মূক (Les muets)

লিখেছেন:আলবেয়ার কামু, বঙ্গানুবাদ- সুরজিৎ ব্যানার্জী
যদি তারা আবার তরুণ হত... সমুদ্রের ওপারে অনেক দূরে চলে যেত...

 

জমাট শীত, তবু ইতিমধ্যেই জেগে ওঠা শহরের ওপর সূর্য উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। জেটির শেষে সমুদ্র আর আকাশ এক ঝলমলে আলোয় মিশে গিয়েছিল। কিন্তু ইভার্স তা দেখেনি। বন্দরের ধারের উঁচু প্রশস্ত রাস্তা ধরে সে ধীরে সাইকেল চালাচ্ছিল। প্যাডেলের এক পাশে তার পঙ্গু পা টানটান স্থির; অন্য পা রাতের আর্দ্রতায় ভেজা পিচ্ছিল পথকে ঠেলে এগোচ্ছিল। মাথা না তুলে, ঝুঁকে বসা ক্ষীণদেহ মানুষটি ধীরে এগোচ্ছিল।

সে পুরনো ট্রামলাইনের রেল এড়িয়ে যেত, হঠাৎ হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে গাড়িগুলোকে যেতে দিত, আর মাঝেমধ্যে কনুই দিয়ে ঠেলে কাঁধের ব্যাগটা ঠিক জায়গায় বসিয়ে নিত—ফার্নান্দে তাতেই দুপুরের খাবার রেখে দিত। এমন সময় ব্যাগের ভেতরের জিনিসের কথা মনে পড়লে তার ভেতর তিক্ততা জমত। দুটো মোটা রুটির মাঝখানে—স্প্যানিশ ওমলেট নয়, তেলে ভাজা গরুর মাংসও নয়—শুধু এক টুকরো সাদা পনির।

কর্মশালা যাওয়ার পথ তার কখনও এত দীর্ঘ মনে হয়নি। সত্যি বলতে কী, তার বয়স বাড়ছিল। চল্লিশে পৌঁছেও সে লতানো গাছের কচি ডালের মতোই ছিপছিপে ছিল; কিন্তু পেশি আর আগের মতো তাড়াতাড়ি সাড়া দিত না। মাঝে মাঝে খেলাধুলোর খবর পড়তে গিয়ে ত্রিশ বছরের কোনো খেলোয়াড়কে “প্রবীণ” বলা দেখলে সে কাঁধ ঝাঁকাত। “সে যদি প্রবীণ হয়,” সে ফার্নান্দেকে বলত, “তাহলে তো আমি প্রায় হুইলচেয়ারে বসে আছি।” তবু সে জানত, রিপোর্টার পুরো ভুল নয়। ত্রিশ পেরোলে অজান্তেই শক্তি ক্ষয় হতে শুরু করে। চল্লিশে সে এখনও হুইলচেয়ারে নেই, কিন্তু সেদিকেই এগোচ্ছে। এটাই কি সেই কারণ নয় যে এখন শহরের অপর প্রান্তে পিপে-কারিগরের কর্মশালায় যেতে যেতে সে সমুদ্রের দিকে চোখ তোলে না?

বিশ বছর বয়সে সে কখনও সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে ক্লান্ত হত না; বরং মনে ভেসে উঠত সৈকতে কাটানো এক আনন্দভরা সপ্তাহান্তের প্রতীক্ষা। পঙ্গুত্ব সত্ত্বেও—বা হয়তো সেই কারণেই—সাঁতার সে খুব ভালোবাসত। তারপর বছর ঘুরল। জীবনে এল ফার্নান্দে, জন্ম হল ছেলের। সংসার চালাতে ওভারটাইম  করতে হল—শনিবারে কর্মশালায়, আর রবিবারে খুচরো কাজ করে কিছু বাড়তি আয়। যে দুরন্ত সপ্তাহান্তের দিনগুলো তাকে তৃপ্ত করত, ধীরে ধীরে সেই অভ্যাস মিলিয়ে গেল। গভীর স্বচ্ছ জল, উষ্ণ রোদ, মেয়েরা, শরীরী উল্লাস—এ দেশে সুখ বলতে আর কীইবা ছিল! আর সেই সুখ তারুণ্যের সঙ্গেই শেষ হয়ে গেল।

ইভার্স এখনও সমুদ্র ভালোবাসত, তবে দিনের শেষে—যখন উপসাগরের জল একটু গাঢ় হয়ে আসত। কাজের পর বাড়ির সামনের রোয়াকে বসে থাকা সময়টা ছিল সুখের; ফার্নান্দের ইস্ত্রি করে দেওয়া পরিষ্কার শার্ট, আর বরফে জমাট এক গ্লাস এনিসেটের জন্য সে কৃতজ্ঞ বোধ করত। সন্ধ্যা নামত, আকাশ নরম হয়ে আসত, ইভার্সের সঙ্গে কথা বলতে থাকা প্রতিবেশীদের গলা হঠাৎ নিচু হয়ে যেত। সেই সময়গুলোতে সে বুঝতে পারত না—সে সুখী, না কি তার কাঁদতে ইচ্ছে করছে। তবে অন্তত সে শান্তি আর সামঞ্জস্য অনুভব করত—শুধু  কর্তব্যহীন নীরব অপেক্ষা, যদিও ঠিক কীসের জন্য, তা সে জানত না।

কিন্তু সকালে কাজে বেরোনোর সময় সে সমুদ্রের দিকে তাকাতে চাইত না। সমুদ্র তো প্রতিদিনের মতো সেখানেই ছিল—তাকে স্বাগত জানাতে। তবু সন্ধ্যা না নামা পর্যন্ত সে তার দিকে চোখ তুলত না—তুলতে চাইত না।

আজ সকালে সাইকেল চালাতে চালাতে তার মাথা অন্য দিনের চেয়ে আরও বেশি নুইয়ে ছিল; হৃদয়ও ছিল ভারী। আগের রাতে সভা থেকে ফিরে সে যখন জানাল যে তারা কাজে ফিরছে, ফার্নান্দে হেসে বলেছিল, “তাহলে মালিক তোমাদের মজুরি বাড়াচ্ছে?” মজুরি বাড়েনি। ধর্মঘট ব্যর্থ।

সত্যি বলতে, ব্যাপারটা তারা ভালোভাবে সামলাতে পারেনি। তড়িঘড়ি করে কাজ বন্ধ করা হয়েছিল, আর ইউনিয়নের অর্ধেক মন নিয়ে সমর্থন দেওয়াটাই হয়তো ঠিক ছিল। পনেরো জন কারিগর—সে সংখ্যা এমন কী! উপরন্তু অন্য পিপে-কারখানাগুলোও ধর্মঘটে যোগ দেয়নি। ইউনিয়নকে সত্যিই দোষ দেওয়া যায় না। ট্যাঙ্কার আর ট্যাঙ্কার-ট্রাকের নির্মাণই পিপে-শিল্পকে চাপে ফেলেছিল; তার আর কোনো বিকাশ ছিল না। ক্রমেই কমে আসছিল ছোট পিপে আর বড় কাঠের পাত্র তৈরির কাজ; কাজ বলতে মূলত ছিল আগে বানানো সেই বিশাল পাত্রগুলোর মেরামত। সত্যি বলতে কী, মালিকরাও দেখছিল তাদের ব্যবসা বিপন্ন হয়েছে; তবু লাভের একটি মার্জিন ধরে রাখতেই চেয়েছিল। জীবনযাত্রার খরচ বাড়ছিল, তবু মজুরি আটকে রাখাই তাদের কাছে সবচেয়ে সহজ উপায় বলে মনে হয়েছিল। পিপে-শিল্প যখন হারিয়েই যাচ্ছিল, তখন কারিগররা করবেই বা কী? যে পেশা শিখতে এত কষ্ট স্বীকার করেছ, তা তুমি বদলাও না; আর এই পেশা ছিল কঠিন— দীর্ঘ শিক্ষানবিশির শৃঙ্খল মেনে নিতে হত।

ভালো পিপে-কারিগর তখন বিরল ছিল, যে বাঁকানো তক্তাগুলো আগুনের তাপে লোহার বৃত্তে এমন আঁট করে বসাতে পারত যে প্রায় বাতাসও ঢুকত না, আর যার কাজে রাফিয়া বা শণ-আঁশের কোনো ভরাটের দরকার হতো না। ইভার্স জানত এবং এ নিয়ে তার গর্ব ছিল।

পেশা বদলানো তেমন বড় কথা ছিল না। কিন্তু যা সে শিখেছিল, নিজের সেই কারিগরি দক্ষতা ছেড়ে দেওয়া সহজ ছিল না। দক্ষতা আছে, অথচ কাজ নেই—শেষ পর্যন্ত নিজেকে মানিয়ে নিতেই হয়। কিন্তু সেই মানিয়ে নেওয়াও সহজ ছিল না।। মুখ বন্ধ রাখা, সত্যিকার অর্থে কিছু আলোচনা করতে না পারা—এটাই ছিল কঠিনতম। প্রতিদিন সকালে জমতে থাকা ক্লান্তি নিয়ে একই পথ ধরে কাজে যাওয়া, আর সপ্তাহের শেষে হাতে পাওয়া কেবল যতটুকু তারা দিতে চাইত—ক্রমশ অপ্রতুল হয়ে ওঠা সেই মজুরি—এই ছিল বাস্তবতা।

ফলত তারা রেগে উঠেছিল। প্রথমে দু-একজন ইতস্তত করেছিল,  কিন্তু মালিকের সঙ্গে প্রথম কথাবার্তার পর রাগ তাদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছিল। মালিক সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন—নেবে তো নাও, না হলে ছেড়ে দাও। এভাবে কথা বলা যায় নাকি? “ও আমাদের কাছে কী আশা করছে?” এস্পোসিতো বলেছিল। “আমরা ঝুঁকে দাঁড়িয়ে থাকব, যাতে ও পাছায় লাথি মারতে পারে?”

সত্যি বলতে, মালিকটিকে খারাপ বলা যেত না। কর্মশালাটি তিনি বাবার কাছ থেকে পেয়েছিলেন; এখানেই বড় হয়েছেন।। প্রায় সব কারিগরকে বহু বছর ধরে চিনতেন। কখনও কখনও কর্মশালায় সবাইকে নিয়ে হালকা জলখাবারের আয়োজন করতেন। কাঠের ফালি জ্বালিয়ে সেখানে স্যারডিন বা সসেজ মাংস রান্না হতো, সঙ্গে মদ থাকায় মুহূর্তটা আরও আনন্দময় হয়ে উঠত। নববর্ষে প্রত্যেক কারিগরকে তিনি উপহার দিতেন পাঁচ বোতল পুরনো মদ। কেউ অসুস্থ হলে, অথবা বিয়ে বা ফার্স্ট কমিউনিয়নের মতো অনুষ্ঠানে, প্রায়শই অর্থ উপহার দিতেন। মেয়ের জন্মের সময় সবাইকে তিনি চিনির প্রলেপ মাখানো কাঠবাদাম দিয়ে শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন। এমনকি দু-একবার ইভার্সকেও তাঁর সমুদ্র তীরবর্তী জমিদারিতে শিকারে ডেকেছিলেন।

কারিগরদের দক্ষতাকে তিনি সম্মান করতেন—এ নিয়ে সন্দেহ ছিল না। প্রায়ই বলতেন, তাঁর বাবাও শিক্ষানবিশ হিসেবেই কাজ শুরু করেছিলেন।, এবং প্রায়শই বলতেন যে তাঁর বাবাও একজন শিক্ষানবিশ হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। কিন্তু তিনি কখনও কারিগরদের বাড়ি যাননি; তাদের জীবনযাপনের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন না। তিনি মূলত নিজের কথাই ভাবতেন; নিজের গণ্ডির বাইরে তেমন কিছু দেখতেন না—আর এখন সবকিছু ঠিক এমনভাবে দাঁড়িয়েছিল—নেবে তো নাও, না হলে ছেড়ে দাও। এক কথায় তিনি অনড় ছিলেন। নিজের অবস্থান ও ক্ষমতার জোরে তিনি অনড় থাকতে পারতেন। তাঁর অনড়তার সামনে ইউনিয়নের আর কিছুই করার ছিল না। ফলে গেটে তালা পড়ল। “এখানে অবস্থান করার ঝামেলায় যেও না। কারখানা বন্ধ থাকলে বরং আমারই টাকা বাঁচবে," মালিক বলেছিলেন।

কথাটা মিথ্যে ছিল; কিন্তু পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে গেল—কারণ মালিক সরাসরি তাদের বলেছিলেন যে কাজ দিয়ে যেন তিনি তাদের ওপর দয়া করেছেন।। এস্পোসিটো রাগে ক্ষিপ্ত হয়ে বলেছিল, “আপনি  কাপুরুষ।” মালিকও রগচটা ছিলেন; মুহূর্তেই পরিস্থিতি হাতাহাতিতে গড়িয়েছিল; দুজনকে আলাদা করতে হয়েছিল। তবু ঘটনার ছাপ কারিগরদের মনে থেকে গিয়েছিল।

বিশ দিন ধরে ধর্মঘট চলল। স্ত্রীরা বাড়িতে মুখ গোমড়া করে বসে রইল, দু-তিনজনের উৎসাহ ততদিনে একেবারে তলানিতে ঠেকেছিল। শেষ পর্যন্ত ইউনিয়ন পরামর্শ দিল—ধর্মঘট তুলে নিলে তারা মধ্যস্থতা করবে, আর ওভারটাইমের মাধ্যমে হারানো দিনের মজুরি পুষিয়ে নেওয়া যাবে। তাই কারিগররা কাজে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।  অবশ্য গম্ভীর মুখে—ধরে নিয়ে যে সব কিছু এখনও চূড়ান্ত হয়নি, মালিককে আবার ভাবতে হবে—এভাবেই কর্মস্থলে ফিরল।

কিন্তু আজ সকালে, পরাজয়ের দাগ লেগে থাকা ক্লান্তি আর মাংসের বদলে চিজ—সেই দাপুটে ভঙ্গি ধরে রাখা আর সম্ভব হচ্ছিল না। সূর্য যতই ঝলমল করুক, সমুদ্র আর কোনো প্রতিশ্রুতি দিচ্ছিল না। ইভার্স একক প্যাডেলে চাপ দিল; চাকার প্রতিটি আবর্তনের সঙ্গে তার মনে হচ্ছিল, বয়সও যেন একটু করে বেড়ে যাচ্ছে। কর্মশালা, সহকর্মী কিংবা মালিক—যাদের সঙ্গে অচিরেই দেখা হবে—তাদের কথা ভাবতেও পারল না; তার হৃদয় নিঃশব্দে আরও একটু ভারী হয়ে উঠল।

ফার্নান্দে উদ্বিগ্ন স্বরে জিজ্ঞেস করেছিল, "তোমরা এখন মালিককে কী বলবে?"

"কিছুই না।"

দাঁতে দাঁত চেপে, সাইকেলের সিটে পা ছড়িয়ে বসে ইভার্স মাথা নাড়ল। তার ছোট, কালো, কুঁচকানো মুখটি আরও শক্ত হয়ে উঠল।

“আমরা সবাই কাজে ফিরে যাচ্ছি। ব্যস।”

এখনও দাঁত চেপে, মুখে বিষণ্ণতা আর চাপা রাগ নিয়ে সে সাইকেল চালাচ্ছিল—আকাশও যেন সেই রাগের ছায়ায় ঢেকে গিয়েছিল।

সে বন্দরের প্রশস্ত রাস্তা ছেড়ে স্পেনীয় বস্তির স্যাঁতসেঁতে গলিতে ঢুকে পড়ল। গলি ধরে এগোতে এগোতে দেখা যেত এখানে-ওখানে ছড়ানো পুরনো লোহালক্কড়, গাড়ি মেরামতের গ্যারাজ, আর ছোট ছোট কারখানার শেড—এই অঞ্চলেই ছিল তাদের কর্মশালা। নিচু চালের শেডটির সামনের দেওয়ালের অর্ধেকটা পাথরের, তার ওপরের অংশ কাচে ঘেরা, যা উঠে গেছে ঢেউতোলা ধাতব ছাদ পর্যন্ত।

কর্মশালাটি মুখ করে ছিল পুরনো পিপে-কারখানার এক প্রাঙ্গণের দিকে—চারদিকে ছাউনিযুক্ত শেডে ঘেরা একটি চত্বর। ব্যবসা বড় হয়ে গেলে জায়গাটি পরিত্যক্ত হয়; এখন সেখানে পড়ে আছে নষ্ট যন্ত্রপাতি আর ভাঙা পুরনো পিপে। প্রাঙ্গণের ঠিক পরেই, বিবর্ণ টাইলসে মোড়া এক সরু পথ তাকে আলাদা করে রেখেছে; তার ওপারেই শুরু মালিকের বাগান। বাগানের একেবারে শেষে দাঁড়িয়ে তাঁর বাড়ি—বড়, কিন্তু কদাকার। তবু বাইরের সিঁড়ি জড়িয়ে থাকা হানিসাকলের এলোমেলো লতায় তাকে অদ্ভুতভাবে আকর্ষণীয় লাগে।

ইভার্স পৌঁছে দেখল কর্মশালার দরজা বন্ধ; সামনে নীরবে দাঁড়িয়ে কয়েকজন কারিগর। কাজ শুরু করার পর এই প্রথম সে এসে দরজা বন্ধ পেল। মালিক বুঝিয়ে দিতে চেয়েছিলেন—দড়ির টানাটানিতে জোর কার হাতে। ইভার্স বাঁদিকে ঘুরে বেরিয়ে আসা শেডের নিচে সাইকেলটা রেখে দরজার দিকে এগোল। দূর থেকেই চিনতে পারল এস্পোসিতোকে—লম্বা, শ্যামলা, লোমশ দেহ; তার পাশেই কাজ করে; মার্কু—ইউনিয়নের প্রতিনিধি, টেনর গায়কের মতো তীক্ষ্ণ মুখরেখা; সাদ—কর্মশালার একমাত্র আরব। আর বাকিরা, নীরবে তার এগিয়ে আসা দেখছিল। কিন্তু সে তাদের সঙ্গে গিয়ে দাঁড়ানোর আগেই হঠাৎ সবার দৃষ্টি ঘুরে গেল দরজার দিকে—ঠিক তখনই সেটা খুলতে শুরু করেছে। দরজার ফাঁকে দেখা দিল ফোরম্যান ব্যালেস্টার। সে ভারী দরজাগুলোর একটি খুলে, কারিগরদের দিকে পিঠ ফিরিয়েই, লোহার রেলের ওপর দরজাটা ধীরে ধীরে ঠেলে সরাতে লাগল।

ব্যালেস্টার সবার মধ্যে সবচেয়ে পুরনো ছিল। সে ধর্মঘটের বিরোধী ছিল, কিন্তু এস্পোসিটো সোজাসুজি বলেছিল যে সে মালিকের স্বার্থ রক্ষা করছে—তারপর থেকেই সে চুপ করে গিয়েছিল। সে তখন দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল—গাঢ় নীল শ্রমিক-পোশাক গায়ে; চওড়া অথচ খাটো দেহ। ইতিমধ্যেই খালি পায়ে—সাদ ছাড়া একমাত্র সে-ই খালি পায়ে কাজ করত—সে একে একে কারিগরদের ভেতরে ঢুকতে দেখছিল। রোদেপোড়া তামাটে মুখে তার চোখদুটি প্রায় বর্ণহীন; ঘন ঝুলে পড়া গোঁফের নিচে ঠোঁট সামান্য ঝুলে ছিল।

সবাই মূক—পরাজিতের মতো ফিরে এসে নিজেদের নীরবতার প্রতিই ক্ষুব্ধ। কিন্তু সেই নীরবতা যত দীর্ঘ হচ্ছিল, তা ভাঙার শক্তি ততই ক্ষয়ে যাচ্ছিল তাদের ভেতরে। ব্যালেস্টারের দিকে না তাকিয়েই তারা ভেতরে ঢুকল। তারা জানত, এভাবে ভেতরে ঢোকানোটা আদেশ পালন করেই সে করছিল। তার তিক্ত ও নত মুখভঙ্গিই বলে দিচ্ছিল সে কী ভাবছে। একমাত্র ইভার্স তাকিয়েছিল ব্যালেস্টারের দিকে। ব্যালেস্টার তাকে বিশেষ পছন্দ করত; নীরবে মাথা নেড়েছিল। তখন তারা প্রবেশদ্বারের ডানদিকে ছোট্ট লকার-ঘরে ছিল। অরঙিন তক্তা দিয়ে বানানো খোলা খুপরি, দু’পাশে ছোট তালাবদ্ধ আলমারি। একেবারে শেষ খুপরিটি, চালার দেওয়াল ঘেঁষে, বদলে গিয়েছিল স্নানের জায়গায়—মাটির মেঝে কেটে নর্দমার মতো নালা বের করা।

কর্মশালার মাঝখানে বিভিন্ন পর্যায়ের কাজ ছড়িয়ে আছে—কোথাও সম্পূর্ণ তৈরি বিশাল পিপে, কোথাও অর্ধসমাপ্ত কাঠামো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে। কিছু পেল্লায় পিপে ঢিলে হুপে বাঁধা—আগুনের দহনে শক্ত করে আঁটানো হবে বলে নীরবে অপেক্ষায়। অন্যদিকে মোটা, ভারী, শক্ত-পোক্ত কয়েকটি বেঞ্চ; গায়ে লম্বা খাঁজ কাটা। একটিতে পিপের তলদেশের গোল চাকতি আটকানো—রেঁদার ঘষা আর শিরিষ-কাগজের মিহি ঘর্ষণে রুক্ষতা ঝরে যাওয়ার অপেক্ষায় নিঃশব্দে পড়ে আছে। পাশে নিভে থাকা চুল্লি—ঠান্ডা, কালচে। প্রবেশদ্বার পেরিয়ে বাঁ দিকের দেয়াল ঘেঁষে সারি সারি কারিগরি টেবিল। সামনে পিপের পাতের স্তূপ—রেঁদার ধার পেতে থম মেরে আছে। ডান পাশে, দেয়াল থেকে সামান্য ফাঁক রেখে, পাশাপাশি দাঁড়িয়ে দুটি বড়, শক্তিশালী বৈদ্যুতিক করাত—ভালো করে তেল দেওয়া, নীরব, স্থির—আলোয় মৃদু ঝলমল করছে, যেন সামান্য স্পর্শেই জেগে উঠবে।

কিছুদিন ধরেই কর্মশালাটি সেখানে কাজ করা অল্প কজন মানুষের তুলনায় অযথাই বড় হয়ে গিয়েছিল। গরমকালে সুবিধা; শীতে দুর্ভোগ। কিন্তু সেদিন এই বিস্তৃত ফাঁকা জায়গায় অর্ধসমাপ্ত কাজ ছড়িয়ে ছিল, কোণায় কোণায় ফেলে রাখা পিপে—নিচের দিকটা আংটায় কষা, আর উপরের দিকের পাতগুলো মোটা, খসখসে কাঠের ফুলের মতো ছড়িয়ে ছিল—বেঞ্চ, টুলবক্স, যন্ত্রের গায়ে জমে থাকা করাতের গুঁড়ো—সব মিলিয়ে কর্মশালাটিকে পরিত্যক্ত মনে হচ্ছিল। তারা চারদিকে তাকিয়েছিল—পুরনো জাম্পার, বিবর্ণ আর তাপ্পি মারা প্যান্টে। কয়েক মুহূর্তের জন্য থমকে ছিল সবাই। ব্যালেস্টার তাদের দেখছিল। “তাহলে,” সে বলেছিল, “লেগে পড়ি?” একজন একজন করে তারা নিজেদের জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়েছিল, একটিও শব্দ না বলে।

ব্যালেস্টার একে একে সবার কাছে গিয়ে সংক্ষেপে মনে করিয়ে দিল কোন কাজ শুরু করতে হবে, কোনটা শেষ করতে হবে। কেউ উত্তর দিল না। অল্পক্ষণেই প্রথম হাতুড়ির ধাতব ধ্বনি উঠল—লোহার আগায় লাগানো গোঁজে আঘাত পড়ল, আর সেই আঘাতে পিপের উত্তল দেহ বরাবর একটি আংটা ধীরে ধীরে নেমে বসল। কোথাও রেঁদা গোঁ গোঁ শব্দ তুলল, কাঠের গাঁটে ঠেকে। এস্পোসিতোর স্পর্শে একটি করাত হঠাৎ ঘুরতে শুরু করল, ধারালো দাঁতে আলো কাঁপিয়ে।

সাদ, ডাক পড়লে পিপের পাত এনে দিত, অথবা কাঠের চোকলা জ্বেলে আগুন ধরাত। সেই আগুনে পিপেগুলো বসানো হত—লোহার কষে ধরা আংটার আঁট বেষ্টনে ধীরে ধীরে ফুলে ওঠার জন্য। আর কেউ না ডাকলে সে বেঞ্চের ধারে দাঁড়িয়ে ভারী হাতুড়ির ঘায়ে মরচে ধরা বড় আংটায় রিভেট ঠুকত। অল্পক্ষণের মধ্যেই পোড়া চোকলার গন্ধ কর্মশালার ভেতর ঘন হয়ে উঠল।

এস্পোসিতোর কেটে দেওয়া বাঁকানো কাঠের পাতে ইভার্স রেঁদা চালাচ্ছিল। কাঠ পোড়ার পুরনো, চেনা গন্ধে সে ধীরে ধীরে নিজেকে ফিরে পেল। সবাই নীরবে কাজ করছিল; তবু কর্মশালায় ক্রমে এক উষ্ণতা, এক জীবনের স্পন্দন জেগে উঠতে লাগল। বিস্তৃত জানলাগুলো দিয়ে স্বচ্ছ, তাজা আলো শেডের ভেতর ঢুকে পড়ল। সোনালি রোদে ধোঁয়া নীলচে হয়ে ওপরে উঠছিল। খুব কাছেই একটি পোকার ক্ষীণ গুঞ্জন শুনতে পেল ইভার্স।

ঠিক সেই মুহূর্তে দেয়ালের শেষ প্রান্তের দরজা খুলে গেল, আর মালিক লাসাল দোরগোড়ায় থেমে দাঁড়ালেন—রোগাটে গড়ন, গায়ের রঙ গাঢ়, সবে ত্রিশের কোঠা পেরোনো। কাঁধে ঢিলেঢালাভাবে ঝুলছিল সাদা কর্মশালার পোশাক; তার নিচে বাদামি গ্যাবার্ডিন স্যুটের আভাস। তার ভঙ্গিতে ছিল এক ধরনের সহজ, সাবলীল আত্মবিশ্বাস। অস্থিসার মুখ, যেন তীক্ষ্ণ ছুরি দিয়ে চেঁছে নেওয়া; তবু সাধারণত মানুষ তাকে পছন্দ করত—যেমন প্রাণশক্তি ছড়িয়ে দিতে পারে এমন অধিকাংশ মানুষকেই করা হয়।

তবু দরজার দিক থেকে ভেতরে এগোতে গিয়ে তিনি যেন সামান্য সংকুচিত। অভিবাদনে অন্য দিনের মতো শব্দের উচ্ছ্বাস ছিল না; জবাবও এল না কারও কাছ থেকে। হাতুড়ির আঘাত হঠাৎ থেমে গেল—ছন্দ ভেঙে গেল—তারপরই আরও জোরে, আরও দ্রুত তালে ফিরে এল। কয়েক পা ইতস্তত করে লাসাল সোজা ভ্যালেরির দিকে এগিয়ে গেলেন। মাত্র এক বছর হলো সে তাদের সঙ্গে কাজ করছে। ইভার্সের থেকে কয়েক ফুট দূরে, বৈদ্যুতিক করাতের পাশে, একটি বড় পিপের তল বসাতে ব্যস্ত ছিল সে। মালিক তার সামনে এসে দাঁড়ালেন। ভ্যালেরি মাথা না তুলেই কাজ করতে থাকল।

“তাহলে ভাই, কেমন চলছে?” লাসাল বললেন।

যুবকটির দেহভঙ্গি মুহূর্তে শক্ত হয়ে উঠল। সে একবার এস্পোসিতোর দিকে তাকাল—কাছেই দাঁড়িয়ে সে বিশাল বাহুতে তক্তাগুলো জড়ো করে ইভার্সের দিকে বাড়িয়ে দিচ্ছিল। এস্পোসিতো কাজ থামাল না; তবু চোখ তুলল। আর ভ্যালেরি, কোনো উত্তর না দিয়ে, আবার পিপের ভেতরের অন্ধকারে দৃষ্টি নামিয়ে নিল। লাসাল এক মুহূর্ত তার সামনে দাঁড়িয়ে রইলেন—স্পষ্টতই অপ্রস্তুত। তারপর কাঁধ ঝাঁকিয়ে মার্কুর দিকে এগিয়ে গেলেন। মার্কু বেঞ্চের ওপর পা দুদিকে ছড়িয়ে বসে ধীর, সতর্ক টানে পিপের তলার ধারটিতে শেষ শান দিচ্ছিল।

“হ্যালো, মার্কু।” লাসালের কণ্ঠ ম্লান, প্রায় আবেগহীন।

মার্কু কোনো জবাব দিল না; একমনে ধারঘেঁষে লেগে থাকা কাঠের কুঁচি ছেঁটে তুলছিল।

“কী হয়েছে তোমাদের?”—লাসাল এবার উচ্চস্বরে সবার দিকে ফিরে বললেন। “আমরা একমত হইনি, ঠিক আছে। কিন্তু তাই বলে একসঙ্গে কাজ করব না—এ তো কথা নয়। তাহলে এসবের মানে কী?”

মার্কু উঠে দাঁড়াল। তলার গোল কাঠের চাকতিটি তুলে নিয়ে হাতের তালু বুলিয়ে বৃত্তাকার ধার পরীক্ষা করল। তার চোখ দু’টি সামান্য আধবোজা হয়ে এল—মুখে এক মুহূর্তের নিবিড় মনোযোগ। একটি শব্দও উচ্চারণ না করে সে পাশের কর্মীর দিকে এগিয়ে গেল—সে তখন উত্তল পাতগুলো জড়ো করে পিপের কাঠামো দাঁড় করাচ্ছিল। গোটা কর্মশালায় তখন কেবল হাতুড়ির আঘাত আর বৈদ্যুতিক করাতের গর্জন।

“ঠিক আছে,” লাসাল বললেন। “যখন তোমরা এটা কাটিয়ে উঠবে, ব্যালেস্টারের মাধ্যমে আমাকে জানিও।”

শান্ত ভঙ্গিতে তিনি কর্মশালা থেকে বেরিয়ে গেলেন। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই শোরগোল ভেদ করে দুবার ঘণ্টা বেজে উঠল।

ব্যালেস্টার তখন সিগারেট পাকাচ্ছিল। ধীরে উঠে সে শেষের দরজার দিকে গেল। তার বেরিয়ে যেতেই হাতুড়ির শব্দ কিছুটা স্তিমিত হল; একজন তো কাজই থামিয়ে দিল। ফিরে এসে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে সে শুধু বলল, “মালিক তোমাদের ডাকছেন—মার্কু, ইভার্স।” ইভার্সের প্রথম তাগিদ ছিল হাত ধুয়ে নেওয়ার; কিন্তু পাশ কাটিয়ে যেতে গেলে মার্কু তার বাহু চেপে ধরল। বাধ্য হয়ে সে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে তার পিছু নিল।

উঠোনের আলো এত স্বচ্ছ, এত তরল যে ইভার্স তা মুখে ও অনাবৃত বাহুতে স্পষ্ট অনুভব করল। তারা বাইরের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠল—হানিসাকলের লতায় ঢাকা সেই সিঁড়ি, যেখানে ইতিমধ্যে কয়েকটি ফুল ফুটেছে। করিডরে ঢুকতেই—দেয়ালজুড়ে ঝোলানো শংসাপত্রের ফ্রেমগুলোর ওপর দৃষ্টি পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই তারা এক শিশুর কান্না শুনতে পেল। ভেতর থেকে লাসালের গলা ভেসে এল: “ওকে দুপুরের খাবারের পর শুইয়ে দাও। না সেরে উঠলে আমরা ডাক্তার ডাকব।”

হঠাৎ করিডরে লাসাল দেখা দিলেন এবং তাদের নিয়ে ঢুকলেন ছোট্ট অফিসঘরে। অফিসটি সাবেকি ঢঙের চলতি আসবাবে সাজানো; দেয়ালজুড়ে স্পোর্টস ট্রফি। ঘরটি তাদের চেনা।

“বসো,” ডেস্কের পেছনে নিজের জায়গায় বসতে বসতে বললেন লাসাল। কিন্তু দুজনই দাঁড়িয়ে রইল। “আমি তোমাদের ডেকেছি কারণ, মার্কু, তুমি প্রতিনিধি। আর ইভার্স—ব্যালেস্টারের পর তুমি আমার সবচেয়ে পুরনো কর্মচারী। আলোচনা আবার তুলতে চাই না; সেগুলো এখন শেষ। তোমরা যা চাইছ, তা আমি দিতে পারছি না। ব্যাপারটা মিটে গেছে—সিদ্ধান্ত হয়েছে কাজ আবার শুরু হবে। আমি দেখছি তোমরা আমার ওপর রেগে আছ। তাতে আমার কষ্ট হয়—যেমন অনুভব করছি, তেমনই বলছি। শুধু এটুকু যোগ করতে চাই: আজ যা পারছি না, ব্যবসা যখন চাঙা হবে, হয়তো তখন পারব। আর যদি পারি, তোমরা বলার আগেই করব। এর মধ্যে চল, আমরা একসঙ্গে কাজ করার চেষ্টা করি।”

কথা থামিয়ে তিনি যেন একটু ভাবলেন, তারপর তাদের দিকে তাকালেন।

 “তো?” বললেন তিনি।

মার্কু জানলার বাইরে তাকিয়ে ছিল। ইভার্স দাঁতে দাঁত চেপে কিছু বলতে চেয়েও পারল না।

“শোনো,” লাসাল বললেন, “তোমরা সবাই মন বন্ধ করে রেখেছ। তা কেটে যাবে। কিন্তু যখন আবার যুক্তি দিয়ে ভাববে, তখন আমি যা বলেছি, তা ভুলে যেও না।”

তিনি উঠে দাঁড়িয়ে মার্কুর দিকে এগিয়ে গিয়ে হাত বাড়িয়ে বললেন  “চাও!”  হঠাৎ রক্তশূন্য হয়ে উঠল মার্কু; তার উজ্জ্বল, অভিব্যক্তিপূর্ণ মুখে মুহূর্তের জন্য জমে উঠল শীতল কঠোরতা। তারপর আচমকা গোড়ালির উপর ভর করে ঘুরে সে বেরিয়ে গেল। লাসালও ফ্যাকাশে হয়ে উঠেছিলেন। হাত না বাড়িয়েই তিনি ইভার্সের দিকে তাকালেন।

“জাহান্নমে যাও!” তাঁর কণ্ঠ হঠাৎ কর্কশ হয়ে উঠল।

দুজনে ফিরে এসে দেখল, বাকিরা ইতিমধ্যেই টিফিন খেতে বসে পড়েছে। ব্যালেস্টার বেরিয়ে গিয়েছিল। “সব হাওয়া,” বলে মার্কু নিজের বেঞ্চে ফিরে গেলে। রুটিতে কামড় বসাতে বসাতে এস্পোসিতো মাঝপথে থেমে জিজ্ঞেস করল, মালিকের সঙ্গে কী কথা হলো। ইভার্স বলল, তারা কিছুই বলেনি। তারপর সে ঝোলানো ব্যাগ নিয়ে নিজের কাজের বেঞ্চে ফিরে গিয়ে বসে পড়ল। রুটিতে কামড় বসাতে বসাতে তার চোখ গিয়ে ঠেকল সাদের ওপর—সে কাঠের খোসার স্তূপে চিত হয়ে শুয়ে, আনমনে জানালার দিকে তাকিয়ে ছিল। তখন ফিকে হয়ে যাওয়া আকাশের আলো জানালার কাচে নীলাভ আভা ছড়িয়ে দিয়েছিল।

ইভার্স জিজ্ঞেস করল, “তুমি কি খেয়েছ?”

সাদ ধীরস্বরে বলল, “হ্যাঁ, আমি ডুমুর খেয়েছি।”

ইভার্স খাওয়া থামাল। লাসালের সঙ্গে সাক্ষাতের পর থেকে যে অস্বস্তি তার বুকের ভেতর নিঃশব্দে জমাট বেঁধে ছিল, তা যেন হঠাৎ গলে গেল—আর তার জায়গায় ভেসে উঠল এক নরম, মনোরম উষ্ণতা।

সে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে রুটিটা দুভাগ করল। সাদ তা নিতে অস্বীকার করলে সে বলল, “পরের সপ্তাহে সব ঠিক হয়ে যাবে। তখন তোমার পালা খাওয়ানোর।”

সাদ হেসে উঠল। এরপর ইভার্সের দেওয়া রুটির টুকরোতে সে আস্তে করে কামড় দিল—যেন সত্যিই খুব খিদে নেই।

এস্পোসিটো কিছুটা কাঠের খোসা আর ফালি জড়ো করে সেই গাদায় আগুন ধরাল। একটি পুরনো পাত্রে বোতলে আনা কফি ঢেলে সে গরম করতে লাগল। ধর্মঘটের ব্যর্থতার খবর পেয়ে তার মুদি এটা পাঠিয়েছিল—সে জানাল। একটি টিনের পাত্র এক হাত থেকে অন্য হাতে ঘুরছিল। প্রতিবার যখন সেটি এস্পোসিটোর কাছে ফিরে আসত, সে তাতে চিনি মেশানো কফি ঢেলে দিত। খাবার খাওয়ার সময় সাদ যত আনন্দ পেয়েছিল, কফি খাওয়ার সময় তার চেয়ে আরও বেশি আনন্দ পেল। এস্পোসিটো সরাসরি গরম পাত্র থেকে কফি পান করল, ঠোঁট চাটতে চাটতে আর গালাগাল দিতে দিতে।

ব্যালেস্টার এসে সমস্ত কারিগরদের কাজে ফিরে যাওয়ার সংকেত দিল। তারা উঠে নিজেদের হাজিরা কাগজপত্র আর টিফিন-বক্স গুছিয়ে কাঁধের ব্যাগে পুরতে শুরু করল। ঠিক তখনই ব্যালেস্টার তাদের মাঝখানে এসে দাঁড়াল। সে হঠাৎ বলল, ‘পরিস্থিতি যেমন সবার জন্য কঠিন, আমার জন্যও তেমনই। কিন্তু তাই বলে বাচ্চাদের মতো আচরণ করার মানে নেই, মুখ গোমড়া করে থেকেও কোনো লাভ নেই। কফির পাত্রটি হাতে ধরে এস্পোসিটো তার দিকে মুখ ফেরাল। হঠাৎ তার লম্বা, রুক্ষ মুখ লাল হয়ে উঠল।

ইভার্স বুঝতে পারল, সে কী বলতে চলেছে—এবং একসঙ্গে সবাই তাই ভাবছিল—যে তারা মুখ গোমড়া করে বসে নেই, তারা বাধ্য হয়ে মূক থেকেছে—হয় মানো, নয় কাজ ছেড়ে চলে যাও—রাগ আর অসহায়তা কখনও এতটা কষ্ট দেয় যে তুমি চিৎকার করতেও পারো না। তারা মানুষ, তাই এমন পরিস্থিতিতে হাসি বা মিষ্টি ভঙ্গি দেখানো সম্ভব নয়। কিন্তু এস্পোসিটো কিছুই বলল না। তার উত্তেজিত মুখ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে এল, এবং তিনি ব্যালেস্টারের কাঁধে হালকা চাপ দিল। অন্যরাও চুপচাপ নিজেদের কাজে ফিরে গেল।

আবার হাতুড়ির আওয়াজ ধ্বনিত হতে লাগল। গোটা কর্মশালা ভরে উঠল ঘামে ভেজা পোশাক আর কাঠের খোসার মিশ্র গন্ধে। এস্পোসিটো ধীরে ধীরে টাটকা কাঠের চৌকো খণ্ডকে বিদ্যুতচালিত করাতের ধারালো ফলকের দিকে ঠেলতে লাগল। যেখানে করাত কামড় দিচ্ছিল, সেখান থেকে ভেজা কাঠের মিহি গুঁড়ো ছিটকে বেরিয়ে আসছিল, জমে জমে যেন বিস্কুট গুঁরোর ঢিবি তৈরি করছিল। দুটি বড়, লোমশ, পেশিবহুল হাত ফলকের দুপাশে কাঠটিকে দৃঢ়ভাবে ধরে রেখেছিল। খণ্ডটি শেষ পর্যন্ত আলাদা হয়ে গেলে শুধু মোটরের ভোঁ ভোঁ আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল।

সামনে ঝুঁকে রেঁদা ফেরাতে গিয়ে ইভার্স এক ধরনের পিঠের টান অনুভব করল। সাধারণত ক্লান্তি আসে আরও কিছুক্ষণ কাজের পর। এই কয়েক সপ্তাহের শিথিল সময়ে সে কাজের অভ্যাস হারিয়ে ফেলেছিল—এটা স্পষ্ট। সঙ্গে সঙ্গে বয়সও মনে এল—বয়স বাড়লে সূক্ষ্ম কাজ ঠিক আছে , কিন্তু কঠিন কায়িক শ্রম আরও  কষ্টসাধ্য হয়ে যায়। পিঠের টান বার্ধক্যের পূর্বাভাসও বয়ে আনে। যেখানে পেশী জড়িত, সেই কাজ এক সময় অসহনীয় হয়ে ওঠে, মৃত্যুর আগের এক ধরনের অবস্থা মনে করায়; দীর্ঘ কঠোর পরিশ্রমের পরে রাতে ঘুমও যেন মৃত্যুর মতো। ছেলেটি স্কুলশিক্ষক হতে চেয়েছিল—একেবারে ঠিক। যারা কায়িক শ্রম নিয়ে রটে যাওয়া কথা-বাক্য আওড়ায়, তারা জানে না কী বলছে।

শ্বাস ঠিক করতে এবং দুশ্চিন্তা দূর করতে ইভার্স সোজা হয়ে দাঁড়াল। ঠিক সেই মুহূর্তে ঘণ্টা আবার বেজে উঠল—জোরে, কিন্তু অদ্ভুত এক ছন্দে; থেমে থেমে, আবার কর্তৃত্বপূর্ণভাবে শুরু হওয়া—যাতে কারিগররাও তাদের কাজ থামিয়ে তাকিয়ে রইল। ব্যালেস্টার প্রথমে অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, তারপর নিজেকে সামলে ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগোতে লাগল। সে চলে যাওয়ার কয়েক সেকেন্ড পর ঘণ্টা থেমে গেল। কারিগররাও আবার কাজে মন দিল। ঠিক তখনই দরজাটা হঠাৎ এক ঝটকায় খুলল, ব্যালেস্টার লকাররুমের দিকে দৌড়ে গেল। ক্যানভাসের জুতা ও জ্যাকেট পরে দ্রুত বেরিয়ে এসে সে ইভার্সকে বলল, ‘মেয়েটি ফিট হয়েছে। আমি জার্মেইনকে ডেকে আনছি,’—এই বলে সে মূল ফটকের দিকে ছুটল।

ডাঃ জার্মেইনের কোয়ার্টার খুব বেশি দূরে ছিল না; তিনিই কর্মশালার কারিগরদের স্বাস্থ্যের দেখাশোনা করতেন। ইভার্স খবরটি সকলকে অবিকল জানিয়ে দিল। এক রকম অস্বস্তিতে সবাই একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল। বৈদ্যুতিক মোটরের ফাঁপা ঘেঁষা আওয়াজ ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছিল না। কেউ বলল, ‘মনে হয় কিছুই হয়নি।’ এরপর তারা আবার নিজেদের কাজে ফিরে গেল। কর্মশালাটি আবার কারিগরদের কোলাহলে ভরে উঠল, তবে যেন কোনো অজানা আশঙ্কা তাদের কাজের গতি ঢিমে করে দিয়েছিল।

পনের মিনিট পর ব্যালেস্টার আবার ফিরে এল। দেয়ালের খুঁটিতে জ্যাকেট ঝুলিয়ে, কোনো কথা না বলেই সে ছোট দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল। জানালা দিয়ে আসা আলো ক্রমে ফিকে হয়ে আসছিল। কিছুক্ষণের জন্য, যখন করাত কাঠ চেরাইয়ের কাজ থেকে বিরত ছিল, তখন দূর থেকে অ্যাম্বুলেন্সের ধীর সাইরেন শোনা গেল। শব্দটা ধীরে ধীরে কাছে এল, অবশেষে ঠিক কর্মশালার বাইরে থামল। তারপর চারপাশে নেমে এলো নিস্তব্ধতা।

কিছুক্ষণ পর ব্যালেস্টার ফিরে এল। সবাই তার চারপাশে ঘিরে দাঁড়াল। এস্পোসিটো ইতিমধ্যেই বৈদ্যুতিক করাতের মোটর বন্ধ করে দিয়েছিল। ব্যালেস্টার বলল, বাচ্চা মেয়েটি যখন নিজের ঘরে কাপড় ছাড়ছিল, তখন হঠাৎ সামনের দিকে মুখ থুবড়ে পড়ল, যেন কেউ ধাক্কা দিয়েছে।

“আপনি কি কখনও এমন ঘটনা দেখেছেন?” মার্কু বলল। ব্যালেস্টার মাথা নেড়ে অস্পষ্টভাবে কর্মশালার দিকে ইশারা করল। এটা স্পষ্ট, সে প্রচণ্ড চাপে ছিল। আবার অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন শোনা গেল। সবাই সেখানেই দাঁড়িয়ে—জানলার কাচ দিয়ে আসা হলুদ আলোয় ম্লান নীরব কর্মশালায়—কাজ থেকে বিরত থাকা রুক্ষ হাতগুলো কাঠের মিহি গুঁড়োয় ঢাকা পুরনো প্যান্টের পাশে আলগা ঝুলছিল। বাকি দুপুরটা ঘষটে ঘষটে কেটে গেল।

তখন ইভার্সের মধ্যে ছিল শুধুই অবসাদ—আর হৃদয়ের এক নীরব ভার। সে কথা বলতে চাইছিল, কিন্তু বলার মতো কিছুই ছিল না। অন্যদেরও ছিল না। তাদের নীরব মুখে ছিল শুধু দুঃখ—আর একগুঁয়ে অনমনীয়তা। কখনো কখনো তার মনে ‘বিপর্যয়’ শব্দটি ভেসে উঠত, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই মিলিয়ে যেত—যেমন বুদবুদ উঠেই ফেটে যায়।

সে বাড়ি ফিরতে চাইছিল, আবার ফার্নান্দে আর ছেলেটির সঙ্গে রোয়াকে সময় কাটাতে চাইছিল। ঠিক তখনই ব্যালেস্টার ঘোষণা করল—কাজ শেষ, কর্মশালা বন্ধ। মেশিন থেমে গেল। কারিগররা কোনো তাড়াহুড়ো না করে আগুন নিভিয়ে, বেঞ্চের জিনিসপত্র গুছিয়ে একে একে লকার-রুমে চলে গেল। সাদ থেকে গেল; তার দায়িত্ব ছিল কর্মশালা পরিষ্কার করা, ছড়িয়ে থাকা কাঠের গুঁড়ো আর ধুলাবালি ঝাঁট দিয়ে সরিয়ে মাটিতে জল ছিটিয়ে দেওয়া।

লকার রুমে পৌঁছে ইভার্স দেখল—বিশালকায়, লোমশ এস্পোসিতো ঝরনার নিচে দাঁড়িয়ে সশব্দে সাবান মাখছে। সবসময়ই সে পিঠ ঘুরিয়ে স্নান করত। এই লাজুকতার জন্য সবাই তাকে খেপাত। সত্যিই, বিরাট ভাল্লুকের মতো তার শরীর, আর যৌনাঙ্গ লুকোনোর সে কী একগুঁয়ে চেষ্টা। কিন্তু আজ কেউ খেপায়নি, খেপানোর কথা কারো মনেও আসেনি।

এসপোসিতো স্নান সেরে গামছাটা ল্যাঙ্গোটের মতো করে জড়িয়ে বেরল। তারপর একে একে সবাই স্নান সারল। মার্কু শরীরের দুই পাশে জোরে জোরে চাঁটি মারছিল। ঠিক সেই সময়, তার শব্দ ছাপিয়ে লোহার চাকা ঘোরার ঘরঘর আওয়াজ ভেসে এল। কারখানার বড় দরজা ধীরে ধীরে খুলে গেল। ভিতরে এলেন লাসাল। প্রথমবার আসার সময় যে পোশাক পরেছিলেন, সেটাই এখনও তার গায়ে, তবে চুল কিছুটা এলোমেলো। তিনি দোরগোড়ায় থেমে বিস্তীর্ণ ফাঁকা কর্মশালার দিকে তাকালেন, কয়েক পা এগিয়ে আবার থেমে লকার-রুমের দিকে চোখ ফেরালেন।

এস্পোসিতো তখনও ল্যাঙ্গোট পরা, অজান্তে লাসালের দিকে ফিরল। লজ্জায় ও সংকোচে, সে এক পা থেকে আরেক পায়ে দুলছিল। ইভার্স মনে করল, কিছু বলা উচিত মার্কুর। কিন্তু মার্কু তখনো ঝরনার জলের পর্দার আড়ালে অদৃশ্য।

এস্পোসিতো তাড়াহুড়ো করে একটি শার্ট তুলে নিয়ে চটপট গায়ে চাপাচ্ছিল, ঠিক তখনই লাসাল নিরস কণ্ঠে বললেন—‘শুভরাত্রি’, আর ধীর পায়ে ছোট দরজার দিকে এগোতে শুরু করলেন। যতক্ষণে ইভার্সের মনে হলো, কেউ তাঁকে ডাকুক, দরজা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

ইভার্স হাত-মুখ না ধুয়েই পোশাক পরে নিল। সেও সবাইকে ‘শুভরাত্রি’ জানাল, তবে তার শুভেচ্ছায় ছিল আন্তরিকতা। একই উষ্ণতায় সবাই তাকে জবাব দিল। সে দ্রুত বেরিয়ে গিয়ে সাইকেলটা নিল, আর তাতে চড়তেই আবার পিঠে টান অনুভব করল।

পড়ন্ত বিকেলের ভিড়ভাট্টার শহর চিরে ইভার্স দ্রুত সাইকেল চালাচ্ছিল। তার তাড়া ছিল নিজের বাড়ি আর রোয়াকে ফিরে যাওয়ার। সেখানে পৌঁছে সে স্নান করবে, তারপর রোয়াকে বসে সমুদ্র দেখবে—যে সমুদ্র তখনই তার সঙ্গী হয়ে চলছিল, সকালের তুলনায় অনেকটা গাঢ় হয়ে, রাস্তার রেলিংয়ের ওপারে। কিন্তু তার সঙ্গে ছিল সেই ছোট্ট মেয়েটিও; তাকে নিয়ে ভাবনা কিছুতেই মন থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারছিল না।

বাড়ি পৌঁছে ইভার্স দেখল, তার ছেলে স্কুল থেকে ফিরে চিত্রপত্রিকা পড়ছে। তার স্ত্রী ফার্নান্দে জানতে চাইল সবকিছু ঠিকঠাক ছিল কিনা। কোনো উত্তর না দিয়ে সে স্নানঘরে চলে গেল। তারপর রোয়াকের নিচু দেয়ালের পাশে রাখা বেঞ্চে বসল; মাথার ওপর শুকোতে দেওয়া জামাকাপড়। আকাশ ক্রমশ স্বচ্ছ হয়ে উঠছিল, আর পাঁচিলের ওপারে সন্ধ্যার কোমল সমুদ্র দৃশ্যমান ছিল।

ফার্নান্দে এনিসেট, দুটো গ্লাস আর ঠান্ডা জলের জগ এনে স্বামীর পাশে বসল। ইভার্স তাকে সবকিছু জানাল। স্ত্রীর হাত ধরে রেখেছিল ঠিক যেমনটা তারা বিবাহের প্রথম দিনগুলোতে করত। কথা শেষ করে সে নড়ল না, সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে বসে রইল। ইতিমধ্যে দিগন্তের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত গোধূলি দ্রুত নেমে আসছিল। ‘আহ! সবই তারই দোষ!’ সে বলল। যদি সে আর ফার্নান্দে আবার তরুণ হত, তবে তারা সমুদ্রের ওপারে চলে যেত।

 

 

 

 

0 Comments
Leave a reply