অতিথি (L’hôte)

লিখেছেন:আলবেয়ার কামু, বঙ্গানুবাদ- সুরজিৎ ব্যানার্জী
গল্পটি ১৯৫০-এর দশকের মাঝামাঝি আলজেরিয়ায় সংঘটিত এবং এটি সম্ভবত কামু-র একমাত্র গল্প যা সেই সময়ের রাজনৈতিক সংকটের প্রতি ইঙ্গিত করে।

 

 

শিক্ষক দেখছিলেন—দুজন লোক তাঁর দিকে উঠে আসছে। একজন ঘোড়ায়, অন্যজন পায়ে হেঁটে। তাঁরা এখনও সেই খাড়া চড়াইটা ধরেনি, যে পথ পাহাড়ের ঢালে দাঁড়িয়ে থাকা স্কুলবাড়ির দিকে উঠে গেছে। বিস্তীর্ণ জনশূন্য তুষারঢাকা মালভূমির পাথরের ফাঁক দিয়ে তারা কষ্ট করে ধীরে ধীরে এগোচ্ছিল। মাঝে মাঝে ঘোড়াটার পা টলে উঠছিল। চলার শব্দ শোনা যাচ্ছিল না, কিন্তু তার নাসারন্ধ্র থেকে বেরোনো বাষ্পের ফোয়ারা দেখা যাচ্ছিল। অন্তত একজন লোক নিশ্চয়ই জায়গাটা চেনে—মনে হচ্ছিল তাই। তারা পাকদণ্ডী ধরে এগোচ্ছিল, যদিও কয়েক দিন আগেই ময়লাটে সাদা তুষারের স্তরের নিচে পথের চিহ্ন প্রায় চাপা পড়ে গিয়েছিল।

তিনি ফাঁকা, হিমশীতল ক্লাসঘরটি পেরিয়ে গেলেন। বাইরে হাড় কাঁপানো শীত। ব্ল্যাকবোর্ডে চার রঙের চক দিয়ে আঁকা ফ্রান্সের চারটি নদী গত তিন দিন ধরে তাদের নিজ নিজ মোহনার দিকে বয়ে চলেছিল। আট মাসের খরার পর, অক্টোবরের মাঝামাঝি, বর্ষাকে যেন এড়িয়েই আচমকা প্রবল তুষারপাত নেমে এসেছিল। মালভূমির উপর ছড়িয়ে থাকা গ্রামগুলো থেকে যে কুড়ি জনের মতো ছাত্র আসত, তারা আর আসছিল না। ভালো আবহাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

দারু এখন শুধু একটি ঘরই গরম রাখতেন—যেটি ছিল তাঁর থাকার ঘর, ক্লাসঘরের লাগোয়া, আর পূর্বদিকে মালভূমির দিকে খোলা। একটি জানালা, ক্লাসঘরের জানালাগুলোর মতোই, দক্ষিণমুখী ছিল। এই দিক থেকে স্কুলটি ছিল সেই জায়গা থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে, যেখানে মালভূমি দক্ষিণের দিকে ঢালু হয়ে নামতে শুরু করেছে। আকাশ পরিষ্কার থাকলে দূরে দেখা যেত ফিকে বেগুনি পাহাড়ি শৈলশিরা—যেখান থেকে মরুভূমির বিস্তার খুলে গেছে।

একটু উষ্ণতা ফিরে পেয়ে দারু আবার জানালার কাছে গেলেন। এই জানলা থেকেই তিনি প্রথম দুজনকে দেখেছিলেন, কিন্তু এখন তারা চোখের আড়ালে। তাহলে তারা নিশ্চয়ই খাড়া চড়াইটা ধরেছে। আকাশ আর ততটা গাঢ় ছিল না—শেষ রাতে তুষারপাত থেমে গিয়েছিল। মেঘের স্তর ধীরে ধীরে ওপরে উঠছিল, তবু সকালের ঝাপসা, ঢিমে আলো এখনও উজ্জ্বল হয়ে ওঠেনি। দুপুর দুটোতেও মনে হচ্ছিল দিনটা যেন সবে শুরু হয়েছে। তবু গত তিন দিনের তুলনায় আজ ভালোই ছিল। গত তিন দিন অবিরাম অন্ধকারের মধ্যে ঘন তুষার ঝরে পড়েছে, আর হাওয়ার এলোমেলো ঝাপটায় ক্লাসঘরের দুপাল্লার দরজা খটখট শব্দে একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খেয়েছে। সেই সময় তিনি ঘরে বসেই দীর্ঘ সময় ধৈর্য ধরে কাটিয়েছিলেন—বেরিয়েছিলেন শুধু ছাউনির নিচে যাওয়ার জন্য, মুরগিগুলোর দেখাশোনা করতে এবং কয়লার মজুত থেকে কয়লা আনতে। ভাগ্যক্রমে উত্তরের সবচেয়ে কাছের গ্রাম তাজিদের ছোট ট্রাকটি তুষারঝড় শুরু হওয়ার দুই দিন আগে রসদ পৌঁছে দিয়েছিল। আর আটচল্লিশ ঘণ্টা পরে সেটি আবার আসবে।

তাছাড়া অবরুদ্ধ অবস্থাতেও টিকে থাকার মতো রসদ তাঁর ছিল। ছোট্ট ঘরটা প্রায় গমের বস্তায় ভরে গিয়েছিল—প্রশাসন সেগুলো মজুত হিসেবে রেখে দিয়েছিল, যাতে খরায় ক্ষতিগ্রস্ত ছাত্রদের পরিবারগুলোর মধ্যে তিনি সেগুলো বিলি করতে পারেন। আসলে দুর্ভাগ্য সবার ঘরেই নেমে এসেছিল, কারণ সবাইই গরিব। প্রতিদিন দারু বাচ্চাদের রেশন দিতেন। এই কদিনে সেই রেশন তারা পায়নি—এ কথা তিনি ভালোই জানতেন। হয়তো আজ সন্ধ্যায় কোনো বাবা বা দাদা এসে পড়বে, তখন তিনি তাদের কিছু শস্য দিতে পারবেন। পরের ফসল ওঠা পর্যন্ত কোনোভাবে টিকে থাকতে হবে—এইটুকুই। এখন ফ্রান্স থেকে গমভর্তি জাহাজ আসছে। সবচেয়ে কঠিন সময়টা পেরিয়ে গেছে।

তবু সেই দুর্দশা ভুলে থাকা কঠিন—ঝলসানো রোদে ঘুরে বেড়ানো ন্যাকড়া পরা ভূতের দল; মালভূমির নির্জলা মাটি পুড়ে চৌচির; মাটির ডেলা খটখটে, পায়ের চাপ পড়তেই ঝুরঝুরে; হাজার হাজার ভেড়ার লাশ এদিক-ওদিক ছড়িয়ে। এমনকি কিছু মানুষও—যাদের খবর সব সময় পাওয়া যেত না।

এই দারিদ্র্যের মুখোমুখি হয়ে দারু—যিনি এই নির্জন স্কুলে প্রায় সন্ন্যাসীর মতো জীবন কাটাতেন, আর সামান্য যা ছিল আর এই কঠোর জীবন নিয়েই সন্তুষ্ট ছিলেন—নিজেকে যেন প্রভুর মতো মনে করতেন। তাঁর চুনকাম করা দেয়াল, সরু চৌকি, সাদা কাঠের তাক, কুয়ো, আর প্রতি সপ্তাহে পাওয়া জল আর খাদ্যের রসদ—এই সবকিছুর মধ্যেই যেন এক ধরনের প্রাচুর্য ছিল।

আর হঠাৎ এই তুষার—কোনো পূর্বাভাস ছাড়া, বৃষ্টির সামান্য উপশমও না এনে। দেশটা এমনই—বসবাসের পক্ষে নির্মম; মানুষ না থাকলেও নির্মম, আর মানুষ থাকলেও তাতে বিশেষ পরিবর্তন ঘটে না। কিন্তু দারুর জন্ম এখানেই। অন্য কোথাও তিনি নিজেকে নির্বাসিত মনে করতেন।

তিনি বাইরে বেরিয়ে এসে স্কুলের সামনে সমতল জায়গাটিতে এগিয়ে গেলেন। দুজন মানুষ তখন ঢালের মাঝামাঝি উঠে এসেছে। ঘোড়সওয়ারটিকে তিনি চিনতে পারলেন—বালদুচ্চি, সেই বৃদ্ধ জঁদার্ম (ফরাসি সামরিক পুলিশ), যাঁকে তিনি অনেক দিন ধরেই চিনতেন। বালদুচ্চি দড়ির এক প্রান্তে একজন আরবকে ধরে রেখেছিলেন; লোকটি তাঁর পেছনে এগিয়ে আসছিল, হাত বাঁধা, মাথা নিচু।

জঁদার্ম হাত তুলে অভিবাদন জানালেন, কিন্তু দারু তার জবাব দিলেন না; তিনি তখন পুরো মন দিয়ে আরবটিকেই দেখছিলেন। লোকটি রংচটা নীল জেল্লাবা (উত্তর আফ্রিকার ঢিলেঢালা ঐতিহ্যবাহী পোশাক) পরেছিল; পায়ে স্যান্ডেল, তার ভিতরে মোটা ধূসর পশমের মোজা; আর মাথায় ছোট ও সরু একটি শেশ (মাথায় জড়ানো মরুভূমির কাপড়) বাঁধা। আরবটি যাতে আঘাত না পান, তাই বালদুচ্চি ঘোড়াটিকে হাঁটিয়ে আনছিলেন, আর পুরো দলটি ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছিল।

যখন তাঁরা ঢিল ছোড়া দূরত্বে এসে পৌঁছালেন, বালদুচ্চি চিৎকার করে বললেন, “এলামা থেকে এই তিন কিলোমিটার আসতে পাক্কা এক ঘণ্টা লেগে গেল!” দারু কোনো জবাব দিলেন না। মোটা সোয়েটার পরা খাটো, চৌকো গড়নের মানুষটি দাঁড়িয়ে তাদের উঠতে দেখছিলেন। আরবটি একবারও মাথা তুলল না। তাঁরা যখন সমতল জায়গায় এসে উঠলেন, দারু বললেন, “নমস্কার। ভেতরে আসুন, একটু গা গরম করুন।”

বালদুচ্চি কষ্ট করে ঘোড়া থেকে নামলেন, কিন্তু দড়িটা হাত থেকে ছাড়লেন না। খাড়া গোঁফের নিচে তিনি শিক্ষকের দিকে তাকিয়ে হাসলেন। রোদে পোড়া কপালের নিচে গভীর কোটরে বসা ছোট কালো চোখ, চারপাশে বলিরেখা ঘেরা মুখ—তাঁকে একাগ্র ও সতর্ক দেখাচ্ছিল।

দারু ঘোড়ার লাগাম ধরে ঘোড়াটিকে ছাউনির দিকে নিয়ে গেলেন। তারপর ফিরে এসে দেখলেন দুজন মানুষ স্কুলঘরের ভেতরে তাঁর জন্য অপেক্ষা করছেন। তিনি তাঁদের নিজের ঘরে নিয়ে গেলেন। “আমি ক্লাসঘরটা গরম করে আসি,” তিনি বললেন। “ওখানে আমরা বেশি আরামে বসতে পারব।”

কিছুক্ষণ পরে তিনি আবার ঘরে ঢুকলেন। বালদুচ্চি চৌকির ওপর গা এলিয়ে বসেছিলেন। আরবের সঙ্গে বাঁধা দড়িটা তিনি খুলে ফেলেছেন। আরবটি চুল্লির পাশে উবু হয়ে বসে আছে; তার হাত এখনো বাঁধা, শেশটা পিছনে সরে গেছে, আর সে জানালার দিকে তাকিয়ে আছে।

প্রথমে দারুর চোখে পড়ল তাঁর বিশাল ঠোঁট—পুরু, মসৃণ, প্রায় নিগ্রোদের মতো। কিন্তু নাকটি টিকালো, আর চোখ দুটি কালো, জ্বরে জ্বলছে যেন। শেশটা সামান্য পেছনে সরে যাওয়ায় তাঁর কপালে একরোখা ভাব ফুটে উঠেছিল। ঠান্ডায় কিছুটা ফ্যাকাশে হলেও রোদে পোড়া সেই মুখে একসঙ্গে উদ্বেগ আর বিদ্রোহের ছাপ ছিল। আরবটি যখন মুখ ঘুরিয়ে দারুর দিকে তাকাল, সেই দৃষ্টিটাই দারুকে সবচেয়ে বেশি আঘাত করল।

“এদিকে আসুন,” শিক্ষক বললেন। “আমি আপনাদের জন্য পুদিনা চা বানিয়ে আনছি।”

“ধন্যবাদ,” বললেন বালদুচ্চি। “কী ঝামেলার কাজ! অবসর পেলেই বাঁচি।”

তারপর তিনি বন্দির দিকে আরবিতে বললেন, “তুই, এদিকে আয়।”

আরবটি উঠে দাঁড়াল এবং ধীরে ধীরে, হাতদুটো সামনে বাঁধা, স্কুলঘরের দিকে এগিয়ে গেল।

চায়ের সঙ্গে দারু একটি চেয়ারও নিয়ে এলেন। কিন্তু বালদুচ্চি ইতিমধ্যেই ছাত্রদের প্রথম বেঞ্চটির ওপর সিংহাসনের মতো বসে আছেন, আর আরবটি শিক্ষকের মঞ্চের গা ঘেঁষে উবু হয়ে বসে আছে; সামনে সেই চুল্লি, যা টেবিল ও জানালার মাঝখানে রাখা।

বন্দির দিকে চায়ের গ্লাস বাড়িয়ে দিতে গিয়ে দারু তার বাঁধা হাত লক্ষ্য করলেন এবং একটু দ্বিধা বোধ করলেন। “হয়তো ওর হাত খুলে দেওয়া যায়,” তিনি বললেন।

“নিশ্চয়ই,” বললেন বালদুচ্চি। “রাস্তায় আসার সময়ের জন্যই বেঁধেছিলাম।”

তিনি যেন উঠতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু দারু গ্লাসটি মেঝেতে রেখে আরবটির পাশে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন। আরবটি কিছু না বলে জ্বরজ্বালা চোখে তাঁর কাজ লক্ষ্য করছিলেন। হাত মুক্ত হতেই তিনি ফোলা কব্জি দুটো একে অপরের সঙ্গে ঘষে নিয়ে চায়ের গ্লাসটি তুলে দ্রুত ছোট ছোট চুমুকে জ্বলন্ত গরম তরল টানতে লাগলেন।

“আচ্ছা,” দারু বললেন। “তাহলে এখন কোথায় যাচ্ছেন?”

বালদুচ্চি চায়ের গ্লাস থেকে ঝাঁটার মতো ঘন গোঁফে ঢাকা মুখ তুলতে তুলতে, “এখানেই, বাছা।”

“বাহ, কী অদ্ভুত ছাত্র! আপনি কি এখানে রাত কাটাবেন?”

“না। আমি এলামা ফিরে যাব। আর তুমি এই আরবকে তিঙ্গুইতে পৌঁছে দেবে। সেখানে পুলিশ সদর ওর জন্য অপেক্ষা করছে।” বালদুচ্চি বন্ধুসুলভ ছোট্ট হাসি নিয়ে দারুর দিকে তাকিয়ে ছিলেন।

“বলছেন কী আপনি!” শিক্ষক বললেন। “আমার সঙ্গে মজা করছেন নাকি?”

“না, বাছা। এটাই আদেশ।”

“আদেশ? কিন্তু আমি তো…” দারু একটু থেমে গেলেন; তিনি বৃদ্ধ কর্সিকানটিকে কষ্ট দিতে চাননি। (কর্সিকা হলো ভূমধ্যসাগরের একটি দ্বীপ যা ফ্রান্সের অন্তর্গত)

“মানে… এটা তো আমার কাজ নয়।”

— “আহ! ‘মানে’ কী মানে? যুদ্ধের সময় সবাইকে সব কাজই করতে হয়।”

— “তাহলে যুদ্ধ ঘোষণার জন্যই অপেক্ষা করব!”

বালদুচ্চি মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন।

“ঠিক আছে। কিন্তু আদেশ তো দেওয়া হয়েছে, আর সেটা তোমাকেও মানতে হবে। শোনা যাচ্ছে চারদিকে নড়াচড়া শুরু হয়েছে। শিগগিরই বিদ্রোহ হতে পারে বলে কথা উঠছে। এক অর্থে আমরা প্রস্তুত হয়েই আছি।”

দারু তাঁর জেদি ভাবটাই বজায় রাখলেন।

“শোনো, বাছা,” বললেন বালদুচ্চি। “আমি তোমাকে পছন্দ করি। এটা বুঝতে হবে, এলামায় আমাদের মোটে ডজনখানেক লোক আছে—গোটা জেলা টহল দেওয়ার জন্য। আর আমাকে ফিরে যেতে হবে। আমাকে বলা হয়েছে, এই লোকটাকে তোমার কাছে দিয়ে দ্রুত ফিরে যাও। ওকে সেখানে আর রাখা যায়নি। ওর গ্রামে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে—কেউ ওকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। আগামীকালের মধ্যেই তোমাকে ওকে তিঙ্গুইতে পৌঁছে দিতে হবে। তোমার মতো সবল মানুষের কাছে কুড়ি কিলোমিটার ভীতি জাগানোর মতো কিছু নয়। তারপর সব চুকে যাবে—আবার তোমার জীবন ছাত্রদের মাঝে আগের মতোই আরামের হবে।”

দেয়ালের ওপাশ থেকে ঘোড়ার নাক ঝাড়া আর খুরের ঠোকার শব্দ শোনা গেল। দারু জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিলেন। আবহাওয়া সত্যিই পরিষ্কার হয়ে উঠছিল; তুষারঢাকা মালভূমির ওপর আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছিল। সব বরফ গলে গেলে আবার সূর্যের রাজত্ব শুরু হবে, আর সে পাথুরে মাঠগুলোকে দগ্ধ করবে। তারপর টানা অনেক দিন ধরে সেই অপরিবর্তনীয় আকাশ তার শুষ্ক আলো ঢেলে দেবে সেই নির্জন বিস্তারের ওপর—যেখানে মানুষের কোনো উপস্থিতি নেই।

“আচ্ছা,” তিনি বালদুচ্চির দিকে ঘুরে বললেন, “ও কী করেছে?”

জঁদার্ম মুখ খোলার আগেই তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “ও কি ফরাসি বলতে পারে?”

“না, একটি শব্দও না। আমরা এক মাস ধরে খুঁজছিলাম, কিন্তু ওকে লুকিয়ে রেখেছিল। ও নিজের খুড়তুতো ভাইকে খুন করেছে।”

“ও কি আমাদের বিরুদ্ধে?”

“মনে হয় না। কিন্তু তুমি কখনও জোর দিয়ে বলতে পারবে না।”

“ও কেন খুন করল?”

"পারিবারিক ঝগড়া মনে হয়। শোনা যায়, একজন আরেকজনের কাছে কিছু শস্য ধার করেছিল। ব্যাপারটা পরিষ্কার নয়। মোট কথা—ও এক কোপেই খুড়তুতো ভাইকে কাস্তে দিয়ে মেরে ফেলেছে। জানোই তো, ভেড়া জবাই করার মতো—ঝিক!"

বালদুচ্চি গলার ওপর দিয়ে ছুরি চালানোর ভঙ্গি করলেন।

বালদুচ্চির এই ভঙ্গিমা আরবের দৃষ্টি আকর্ষণ করল। উদ্বিগ্ন চোখে তিনি দারুর দিকে তাকিয়ে রইলেন।

হঠাৎ এক তীব্র রাগ দারুর মধ্যে জেগে উঠল—এই মানুষটার বিরুদ্ধে, সমস্ত মানুষের বিরুদ্ধে, তাদের নোংরা নিষ্ঠুরতা, তাদের অবিরাম ঘৃণা আর রক্তপাতের উন্মাদনার বিরুদ্ধে।

তখনই কেটলি শিস দিয়ে উঠল। তিনি আবার বালদুচ্চির কাপ ভরে দিলেন, একটু দ্বিধা করলেন, তারপর আরবটিকেও আবার চা দিলেন; তিনি দ্বিতীয়বারও লোভের সঙ্গে তা পান করলেন। চা খাওয়ার সময় তাঁর দুহাত উঠতেই জেল্লাবাটা একটু ফাঁক হয়ে গেল, আর শিক্ষক দেখলেন—রোগা, পেশল বুকটা।

“ধন্যবাদ, ভাইটি,” বললেন বালদুচ্চি। “এবার আমি চলি।” তিনি উঠে দাঁড়ালেন এবং পকেট থেকে একটি দড়ি বের করে আরবটির দিকে এগোতে লাগলেন।

“এটা কী করছেন আপনি?” দারু কড়া স্বরে জিজ্ঞেস করলেন। বালদুচ্চি একটু হতভম্ব হয়ে তাঁকে দড়িটা দেখালেন।

"ওটার দরকার নেই।"

বৃদ্ধ জঁদার্ম একটু ইতস্তত করলেন।

"যাকগে, এটা তোমার ব্যাপার। তোমার কাছে অস্ত্র আছে তো?"

“আমার শিকারি বন্দুক আছে।”

"কোথায়?"

"ট্রাঙ্কে।"

“ওটা তোমার চৌকির কাছেই রাখা উচিত।”

“কেন? আমার ভয় পাওয়ার কিছু নেই।”

"বাছা, তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। যদি তারা বিদ্রোহ করে, তাহলে কেউই নিরাপদ থাকবে না—আমরা সবাই একই বিপদে পড়ব।"

“আমি আত্মরক্ষা করব। তারা আসতে শুরু করলে আমি সময়মতো লক্ষ্য করতে পারব।”

বালদুচ্চি হাসতে শুরু করলেন, তারপর হঠাৎ তাঁর গোঁফ সরে এসে সাদা দাঁতগুলো ঢেকে দিল।

“তুমি মনে করছ, তুমি সময় পাবে? ভালো। আমি তো সেটাই বলছিলাম। তুমি সবসময়ই একটু পাগলাটে ছিলে। সেই কারণেই তোমাকে আমার ভালো লাগে—আমার ছেলেও ঠিক এমনই ছিল।” এই কথা বলতে বলতে তিনি পকেট থেকে রিভলবার বের করে ডেস্কে রাখলেন। "এটা রাখো; এলামা পর্যন্ত যেতে আমার দুটো অস্ত্রের দরকার নেই।"

ডেস্কের কালো পটভূমিতে রিভলভারটি চকচক করছিল। জঁদার্ম যখন তাঁর দিকে ফিরে দাঁড়ালেন, তখন শিক্ষক তাঁর শরীর থেকে চামড়া আর ঘোড়ার গন্ধ পেলেন।

“শুনুন,” হঠাৎ বলে উঠলেন দারু, “এই সবকিছুই আমাকে ঘৃণায় ভরিয়ে দিচ্ছে—আর আপনার লোকটাকে সবচেয়ে বেশি। কিন্তু আমি ওকে ধরিয়ে দেব না। দরকার হলে আমি লড়ব, হ্যাঁ। কিন্তু এটা আমি করব না।”

বৃদ্ধ জঁদার্ম তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে কঠোর চোখে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলেন।

“তুমি বোকামি করছ,” তিনি ধীরে বললেন। “আমারও এটা ভালো লাগে না। একজন মানুষের গলায় দড়ি দেওয়া—এত বছর পরও এতে অভ্যস্ত হওয়া যায় না; বরং, হ্যাঁ, এতে লজ্জাই লাগে। কিন্তু আমরা তাদের যা খুশি করতে দিতে পারি না।”

“আমি ওকে ধরিয়ে দেব না,” দারু আবার বললেন।

“এটা আদেশ, বাছা। আমি আবার বলছি।”

“ঠিক আছে। তাদেরকে বলবেন আমি যা বলেছি—আমি ওকে ধরিয়ে দেব না।”

বালদুচ্চির চোখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল—তিনি গভীরভাবে চিন্তায় ডুবে আছেন। তিনি আরব বন্দি ও দারুর দিকে তাকালেন। অবশেষে মনস্থির করে বললেন, "না, আমি তাদের কিছুই বলব না। তোমার যা খুশি তাই কর। আমি তোমার নালিশ করব না। আমাকে বন্দিকে পৌঁছে দেওয়ার আদেশ দেওয়া হয়েছিল—আমি সেই কাজটাই করেছি। এখন তুমি এই কাগজে সই করো।"

“এর দরকার নেই। আপনি যে ওকে আমার কাছে রেখে গেছেন, সেটা আমি অস্বীকার করব না।”

“আমার সঙ্গে কঠোর হও না। আমি জানি তুমি সত্যিই বলবে। তুমি এখানকার মানুষ, একজন সৎ মানুষ। কিন্তু তোমাকে সই করতেই হবে—এটাই নিয়ম।”

দারু টেবিলের ড্রয়ার খুলে একটি ছোট বেগুনি কালির বোতল বের করলেন। তারপর লালচে কাঠের কলমদানি থেকে ‘সার্জেন্ট-মেজর’ কলমটি নিলেন, যা তিনি ছাত্রদের লিপিবিদ্যা অনুশীলনের জন্য ব্যবহার করতেন। সেই কলম দিয়ে কাগজে সই করলেন। জঁদার্ম কাগজটি যত্ন করে ভাঁজ করে মানিব্যাগে রাখলেন। তারপর তিনি ধীরে দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন।

“একটু এগিয়ে দিই,” বললেন দারু।

“না,” বলল বালদুচ্চি, "তোমাকে আর ভদ্রতা করতে হবে না। তুমি যথেষ্ট অপমান করেছ।" তিনি আরবের দিকে নাক সিটকিয়ে তাকালেন। আরব একই জায়গায় স্থির বসেছিলেন। বাল্লুচ্চি দুঃখভরা ভঙ্গিতে নাক টেনে মুখ ঘুরিয়ে দরজার দিকে এগোলেন। "চলি বাছা।" তাঁর পিছনে দরজাটা ধপ করে বন্ধ হয়ে গেল।

হঠাৎ জানালার বাইরে বালদুচ্চির ছায়া এক পলকের জন্য দেখা গেল, তারপর অদৃশ্য হয়ে গেল। তুষারে পায়ের শব্দ ঢেকে পড়েছিল। দেয়ালের ওপাশে ঘোড়ার নড়াচড়ার আওয়াজ শোনা গেল। সঙ্গে সঙ্গে মুরগিরা ভয়ে ডানা ঝাপটাতে শুরু করল। কিছুক্ষণ পর বালদুচ্চি আবার জানালার বাইরে দেখা দিলেন। ঘোড়াটির লাগাম ধরে তিনি ছোট ঢিবির দিকে এগিয়ে গেলেন, একবারও না মুড়ে। কিছুক্ষণ পর তিনি দৃষ্টির আড়ালে চলে গেলেন। তারপর একটি বড় পাথর গড়িয়ে পড়ার শব্দও শোনা গেল।

দারু এবার বন্দির কাছে ফিরে এলেন। তিনি এতক্ষণ, না নড়ে, তাঁর দিকেই চোখ লাগিয়ে বসেছিলেন।

"দাঁড়াও," শিক্ষক আরবিতে বলে দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। চৌখাঠে পৌঁছে তিনি কিছু একটা ভাবলেন। ফিরে গিয়ে ডেস্কের উপর পড়ে থাকা রিভলভারটা তুলে পকেটে রাখলেন। তারপর পিছনে না তাকিয়ে নিজের ঘরে চলে গেলেন।

দীর্ঘ সময় ধরে তিনি চৌকিতে শুয়ে রইলেন—চারপাশের নীরবতা অনুভব করতে করতে আকাশটাকে ধীরে ধীরে মেঘে ঢেকে যেতে দেখলেন।

অথচ এই নীরবতাই তাঁকে সবচেয়ে কষ্ট দিত—যুদ্ধের পর যখন প্রথম এখানে এসেছিলেন। তিনি মরুভূমি ও উঁচু মালভূমির মাঝের পাহাড়ের পাদদেশে একটি ছোট শহরে চাকরি চেয়েছিলেন। সেখানে পাহাড়গুলো পাথরের দেয়ালের মতো—উত্তরে সবুজ আর কালো, দক্ষিণে গোলাপি বা হালকা বেগুনি—যেন চিরস্থায়ী গ্রীষ্মের দেশের সীমানা চিহ্নিত করে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু তাঁকে আরও উত্তরে, সেই মালভূমির মাঝেই একটি স্কুলে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।

শুরুর দিকে এই নিষ্ঠুর ভূমিতে—যেখানে শুধু পাথর ছাড়া আর কিছু নেই—একাকীত্ব ও নীরবতা তাঁর জন্য সহ্য করা কঠিন ছিল। কখনও জমিতে দাগ কাটা রেখা দেখে মনে হতো যেন চাষ হয়েছে, অথচ তা ছিল বিশেষ ধরনের নির্মাণযোগ্য পাথর খোঁড়ার চিহ্ন। এখানে যেন চাষ করা হতো শুধুমাত্র পাথর সংগ্রহের জন্য। কখনও আবার গর্তে জমে থাকা সামান্য মাটি খুঁটে বের করা হতো, যাতে গ্রামের ছোট ছোট বাগানগুলো সামান্য উর্বর হয়। এইভাবেই—দেশের তিন-চতুর্থাংশ কেবল পাথরে ঢাকা।

এখানে শহর জন্ম নেয়, কিছুদিন জেগে থাকে, তারপর মিলিয়ে যায়। মানুষ আসে, একে অপরকে ভালোবাসে বা গলা কামড়ে ধরে লড়াই করে, তারপর মারা যায়। এই মরুভূমিতে কেউই কিছু নয়—না নিজে, না অতিথি। তবুও দারু জানত, এই মরুভূমির বাইরে কেউই সত্যিকারের বাঁচতে পারত না।

যখন তিনি উঠে দাঁড়ালেন, ক্লাসঘর থেকে কোনো শব্দ আসছিল না। এই ভেবে যে আরবটি হয়তো পালিয়ে গেছে এবং আর তাঁকে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হবে না—তিনি নিজেই অবাক হলেন নিজের অকপট আনন্দে; মনে হলো, আবার একা হয়ে যাচ্ছেন।

কিন্তু বন্দি তখনও সেখানেই ছিলেন। তিনি চুল্লি আর টেবিলের মাঝখানে লম্বা হয়ে শুয়ে ছিলেন, চোখ খোলা রেখেই ছাদের দিকে তাকিয়ে। এই ভঙ্গিতে তাঁর মোটা ঠোঁটগুলো সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ছিল, যা তাকে কিছুটা অভিমানী বা গোমড়া চেহারা দিচ্ছিল।

"এসো।"

আরব উঠে তাঁর অনুসরণ করলেন। ঘরে ঢুকে শিক্ষক তাঁকে জানালার নিচে টেবিলের পাশে একটি চেয়ার দেখিয়ে দিলেন। আরব বসে পড়লেন। এখনও তাঁর চোখ দারুর দিক থেকে সরে যায়নি।

"তোমার খিদে পেয়েছে?"

"হ্যাঁ," বন্দী উত্তর দিলেন।

দারু দুজনের জন্য খাওয়ার ব্যবস্থা করলেন। তিনি প্রথমে প্যানে আটা মেখে মোটা রুটির লেচি বানালেন। তারপর ছোট বার্নার জ্বালিয়ে প্যান বসিয়ে রান্না শুরু করলেন। মাঝে চালার ঘরে গিয়ে চিজ, ডিম, খেজুর আর কনডেন্সড মিল্ক নিয়ে এলেন।। রুটি সেঁকা হয়ে গেলে তা ঠাণ্ডা করার জন্য জানলার তাকে রেখে দিলেন। তারপর কনডেন্সড মিল্কে জল মিশিয়ে গরম করলেন এবং শেষে ডিম ফেটিয়ে অমলেট বানালেন। কাজের ফাঁকে একসময় খোঁচা খেলেন ডান পকেটে রাখা রিভলভারের। তখন বাসন নামিয়ে ক্লাসঘরে গিয়ে রিভলভারটা টেবিলের ড্রয়ারে রেখে এলেন। যখন তিনি আবার ঘরে ফিরলেন, তখন রাত নেমে আসছিল। আলো জ্বালিয়ে আরবের কাছে খাবারের থালা এগিয়ে দিলেন।

"খাও," দারু বললেন।

অন্যজন একটি রুটির টুকরো মুখের কাছে তুলে এনে কামড় বসাতে গিয়ে থমকে গেল।

"আর আপনি?"

“তুমি খেয়ে নাও। তারপর আমি খাবো।”

আরবের মোটা ঠোঁট ঈষৎ খুলে গেল। কিছুক্ষণ ইতস্তত করে তিনি রুটিতে সজোরে কামড় বসালেন। খাওয়া শেষ হলে আরবটি শিক্ষকের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

"আপনি কি  বিচারক?"

"না। আমি শুধু তোমাকে কাল পর্যন্ত এখানে রাখব।"

"আপনি আমার সঙ্গে খাচ্ছেন কেন?"

"আমার খিদে পেয়েছে।"

অন্যজন চুপ করে গেল। দারু উঠে চালার ঘর থেকে একটি ক্যাম্প-খাট এনে চুল্লি আর টেবিলের মাঝে নিজের খাটের সঙ্গে আড়াআড়ি করে বিছিয়ে দিলেন। কোণের দিকে দাঁড় করিয়ে রাখা একটি বড় স্যুটকেস থেকে—যেটা কাগজপত্র রাখার তাকের মতো ব্যবহার করা হতো—তিনি দুটি কম্বল বের করে ক্যাম্প-খাটের ওপর বিছিয়ে দিলেন। তারপর ভাবলেন কিছুক্ষণ থেমে আর কিছু করার আছে কি নেই। অবশেষে বসলেন নিজের বিছানায়। শুধু এই লোকটির দিকে তাকানো ছাড়া কোন কাজ পড়ে নেই। তাই তিনি তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলেন, চেষ্টা করছিলেন কল্পনা করতে—এই মুখটা ক্রোধে উন্মত্ত হলে কেমন দেখাত। কিন্তু তিনি তা কল্পনা করতে পারলেন না; দেখতে পেলেন শুধু কালো চকচকে চোখ আর পশুর মতো মুখ।

"তুমি মারলে কেন?" দারু জিজ্ঞেস করলেন, তাঁর কণ্ঠে এমন শত্রুতার সুর ছিল যা তাঁকে নিজেকেই বিস্মিত করল। আরব মুখ ফিরিয়ে নিলেন। 

"ও পালিয়ে যাচ্ছিল। আমি পেছন পেছন তাড়া করলাম।” তিনি আবার দারুর দিকে তাকালেন। চোখে ছিল বিষাদ আর ছিল কিছু জিজ্ঞাসা।

“এখন ওরা আমার সঙ্গে কী করবে?”

"তোমার কি ভয় করছে?"

আরবের শরীর কাঠের মতো শক্ত হয়ে উঠল। তিনি চোখ ফিরিয়ে নিলেন।

“তোমার কি অনুশোচনা হচ্ছে?”

আরব হা হয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলেন—স্পষ্টতই কিছুই বুঝতে পারছিলেন না। দারুর বিরক্তি ক্রমে বেড়ে উঠল। একই সঙ্গে নিজের উপস্থিতি আর অস্বস্তি আরবকে ঘিরে ধরল। বড় শরীর নিয়ে তিনি দুটি বিছানার তেকোণা ফাঁকে জবুথবু হয়ে বসেছিলেন।

“ওখানে শুয়ে পড়ো,” দারু অধৈর্য হয়ে বললেন। "ওটাই তোমার বিছানা।"

আরবটি নড়লেন না। তিনি দারুকে ডাকলেন, “শুনুন!”

শিক্ষক তাঁর দিকে তাকালেন।

“জঁদার্ম কি কাল আবার আসবে?”

"জানি না।"

“আপনি কি তখন আমাদের সঙ্গে যাবেন?”

“আমি জানি না। কেন?”

বন্দি উঠে কম্বলের উপরেই লম্বা হয়ে শুয়ে পড়লেন। পা জানালার দিকে। বৈদ্যুতিক বাতির আলো সরাসরি তাঁর চোখে পড়ছিল, তিনি সঙ্গে সঙ্গে চোখ বন্ধ করলেন।

“কেন?”—দারু আবার জিজ্ঞেস করলেন, চৌকির সামনে দাঁড়িয়েই। সেই তীব্র আলোয় আরবটি পলক না ফেলার চেষ্টা করতে করতে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলেন।

“আমাদের সঙ্গে চলুন,” তিনি বললেন।

তখন মধ্যরাত। দারু এখনও ঘুমোতে পারেননি। সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে তিনি শুতে গেলেন—সাধারণত এভাবেই ঘুমাতেন। কিন্তু নিজের দেহকে পুরোপুরি অরক্ষিত অবস্থায় পেয়ে কিছুক্ষণ দ্বিধায় পড়লেন; মুহূর্তের জন্য আবার কাপড় পরার ইচ্ছা জাগল। কিন্তু কাঁধ ঝাঁকালেন—এর চেয়েও বেশি বিপদ তিনি আগেও দেখেছেন, এবং প্রয়োজনে প্রতিপক্ষের সঙ্গে লড়াইয়ে বিন্দুমাত্র পিছপা হতেন না।

নিজের চৌকি থেকে তিনি লোকটিকে দেখতে পাচ্ছিলেন—সে চিত হয়ে শুয়ে আছে, একেবারে স্থির, চোখ বন্ধ, তীব্র আলো তার মুখে পড়ছে। দারু যখন বাতি নিভিয়ে দিলেন, মনে হলো যেন অন্ধকার হঠাৎ জমে গিয়ে ঘরটাকে ঢেকে ফেলল। ধীরে ধীরে রাত আবার জীবন্ত হয়ে উঠল জানালার কাছে; সেখানে তারা-হীন আকাশটা মৃদু নড়াচড়া করছিল। শিক্ষক কিছুক্ষণ পর সামনে শুয়ে থাকা দেহটা স্পষ্ট করে দেখতে পেলেন। আরবটি এখনও নড়েনি, কিন্তু মনে হচ্ছিল তার চোখ খোলা।

একটা হালকা বাতাস স্কুলবাড়ির চারপাশে চুপচাপ ঘুরে যাচ্ছিল। হয়তো সেটা মেঘগুলোকে সরিয়ে দেবে, আবার সূর্য বেরোবে। রাত যত বাড়ল, বাতাস তত জোরে বইতে লাগল। মুরগিরা হালকা নড়েচড়ে উঠল, তারপর আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল। আরবটি কাত হয়ে শুয়ে আছে, পিঠটা দারুর দিকে ফিরিয়ে। দারুর মনে হলো যেন তিনি তাকে হালকা গোঙাতে শুনলেন।

তারপর তিনি কান পেতে অতিথির শ্বাস-প্রশ্বাস শুনলেন, যা ক্রমে আরও ভারী এবং নিয়মিত হয়ে উঠছিল। এই এত কাছে শ্বাসের শব্দ শুনতে শুনতে তিনি জেগেই রইলেন, আধো-স্বপ্নের মতো অবস্থায়, কিন্তু ঘুম এল না। এই ঘরে, যেখানে এক বছর ধরে তিনি একাই ঘুমিয়েছেন, অন্য একজন মানুষের উপস্থিতি তাঁকে অস্বস্তিতে ফেলছিল। এছাড়াও অন্য এক কারণে তিনি বিরক্তও হচ্ছিলেন—এই উপস্থিতি যেন তাঁকে এক ধরনের ভ্রাতৃত্বের অনুভূতি চাপিয়ে দিচ্ছিল, এমন কিছু যা এই পরিস্থিতিতে তিনি স্বীকার করতে চাইছিলেন না, যদিও ভালো করেই বুঝতেন তা কী।

মানুষ যখন একই ঘরে রাত কাটায়—সৈনিক হোক বা বন্দি—তারা এক ধরনের অদ্ভুত বন্ধনে জড়িয়ে পড়ে। যেন পোশাকের সঙ্গে সঙ্গে তাদের বর্মও খুলে যায়, আর প্রতি সন্ধ্যায় তারা নিজেদের সব পার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে স্বপ্ন ও ক্লান্তির সেই প্রাচীন মানবসমাজে আবার মিলিত হয়।

কিন্তু দারু নিজেকে ঝাঁকিয়ে নিলেন। তাঁর ভালো লাগছিল না এসব ভাবনা। এখন ঘুমোতে হবে।

তবু একটু পরে, আরব প্রায় অদৃশ্যভাবে নড়লেন, কিন্তু শিক্ষক এখনও ঘুমোতে পারলেন না। বন্দির দ্বিতীয় নড়াচড়ায় তিনি সতর্ক হয়ে শরীর শক্ত করে ফেললেন। আরবটি ধীরে ধীরে হাতের ওপর ভর দিয়ে উঠছিলেন—প্রায় নিদ্রাভ্রমণের মতো এক ভঙ্গিতে। খাটে বসে তিনি স্থির হয়ে রইলেন; দারুর দিকে মাথা ঘোরালেন না, যেন সমস্ত মনোযোগ দিয়ে কিছু শুনছেন। দারু নড়লেন না। তাঁর হঠাৎ মনে পড়ল, রিভলভারটা তাঁর টেবিলের ড্রয়ারে পড়ে আছে। এখনই কিছু করা ভালো। তবু তিনি বন্দিটিকে লক্ষ করতে থাকলেন। একই মসৃণ ভঙ্গিতে আরবটি পা দুটো মেঝেতে নামালেন, আবার একটু অপেক্ষা করলেন, তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াতে লাগলেন। দারু তাঁকে ডেকে উঠতে যাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই আরবটি হাঁটা শুরু করলেন—এবার চলনটা স্বাভাবিক, কিন্তু আশ্চর্যরকম নিঃশব্দ। তিনি ঘরের পেছনের দরজার দিকে গেলেন, যেটা খুলে যায় চালাঘরে। খুব সাবধানে কপাটের ছিটকিনি সরালেন, তারপর দরজাটা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে গেলেন; দরজাটা পিছনে ঠেলে দিয়ে, কিন্তু বন্ধ করলেন না। দারু নড়লেন না। তিনি শুধু ভাবলেন, “ও পালাচ্ছে। ভালোই হলো—যাক গে!”

তবু তিনি কান পেতে রইলেন। মুরগিগুলো নড়েনি—অর্থাৎ লোকটি এখন মালভূমির ওপরে। তারপর হঠাৎ একটু জলের শব্দ তাঁর কানে এল। আরব যখন আবার দরজার ফাঁকে দেখা দিল, তখনই তিনি বুঝলেন, এটা কীসের শব্দ। আরব সাবধানে দরজাটা বন্ধ করলেন এবং নিঃশব্দে শুয়ে পড়লেন। তখন দারু পিঠ ফিরিয়ে শুয়ে পড়লেন এবং ঘুমিয়ে গেলেন। আরও পরে, গভীর ঘুমের ভেতর থেকে তাঁর মনে হলো যেন স্কুলবাড়ির চারপাশে কারও চুপিচুপি পায়ের চাপা শব্দ শুনছেন। “আমি স্বপ্ন দেখছি, স্বপ্ন দেখছি,”—তিনি নিজেকে বলতে লাগলেন। আর তিনি ঘুমিয়েই রইলেন।

যখন তিনি জেগে উঠলেন, আকাশ তখন পরিষ্কার; ঠিকমতো বন্ধ না হওয়া জানালা দিয়ে ঠান্ডা, নির্মল বাতাস ঢুকছিল। আরবটি ঘুমোচ্ছিলেন—এবার কম্বলের নিচে গুটিসুটি মেরে, মুখটা আধখোলা, সম্পূর্ণভাবে নিজেকে ছেড়ে দিয়ে। কিন্তু দারু যখন তাঁকে ঝাঁকিয়ে তুললেন, তিনি ভীষণ চমকে উঠলেন—পাগলাটে চোখে দারুর দিকে তাকিয়ে রইলেন, যেন তাঁকে চিনতেই পারছেন না; মুখে এমন ভয়ের ছাপ যে শিক্ষক এক পা পিছিয়ে গেলেন।

“ভয় পেও না। আমি। খেতে হবে।”

আরবটি মাথা ঝাঁকালেন, তারপর বললেন, “হ্যাঁ।”

তাঁর মুখে আবার শান্তি ফিরে এসেছিল, কিন্তু তাঁর অভিব্যক্তি এখনও শূন্য আর বিমনা রয়ে গেল।

কফি তৈরি ছিল। দুজনেই ক্যাম্প-খাটে বসে কফি খেলেন, রুটির টুকরো কামড়াতে কামড়াতে। তারপর দারু আরবটিকে চালাঘরের নিচে নিয়ে গেলেন এবং তাঁকে জলের কলটা দেখালেন যেখানে তিনি মুখ-হাত ধুতে পারবেন। তিনি আবার ঘরে ফিরে এসে কম্বলগুলো ভাঁজ করলেন, ক্যাম্প-খাটটা গুছিয়ে রাখলেন, নিজের বিছানাটা ঠিক করলেন এবং ঘরটাকে গুছিয়ে দিলেন। তারপর স্কুলঘর পেরিয়ে তিনি বেরিয়ে এলেন সমতল প্রান্তরে।

সূর্য তখন ইতিমধ্যেই নীল আকাশে উঠেছে; কোমল অথচ উজ্জ্বল আলো প্লাবিত করে দিচ্ছে নির্জন মালভূমিটাকে। খাড়া ঢালু পথটায় এখানে-সেখানে বরফ গলতে শুরু করেছে। পাথরগুলো আবার দেখা দিতে শুরু করবে। মালভূমির এই কিনারায় বসে শিক্ষক সেই বিস্তীর্ণ শূন্যতার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর মনে পড়ছিল বালদুচ্চির কথা। তিনি তাঁকে কষ্ট দিয়েছেন; একরকম তাঁকে ফিরিয়ে দিয়েছেন—যেন একই দলে পড়তে তিনি রাজি নন। জঁডার্মের বিদায়ের কথা যেন এখনও কানে বাজছিল; কেন তা না জেনেই তিনি অদ্ভুতভাবে শূন্য আর বিপন্ন বোধ করছিলেন।

এই সময় স্কুলবাড়ির অন্য দিক থেকে বন্দির কাশি শোনা গেল। দারু শুনলেন—প্রায় অনিচ্ছায়। তারপর হঠাৎ রাগে একটা পাথর ছুড়ে দিলেন; সেটা বাতাসে শিস দিয়ে উড়ে গিয়ে বরফের মধ্যে ঢুকে গেল। লোকটার নির্বোধ অপরাধ তাঁকে ঘৃণায় ভরিয়ে তুলছিল; কিন্তু তাঁকে ধরিয়ে দেওয়া তাঁর সম্মানের বিরুদ্ধে—এমনকি সেই কথা ভাবতেই অপমানের তীব্রতায় তিনি যেন উন্মত্ত হয়ে উঠছিলেন। তিনি একই সঙ্গে অভিশাপ দিচ্ছিলেন নিজের লোকদের—যারা এই আরবটিকে পাঠিয়েছে—আর সেই আরবকেও, যিনি হত্যা করার দুঃসাহস দেখিয়েছেন কিন্তু পালাতেও পারেননি। দারু উঠে দাঁড়ালেন, কিছুক্ষণ পায়চারি করলেন, তারপর স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। অবশেষে তিনি আবার স্কুলবাড়িতে ঢুকে গেলেন।

চালাঘরের সিমেন্টের মেঝের ওপর ঝুঁকে আরবটি দুই আঙুল দিয়ে দাঁত মাজছিলেন। দারু কিছুক্ষণ তাঁকে দেখলেন, তারপর বললেন, “এসো।”

তিনি বন্দির আগে আগে ঘরে ঢুকলেন। সোয়েটারের ওপর শিকারির জ্যাকেটটা গায়ে চাপালেন এবং হাঁটার জুতো পরলেন। আরবটির শেশ আর স্যান্ডেল পরে নেওয়া পর্যন্ত তিনি দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করলেন।

তাঁরা ক্লাসঘর পেরিয়ে গেলেন, আর শিক্ষক সঙ্গীটিকে বেরোনোর পথ দেখালেন।  “যাও,” তিনি বললেন।

অন্যজন নড়ল না। “আমি আসছি,” বললেন দারু।

আরবটি বাইরে বেরিয়ে গেলেন। দারু আবার ঘরে ফিরে বিস্কুট, খেজুর আর চিনির একটা ছোট পুঁটলি বাঁধলেন। ক্লাসঘরে, বেরোনোর আগে, নিজের টেবিলের সামনে এক মুহূর্ত থমকে রইলেন; তারপর স্কুলের দোরগোড়া পেরিয়ে বাইরে এলেন এবং দরজাটা বন্ধ করে দিলেন।

“এই দিক দিয়ে,” তিনি বললেন।

তিনি পূবদিকের পথ ধরলেন, বন্দি তাঁকে অনুসরণ করলেন। কিন্তু স্কুল থেকে সামান্য দূরে গিয়েই মনে হলো যেন পেছন থেকে হালকা কোনো শব্দ শোনা গেল। তিনি ফিরে গিয়ে স্কুলের চারপাশে দেখলেন—কেউ নেই। আরবটি তাঁর কাজকর্ম লক্ষ্য করছিলেন, কিন্তু মনে হচ্ছিল কিছুই তাঁর বোধগম্য হচ্ছিল না।

“চলো,” বললেন দারু।

তাঁরা এক ঘণ্টা হেঁটে সূঁচের মতো দাঁড়িয়ে থাকা একটি চুনাপাথরের পাশে একটু বিশ্রাম নিলেন। বরফ দ্রুত গলছিল; সূর্য সঙ্গে সঙ্গে সেই জল শুষে নিয়ে মালভূমিটাকে পরিষ্কার করে দিচ্ছিল, যা ধীরে ধীরে শুকিয়ে গিয়ে বাতাসের মতোই ঝিলমিল করছিল।

তাঁরা আবার পথে নামলেন। মাটিতে পা পড়তেই শব্দ প্রতিধ্বনি করছিল। একটু দূরে একটি পাখি আনন্দে চিৎকার করে তাঁদের সামনে আকাশ কেটে উড়ছিল। দারু গভীর শ্বাসে শীতল আলো পান করছিলেন। পরিচিত সেই বিশাল প্রান্তরের সামনে তাঁর ভেতরে এক ধরনের উল্লাস জেগে উঠছিল—এখন প্রায় সম্পূর্ণ হলুদ হয়ে ওঠা ভূমি, আর তার ওপরে নীল আকাশের গম্বুজ।

আরও এক ঘণ্টা হাঁটার পর তাঁরা দক্ষিণ দিকে নেমে এসে পৌঁছলেন ঝুরঝুরে পাথরের এক চ্যাপ্টা উঁচু জায়গায়। সেখান থেকে মালভূমি পূর্বদিকে ঢালু হয়ে নেমে গেছে এক নিচু সমতলের দিকে—যেখানে কয়েকটি সরু গাছ দেখা যায়—আর দক্ষিণে ছড়িয়ে আছে পাথরের স্তূপ, যা এই প্রান্তরকে দিয়েছে এক অস্থির, খণ্ডিত রূপ।

দারু দুদিকেই তাকালেন। দিগন্তে ছিল শুধু আকাশ—কোথাও মানুষের চিহ্ন নেই। তিনি আরবের দিকে ফিরলেন; আরবটি তাঁর দিকে তাকিয়ে ছিলেন, কিছুই যেন বুঝতে পারছেন না। দারু তাঁর হাতে একটা পোটলা দিলেন।

“এটা নাও,” তিনি বললেন। “খেজুর, রুটি, চিনি—দুদিন চলবে। আর আছে এক হাজার ফ্রাঁ।”

আরবটি পোটলা আর টাকা নিলেন, কিন্তু দুহাত বুকের কাছে ধরে রইলেন, যেন কী করবেন বুঝতে পারছেন না।

“এখন দেখ,” দারু বললেন, তাঁকে পূর্বদিক দেখিয়ে, “ওটাই তিঙ্গুইয়ের রাস্তা। হাঁটতে প্রায় দুই ঘণ্টা লাগবে। সেখানে প্রশাসন আর পুলিশ তোমার অপেক্ষায় আছে।”

আরব পূর্বদিকে তাকালেন, এখনও পোটলা এবং টাকাটা বুকের কাছে ধরা। দারু তাঁর কনুই ধরে একটু রূঢ়ভাবে তাঁকে দক্ষিণ দিকে ঘুরিয়ে দিলেন। নিচে একটি আবছা পাকদণ্ডি খাঁজ কেটে কেটে চলে গেছে।

“ওটা মালভূমি পার হওয়ার পথ। এখান থেকে এক দিনের হাঁটাপথে তুমি চারণভূমি আর যাযাবরদের প্রথম বসতিতে পৌঁছবে। তারা তোমাকে স্বাগত জানাবে এবং তাদের নিয়ম অনুযায়ী আশ্রয় দেবে।”

এবার আরব দারুর দিকে ফিরলেন; তাঁর মুখে এক ধরনের আতঙ্ক ভেসে উঠল। “শুনুন,” তিনি বললেন।

দারু মাথা নাড়লেন। “না, চুপ থাকো। এখন আমি তোমাকে ছেড়ে দিচ্ছি।”

তিনি পিঠ ঘুরিয়ে স্কুলের দিকে বড় বড় দুপা এগোলেন, আরবকে অচল দেখে নির্দিষ্ট দৃষ্টিতে তাকালেন এবং চলে গেলেন। কয়েক মিনিট ধরে তিনি আর কোনো শব্দ শোনেননি, শুধু নিজের পায়ের শব্দ—ঠান্ডা মাটিতে ভেসে চলছিল। মাথা না ঘুরিয়ে চলতে থাকলেন।

কিছুক্ষণ পরে তিনি ফিরে তাকালেন। আরব তখনও সেখানেই ছিলেন, পাহাড়ের কিনারায়, এখন হাত নীচে ঝুলছে, এবং দারুর দিকে তাকিয়ে আছেন। দারু অনুভব করলেন, যেন গলা দিয়ে কিছু একটা দলা পাকিয়ে উঠছে। কিন্তু তিনি ধৈর্য ধরে একটি বড় অঙ্গভঙ্গি দেখালেন এবং আবার রওনা দিলেন।

তিনি ইতিমধ্যেই অনেক দূরে চলে গিয়েছিলেন, যখন আবার একবার ফিরে তাকালেন। পাহাড়ে আর কেউ ছিল না। দারু একটু দ্বিধা করলেন। সূর্য তখন আকাশে বেশ উঁচুতে উঠে গেছে এবং তাঁর কপাল পুড়িয়ে দিতে শুরু করেছে।

শিক্ষক ফিরে চললেন সেই ছোট পাহাড়টির দিকে—প্রথমে কিছুটা দ্বিধায়, তারপর দৃঢ় পায়ে। সেখানে পৌঁছতে পৌঁছতে তিনি ঘামে ভিজে গেলেন। দ্রুত উঠে গেলেন উপরে এবং চুড়ায় দাঁড়িয়ে হাঁফাতে লাগলেন। দক্ষিণে পাথরের বিস্তার নীল আকাশের পটভূমিতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল, আর পূর্বদিকে সমতলের ওপর ইতিমধ্যেই তাপের হালকা কুয়াশা উঠেছে। দারু, বুকটা হঠাৎ আঁটসাঁট হয়ে উঠতে অনুভব করে, দেখতে পেলেন—সেই হালকা আবছায়ার মধ্যে আরব ধীরে ধীরে জেলের পথেই এগিয়ে চলেছেন।

কিছুক্ষণ পরে, ক্লাসঘরের জানালার সামনে দাঁড়িয়ে শিক্ষক তাকিয়ে ছিলেন—কিন্তু যেন না দেখেই—আকাশের উঁচু থেকে লাফিয়ে নেমে আসা সকালের নতুন আলো-কে, যা মালভূমির সমগ্র পৃষ্ঠ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ছিল। তাঁর পেছনে, ব্ল্যাকবোর্ডে, ফ্রান্সের নদীগুলোর আঁকাবাঁকা রেখার মাঝখানে, এক অদক্ষ হাতে চকে লেখা ছিল একটি বাক্য, যা তিনি একটু আগেই পড়েছেন: “তুমি আমাদের ভাইকে ধরিয়ে দিয়েছ। এর মাশুল তোমাকে দিতে হবে।”

দারু তাকিয়ে রইলেন আকাশের দিকে, মালভূমির দিকে, আর তারও ওপারে—সেই অদৃশ্য ভূমিগুলোর দিকে, যা দূরের সমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত।

এই বিশাল দেশে, যাকে তিনি এত ভালোবেসেছিলেন, তিনি একা।

 

0 Comments
Leave a reply