরে পৌরাণিক ত্রয়ীর অন্তর্গত প্রাণময় দেবতায় রূপান্তরিত হলো।…

(সুকুমারী ভট্টাচার্য, The Indian Theogony: A Comparative Study of Indian Mythology from the Vedas to the Purāṇas, 1970, Cambridge University Press, ভারতীয় সংস্করণ-মোতিলাল বানারসীদাস (১৯৮৮), পৃঃ ২০৩-২০৭, মূল ইংরেজি থেকে বাংলা তর্জমা বর্তমান লেখকের করা।)

সুতরাং পাণিনির সময়কালে শিব প্রধান দেবতা হিসেবে উঠে এসেছে এক যুগ্ম প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে: একদিকে পুরোনো আর্য দেবতাদের বিভিন্ন ক্ষমতাকে নিজ মধ্যে শুষে নিয়ে তাদের চেয়ে শক্তিধর হয়ে ওঠার মধ্য দিয়ে [যেমন, পুরোনো দেবতা ইন্দ্রের শৌর্য ও শক্তির অতিকথা গড়ে উঠেছিলো অনার্য গোষ্ঠীপতি বৃত্র-কে সংহারের আখ্যানের উপর দাঁড়িয়ে, পরবর্তীতে মহাকাব্যের যুগে এসে আখ্যানটি পরিবর্তিত হলো এভাবে যে বৃত্র-কে পরাজিত করার জন্য দেবতারা যখন ব্রহ্মার দ্বারস্থ হয়, ব্রহ্মা তখন তাদের শিবের কাছে পাঠায়, শিব তার ‘গাত্রজ বর্ম’ খুলে দেয়, যে বর্ম পরিধান করে এবং যার জোরেই ইন্দ্র বৃত্র-কে হত্যা করে (মহাভারত, vii: ৬৯); মহাকাব্য ও পুরাণ-এ রুদ্র-শিব কল্পনার মধ্য দিয়ে অগ্নি ও শিবকে মিলিয়ে দেওয়া হয়; প্রহ্লাদ-হিরণ্যকশিপু-র পৌরাণিক আখ্যানে প্রহ্লাদের পক্ষ নিয়ে তার আরাধ্য বিষ্ণু যখন নরসিংহের রূপ নিয়ে প্রহ্লাদপিতা হিরণ্যকশিপু-কে আক্রমণ করে, তখন হিরণ্যকশিপুর আরাধ্য শিব তাকে রক্ষা করে নরসিংহের চেয়েও শক্তিশালী আটপেয়ে ডানাওয়ালা এক ভয়ঙ্কর পশুর রূপ ধরে, অর্থাৎ, বিষ্ণু শিবের কাছে পরাজিত হয়], আর অন্যদিকে অনার্যদের প্রকৃতি-উর্বরতা-কৃষিকাজ-এর বিভিন্ন দেব-দেবীকে নিজের মধ্যে আত্তীকৃত করে অথবা নিজের স্ত্রী-সহচর-অনুগামী-তে পরিণত করে। এই ধর্মীয়-অতিকথা-উৎপাদন যে সমাজ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের দ্বারা চালিত হচ্ছিলো এবং যে সমাজ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের যৌক্তিকতা নির্মাণ করছিলো, তা হলো একদিকে আর্যদের মধ্যে বিভিন্ন গোষ্ঠীর স্বশাসন ও পৃথকত্ব গুঁড়িয়ে এক-শাসন এক-আচার রাজতন্ত্র-ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের একশিলা কাঠামোয় বাঁধা (ফলে বিবিধ আর্য গোষ্টীদের বিবিধ কুলদেবতা হয় আত্তীকৃত হয়ে নয়তো পদানত হয়ে প্রধান কোনো দেবতার আধিপত্যে ক্রম-বিলীন হয়ে যাওয়া) ও অন্যদিকে অনার্যদের গ্রাম-জনপদ একের পর এক হিংসাত্মক শক্তির জোরে দখল করে একটা বড়ো অংশকে খুন বা উৎখাত করা আর বাকি অংশকে আর্য আধিপত্যাধীনে আর্য সমাজের সবচেয়ে নিচু ধাপে শামিল করে নেওয়া (যার ফলে অনার্য প্রকৃতি ও উর্বরতার দেব-দেবী-রা কিছু শিব-চরিত্রে আত্তীকৃত হয়েছে, কিছু শিবের পরিবার ও অনুচরমণ্ডলীর মধ্যে সেঁধিয়ে গেছে, কিছু অনার্য আচার-অনুষ্ঠান-ও দেবভজনার উপায় হিসেবে অনুমতি পেয়েছে)। রাজতন্ত্র-ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের প্রচার-প্রসারের মধ্য দিয়ে আর্যশক্তির শিলীভূত রূপ এই যে ধাপবন্দি ক্ষমতা-পরিসর নির্মাণ করছিলো, ক্ষমতাধরেদের রুদ্র হিংসা প্রয়োগের অবাধ ছাড়পত্র, অপরদের সংহার করার অবাধ ছাড়পত্র সেখানে অতি জরুরী--- তারই দার্শনিক ভিত্তি তৈরি করা হচ্ছে না কি দণ্ড(শাস্তি)-অসি-মৃত্যু-র স্রষ্টা শিবের তাণ্ডব নৃত্যের মধ্য দিয়ে সর্ব-সংহারক রূপে অত্মপ্রকাশকে মহাজাগতিক পরিকল্পনার অপরিহার্য অংশ বলে চিহ্নিত করার মধ্য দিয়ে?

সুতরাং, পাণিনি যখন তাঁর অক্ষরমালাকে শিবসূত্র আখ্যা দেন, ব্যাখ্যাত হয় যে তাণ্ডব নৃত্যের পরে নব সৃষ্টির সূত্র হিসেবে শিব এগুলো প্রদান করেছেন, তখন এই ধর্মীয় প্রতিমার পিছনে হিংসা-জর্জর সমাজ-রাজনৈতিক অন্তর্বস্তুটিও কি উঁকি দেয় না? রাজতন্ত্র-ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের হিংসাশক্তি-নির্ভর আধিপত্যকাঠামোর পদ্ধতি-প্রণালী-ই এখানে কাজ করছে: খাঁটি আর্য উচ্চারণ-বচন-ভাষাব্যবহার বেঁধে দিয়ে, শুদ্ধ শব্দ চিহ্নিত করার নামে বেছে-নেওয়া শব্দগুলোকে যে-পূর্ণের-সে-অন্তর্গত-সেই-পূর্ণবস্তু-র সঙ্গে সম্পর্কিত বলে অনন্যতা তৈরি করে অপর সমস্ত উচ্চারণ-বচন-ভাষারীতিকে অসম্পূর্ণ-অশুদ্ধ-বিকৃত বলে ঘোষণা করা হলো। এই পবিত্র ব্যাকরণে বাঁধা সংস্কৃত ভাষা ব্রাহ্মণ-রাজন্যদের মুখনিঃসৃত হয়ে ধাপে বাঁধা সমাজে তাদের উচ্চ স্থান-মান দখলের আর একটি যৌক্তিকতায় পরিণত হয়েছিলো, আপামর মানুষের মুখের ভাষাকে বোঝার বা প্রভাবিত করার কোনো উদ্দেশ্য তার ছিলো না, দায়ও ছিলো না।

এখানে, ব্যাকরণ ভাষার নিজের চরিত্রগত (অর্থাৎ, সামাজিক-রাজনৈতিক-নিরপেক্ষ) কোনো বিকাশ বা সংহতির জায়গা থেকে উদ্ভূত হয়নি, ফলে ব্যাকরণ-ওলা ভাষাকে নির্ভেজাল ভাষিক চরিত্রের বিচারে বিকাশ বা সংহতির উচ্চতর কোনো পর্যায়ভুক্ত বলে বলা যায় না। ধাপবন্দি সমাজ-রাজনৈতিক কাঠামোর ক্ষমতা-পরিসর অনুযায়ী ভাষাসমূহকে বিন্যস্ত করার একটা উপায় ছিলো ব্যাকরণ, তার যুক্তি ও দর্শনও সমাজ-রাজনীতির ক্ষমতাসূত্রে বাঁধা।

ভাষার নিজস্ব আভ্যন্তরীণ তাগিদ থেকে যে ব্যাকরণ তৈরি হয়নি, তা আমরা এই সূত্র থেকেও বলতে পারি যে সংস্কৃত ভাষা ছাড়া ভারতীয় উপমহাদেশের বাকি আরো হাজার হাজার লৌকিক ভাষায় দীর্ঘদিন অবধি (ইউরোপীয় ধর্মপ্রচারক ও ঔপনিবেশিকদের পা রাখার আগে অবধি) ব্যাকরণ তৈরির কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। ভারতীয় উপমহাদেশে আর্যভাষার চেয়েও পুরোনো মুণ্ডারী ভাষা, বিস্তীর্ণ অঞ্চলে শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে তা বিকশিত হয়েছে, মুণ্ডারীভাষীরা কখনও ব্যাকরণের প্রয়োজন অনুভব করেনি, ইউরোপীয় ধর্মপ্রচারকরা এসে তাদের ধর্মপ্রচারে আঞ্চলিক ভাষাকে হাতিয়ার করার জন্য এ ভাষা রপ্ত করার তাগিদে প্রথম মুণ্ডারী ভাষার ব্যাকরণ তৈরি করে বিশ শতকের গোড়ায়: ফলে এখানেও ব্যাকরণ ভাষার আভ্যন্তরীণ তাগিদ থেকে আসেনি, এসেছে বাইরের সমাজ-রাজনৈতিক ক্ষমতা-পরিসরে আধিপত্যবাদী অভিপ্রায়ের হাত ধরে।

আমরা সম্মান করে যাঁকে ভাষাচার্য নামে ডেকে থাকি, সেই সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়-এর পর্যবেক্ষণ মতে:

আর্য বচন যখন ১০০০ খৃস্টপূর্বাব্দের পরবর্তী কালে অধুনাতন বিহার অঞ্চলে অনুপ্রবেশ করে বসলো, তখন অ-বৈদিক অর্যদের কথ্যভাষা এইসব পুবের আর্য উপভাষাগুলোয় স্পষ্ট আলাদা কিছু উচ্চারণ-প্রবণতা ফুটে উঠেছিলো।

(সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়, The Origin and Development of the Bengali Language, ১৯২৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম প্রকাশিত, এখানে রূপা প্রকাশনী থেকে ২০১৭ সালে প্রকাশিত সংস্করণ থেকে উদ্ধৃত, পৃঃ ৪৩, মূল ইংরেজি থেকে বাংলা তর্জমা বর্তমান লেখকের করা।)

এখানে অ-বৈদিক আর্য মানে কারা? অনুমান করা যায় যে এরা হলো সেই ‘ব্রাত্য’-রা, যাদের বৈদিক আর্যরা ‘জাতিভ্রষ্ট’ বা ‘আচারহীন’ বলে দেগে দিয়েছিলো। বৈদিক আর্যরা এদের নিজেদের সমাজ থেকে বহিষ্কৃত করেছিলো, একইসঙ্গে এরাও ক্ষমতার বেড়ি পরানো ধাপকাটা কাঠামোয় স্বেচ্ছাবন্দি হতে চায়নি। বৈদিক আর্যদের আধিপত্যে চলে আসা অঞ্চল ছেড়ে এদের অনেকে তাই আরো পুবে সরে এসে বাস গেড়েছিলো। তদানীন্তন মগধ-এই সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় তারা জড়ো হয়েছিলো। বৈদিক ভাষা বা জ্ঞানের সঙ্গে তারা পরিচিত হলেও পূর্বে বর্ণিত নির্বিকল্প রূপসাধনের ক্ষমতাখেলার শরিক তারা ছিলো না। এদের প্রভাবেই মগধের অভিজাত উপরমহলের ভাষায় আর্য ভাষার ছাপ ফুটে উঠলেও তা সংস্কৃত ভাষার তুলনায় ছিলো অনেক খোলামেলা, আঞ্চলিক লৌকিক ভাষাগুলোর সঙ্গে তার মিথষ্ক্রিয়া কখনোই স্তব্ধ হয়ে যায়নি। সুনীতিবাবু বলেছেন যে এই ভাষা, যাকে আমরা ‘পুবের ভাষা’ বা ‘পুবের বচন’ বলতে পারি, তা বিস্তারলাভ-ও করেছিলো। মৌর্য শাসনকালে, বিশেষত অশোক-এর রাজত্বকালে এই পুবের ভাষা ভারতীয় উপমহাদেশের বিরাট সিংহভাগ অঞ্চলে প্রশাসনিক ভাষা হয়ে উঠেছিলো এবং অন্য বিভিন্ন প্রাকৃত ভাষাগুলোর উপরও প্রভাব ফেলেছিলো। বুদ্ধ এবং মহাবীর এই ভাষাতেই তাঁদের ধর্ম প্রচার করেছিলেন। বুদ্ধের মৃত্যুর অনেক পরে, এমনকি অশোকের রাজত্বকালেরও পরে, বুদ্ধের বাণী ও শিক্ষাগুলোকে পশ্চিমী উপভাষায় লিপিবদ্ধ করা হয়, যে ভাষা ‘পালি’ নামে পরিচিত হয়। সম্রাট অশোক, বৌদ্ধ ও জৈন-দের ব্যবহারের মধ্য দিয়ে যেভাবে মগধী প্রাকৃত, পালি, অর্ধমাগধী ভাষাগুলো রূপ নিয়েছিলো, তা তাদের সাধারণ আমজনতার মুখের ভাষা করে তোলেনি, বরং, অভিজাত-জন, অর্থাৎ, শাসক-প্রশাসক-ধর্মপ্রচারক-পণ্ডিত-দের সাধারণ ভাষা করে তোলার অভিপ্রায় দ্বারা চালিত হয়েছিলো। বলা বাহুল্য, সাধারণ আমজনতার মধ্যে অনার্য আদিবাসী জনজাতিদের বিভিন্ন ভাষা বহাল তবিয়তে প্রাণবন্ত অস্তিত্ব নিয়ে ছিলো।

অথর্ব বেদ-এর সময়কাল (মোটামুটি ১২০০ থেকে ১০০০ খৃস্টপূর্বাব্দ কাল) থেকেই মগধ-এর অভিজাতকুলের আর্যকরণ প্রায় সম্পূর্ণ হয়েছিলো এই ব্রাত্য আর্যদের প্রভাব-প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। আর্যাবর্ত-এর মধ্যেই তখন মগধ পরিগণিত হতো। মগধের আরো পুবে ছিলো বঙ্গ, পুণ্ড্র বা লাধা, সেখানে তখনও আর্যপ্রভাব পৌঁছয়নি, সেখানকার বিভিন্ন জনজাতিদের ভাষাকে আর্য পণ্ডিতরা ভাষার মর্যাদা দিতো না, ব্যঙ্গ করে পাখির কিচির-মিচির বলতো (তাতে বঙ্গের জনজাতিদের ভাষাগুলো না-ভাষা হয়ে যায় না, তাদের মর্যাদারও কিছু হানি হয় না, বরং আর্য পণ্ডিতদের আত্মগর্বী মূঢ়তাই ব্যক্ত হয়)। মগধ রাজতন্ত্রের পৃষ্ঠপোষকতায় বৌদ্ধ ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রচার-প্রসার চেষ্টা বঙ্গে ছড়ানোর মধ্য দিয়ে আর্য ভাষা (পালি, অর্ধমাগধী প্রভৃতি প্রাকৃত ভাষা) বঙ্গে প্রবেশ করে। সুনীতিবাবু একে ‘Aryanization from the West’ (‘পশ্চিম দিক থেকে ঘটা আর্যকরণ’) বলেছেন। এই সমস্ত প্রাকৃত ভাষা থেকে বঙ্গের জনজাতিদের ভাষায় বিভিন্ন শব্দ চুঁইয়ে ঢুকতে থাকে, আর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ছোটো একটি অভিজাত একটি অংশও তৈরি হয় যারা ওইসব আর্য ভাষার বাচকতা গ্রহণ করে সামাজিক-মান-বৃদ্ধির উপায় হিসেবে। বঙ্গে বৌদ্ধ রাজাদের রাজতন্ত্রও প্রতিষ্ঠা হয়। শেষ বৌদ্ধ রাজতন্ত্র হিসেবে পাল রাজাদের রাজত্বের পতন ঘটে খৃস্টাব্দ বারো শতকে। তার জায়গায় প্রতিষ্ঠিত হয় দক্ষিণ ভারত থেকে আসা গোঁড়া হিন্দু রাজা বিজয়সেন-এর রাজতন্ত্র। এই সেন রাজাদের আমলে বঙ্গে অন্য সমস্ত কিছু উৎখাত করে পুনরুজ্জীবিত ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের নিরঙ্কুশ আধিপত্য স্থাপন করার হিংসাত্মক প্রয়াস নেওয়া হয়, আর্যাবর্তের ব্রাম্ভন্য ক্ষমতাকাঠামোর মধ্যে গিলে নেওয়ার চেষ্টা হয়। এই আমলে আর্যাবর্ত থেকে ব্রাহ্মণদের নিয়ে এসে বঙ্গে প্রতিস্থাপন করে ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের আচার-ব্যবহার এবং সংস্কৃত ভাষার কৌলীন্য প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ ছিলো অবিরত, ফলে আর্যভাষী আর্যআচারী একটা ছোটো অভিজাত অংশ তৈরি হয়। কিন্তু সিংহভাগ বঙ্গের মানুষজন, যারা প্রাক-আর্য সময় থেকে এখানকার অধিবাসী, তারা এই নয়া ব্রাহ্মণ্যতান্ত্রিক শাসনের জাত-পাত কাঠামোয় সবচেয়ে নীচু জাতের অসম্মান-অনবস্থায় পতিত হলেও প্রতিরোধ জারি রেখেছে নানাভাবে। ব্রাহ্মণ্য আচারবিধির বাইরে লোকায়ত বিভিন্ন ধর্মের রূপ-ও এই প্রতিরোধ নিয়েছিলো। তেমনই এক লোকাচার হলো বৌদ্ধ-প্রভাব-সমণ্বিত ধর্মপুজো, যার আচার বর্ণনা করে রচিত হয়েছিলো ‘শূন্য-পুরাণ’। রামাই পণ্ডিত রচিত এই ‘শূন্য-পুরাণ’-এ বর্ণনা আছে কীভাবে ব্রাহ্মণরা মালদা অঞ্চলের মানুষদের উপর প্রাণান্তকর কর চাপিয়েছিলো এবং বৌদ্ধ-ধর্মীয় আচারপালনকারী ‘স্বধর্মী’-দের নির্বিচারে হত্যা করেছিলো। এর ফলে ‘ধর্ম’ ঠাকুর (অর্থাৎ, বিষ্ণু) বৈকুন্ঠে তাঁর আবাসে ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠেন এবং ‘খোদে’ (মুসলমানদের আরাধ্য ‘খোদা’)-র রূপ ধরে ধরায় অবতীর্ণ হন:

ধর্ম হৈল্যা যবন রূপী

মাথে তার কালো টুপি

হাতে শোভে ত্রিরুচ কামান।।

ব্রহ্মা হৈল্যা মহম্মদ

বিষ্ণু হৈল্যা পেকাম্বর

আদম্ফ হৈল্যা শূলাপাণি।।

গণেশ হৈল্যা গাজী

কার্ত্তিক হৈল্যা কাজী

ফকির হৈল্যা যথ মুনি।।

তেজিয়া আপন ভেক

নারদ হৈল্যা শেক

পুরন্দর হৈল্যা মলানা।।

আপনি চণ্ডিকা দেবী

তিঁহ হৈল্যা হায়া বিবি

পদ্মাবতী হৈল্যা বিবি নূর।।

যথেক দেবতাগণ

সভে হয়্যা একমন

প্রবেশ করিল জাজপুর।।

দেউল দোহারা ভাঙ্গে

কাড়্যা ফিড়্যা খাএ রঙ্গে

পাখড় পাখড় বোলে বোল।।

এখানে আমরা দেখছি যে সেন রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় পুষ্ট ব্রাহ্মণদের সঙ্গে বাংলার আপামর মানুষদের এক বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়েছে, রাজতন্ত্র-ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের শাসন-নিপীড়ন প্রতিরোধের উপায় হিসেবে তারা আর্যধর্মের আধিপত্যের বদলে ইসলাম ধর্ম-প্রসার সমর্থন করছেন (আর্যধর্মের প্রধান আরাধ্য দেবদেবীরা রাজতন্ত্র-ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের অধর্মমূলক কাজে ক্ষুব্ধ হয়ে ইসলাম ধর্মের খোদা-মহম্মদ-পয়গম্বর-ইত্যাদি রূপ ধরে অন্যায়-দমনের জন্য আবার ধরায় এসেছে এই রূপক-এর মধ্য দিয়ে), এমনকি মুসলমান বাহিনীর হাতে দেব-দেউল ধ্বংস হওয়াকেও সমর্থনের চোখে দেখছেন (১৫৬৮ সালে সুলেইমান কাররানির সেনাপতি কালাপাহাড়ের হাতে জাজপুরের মন্দির তছনছ হয়েছিলো, যার উল্লেখ উদ্ধৃত অংশের শেষ ছয় পঙক্তিতে আছে)। আর্য ধর্মাচার ও সমাজশাসন বঙ্গে এমন বেখাপ্পা হযে ওঠার পিছনের কারণগুলো হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ব্যাখ্যা করেছেন এইভাবে:

ব্রাহ্মণ-পণ্ডিতেরা ছিলেন, তাঁহারা সংস্কৃত পড়িতেন, স্মৃতির চর্চা করিতেন, বলিতেন, জাতি চারিটি--- ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র। এই চারি জাতির সংকর হইয়া অথবা ইহা হইতে পতিত হিয়া অপর সকল জাতির উৎপত্তি হইয়াছে। কথাটা বাংলার পক্ষে খাটে কিনা, সেটা ভাবিতেন না। ইতিহাস বলিয়া একটা জিনিস যে আছে, সেটাও তাঁহাদের ধারণা ছিল না। তাঁহারা জানিতেন, আবহমান কাল হইতে ঐ চারি জাতি, ঐ সংকর আর ঐ ব্রাত্য চলিয়া আসিতেছে। সুতরাং উহার মধ্যেই সকলের মীমাংসা করিযা লইবার চেষ্টা করিতেন।… (কিন্তু) আমাদের দেশে চারি জাতি বা চারি বর্ণ খুঁজিয়া বেড়ানো বোধ হয় ভুল। নন্দরাজার পর আমাদের দেশে ক্ষত্রিয় ছিল না, এখনো নাই। যাহা আছে তাহা বিদেশী আমদানি এবং বেশি দিনের নহে। ৩০০ বৎসরের মধ্যে বাংলা দেশ বৈশ্য-প্রধান দেশ। এখানে রেশম, ছালটি, তুলার কাপড় খুব হইত; অনেক লোক নৌকার ব্যবসা করিত, মাছ অনেক লোক ধরিত, জঙ্গলের মধ্যে মহল করিয়াও অনেক লোক জীবিকা নির্বাহ করিত, তাহাতেই গালার ব্যবসায় হরীতকী ব্যবসায় আরম্ভ হইয়াছে। খনি হইতে লোহা অভ্র তুলিয়া অনেক লোক দিন গুজরান করিত। লোহার ব্যবসায়ের ব্যাপার কতক কতক শুনিয়াছি। বীরভূমে এ বিষয়ে একটু অনুসন্ধানও চলিতেছে। আশ্চর্যের বিষয় এই যে, লোহা আছে কিনা পরীক্ষা করিত এক জাতি। লোহা খুঁজিয়া বাহির করিত এক জাতি। লোহার মল বাহির করিয়া দিয়া খাঁটি লোহা লইত এক জাতি। লোহা হইতে ইস্পাত বাহির করিত এক জাতি। এইরূপে দশ-বারো জাতি পরস্পর সাহায্য করিয়া ইস্পাত বিক্রয় করিত। এইসব জাতিরই পরামাণিক, মেট পরামাণিক, খারিক, বারিক প্রভৃতি গভর্নমেন্টের সব সরঞ্জাম ছিল। এই-সকল জাতির অনেকেই এখন মুসলমান হইয়া গিয়াছে।… বাংলায় বৈশ্যবৃত্তিই অধিক ছিল। কিন্তু এই বৈশ্যেরা হিন্দু বৈশ্য ছিল না। অধিকাংশই বৌদ্ধ, জৈন, আজীবক প্রভৃতি ধর্ম আশ্রয় করিয়া (হিন্দু) চতুর্বর্ণ সমাজ হইতে তফাত হইয়া পড়িয়াছিল। একবার বৌদ্ধ হইয়া গেলে তাহাকে আবার যদি হিন্দু হইতে হয়, তবে তাহাকে শূদ্রই হইতে হইবে। এইরূপে সারা বাংলাই শূদ্র হইয়া গিয়াছিল। তাই রঘুনন্দন বলিয়া গিয়াছেন, বাংলায় ব্রাহ্মণ ও শূদ্র ভিন্ন অন্য বর্ণ নাই।

(হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, বাংলার সামাজিক ইতিহাসের মূল সূত্র, ১৯৫০ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসের ‘মাসিক বসুমতী’-তে প্রথম প্রকাশিত, নির্বাচিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি, ২০০২, পৃঃ ২৭৯-২৮১)

সুতরাং, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী-র বয়ান থেকে আমরা পাই: রাজ-রাজন্য-ব্রাহ্মণ-এর পাতলা আস্তরণটি তৎকালীন বঙ্গসমাজের উপর থেকে সরিয়ে নিলে পুরোটাই ছিলো বিভিন্ন বৃত্তিভিত্তিক মানুষদের নিয়ে গঠিত এমন এক গ্রামসমাজ যেখানে জাত-বর্ণ-ভিত্তিক ধাপবন্দি কাঠামো অনুপস্থিত; শাস্ত্রী মহাশয় সেই সর্বজনকে বৈশ্য আখ্যা দিলেও তা তাদের দেওয়া নিজ স্বপরিচয় নয়, তাদের বিবিধ বৃত্তিকে এই সাধারণ নামে শাস্ত্রী তাঁর নিজ অভ্যস্ত ভাষায় আখ্যায়িত করেছেন, বৈশ্য এখানে আর্য জাত-কাঠামোর ভিতরে কোনো অবস্থানকে বোঝাচ্ছে না; এই বিবিধ বৃত্তির মানুষজন একে অপরের সঙ্গে কর্মবিভাজন করে সহযোগিতার ভিত্তিতে কাজ করতে অভ্যস্ত ছিলেন (উদাহরণ: যারা লোহার কাজ করতেন) এবং ব্যবসা পরিচালনাও করতেন; আর্যাবর্ত থেকে আমদানি হওয়া ধাপবন্দি-কাঠামোয়-বাঁধা রীতি-নীতি-আচার-শাসন প্রত্যাখ্যান করে তাঁরা বৌদ্ধ-জৈন-আজীবক ও শেষাবধি ইসলাম ধর্ম অবলম্বনের মধ্য দিয়ে তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। আরো লক্ষণীয় যে, ওই উপরের তলার পাতলা ব্রাহ্মণ আস্তরণটি সংস্কৃত ভাষা ব্যবহার ও চর্চাকেই তাঁদের করণীয় মনে করতেন। ফলে, শূন্য -পুরাণ-এর বয়ানে আমরা যে বাংলা ভাষার রূপ দেখতে পাচ্ছি, তার উৎস ও বিকাশ এই বঙ্গসমাজের অ-ব্রাহ্মণ অনার্য সিংহভাগ অংশের মুখের ভাষার মিশ্রণ ও মিথষ্ক্রিয়ার মধ্য দিয়েই। খ্রিস্টাব্দ তেরো শতকে এসে মুসলমান নবাবরা যখন বাংলার শাসনক্ষমতা দখল করলো, তখন আধুনিক বাংলার কাছাকাছি বাংলার বহু আঞ্চলিক রূপ ইতিমধ্যেই নির্দিষ্ট চেহারা নিয়ে নিয়েছে। বিভিন্ন পল্লীগীতির মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষার সাহিত্য ভাণ্ডারও ভরে উঠেছে। এর আগের রাজতন্ত্র-ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের জোট-শাসন এই ভাষা ও তার সাহিত্যকে কোনো গুরুত্বই দিতো না, মুসলমান নবাবদের আমলে এই বাংলা ভাষার পল্লী-কবিরাও রাজ-পৃষ্ঠপোষকতা পেতে শুরু করলেন, ফলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য জাহির হয়ে উঠলো (যেমন, গৌড়ের নবাব রুকনুদ্দিন বরবক শা-র আদেশে ও পৃষ্ঠপোষণায় আনুমানিক ১৩৮১ থেকে ১৪৬১ খৃস্টাব্দের মধ্যে কৃত্তিবাস বাংলায় রামায়ণ অনুবাদ করেন)। বৌদ্ধ-জৈন-প্রচারকদের বয়ে আনা মগধী প্রাকৃত, পালি, অর্ধমাগধী ভাষার বহু শব্দ আত্মসাৎ করে, পরবর্তীতে সুফি পীরদের বয়ে আনা ফারসি ভাষার বহু শব্দ গ্রহণ করে স্থানীয় লোকায়ত ভাষার কাঠামোর উপর ধীরে ধীরে রূপ নিয়েছিলো বাংলা ভাষা। তাই সংস্কৃত ভাষা কোনোমতেই বাংলা ভাষার উৎস বা ভিত্তি হতে পারে না। বরং, অনেক বেশি সম্ভবপর হলো ভাষাতাত্ত্বিক সুহৃদ কুমার ভৌমিক-এর এই মত:

বাঙলা ভাষার বিচারেও দেখা যায়--- এটি দাঁড়িয়ে আছে খেরওয়াল গোষ্ঠীর ভাষার কাঠামোর উপর।

(সুহৃদ কুমার ভৌমিক, সাঁওতালি ছোটোগল্পের ভূমিকা, মারাংবুরু প্রেস, ২০০০, পৃঃ ১৩)

ভাষাচার্য সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়ও এই মত ব্যক্ত করেছিলেন:

বাংলা ভাষাটা যে অনার্য ভাষার ছাঁচে ঢালা আর্য ভাষা, সেটাও ক্রমে ক্রমে লোকে মানবে, আচার্য মহাশয়েরা যতোদিন বাধা দিতে থাকবে, ততোদিন বাংলার ঠিক স্বরূপটি আমাদের বের করা কঠিন হবে।… কুক্ষণে এদেশে বিলেত থেকে নতুন করে ‘আর্য’ শব্দের আমদানি হয়েছিলো। ম্যাক্সমুলার-এর লেখা পড়ে আর নব্য হিঁদুয়ানি দলের বিজ্ঞান-ইতিহাস বদহজমের ফলে একটা নতুন গোঁড়ামি এসে আমাদের ঘাড়ে চেপেছে, সেটার নাম হচ্ছে ‘আর্যামি’। এই গোঁড়ামি আমাদের দেশে নানা স্থানে নানা মূর্তি ধরেছে--- স্বাধীন চিন্তার শত্রু এই বহুরূপী রাক্ষসকে নিপাত না করলে ইতিহাস চর্চা বা ভাষাতত্ত্বের আলোচনা--- কোনোটাই নিরাপদ হয় না।

(সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়, ১৯১৯ সালে বাংলা ভাষার কুলুজি, কৃষ্ণনগর নদিয়া সাহিত্য পরিষদের পঞ্চম বার্ষিক অধিবেশনে পঠিত, ‘বাংলা ভাষা প্রসঙ্গে’ বইয়ে সংকলিত)

সুনীতিকুমার এখানে যে বিজ্ঞান-ইতিহাস বদহজম ও ‘আর্যামি’ নামক নয়া গোঁড়ামির প্রকোপের কথা বলেছেন, সেই ভূতের উৎপাত শুরু হয় বাংলা যখন ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসনের মুঠোয় বন্দি হয়ে দিন কাটাচ্ছে। এখন সেই প্রসঙ্গে ঢোকা যাক। এই পর্যায়টিকে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী তাঁর নিজের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে যেভাবে বর্ণনা করেছেন তা দেখা যাক:

সকলেই জানেন অতি অল্প দিন পূর্বে বাংলাভাষায় গদ্যগ্রন্থ ছিল না, কিন্তু পদ্য প্রচুর ছিল। ইংরেজি শিক্ষা আরম্ভ হওয়ার পূর্বে যেসকল পদ্য লিখিত হইয়াছিল, তাহা বিশুদ্ধ বাংলাভাষায় লিখিত। কৃত্তিবাস, কাশীদাস অনুবাদ করিয়াছেন, সেজন্য তাঁহাদের গ্রন্থে দু-পাঁচটি অপ্রচলিত সংস্কৃত সব্দ থাকিলেও উহা প্রধানত বিশুদ্ধ বাংলা। কবিকঙ্কণ, ভারতচন্দ্র, রামপ্রসাদ সেন প্রভৃতি কবিগণের লেখা বিশুদ্ধ বাংলা। গদ্য না থাকিলেও ভদ্র সমাজে যে ভাষা প্রচলিত থাকে তাহাকেই বিশুদ্ধ বাংলাভাষা কহে। আমাদের দেশে সেকালে ভদ্রসমাজে তিন প্রকার বাংলাভাষা চলিত ছিল। মুসলমান নবাব ও ওমরাহদিগের সহিত যে-সকল ভদ্রলোকের ব্যবহার করিতে হইত তাঁহাদের বাংলায় অনেক উর্দু শব্দ ণিশানো থাকিত। যাঁহারা শাস্ত্রাদি অধ্যয়ন করিতেন, তাঁহাদের ভাষায় অনেক সংস্কৃত শব্দ ব্যবহৃত হইত। এই দুই ক্ষুদ্র সম্প্রদায ভিন্ন বহু সংখ্যক বিষয়ী লোক ছিলেন। তাঁহাদের বাংলায় উর্দু ও সংস্কৃত দুই মিশানো থাকিত। কবি ও পাঁচালি ওয়ালারা এই ভাষায় গীত বাঁধিত।…

ইংরেজরা এ দেশ দখল করিয়া ভাষার কিছুমাত্র পরিবর্তন করিতে পীরেন নাই। কিন্তু তাঁহারা বহু-সংখ্যক আদালত স্থাপন করায় এবং আদালতে উর্দু ভাষা প্রচলিত রাখায় বাংলাময় পারসি শব্দের কিছু অধিক প্রাদুর্ভাব হইয়াছিল মাত্র. সাহেবরা পারসি শিখিতেন, বাংলা শিখিতেন। দেশীয়েরা দেশীয় ভাষায় তাঁহাদের সহিত কথা কহিতেন। সুতরাং ইংরেজি কথা বাংলার মধ্যে প্রবিষ্ট হইতে পারে নাই।…

আমাদিগের দুর্ভাগ্যক্রমে যে সময়ে ইংরেজ মহাপুরুষেরা বাঙালিদিগকে বাংলা শিখাইবার জন্য উদ্যোগী হইলেন, সেই সময়ে যে-সকল পণ্ডিতের সহিত তাঁহাদের আলাপ ছিল তাঁহারা সংস্কৃত কালেজের ছাত্র। তখন সংস্কৃত কালেজ বাংলায় একঘরে। ব্রাহ্মণ-পণ্ডিতেরা তাঁহাদিগকে যবনের দাস বলিয়া সঙ্গে মিশিতে দিতেন না। তাঁহারা যে-সকল গ্রন্থাদি পড়িতেন তাহা এ দেশমধ্যে চলিত ছিল না। এমন-কি দেশীয় ভদ্রসমাজে তাঁহাদের কিছুমাত্র আদর ছিল না। সুতরাং তাঁহারা দেশে কোন্ ভাষা চলিত কোন্ ভাষা অচলিত, তাহার কিছুই বুঝিতেন না। হঠাৎ তাঁহাদিগের উপর পুস্তক প্রণয়নের ভার হইল। তাঁহারাও পণ্ডিতস্বভাবসুলভ দাম্ভিকতা সহকারে বিষয়ের গুরুত্ব কিছুমাত্র বিবেচনা না করিয়া লেখনী ধারণ করিলেন।

পণ্ডিতদিগের উপর পুস্তক লিখিবার ভার হইলে তাঁহারা প্রায়ই অনুবাদ করেন। সংস্কৃত কালেজের পণ্ডিতেরাও তাহাই করিলেন। তাঁহারা যে-সকল অপ্রচলিত গ্রন্থ পাঠ করিয়াছিলেন তাহারই তর্জমা আরম্ভ করিলেন। রাশি রাশি সংস্কৃত শব্দ বিভক্তি পরিবর্জিত হইয়া বাংলা অক্ষরে উত্তম কাগজে উত্তমরূপে মুদ্রিত হইয়া পুস্তকমধ্যে বিরাজ করিতে লাগিল।…

এই শ্রেণীর লেখকের হস্তে বাংলাভাষার উন্নতির ভার অর্পিত হইল। লিখিত ভাষা ক্রমেই সাধারণের দুর্বোধ্য ও দুষ্পাঠ্য হইয়া উঠিল। অথচ এডুকেশন ডেসপ্যাচের কল্যাণে সমস্ত বঙ্গবাসী বালক এই প্রকারের পুস্তক পড়িয়া বাংলাভাষা শিখিতে আরম্ভ করিল। বাংলাভাষার পরিপুষ্টির দফা একেবারে রফা হইয়া গেল।

সংস্কৃত কলেজের ছাত্রদিগের দেখাদেখি ইংরেজিওয়ালারাও লেখনী ধারম করিলেন। বাংলায় সংস্কৃত কালেজের ছাত্রেরা যেমন একঘরে ছিলেন, ইংরেজিওয়ালারাও তাহা অপেক্ষা অল্প ছিলেন না। তাঁহারাও পূর্বোক্ত ত্রিবিধ বাংলাভাষার কিছুমাত্র অবগত ছিলেন না। অধিকন্তু তাঁহাদের ভাব ইংরেজিতে মনোমধ্যে উদিত হইত, হজম করিয়া নিজ কথায় তাহা ব্যক্ত করিতে পারিতেন না। নূতন কথা তাঁহাদের গড়ার প্রয়োজন হইত। গড়িতে হইলে নিজ ভাষায় ও সংস্কৃতে যেটুকু দখল থাকা আবশ্যক তাহা না থাকায় সময়ে সময়ে বড়োই বিপন্ন হইতে হইত। উৎপিপীড়িষা, জিজীবিষা, জিঘাংসা, প্রভৃতি কথার সৃষ্টি হইত।…

এই সকল কারণবশত, বলিয়াছিলাম যে, যাঁহারা বাংলা গ্রন্থ লিখিয়াছেন, তাঁহারা ভালো বাংলা শিখেন নাই। লিখিত বাংলা ও কথিত বাংলা এত তফাত হইয়া পড়িয়াছে যে, দুইটিকে এক ভাষা বলিয়াই বোধ হয় না। দেশের অধিকাংশ লোকই লিখিত ভাষা বুঝিতে পারে না. এ জন্যই সাধারণ লোকের মধ্যে আজও পাঠকের সংখ্যা এত অল্প। এ জন্যই বহু-সংখ্যক সম্বাদপত্র ও সাময়িক পত্রিকা জলবুদ্বুদের ন্যায় উৎপন্ন হইয়াই আবার জলে মিশিয়া যায়।

গ্রন্থকারেরা বাংলাভাষা না শিখিয়া বাংলা লিখিতে বসিয়া এবং চলিত শব্দ সকল পরিত্যাগ করিয়া অপ্রচলিত শব্দের আশ্রয় লইয়া ভাষার যে অপকার করিয়াছেন, তাহার প্রতিকার করা শক্ত।… তাঁহাদের সময়ে শিক্ষাবিভাগ স্থাপিত হওয়ায, তাঁহাদিগের প্রভাব কিছু অতিরিক্ত পরিমাণে বৃদ্ধি পাইয়াছে। এবং এই কয় বৎসরের মধ্যে ইংরেজির অতিরিক্ত চর্চা হোয়ায় বহু-সংখ্যক ইংরেজি শব্দ ও ভাব, বাংলাময় ছড়াইয়া পড়ায় বিষয়ী লোকের মধ্যে যে ভাষা প্রচলিত ছিল, তাহার এত পরিবর্তন হইয়া গিয়াছে যে, পূর্বে উহা কিরূপ ছিল, তাহা আর নির্ণয় করিবার জো নাই।

ভট্টাচার্য ও কথকদিগের মধ্যে যে ভাষা প্রচলিত ছিল, তাহা এখনো কতক কতক নির্ণীত হইতে পারে। কিন্তু এই দুই শ্রেণীর লোক এত অল্প হইয়া আসিয়াছে যে, সেরূপ নির্ণয় করাও সহজ নহে। গ্রন্থকারদিগের বাংলা বাংলা নহে। বিশুদ্ধ বাংলা কি ছিল তাহা জানিবার উপায় নাই। এ অবস্থায় আমাদের মতো লেখকের গতি কী? হয়, ইংরেজি, পারসি, বাংলা ও সংস্কৃতময় যে ভাষায় ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশনাদি প্রসিদ্ধ ভদ্রসমাজে কথাবার্তা চলে সেই ভাষায় লেখা, না-হয়, যাহার যেমন ভাষা যোগায় সেই ভাষায় নিজের ভাব ব্যক্ত করা। এই সিদ্ধান্তের প্রতি যাঁহাদের আপত্তি আছে, তাঁহারা কিরূপ ভাষাকে বিশুদ্ধ বাংলাভাষা বলেন, প্রকাশ করিয়া বলিলে গরিব লোকের যথেষ্ট উপকার করা হয়। যত দিন না বলিতে পারেন, তত দিন কুঠার আঘাত বিষয়ে তাঁহাদের কিছুমাত্র অধিকার নাই।

(হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, বাংলা ভাষা, ১৮৮১ সালে বঙ্গদর্শন পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত, এখানে উদ্ধৃত হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি কর্তৃক ২০০২ সালে প্রকাশিত ‘নির্বাচিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী’ গ্রন্থের পৃঃ ১৪১-১৪৫ থেকে।)

হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর এই সাক্ষ্য থেকে আমরা দেখতে পাই: ইউরোপীয় খৃস্টধর্মপ্রচারক ও উপনিবেশ-সাসকরা যখন তাদের ধর্মপ্রচার ও শাসনের কাজের প্রয়োজনে যতটুকু দেশী ভাষা শিখতে হয় তার গণ্ডী ছাপিয়ে বাঙালীদের বাংলা শেখানোর মহা দায়িত্ব ‘শ্বেত পুরুষদের বোঝা’ হিসেবে কাঁধে তুলে নিলেন, তখন সেই দায়িত্ব নির্বাহের জন্য যে সংস্কৃত-পণ্ডিত ও দেশী ইংরেজি-আয়ত্তকারীদের উপর ভর করলেন, তারা দেশী বাংলা-কথকদের থেকে সামাজিক-স্তর-গত-বিভাজনের কারণে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ফলে কথ্য বাংলা ভাষার বিভিন্ন রূপ ও বৈচিত্র্য নিয়ে কিছুই জানতেন না; এই প্রকৃত-প্রস্তাবে অজ্ঞ কিন্তু পাণ্ডিত্যাভিমানে বিজ্ঞ আর্য-ইঙ্গ-উপাসকরা তাঁদের সংস্কৃত ও ইংরেজির জ্ঞান মিশিয়ে এক কৃত্রিম ভাষাকে বাংলা মান ভাষা হিসেবে প্রস্তাব করলেন; উপনিবেশ-শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থার নব-প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতাবলে তা আপামর বাঙালির উপর ভদ্র ভাষা বা উপরের-মহলে-ওঠার-সিঁড়ি-স্বরূপ ভাষা হিসেবে আরোপিত হলো; এই কৃত্রিমতার আগ্রাসন প্রকৃত বা লোকায়ত বাংলাভাষাকে ইতর-মুখের-ভাষা বলে অপমান-অন্ধকারে ঠেলে দিয়ে ক্ষমতার আলোকিত মঞ্চটিকে দখল করলো; প্রকৃত বা লোকায়ত বাংলা ভাষার স্রোত অবরুদ্ধ হওয়ার উপক্রম হলো; বাংলা লিখিত ভাষা বা লেখ্য ভাষার সম্মান-মহিমা-ক্ষমতা-য় ভূষিত রূপটি প্রকৃত-লোকায়ত ভাষাপ্রবাহের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে পরমুখাপেক্ষী-পরনির্ভরশীল-প্রাণহীন হয়ে থাকলো। এই অবস্থায় শাস্ত্রী মহাশয় তাঁর লেখা শেষ করেছেন নিজেই-নিজেকে-অধিকারী-ভেবে-নেওয়া-বিশেষজ্ঞকুলকে কুঠারাঘাতের প্রমত্ততা থেকে বিরত করতে চেয়ে। এই কুঠারাঘাত মানে নিজেদের ইঙ্গ-আর্য সংস্কার অনুযায়ী ভাষার মান রূপ ও ব্যাকরণ নির্ধারণ করে সকলের উপর বাধ্যতামূলক বলে তা চাপানোর কলকাঠি অবলম্বন করা। ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থার বংশজাত আমাদের  শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার প্রতিষ্ঠানগুলোর ডিগ্রিধারী বিশেষজ্ঞ-অধ্যাপক-প্রভাষক হয়ে উঠলে ওই কলকাঠি নাড়ার লোভ সামলানো খুবই মুশকিল। কীভাবে এই কলকাঠি বাংলা ভাষার অবস্থাকে আরো সঙ্গীন করে তুলেছে তা আবার হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মুখ থেকেই শোনা যাক:

বাংলা ভাষায় কিছু কম আড়াই শত বাংলা ব্যাকরণ লিখিত হইয়াছে। গত দশ বৎসরের মধ্যেই ইঁহাদের অধিকাংশ প্রাদুর্ভূত হইয়া বঙ্গীয় বালকগণের মস্তিষ্ক বিকৃত এবং তাহাদের অভিভাবকগণের পয়সা অপহরণ করিতেছেন। এতগুলি ব্যাকরণ বাহির হইয়াছে বলিয়া বাঙালির গৌরব করিবার কিছুই নাই; কারণ সমস্ত বাংলা ব্যাকরণগুলিই দুই শ্রেণীর লোক কর্তৃক দুই প্যাটেন্টে প্রস্তুত হইতেছে; একটি মুগ্ধবোধ প্যাটেন্ট গ্রন্থকার পণ্ডিতগণ, আর একটি হাইলি-প্যাটেন্ট [Richard Hiley, English Grammar] গ্রন্থকার মাস্টারগণ। এক প্যাটেন্টের গ্রন্থ খুলিলেই বর্ণের উচ্চারণস্থান ও নিয়ম দেখিতে পাওয়া যায়; অপর প্যাটেন্টের ব্যাকরণ খুলিলেই দেখিতে পাওয়া যায়, শব্দ-সমূহ পাঁচ ভাগে বিভক্ত--- বিশেষ্য বিশেষণ সর্বনাম ক্রিয়া ও অব্যয়। ক্রমে এই প্যাটেন্টে সংস্কৃত সূত্রগুলির তর্জমা, আর-এক প্যাটেন্টে ইংরেজি রুলগুলির তর্জমা। বাংলাটা যে একটা স্বতন্ত্র ভাষা, উহা যে পালি মাগধী অর্ধমাগধী, সংস্কৃত পারসি ইংরেজি প্রভৃতি নানা ভাষার সংমিশ্রণে উৎপন্ন হইয়াছে, গ্রন্থকারগণ সেকথা একবারও ভাবেন না। অনেকে আবার দুই প্যাটেন্ট মিশাইয়া এক প্রকার খিচুড়ি প্রস্তুত করেন। সে অতি উৎকৃষ্ট পদার্থ। তাহাতে যুক্তির লেশমাত্রও নাই; বহুদর্শিতার নামও নাই।

(হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, বাংলা ব্যাকরণ, ১৯০১ সালের ২৭ জুলাই বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষদ-এর তৃতীয় মাসিক অধিবেশনে শাস্ত্রী মহাশয় এই প্রবন্ধটি পড়েন, এখানে উদ্ধৃত হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি কর্তৃক ২০০২ সালে প্রকাশিত ‘নির্বাচিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী’ গ্রন্থের পৃঃ ১৭৪ থেকে।)

উপরোক্ত প্রবন্ধটিতে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী আর্য-ইঙ্গ-নকলকারী ব্যাকরণকারদের পাকশালায় প্রস্তুত নানারূপ খিচুড়ির উদাহরণ দিয়েছিলেন, যেমন:

১। বাংলা ভাষায় অব্যয়ের পরে বিভক্তি হয় না। কিন্তু সংস্কৃত ব্যাকরণ শিরোধার্য করে মুগ্ধবোধ ব্যাকরণকারদের সংস্কার হলো ‘নাপদং শাস্ত্রে প্রযুঞ্জীত’, অর্থাৎ, বিভক্তিযুক্ত না হলে ধাতু ও শব্দ শাস্ত্রে প্রয়োগ করা যায় না। বাংলা ভাষার বৈশিষ্ট্য অনুধাবন করার বিন্দুমাত্র চেষ্টা না করে তাই তাঁরা অব্যয়ের পরেও বিভক্তি করে তারপর তা লোপ করার এক ভ্যাবাচ্যাকা-খেলা খেলবেন, যা ভাষার চরিত্রকে আড়াল করে ব্যাকরণকারদের ভেলকিবাজি প্রদর্শনের দক্ষতাকেই জাহির করে তোলে; ভাষা-ব্যবহারকারীদের থতমত নাকাল হতে হয়।

২। ইংরেজি ব্যাকরণকারেরা যেহেতু parts of speech দেন, ইঙ্গ-আর্য-নকলকারীরা তাই বাহাদুরি দেখাতে বিভক্তি ও parts of speech দুটিই একসঙ্গে প্রয়োগ করেন। সংস্কৃতে কারক-এর লক্ষণ ও ইংরেজিতে case-এর লক্ষণ যে সম্পূর্ণ ভিন্ন তা খেয়াল মাত্র না করে কারক ও বিভক্তিতে গোলোযোগ বাঁধিয়ে তুলে ব্যাকরণ-পড়ুয়াদের মনে ত্রাস সঞ্চার করেন।

৩। প্রাকৃত ব্যাকরণে সম্প্রদান কারক নেই, বাংলায়ও সম্প্রদান কারক নেই। কিন্তু সংস্কৃত ও ইংরোজি উভয় ব্যাকরণেই যেহেতু সম্প্রদান কারকের অস্তিত্ব বজায় রাখা হয়েছে, তাই ইঙ্গ-আর্য ব্যাকরণকারেরাও জোর করে বাংলা ভাষায় তা আমদানি করতে গিয়ে অর্থেরই বারোটা বাজিয়ে বসেন।

৪। যে-সকল শব্দ সংস্কৃত কৃৎ ও তদ্ধিত প্রত্যয় যোগে নিষ্পন্ন হয়ে বাংলায় এসেছে, তাতে সন্ধি আছে, নিজ বাংলায় নেই। বাংলা ভাষায় কতিপয় সংস্কৃতমূলক শব্দ ছাড়া অন্যত্র সমাসেও সন্ধি হয় না, যে-সব সমাস-করা পদ সংস্কৃত থেকে এসেছে সেখানেই সন্ধি থাকে। সন্ধিতে জমাট করা যে-সব জিনিস সংস্কৃত থেকে এসেছে বাংলাভাষীরা তা-ও একপদ হিসেবেই ব্যবহার করে থাকে, যা ভাঙার আর প্রয়োজন পড়ে না। বাংলা ভাষার নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের বিচারে সন্ধি আসে না। অথচ আর্যামি-গোঁড়ামি-তে আক্রান্ত ব্যাকরণকারদের লেখা ব্যাকরণ বইয়ে সন্ধি ও তার বিভিন্ন প্রকার নিয়ে আলোচনার ঘনঘটা, যা মুখস্থ করার সময় বাংলাভাষী পড়ুয়া স্বাভাবিকভাবেই তার নিজ মুখের ভাষার সঙ্গে কোনো যোগ খুঁজে পায় না।

৫। বাংলায় যা ‘তেল’, সংস্কৃতে তা ‘তৈল’, প্রাকৃতে তা ‘তেল্ল’। বাংলা শব্দটি এসেছে প্রাকৃত ‘তেল্ল’ থেকেই। অথচ বৈয়াকরণেরা ‘সাধু বাংলা ভাষা’ বলে যখন অভিজাত ভাষা তৈরি করতে বসেন, তখন সংস্কৃত ‘তৈল’ শব্দটিকেই সাধু বাংলা বলে ফরমান জারি করেন। এর মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষার উৎপত্তি ও বিকাশ-ইতিহাস সম্পর্কেও তাঁদের নিদারুণ মূর্খতা প্রকট হয়। এরকম উদাহরণ অজস্র। সাধু বাংলা নির্মাণের নামে প্রকৃত বা লোকায়ত বাংলা ভাষার শব্দগুলোকে বিসর্জন দিয়ে সংস্কৃত শব্দসমূহ আমদানি করে এক ভয়ঙ্কর খাঁচার বাঘ তৈরি করা হয়েছে যা দর্শকদের সম্ভ্রম আকর্ষণ করলেও আসল-বনের-বাঘের ক্লিষ্ট ছায়া মাত্র এবং কোনো দর্শকই স্বাভাবিক অবস্থায় খাঁচার মধ্যে ঢুকে তার সঙ্গে গলাগলি করতে যাবে না।

এমন উদাহরণ আরো দিয়েছেন শাস্ত্রী মহাশয়। পাঠকের যদি খুব সময়ের অভাব না থেকে থাকে তাহলে মূল প্রবন্ধটি পড়ে দেখতে পারেন, মন উৎফুল্ল হবে, চোখও খুলে যাবে।

যাইহোক, যা নিয়ে উৎফুল্ল হওয়ার কিছু নেই, তা হলো এই যে ব্যাকরণ সব ভাষার মান-বিধি-নির্ণয়-এর বিবিধ পণ্ডিতী প্রচেষ্টা কেবল যে জীবন্ত লোকায়ত ভাষার সঙ্গে এহেন পণ্ডিতদের নিদারুণ বিচ্ছিন্নতাকেই বে-আব্রু করে দিয়েছে, তা নয়, তা জীবন্ত লোকায়ত ভাষার প্রাণশক্তির মধ্যেও অন্তর্ঘাত চালিয়েছে। আমরা এই আলোচনার প্রথম ভাগে দেখেছি যে সংস্কৃত ব্যাকরণ তার আবির্ভাবকালে কীভাবে সমাজকে এক ধাপবন্দি খ্ষমতাকাঠামোয় বিন্যস্ত করার সামগ্রিক প্রক্রিয়ার অংশ ছিলো। ইঙ্গ-আর্য নকলনবিশদের তৈরি বাংলা ব্যাকরণ ও ভাষা-মান ভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে হলেও একইভাবে ঔপনিবেশিক শাসনাধীন বাংলায় ধাপবন্দি ক্ষমতাকাঠামো নির্মাণের প্রক্রিয়ার অংশ ছিলো। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, ঔপনিবেশিক শিক্ষাকলের অঙ্গীভূত হয়ে প্রসারলাভ, নতুন-গজানো ছাপাখানার মধ্য দিয়ে জ্ঞানোৎপাদন ও ব্যবসার বিয়েতে পুরুত হওয়া, শাসক-ঘনিষ্ঠ দিশি বাবুদের  চিহ্নিতকরণ-বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠা: এ-সবের মধ্য দিয়ে এই শিকড়হীন খিচুড়ি-মার্কা মান-ভাষা আধিপত্যকারী হয়ে উঠলো। সেই আধিপত্যের প্রখর তাপে লোকায়ত ভাষারূপগুলো ছোটোলোকদের ঘরে মুখ লোকালো। কিন্তু ক্রমশ সেই ছোটোলোকদের ঘরগুলোও তো পুড়ে খাক ঙতে শুরু করলো: ঔপনিবেশিক করতাদের লক্ষ্মী-আমদানির জন্য করা চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পেষণে গ্রামের সমাজ তার শ্রী হারাতে শুরু করলো, গৃহস্থের ঘরে টান পড়লো, গ্রাম ছেড়ে নগরে দেশান্তরী হওয়ার ধারা বাড়তে লাগলো, গ্রামের নিজস্ব উৎসব-আচার-বিনোদনগুলো শুকিয়ে যেতে শুরু করলো, ফলে লোকায়ত বাংলা ভাষার বিভিন্ন বৈচিত্র্যময় রূপগুলোর সামাজির ব্যবহারের অঙ্গন ফাঁকা হয়ে আসতে লাগলো। চূড়ান্ত আঘাতটি লাগলো পঞ্চাশের মন্বন্তরে (১৯৪৩) যখন ঔপনিবেশিক প্রভুদের যুদ্ধ-কৌশল এবং যুদ্ধব্যবসায়ী-মজুতদার-কালোবাজারী-দের মুনাফালোভের আগ্রাসনে গ্রামবাংলা ছেয়ে গেলো অনাহারে-মৃত্যুতে, গ্রামের সমাজকাঠামোর সেষতম অবশেষটুকু ভেঙে পড়লো শহর-কেন্দ্রীক অর্থনীতির যোগানদার ও হীন নির্ভরশীল হয়ে থাকা ছাড়া গ্রামাঞ্চলের আর নিজস্ব কোনো শক্তি অবশিষ্ট থাকলো না। গ্রামীণ জীবনচর্যা ভেঙে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্রামীণ জীবনে শিকড় ছড়িয়ে থাকা বাংলা ভাষার বৈচিত্র্যপূর্ণ লোকায়ত রূপগুলোও উচ্ছিন্ন হয়ে গেলো। তারপর রক্তক্ষয় আরো তীব্র হলো ১৯৪৭ সালে ভয়ঙ্কর হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা ও বাংলা ভেঙে দুটুকরো হয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে। ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়িয়ে গেলো ভাষার দেহ জুড়ে: মুসলমান-প্রধান অঞ্চলে আরবি-ফারসি শব্দে যথেচ্ছ বোঝাই করে মান-ভাষা তৈরির উদ্যোগ দেখা দিলো আর হিন্দু-প্রধান অঞ্চলে সংস্কৃত বোঝাই করে মান-ভাষা তৈরির উদ্যোগ মাথা চাড়া দিলো। ইতিমধ্যে প্রকৃত লোকায়ত বাংলা ভাষার বিভিন্ন রূপগুলো শ্মশানে-কবরস্থানে পাক-খাওয়া উতল হাওয়ার মতো কেবল মৃত আত্মার স্মৃতি বহন করে ফিরতে লাগলো।

হরপ্রসাদ শাস্ত্রী সেই ১৮৮১ সালেই বলেছিলেন যে বিশুদ্ধ বাংলা কী ছিলো তা আর বোঝার উপায় নেই। আজ কথাটা আরও বেশি খাটে। কিন্তু ব্যাকরণকার ও ভাষার-মান-রূপ-নির্মাণেচ্ছু-দের নিজ বৃত্তি টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে উৎসাহের শেষ নেই। তা তাঁরা তাঁদের ওই বৃত্তি ফলিয়ে শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতাবৃত্তে গবেষক-প্রভাষক-অধ্যাপক হওয়ার সিঁড়ি বেয়ে ওঠার খেলা যতোখুশি খেলুন না কেন, আমার কোনো আপত্তি নেই, কিন্তু দয়া করে তাঁরা তাঁদের ওই ইঙ্গামি-আর্যামি-গুলো আমাদের মতো ভাষা-ব্যবহারকারীদের উপর বাধ্যতামূলক বলে চাপিয়ে দিতে আসবেন না। আমাদের নিজেদের লোকসমাজের ভাষা বাংলা ভাষার সঙ্গে আপনাদের নিদারুণ বিচ্ছিন্নতা, আপনাদের অসার ইঙ্গ-বঙ্গ-অনুকরণপ্রবণতা, ও তা দিয়ে হাজারো ক্ষতি করার পরও বিন্দুমাত্র দুঃখিত-অনুতপ্ত না হওয়া--- এসব আপনাদের প্রতি আমাকে অবিশ্বাসী করে তুলেছে। তাই রেহাই দিন। আমাদের মুখের ভাষার নানা বৈচিত্র্য থেকে লিখিত ভাষার রূপ কীভাবে দেওয়া যায়, বানান কী করা যায়, তা আমাদেরই ঠিক করতে দিন, তার মধ্যে ফারাক থাকুক, ভ্রম থাকুক, আমাদেরই ভাবতে দিন তা আমাদের লোকায়ত বাংলা ভাষার কোন পরম্পরার স্মৃতি বয়ে আনছে, আর যদি আপনার পাণ্ডিত্যপনার সবজান্তা অভিমান ছেড়ে এ-কাজে আমাদের সবার সাথে এক আঙিনায় আপনারাও শামিল হন, তাহলে তার থেকে ভালো অবশ্য আর কিছু হতে পারে না।

 

 

 

 

0 Comments
Leave a reply