জলি বাগচি: নির্ভয় গানের উড়ান

লিখেছেন:বিপ্লব নায়ক
জলি বাগচি। ছয় দশক ধরে গানের সঙ্গে বসত করা। কখনও বিদ্রোহে-বিপ্লবে, কখনও বা দুঃখ-আশা-প্রেম-যন্ত্রণার পোড়ামাটি প্রকাশে। কখনও যৌথ দলবদ্ধ পরিবেশনায়, কখনও বিজন সুরসাধনায়। তিনি চলে গেলেন। তাঁর জীবনকে ফিরে দেখার জন্য এই দৃকপাত।

১৯৩৯ সালের ১৮ই জানুয়ারি ময়মনসিংহের নেত্রকোণায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন জলি বাগচি। বাংলায় তখন থাবা গেড়ে বসেছে ব্রিটিশ শাসকদের যুদ্ধনীতি থেকে উদ্ভূত ভয়াল পঞ্চাশের (১৯৪৩) মন্বন্তর। তার পিছু পিছু এলো ১৯৪৪ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, ১৯৪৭ সালের দেশভাগ। সেই দুর্যোগময় অন্ধকার সময়ে খড়কুটোর মতো ছিন্নমূল হয়ে শরণার্থী হয়েছিলো হাজার হাজার মানুষ, ভেঙে পড়েছিলো একের পর এক পরিবার। সেই সর্বনাশের স্রোতে ভেসে ১৯৪৮ সালে নয় বছর বয়সী কিশোরী দ্বিখণ্ডিত বাংলার ওপার থেকে এপারে এসে ঠাঁই পেয়েছিলো যাদবপুরে তার যাদবপুর-বিশ্ববিদ্যালয়-পড়ুয়া দাদার আস্তানায় (নতুন গড়ে ওঠা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম অবশ্য তখনও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় হয়নি)। কঠিন সময়ের চোখে চোখ রেখে, আগ্রাসী বিরূপতার চোখরাঙানি অগ্রাহ্য করে জীবনকে গড়ে তোলার যে অফুরান জীবনীশক্তি, তার বোধন সেই কিশোরীর মধ্যে সেই লগনেই হয়ে গিয়েছিলো। আত্মসত্তা গঠন ও প্রকাশের মাধ্যম বিভিন্ন মানুষ বিভিন্ন কিছুর মধ্য দিয়ে খুঁজে নেয়, সেই কিশোরী তা খুঁজে নিয়েছিলো সুর-তাল-গানের মধ্য দিয়ে। ভারতীয় রাগ সঙ্গীতের একটি ঘরানায় তাঁর সঙ্গীতি তালিমের শুরু। ক্রমশ প্রাচ্য রাগসঙ্গীত ও রবীন্দ্রসঙ্গীত উভয়েই খেতাব-সহ প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি অর্জন করেন। কিন্তু সেই যৌবনেই তাঁর গান ডানা মেলে ঝড়ের আকাশে--- পথে-ঘাটে-মিছিলে গণসঙ্গীতেই যেন তাঁর কন্ঠ নির্ভয়ে ওড়ার আকাশ খুঁজে পায়।

তীব্র খরা, শস্যোৎপাদন হ্রাস, সরকারি অব্যবস্থাপনা (গোদের উপর বিষফোড়ার মতো রেশনে মাথাপিছু চালের পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া) যে সমাজ-রাজনৈতিক সংকটের জন্ম দিয়েছিলো তা সেই ১৯৬৬ সালে তীব্র গণ-আন্দোলন রূপে ফেটে পড়ে, বামপন্থী রাজনৈতিক সংগঠনগুলো সেই গণ-আন্দোলনে নেতৃত্বের জায়গায় উঠে আসে। সেই তীব্র টালমাটালের সময়ে জলি বাগচী দক্ষিণ কলকাতার একটি সাংস্কৃতিক দল ‘ঋত্বিক’-এর একজন।  সেই দল বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী পার্টির দৃষ্টিভঙ্গির অনুসারী হয়ে পথে নেমে মিছিলে মিশে তাদের গান ও নাটক হাজির করতো। বহু নতুন নাটক ও গান তারা তৈরি করেছিলো। তার একটি গান, সমরেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ও সুর দেওয়া ‘যারা কাফেতে মোড়েতে বসে আছো আমি তোমাদের ছেড়ে চললাম…’ আজও নানা প্রতিবাদী অনুষ্ঠানে-সমাবেশে গাওয়া হয়ে থাকে। সেই ‘ঋত্বিক’-এ জলি বাগচি (তখন গুপ্ত) ছিলেন অন্যতম প্রধান কন্ঠ। ক্রমে খাদ্য আন্দোলনের ঢেউ যখন থিতিয়ে গেলো, বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর গরিষ্ঠ অংশ তাদের নবলব্ধ জনপ্রিয়তাকে ভোটে জিতে সরকারি গদি দখল করার ছক তৈরিতে কাজে লাগানোর জন্য নামলো, ঝড়ের খেয়া যেন থমকে দাঁড়ালো। সরকার-পরিচালনায় যাওয়া না-যাওয়া নিয়ে বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যেমন ফাটল ধরলো, ভাঙন শুরু হলো, তেমনই সেই দলগুলোর সহযাত্রী সাংস্কৃতিক কর্মীদের মধ্যেও সক্রিয়তানাশী সন্দেহ-অবিশ্বাস-ফাটল তৈরি হলো। ‘ঋত্বিক’ দলটিও ভেঙে গেলো।

বাংলার বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর বড়ো অংশের ভোটে জিতে সরকার গঠন-পরিচালনার কাজে নিজেদের আত্মনিয়োগ করার বিপ্রতীপে অন্য একটি ধারাও তখন গড়ে উঠছিলো। ১৯৬৭ সালে নক্সালবাড়ির কৃষক অভ্যুত্থানের অভিঘাতে সেই জায়মান ধারা সংসদীয় রাজনীতির খেলায় নামার বদলে বিপ্লব সংঘটনের মধ্য দিয়ে শ্রমিক-কৃষক রাজ কায়েম করাকেই কর্তব্য বলে স্থির করেছিলো। আন্তর্জাতিকভাবে চীন বিপ্লবের নানা ঘটনাবলী, ভিয়েতনাম যুদ্ধ, কিউবার বিপ্লবের অভিঘাতও এই ধারাটিকে পুষ্ট করছিলো। নতুন গড়ে ওঠা মার্কসবাদী-লেনিনবাদী কম্যুনিস্ট পার্টির পাশাপাশি পুরোনো বামপন্থী পার্টিগুলো থেকে বেরিয়ে আসা বেশ কিছু মার্কসবাদী-লেনিনবাদী গ্রুপ সংগঠন শ্রমিক ও কৃষকদের মধ্যে এই বিপ্লবী ধারায় সংগ্রাম ও সংগঠন বিস্তার করায় উদ্যোগী হয়। এমনই একটি গ্রুপ সংগঠন গড়ে উঠেছিলো ‘সন্ধিক্ষণ’ পত্রিকাকে ঘিরে। জলি বাগচি সেই গ্রুপ সংগঠনে কর্মী হিসেবে আত্মনিয়োগ করেন। সর্বক্ষণের রাজনৈতিক কর্মী সন্ধিক্ষণ পত্রিকার সম্পাদক সন্দ্বীপ বাগচি তখন তাঁর জীবনসঙ্গী। তিনি, সন্দ্বীপ বাগচি, সুভাষ রায় ও ছুটি রায় চারজন রাজনৈতিক কর্মী একসাথে একটা ছোটো ভাড়া ঘরে হাজরা-বালিগঞ্জ এলাকায় তখন থাকতেন, ঘরে একটাই শোয়ার চৌকি, তাঁদের কোনো অভাববোধ ছিলো না। এরকমই এক সময়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে গ্রন্থাগারিকের চাকরি তিনি পান। চাকরি করেও বাকি সময়টা বিভিন্ন এলাকার শ্রমিক মহল্লায় রাজনৈতিক কাজে ছুটে বেড়াতে কোনো অসুবিধা তাঁর হয়নি। ইতিমধ্যে তাঁর রাজনৈতিক সঙ্গীরা তাঁকে প্রস্তাব দেন গণসঙ্গীতের একটা দল গড়ে তোলার, ‘ঋত্বিক’-এর সুবাদে যার কিছু অভিজ্ঞতা তাঁর আগে থেকেই থাকায় তাঁকেই অগ্রণী ভূমিকা নিতে বলা হয়। ১৯৭৭ সাল। জলি বাগচি ও তাঁর সঙ্গীসাথীরা গড়ে তোলে সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘গণবিষাণ’। মাঠে-ঘাটে কারখানার গেটে গান ও নাটকের মধ্য দিয়ে বিদ্রোহ-বিপ্লবের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়াই ছিলো তার কাজ। এই ২০২৬ সালেও সেই ‘গণবিষাণ’ এখনও টিকে আছে। গণবিষাণের গান বাংলার প্রতিবাদী সংস্কৃতির ধারায় স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে। সেই গানের ধারার গভীর প্রাণোচ্ছলতাকে একবার ফিরে দেখা যাক।

বিশ শতকে সত্তর দশকের শেষকাল। জরুরী অবস্থার বজ্রআঁটুনি সবে আলগা হয়েছে। কলকাতার রাস্তায় রাজনৈতিক বন্দীমুক্তি আন্দোলনের ঢেউ ফুলেফেঁপে উঠছে। এই পরিবেশে এই আন্দোলনের প্রসূতিগৃহেই পূর্ববর্তী বিপ্লবকামী বামপন্থী সাংস্কৃতিক আন্দোলনের বংশ-পরম্পরা থেকে গণবিষাণের জন্ম। ‘ওরা ভগৎ সিং-এর ভাই, ওরা ক্ষুদিরামের ভাই, সমস্ত রাজবন্দীদের মুক্তি চাই’ (১৯৭৭)— বন্দীমুক্তি আন্দোলনের স্বাক্ষর-সুর হয়ে ওঠা এই গান নবজাতক গণবিষাণেরও হয়তো প্রথম আত্মঘোষণা।

জন্মলগ্ন থেকেই গণবিষাণের রাজনৈতিক কুলজি অতি স্পষ্ট। মার্কস-এঙ্গেলস-লেনিন-স্তালিন-মাও-কে মহান পঞ্চশিক্ষকের আসনে বসিয়ে শ্রমিকশ্রেণির রাজ কায়েমের লক্ষ্য নিয়ে যে রাজনৈতিক চর্চা, গণবিষাণ তারই সহযাত্রী। ফলতঃ, একদিকে আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের উত্তরাধিকার, অন্যদিকে বিপ্লবী বামপন্থার দৃষ্টিকোণ থেকে ভারতের শ্রমিক ও কৃষক আন্দোলন--- এই দুই উৎস থেকে গণবিষাণ তার সৃজন ও শিল্প-পরিবেশনার রসদ সংগ্রহ করেছে। প্রথম ১৪ বছর (১৯৭৭–১৯৯০) সময়পর্যায়ে গণবিষাণের গানের দিকে তাকালে এই দুই উৎসের প্রভাববিন্যাস আমরা এভাবে দেখতে পাই:

আন্তর্জাতিক উত্তরাধিকার

১। কমরেড বলে ডাক দিলে কেউ কমরেড বলে ডাক (১৯৭৮, তৃতীয় দুনিয়ার উত্তাল আন্দোলনের ঢেউয়ে সওয়ার হওয়ার ডাক দিয়ে গান)

২। দুর্জয় গিরিশৃঙ্গ/হয় হোক উত্তুঙ্গ (১৯৭৯, চীনের লালফৌজের কীর্তি নিয়ে গান)

৩। আজ মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে দুটো দল (১৯৮০-র দশক, আমেরিকার কেন্টাকি অঞ্চলের কয়লাখনি ধর্মঘটের নেতা জিম রিভস-এর স্ত্রীর লেখা গানের অনুবাদ)

৪। আমি নিজের জন্য গর্বিত (১৯৮৬, বেঞ্জামিন মোলায়েজ-এর গানের অনুবাদ)

৫। ইস্পাত গান গায় ঠিকঠাক আমাদের হাতে (১৯৮৬, বেঞ্জামিন মোলায়েজ-এর গানের অনুবাদ)

৬। এক সুন্দরীর পথ চেয়ে আছি বহুকাল (১৯৮০-র দশক, ফ্রান্সে পারী কম্যুনের আগে প্রজাতন্ত্রেরর বাসনা প্রকাশ করে লেখা ইউজিন পতিয়ের-এর গানের অনুবাদ)

৭। এতদিন কত ভালোবাসা ভরে বলেছি তোমার নাম (১৯৮০-র দশক, চীন ভিয়েতনাম আক্রমণ করার পর ভিয়েতনামকে রুশ সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের দালাল বলে সমালোচনা করে গান)

৮। আমাদের জামা যখন ছিঁড়তে থাকে (১৯৮০-র দশক, ১৯৩০-৩১ সালে জার্মানিতে আপোষকামী নেতৃত্বের বিরুদ্ধে শ্রমিকদের গান হিসেবে বার্টোল্ট ব্রেখটের গানের অনুবাদ)

৯। বলব কি আর দাদা/ সব উকিলগুলো গাধা (১৯৮৪, চার্টিস্ট আন্দোলনের একটি কবিতায় সুর দিয়ে গান)

 

বিপ্লবী বামপন্থী দৃষ্টিকোণে ভারতের পরিস্থিতি

১। পোড়া দেশে আইলো যে আকাল রে (১৯৭৮, জোতদার সরকারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অঙ্গীকার নিয়ে গান)

২। আমরা রেলের মজদুর এই রেল আমরা চালাই (১৯৭৮, ভারতবর্ষ কঁাপিয়ে দেওয়া রেল ধর্মঘটের একজন শরিকের লেখা গান)

৩। আন্ধারে কে গো, আন্ধারে কে (১৯৭৮-৭৯, জমিদারের নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের হাঁক দিয়ে গান)

৪। আজি পরানের বড় দুখ দিদি গো (১৯৭৮, বন্যা-খরার দুর্যোগ ও নিষ্কর্মা সরকারের বিরুদ্ধে লড়ে বাঁচার ডাক দিয়ে গান)

৫। কেন খরা ও বন্যা আসে বছর বছর (১৯৭৮, চীনে বিপ্লবের পর বন্যা-খর নিয়ন্ত্রিত হয়েছে, ভারতে তবে কেন হয়নি, এই প্রশ্ন তুলে গান)

৬। চাই না মিছিল হাজারো অশ্বখুরে (১৯৭৮, আন্দোলনের সাথীদের খুনে লাল স্বদেশে মে-দিনের আদর্শে শ্রমিকদের লড়াই গড়ার আহ্বান, একইভাবে মে-দিনের আদর্শকে তুলে ধরে আরো কিছু গান এই সময়পর্যায়ে তৈরি হয়েছে)

৭। বিরুদ্ধতার চাবুক ওঠাও হাতে (১৯৭৮, পুঁজিপতি, জমিদার ও মার্কিন-সোভিয়েত সাম্রাজ্যবাদের শোষণরাজের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান)

৮। জয় জয় জয় মোদের লাল নিশানের জয় (১৯৭৯, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মুছে দাঁড়িয়ে লাল-নিশান-ধারী মজুর-কিষাণ আন্দোলনের আহ্বান)

৯। মজদুর কি হ্যায় জিন্দেগানি তেরি (১৯৭৯-৮০, মজদুরদের নিজেদের লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে নিজেদের আজাদী ছিনিয়ে নেওয়ার আহ্বান)

১০। হম হৈ দুনিয়াকা মেহনত কস্ ইনসান (১৯৭৯-৮০, পূর্ববর্তী বাংলা গানের হিন্দি অনুবাদ, বাংলায় অন্যান্য প্রদেশ থেকে আসা শ্রমিকদের দুরবস্থা বর্ণনা করে গান)

১১। জিনা হ্যায় তো সব মিলকর (১৯৭৯-৮০, ধর্মীয় ও অন্যান্য বিভেদ মিটিয়ে মেহনতীদের লড়াইয়ের ঐক্য গড়ে তুলে দুষ্মন-এর বিরুদ্ধে হাতিয়ার তুলে নেওয়ার আহ্বান)

১২। কালকি বাতেঁ ভুল যাও, ভুল যাও ভেদ পুরানী (১৯৮০, জাত-পাত-ধর্মের বিভাজনের পিছুটান ভুলে নয়া জমানা তৈরির জন্য মেহনতীদের ঐক্য গঠনের আহ্বান)

১৩। অব সাহিল তেরা দূর নহি (১৯৭৯-৮০, দুর্যোগপূর্ণ প্রতিকূল পরিবেশে হতোদ্যম না হয়ে অচিরেই লক্ষ্য হাসিল করার বিশ্বাস নিয়ে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান)

১৪। আজ তুঝে এক কহানী শুনাউ (১৯৮০, জরুরী অবস্থার সময়কালীন ইন্দিরা গান্ধীর স্বৈরতন্ত্রেরর বিরুদ্ধে গান, এমন গান আরো একটি অন্তত বাংলা ভাষায় তৈরি হয়েছিল)

১৫। এখন আর কোরো না কো এটা চাই ওটা চাই (১৯৮০-র দশক, বিভিন্ন জনজাতি গোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের দাবিতে আন্দোলন থেকে শ্রমিক-কৃষকের আন্দোলনের উপর বিচ্ছিন্নতাবাদের তকমা সেঁটে দিয়ে রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন নামিয়ে আনার বিরুদ্ধে খাঁটি গণতন্ত্রেরর জন্য লড়াইয়ের আহ্বান)

১৬। এমন দেশে জনম মোদের বলব কি আর ভাই (১৯৮০-র দশক, বেকারি-মূল্যবৃদ্ধি-বন্যা-খরা-লকআউট-এর নাগপাশে মানুষকে বেঁধে রেখে নেতারা গদিতে বসে সমাজবাদের বুকনি ঝাড়ছেন— তাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পথ বেছে নেওয়ার আহ্বান)

১৭। দুটি পাতা একটি কুঁড়ি টুক্রি ভরে যায় (চা-বাগানের নারী শ্রমিকদের দুরবস্থা নিয়ে গান, নারী শ্রমিকদের নিয়ে আরো দুটি গান অন্তত এই সময় হয়েছিল)

১৮। গুপ্তিপাড়ার সেই ছোট্ট মেয়ে (১৯৮৩-৮৪, পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারী-নির্যাতন নিয়ে গান, নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে এমন আরও কয়েকটি গান এই সময়পর্যায়ে তৈরি হয়েছিল)

১৯। পায়ের নিচে ফুঁসছে মাটি (১৯৮৬, দুঃশাসনের গড় উপড়ানো বিদ্রোহের মধ্যেই মানুষ নামের আসল পরিচয়— এই কথা তুলে ধরে বিদ্রোহের ডাক)

২০। দুঃখে পরান জ্বলে ও বোন (১৯৮৭-৮৮, পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্টের শাসনকালীন শ্রমিক-পরিবারের অন্ধকার দিন নিয়ে গান)

২১। কেন এখনও অন্ধকারে হাতড়ে বেড়াও সাথী (১৯৮৮, বিদ্রোহী যেন রণক্লান্ত, নিরাশা-হতাশা ভারী বোঝা হয়ে উঠছে— তা ঝেড়ে ফেলে বাকি যুদ্ধে সামিল হওয়ার আহ্বান)

 

উপরের সারণির দিকে চোখ রাখলে কী কী বিষয় খেয়াল করা যেতে পারে দেখা যাক।

সত্তরের দশকে (১৯৭৭-৮০) গণবিষাণের সৃজনীতে আন্তর্জাতিক উত্তরাধিকার প্রসূত গানের চেয়ে ভারতীয় পরিস্থিতি নিয়ে গান অনেক বেশি। প্রথম ধরনের গান যেখানে ২-টি, সেখানে দ্বিতীয় ধরনের গান ১৩-টি। আশির দশকে এসে প্রথম ধরনের গান তুলনায় বাড়ছে— সেখানে প্রথম ধরনের গান ৭-টি, দ্বিতীয় ধরনের গান ৮-টি। এই ফারাকের পিছনে কাকতালীয় নয় এমন কিছু কারণ কাজ করেছে কি? অনুমানের চেষ্টা করা যাক।

আমরা জানি যে সত্তরের দশক মুক্তির দশক হিসেবে ঘোষিত হয়েছিল। বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মী ও তাদের সহগামীদের মধ্যে এই বিশ্বাস জোরালো ও সর্বময় ছিল যে অতি দ্রুতই বিপ্লব ঘটে যাবে, শ্রমিক-কৃষকের পার্টি ক্ষমতা দখল করবে। সাধারণভাবে দেশের পরিস্থিতিকে তঁারা বিপ্লবী পরিস্থিতি হিসেবে দেখছিলেন এবং বিপ্লবী কম্যুনিস্ট পার্টির ডাকে ও নেতৃত্বে ব্যাপক শ্রমিক-কৃষক আন্দোলনে অবতীর্ণ হবে বলে বিশ্বাসী ছিলেন। ১৯৭০-এর দশকের গণবিষাণের দেশীয় পরিস্থিতি নিয়ে গানেও কি সেই ছাপই আমরা দেখছি না? জাতপাত-ধর্ম-বর্ণের বিভেদকে অতিক্রম করে নতুন সমাজ তৈরির আহ্বানই বারবার বিভিন্ন প্রেক্ষিতে আবেগ ও প্রত্যয়ের সঙ্গে ধ্বনিত হয়েছে, রেল শ্রমিকদের ধর্মঘটকে সেই আসন্ন বিপ্লবের পূর্বাভাস হিসেবেই উদযাপন করেছে। এই প্রত্যাশা ও প্রত্যয়ই দেশীয় পরিস্থিতিতে লড়াইয়ের আহ্বান হাজির করাকে সৃজনচেতনায় প্রধান করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষিতে তাই অতো জোর পড়েনি। কেবল তৃতীয় বিশ্বের বিপ্লবী ঘনঘটার প্রত্যাশা ও লাল চীনের নেতৃত্বদায়ী ভূমিকায় আস্থা ঘোষণা দুটি গানের বিষয় হয়েছে।

অন্যদিকে, আশির দশকের দেশীয় পরিস্থিতি নিয়ে গানগুলো বিচার করলে আমরা দেখব যে সেখানে ক্রমশ একটা অন্য সুর জায়গা করে নিচ্ছে। সেই সুর হল বাইরের প্রকোপ (রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, বন্যা-খরা, মূল্যবৃদ্ধি-বেকারি) ও ভিতরের অসুখ (জাত-পাত-ধর্ম-বর্ণের বিভেদবোধ, পুরুষ-প্রভুত্ব, ‘বিচ্ছিন্নতাবাদ’-এর প্রশ্ন)— এই দুইয়ের মুখে শ্রমিক-কৃষক আন্দোলন যেন কিছুটা রোগন্যুব্জ, বিপ্লবী সম্ভাবনার তালও যেন বা কেটে যাচ্ছে, তাই জোরালো হচ্ছে এই প্রকোপ কাটিয়ে বিপ্লবী প্রত্যয় ও শক্তি ফিরিয়ে আনার আর্তি। সেইজন্যই বোধহয় এই আশির দশকের পর্যায়ে আন্তর্জাতিক উত্তরাধিকারের উপর তুলনায় বেশি জোর পড়েছে, উজ্জ্বল উদাহরণকে তুলে এনে দেশকালের অসুখের নিরাময় চেষ্টা করা হয়েছে। রিভস-এর স্ত্রীর গান, বেঞ্জামিন মোলায়েজ ও ব্রেখটের কবিতা এভাবেই গণবিষাণের তূণীরে যুক্ত হয়েছে।

আরেকটি বিষয়ও খেয়াল করা যায়। ১৯৭৯-৮০ থেকে পরবর্তী কয়েক বছর বেশ কিছু হিন্দি গান (কখনও হিন্দিতেই রচিত, কখনও পূর্ববর্তী বাংলা গানের হিন্দিতে অনুবাদ) গণবিষাণ হাজির করেছে, বাংলার কারখানা-অঞ্চলে কাজ করতে আসা অ-বাংলাভাষী শ্রমিকদের সমস্যাও গানের বিষয় হয়ে উঠেছে। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে কারখানার গেটে শ্রমিক-অবস্থানে বা মে-দিবস পালনের অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার উপর জোর পড়া এবং সেখানে অ-বাংলাভাষী শ্রমিকদের সঙ্গে যোগাযোগের সেতু গড়ার তাগিদই বোধহয় এখানে কাজ করেছে।

শেষত বলা যায় যে বিপ্লবী আবেগ ও প্রত্যয়ের ভরা কোটাল থেকে থিতিয়ে আসা নদীর ভিতর দিকে মুখ ফিরিয়ে আত্মবিশ্লেষণমুখী চলন অবধি এই যাত্রায় গণবিষাণের গানের বিষয়বৈচিত্র্য ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়েছে। শ্রমিকদের দৈনন্দিন সমস্যা, নারী-শ্রমিকদের কথা, পুরুষ-প্রভুত্বের রোগজীবাণু, জাতপাত-ধর্মের বিভেদ-বিষ--- গণবিষাণের গান ক্রমশ এসবের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মোকাবিলা করতে প্রয়াসী হয়েছে।

 এরপর এলো ১৯৯০-এর দশক। কিছুদিন আগেই চীনের তিয়েন আন মেন স্কোয়ারে গণতন্ত্রের দাবিতে অবস্থানরত ছাত্রছাত্রীদের দমন করতে চীনা কম্যুনিস্ট পার্টির নির্দেশে সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া গাড়ি নির্মম অভিযান চালিয়েছে। আর তার কিছুদিনের মধ্যেই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়লো সোভিয়েত ইউনিয়ন। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিভিন্ন খণ্ডরাজ্যে কম্যুনিস্ট পার্টির প্রতি তীব্র ক্ষোভ ও ঘৃণা নিয়ে প্রচুর মানুষের রাস্তায় নেমে আসার ছবি উঠে এলো। পূর্ব ইউরোপের সোভিয়েত-সমর্থিত কম্যুনিস্ট সরকারগুলোর বিরুদ্ধেও সেসব দেশের আপামর মানুষের তীব্র বিক্ষোভ ফেটে পড়ে তাদের পতন ডেকে আনলো। ভেঙে পড়লো বার্লিনের প্রাচীর--- পুঁজিবাদী জার্মানি ও সমাজতান্ত্রিক জার্মানির মধ্যে বিভাজনরেখা মুছে গেল। বিশ্বজুড়ে সমাজতন্ত্র গড়ার স্বপ্ন নিয়ে ইতিহাসের সাগর পাড়ি দেওয়া মানুষরা সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনকে দুটি অজর আলোকস্তম্ভ হিসেবে সামনে রেখেছিল, সেই দুটি আলোকস্তম্ভই ইতিহাস-সাগরের ফেনিল তরঙ্গোচ্ছাসে ভেঙে পড়ল। আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন যে একটা বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে, তা নিয়ে আর তখন সন্দেহ নেই। কিন্তু সেই বিপর্যয়ের ব্যাপ্তি ও গভীরতা নিয়ে তখন নানা প্রশ্ন, নানা সংশয়। ভুল শুধরে তো আবার ঘুরে দাঁড়াতে হবে। কিন্তু ভুল কোথায়? ভুল কি শুধু তত্ত্বের প্রয়োগে, নাকি ভুল তত্ত্বের ভিতরেও খুঁজতে হবে? মার্কস-এঙ্গেলস-লেনিন-স্তালিন-মাও--- এই যে পঞ্চশিক্ষক প্রশ্নের ঊর্ধ্বে ছিলেন, এখনও কি সেভাবেই ভাবা সমীচীন হবে, নাকি তঁাদেরও এবার প্রশ্ন করতে হবে? ১৯৯০ সালে লাল পতাকা হাতে রাজনৈতিক লড়াইয়ের ময়দানে নামলে এই প্রশ্নগুলো খেপা ষাঁড়ের মতো তাড়িয়ে ফিরবেই। সত্তর বা আশির দশকে লাল-পতাকা-ধারী রাজনৈতিক কর্মীরা মতাদর্শের সঠিকতা ও চূড়ান্ত সাফল্যের নিশ্চয়তা সম্পর্কে যে আশ্বস্তকারী প্রত্যয় নিয়ে কাজ করতে পারতেন, নব্বইয়ের দশকে লাল-পতাকা হাতে নেওয়া কর্মীদের পক্ষে তা সম্ভব ছিল না। রাজনৈতিক অঙ্গনে সংক্রমণের মতো ছড়িয়ে পড়ছে একদিকে মতাদর্শ ঘিরে সংশয় ও অন্যদিকে মতাদর্শহীনতার মড়ক। নিজেদের মতো একটা দাঁড়াবার জায়গা তৈরি না করে নিলে সেখানে টেকা দায়। গণবিষাণ তার মতো করে একটা দাঁড়ানোর জায়গা তৈরি করে নিয়েছিলো, তা এইরকম: মার্কসীয়-লেনিনীয় মতাদর্শ মূলত অভ্রান্ত, তার ভুল প্রয়োগই বিপর্যয় ডেকে এনেছে, মার্কসীয়-লেনিনীয় তত্ত্বকে সঠিকভাবে আয়ত্ত করে তার সঠিক প্রয়োগের মধ্য দিয়েই বিপর্যয় কাটিয়ে অগ্রগতির পথ খুলবে, সেই প্রয়োগ করবে নতুনভাবে উঠে দাঁড়ানো শ্রমিকশ্রেণি, সুতরাং শ্রমিকশ্রেণির সেই অনাগত চর্চার আবাহন করাই এখন কাজ। এই অবস্থান থেকেই গণবিষাণ তার গান তৈরি ও পরিবেশনের ধারা সজীব রেখেছিলো। রাস্তার মোড়ে পথসভায়, কারখানার গেটে শ্রমিক-লড়াইয়ের ছাউনিতে বা প্রেক্ষাগৃহের সাজানো আসরে যেখানেই পরিবেশিত হোক না কেন, গণবিষাণের গান প্রত্যয় ও বিশ্বাসের এমন এক ওম উপহার দিত যা আমরা দৈনন্দিন পারিপার্শ্বিক থেকে সরাসরি পাওয়া যেতো না, যা বোধহয় সত্তরের সেই ভরা কোটালের সময়ের অবশেষ হিসেবে গণবিষাণের গানের মধ্যে কেলাসিত হয়ে রয়ে গিয়েছিলো।

১৯৯০-এর দশকে তৈরি গণবিষাণের গানগুলোর মধ্যে ছিলো:

১। আমরা চাইনা মশাই তোমার লাখো লাখো টাকা (১৯৯০, ভোগবিলাসে ভেসে থাকা ও সংসদীয় রাজনীতির নিলামঘরে নিজেদের বেচে দেওয়ার বিপরীতে দাঁড়িয়ে শোষণমুক্তির রাজনীতিতে অবিচল থাকার প্রত্যয় ঘোষণা)

২। বড় মায়া লাগে ছাড়িতে এ আরাম (১৯৯০, বামফ্রন্ট সরকারের শাসন কীভাবে পুঁজিপতিদের তুষ্ট করে পুলিশ-গুণ্ডা-ক্যাডারের সন্ত্রাস কায়েম করে শ্রমিক-কৃষকদের প্রাণ-হন্তারক হয়ে উঠেছে তার বর্ণনা)

৩। হরি হরি খেতোঁমে চমক রহা হ্যায় ইয়ে ধান (১৯৯১-৯২, জমিদারদের দ্বারা ফসল-লুঠের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ক্ষেতের উপর কৃষকের অধিকার কায়েম করার আহ্বান)

৪। বেচিসনি মা বেচিসনি মা বেচিসনি মা মোরে (১৯৯৪, কালাহান্ডিতে অভাবী মা পেটের দায়ে তার সন্তানকে বিক্রি করে দিয়েছে, এই ঘটনার উপর গান)

৫। এই ছেলেটা ভেলভেলেটা শহরপানে যাবি (১৯৯০-এর দশক, মেহনতী পরিবারের ছেলের বাধ্য হয়ে শিশুশ্রমের অন্ধকারে ডুবে যাওয়া নিয়ে গান, আরো একটি এমন গান এই সময়ে তৈরি হয়েছিল)

৬। পান্তাভাতে বেগুন পোড়া অনেক খেয়েছি (১৯৯৫, নিপীড়িত মেহনতীর নিপীড়নমুক্ত সুদিনের স্বপ্ন দেখার গান)

৭। যত নেতা দাদা পুলিশ পেয়াদা একসাথে (১৯৯৫, দুর্নীতি তোলাবাজির বিরুদ্ধে গান)

৮। শুন শুন শুন সবে শুন দিয়া মন (১৯৯৫, পূর্ব চম্পারণের কৃষকনেতা গম্ভীরা শা-র জীবন নিয়ে গান)

৯।ঝরো ঝরো ঝরে শ্রাবণ (১৯৯৭, লক্ষ প্রাণের আহ্বানে অসীম অজানায় ডিঙ্গা ভাসানো নাইয়াদের তরী দুই দশক পর এখনও তীরে না পৌঁছানোর দুঃখ নিয়ে গান)

১০। এ লড়াই বাঁচার লড়াই/ এ লড়াই জিততে হবে (১৯৯০-এর দশক, শ্রমিক-কৃষক-আদিবাসীদের যৌথ লড়াইয়ের আহ্বান)

গানগুলোতে শ্রমিক-কৃষকের লড়াইয়ের পিছু হঠা, তাদের নেতৃত্বের বড় একাংশের পুঁজাবাদী শাসন পরিচালনার কাজে হাত পাকিয়ে ফেলা, মেহনতীদের জীবনে বিপর্যয় আরো ঘনিয়ে ওঠার ছবির পাশাপাশি, নতুনভাবে লড়াই গড়ে তোলার আহ্বান যেমন আছে, তেমনই আশাভঙ্গের বেদনাবিধুরতা নিয়ে হলেও নতুন দিনের স্বপ্ন ধ্বনিত হয়েছে।

১৯৯০-এর দশকে গণবিষাণের যে গানটি আমায় সবচেয়ে চমৎকৃত করেছিল তার কথা আলাদা করে বলবো বলেই উপরের তালিকায় রাখিনি। এবার সেই গানটির কথায় আসা যাক।

গানটি হল ‘কই গেল রে গেল দিন আইলো কালবেলা’। মলয়দার (মলয় মুখোপাধ্যায়) লেখা, মলয়দারই সুর দেওয়া। গানটির পরিপ্রেক্ষিত একটু বলে নেওয়া দরকার। ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ভাঙা পড়লো। সংকীর্ণ হিন্দু উগ্র-জাতীয়তাবাদী সঙ্ঘ পরিবারের অন্তর্গত বিভিন্ন শাখা সংগঠন ভারতজুড়ে মুসলমান বিদ্বেষের বিষকে সুনিপুণভাবে ব্যবহার করে ধর্মের বিষে জর্জর দঙ্গলকে লাগামহীন করে বাবরি মসজিদ ভাঙার পাশাপাশি ভারতের মূল ভূখণ্ড জুড়ে দাঙ্গার আগুন ছড়িয়ে দিলো। আমাদের বাংলায় ওইসব সঙ্ঘভুক্ত সংগঠনের প্রভাব খুব একটা দৃষ্টিগোচর ছিলো না, সেখানেও মন্দির-মসজিদ ভাঙা বা অপবিত্র করা নিয়ে নানা গুজব, ছোটখাটো দাঙ্গার নানা গুজব হু হু করে ছড়াতে লাগলো। প্রগতিশীল বামমনস্ক বলে পরিচিত মানুষজনের কারো কারো মনেও কীভাবে এতদিন ধর্মীয় বিদ্বেষের কালসর্প কুণ্ডলী পাকিয়ে ছিলো হঠাৎ-হঠাৎই তা ফনা মেলে বেরোতে শুরু করলো। এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধের আশু গুরুত্বপূর্ণ কাজটি হবে কীভাবে?

গণবিষাণের তূণীরে ধর্মীয় বিদ্বেষ ও সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী কিছু গান আগে থেকেই ছিলো। কিন্তু সে গানগুলোতে সাম্প্রদায়িকতাকে দেখা হয়েছে পুঁজিপতি বা শাসকশ্রেণির একটি চক্রান্ত হিসেবে, যা শ্রমিক-কৃষক-মেহনতীদের শোষণবিরোধী লড়াইয়ের ঐক্যকে দানা বাঁধতে না দেওয়ার জন্য বা দুর্বল করার জন্য তারা ব্যবহার করে--- অর্থাৎ, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ বিষ মেহনতীদের মনের ভিতরের অসুখ নয়, বাইরের বিপদ। ১৯৯২-পরবর্তী পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে এই ভাবনা বেশ অগভীর মনে হতে বাধ্য। এই সময়েই মলয়দা লিখলেন নতুন গান: ‘কই গেল রে গেল দিন আইলো কালবেলা’। গানটিতে আখ্যানবর্ণনার ঢঙে দুই শ্রমিকের গল্প বলা হয়েছে। একজন হিন্দু, নাম রাম। আর আরেকজন মুসলমান, নাম রহিম। অতীতে কারখানার মালিকের বিরুদ্ধে অনেক লড়াই তারা কঁাধে কঁাধ মিলিয়ে করেছে। আজ দাঙ্গায় আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে রহিম ঘর ছেড়ে রামের কাছে আশ্রয় নিতে এসেছে। আজ রাম তাকে সহযোদ্ধা হিসেবে দেখলো না, মুসলমান হিসেবে দেখলো, আর আশ্রয় দিলো না। রহিম সেই রাতে দাঙ্গায় মরে। সকালে রাম তার লাশ খুঁজতে খুঁজতে নিজের মনের ভিতরের সেই কালসর্পটিকেও খোঁজে যে রহিমকে এই মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে। গণবিষাণের সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ বিরোধী আগের সমস্ত গানের থেকে এ গান আলাদা। ‘আপন মনের বিষের খবর রাখলি না মনা’— বাইরের শত্রুকে দোষারোপ নয়, নিজের ভিতরের শত্রুর দিকে তা চোখ ফিরিয়ে দেয়। উপস্থাপনার নাটকীয়তায়, লৌকিক সুর ও ভাষা ব্যবহারের লালিত্যে আঙ্গিকগতভাবেও এই গান আমার বিবেচনায় গণবিষাণের সেরা গান।

গণবিষাণ মানে কেবল জলিদি নয়। ২০০২ সালে প্রকাশিত ‘গণবিষাণের গান’ বইয়ের শেষে গণবিষাণের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে কখনও না কখনও যুক্ত থাকা ব্যক্তিদের যে তালিকা আছে, তাতে নাম পাওয়া যায় ৯৭ জনের। তার পরেও যে তরুণ-তরুণীরা গণবিষাণে যুক্ত হয়েছেন, তাদের অন্তর্ভুক্ত করলে তালিকা অনায়াসে ১০০ ছাড়িয়ে যায়। এঁদের মধ্যে পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়, বিপুল চক্রবর্তী, অপরূপ রায়, সজল রায়চৌধুরী বহু জনপ্রিয় গান রচনা করেছেন; বিপুল চক্রবর্তী, অপরূপ রায়, মলয় মুখোপাধ্যায় বহু জনপ্রিয় গানের সুর দিয়েছেন; আর পরিবেশনার ক্ষেত্রে মলয় মুখোপাধ্যায়-এর কন্ঠ ও গায়কীর আকর্ষণক্ষমতা ছিলো অনবদ্য। অনেকেরই নাম এখানে করা হলো না, তাঁদের ভূমিকাও ছিলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই, গণবিষাণ মানে কেবল জলিদি নয়। কিন্তু, সেই ১৯৭৭ থেকে এই ২০২৬ অবধি, গণবিষাণের মূল কাণ্ডারী জলিদি-ই। গণবিষাণের এই যাত্রাপথে জলিদি কাণ্ডারীস্বরূপ কী ভূমিকা পালন করেছেন তা কয়েকটা দিক থেকে বোঝার চেষ্টা করা যেতে পারে, যেমন:

ক) ২০০২ সালে প্রকাশিত ‘গণবিষাণের গান, ১৯৭৭-২০০১’ বইতে মোট ১০৬-টি গান সংকলিত হয়েছিলো, তার মধ্যে জলি বাগচির সুর দেওয়া গান ৫২-টি, সুর ও লেখা উভয়ই জলি বাগচির এমন গান ৪-টি। ২০১২ সালে জলি বাগচি ও দিপালী সেনগুপ্তের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘গণবিষাণের গানের স্বরলিপি, ১৯৭৭-২০১১’, যেখানে মোট ৮৮-টি গানের স্বরলিপি সংকলিত হয়েছিলো। এখানেও ৮৮-টির মধ্যে ৫২-টি গানের সুর জলি বাগচির করা (এই ৫২-টির মধ্যে অনেকগুলোই আগের ৫২-টির থেকে আলাদা), বেশিরভাগ গানের স্বরলিপিও তিনিই তৈরি করেছিলেন। এর থেকে বোঝা যায় যে গণবিষাণে প্রথম থেকে শেষ অবধি সুর বসিয়ে গান তৈরির ক্ষেত্রে জলি বাগচি প্রধান ভূমিকা পালন করে এসেছেন। কখনও কখনও মনে হয় যে এই ভূমিকা এতোটাই প্রধান ছিলো যে আজ তাঁর মৃত্যুর পর তৈরি হওয়া শূন্যতা পূরণ গণবিষাণের পক্ষে খুবই দুষ্কর।

খ) ১৯৭৭ সাল থেকে শেষ অবধি শ্রমিকশ্রেণির বিপ্লবী ভূমিকার উপর আস্থাশীল রাজনীতির সক্রিয় শরিক থাকার ফলে গণবিষাণের গান-ভাবনার জগতের বিপ্লবী প্রাণশক্তি ও প্রণোদনার উৎসকে তিনি কখনও শুকিয়ে যেতে দেননি।

গ) ওঠা-পড়া ভাঙা-গড়া-র দোলে দোলা এক লম্বা সময়পর্যায় বহু ধরনের বহু বয়সের ব্যক্তিদের নিয়ে এমন এক যৌথ সাংস্কৃতিক চর্চা পরিচালনা করা, যেখানে ব্যক্তির আগে দল আসবে, ব‍্যক্তিগত সাফল্য-স্বীকৃতিকে তুচ্ছ জ্ঞান করে মেহনতী জনতার প্রতি দায়বদ্ধতাকেই নির্ণায়ক আসন দেওয়া হবে--- এ কাজ সহজ নয়। একদিকে যেমন প্রতিমুহূর্তে আত্মসর্বস্বতার গহ্বরে পদস্খলনের ফাঁদ পাতা থাকে, অন্যদিকে তেমনই পদস্খলনের আশঙ্কায় পরিচালকদের দ্বারা কষে-বাঁধা নীতি ব্যক্তিদের স্বতঃস্ফূর্ততা ও স্বাধীনতার পরিসরটিকে ক্রমসংকুচিত করে দিয়ে উল্টো বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। এই শাঁখের করাতের উপর দিয়ে হেঁটে জলিদি যে হাসিমুখে এতোদিন গণবিষাণ পরিচালনা করতে পেরেছেন তা যেমন তাঁর সংগঠনী সক্ষমতার পরিচয়, তেমনই তা সম্ভব হয়েছে তাঁর সহজ বন্ধুত্ব ও ভালোবাসায় ভরা স্বভাবের জন্য। চলতে চলতে বহু ব্যক্তি গণবিষাণে প্রত্যক্ষ অংশ নেওয়া থেকে সরে গেছেন, কিন্তু প্রায় কারও সঙ্গেই জলিদির সুসম্পর্কে চির ধরেনি, তাই বিভিন্ন সময় তাঁরা আবার গণবিষাণের নানা পরিবেশনার প্রয়োজনে সাহায্যের হাতও বাড়িয়ে দিয়েছেন, গণবিষাণের চারধারের সঙ্গীমহলটি কখনও লোকশূন্য হয়ে যায়নি।

ঘ) এরপর আসে গণবিষাণের গান পরিবেশনার কথা। পথের ধারে, কারখানার গেটে, সমাবেশের মাঠে বা প্রেক্ষাগৃহের মঞ্চে--- যেখানেই গণবিষাণের দল গান গাইতে উঠেছে, হারমোনিয়ামে সূত্রধর হিসেবে জলিদি। পাশ্চাত্য ধ্রুপদী যৌথবাদনে যেমন একজন কন্ডাক্টর গোটা পরিবেশনাটির তাল-লয়-মেজাজ নিয়ন্ত্রণ করে ব্যাটন হাতে, প্রায় একইরকমভাবে জলিদির হারমোনিয়াম ও কন্ঠ গোটা পরিবেশনার প্রাণটিকে মূর্ত করে তুলতো, সবার কন্ঠ-গায়কী-উচ্চারণে সমন্বয় ঘটিয়ে দিতো। প্রকাশ্য পরিবেশনার আড়ালে প্রস্তুতির যে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিভূমিটি থাকে, তাতেও জলিদি-র ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। গণবিষাণের যেকোনো সদস্যের কাছ থেকে জানা যাবে কীভাবে কোথাও একটি-দুটি গান পরিবেশনার কথা থাকলেও তার আগে যথাযথ রিহার্সাল না করলে জলিদি পরিবেশনার ছাড়পত্র দিতেন না। রিহার্সালের ব্যাপারে তিনি ছিলেন বেশ কঠোর। মার্গসঙ্গীতে হাতেখড়ি হওয়ার ফলে তাঁর নিজের নিয়মিত স্বর-প্রশিক্ষণ (ভয়েস ট্রেনিং) করার অভ্যাস ছিলো, তাতে কোনোদিন ছেদ পড়েনি। তাঁর ঘরে আরো অনেককিছু না থাকলেও তানপুরা, হারমোনিয়াম, ও তবলা আমি সবসময় দেখেছি। প্রাত্যহিক তাঁর নিজের স্বর-প্রশিক্ষণ করা ছাড়াও দেখেছি যে তাঁর পরিচিত তবলচি সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিন তাঁর ঘরে আসতো এবং তবলা ও হারমোনিয়ামের সঙ্গে তিনি একের পর এক গান গেয়ে জনান্তিকে নিজ প্রশিক্ষণ চালিয়ে যাচ্ছেন। জীবনের শেষ দিনগুলোতেও এর কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। এই নিবিড় স্ব-প্রশিক্ষণের অভ্যাস তিনি গণবিষাণের সবার মধ্যেও চারিয়ে দিতে নরমে-গরমে অক্লান্ত চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। তাঁর কাছে গণসঙ্গীত গাওয়া মানে যেমন-তেমন করে কিছু বিপ্লবী কথা আউড়ে আসা ছিলো না, গণসঙ্গীত গাওয়া মানে তিনি বুঝতেন নিজেকে ধারাবাহিক চর্চার মধ্য দিয়ে প্রস্তুত করে নিজের স্বর-সংবেদন-আবেগ সর্বস্ব নিবেদন করা।

 

 

 

 

 

 

আমি নিজে সুরের নদীর মাঝি নই, গলায় আমার সুর খেলে না, কানও বেশ অপ্রশিক্ষিত। তবু জলিদির করা গানের সুর নিয়ে আমার কিছু মনে-হওয়া-কথা বলার ছাড়পত্র আমি পাঠকদের কাছ থেকে চেয়ে নিচ্ছি।

জলিদির গান-যাত্রা শুরু হয়েছিলো প্রাচ্য ধ্রুপদী সঙ্গীত ও রবীন্দ্রসঙ্গীতের ঘাট থেকে। গণবিষাণের প্রথমদিকের যে গানগুলোয় জলিদি সুর দিয়েছিলেন তার কাঠামো হিসেবে তাই কাহারবা, দাদরা বা ৪-মাত্রার তালের সৌষ্ঠব লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু ক্রমশ আরো নানা বৈচিত্র্য তাঁর ভাবনায় আসে। পিট সীগার বা জোয়ান বায়েজের গান শুনে তাঁদের গায়কীতে তিনি আকৃষ্ট হন। অনুকরণ নয়, তা আত্মীকরণের ইচ্ছাও জাগে। তাঁর মনে হয় যে হারমোনিয়াম বা তানপুরার সঙ্গে এই সুরের চলন খুব যাচ্ছে না, তাই তিনি গিটার শিখতে শুরু করেন। গিটার শিক্ষা পুরোপুরি সম্পূর্ণ না হলেও, ক্রমশ তাঁর করা গানের সুরে এর ছাপ পড়তে শুরু করে। তাল ও মাত্রার মধ্যে থেকেও উচারণে নাটকীয়তা আনা, যেনবা দাবি বা স্লোগানের মতো করে কন্ঠক্ষেপ করা, কখনও গানের কোনো অংশকে তালের বাইরে নিয়ে চলে যাওয়া--- সব নিয়ে গায়কীর এক নতুন রূপ যেন হাজির হয়। এর একটা বড়ো উদাহরণ হলো বার্টোল্ট ব্রেখটের কবিতা অবলম্বনে তৈরি ‘আমাদের জামা যখন ছিঁড়তে থাকে’ গানটি, যা মলয়দার অননুকরণীয় কন্ঠে পরিবেশিত হয়ে ব্যতিক্রমী মাত্রা ধারণ করেছিলো। এই একটাই নয়, এমন আরো কিছু গান আমরা ক্রমশ পেয়েছি।

বিভিন্ন ধারার সুর ও গানের মধ্যে অনায়াস যাতায়াত ও আত্মীকরণ করার এই বিরল সক্ষমতা আরো প্রোজ্জ্বল হয়ে ওঠে যখন জলি বাগচি গোয়ালপাড়িয়া অঞ্চলের লোকগানের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক পাতেন। পশ্চিম গোয়ালপাড়ার গৌরীপুর অঞ্চলের বড়ুয়া রাজ পরিবারের কন্যা নীহারবালা বড়ুয়া (১৯০৫-২০০৪) অঞ্চলের জলে-জঙ্গলে গ্রামে-জনপদে ঘুরে ঘুরে সারা জীবন ধরে সংগ্রহ করেছিলেন এই এলাকার অসংখ্য লোকগান, যা গোয়ালপাড়িয়া গান নামে পরিচিত হয়। এই সংগৃহীত গানের ঝুলির মধ্যে আছে মাহুত ও মইষালদের গান, নারীজীবনের আশা-আনন্দ-যন্ত্রণার গান, প্রেম (বিশেষত পরকীয়া প্রেম)-এর গান, সামাজির আচার-অনুষ্ঠানের গান। সমাজের অতি নিম্নবর্গের সাধারণ দুঃখী মানুষদের নিজেদের বয়ানে নিজেদের জীবন উঠে এসেছে এইসব গানে। নীহারবালা বড়ুয়ার ভাইঝি প্রতিমা বড়ুয়া (১৯৩৪-২০০২) তাঁর অনন্য কন্ঠে এই গানগুলি পরিবেশন করে বৃহত্তর মহলে পরিচিত করে তুলেছিলেন। জলি বাগচি এই গানধারার প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে আসেন ১৯৮৩-৮৪ সালে। তাঁর নিজের বয়ানে:

প্রতিমাদির সঙ্গে সম্যক পরিচয়ের সুযোগ আসলো ১৯৮৩-৮৪ সালে যখন আমরা কয়েকজন কলকাতা থেকে অসমে মূলত বেড়াতেই গিয়েছিলাম। প্রথমেই আমরা অসমের গৌরীপুরে যাই। বড়ো ইচ্ছা ছিলো গৌরীপুরের মাটিয়াবাগের বিখ্যাত শিল্পী প্রতিমা বড়ুয়ার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার ও সামনে বসে গানের পর গান শোনার। ইচ্ছাটা যে এতো সহজে ধরা দেবে তা ভাবতে পারিনি। আমরা গৌরীপুরে যার বাড়িতে আস্তানা গেড়েছিলাম, তার সঙ্গে প্রতিমা বড়ুয়ার গভীর পরিচয় ছিলো। আমাদের ইচ্ছাটা প্রতিমা বড়ুয়া অতি সহজেই মেনে নিলেন এবং স্থির হলো একদিন ওঁর বাড়িতে বিকেলে গানের আসর বসবে এবং সব বাজনদারও সেদিন আসবেন। নির্দিষ্ট দিনে মনে অনেক কৌতূহল, উত্তেজনা নিয়ে মাটিয়াবাগের টিলার উপরে চীনা মিস্ত্রির দ্বারা নির্মীত অত্যন্ত সুন্দর, রুচিসম্মত, দৃষ্টিনন্দন, প্রায় প্রাসাদই বলা চলে, সেখানে প্রায় জনা ১০-১২ উপস্থিত হয়েছিলাম। প্রায় আড়াই-তিন ঘন্টা সেখানে ছিলাম, মুগ্ধ হয়ে গানের জগতে ভেসে গিয়েছিলাম। অতো বড়ো একজন শিল্পীর গান, এতো কাছ থেকে, এতোক্ষণ ধরে শুনতে পাবো, গান রেকর্ড করতে পারবো, তা ভাবতেই পারিনি।

(জলি বাগচি, ইতিহাসের বীক্ষণে কোচবিহার ও গোয়ালপাড়ার লোকসংগীত, পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত দ্বিতীয় সংস্করণ, ২০১৯, অন্যতর পাঠ ও চর্চা, কলকাতা, পৃষ্ঠা: ৩৩৫-৩৩৬)

বিস্ময়মুগ্ধতা পেরিয়ে জলি বাগচি ক্রমশ গোয়ালপাড়িয়া গানের সঙ্গে প্রাণের টানে বাঁধা পড়েন। প্রথমে তিনি মনস্থ করেছিলেন যে গোয়ালপাড়িয়া গানের শুদ্ধ বাণী, সুর আগামী প্রজন্মের জন্য ধরে রাখার উদ্দেশ্যে স্বরলিপি তৈরির কাজ করবেন। প্রতিমা বড়ুয়ার কাছে সে কথা পেড়েওছিলেন:

…১৯৯৩ সালের শেষ দিকে… প্রতিমাদির সঙ্গে দেখা করি। আমার স্বরলিপি করার ভাবনার কথা তাঁকে বললাম। বললাম যে সেইজন্য মাঝেমধ্যে আমি গৌরীপুরে যাবো, তাঁর কাছে গান শিখবো। মনে হয় উনি অবাকই হয়ে গিয়েছিলেন, বলেছিলেন, আমি তো হারমোনিয়াম বাজাতে পারি না, দোতরার সাথে গান গাই। যাই হোক, তিনি আমাকে নিরাশ করেননি।

(জলি বাগচি, ইতিহাসের বীক্ষণে কোচবিহার ও গোয়ালপাড়ার লোকসংগীত, পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত দ্বিতীয় সংস্করণ, ২০১৯, অন্যতর পাঠ ও চর্চা, কলকাতা, পৃষ্ঠা: ৩৩৬)

এরপর প্রায় দশ বছর ধরে জলি বাগচি নিয়মিত প্রতিমা বড়ুয়ার কাছে গোয়ালপাড়িয়া গানের পাঠ নিয়েছেন। অনেকেই জলিদিকে বলেছিলো, তাঁর নিজের মনেও এই সন্দেহ ছিলো যে তাঁর গলার স্বরবিস্তার (ভয়েস রেঞ্জ) এমন যা গোয়ালপাড়িয়া গান গাওয়ার জন্য উপযুক্ত নয়। কিন্তু নিজেকে ভেঙেচুরে জলিদি হয়ে উঠেছিলেন গোয়ালপাড়িয়া গানের এক দক্ষ পরিবেশক। গোয়ালপাড়িয়া গানের ভাষা সেই অঞ্চলের মানুষের মুখের ভাষা, যা বাংলা ভাষা নয়, অসমিয়া ভাষাও নয়। সেই ভাষার উচ্চারণশৈলীও আত্মস্থ করেছিলেন অতি যত্নের সঙ্গে। প্রতিমাদির দীর্ঘদিনের সাথী বাজনদাররাই (ঢোলে কলুদা, সারিন্দায় বুড়াদা) জলিদির সঙ্গে বাজিয়েছেন। ধুবুড়ি ও গৌরীপুরের বিহু উৎসবে গোয়ালপাড়িয়া গান গাইতে আমন্ত্রিত হয়ে তিনি সেই ভাষাভাষী মানুষদের কাছেও সম্মান ও সম্ভ্রম পেয়েছেন। কলকাতায় বিভিন্ন সময়ে যখন তিনি এই গান পরিবেশন করেছেন, তখন গান গাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেইবসব গানের মধ্যে জড়িয়ে থাকা সেই এলাকার মাহুত, মইষাল, মাঝি, ভুঁইমালি, ডোম ও বিশেষত নারীদের জীবনের কথা কথকতার ঢঙে পরিবেশন করেছেন, মাটিলগ্ন মানুষদের জীবনের ওম উঠে এসেছে। আর কেবল স্বরলিপি নয়, এই গানের ইতিহাস ও সামাজিকতা নিয়ে পূর্ণাঙ্গ গবেষণাপত্র ‘ইতিহাসের বীক্ষণে কোচবিহার ও গোয়ালপাড়ার লোকসংগীত’ তিনি রচনা করেন, যা প্রথম প্রকাশিত হয় ২০০১ সালে।

প্রতিমা বড়ুয়া ছাড়াও লোকগানের ক্ষেত্রে জলি বাগচি তাঁর শিক্ষক হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন কালী দাশগুপ্তকে। কালী দাশগুপ্ত-র প্রতিষ্ঠা করা লোকসঙ্গীতের দল ‘লোকসরস্বতী’-রও তিনি সদস্য ছিলেন আমৃত্যু। সেখানেও তিনি অসংখ্য তরুণ-তরুণীকে লোকগান গাওয়ার পাঠ দিয়ে এসেছেন। কালী দাশগুপ্তের সংগ্রহ করা লোকগানের বিপুল ভাণ্ডারের স্বরলিপি তৈরির কাজেও অংশ নিয়েছেন।

কোচবিহার ও গোয়ালপাড়ার লোকগান নিয়ে গবেষণাপত্র তৈরির কাজ জলিদির সক্রিয়তার নতুন একটি দিকের বোধন ঘটিয়েছিলো। সেই দিকটি হলো নিবিড় ক্ষেত্রসমীক্ষার মধ্য দিয়ে মাটিলগ্ন তলাকার মানুষের জীবন ও সংস্কৃতিকে ভাস্বর করে তোলা। পুরুলিয়ার ঝুমুর গানের সঙ্গে নাচা নাচনিদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ হয়ে তাদের জীবনের কথা বোঝার কাজ তিনি শুরু করেন ২০০০-২০০১ সাল নাগাদ। সেই কাজের উপর দাঁড়িয়ে একটি তথ্যচিত্র তিনি নির্মাণ করেন। আর ২০১৫ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর ‘পুরুলিয়ার নাচনি ও নাচনি নাচ’ বইটি কলকাতার ‘অন্যতর পাঠ ও চর্চা’ প্রকাশনা থেকে। নাতিদীর্ঘ বইটিতে অকপট ভঙ্গিমায় নাচনি, রসিক, তাদের সঙ্গে কাজ করা বাজনদার-দের জীবনের ছবি যেমন উঠে এসেছে, যন্ত্রণা-বেদনা ফুটে উঠেছে, তেমনই, সমাজ ও সামাজিকতার কোন পাকে তারা বাঁধা, সেই অনুসন্ধানের মধ্যেও পাঠককে এনে ফেলেছে। এরপর ২০২৩ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর আরেকটি বই: ‘মোষের ঝাপানতলা ও বাথান’। বইটিতে বিশ্বের দুই প্রান্তের দুটি জীবন-সংস্কৃতি--- একটি কানাডার অ্যালবার্টা অঞ্চলের আদিবাসী প্লেনস ইন্ডিয়ানসদের বুনো মোষ-শিকার-ভিত্তিক সংস্কৃতি ও অন্যটি কোচবিহার-অসম-উত্তরবঙ্গের মোষপালন-ভিত্তিক সংস্কৃতি--- এই দুটোকে সমান্তরালে রেখে একটা তুলনামূলক আলোচনা করা হয়েছে। শেষের কয়েকটা বছর জলিদি প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন দুই বাংলায় গণসঙ্গীতের ইতিহাসধারার উপর গবেষণামূলক একটি কাজ করার জন্য। সেজন্য প্রচুর পত্রপত্রিকা, নথিপত্র জড়ো করেছিলেন, ভাবনাচিন্তার প্রথম পদক্ষেপগুলো নেওয়া শুরু করেছিলেন। মৃত্যু এসে সে কাজকে অসমাপ্ত রেখে দিলো।

জলিদি যখন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের গ্রন্থাগারিক পদ থেকে অবসর নিচ্ছেন, তখন তাঁর সহকর্মীরা তাঁকে নিয়ে একটি অনুষ্ঠান করতে চেয়েছিলো। জলিদি তাদের বলেছিলো যে তারা যদি সত্যিই তাঁকে ভালোবাসে, তাহলে তাঁকে নিয়ে নয়, গান নিয়ে অনুষ্ঠান করুক, আর তা একবারের গান-গাওয়া নয়, বারবার জীবনকে গানের স্পর্শে আনা। তাঁর এই প্ররোচণায় ষাটের কাছাকাছি বয়স্ক তাঁর সহকর্মিণীরা গড়ে তুলেছিলো একটি গানের দল, নাম দিয়েছিলো ‘বিকেলে ভোরের ফুল’। জলিদিই তাঁদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করেছিলেন, প্রতিবছর তারা অনুষ্ঠানও করতো--- কখনও রবীন্দ্রনাথ নিয়ে, কখনও লোকগান নিয়ে।

জলিদির জীবনের বহু ঘটনার মতো এই ঘটনাটিও দেখায় যে তাঁর কাছে গান কেবল কোনো ‘পারফরমেন্স’ ছিলো না, গান ছিলো তাঁর প্রাণশক্তির সহজ স্বাভাবিক প্রকাশরূপ, গান ছিলো হাজারো মানুষের প্রাণের সাথে প্রাণ বাঁধার সহজ গ্রন্থি, সমস্ত জরা-জীর্ণ-মুমূর্ষুতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে জীবনের উৎসমুখটিকে অনর্গলিত করে দেওয়া। তাই, ১৭ই জানুয়ারি ২০২৬, মৃত্যু তাঁর নশ্বর দেহটিকে নিয়ে চলে গেলেও, তা কখনোই তাঁর গানকে ছুঁতে পারবে না, তাঁর গান জীবনের অপরাজেয়তার কথা বলে যাবে, বলে যাবেই।

 

[জলিদিকে নিয়ে এই লেখা লিখতে লিখতে বারবার মনে হয়েছে যে গভীর ব্যক্তিগত সম্পর্কে তিনি আমায় বেঁধেছিলেন তার কথাও কিছু বলি। কিন্তু বারবারই মনে হয়েছে সে কথা কী করে বলবো? সন্দ্বীপ বাগচির জীবনের শেষ কয়েকটা বছর তাঁর ও জলি বাগচির সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের বন্ধন ক্রমশ যে নিবিড় চেহারা নিয়েছিলো, তা বলতে যাওয়ার দরকারটাই বা কী? আমার বাবা যেদিন মারা গেলেন, শ্মশানে পুড়িয়ে আসার পর, প্রথম ফোনটা পেয়েছিলাম সন্দ্বীপদার, সন্দ্বীপদা বলেছিলেন: সবার সামনে তুমি পাথর হয়ে গেছো, কাঁদতে পারছো না, একলা কোনো ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে কাঁদো, যতটা কাঁদতে মন চায় কাঁদো। জলিদিকে নিয়ে আমার ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণও সেই বিজন ঘরের বিষয়।]

0 Comments
Leave a reply