একটি কৃশকায় মাছি কিছুক্ষণ ধরে ঘুরছিল বাসের ভেতরে, যদিও জানালাগুলো সবই তোলা ছিল। অদ্ভুতভাবে, সে ক্লান্ত ডানা মেলে নিঃশব্দে এদিক-ওদিক উড়ে বেড়াচ্ছিল। জ়ানিন তার গতিপথ হারিয়ে ফেলে ছিল, তারপর দেখল মাছিটি তার স্বামীর স্থির হাতের ওপর বসে পড়েছে। ঠান্ডা পড়েছিল। বালুময় বাতাসের প্রতিটি ঝাপটায়, যা কাচের গায়ে কটকট শব্দ তুলছিল, মাছিটি কেঁপে উঠছিল। শীতের সকালের ক্ষীণ আলোয়, পাতলা টিনের খোলস আর ধাতব চাকা-দণ্ডের বিকট শব্দে, গাড়িটি দুলতে দুলতে এগোচ্ছিল—এমনভাবে, যেন আদৌ এগোচ্ছে না। জ়ানিন স্বামীর দিকে তাকাল। সরু কপালে নেমে আসা ধূসর চুলের গোছা, প্রশস্ত নাক, ঝুলে পড়া ঠোঁট—মার্সেলকে মনে হচ্ছিল এক রুষ্ট ফন (ফন: রোমান রূপকথার অর্ধমানব-অর্ধপশু চরিত্র)।
রাস্তার প্রতিটি গর্তে ধাক্কা লাগলেই সে টের পেত—স্বামীর দেহ হঠাৎ কেঁপে উঠছে। তারপর আবার তার ভারী দেহ দু-পা ছড়িয়ে রাখা হাঁটুর ওপর ঢলে পড়ত; ফাঁকা দৃষ্টি, নিস্তেজ, প্রায় অস্তিত্বহীন। শুধু তার মোটা, লোমহীন হাতদুটোই যেন জীবিত ছিল। ধূসর ফ্ল্যানেলের গেঞ্জির হাতা কব্জির ওপর নেমে এসেছিল, ফলে হাতগুলো আরও ছোট আর মোটা দেখাচ্ছিল। সেই হাতদুটো সুটকেসটি এমন শক্ত করে চেপে ধরেছিল যে, তার ওপর ঘুরে বেড়ানো মাছিটির ক্ষীণ নড়াচড়াও যেন তার অনুভূতিতে পৌঁছত না।
হঠাৎ শোনা গেল বাতাসের হাহাকার। বাসের চারদিকে বালির কুয়াশা আরও ঘন হয়ে উঠল। জানালার কাচে বালি ঝাঁপিয়ে পড়তে লাগল—যেন অদৃশ্য হাত সেগুলো ছুড়ে মারছিল। মাছিটি শীতল ডানা ঝাপটাল, পায়ের ওপর ভর দিয়ে কেঁপে উঠল, তারপর উড়ে গেল। বাসের গতি কমে এল—যেন এবার থেমেই যাবে। তারপর বাতাস খানিক স্তিমিত হল; কুয়াশা সামান্য পাতলা হল। গাড়ি আবার ধীরে ধীরে গতি পেল। ধুলোয় ডুবে থাকা দৃশ্যপটের ফাঁক গলে আলো পথ খুঁজতে লাগল। দুই-তিনটি পাতলা, বিবর্ণ খেজুরগাছ—ধাতব ছাঁচের মতো—জানালায় ভেসে উঠল, আর মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল।
“কী দেশ,” মার্সেল বলল।
বাসটি আরব যাত্রীতে ঠাসা ছিল—সবাই ঘোমটা-ঢাকা বুরনুসে মোড়া, ঘুমিয়ে আছে এমন ভঙ্গিতে বসেছিল। তাদের কয়েকজন পা সিটের ওপর ভাঁজ করে রেখেছিল, আর গাড়ির দুলুনিতে অন্যদের চেয়ে বেশি দুলছিল। তাদের নীরবতা, তাদের ঔদাসীন্য, ধীরে ধীরে জ়ানিনের ওপর বোঝা হয়ে চেপে বসছিল। তার মনে হচ্ছিল, যেন দিনের পর দিন এই নির্বাক সঙ্গীদের সঙ্গেই সে ভ্রমণ করছে। অথচ বাসটি ভোরে রেল-টার্মিনাস থেকে ছেড়েছিল। মাত্র দুই ঘণ্টা ধরে, শীতের মধ্যে, বাসটি এগোচ্ছিল এক পাথুরে, নির্জন মালভূমির ওপর দিয়ে—যে মালভূমি শুরুতে তার সোজা রেখাগুলো লালচে দিগন্ত পর্যন্ত প্রসারিত করেছিল। তারপর ঝড় উঠল। ধীরে ধীরে সেই বিশাল বিস্তৃতি গিলে ফেলল সবকিছু। সেই মুহূর্ত থেকে যাত্রীরা আর কিছুই দেখতে পায়নি। একে একে তারা চুপ হয়ে গিয়েছিল এবং এক ধরনের সাদা রাতের ভেতর তারা নীরবে ভেসে চলছিল—মাঝে মাঝে ঠোঁট আর চোখ মুছে নিচ্ছিল, যখন ভেতরে ঢুকে পড়া বালি চোখ-মুখ জ্বালিয়ে দিত।
“জ়ানিন!”
স্বামীর ডাক শুনে সে চমকে উঠল। আবারও মনে হল—এই নামটা তার জন্য কত বেমানান। নামটি যেন হালকা, প্রায় শিশুসুলভ; তার লম্বা, দৃঢ় দেহের ভারী উপস্থিতির সঙ্গে একেবারেই খাপ খায় না।
মার্সেল জিজ্ঞেস করল নমুনার ব্যাগটি কোথায়। জ়ানিন পা বাড়িয়ে বেঞ্চের নিচের ফাঁকা জায়গায় খুঁজল; আঙুলের ডগায় শক্ত কিছু ঠেকল—সম্ভবত ব্যাগটাই। সে নিচে ঝুঁকল না। ঝুঁকতে গেলেই তার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। অথচ কলেজে সে জিমন্যাস্টিকসে প্রথম ছিল। তার শ্বাস ছিল দীর্ঘ, অবিশ্রান্ত—যেন ফুরোবার নয়।
কতদিন আগের কথা? পঁচিশ বছর। পঁচিশ বছর—কিছুই নয়। তার মনে হচ্ছিল, যেন গতকালই সে দাঁড়িয়ে ছিল এক মোড়ে: স্বাধীন জীবন নেবে, না বিয়ে করবে? গতকালই আতঙ্কে ভেবেছিল—একদিন হয়তো একাই বুড়ি হতে হবে তাকে। কিন্তু সে একা ছিল না। সেই আইন-ছাত্র, যে তাকে কখনও ছেড়ে যেতে চাইত না, এখন তার পাশেই বসে আছে।
শেষ পর্যন্ত সে তাকে গ্রহণ করেছিল। যদিও সে একটু খাটো। যদিও তার লোভাতুর, হঠাৎ ফুটে ওঠা হাসি জ়ানিনের ভালো লাগত না। যদিও বাইরের দিকে ঠেলে বেরনো কালো চোখদুটোতে কখনও কখনও অদ্ভুত এক তীক্ষ্ণতায় ঝলকে উঠত। তবু সে ভালোবাসত তার বাঁচার সাহস—এই দেশের ফরাসিদের মধ্যে যা বিশেষ কিছু ছিল না। ভালোবাসত তার বিমর্ষ মুখটাও, যখন মানুষ বা ঘটনা তার প্রত্যাশাকে ভেঙে দিত। সবচেয়ে বেশি, সে ভালোবাসত ভালোবাসা পেতে। মার্সেল তাকে নিরন্তর যত্নে ভরিয়ে রেখেছিল—বার বার তাকে অনুভব করিয়েছিল যে সে তার জন্য আছে, তার ওপর নির্ভরশীল—যে জ়ানিন সত্যিই নিজের অস্তিত্ব অনুভব করত। না, সে একা ছিল না…
বাসটি প্রবল হর্ন বাজিয়ে যেন অদৃশ্য বাধা ভেদ করে এগোচ্ছিল। কিন্তু ভেতরে কেউ নড়ছিল না। হঠাৎ জ়ানিন টের পেল কেউ তাকে দেখছে, আর সে ঘুরে তাকাল পাশের সারির একটি সিটের দিকে। সে আরব ছিল না, আর জ়ানিন অবাক হলো যে যাত্রার শুরুতে তাকে খেয়াল করেনি। তার গায়ে ছিল সাহারার ফরাসি ইউনিটের পোশাক, আর মাথায় হালকা বাদামি কাপড়ের টুপি; মুখ ছিল রোদে পোড়া, শেয়ালের মতো লম্বা ও সূচলো। সে তার ধূসর চোখ দিয়ে জ়ানিনকে স্থিরভাবে দেখছিল, এক ধরনের গোমড়া রুক্ষতায়। জ়ানিন হঠাৎ লজ্জায় লাল হয়ে গেল এবং স্বামীর দিকে ফিরল, যে তখনও সামনে তাকিয়ে ছিল—কুয়াশা আর বাতাসের দিকে। সে কোটে নিজেকে আরও জড়িয়ে নিল। কিন্তু সেই ফরাসি সৈনিকের চেহারাই তার চোখে লেগে রইল—লম্বা ও পাতলা, এতটাই পাতলা যে তার আঁটসাঁট জ্যাকেটের ভেতর তাকে মনে হচ্ছিল যেন শুকনো, ভঙ্গুর কোনো পদার্থ—বালি আর হাড়ের মিশ্রণে গড়া। ঠিক তখনই তার চোখ সামনে বসা আরবদের কঙ্কালসার হাত এবং রোদে পোড়া মুখগুলির ওপর পড়ল। সে লক্ষ্য করল যে তাদের ঢিলেঢালা পোশাকেও তারা স্বাভাবিকভাবেই ছড়িয়ে বসেছিল, আর সে ও তার স্বামী কষ্টে নিজেদের গুঁজে রেখেছিল। জ়ানিন আবার কোটের পাটগুলো নিজের দিকে টেনে নিল। অথচ সে মোটেই মোটা নয়—বরং লম্বা, পূর্ণ, মাংসল। এখনও কাম্য—পুরুষদের দৃষ্টিতে সে তা টের পেত। তার মুখে ছিল একটুখানি শিশুসুলভ সরলতা, চোখ দুটি নির্মল ও উজ্জ্বল; আর সেই বড় দেহ, যার উষ্ণতা ও আরামের কথা সে নিজেই জানত।
না, কিছুই ঘটছিল না তার কল্পনার মতো। মার্সেল যখন তাকে সফরে সঙ্গে নিতে চেয়েছিল, সে আপত্তি করেছিল। এই যাত্রার কথা মার্সেল ভেবেছিল বহুদিন—যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর থেকেই, যখন ব্যবসা আবার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে শুরু করেছিল। যুদ্ধের আগে, বাবা-মার কাছ থেকে পাওয়া ছিট কাপড়ের ছোট দোকানটি—আইন পড়া ছেড়ে দিয়ে—সে নিজের হাতে নিয়েছিল। তখন তাদের জীবন চলত, মোটামুটি ভালোই। উপকূলে, যৌবনের বছরগুলো সত্যিই সুখের হতে পারে। কিন্তু মার্সেল শারীরিক শ্রম পছন্দ করত না। খুবশিগগিরই সে তাকে সৈকতে নিয়ে যাওয়া বন্ধ করে দেয়। ছোট গাড়িটি শহরের বাইরে বেরত শুধু রবিবারে বেড়ানোর জন্য। বাকি সময় সে থাকতে চাইত তার রঙ-বেরঙের কাপড়ে ভরা দোকানে—এই আধা-নেটিভ, আধা-ইউরোপীয় পাড়ায়। দোকানের উপরে তাদের তিন কামরার বাসা—আরবি ঝুল-পর্দা আর বারবেসের ভারী আসবাবে সাজানো। তাদের কোনো সন্তান হয়নি। বছরগুলো কেটে গেছে, আধো-বন্ধ জানালার অন্ধকারে। গ্রীষ্ম, সৈকত, বেড়ানো, এমনকি আকাশও—ধীরে ধীরে দূরে সরে গেছে। মার্সেলকে কিছুই যেন আকর্ষণ করত না—শুধু ব্যবসা ছাড়া। সে ভেবেছিল মার্সেলের আসল আসক্তি—টাকা, আর সেটা তার ভালো লাগত না, যদিও কেন তা স্পষ্ট জানত না। তবে নিশ্চিতই, সেও এর সুফল ভোগ করত। মার্সেল কৃপণ ছিল না; বরং ছিল উদার, বিশেষ করে তার প্রতি। “আমার কিছু হলে,” সে বলত, “তুমি নিরাপদ থাকবে।” সত্যিই, অভাব থেকে আশ্রয় নিতে হয়। কিন্তু অভাবের বাইরে যে চাহিদা, তার থেকে আশ্রয় নেবে কীভাবে? মাঝে মাঝে, দূর থেকে ভেসে আসা কোনো অস্পষ্ট অনুভূতির মতো, এই প্রশ্নটিই তাকে ছুঁয়ে যেত। এদিকে আবার সে মার্সেলকে হিসাব রাখতে সাহায্য করত, কখনও কখনও দোকানে বসতো তার জায়গায়।
সবচেয়ে কঠিন ছিল গ্রীষ্মকাল, যখন তাপ এমনকি একঘেয়েমির ক্ষীণ উত্তেজনাকেও নিঃশেষ করে দিত। হঠাৎ করেই, ঠিক গ্রীষ্মের মাঝামাঝি সময়ে, যুদ্ধ শুরু হল। মার্সেল সেনাবাহিনীতে ডাক পেল, মেডিক্যাল কারণে বাদও গেল। কাপড়ের অভাব দেখা দিল, ব্যবসা থেমে গেল, রাস্তাগুলো হয়ে উঠল জনশূন্য আর উত্তপ্ত। যদি কোনো অঘটন ঘটে, নিরাপত্তার ছায়া সরে যাবে। তাই বাজারে কাপড় ফিরে আসতেই মার্সেল ঠিক করল, মধ্যস্বত্বভোগী বাদ দিয়ে উচ্চ মালভূমি ও দক্ষিণের গ্রামগুলোতে গিয়ে সরাসরি আরব ব্যবসায়ীদের কাছে মাল বিক্রি করবে। সে চেয়েছিল জ়ানিনকে সঙ্গে নিতে। জ়ানিন জানত যাত্রা কঠিন, তার শ্বাসকষ্ট ছিল, এবং সে বাড়িতেই থাকতে চেয়েছিল। কিন্তু মার্সেল ছিল একগুঁয়ে, আর না বলতে যে শক্তি দরকার—তা তার ছিল না।
এখন তারা এখানে। আর সত্যিই, কিছুই তার কল্পনার মতো নয়। সে ভেবেছিল প্রচণ্ড গরম, মাছির ঝাঁক, আর অ্যানিসের গন্ধে ভরা নোংরা সরাইখানা। ঠান্ডার দংশন, বাতাসের ধারালো আঘাত, আর মোরাইনে ভরা মেরু-অঞ্চলের মতো মালভূমি—এসবের কথা তার কল্পনায় আসেনি। তার স্বপ্নে ছিল খেজুরগাছের ছায়া আর নরম বালি। সে এখন যা দেখল তা মরুভূমি নয়—কেবল পাথর আর পাথর। আকাশে, যেখানে এখনো রাজত্ব করছে ঠান্ডা, খসখসে পাথরের ধুলো, আর মাটিতে, যেখানে পাথরের ফাঁকে ফাঁকে জন্মায় শুধু শুকনো ঘাস।
হঠাৎ ঝাঁকুনি দিয়ে বাসটি থেমে গেল। ড্রাইভার সবার উদ্দেশে কয়েকটি কথা বলল এমন এক ভাষায়, যা জ়ানিন সারাজীবন শুনেছে, কিন্তু কখনো বোঝেনি।
“কী হয়েছে?” মার্সেল জিজ্ঞেস করল। এবার ড্রাইভার ফরাসিতে বলল—বালি ঢুকে কার্বুরেটর বন্ধ হয়ে গেছে। মার্সেল আবারও দেশটাকে গাল দিল। ড্রাইভার দাঁত বের করে হেসে বলল, কিছু নয়—কার্বুরেটর পরিষ্কার হলেই আবার চলা যাবে। সে দরজা খুলতেই ঠান্ডা বাতাস গাড়ির ভেতর ঢুকে পড়ল; সঙ্গে সঙ্গে হাজার বালিকণা তাদের মুখে বিঁধতে লাগল। সব আরব যাত্রী নীরবে বুরনুসের ভেতর মুখ গুঁজে নিজেদের গুটিয়ে নিল।
“দরজা বন্ধ করো!” চিৎকার করল মার্সেল। ড্রাইভার হাসতে হাসতে ফিরে এসে ড্যাশবোর্ডের নিচ থেকে কয়েকটি যন্ত্র তুলে নিল। তারপর, কুয়াশার মধ্যে ক্রমে ক্ষুদ্র হয়ে, আবার সামনের দিকে মিলিয়ে গেল—দরজা খোলা রেখেই। মার্সেল দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“তুমি নিশ্চিত থাকতে পার, সে জীবনে কোনো মোটর দেখেনি।”
“থাক,” শান্ত গলায় বলল জ়ানিন। হঠাৎ সে চমকে উঠল। রাস্তার উঁচু বাঁধের ওপর, বাসের একেবারে কাছাকাছি, কয়েকটি ঢাকা অবয়ব স্থির দাঁড়িয়ে। বুরনুসের হুডের তলায়, ঘোমটার প্রাচীরের আড়ালে, দেখা যাচ্ছিল শুধু চোখ। নিঃশব্দে—কোথা থেকে এসেছে বোঝা যায় না—তারা যাত্রীদের দিকে তাকিয়ে ছিল।
“মেষপালক,” বলল মার্সেল।
গাড়ির ভেতরে সম্পূর্ণ নীরবতা। সব যাত্রী মাথা নিচু করে বসে, যেন এই অন্তহীন মালভূমির উপর মুক্তি পেয়ে ছুটে চলা বাতাসের স্বর শুনছে। হঠাৎ জ়ানিনের চোখে পড়ল—প্রায় কোনো মালপত্রই নেই। রেল-টার্মিনাসে ড্রাইভার তাদের বড় ট্রাঙ্ক আর কয়েকটি বোঝা ছাদে তুলে দিয়েছিল। গাড়ির ভেতরে, জালের তাকগুলোতে দেখা যাচ্ছিল শুধু কয়েকটি গিঁটওয়ালা লাঠি আর চ্যাপ্টা ঝুড়ি। দক্ষিণের এই মানুষগুলো, স্পষ্টতই, প্রায় খালি হাতেই ভ্রমণ করছিল।
কিন্তু ড্রাইভার দ্রুত ফিরে এল। মুখ সে-ও কাপড়ে ঢেকেছে; শুধু চোখ দুটোই হাসছিল। সে জানাল, এখনই রওনা হবে। দরজা বন্ধ হতেই বাতাস স্তব্ধ হল, আর জানালার কাচে বালির ঝরঝর শব্দ আরও স্পষ্ট শোনা গেল। ইঞ্জিন কাশল, তারপর নিঃশ্বাস ফেলে থেমে গেল। দীর্ঘক্ষণ স্টার্টারের চাপে অবশেষে সাড়া দিল; ড্রাইভার অ্যাক্সেলেটরে চাপ দিয়ে তাকে হুঙ্কার তুলতে বাধ্য করল। একটা বড় হেঁচকির মতো ঝাঁকুনি দিয়ে গাড়ি আবার চলতে শুরু করল। স্থির দাঁড়িয়ে থাকা ছিন্নবস্ত্রের মেষপালকদের ভিড় থেকে একটি হাত উঠল—তারপর কুয়াশায় মিলিয়ে গেল, তাদের পেছনে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই রাস্তা আরও খারাপ হয়ে উঠল। গাড়ি লাফাতে লাগল। আরব যাত্রীরা দুলতে দুলতে বসে রইল। জ়ানিন টের পাচ্ছিল, ঘুম ধীরে ধীরে তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলছে—ঠিক তখনই তার সামনে এগিয়ে এল একটি ছোট হলুদ বাক্স, লজেন্সে ভরা। সৈনিক-শেয়ালটি হাসিমুখে তাকিয়ে ছিল। দ্বিধা কাটিয়ে জ়ানিন একটি লজেন্স নিল এবং ধন্যবাদ জানাল। সৈনিক বাক্সটি পকেটে ঢুকিয়ে নিল—এবং একই সঙ্গে হাসি গিলে ফেলল। এখন সে সোজা সামনে, রাস্তার দিকে তাকিয়ে। জ়ানিন মার্সেলের দিকে ফিরল, কিন্তু দেখতে পেল শুধু তার শক্ত ঘাড়ের পেছনটা। জানলার বাইরে মার্সেল তাকিয়ে ছিল—বালি-পাথরের বাঁধ থেকে উঠে আসা আরও ঘন কুয়াশার দিকে।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাস চলছিল, ক্লান্তি যেন গাড়ির ভেতরের সমস্ত প্রাণশক্তিকে নিভিয়ে দিয়েছিল। হঠাৎ বাইরে শোরগোল উঠল—বুরনুস পরা বাচ্চারা লাট্টুর মতো ঘুরতে ঘুরতে, লাফাতে লাফাতে, হাততালি দিতে দিতে বাসের চারপাশে দৌড়াচ্ছিল। বাসটি এখন একটি দীর্ঘ রাস্তায় এগোচ্ছিল, যার দুপাশে সার বেঁধে নিচু ঘরবাড়ি। তারা ধীরে ধীরে ওয়েসিসে ঢুকে পড়ছিল। বাতাস তখনও বইছিল, দেয়ালগুলো বালির কণাগুলোকে থামিয়ে দিচ্ছিল—যে কণাগুলো আলোকে আরও ঘোলাটে করে তোলে।
ব্রেকের কর্কশ ধাতব চিৎকারে বাস থেমে গেল কাঁচা-মাটির খিলানওয়ালা একটি হোটেলের সামনে। রাস্তায় পা দিতেই জ়ানিন সামান্য টলে গেল। বাড়িগুলোর মাথায় সে দেখতে পেল হলুদ, সরু মিনার।। তার বাঁ দিকে ওয়েসিসের খেজুরগাছগুলোর প্রথম সারি ইতিমধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। সে সেদিকেই যেতে চেয়েছিল।। কিন্তু দুপুর হলেও ঠান্ডার তীব্রতা কমেনি। বাতাসে সে কেঁপে উঠল। সে মার্সেলের দিকে ফিরল, কিন্তু প্রথমেই চোখে পড়ল সৈনিকটি—সে এগিয়ে আসছিল। জ়ানিন অন্তত একটা হাসি বা সম্ভাষণ আশা করেছিল। কিন্তু সৈনিকটি একবারও চোখ না তুলে তাকে পেরিয়ে ভিড়ের মধ্যে মিলিয়ে গেল। মার্সেল তখন ট্রাঙ্ক নামাতে ব্যস্ত। ড্রাইভার ছাদে উঠে বুরনুস পরা লোকদের ভিড়ের সামনে বক্তৃতা ঝাড়ছিল। হাড়-চামড়ার মতো মুখগুলো, গলার গভীর থেকে উঠে আসা কর্কশ স্বর—এই বেষ্টনীর ভেতর দাঁড়িয়ে হঠাৎ তার ক্লান্তি ফিরে এল। “আমি উপরে যাচ্ছি,” সে মার্সেলকে বলল, যে তখন বিরক্ত হয়ে ড্রাইভারকে ডাকছিল।
জ়ানিন হোটেলে ঢুকল। রোগা, স্বল্পভাষী এক ফরাসি মালিক এগিয়ে এল। সে তাকে দোতলায় নিয়ে গেল, রাস্তার ওপর ঝুলে থাকা একটি বারান্দা পেরিয়ে এমন এক ঘরে, যেখানে ছিল শুধু একটি লোহার খাট, সাদা রঙ করা একটি চেয়ার, পর্দাহীন একটি আলমারি, আর বেতের তৈরি একখানা আড়ালের পেছনে একটি প্রসাধনের ছোট্ট কোণ—যার বেসিনের ওপর পাতলা বালির স্তর জমে ছিল। দরজা টেনে বেরিয়ে গেলে জ়ানিন অনুভব করল চুনকাম করা খালি দেয়াল থেকে ছুঁয়ে আসা শীতলতা। সে ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না, কোথায় রাখবে ব্যাগ, কোথায় রাখবে নিজেকে। শুতে হবে, না দাঁড়িয়ে থাকতে হবে—উভয় অবস্থাতেই তাকে কাঁপতে হবে। সে দাঁড়িয়ে রইল, ব্যাগ হাতে, সিলিঙের কাছে থাকা সরু চেরা জানালার দিকে তাকিয়ে। কেন অপেক্ষা করছে, সে জানত না। শুধু অনুভব করছিল তার একাকীত্ব, হাড়ে ঢুকে পড়া শীত, আর হৃদয়ের গভীরে জমে থাকা এক অদৃশ্য ভার।
সে যেন আধা-স্বপ্নে ভাসছিল। রাস্তার শব্দ, মার্সেলের কণ্ঠস্বর—সবই অস্পষ্ট। বরং বেশি স্পষ্ট ছিল সেই সরু ফাঁক দিয়ে ভেসে আসা নদীর মতো গুঞ্জন, যা প্রকৃতপক্ষে ছিল খেজুরগাছগুলির মাথায় বাতাসের শব্দ। বাতাস আরও জোরে বইতে শুরু করল। মৃদু জলধ্বনি ঢেউয়ের ঝঙ্কারের মতো তীব্র ধ্বনিতে রূপ নিল। দেয়ালের ওপারে সে কল্পনা করল সোজা ও নমনীয় খেজুরগাছের সমুদ্র—ঝড়ে দোল খাচ্ছে। কিছুই তার প্রত্যাশার মতো ছিল না। তবুও সেই অদৃশ্য ঢেউগুলি তার ক্লান্ত চোখকে সজীব করে তুলল। ঝুলে পড়া হাতের ভারে সামান্য ঝুঁকে দাঁড়িয়ে ছিল সে। পা বেয়ে শীত উপরে উঠে যাচ্ছিল। সে স্বপ্নে ঋজু ও নমনীয় খেজুরগাছগুলির মাঝে দেখছিল সেই মেয়েটিকে, যা এককালে সে নিজেই ছিল।
হাত-মুখ ধুয়ে তারা ডাইনিং রুমে নামল। ফাঁকা দেয়ালে আঁকা উট আর খেজুরগাছগুলো গভীর গোলাপি-বেগুনি পটভূমিতে কিছুটা ফিকে দেখাচ্ছিল। জানলাগুলি থেকে খীণ আলো ঢুকছিল। মার্সেল ম্যানেজারের কাছে ব্যবসায়ীদের ব্যাপারে জানতে চাইল। তারপর পোশাকে সামরিক পদক লাগানো এক বৃদ্ধ আরব তাদের খাবার পরিবেশন করল। মার্সেল একমনে রুটি ছিঁড়ে ছোট ছোট টুকরো করছিল। সে তার স্ত্রীকে জল খেতে বাধা দিল। “এটা ফুটানো হয়নি। বরং ওয়াইন খাও।”
জ়ানিন ওয়াইন পছন্দ করত না; এতে আলসেমি আসে। তাছাড়া মেনুতে ছিল শুয়োরের মাংস।
“কোরান এটা নিষিদ্ধ করেছে। কিন্তু কোরান জানে না যে ভালোভাবে রান্না করা শুয়োরের মাংস শরীরের ক্ষতি করে না। আমরা ফরাসিরা রান্না করতে জানি। তুমি কী ভাবছ?”
জ়ানিন কিছুই ভাবছিল না—হয়তো ভাবছিল নবীদের ওপর রাঁধুনিদের বিজয় নিয়ে। কিন্তু তাকে তাড়াহুড়ো করতে হচ্ছিল, কারণ পরের দিন সকালে তাদের আরও দক্ষিণে যাত্রা করতে হবে। আজকের বিকেলের মধ্যে সব গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়ীর সঙ্গে দেখা সেরে ফেলতে হবে। মার্সেল তখন বৃদ্ধ আরবকে তাড়াতাড়ি কফি দিতে বলল। বৃদ্ধটি হেসে কিছু না বলে মাথা নেড়ে ধীরে ধীরে চলে গেল।
“সকালে ধীরে চলো, বিকেলে তাড়াহুড়ো করো না,” হাসতে হাসতে বলল মার্সেল।
অবশেষে কফি এলো। তারা তা শেষ করে ধূলিময়, ঠাণ্ডা রাস্তায় বেরিয়ে পড়ল। মার্সেল একজন তরুণ আরবকে ডেকে ট্রাঙ্ক বইতে বলল, কিন্তু মালবহন খরচ নিয়ে নীতিগতভাবে তর্ক জুড়ে দিল। এই নীতি, যা সে জ়ানিনকেও একবার আগে ব্যাখ্যা করেছিল, এর ভিত্তি—যে লোকেরা সবসময় দ্বিগুণ চায়, শেষে কেবল এক চতুর্থাংশে রফা হয়।
জ়ানিন অস্বস্তি নিয়ে দুই ট্রাঙ্কবাহকের পেছনে পেছনে চলল। ভারী কোটের নিচে সে একটি পশমের পোশাক পরেছিল; চাইছিল যেন তার শরীরটা বেশি মোটা না দেখায়। শুয়োরের মাংস যদিও ভালোভাবে রান্না করা হয়েছিল এবং ওয়াইনও মাত্র সামান্যই পান করেছিল, তবু এই দুটোই তাকে কিছুটা অস্বস্তিতে ফেলছিল।
তারা ধুলোমাখা গাছপালায় ঘেরা একটি ছোট রাস্তা পার হচ্ছিল। আরবরা তাদের অগ্রাহ্য করছিল বা চোখ এড়িয়ে চলছিল। তারা সবাই বুরনুসে জড়ানো; এমনকি যাদের পোশাক ছিল ছেঁড়াফাঁটা, তাদের চলাফেরাতেও এক ধরনের মর্যাদার ছাপ ছিল, যা জ়ানিনের শহরের আরবদের মধ্যে কম দেখা যেত।
জ়ানিন ট্রাঙ্কটির পেছন পেছন চলছিল, আর ট্রাঙ্কটি ভিড় চিরে পথ করে নিচ্ছিল। তারা একটি মাটির কেল্লার সিংহদ্বার পেরিয়ে এমন এক ছোট চত্বরে পৌঁছাল, যেখানে গাছগুলি যেন পাথরের টিলার মতো নিস্পন্দ দেখাচ্ছিল। চত্বরের সবচেয়ে চওড়া অংশে সারি সারি দোকান দাঁড়িয়ে ছিল, প্রতিটির সামনেই ছোট ছোট তোরণ। তারা সারির মাঝখানের একটি দোকানের সামনে থামল। দোকানটির গড়ন ছিল কামানের গোলার মতো, আর রং—যেন হালকা নীল চকের প্রলেপ। বাইরের আলোয় ভেতরটা আধো-অন্ধকার দেখাচ্ছিল। চকচকে কাউন্টারের পেছনে সাদা গোঁফওয়ালা এক বৃদ্ধ আরব দাঁড়িয়ে কায়দা করে তিনটি ছোট রঙিন গ্লাসে চা ঢালছিল। আধো-অন্ধকারে চোখ সয়ে ওঠার আগেই দরজার মুখে পুদিনা চায়ের মিষ্টি গন্ধ এসে লাগল মার্সেল আর জ়ানিনের নাকে। চৌকাঠে ঝুলছিল দস্তা-চাপানো চায়ের কেটলি, পেয়ালা-পিরিচের মালা আর কিছু পোস্টকার্ড। সেগুলো পাশ কাটিয়ে মার্সেল গিয়ে দাঁড়াল কাউন্টারের সামনে। জ়ানিন দরজার কাছেই একটু সরে দাঁড়াল, যাতে আলো ঢাকা না পড়ে। ঠিক তখনই সে বৃদ্ধ ব্যবসায়ীর পেছনের অন্ধকারে দুই আরবকে দেখতে পেল—তারা দোকানের পেছনে ফুলে থাকা বস্তার ওপর বসে মৃদু হাসছিল।
দেয়াল জুড়ে ঝুলছিল লাল-কালো গালিচা আর নকশাকাটা ওড়না। মেঝে ঠাসা ছিল বস্তা আর ছোট ছোট কাঠের বাক্সে—সবকটিই সুগন্ধি দানায় ভরা। কাউন্টারের ওপর, ঝকঝকে পিতলের দাঁড়িপাল্লা আর খোদাই মুছে যাওয়া এক পুরনো গজদণ্ডকে ঘিরে সারি দিয়ে সাজানো ছিল নীল মোটা কাগজে মোড়া চিনির খণ্ড।। তাদের মধ্যে একটি খোলা—নীল কাগজ সরানো, মাথার ওপর কাটা দাগটি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। বৃদ্ধ ব্যবসায়ী কেটলি নামিয়ে রেখে অভিবাদন জানাল। তখনই চায়ের তাজা গন্ধের নিচে চাপা পড়ে থাকা পশম আর মশলার ভারী গন্ধ উঠে এল।
মার্সেল নিচু ও স্বভাবসিদ্ধ দ্রুত স্বরে কথা বলতে শুরু করল। ট্রাঙ্ক খুলে পশম আর সিল্ক বের করল। জিনিসগুলো মেলে ধরতে দাঁড়িপাল্লা আর গজদণ্ড সরিয়ে দিল। তার হাসি উদ্বিগ্ন; কণ্ঠ একটু উঁচু হল। হাত ছড়িয়ে দামাদামির ভঙ্গি করল। বৃদ্ধ মাথা নাড়ল। চায়ের রেকাবি পিছনে বসা দুই আরবের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে কয়েকটি কথা বলল। মার্সেল থেমে গেল। মালপত্র গুটিয়ে ট্রাঙ্কে ভরল। কপাল মুছল—যেন ঘাম মুছছে। তারপর কুলিকে ইশারা করে ট্রাঙ্ক তুলিয়ে তোরণের দিকে এগোল।
পরের দোকানে কিছুটা ভালো ফল মিলল। শুরুতে ব্যবসায়ীর ভঙ্গিও ছিল প্রায় অলিম্পীয় উদাসীন। “ওরা ভাবে ওরা ঈশ্বর,” মার্সেল বলল, “কিন্তু শেষ পর্যন্ত তো ব্যবসা করেই বাঁচতে হয়। জীবন সবার জন্যই কঠিন।” জ়ানিন কোনো জবাব দিল না। সে তার পেছনে চলল। বাতাস প্রায় স্তব্ধ। আকাশের কিছু অংশ পরিষ্কার। মেঘের গভীর ফাঁক থেকে নেমে আসছিল ঠাণ্ডা ধারালো আলো।
তারা উদ্যান পেরিয়ে ঢুকল একটি সরু রাস্তায়—দুপাশে উঁচু হলদে-বাদামি মাটির দেয়াল। দেয়ালে ঝুলছিল ডিসেম্বরের পচা গোলাপ আর কোথাও কোথাও শুকনো, পোকা-খাওয়া ডালিম। বাতাসে ধুলো, কফি, জ্বলা কাঠের ধোঁয়া, পাথর আর ভেড়ার গন্ধ। দেয়ালের গায়ে লেগে থাকা দোকানগুলো দূরে দূরে ছড়ানো।
জ়ানিনের মনে হচ্ছিল তার পা ভারী হয়ে আসছে। কিন্তু তার স্বামী ক্রমশ প্রফুল্ল। বিক্রি শুরু হয়েছে। ফুরফুরে স্বরে সে জ়ানিনকে “সোনা” বলে ডাকল—এই সফর ব্যর্থ হবে না। “অবশ্যই,” জ়ানিন যন্ত্রের মতো বলল, “ওদের সঙ্গে সরাসরি লেনদেন করাই ভালো।”
একটি অন্য রাস্তা দিয়ে তারা শহরে ফিরল। বিকেল অনেকটা গড়িয়েছে। আকাশ এখন প্রায় পরিষ্কার। তারা চৌরাস্তায় এসে থামল। মার্সেল হাত ঘষছিল। সামনে রাখা ট্রাঙ্কটির দিকে তৃপ্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল।
“দেখো,” বলল জ়ানিন।
চৌরাস্তার অন্য প্রান্ত থেকে এক লম্বা, মেদহীন, বলিষ্ঠ আরব এগিয়ে আসছিল। আকাশী নীল বুরনুসে আবৃত, হলুদ নরম বুট, হাতে দস্তানা। মাথা উঁচু, তামাটে মুখ, নাক ঈগলের মতো টিকোলো । শুধু আলগোছে পাগড়ির মতো করে জড়ানো কাপড়টুকু তাকে সেই ফরাসি ‘আফেয়ার ইন্ডিজেন’ অফিসারদের থেকে আলাদা করছিল, যাদের প্রতি জ়ানিনের মাঝে মাঝে এক ধরনের মৃদু মুগ্ধতা ছিল। সে স্থির গতিতে এগিয়ে আসছিল, ধীরে ধীরে এক হাতের দস্তানা খুলতে খুলতে। মনে হচ্ছিল, সে তাদের দিকে নয়, অন্য কোথাও তাকিয়ে ছিল।
“হুঁ,” কাঁধ ঝাঁকিয়ে মার্সেল বলল, “দেখো তো একে, ও নিজেকে জেনারেল মনে করে।”
হ্যাঁ, এখানকার সবার মধ্যেই অহংকার ছিল। কিন্তু এই লোকটা সত্যিই বাড়াবাড়ি করছিল। ফাঁকা চত্বর তাদের চারদিক থেকে ঘিরে রেখেছিল। সে সোজা এগিয়ে আসছিল—তার দৃষ্টিতে না ট্রাঙ্ক, না তারা। দূরত্ব দ্রুত কমে এল। ঠিক গায়ে এসে পড়ার মুহূর্তে মার্সেল হঠাৎ হাতল ধরে ট্রাঙ্কটা পিছনে টেনে নিল। লোকটা পাশ কাটিয়ে গেল—কিছুই লক্ষ্য না করে—একই ভঙ্গিতে প্রাচীরের দিকে। জ়ানিন স্বামীর দিকে তাকাল। মুখে হতাশার ছাপ।
“এখন ওরা ভাবে ওরা সব করতে পারে,” সে বলল। জ়ানিন চুপ রইল। লোকটার নির্বোধ অহংকার তাকে ঘৃণায় ভরিয়ে দিল। হঠাৎ সে নিজেকে অসুখী মনে করল।
জ়ানিন হোটেলের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। হোটেলের ঘরে ফিরে যাওয়ার কথা ভাবছিল। বরফঠান্ডা ঘরের কথা ভেবে মন সায় দিচ্ছিল না। হঠাৎ মনে এলো—ম্যানেজার বলেছিল, দুর্গের ছাদে উঠুন, মরুভূমি দেখবেন। সে মার্সেলকে জানাল আর চাইল ট্রাঙ্ক হোটেলে রেখে আসতে। কিন্তু মার্সেল ছিল ক্লান্ত। ডিনারের আগে ঘুমিয়ে নিতে চেয়েছিল।
“প্লিজ,” জ়ানিন বলল। মার্সেল হঠাৎ তাকাল। “অবশ্যই, সোনা,” সে বলল। জ়ানিন রাস্তায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করল।
জ়ানিন হোটেলের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। সাদা পোশাকের ভিড় ক্রমশ বাড়ছিল। সেখানে একটিও নারী দেখা যাচ্ছিল না, আর তার মনে হচ্ছিল সে কখনো এত পুরুষ একসঙ্গে দেখেনি। তবু, কেউই তাকাচ্ছিল না তার দিকে। কিছু লোক, যেন তাকে না দেখেই, ধীরে ধীরে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আনছিল তাদের রোগাটে, তামাটে মুখ; অথচ চোখে শূন্যতা। প্রত্যেকটি মুখই যেন বাসের ফরাসি সৈনিকের মুখ বা দস্তানা পরা আরবের মুখ—সব মুখে একই ধূর্ততা, একই অহংকার। প্রত্যেকটি মুখ বিদেশিনীর দিকে ঘুরত, অথচ তাকে দেখত না। তারপর নিঃশব্দে, হালকা পদক্ষেপে তার চারপাশ দিয়ে চলে যেত। জ়ানিন দাঁড়িয়ে ছিল, তার গোড়ালি ধীরে ধীরে ফুলে উঠছিল। অস্বস্তি ক্রমশ বাড়ছিল, পালানোর তাগিদ তীব্র হচ্ছিল।
“কেন এসেছিলাম?” সে ভাবল। কিন্তু তখনই মার্সেল নেমে এল।
তারা যখন দুর্গের সিঁড়ি বেয়ে উঠছিল, তখন বিকেল পাঁচটা। বাতাস পুরোপুরি থেমে গিয়েছিল। আকাশ সম্পূর্ণ উন্মুক্ত, তখন অপরাজিতার মতো নীল। শুষ্ক ঠান্ডা তাদের গালে বিঁধছিল। মাঝসিঁড়িতে, দেয়ালের গায়ে হেলান দিয়ে এক বৃদ্ধ আরব পা ছড়িয়ে বসে ছিল। জিজ্ঞেস করল, গাইড লাগবে কি না। কিন্তু তার ভঙ্গিতে কোনো অপেক্ষা ছিল না—যেন প্রত্যাখ্যান আগেই মেনে নিয়েছে। সিঁড়ি দীর্ঘ ও খাড়া, মাঝে কয়েকটি পেটানো মাটির ছোট সমতল অবতরন। তারা উঠতে থাকল। চারদিক ক্রমশ খুলে যেতে লাগল। তারা প্রবেশ করল আরও বিস্তৃত, শীতল, শুষ্ক আলোয়—যেখানে ওয়েসিসের প্রতিটি শব্দ স্বচ্ছ, পৃথক। আলোকিত বাতাস যেন তাদের চারপাশে ক্রমে দীর্ঘতর এক কম্পনে কাঁপছিল—যেন তাদের পদক্ষেপ আলোর স্ফটিকে একটি তরঙ্গ তুলে দিচ্ছে। ছাদে উঠতেই দৃষ্টি এক আঘাতে খেজুরবাগান পেরিয়ে অসীম দিগন্তে আছড়ে পড়ল। তখন জ়ানিনের মনে হলো—সমগ্র আকাশ একটি উজ্জ্বল, ক্ষণস্থায়ী ধ্বনিতে বেজে উঠেছে; প্রতিধ্বনি ধীরে ধীরে তার মাথার ওপরের শূন্য আকাশ ভরে দিচ্ছে, তারপর থেমে গেছে। সে সীমাহীন বিস্তারের সামনে দাঁড়িয়ে রইল।
পূর্ব থেকে পশ্চিমে তার দৃষ্টি ধীরে ধীরে ভেসে চলছিল—কোথাও একটুও বাধা নেই, নিখুঁত এক বক্ররেখা ধরে। নিচে আরব শহরের নীল-সাদা ছাদগুলো স্তরে স্তরে একে অপরের ওপর উঠে গেছে, রোদে শুকোতে দেওয়া মরিচের গাঢ় লাল দাগে যেন রক্তাক্ত। কাউকে দেখা যাচ্ছিল না। তবু উঠোন থেকে উঠছিল ভাজা কফির গন্ধমাখা ধোঁয়া; ভেসে আসছিল হাসির স্বর, অথবা অস্পষ্ট পদধ্বনি। একটু দূরে, কাদামাটির প্রাচীরে অসম ভাগে বিভক্ত খেজুরবাগান। উপরের পাতাগুলো সশব্দে কাঁপছিল। সেই বাতাসের স্পর্শ ছাদের চাতালে আর টের পাওয়া যাচ্ছিল না। আরও দূরে, দিগন্ত পর্যন্ত প্রসারিত—যেখানে শুরু হয়েছে গেরুয়া আর ধূসর পাথরের রাজ্য, সেখানে জীবনের কোনো চিহ্ন নেই। ওয়েসিস থেকে কিছুটা দূরে, পশ্চিমে, খেজুরবাগানের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ওয়েদ-এর ধারে, দেখা যাচ্ছিল কয়েকটি বড় কালো তাবু (ওয়েদ: মরু অঞ্চলে বৃষ্টির সময় অস্থায়ীভাবে জল বহন করে এমন শুকনো নদীখাত বা খাল।)। চারপাশে উটের পাল, দূর থেকে ক্ষুদ্র, প্রায় নিষ্ঠুরভাবে স্থির—ধূসর মাটির ওপর ছড়িয়ে ছিল অদ্ভুত এক লিপির গাঢ় চিহ্নের মতো; যেন তার সংকেত ভেঙে অর্থ উদ্ধার করাই বাকি। মরুভূমির ওপর নীরবতা ছিল আকাশের বিস্তারের মতোই বিশাল।
ছাদের কার্নিশে পুরো শরীর ঠেসে জ়ানিন নিঃশব্দ দাঁড়িয়ে রইল; সামনে উন্মুক্ত হতে থাকা সেই শূন্যতা থেকে নিজেকে ছিন্ন করে সরিয়ে নিতে পারছিল না। তার পাশে মার্সেল অস্থির হয়ে উঠছিল। তার ঠান্ডা লাগছিল, সে নিচে নামতে চাইছিল। এখানে দেখার কী-ই বা ছিল? তবু সে দিগন্ত থেকে চোখ সরাতে পারছিল না। ওখানে, আরও দক্ষিণে—যেখানে আকাশ আর মাটি এক শুদ্ধ রেখায় এসে মিশেছে—হঠাৎ তার মনে হলো, সেখানে কিছু একটা তার জন্য অপেক্ষায় আছে; এমন কিছু, যাকে সে আজ পর্যন্ত উপেক্ষা করেছে, অথচ যার অভাব কখনোই তার জীবন থেকে সরে যায়নি।
বিকেল যত গড়াতে লাগল, আলো তত আস্তে আস্তে শিথিল হয়ে এল; স্ফটিকের মতো টানটান স্বচ্ছতা ছেড়ে তা হয়ে উঠল তরল। ঠিক সেই সময়েই—যে নারীকে নিছক দৈবই এখানে এনে ফেলেছে—তার হৃদয়ের গভীরে বছরের পর বছর অভ্যাস আর একঘেয়েমি যে গিঁট শক্ত করে বেঁধে রেখেছিল, তা ধীরে ধীরে আলগা হতে লাগল। সে তাকিয়ে রইল যাযাবরদের শিবিরের দিকে। সে সেখানে বসবাস করা পুরুষদের একবারও দেখেনি—কালো তাঁবুগুলোর মাঝখানে কিছুই নড়ছিল না। তবু তার ভাবনা বারবার তাদের কাছেই ফিরে যাচ্ছিল—যাদের অস্তিত্বের কথা আজকের আগে সে প্রায় জানতই না। ঘরবাড়িহীন, পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন—হাতে গোনা কয়েকজন মানুষ এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে সেই বিশাল ভূখণ্ডে, যা তার চোখের সামনে ধীরে ধীরে উন্মোচিত হচ্ছিল; অথচ সেটুকু ছিল আরও বৃহত্তর এক পরিসরের তুচ্ছ অংশ, যার মাথা-ঘোরানো বিস্তার থামত কেবল হাজার হাজার কিলোমিটার দক্ষিণে—সেখানে, যেখানে প্রথম নদী অবশেষে অরণ্যকে উর্বর করে। আদিকাল থেকেই, এই সীমাহীন প্রান্তরের হাড়-ঘষা শুষ্ক মাটির ওপর, হাতে গোনা কয়েকজন মানুষ নিরন্তর হেঁটে চলেছে—যাদের কিছুই নেই, কিন্তু যারা কারও সেবক নয়; এক অদ্ভুত দেশের দীন, অথচ স্বাধীন প্রভু। জ়ানিন জানত না কেন এই ভাবনাটি এমন এক কোমল অথচ সীমাহীন বিষাদে পরিপূর্ণ হয়ে উঠছিল—যার ভারে তার চোখ বুজে আসছিল। সে শুধু জানত, এই দেশ—আদিকাল থেকেই—তার জন্য প্রতিশ্রুত, অথচ কোনোদিনই তা তার হবে না, আর কখনোই না; কেবল এই ক্ষণস্থায়ী মুহূর্তটুকু ছাড়া।
যখন সে আবার চোখ মেলে তাকাল স্থির হয়ে যাওয়া আকাশের দিকে, আর জমাট বাঁধা আলোর ঢেউয়ের দিকে, ঠিক তখনই আরব শহর থেকে ভেসে আসা কণ্ঠস্বর হঠাৎ থেমে গেল। সে অনুভব করল, ঠিক ওই মুহূর্তে যেন বিশ্বের গতি থেমে গেছে, আর এরপর থেকে কেউ আর বৃদ্ধ হবে না, কেউ আর মরবে না। সর্বত্র জীবন স্থগিত—শীতল ও স্থির—কেবল তার হৃদয়ে নয়, সেখানে ঠিক একই সময়ে কেউ কাঁদছে ব্যথা আর বিস্ময়ে।
কিন্তু আলো স্থিরতা হারাতে শুরু করল। সূর্য, স্পষ্ট অথচ উষ্ণতাহীন, পশ্চিমে হেলে পড়ছিল। সেখানে আকাশে হালকা গোলাপি আভা ছড়িয়ে পড়ছিল। একই সময়ে, পূবে এক ধূসর ঢেউ জন্ম নিচ্ছিল, ধীরে ধীরে সেই অসীম বিস্তারের উপর ভেসে আসার জন্য। হঠাৎ দূরে একটি কুকুর চিৎকার করে উঠল। তার আর্তনাদ ঠান্ডা হয়ে আসা বাতাসে ভেসে উঠল। জ়ানিন তখন খেয়াল করল, তার দাঁত কাঁপছে।
“আমরা মরছি,” মার্সেল বলল, “বোকার মতো করছো। চলো, ফিরে যাই।” সে বাম হাত চেপে ধরল। বাধ্য হয়ে সে প্রাচীর থেকে মুখ ফিরিয়ে তাকে অনুসরণ করল। সিঁড়ির সেই বৃদ্ধ আরব, নিশ্চল, তাদের শহরের দিকে নেমে যেতে দেখল।
সে কারও দিকে তাকাতে পারছিল না। আকস্মিক ক্লান্তিতে তার শরীর কুঁকড়ে গিয়েছিল; সে যেন নিজেকেই টেনে নিয়ে চলছিল—এমন এক ভার, যা এখন অসহনীয়। উত্তেজনা তার ভেতর থেকে সরে গেছে। এখন সে অনুভব করছিল, সে যেন অতিরিক্ত বড়, অতিরিক্ত ভারী, অতিরিক্ত বিবর্ণ—এই নতুন পৃথিবীর জন্য।
একটি শিশু, এক তরুণী, এক শীর্ণ মানুষ, আর ছায়ার মধ্যে লুকিয়ে থাকা শেয়াল—এরা-ই কেবল নীরবে এই ভূমিতে হেঁটে যেতে পারে। আর সে? সেখানে তার কী স্থান? সে তো শুধু নিজেকেই টেনে নিয়ে যাবে—ধীরে ধীরে, ঘুমের দিকে, মৃত্যুর দিকে।
কিন্তু সে নিজেকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল রেস্তোরাঁর দিকে, এক স্বামীর সঙ্গে, যে হঠাৎ মৌনী হয়ে গিয়েছিল—শুধু বলেছিল সে কত ক্লান্ত। আর সে—ঠান্ডার সঙ্গে তার লড়াই ছিল দুর্বল; জ্বর ধীরে ধীরে তার শরীর বেয়ে ওপরে উঠছিল। তারপর সে নিজেকে বিছানার দিকে টেনে নিয়ে গেল। মার্সেল এসে তার পাশে শুয়ে পড়ল, কোনো কথা না বলে সঙ্গে সঙ্গে বাতি নিভিয়ে দিল।
ঘরটা ছিল বরফের মতো ঠান্ডা। জ়ানিন টের পাচ্ছিল, ঠান্ডা চুপিসারে গা বেয়ে লতিয়ে উঠে তাকে ধীরে ধীরে গ্রাস করছে আর জ্বরও দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে। সে ঠিকমতো শ্বাস নিতে পারছিল না। রক্তে প্রবাহ ছিল ঠিকই, কিন্তু শরীরকে উষ্ণ করতে পারছিল না। তার অন্তরে এক অজ্ঞাত ভয় জমে উঠছিল।
সে পাশ ফিরল, আর পুরনো লোহার খাট তার ওজনের ভারে ককিয়ে উঠল। না, সে অসুস্থ হতে চাইছিল না। তার স্বামী ইতিমধ্যে ঘুমিয়ে পড়েছিল, তাকেও ঘুমোতে হবে, ঘুমোতেই হবে। শহরের দম হারানো শব্দগুলো ছোট জানালার ফাঁক গলে ভেসে আসছিল। মুরদের ক্যাফেতে পুরোনো ফনোগ্রাফ বাজছিল। ঝিমন্ত ভিড়ের স্তিমিত কোলাহলে চেপে সেই অস্পষ্ট চেনা সুর তার কাছে পৌঁছচ্ছিল। তাকে ঘুমাতেই হবে। কিন্তু তার চোখের পাতা বন্ধ করলেই সে গুনছিল কালো তাঁবুগুলো; স্থির উটগুলো যেন চোখের সামনে ঘাস খাচ্ছিল। তার অন্তরে বিশাল একাকিত্ব ঘূর্ণির মতো পাক খাচ্ছিল। হ্যাঁ, কেন সে এখানে এসেছিল? এই প্রশ্নকে বুকে নিয়েই সে ঘুমিয়ে পড়েছিল।
সে কিছুক্ষণ পরে জেগে উঠল। চারপাশে ছিল এক অসীম নিস্তব্ধতা। কিন্তু শহরের সীমানা থেকে কর্কশ কণ্ঠে কুকুরদের হাহাকার নিঃশব্দ রাত চিরে ভেসে আসছিল। জ়ানিন শিউরে উঠল।
সে কিছুক্ষণ পরে জেগে উঠল। চারপাশে ছিল এক অসীম নিস্তব্ধতা। কিন্তু শহরের সীমানা থেকে কর্কশ কণ্ঠে কুকুরদের হাহাকার নিঃশব্দ রাত চিরে ভেসে আসছিল। জ়ানিন শিউরে উঠল। সে পাশ ফিরল। সে পাশ ফিরল। হাত বাড়াতেই টের পেল স্বামীর শক্ত কাঁধ; আর হঠাৎ, আধো ঘুমের ঘোরে, সেই কাঁধে নিজেকে জড়িয়ে নিল। সে তখনও ঘুমের পৃষ্ঠে ভাসছিল—পুরোপুরি তলিয়ে যায়নি। অচেতন এক আকাঙ্ক্ষায় সে কাঁধটিকে আঁকড়ে ধরল, যেন সেটিই তার একমাত্র নিরাপদ আশ্রয়।
সে কিছু বলছিল, অথচ নিজের কণ্ঠই যেন শুনতে পাচ্ছিল না। শুধু মার্সেলের শরীরের উষ্ণতাটুকুই সে অনুভব করছিল। কুড়ি বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রতিটি রাত এমনই কেটেছে—তার উষ্ণতার ভিতরে, দুজন পাশাপাশি; অসুস্থতায়, ভ্রমণে, কিংবা এমনই অচেনা হোটেলঘরে, যেমনটা এখন…
বাড়িতে একা থাকলে সে-ই বা কী করত? সন্তান নেই—এটাই কি তার অভাব? সে জানত না। সে শুধু মার্সেলের পিছু পিছু চলত, এই ভেবে নিজেকে সান্ত্বনা দিত যে অন্তত কারও তার প্রয়োজন আছে। মার্সেল তাকে অন্য কোনো আনন্দ দেয়নি—শুধু এই অনুভূতিটুকু ছাড়া যে সে প্রয়োজনীয়। হয়তো সে তাকে ভালোবাসত না। ভালোবাসা—এমনকি ঘৃণায় দগ্ধ ভালোবাসাও—এত গম্ভীর, এত নির্বাক মুখ পরে থাকে না। কিন্তু ভালোবাসার মুখ আসলে কেমন? তারা ভালোবাসত অন্ধকারে, না দেখে, স্পর্শে স্পর্শে। দিনের আলোয় উচ্চকণ্ঠ, উন্মুক্ত কোনো ভালোবাসা কি আদৌ আছে? সে জানত না।
তবে সে জানত, মার্সেল তার প্রয়োজন বোধ করত, আর নিজেও সেই প্রয়োজনের প্রয়োজন অনুভব করত—দিনে ও রাতে, বিশেষ করে রাতে, যখন মার্সেল একা থাকতে চাইত না, বার্ধক্য বা মৃত্যু মেনে নিতে চাইত না, সেই জেদি একগুঁয়ে মুখভঙ্গি নিয়েই, যা সে মাঝে মাঝে অন্য পুরুষদের মুখেও চিনে নিতে পারত।
এই মুখভঙ্গিই সেইসব মানুষের স্বাভাবিক চিহ্ন, যারা যুক্তির মুখোশে নিজেদের আড়াল করে রাখে, যতক্ষণ না কোনো উন্মাদনা তাদের গ্রাস করে এবং তাদেরকে মরিয়া করে তোলে—এক নারীর শরীরে আশ্রয় খুঁজতে, যেখানে তারা কামনা নয়, বরং নিঃসঙ্গতা ও রাতের ভীতিকর সত্য থেকে নিজেকে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করে।
মার্সেল সামান্য নড়ল, যেন সে নিজেই তার কাছ থেকে দূরে সরে যেতে চাইছে। না, সে তাকে ভালোবাসত না। সোজা কথা—সে জ়ানিন ছাড়া ভয় পেত সবকিছুকে। তাদের বিচ্ছেদ অনেক সময় ধরেই অযথা স্থগিত ছিল; উচিত ছিল একা একা ঘুমনো। কিন্তু কে সর্বদা একা ঘুমতে পারে? কিছু পুরুষ পারে—যারা পেশা বা দুর্ভাগ্যের কারণে অন্যদের সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, এবং যারা প্রতিরাতে মৃত্যুর সঙ্গে এক বিছানায় শুয়ে থাকে। মার্সেল তা পারবে না, কখনই পারবে না। মূলত সে দুর্বল ও অসহায় শিশু, যাকে প্রতিটা কষ্টই ভীত করত—ঠিক সেই শিশু, যাকে জ়ানিনের প্রয়োজন ছিল। আর ঠিক সেই মুহূর্তে সে কেঁকিয়ে কেঁদে উঠল।
জ়ানিন তার দিকে আরও ঘেঁষে এল; হাত রাখল মার্সেলের বুকে। নিজের মধ্যে, নিজের মনেই, সে তাকে সেই ভালোবাসার নাম ধরে ডাকল, যা একসময় সে তাকে দিয়েছিল। মাঝে মাঝে তারা এখনও তা ব্যবহার করত, কিন্তু আর ভাবতো না যে আসলে কী বলছে।
সে তাকে সমগ্র হৃদয় দিয়ে ডাকল। শেষ পর্যন্ত, জ়ানিনেরও তো তার প্রয়োজন ছিল—মার্সেলের শক্তি, তার ছোটখাটো খামখেয়ালি স্বভাব; আর জ়ানিনও মৃত্যুকে ভয় পেত। “যদি সেই ভয়টাকে কাটিয়ে উঠতে পারতাম, তবে কত সুখীই না হতাম…” ঠিক তখনই এক অনির্বচনীয় অস্থিরতা তাকে গ্রাস করল। সে মার্সেল থেকে একটু সরে এল। না, সে কিছুই কাটিয়ে উঠতে পারছিল না; সে সুখী ছিল না; প্রকৃতপক্ষে, মুক্ত না হয়েই সে মরতে চলেছিল। তার হৃদয় যন্ত্রণায় ভরে উঠল। এক অতি ভারী বোঝার নিচে তার শ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসছিল। হঠাৎ সে বুঝল—এই বোঝা সে গত কুড়ি বছর ধরে বয়ে চলেছিল। আর এখন সেই বোঝার নিচেই সে সমস্ত শক্তি দিয়ে লড়ছিল। সে মুক্ত হতে চেয়েছিল—যদিও মার্সেল, কিংবা অন্য কেউ—কেউই কখনো মুক্ত হতে পারেনি।
জেগে উঠে সে হঠাৎ বিছানায় সোজা হয়ে বসেছিল এবং খুব কাছ থেকে ভেসে আসছে বলে মনে হওয়া এক ডাকে কান পেতে ছিল। কিন্তু রাতের দূরতম প্রান্তদেশ থেকে ভেসে এসেছিল শুধু তোয়াসিসের কুকুরগুলোর ক্লান্ত অথচ অবসানহীন আর্তস্বর। মৃদু এক বাতাস উঠেছিল; খেজুরবনের ভিতর দিয়ে জলধারার মতো নরম বয়ে যাওয়ার শব্দ সে শুনতে পাচ্ছিল। বাতাস দক্ষিণ দিক থেকে আসছিল—সেই দিক থেকে, যেখানে স্থির আকাশের নিচে মরুভূমি আর রাত একাকার হয়ে ছিল; যেখানে জীবন থেমে ছিল, যেখানে কেউ বৃদ্ধ হত না, কেউ মরত না।
তারপর জলধারার মতো বয়ে চলা সেই ধ্বনি হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। সে আর নিশ্চিত হতে পারেনি—আদৌ কিছু শুনেছিল কি না—শুধু এক নীরব আহ্বান, যাকে সে চাইলে দমন করতে পারত, চাইলে গ্রহণ করতে পারত। কিন্তু সেই মুহূর্তেই সাড়া না দিলে আহ্বানের অর্থ তার কাছে চিরতরে অজানাই থেকে যেত। অন্তত এইটুকু সে নির্মমভাবে নিশ্চিত ছিল।
সে আস্তে করে উঠে বিছানার পাশে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, স্বামীর শ্বাসের ওঠানামা গুনতে গুনতে। মার্সেল ঘুমোচ্ছিল। পরের মুহূর্তেই বিছানার উষ্ণতা তার দেহ থেকে সরে গেল; শীত এক ঝটকায় তাকে জড়িয়ে ধরল। সামনের জানালার খড়খড়ির ফাঁক গলে রাস্তার বাতির ক্ষীণ আলো ঘরে ঢুকছিল। সেই আধো আলোয় হাতড়ে হাতড়ে নিজের কাপড় খুঁজে নিয়ে সে নিঃশব্দে পোশাক পরল।
জুতো হাতে নিয়ে সে দরজার দিকে এগোল। অন্ধকারে সে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল, তারপর আস্তে করে দরজার হাতলে হাত রাখল। কিঁচ করে উঠতেই তার শরীর মুহূর্তে শক্ত হয়ে গেল। তার বুকের ভেতর হৃদপিণ্ড ধকধক করছিল তীব্র উত্তেজনায়। সে কান পেতে রইল, নীরবতায় আশ্বস্ত হয়ে হাতটা আরও একটু ঘুরিয়ে দিল। তারপর গালটা দরজার কাঠে ঠেসে অপেক্ষা করতে লাগল। কিছুক্ষণ পর দূর থেকে মার্সেলের শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ তার কানে এল।
দরজার বাইরে পা দিতেই রাতের বরফশীতল বাতাস তার মুখে এসে আছড়ে পড়ল। সে বারান্দা বরাবর দৌড়ে গেল। হোটেলের প্রধান দরজাটি বন্ধ ছিল। ছিটকিনি খুলতে গিয়েই সে টের পেল—সিঁড়ির ওপরের ধাপে রাতের প্রহরী দাঁড়িয়ে আছে; মুখে ঘুমের ঘোর, আরবি ভাষায় সে তাকে কিছু বলল।
“আমি ফিরে আসছি,” জ়ানিন বলল, আর সে রাতের অন্ধকারে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
কালো আকাশ থেকে তারার মালা খেজুরগাছ আর ঘরবাড়ির মাথার ওপর নেমে এসেছে। সে ছোট্ট সেই পথ ধরে দৌড়ে চলছিল—যে পথ দুর্গের দিকে ওঠে, এখন একেবারে জনশূন্য। সূর্যের কোনো প্রতিরোধ ছিল না; শীত পুরো রাতটাকে দখল করে রেখেছিল। বরফশীতল বাতাস তার ফুসফুসে আগুন ধরাচ্ছিল।
তবুও সে দৌড়াতেই থাকল—প্রায় অন্ধকারে অন্ধ হয়ে। হঠাৎ পথের চূড়ায় কয়েকটি আলো ফুটে উঠল, তারপর আঁকাবাঁকা ভঙ্গিতে তার দিকে নেমে আসতে লাগল। সে থেমে পড়ল। পোকার ডানা কাঁপার মতো এক শুষ্ক খসখস শব্দ কানে এল; বড়ো হতে থাকা আলোগুলোর আড়াল থেকে অবশেষে ভেসে উঠল বিশাল বিশাল বুরনুস—যাদের নিচে সাইকেলের সরু তারওয়ালা চাকাগুলো ঝিকমিক করছিল। বুরনুসগুলো তার গা ঘেঁষে বয়ে গেল; পেছনের অন্ধকারে তিনটি লাল আলো হঠাৎ জ্বলে উঠল, আর মুহূর্তেই নিভে মিলিয়ে গেল।
সে আবার দুর্গের দিকে দৌড়ানো শুরু করল। সিঁড়ির মাঝামাঝি পৌঁছে ফুসফুসে ঠান্ডা বাতাসের দাহ এত তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল যে থেমে যেতে ইচ্ছে করছিল। কিন্তু শেষ এক ঝোঁক তাকে নিজের অজান্তেই ছুড়ে দিল ছাদের ওপর, সেই প্রাচীরঘেরা কার্নিশের গায়ে—যা তার পেট চেপে ধরেছিল। সে হাঁপাচ্ছিল; চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে উঠছিল।
দৌড় তাকে উষ্ণ করতে পারেনি; তার সারা শরীর তখনও কাঁপছিল। কিন্তু যে বরফশীতল বাতাস সে খণ্ড খণ্ড শ্বাসে টেনে নিচ্ছিল, তা ক্রমে তার ভেতর নিয়মিত স্রোতের মতো বইতে শুরু করল; কাঁপুনির গভীরে অল্প অল্প করে এক ক্ষীণ উষ্ণতা জেগে উঠল। অবশেষে তার দৃষ্টি খুলে গেল রাতের বিস্তীর্ণতার দিকে।
আর তখন একটুও বাতাস ছিল না, কোনো শব্দও ছিল না—মাঝে মাঝে শুধু ঠান্ডায় পাথর বালিতে চূর্ণ হয়ে ওঠার নরম কটকট শব্দ ছাড়া। আর কিছুই সেই নিঃসঙ্গতা ও নীরবতাকে ভাঙতে পারছিল না, যা জ়ানিনকে চারদিক থেকে আবৃত করে ছিল।
কিছুক্ষণ পর হঠাৎ তার মনে হল, তার ওপরে আকাশ যেন এক ভারী, নিঃশব্দ ঘূর্ণিতে ধীরে ধীরে আবর্তিত হচ্ছে। শুষ্ক, শীতল রাতের গভীরে নিরবচ্ছিন্নভাবে হাজার হাজার তারা জন্ম নিচ্ছিল; আর জন্মমাত্রই তাদের দীপ্ত বরফকণাগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে অচেতন স্রোতের মতো দিগন্তের দিকে গড়িয়ে যাচ্ছিল।
দিগন্তের দিকে ভেসে চলা সেই আলোকাগ্নিগুলোর মগ্নতা থেকে জ়ানিন নিজেকে আর ছিন্ন করতে পারছিল না। সে যেন তাদের সঙ্গেই আবর্তিত হচ্ছিল; আর সেই স্থির অথচ অবিরাম গতি ক্রমে তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল তার গভীরতম সত্তার কাছে—যেখানে শীত আর আকুল আকাঙ্ক্ষা মুখোমুখি সংঘর্ষে লিপ্ত ছিল।
তার চোখের সামনে তারাগুলো একে একে খসে পড়ছিল, পাথুরে মরুভূমির অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছিল; আর প্রতিটি পতনের সঙ্গে জ়ানিন নিজেকে আরও গভীরভাবে রাতের কাছে সমর্পণ করছিল। সে গভীর শ্বাস নিচ্ছিল, ভুলে যাচ্ছিল শীত, মানুষের অস্তিত্বের ভার, উন্মাদ ছুটে চলা কিংবা জমাট বেঁধে থাকা জীবনের চাপ, আর বেঁচে থাকা ও মৃত্যুর দীর্ঘস্থায়ী উৎকণ্ঠা।
এত বছর ধরে ভয়ের হাত থেকে পালাতে পালাতে, দিশাহীন ছুটে চলার পর—অবশেষে সে থেমে গেল। একই সঙ্গে মনে হলো, সে যেন নিজের শিকড়কে আবার খুঁজে পেয়েছে; শরীরে রস সঞ্চারিত হতে শুরু করল—যে শরীর আর কাঁপছিল না। নিজের সমস্ত উদর প্রাচীরের ধারে চেপে ধরে, চলমান আকাশের দিকে টানটান হয়ে, সে শুধু অপেক্ষা করল—তার আলোড়িত হৃদয়টাও যেন শান্ত হয়, তার ভেতরে যেন নীরবতা নেমে আসে।
নক্ষত্রমণ্ডলীর শেষ তারাগুলো তাদের গুচ্ছগুলোকে মরুভূমির দিগন্তের ওপর আরেকটু নিচে নামিয়ে নিল, তারপর স্থির হয়ে রইল। তখন, অসহ্য কোমল এক স্রোতে, রাতের জল জ়ানিনের ভেতরে প্রবেশ করল। তা শীতকে নিমজ্জিত করল, তার অস্তিত্বের অন্ধকার কেন্দ্র থেকে ধীরে ধীরে উঠতে লাগল—অবিরাম প্লাবনের মতো, তার গোঙানিতে ভরা মুখ অবধি উপচে পড়ল। ঠিক পরের মুহূর্তে, ঠান্ডা মাটিতে উপুড় হয়ে পড়া তার শরীরের ওপর সমগ্র আকাশ যেন ছড়িয়ে পড়ল।
কিন্তু জ়ানিন শুয়ে পড়তেই মার্সেল গোঁ গোঁ করে উঠল, এবং কয়েক সেকেন্ড পরে হঠাৎ সোজা হয়ে বসল। সে কিছু বলল, কিন্তু জ়ানিন তার কথার অর্থ বুঝতে পারল না। সে উঠে দাঁড়াল, আলো জ্বালল—আর সেই আলো জ়ানিনের মুখে সরাসরি চড়ের মতো এসে লাগল। সে ডগমগ করে সিঙ্কের দিকে এগলো এবং খনিজ জলের বোতল থেকে দীর্ঘক্ষণ জল পান করল।
মার্সেল চাদরের নিচে ঢুকতে যাচ্ছিল; তখন সে হাঁটু গেড়ে বিছানার ওপর বসে জ়ানিনের দিকে তাকাল—কিছুই বুঝতে পারলো না।
জ়ানিন অঝোর ধারায় কেঁদে যাচ্ছিল, নিজেকে সামলাতে পারছিল না।
“কিছুই না, সোনা,” জ়ানিন নরম স্বরে বলল, “কিছুই না।”