মার্কস(বাদ)-এর মৃত্যু

লিখেছেন:বিপ্লব নায়ক
কেউ মরে, কেউ মরিয়াও প্রমাণ করে যে সে মরে নাই। কোনও প্রতীতিতে মৃত্যুই অন্তিম ও চূড়ান্ত, আবার কোনও প্রতীতিতে মৃত্যু জীবন-পরিসরের মাঝে অবশ্যম্ভাবী কিছু ভাঁজ বৈ আর কিছু নয়। এই সমস্ত বিবিধার্থ বহন করেই এখানে মৃত্যু-আখ্যান শোনানো হয়েছে।

 

১৮৮৩ সালের ১৪ই মার্চ মার্কস মারা গিয়েছিলেন, অর্থাৎ মার্কসের নশ্বর দেহটি মারা গিয়েছিল। আর তার কিছু কালের মধ্যেই মার্কসের চিন্তা মার্কসবাদের শরীরে ভর করে নতুন প্রাণ পেয়েছিল। গোটা পুঁজিবাদী জগৎ মার্কসবাদের ভূত দেখতো। পুঁজিবাদ উচ্ছেদ করে পুঁজিবাদোত্তর সমাজ প্রতিষ্ঠার তত্ত্ব-স্বপ্ন-কল্পনা-চর্চা-ই ছিলো মার্কসবাদের প্রাণ। কিন্তু সেই প্রাণ কি এখন নিভে গেছে? মার্কসবাদের শরীরও কি তার নশ্বরত্ব প্রমাণ করে মারা গিয়েছে? ২০২৬ সালের ১৪ই মার্চ এই প্রশ্নটিকে সামনে রেখে আসুন বিবেচনা করে দেখা যাক।

মার্কসবাদীদের কাম্য এমন একটা বিপ্লব যা পুঁজিবাদের মধ্যে চলতে থাকা উৎপাদনী শক্তির বিকাশকে পুঁজিবাদী (এবং স্থানবিশেষে প্রাক-পুঁজিবাদী) উৎপাদনী সম্পর্কের সঙ্গে বিরোধের ঘেরাটোপ থেকে মুক্ত করে তার অবারিত বিকাশের মুখ খুলে দিতে পারে। মার্কসবাদী তত্ত্ব বলে যে উৎপাদনী শক্তির এই অবারিত বিকাশ সমাজতান্ত্রিক সমাজের বস্তুগত ভিত্তি তৈরি করবে, যে ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে শেষাবধি নানা উত্তরণপর্ব পেরিয়ে সেই কাম্য সমাজে পৌঁছানো যাবে যেখানে প্রত্যেকে (সমাজকে) দেবে (অর্থাৎ উৎপাদনী শ্রম করবে) তার সাধ্য অনুযায়ী এবং নেবে (অর্থাৎ ব্যবহার্য বস্তু নেবে) তার চাহিদা অনুযায়ী। চাহিদার অন্তহীন বৃদ্ধির প্রবণতাকে এখানে সদর্থকভাবে দেখা হয় কারণ একদিকে যেমন তা উৎপাদিকা শক্তির অন্তহীন বিকাশের তাগিদকে ত্বরান্বিত করে, অন্যদিকে ব্যবহার্য বস্তুর প্রতুলতা মানব জীবন ও যাপনকে ঋদ্ধতর উন্নততর করে তোলে বলে মনে করা হয়।

কিন্তু বাস্তব সংকট পেকে ওঠার মধ্য দিয়ে উপরোক্ত ধারণাগুলো এখন প্রশ্নের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। পুঁজিবাদের মধ্যে চলা উৎপাদনী শক্তির বিকাশ প্রকৃতি-সমাজ-জীবন-এ গভীর থেকে গভীরতর ক্ষত তৈরি করে চলেছে—

১) পৃথিবীর সমস্ত জৈব ও অজৈব উপকরণকে উৎপাদনের কঁাচামালে পরিণত করে তাদের নিষ্কাশন ও ব্যবহার আরো ব্যাপ্ত আরো দ্রুত করতে থাকার মধ্য দিয়ে বহু উপকরণকে তা নাটকীয় দ্রুততায় নিঃশেষিত করে ফেলার মুখে এনে দাঁড় করিয়েছে যা প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রকে ক্ষয়গ্রস্ত করে ভেঙে পড়ার নজিরবিহীন বিপদের মধ্যে এনে ফেলেছে। এই হারে আর কয়েক দশক চললে পৃথিবীর বিস্তীর্ণ অঞ্চল যে কোনো রূপ প্রাণ ধারণের অযোগ্য পতিত অঞ্চলে পরিণত হবে, ক্রমে গোটা পৃথিবীই প্রাণ ধারণের অযোগ্য গ্রহে পরিণত হওয়ার দিকে এগোবে। কোনো মনুষ্যকল্পিত ‘উন্নততর বিজ্ঞান বা প্রযুক্তি' এর অন্যথা করতে পারবে না কারণ প্রাণধারণের যোগ্য হয়ে ওঠার প্রাকৃতিক পরিবেশগত শর্তগুলো বহু বহু হাজার বছর ধরে জটিল প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছিল, কয়েক বছরে বা কয়েকশো বছরেও কৃত্রিম মনুষ্যকৃত উপায়ে তা গড়ে তোলা যায় না। সুতরাং পৃথিবীকে পতিতগ্রহে পরিণত করে মঙ্গলগ্রহে সমাজতন্ত্রের সংসার পাতার মূঢ় কল্পসুখকল্পনাকে যদি আমরা রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে হাজির না করতে চাই, তাহলে পুঁজিবাদে চলতে থাকা উৎপাদনী শক্তির বিকাশকে অবারিত করার আকাঙ্ক্ষা আমাদের অভিপ্রায় হতে পারে না।

২) পঁুজিবাদে উৎপাদনী শক্তির বিকাশ শহরভিত্তিক বৃহৎ শিল্পোৎপাদনে বস্তুগত উৎপাদনকে কেন্দ্রীভূত করে ও তার চাহিদামতো বনসম্পদ-প্রাণসম্পদ-খনিসম্পদ দখল-খনন-আহরণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সেই প্রক্রিয়াজাত যে পরিমাণ বর্জ্য ক্রমবর্ধমান হারে বমন করে যাচ্ছে, তা-ও প্রকৃতি-পরিবেশের সংকট ঘনিয়ে তুলছে। উদাহরণস্বরূপ কার্বন নির্গমন ও তজ্জনিত বিশ্ব উষ্ণায়নের সমস্যার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। এই উৎপাদনী শক্তির বিকাশকে অব্যাহত রেখে কোনো প্রযুক্তি বা সংস্কার যে এই সমস্যার সমাধান করতে পারে না তা গত অর্ধশতক জুড়ে কার্বন নির্গমন নিয়ন্ত্রণের বিবিধ বেকার চেষ্টা ও কার্বন-ট্রেডিং নামক জালিয়াতির ছড়িয়ে পড়াই প্রমাণ করে।

৩) আমাদের চাহিদা সীমাহীনভাবে বাড়তে থাকাকে সদর্থক রূপে দেখা হয় কেন? কারণ, মনে করা হয় যে চাহিদার বৃদ্ধি হল উন্নততর ও পূর্ণতর জীবন ও যাপনের লক্ষণ, বা অন্ততপক্ষে তার আকাঙ্ক্ষার লক্ষণ। চাহিদার বৃদ্ধি মানে উন্নততর জীবনের জন্য আকাঙ্খা এবং তদনুযায়ী পরিমাণে ও রকমে ভোগ্যবস্তু আহরণ ও ব্যবহার বাড়ার মধ্য দিয়ে জীবন ও যাপনের মান উন্নততর হয়— সত্যিই কি তাই? ভোগ্যবস্তুর চাহিদা সেই ভোগ্যবস্তু পাওয়ার মধ্য দিয়ে শেষ হয়না, বরং ঘিয়ের ছিটে দেওয়া আগুনের মতো আরো তীব্র হয়ে ওঠে। একই ভোগ্যবস্তু আরো বা নতুনতর ভোগ্যবস্তুর জন্য অকাঙ্ক্ষা প্রকট হয়। ফলত তা কোনো আকাঙ্ক্ষাতৃপ্তির বোধে পৌঁছে দেয়না, বরং তা নিরন্তর ভোগবুভুক্ষার এক তাড়নাগ্রস্ত অতৃপ্ত অস্তিত্বে বেঁধে রাখে। সেই তাড়না জন্ম দেয় অসংখ্য বিকারের, যেমন, ভোগব্যয় মেটানোর জন্য যে কোনো ভাবে হোক উপার্জনবৃদ্ধির পিছনে ছুটে নিঃশেষিত হওয়ার বিকার, সংবেদনহীন ভোগপ্রদর্শনীর প্রদর্শন ও আস্ফালন দিয়ে আত্মগরিমা জাহির করার অসুখ, ইত্যাদি। এই তাড়নাগ্রস্ত অসুস্থ অস্তিত্বকে নিশ্চয়ই উন্নততর জীবন ও যাপন বলব না। তাছাড়া, পশ্চিম ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকার কোনো নাগরিকের এখন যে প্রাত্যহিক গড় ভোগ-চাহিদা, সেই মাপে পৃথিবীর বর্তমান সমস্ত মানুষকে তুলে আনতে হলে সেই চাহিদা পুরণের জন্য কঁাচামাল যোগান দিতে একটি পৃথিবী নয়, খান-দশেক পৃথিবী কয়েক দশকের মধ্যেই নিঃস্ব পতিতভূমিতে পরিণত হবে। সুতরাং চাহিদা ও ভোগবৃদ্ধির মধ্য দিয়ে সামূহিক জীবন ও যাপনের ‘উন্নতিসাধন’ বস্তুগতভাবেও অসম্ভব। বরং তার বিপরীতটাই বাধ্যতামূলক হয়ে উঠেছে। মানুষ যদি গোটা পৃথিবীর বাস্তুতন্ত্রকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে নিয়ে যাওয়া বিপজ্জনক অবিমৃষ্যকারী প্রজাতি হিসেবে নিজেদের যাত্রা শেষ না করতে চায়, তবে মানুষকে তার চাহিদা ও ভোগ বাড়ানোর বদলে ব্যাপকভাবে কমাতে হবে এবং ভোগবৃদ্ধির মধ্য দিয়ে সুখের আলেয়ার পশ্চাদ্ধাবন করার বদলে জীবনের উৎকর্ষ/অপকর্ষ সম্বন্ধে বিকল্প ধারণার সন্ধান করতে হবে। পৃথিবীর সমস্ত জৈব ও অজৈব উপাদান, সমস্ত অন্যান্য প্রাণীপ্রজাতি কেবল মানুষের বস্তু-উৎপাদনের কঁাচামাল হিসেবে মানুষের ভোগচাহিদা মেটানোর জন্যই উৎসর্গিত, এই স্থূল সংকীর্ণ কর্তৃত্ববাদী অহমিকা ছেড়ে মানুষকে প্রকৃতির অন্য সমস্ত বস্তু ও প্রাণের সঙ্গে নিজের জৈবিক সম্পর্কবন্ধনটিকে পুনরাবিষ্কার করতে হবে। কোনও এক কল্পসুখস্বর্গে (অর্থাৎ সমাজতন্ত্রে) পৌঁছানোর পর আপনা থেকেই (অর্থাৎ সমাজের অর্থনৈতিক ভিত্তির পরিবর্তনের ফলস্বরূপ) এই সব হয়ে যাবে এমন ছদ্মনিশ্চয়তা নিয়ে আমরা যদি কেবল ওই অর্থনৈতিক ‘উন্নতি’ বা পরিবর্তনসাধনেরই করণিকগিরি করি তাহলে কল্পসুখস্বর্গে পৌঁছানোর বদলে পুঁজিবাদের গর্ভেই চরকিপাক ঘুরে যাব। সুতরাং পুঁজিবাদের বিরোধিতা বা পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের যে কোনো প্রচেষ্টায় আজই পণ্যভক্তিবাদ ও মানুষের প্রজাতিগত অন্ধ অহংকারকে বর্জন করে বিকল্প ভাবনা-অবস্থানে পৌঁছানোর তাত্ত্বিক-ব্যবহারিক সংগ্রাম জারি করা দরকার। মান্য মার্কসবাদের স্থূল-বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি তার বস্তুবাদের দোহাই দিয়ে এসবকিছু নিয়েই মাথা ঘামাতে নারাজ। তাই মান্য মার্কসবাদ পুঁজিবাদ-বিরোধিতাকে কেবল একটি পার্টির কর্মসূচী নির্ধারণের পরিসরে সীমায়িত করে দিয়েছে, জীবন ও যাপনের বহুভঁাজ পরিসরে পুঁজিবাদ-বিরোধিতার সমস্ত অতি জরুরী প্রশ্নগুলোই ‘এখন বিবেচ্য নয়’–য়ের পর্যায়ে ঠেলে দিয়েছে। তাই তা এত যান্ত্রিক হয়ে উঠেছে। পুঁজিবাদ সম্পর্কে মার্কসের সমালোচনাত্মক বিচারে আমরা সব-কিছুকে-প্রশ্ন করার স্পর্ধা দেখতে পাই, অথচ তঁার নাম করে, তঁার উত্তরাধিকার বওয়ার আছিলায়, তঁার চিন্তার ‘বিশুদ্ধতা’ রক্ষার ছলে প্রচলিত ঘরানার মার্কসবাদীরা বিমূর্ত কিছু ধূসর ফরমুলার স্তোত্রকারী হিসেবে নিজেদের ক্রমশঃ এক মতবাদসর্বস্ব আচার-অনুষ্ঠান-পালনকারী প্রাণহীনতায় নিমজ্জিত করছে, পুঁজিবাদী যাপনের বিরুদ্ধে মৌল প্রশ্নগুলো তোলারও ক্ষমতা হারিয়েছে।

পুঁজিবাদের আপোষহীন সমালোচক মার্কস-এর চিন্তার চলমানতা কীভাবে মার্কসবাদের মধ্যে রুদ্ধ হয়ে পুঁজিবাদকে প্রশ্ন করার ক্ষমতা খুইয়ে বসলো, তার কিছু ইতিহাসচিহ্ন ফিরে দেখা যাক।

মার্কস পুঁজিবাদের উৎপত্তি বর্ণনা করতে গিয়ে এই প্রক্রিয়াকে ‘আদিম পুঞ্জীভবন' (primitive accumulation) বলে অভিহিত করেছিলেন। পুঁজি কেন্দ্রীভূত করার এই পদ্ধতি রুশ বিপ্লবের পর সমাজতন্ত্র গঠনের জন্যও এত গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়েছিল যে বলশেভিক অর্থনীতি-বিশেষজ্ঞ প্রিওব্রাঝেনস্কি তঁার মান্য বইয়ে ‘সমাজতান্ত্রিক আদিম পুঞ্জীভবন' (socialist accumulation) নাম দিয়ে তা কীভাবে মূলত কৃষকদের সম্পদ রাষ্ট্রের অধীনে কেন্দ্রীভবন ও শিল্পপণ্যের তুলনায় কৃষিপণ্যের দামকে জোর করে নামিয়ে রাখার মধ্য দিয়ে হতে পারে তা আলোচনা করেছিলেন। পার্টির মধ্যে ক্ষমতার লড়াইয়ে পরাভূত হয়ে প্রিওব্রাঝেনস্কি পরবর্তীতে অবাঞ্ছিততে পরিণত হয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হলেও, তঁার ‘সমাজতান্ত্রিক আদিম পুঞ্জীভবনের’ নিদান অবাঞ্ছিত হয়নি। ১৯৩০-য়ের দশকে স্তালিনের নেতৃত্বে রুশ কম্যুনিস্ট পার্টি সোভিয়েত রাশিয়ার গ্রামাঞ্চলে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও লু্ন্ঠন বল্গাহীন করে কৃষিতে যে ‘সমবায়িকরণ’ (collectivisation) প্রক্রিয়া হাসিল করেছিল, তা এই ‘সমাজতান্ত্রিক পুঞ্জীভবন’ তত্ত্বেরই প্রয়োগ বলা যায়।

পুঁজিকে কেন্দ্রীভূত করার এই বিধ্বংসী প্রক্রিয়াকে মতবাদিক নির্ধারণের মাধ্যমে আপন করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে প্রচলিত মার্কসবাদ পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিকল্প অনুসন্ধান ও গঠনের অনুশীলনের বদলে পুঁজিবাদী ব্যবস্থারই একটি অন্যতর রূপ নির্মাণের অনুশীলনে পরিণত হয়েছে।

এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে রুশ বিপ্লবী ভেরা জাসুলিচের চিঠির প্রত্যুত্তরে লেখা মার্কসের চিঠিতে আমরা মার্কসের এমন ভাবনার প্রকাশ দেখতে পাই যেখানে মার্কস বিপ্লবোত্তর রাশিয়ায় (তখনও রুশ বিপ্লব হয়নি) পশ্চিমী কেন্দ্রীভূত বৃহদায়তন শিল্পের পরিবর্তে কৃষকদের বিকেন্দ্রীভূত গ্রামীণ কমিউনগুলোর উপর ভিত্তি করে সমাজতন্ত্রের পথে এগোনোর সম্ভাবনার কথা বলেছিলেন। সুতরাং মার্কসের ভাবনায় পশ্চিমী পুঁজিবাদী উন্নয়নী বিশ্ববীক্ষার প্রভাবই কেবল ছিল না, তার দিকে সংশয়ী চোখে তাকানো অন্যতর উপাদানও ছিল। মার্কসবাদীরা অবশ্য মার্কসের ভাবনার এই সংশয়ী অনেকান্ততাকে উপেক্ষা করেই তাদের ‘বৈজ্ঞানিক মতবাদ' নির্মাণ করেছে।

লেনিন ও বলশেভিকরা যেভাবে মার্কসবাদ পাঠ করেছিলেন, তা থেকে তাঁদের ধারণা ছিলো যে পুঁজিবাদ থেকে পুঁজিবাদোত্তর সমাজে উৎক্রমণের ভিত্তি হলো পুঁজিবাদের পর্যায়ে উৎপাদনীশক্তির বিকাশ যে চূড়ান্ত বিন্দুতে পৌঁছেছে, তা ছুঁয়ে এবং তারপর তা পেরিয়ে উৎপাদনী শক্তির বিকাশ আরো অপার করে দেওয়া। ফলে, বিপ্লবোত্তর সমাজে সমাজতন্ত্র গড়ায় অংশ নেওয়া শ্রমিকদের যে সাংস্কৃতিক স্তর অর্জন করা আবশ্যক বলে তাঁরা বোধ করেছিলেন, তা সমাজজুড়ে জড়-উৎপাদন বৃদ্ধি ও উৎপাদনী শক্তির অবিরত বিকাশ স্বতপ্রবৃত্তভাবে সংগঠিত ও পরিচালনা করার সংস্কৃতি। তাই তাঁরা ভেবেছিলেন যে সংগঠিত শিল্পের তুলনামূলক অবিকাশের কারণে রুশ শ্রমিকরা এই সংস্কৃতি অর্জনে পিছিয়ে থাকলেও জার্মানি বা পশ্চিম ইউরোপের কোনো শিল্পোন্নত দেশে বিপ্লব হলে সেখানকার শ্রমিকশ্রেণি এই সাংস্কৃতিক স্তরের মূর্ত নিদর্শন হাজির করে বিপ্লবোত্তর রাষ্ট্র সংগঠনের পথ স্পষ্ট করে দেবে।

একথা ঠিক যে লেনিনবাদীরা পশ্চিম ইউরোপে যে ধরনের বিপ্লবের কল্পনা বা আশা করেছিলেন তা বাস্তবায়িত হয়নি। কিন্তু একথাও সত্য যে পশ্চিম ইউরোপের একাধিক শিল্পোন্নত দেশে, বিশেষ করে স্ক্যান্ডিনেভিয় দেশগুলোতে, সমাজ-গণতান্ত্রিক (social democrat) পার্টিগুলো বেশ লম্বা সময় ধরেই ক্ষমতায় থেকেছে। সেখানকার শিল্প-শ্রমিকরাও বেশ বড় সময় ধরেই এই পার্টিগুলোর মধ্যে বা সঙ্গে থেকেছে। কেন্দ্রীভূত উৎপাদন-পরিকল্পনা ব্যবস্থায় দক্ষ শিল্প-শ্রমিকদের অংশগ্রহণ, উৎপাদন পরিচালনায় দক্ষ শ্রমিকদের ভূমিকা বাড়া, বন্টনব্যবস্থায় নানা জনকল্যাণকামী বন্দোবস্ত এবং তা নিয়ন্ত্রণ-পরিচালনায় দক্ষ শ্রমিকদের নানারূপ সংগঠনের ভূমিকা নেওয়া-- এসবই দেখতে পাওয়া যাবে, কিন্তু তা দিয়ে পুঁজির সংবহন-পুনরুৎপাদন-সঞ্চয় বাধার মুখে পড়েনি। এই সাংস্কৃতিক স্তর শ্রমিকদের মধ্যেও ‘সংশ্লিষ্ট উৎপাদক’ (‘associated producers’, মার্কস সমাজতন্ত্রে উৎপাদকদের যেভাবে কল্পনা করেছিলেন)-মুখী কোনো বোধোদয় ঘটায়নি, বরং নানা ক্ষয়চিহ্ন প্রকট করে তুলেছে, যেমন: শ্রমিকশ্রেণির আন্তর্জাতিকতাবোধের বদলে জাত্যাভিমানী অপরবিদ্বেষী (বিশেষ করে অভিবাসী-শ্রমিক-বিদ্বেষী) বোধ শক্তিবৃদ্ধি করেছে, উৎপাদনীশক্তি বিকাশের পথে কাজের খণ্ডিতকরণ ও যান্ত্রিকীকরণ শ্রমিকদের বিচ্ছিন্নতা (alienation) বহুগুণ বাড়িয়ে বিচ্ছিন্ন একাকী এক উপভোক্তার সংকীর্ণতায় আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলছে, সমাজতন্ত্রকামী বিপ্লবী রাজনীতির বদলে বিদ্বেষী অতি-ডানপন্থী রাজনীতির মক্কেল করে তুলছে। আরও একটি দিক ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, তা হলো: উৎপাদন-বন্টন প্রযুক্তি-প্রকৌশলের অভাবনীয় (প্রায় জাদুকরী) বিকাশ উৎপাদকদের ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্নকৃত শ্রম (alienated labour) ও অস্তিত্বযাপনের (being) সময় ও পরিধি কমাচ্ছে না, বরং গুণগত ও মাত্রাগত উভয়ভাবেই ক্রমশ বাড়িয়ে চলেছে, যা সামাজিক বিষয়ী হিসেবে তাদের সক্রিয়তার ধারাটিকেও শুকিয়ে আনছে। প্রযুক্তি-প্রকৌশলে দড় দক্ষ শ্রমিক এবং দৈহিক শ্রমশক্তি-নির্ভর অদক্ষ শ্রমিকদের মধ্যে ক্রমশ চওড়া হতে থাকা সামাজিক-অর্থনৈতিক বৈষম্য-পরিসর এতটাই স্বাভাবিকতা অর্জন করে ফেলেছে যে তা ঐক্যবদ্ধ শ্রেণিস্বার্থ কল্পনা করাকেও দুঃসাধ্য করে তুলেছে। 

ফলে লেনিন ও বলশেভিকরা যে সাংস্কৃতিক স্তরের কথা বলেছেন, তা যে শিল্পোন্নয়নের অগ্রগতি স্বাভাবিকভাবেই শ্রমিকদের মধ্যে সঞ্চারিত করে দিতে থাকবে না, উৎপাদন পরিকল্পনা ও পরিচালনায় অংশগ্রহণ ও দক্ষতাবৃদ্ধিও যে তার মাপকাঠি নয়, তা অস্বীকার করার কোনো উপায় আজ আর নেই। ‘পুঁজিবাদ নিজেই তার কবরখনকদের তৈরি করে দেয়’—এ আপ্তবাক্য বেশ স্বস্তিদায়ক হলেও, তা মিছে আশার ছলনা কিনা সেই সংশয় আর এককথায় নাকচ করে দেওয়া সম্ভব নয়।

পুঁজিবাদোত্তর সমাজ-পরিচালনার কাম্য দিশায় তাই আজ এই বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে গেছে। উৎপাদনী শক্তির বিকাশ উৎপাদকদের সংশ্লিষ্ট প্রয়াস (associated effort)-এর মধ্য দিয়ে করা আজ দিশা নয়, আজ দিশা হলো পুঁজি-নির্দেশিত ভোগ-উৎপাদন-এর সঙ্গে পরিবেশ-প্রকৃতির দ্বন্দ্বজাত ফাটল বুজিয়ে প্রকৃতির বিপাকক্রিয়ার অন্তর্গত মানব-অস্তিত্ব যৌথপ্রয়াসে নির্মাণ করা। বৃহৎ শিল্প কেন্দ্রীক অর্থনীতি এবং পণ্য-উপভোগবাদের মায়ার টানে পুঁজিবাদ যে বিকাশপথ একমেবাদ্বিতীয়ম বলে হাজির করেছে, সমাজতান্ত্রিক গঠনকার্যের নামে তারই লেজুড়বৃত্তি না করে প্রকৃতই বিকল্প পথ খুঁজে নেওয়া আজ প্রয়োজন।

বৃহৎ শিল্প কেন্দ্রীক অর্থনীতি এবং পণ্য-উপভোগবাদের জোড়া ফলার আক্রমণে সমস্ত ‘পশ্চাদপদতা’-কে ঝেঁটিয়ে বিদায় করে পৃথিবীর সমস্ত মানুষের জীবনযাত্রার মান হলিউডি বাণিজ্যিক সিনেমায় দেখানো ‘উন্নত’ জীবনযাত্রায় পৌঁছে দেওয়া যাবে কি না তা নিয়ে ১৯৮০ ও ১৯৯০ দশকের বিতর্কগুলো মূলত এই ‘বিকাশপথ’-এ এগোনোর সঠিক পন্থা নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। মার্কিন-নির্দেশিত পথে আন্তর্জাতিক অর্থভাণ্ডার/ বিশ্বব্যাঙ্ক, জাতিসংঘ ও ন্যাটো-র পৌরোহিত্য মেনে নেওয়া সঠিক পন্থা, নাকি, সোভিয়েত শিল্পায়নের রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত পরিকল্পনার পথে সোভিয়েত শিবিরের সাহায্য নিয়ে এগোনো সঠিক পন্থা। ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে এই দুই পন্থারই বেশ কিছু বিরূপ প্রভাব ফুটে উঠছিল। মার্কিন-নির্দেশিত পথে বিভিন্ন দেশ যেভাবে আন্তর্জাতিক ব্যাঙ্ক ও বিনিয়োগকারীদের কাছে উন্নয়নী খাতে নেওয়া ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ে দেশের সমস্ত সম্পদ বন্ধক রাখা বা নীলামে চড়ানোর পাশাপাশি ‘কাঠামোগত পুনর্বিন্যাস’ (structural adjustment)-এর নামে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের (মূলত মার্কিনী বা ইউরোপীয় ব্যাঙ্ক ও বিনিয়োগকারীদের প্রতিনিধি) হাতেই অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক নীতি-নির্ধারণের ক্ষমতা তুলে দিতে বাধ্য হচ্ছিল, তা সেইসব দেশে বৈষম্যবৃদ্ধি, বিপুল অংশ সাধারণজনের নিঃস্বকরণ ঘটাতে ঘটাতে যাচ্ছিল। এই পথের কুপ্রভাবকে বাজার ও পুঁজির চাহিদাকে অনিয়ন্ত্রিত ভাবে কাজ করতে দেওয়ার মাশুল হিসেবে চিহ্নিত করে সমলোচকরা তা নিয়ন্ত্রণের নানা অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক কূটকৌশল নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছিলেন। আর সমালোচকদের একটা বড় অংশ সোভিয়েত শিবিরের দিকে নির্দেশ করে সমাধানের কথা বলছিলেন। কিন্তু সেই সোভিয়েত শিবিরেও স্বস্তি ছিল না। বাজার ও পুঁজিকে কড়া পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে শিল্পবিকাশ ও ভোগবৃদ্ধির পথে বশ করার শাসনদণ্ড যে রাষ্ট্রের হাতে তা সর্বাত্মকতাবাদী শাসক হয়ে উঠে গোটা সমাজজীবনকেই এমনভাবে নিয়মানুগ ও বাধ্য করে তুলতে উদ্যত হয়েছে, যে কোনো ব্যর্থতা স্বীকার এতটাই তার স্বভাববিরুদ্ধ যে সমস্ত সমালোচনাকে দমন করে সমস্ত ব্যর্থতাকে মতবাদ ও প্রচারের রোশনাইয়ে ঢেকে সাফল্য বলে জমকালো করে তুলছে, তা মুক্তি নয়, সাধারণজনের অধিকার হরণের মহাকাব্য রচনা করল। গণরোষ ও গণআন্দোলন প্রথমে পূর্ব ইউরোপের সোভিয়েত শিবিরকে ভেঙে ধূলিস্মাৎ করল, তারপর ভেঙে পড়ল সোভিয়েত ইউনিয়নও। সোভিয়েত সাহায্যে অভূতপূর্ব বিকাশের পোস্টার-বয় কিউবার অর্থনীতিও ঘোরালো সংকটের মুখে পড়ল তার অত্যধিক আমদানি-নির্ভরতা বা পর-নির্ভরতার জন্য। ফলে বিকাশ ও ভোগবৃদ্ধির পথ অনুসরণের এই পন্থাও ব্যর্থতারই বেশি জন্ম দিয়েছে, সেই ব্যর্থতা যখন আর ঢেকে রাখা যায়নি, তখন নির্দিষ্ট মতবাদপালনে কোথায় কী খামতি হয়েছে তা নিয়ে বাকবিতণ্ডা লেগেছে।

পুঁজিবাদের ধর্মই হলো কেন্দ্রীভবন। পুঁজি এবং অর্থনীতির কেন্দ্রীভবনের সাথে সাথে ক্ষমতা ও রাজনীতি-প্রশাসনেরও কেন্দ্রীভবন। এর উল্টোদিকে চলতে গেলে সামগ্রিক বিকেন্দ্রীকরণের প্রক্রিয়ায় পাড়ি দিতে হবে। অর্থনীতির কেন্দ্রীভবনকে ভেঙে উৎপাদন ও বন্টনের প্রক্রিয়াকে বিকেন্দ্রীভূত করে, ছোটো ছোটো আঞ্চলিক একক--- যেগুলো পরস্পর-সমন্বিত হলেও আত্মশক্তিনির্ভর ও আত্মবোধনির্ভর--- তেমনভাবে আমাদের সামগ্রিক উৎপাদন-পুনরুৎপাদনের কাজ সাজাতে না পারলে অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের আধারগুলোও গড়ে উঠতে পারবে না। প্রতিটি অঞ্চলের মানুষ তাদের নিজস্ব জ্ঞান-পরম্পরা, নিজভূমির প্রকৃতির সঙ্গে সংসক্তি ও তাদের জীবনাচরণের স্বাভাবিকতা অনুযায়ী তাদের এলাকার কৃষি-শিল্প-শিক্ষাব্যবস্থা-প্রশাসনবিধি গড়ে তুলবে, বিচার-বিবেচনা করে পরিবর্তন দরকার মনে হলে নিজেরাই তা করবে, এবং এসব করার জন্য অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্তগ্রহণের পরিসরগুলোও গড়ে তুলবে ও বজায় রাখবে। বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে ভাবনা-চিন্তা-জিনিষপত্রের আদানপ্রদান একে অপরের থেকে বিবিধ কিন্তু একে অপরের সমান পড়শিদের মধ্যে সহবাসীর নৈকট্য তৈরি করবে, পরস্পরের প্রতি আগ্রহ ও সম্মান তৈরি করবে। কোনো জাতি-রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের সমসত্ত্বতা-আরোপকারী শিকলে বেঁধে, সরবশক্তিমান কোনো রাষ্ট্রের পায়ের তলে ভাবনা-চিন্তা-সিদ্ধান্তের সমস্ত স্বাধীনতাকে বিসর্জন দিইয়ে ঐক্য বিধান করতে হবে না। কোনো একলষেঁড়ে ক্ষুদ্র বদ্ধতায় বন্দী হয়ে নিরাপত্তা খোঁজা এ নয়, সীমানাহীন পৃথিবীর সঙ্গে নিবিড় আত্মীয়তা পাতিয়েও নিজ স্বতঃক্রিয়ার পরিধিটির সার্বভৌমত্ব বজায় রাখার প্রয়াস এটা, এ ছাড়া প্রকৃত প্রস্তাবে সর্বজনের আত্মশাসন/স্বশাসন সম্ভব নয়।

এই প্রয়াসের জন্য কোনো তাত্ত্বিক নীল নকশার উপর জোর না দিয়ে, সার্বজনীন কোনো পন্থা আবিষ্কার করে ফেলার বাগাড়ম্বর পরিহার করে, সর্বজনের রাজনৈতিক স্বতঃক্রিয়াকে আত্মপ্রকাশিত ও বিকশিত হতে দেওয়ার ছোটো ছোটো ক্ষেত্রগুলোর সন্ধান করা বা নির্মাণ করার চেষ্টা করা এবং সহযোগিতা-সহানুভূতির সম্পর্ক তৈরি করে এহেন বিবিধ প্রচেষ্টার মধ্যে সংহতি তৈরির চেষ্টা করা, এ কাজ বোধহয় সম্ভব। মার্কসবাদের দেহে rigor mortis-এর চিহ্নগুলো প্রকট হয়ে উঠলেও পুঁজিবাদের বিকল্প অনুসন্ধান ও নির্মাণ তাই এখনও অতি জীবিত ও প্রাণময় একটি বিষয়।

১৪ই মার্চ, ২০২৬

0 Comments
Leave a reply