জাতির মুখ নির্মাণ

লিখেছেন:বিপ্লব নায়ক
জাতির মুখাবয়ব, জাতির রূপ নির্ধারিত হয় কীভাবে? কেবলই কি তা এক যৌথ পরিচয়ের উদযাপন, নাকি এক আধিপত্য-নির্মাণ? আমাদের অভিজ্ঞতা কী বলে?

সে নিজের জন্য একটা মুখ বানিয়েছিলো।

সেই মুখের আড়ালে

সে বেঁচেছে, মরেছে ও পুনর্জীবন পেয়েছে

অসংখ্যবার।

এখন তার মুখে

সেই মুখের ভাঁজগুলো সব-ই আছে

কিন্তু ভাঁজগুলো নিয়ে আর কোনো মুখ অবশিষ্ট নেই।

উপরের কবিতাটির নাম ‘অপর’, লিখেছেন মেহিকোর কবি অকতাভিও পাজ, বাংলা তর্জমা বর্তমান লেখকের করা। এই কবিতাটিকে প্রবেশপথ হিসেবে ধরে জাতির মুখ নির্মাণের কিসসায় ঢোকা যাক। নিজের জন্য একটা মুখ বানানোর মধ্য দিয়েই একটা জাতি সন্দেহাতীতভাবে ‘জাতি’ হয়ে ওঠে। জাতি মানে যদি ধরে নিই ‘কল্পিত গোষ্ঠী-সম্প্রদায়’ (বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসন-এর ‘imagined community’ অর্থে), তাহলে প্রথম যে প্রশ্ন আসে, তা হলো, এই গোষ্ঠী-সম্প্রদায়-গত সাধারণ চরিত্রের/রূপের কল্পনাটি কে করছে? সেই গোষ্ঠীর মানুষ নিজেরাই করছে? নাকি অপর কোনো গোষ্ঠীর মানুষ পর্যবেক্ষকের ভূমিকা নিয়ে করছে? অর্থাৎ, তার মুখ কি সে নিজেই বানালো, নাকি, তার মুখ অপর কেউ বানানোর পর সে তা গ্রহণ করেছে? আর এখান থেকেই আরো সব প্রশ্ন তৈরি হতে থাকে, যেমন: মুখ যদি সে নিজেই তৈরি করে থাকে, তাহলে, কেন কী উদ্দেশ্যে তা তৈরি করল, নাকি অহৈতুকী কোনো প্রণোদনায় অস্তিত্বগত প্রতিবর্ত ক্রিয়া হিসেবেই তা সম্পন্ন হয়েছে? আর মুখ যদি পর্যবেক্ষক-রূপী অপর-এর দ্বারা নির্মীত হয় তাহলে সেই অপর-ই বা কেন কী উদ্দেশ্যে তা করলো, সে মুখ গৃহীতই বা হয়ে গেল কেন, পর্যবেক্ষক ও পর্যবেক্ষণাধীনের মধ্যে কী ধরনের ক্ষমতা-সম্পর্ক-ই বা এর মধ্য দিয়ে তৈরি হলো? এরপর কবি বলছেন যে মুখের আড়ালে সে, অর্থাৎ, আমাদের ধরে নেওয়া অনুযায়ী, সেই জাতিগোষ্ঠী, অসংখ্যবার বাঁচা-মরা-পুনর্জন্ম-এর সর্পিল পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে চলে। অর্থাৎ, এই মুখটির আড়াল বা আশ্রয় তার যৌথজীবনের উৎপাদন-পুনরুৎপাদন করে চলে; অথবা, অন্যভাবে দেখলে, যৌথতাকে জীবনের অভিব্যক্তি রূপে উৎপাদন-পুনরুৎপাদন করে চলে। ফলে এই কল্পিত মুখের ভাঁজগুলো ‘সহজ ও স্বাভাবিক’ রূপে মূল্যায়িত হতে থাকে। কিন্তু এরপর-ই কবি চকিতে এক ট্র্যাজেডির উন্মোচন করেছেন। ট্র্যাজেডি-টি হলো এই যে ‘সহজ ও স্বাভাবিক’ হিসেবে গেঁথে বসা ওই মুখভাঁজগুলো মিলে এখন আর কোনো মুখ তৈরি হয় না। কীভাবে এই ট্র্যাজেডি ঘটলো? স্বপরিচয় নির্মাণের এক ইতিহাসপথ পরিক্রমা করে এসে কোন জাদুবলে স্বপরিচয়টিই খুইয়ে বসতে হলো? এই প্রশ্নগুলোকেই এবার আমরা আমাদের মূর্ত অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে ফেলে দেখার চেষ্টা করবো।

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীন বাংলায় উনিশ শতকের শেষভাগে বাংলা গদ্যভাষা সৃষ্টিতে ব্যাপৃত বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮-১৮৯৪)-এর আরেকটি সাধনার বিষয় ছিলো ভারতীয় জাতীয়তার নির্মাণ। তাঁর উপন্যাসে, তাঁর সমাজ-ব্যাখ্যায়, তাঁর ধর্ম-আলোচনায়, এমনকী তাঁর রসিকতাতেও এই জাতীয়তা-প্রতিষ্ঠা-চেষ্টা ঘুরেফিরে নানা রূপ ধরে হাজির ছিলো। যে কোনো জাতীয়তার প্রাথমিক লক্ষ্য একটি গোষ্ঠী-চেতনা তৈরি করা। আমরা যে আমরাই এবং ওরা যে ওরা, সেই কথা খোলা ক্ষতের মতো সর্বদা জেগে না থাকলে জাতীয়তাবোধ জোরদার হয় না। বঙ্কিমচন্দ্র ভারতের হিন্দুসমাজকে ‘আমরা’ মনে করেছিলেন। কিন্তু আদ্যোপান্ত মধ্যবিত্ত শিক্ষিত বাঙালি হওয়ার সুবাদে বাঙালি মধ্যবিত্ত হিন্দুসমাজ মাঝেমধ্যেই এই ব্যাপকতর হিন্দুসমাজের স্থান নিতো। ঔপনিবেশিক সমাজে বসে আত্মসম্মানের তাগিদে নিজ জাতীয় আত্মপরিচয় সন্ধানী মানুষটির সাহিত্য-রচনায় তাই হিন্দুসমাজের আলোচনা, হিন্দুর ইতিহাস ফিরে ফিরে এসেছে। কিন্তু তাঁর এই জাতীয়তা-নির্মাণও ভারতবাসীর ঐক্যবিধান করার বদলে ফাটলগুলোকেই চওড়া করেছে--- কীভাবে তা দেখা যাক।

১৭৫৭ সালের পলাশির যুদ্ধের পর একশো বছরের উপর ধরে ইংরেজ শাসনের অভিঘাত বাংলার সমাজে রাজন্যবর্গকে নিরস্ত্র ও নিস্তেজ করেছিলো, কিন্তু নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণি কিছুটা প্রতিপত্তি পেয়েছিলো। বাঙালি মধ্যবিত্ত কলকাতার সমাজে যে মর্যাদা পেলো, মুর্শিদাবাদে সেকথা ভাবা যেতো না। ইংরেজের প্রয়োজনে নতুন ভাষা (ইংরেজি) এসেছিলো, তার ভিত্তিতে নতুন শিক্ষা প্রথাও চালু হয়েছিলো। বাঙালি মধ্যবিত্ত নিজের মতো করে ইংরেজি শিখলো, ইংরেজ দার্শনিক ও রাজনীতি-চিন্তকদের লেখাপত্র হজম (বা বদহজম) করে আধুনিকতার হদিশ করতে চাইলো। তার ফলে ইংরেজি-না-শেখা ‘অশিক্ষিত’ জনতা (কৃষকসমাজ, যার বড়ো অংশটাই মুসলমান, জনজাতি সম্প্রদায়, হিন্দুসমাজের তলাকার কুঠুরিতে ঠেসে পুরে রাখা বিভিন্ন জাত সম্প্রদায়) ভদ্রলোক সমাজ থেকে আরো দূরে সরে গেলো, বিচ্ছিন্নতাটা বেশ পাকাপাকি ভাবে গেঁড়ে বসলো। উনিশ শতকের শেষ কটি দশকে, অর্থাৎ বঙ্কিমচন্দ্রের সময়ে, মধ্যবিত্ত শ্রেণি প্রধানত রাষ্ট্র-সংলগ্ন পেশাদারী গোষ্ঠীর রূপ নিয়েছিলো। জমিদারদের ব্রিটিশ ইন্ডিয়া অ্যাসোসিয়েশন সরিয়ে তারা তখন ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন নামে আলাদা সমিতি তৈরি করেছে, জমিদার-শ্রেণির স্বার্থবিরোধী কিছু কথা উপস্থাপনা করার মতো ক্ষমতা ও সুযোগও পেশাদারী মধ্যবিত্তের হয়েছে। এই পেশাদারী মধ্যবিত্ত ইংরেজ শাসনকে মূলত সদর্থক রূপেই দেখছে, বঙ্কিমের সমাজচিন্তাতেও তাই সাম্রাজ্যবাদের দ্বিধাহীন কোনো প্রতিবাদ নেই। বরং ইউরোপীয় জাতি-রাষ্ট্র-কেন্দ্রীক জাতীয়তাবাদকেই তিনি সবল রাজনৈতিক রূপ হিসেবে দেখেছেন এবং সেই তাড়সেই জাতীয়তা-পরিচয় নির্মাণ করতে চেয়েছেন।

কিন্তু জাতীয়তা-পরিচয় নির্মাণে যেমন ‘আমরা’ লাগে, তেমনই ‘ওরা’-ও লাগে; জাতি-প্রতিষ্ঠার সন্ধানে যেমন নায়ক-গোষ্ঠী লাগে, তেমনই কাকে পরাভূত করে সে জয় হাসিল হবে, সেই শত্রু-গোষ্ঠীও চিহ্নিত করতে লাগে। নায়ক-চরিত্রগুলোকে বিজাতীয় শত্রুর বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে হবে এবং সেই অবস্থায় নায়কের গুণকীর্তন করতে হবে, আত্মত্যাগের ফিরিস্তি লিখতে হবে বীরত্বের প্রশংসা করতে হবে। প্রত্যেক উদীয়মান জাতি এভাবেই ইতিহাস লেখে। নিরন্তর শত্রুসন্ধান ও শত্রু-নিকেশ-পরিকল্পনা ছাড়া জাতীয়তাবাদী আবেগকে উথলে তোলা যায় না। বঙ্কিমচন্দ্র হিন্দুদের নায়ক-গোষ্ঠী করলেন, কৃষ্ণচরিত্রকে নতুনভাবে নায়ক চরিত্র হিসেবে পাঠ করলেন, কিন্তু শত্রু কে? ইংরেজরা তো শত্রু নয়, বরং অনুকরণীয় অগ্রগামী গোষ্ঠী, তাই ভারত-ইতিহাসের মুসলমান-শাসন-আমলের দিকে ফিরে তিনি মুসলমানকেই শত্রু বলে চিহ্নিত করে বসলেন। জমিদারদের শোষণের বিরুদ্ধে লিখতে গিয়ে যে হাসিম শেখ ও রামা কৈবর্ত-দের তিনি বাংলার কৃষকসমাজের প্রতিভূ হিসেবে হাজির করেছিলেন, এখন জাতীয়তাবাদের ভিত্তিকে শক্ত করার জন্য তিনি সেই হাসিম সেখ ও রামা কৈবর্তকেই একে অপরের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে দাঁড় করিয়ে দিলেন।

যে বাঙালি হিন্দু মধ্যবিত্ত শিক্ষিতসমাজ বঙ্কিমচন্দ্রকে ‘সাহিত্যসম্রাট’ উপাধি দিয়ে পুজোর আসনে বসিয়েছে, বঙ্কিমচন্দ্রের এই রাজনৈতিক জাতীয়তা নির্মাণও তাদের মধ্যে গভীরে শিকড় ছড়িয়ে দিয়েছে।

হিন্দুকে নায়ক ও মুসলমানকে শত্রু করে এহেন জাতীয়তা নির্মাণ (প্রায় দেড়শ বছর পর এখনও এ গরল আমরা বয়ে নিয়ে চলেছি, অনেক হিন্দু বাঙালিই ‘বাঙালি’ বলতে কেবল হিন্দুদেরই বোঝে, বাংলার মুসলমানদের তারা ‘বাঙালি’ নয়, ‘মুসলমান’ বলে চিহ্নিত করে) হিন্দু শিক্ষিত মধ্যবিত্তদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী আবেগ যতোই ফেনিল উচ্ছ্বাসে উতরোল করে তুলুক না কেন, তা সমাজের অন্য অংশের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা ও বিরূপতার বোধকেই আরো পোক্ত করে তোলে। বিশ শতকের প্রথম অর্ধে জাতীয়তাবাদী স্বাধীনতা আন্দোলনকে (এবং সেই সুবাদে কংগ্রেসকে) অবিভক্ত বাংলার মুসলমান কৃষক ও নমঃশুদ্র সম্প্রদায়ের গরিষ্ঠ অংশই যে হিন্দুদের আন্দোলন হিসেবে দেখেছিলো (এবং কেবলমাত্র হিন্দুত্ববাদী জনসংঘের বিরুদ্ধে নয়, কংগ্রেসের বিরুদ্ধেও মুসলিম লিগ বা প্রজা কৃষক পার্টির মধ্য দিয়ে নিজস্ব প্রতিনিধিত্ব খুঁজেছিলো), তার পিছনে এই ধরনের হিন্দু জাতীয়তাবাদ নির্মাণের বিরুদ্ধ-প্রতিক্রিয়া বড়োভাবে কাজ করেছিলো। আর এই হিন্দুকে নায়ক, মুসলমানকে শত্রু করে সাজানো জাতীয়তাবাদ উশকে দিয়েছিলো তার বিপরীত জাতীয়তাবাদ-নির্মাণকেও, যেখানে মুসলমান নায়ক আর হিন্দুরা সব শত্রু। এই দুই পরস্পর-বিরোধী, অথচ একে-অপরকে উশকে দিয়ে পরস্পরের শক্তিবৃদ্ধিতে সহযোগী জাতীয়তাবাদ আমাদের এই উপমহাদেশে একের পর এক ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি ঘটিয়ে গেছে, এখনও ঘটিয়ে চলেছে--- জাতীয় পরিচয় প্রতিষ্ঠার নাম করে তা এমন তিনটি জাতিরাষ্ট্র (বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান) পয়দা করেছে যেগুলো নিরন্তর শত্রুতার-অবিশ্বাসের-অসহযোগের বিষক্রিয়া করে চলেছে, দাঙ্গা-গণহত্যা-উৎখাতের খোলা ক্ষত বাড়িয়ে চলেছে। মানুষ ও মানবিকতা ক্রমশ ছোটো হতে হতে অণুবীক্ষণের আওতায় সেঁধিয়েছে, আর জাতিরাষ্ট্রের দমন-পীড়নের যন্ত্রগুলো বড়ো থেকে আরো বড়ো হয়ে উঠে সর্বগ্রাসী হয়ে উঠেছে।

 

 পাশের ছবিটি ‘ভারতমাতা’ নামে খ্যাত। এঁকেছিলেন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ১৯০৫ সালে, বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে। তৎকালীন ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় যখন প্রথম ছাপা হয়, তখন ছবির নাম হিসেবে মুদ্রিত হয়েছিলো ‘মাতৃমূর্তি’। অবনীন্দ্রনাথ নিজে এই ছবির নাম হিসেবে ভেবেছিলেন ‘বঙ্গমাতা’। ঔপনিবেশিক শাসক ব্রিটিশ সরকার জনগোষ্ঠীর ধর্মপরিচয়ের ভিত্তিতে বাংলাকে ভেঙে দু-টুকরো করে মুসলমান-প্রধান পূর্ববঙ্গ ও হিন্দু-প্রধান পশ্চিমবঙ্গ করার যে ঘোষণা করেছিলো, তার বিরুদ্ধে বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলন তুলে ধরেছিলো এক ধর্ম-নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ বাংলার পরম্পরাগত পরিচয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি লিখেছিলেন এইসময়, তাছাড়া রাজশাহীর কান্তকবি রজনীকান্ত সেন লিখেছিলেন ‘মায়ের দেওয়া মোটা কাপড় মাথায় তুলে নে রে ভাই’, দ্বিজেন্দ্রলাল রায় লিখেছিলেন ‘বঙ্গ আমার, জননী আমার, ধাত্রী আমার, আমার দেশ’ ও ‘ধনধান্য পুষ্পে ভরা আমাদের এই বসুন্ধরা, তাহার মাঝে আছে দেশ এক সকল দেশের সেরা’। এই গানগুলো বিপুল জনপ্রিয় হয়ে বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে এক ঐক্যবদ্ধ দেশের চেতনা সামনে নিয়ে এসেছিলো। সেই ঐক্যবদ্ধ দেশ হলো বঙ্গ বা বাংলা, তার এক মাতৃরূপ কল্পনা করা হয়েছিলো, দেশের সবাই সেই মায়ের সন্তান। তাছাড়া উঠে এসেছিলো এহেন আত্মসমালোচনা যে সেই মায়ের সন্তানরা মায়ের ঘরের ধনকে অবহেলা করে বিদেশী শাসক ব্রিটিশদের বস্তুসম্পদের জৌলুসে চোখ ধাঁধিয়ে ফেলায় ও আপন ঋদ্ধ পরম্পরা অবহেলা করে অপরের হীন অনুকরণকারীতে পরিণত হওয়ায় মায়েরও আজ হীন করুণ দশা। তাই আপন দেশের, আপন পরম্পরার সমৃদ্ধ ভিত্তির উপর ফিরে এসে আপন দেশের গৌরব উপলব্ধি করা ও তা আরো বিকশিত করে তোলাই আমাদের যৌথ দায়িত্ব। এই ভাবনা চিত্ররূপ গ্রহণ করেছে অবনীন্দ্রনাথের ছবিতে। অবনীন্দ্রনাথ যাঁকে ‘বঙ্গমাতা’ রূপে এঁকেছেন, তাঁর চারটি হাতের এক-একটিতে রয়েছে পুঁথি, শস্য, সাদা কাপড় ও জপের মালা: বঙ্গ বা বাংলার খাদ্য-বস্ত্র উৎপাদন, বিদ্যাচর্চা ও আধ্যাত্মিক চর্চার পরম্পরাকে তা তুলে ধরছে। আর বঙ্গমাতার পোষাক ও অভিব্যক্তিতে এক শান্ত আধ্যাত্মিকতার ছাপ, এক বস্তুবিরল অলৌকিক আভায় আচ্ছন্ন পটে তা ফুটে উঠেছে: ঔপনিবেশিক শাসকদের পশ্চিমী সদা-চঞ্চল সদা-অতৃপ্ত বস্তুসংস্কৃতির সঙ্গে তা যেন এক বৈপরীত্যে স্থিত। তাই বলা যায় যে বঙ্গভঙ্গ রদের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ঐক্যবদ্ধ বঙ্গ বা বাংলার অধিবাসী হিসেবে বাঙালিজাতির রূপ ও চরিত্র কল্পনা হয়েছিলো, সে জাতির মুখ আমরা এই ছবিটিতে দেখতে পাই।

‘বঙ্গমাতা’ রূপে জাতির মুখ নির্মাণের এই প্রয়াস কতোটা ব্যাপ্ত ছিলো? অর্থাৎ, বাংলার জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন অংশের মধ্যে কতোটা অংশ এর মধ্যে নিজেকে খুঁজে পেয়েছিলো? অবিভক্ত বাংলার ব্যাপক কৃষকসমাজ, যার মধ্যে মুসলমান ও নমঃশুদ্র সম্প্রদায়ই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ, তাদের যৌথচেতনা বা যৌথ-অবচেতনার মধ্যেও কি তা শিকড় চারাতে পেরেছিলো? হাড়ি-বাগদি-ডোম ও বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষজনের স্বপরিচয়-নির্মাণে কি তা নির্ধারক হয়ে উঠতে পেরেছিলো? মনে হয়, না। মূলত শিক্ষিত চাকুরিজীবী বা চাকুরি-আকাঙ্ক্ষী মধ্যবিত্ত, যার মধ্যে হিন্দু উচ্চবর্ণই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ, তাদের চেতনা-অবচেতনা-আকাঙ্ক্ষার জমিতেই এই প্রয়াস সীমাবদ্ধ ছিলো। বঙ্গভঙ্গ-রদের আন্দোলনের সময় বিভিন্ন প্রাদেশিক সভায় দেওয়া রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষণগুলো যদি আমরা তাঁর রচনাবলী খুলে আবার দেখি, তাহলে দেখতে পাবো যে বারবার তিনি আন্দোলনের সংগঠক কর্মীদের সচেতন করতে চাইছেন গ্রামের কৃষকদের মেঠো জগতের থেকে বিচ্ছিন্নতা সম্বন্ধে, বারবার আবেদন করছেন যে গ্রামে-গ্রামে ছড়িয়ে গিয়ে মেঠো মানুষদের সঙ্গে মিশে গিয়ে গ্রামগঠনের কর্তব্য হাতে না নিলে জাতিগঠন হবে না। রবীন্দ্রনাথের পক্ষ থেকে এই বিচ্ছিন্নতা কাটানোর মরীয়া আহ্বান বারবার ধ্বনিত হওয়া বস্তুতপক্ষে এই বিচ্ছিন্নতার অস্তিত্বকে প্রমাণ করে। এই বিচ্ছিন্নতার কারণেই জাতির মুখ কল্পনার প্রতিমা-লক্ষণা ও সাংকেতিক উপাদানে হিন্দু-উচ্চবর্ণের শিক্ষা-সংস্কৃতির ছাপ এতো সর্বময়।

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে ছবির নাম ভেবেছিলেন ‘বঙ্গমাতা’, তার নাম ‘ভারতমাতা’ হয়ে গেলো কীভাবে? ‘ভারতমাতা’ নামটি ভগিনী নিবেদিতার দেওয়া। ছবিটি সম্পর্কে নিবেদিতার উচ্ছ্বাস ব্যক্ত হয়েছিলো এই ভাষায়:

শুরু থেকে শেষ অবধি এই ছবিটি ভারতীয় ভাষায় ভারতীয় হৃদয়ের কাছে এক আবেদন। নতুন শৈলীতে এই ছবিটিই হলো প্রথম মহান শিল্পকর্ম। যদি আমার পক্ষে সম্ভব হতো, আমি এই ছবিটিকে হাজারে হাজারে প্রতিলিপি করে গোটা দেশজুড়ে ছড়িয়ে দিতাম, প্রচার করতাম, যতক্ষণ না কেদারনাথ থেকে কন্যাকুমারী অবধি একটি কৃষকের ঘর বা একটি কারিগরের কুঁড়েও অবশিষ্ট না থাকে যেখানে ভিতর-দেওয়ালের কোথাও না কোথাও ভারতমাতা-র এই প্রতিকৃতিটি শোভা না পাচ্ছে। যতোবারই এই ছবিটির গুণগত দিকের পানে চাওয়া যাক না কেন, ছবিটিতে উপস্থাপিত ব্যক্তিত্বের শুদ্ধতা ও কমনীয়তা অবাক না করে পারে না।

(The Complete Works of Sister Nivedita, Volume-3, Advaita Ashrama, মূল ইংরেজি থেকে বাংলা তর্জমা বর্তমান লেখকের করা।)

সুতরাং নিবেদিতা একে বাঙালি জাতির নয়, ভারতজাতির মুখ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন, যা কিনা ভারতীয় ভাষায় ভারতীয় হৃদয়ের সঙ্গে সরাসরি সংযোগস্থাপন করে। কিন্তু প্রশ্ন হল, এই ভারতীয় ভাষায় ভারতীয় হৃদয়ের সঙ্গে সংযোগস্থাপন মানে কি? ভারতীয় ভাষা বলতে যদি আমরা ভারতীয় চিত্রভাষা ধরি, তাহলে এমন কি কোনো সাধারণ ভারতীয় চিত্রভাষা ছিলো, বা এই ছবির মধ্য দিয়ে আবিষ্কৃত হয়েছিলো, যা সমস্ত ভারতীয়র চেতন-অবচেতন-কে ছুঁয়ে যাওয়ার দাবি করতে পারে? অবনীন্দ্রনাথের এই ছবিটির চিত্রভাষা ব্রাহ্মণ্যতান্ত্রিক ধর্ম-পরম্পরায় বিকশিত দেবী-মূর্তি আঁকার চিত্রভাষাকে অনুসরণ করেছে, তার মধ্য দিয়েই তা মা ও দেবীর আদিপ্রতিমার সঙ্গে মিলিয়ে জাতি (সঠিক অর্থে nation, রবীন্দ্রনাথের মতে যার কোনো ভারতীয় ভাষাতেই কোনো প্রতিশব্দ নেই, যেহেতু এই রাজনৈতিক ধারণাটির উদ্ভব পাশ্চাত্যে এবং ঔপনিবেশিক আধিপত্যের ধমনী বেয়ে এর প্রাদুর্ভাব ঘটেছে আমাদের দেশে)–র মুখ তৈরি করতে চেয়েছেন। এই চিত্রভাষা ‘ভারতীয় চেতন-অবচেতন’-কে প্রতিনিধিত্ব করার মতো কতোটা সর্বজনীনতা দাবি করতে পারে? কয়েকটি উদাহরণ ধরে প্রশ্নটিকে একটু তলিয়ে বিচার করা যাক।

প্রথম দুটি উদাহরণ ভারত ভূখণ্ডের দুটি আদিবাসী গোষ্ঠীর দীর্ঘ-পরম্পরা-বাহী চিত্রকলা থেকে নেওয়া যাক। গোণ্ড জনজাতির চিত্রকলায় মাতৃমূর্তি আঁকা হয়েছে এভাবে:

 

খেয়াল করে দেখলে দেখা যায় যে এখানে মাতৃমূর্তির মধ্যে পশু-পাখি এতো নিবিড়ভাবে মিশে গেছে যে ‘মা’ ধারণাটি কেবল আর মনুষ্যসীমার মধ্যে সীমায়িত না থেকে গোটা জীবজগতের মধ্যে মানুষকে স্থাপন করে দেখতে চেয়েছে। জীবপ্রজাতির মধ্যে শ্রেষ্ঠ রূপে মানুষের যে অহং তার প্রকাশ এখানে নেই, বরং সমস্ত জীবপ্রজাতির মধ্যে সমান হিসেবে মিলে প্রাণধারণের বিস্ময়কে উদযাপন করার আকুতি আছে। দ্বিতীয় ছবিটি এই ভূখণ্ডের আদিবাসী চিত্রকলার আরেকটি দীর্ঘ পরম্পরা মধুবনী চিত্রশিল্পের পরম্পরা থেকে নেওয়া। এখানে মাতৃমূর্তি কল্পিত হয়েছে এভাবে:

 

নজর এড়িয়ে যেতে পারে না যে এখানে মায়ের মূর্তিটি গাছ, মাটি, ঘাস সবকিছুকে আত্মস্থ করে নিয়েছে, অর্থাৎ মা এখানে মিশে গেছে গোটা প্রকৃতির সঙ্গে। আমাদের ভূখণ্ডের আদিবাসী জনজাতির মানুষদের চেতন-অবচেতন-জাত এই চিত্রভাষা অবনীন্দ্রনাথের চিত্রভাষার সঙ্গে মেলে না। অবনীন্দ্রনাথের চিত্রভাষায় ‘মা’ একটি বিমূর্ত পবিত্র, অলৌকিক দেবীস্বরূপা অস্তিত্ব: তা মাটি-জল-রক্ত-মাংস-এর ছোঁয়ার বাইরে বলেই রাজনৈতিক বিমূর্ততায় তাকে মূর্ত করতে হয়, অর্থাৎ, জাত-ভাষা-ধর্ম-সীমানা-র ঘেরাটোপ দিয়ে তার ভিত্তি স্থাপন করতে হয়, তারপর জাতি-রাষ্ট্রের দুর্গ বানিয়ে তাকে মূর্ত করতে হয়। অপরদিকে, গোণ্ড বা মধুবনী চিত্রভাষায় মা সীমানাহীন জীব ও প্রকৃতি জগতের মধ্যে প্রাণের স্ফূরণে-বিস্ময়ে সদা মূর্ত, তাই তা থেকে কোনো রাজনৈতিক সীমানা বা জাতি-রাষ্ট্রের ধারণা সোৎসারিত হয় না।

তৃতীয় আর একটি উদাহরণও দেখা যাক, অবনীন্দ্র-পরবর্তী এক চিত্রকরের কাজ থেকে। এই ছবিটির চিত্রকর চিত্তপ্রসাদ ভট্টাচার্য, দ্বিতীয়-বিশ্বযুদ্ধ-কালীন বাংলার পঞ্চাশের মন্বন্তর যাঁর আবেগী চিত্রকর্মের সাক্ষ্যে এখনও জীবন্ত হয়ে আছে। তাঁর আঁকা মাতৃমূর্তি এরকম:

 

আমাদের ভূখণ্ডে পটের ছবি বা পটচিত্রের যে সুদীর্ঘ পরম্পরা আছে, সেই পটচিত্রের চিত্রভাষার প্রভাব এই ছবিটিতে লক্ষ্যণীয়। তবে সেই পরম্পরাগত শৈলীর অভ্যন্তরে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেছে এই আধুনিক সমাজতান্ত্রিক চেতনা যে ‘শ্রমের মূল্য ও শ্রমের প্রতি সম্মানকে মানব-অস্তিত্বের কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে’। এই মাতৃমূর্তিতে কোনো পবিত্রতা বা আধ্যাত্মিকতার জৌলুস নেই, এমনকি উচ্চবর্গের শালীনতার সংস্কারকেও বিসর্জন দিয়ে মায়ের স্তনদুটি সম্পূর্ণ অনাবৃত। আর মায়ের চারদিকে চলছে কৃষিকাজ, মা যেন ক্ষণেকের জন্য কৃষিকাজ থেকে উঠে এসেছেন ক্ষুধার্ত সন্তানকে দুধ খাওয়ানোর জন্য। ‘মা’-এর ধারণাটি এখানে কৃষিকাজ, উৎপাদনী-শ্রম-এর সাথে এমনভাবে সম্পৃক্ত হয়ে উপস্থিত যে তাকে সীমানাঘেরা কোনো জাতিরাষ্ট্রের আদিপ্রতিমা করে তোলা মুশকিল।

এই তিনটি উদাহরণ বিচার করার পর আমরা যদি আবার আগের প্রশ্নটিতে ফিরে যাই, তাহলে বলতে হয়: নিবেদিতা যেমন এক সার্বজনীন ভারতীয় হৃদয়ে আলোড়ন তুলতে পারা সার্বজনীন ভারতীয় ভাষা অবনীন্দ্রনাথের ছবিতে খুঁজে পেয়েছিলেন, তা তাঁর নিজের কল্পনা, বাস্তবে তেমন কিছু মেলে না।

নিবেদিতা ভারতে আসার আগে তাঁর জন্মভূমি আয়ারল্যান্ডে ব্রিটিশ আধিপত্যের বিরুদ্ধে আইরিশ জাতির রাজনৈতিক স্বাধীনতার সংগ্রামের শরিক ছিলেন। ভারতে আসার পর সেই ধারাবাহিকতাতেই তিনি ভারত ভূখণ্ডের মানুষদের একটি জাতি (nation) হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন এবং ব্রিটিশ আধিপত্যের বিরুদ্ধে তাদের রাজনৈতিক স্বাধীনতার সংগ্রামে অনুঘটক হতে চেয়েছিলেন। ভারতীয় দর্শন-সংস্কৃতি বলতে তিনি মূলত ব্রাহ্মণ্যতান্ত্রিক বেদ-পুরাণ-উপনিষদ-নির্ভর দর্শন-সংস্কৃতির সঙ্গেই পরিচিত হয়েছিলেন, ফলে তার সঙ্গে মিলিয়ে অবনীন্দ্রনাথের মাতৃমূর্তির আধ্যাত্মিকতাকে তিনি সর্বজনীন বলে ভেবে নিয়েছিলেন। অবনীন্দ্রনাথের ‘বঙ্গমাতা’-কে তাই তিনি ‘ভারতমাতা’ নামে অভিষিক্ত করলেন।

কিন্তু যা কেবল অংশের পরিচয়, তাকে সমগ্রের পরিচয় বলে আরোপ করলে অনর্থ ঘটতে থাকে নানারকম। যে ক্ষুদ্র অংশের তা পরিচয়, তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি-আধিপত্যের সাংস্কৃতিক-সামাজিক-রাজনৈতিক কলকব্জাগুলো বাকি সমস্ত অংশের উপর এঁটে বসে সেই পরিচয়ের উপর গড়ে ওঠা জাতিরাষ্ট্রের সৌধকে ক্রমাণ্বয়ে এক অসহ কারাগারের রূপ দেয়। ব্রাহ্মণ্যতান্ত্রিক মাতৃকল্পনার আদিপ্রতিমাকে জাতিরাষ্ট্রের মুখ করে তোলার ফলে ঘনায়মান সেই অনর্থগুলোকে আজ আমরা ভারতরাষ্ট্রে হিন্দুত্ববাদীদের আগ্রাসনের মধ্য দিয়ে হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি।

   হিন্দুত্ববাদীদের প্রচার এমন একটা ধারণা ছড়ায় যেন-বা আদি অনন্ত কাল ধরে ভারত নামক এক দেশ ছিলো, যেখানে সংস্কৃত ভাষায় তাক-লাগানো সব জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা হতো, মনুবাদী বর্ণব্যবস্থা সবাই সুবোধ বালক-বালিকা-র মতো মেনে চলতো, গুটিকয় দস্যু বা রাক্ষস শান্তিতে বিঘ্ন ঘটালে বাহুবলী রামের মতো রাজারা তাদের নিমেষে ঠান্ডা করে দিতো। তাঁদের ‘ভারতমাতা কী জয়’ লেখা ব্যানারে বা পোস্টারে এই আদি-অনন্ত-কালের ভারত দেশের যে মানচিত্র মাঝেমধ্যে দেখা যায় তাতে বর্তমানের ভারত, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান, এমনকি কখনও কখনও শ্রীলঙ্কা-ও ঢুকে বসে থাকে। তাঁরা বোঝাতে চান যে মুসলমান হানাদারদের চক্রান্তের ফলেই এই আদি-অনন্ত-কালীন ভারত টুকরো হয়েছে, তাই মুসলমান চক্রান্তকারীদের ঝেঁটিয়ে বিদায় করে আবার সেই আদি-অনন্ত-কালীন ঐক্যে ফিরে যাওয়ার মধ্য দিয়েই আমাদের গৌরব পুনরুদ্ধার করতে হবে। এভাবে তাঁরা তাঁদের হিংস্র অপর-বিদ্বেষী খুনী মানসিকতাকে অতীত গৌরব পুনরুদ্ধারের এক গা-গরম-করা গয়নায় সাজিয়ে হাজির করেন। কিন্তু সমস্যা হলো: যে অতীতকে গৌরবের পরাকাষ্ঠা বলে তাঁরা তুলে ধরছেন, সেই অতীত সম্পর্কে তাঁদের এই বক্তব্যগুলো পুরোটাই তাঁদের মনগড়া, প্রাচীনকালের যে নথিপত্র এখনো টিকে আছে তার কোনোটাই তাঁদের এই গল্পে সায় দেয় না।

যেমন ধরা যাক, ভারত বলে দেশের আদি-অনন্ত কাল জোড়া অস্তিত্বের গল্পটি। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সেন্টার ফর হিস্টোরিকাল স্টাডিজ’-এর বরিষ্ঠ অধ্যাপক ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায়-এর দীর্ঘকালীন গবেষণা ও বিশ্লেষণের সংগ্রহ হিসেবে ২০১৮ সালে স্টেট ইউনিভার্সিটি অফ নিউ ইয়র্ক থেকে প্রকাশিত ‘The Concept of Bharatavarsha and Other Essays’ বইটি দেখা যাক। ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায় দেখাচ্ছেন: বেদ ও উপনিষদের কালে বিভিন্ন জনপদের নাম পাওয়া যায়, জনপদ হলো একটি ‘জন’ অর্থাৎ জনগোষ্ঠীর বাসভূমি, কিন্তু বিভিন্ন জনপদ মিলে কোনো একটি দেশ বা রাষ্ট্রের ধারণা পাওয়া যায় না; এর পরের পর্যায়ে এসে বৌদ্ধদের বেশ কিছু পালি পাঠ্যবস্তুতে ‘জম্বুদ্বীপ’-এর উল্লেখ পাওয়া যায়, সেখানে গোটা বিশ্বকে চারটি মহাদ্বীপ হিসেবে কল্পনা করে তার একটিকে জম্বুদ্বীপ বলা হয়েছিলো এবং এই জম্বুদ্বীপেই আমাদের অবস্থান ভাবা হয়েছিলো, সুতরাং এটিও কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা রাষ্ট্র সম্পর্কে ধারণা সামনে আনছে না, বরং বিশ্বের ভৌগোলিক গঠন সম্পর্কে একটা অনুমান সামনে আনছে; এরও পরের পর্যায়ে বিভিন্ন পুরাণে, যেমন বিষ্ণুপুরাণে ‘ভারতবর্ষ’ শব্দটা আমরা প্রথম পাই, এখানে ভারতবর্ষ ও জম্বুদ্বীপ শব্দদুটোকে কখনও একই অর্থে, কখনো বা একটি আরেকটির অংশ এই অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে, এখানে ভারতবর্ষ মানে সীমানাহীন একটি ভূখণ্ড যার ঠিক মাঝখানে রয়েছে আর্যাবর্ত যেখানেই কেবল মনুবাদী বর্ণব্যবস্থা ও ব্রাহ্মণ্যতন্ত্র অনুযায়ী সমাজ বিন্যস্ত ও অভিজাত ভাষা হিসেবে সংস্কৃত আধিপত্যমান, কিন্তু এই ছোট্ট মধ্যাঞ্চল ছাড়া বিস্তীর্ণ চারপাশের অঞ্চলে বিভিন্ন ব্রাত্য-যবন-ম্লেচ্ছ-দের বাস যেখানে ভাষা-সমাজগঠন-প্রশাসন-সংস্কৃতি সবই আলাদা, ফলে এখানেও ভারতবর্ষ বলতে কোনো ঐক্যবদ্ধ দেশ বা রাষ্ট্রের কথা বলা হচ্ছে না (সূত্র: পূর্বোক্ত বই, পৃঃ ১-৩০)। ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায়ের মতে, ইউরোপ থেকে আসা ঔপনিবেশিক শাসকরাই প্রথম ‘ইন্ডিয়া’ নামে একটি সুনির্দিষ্ট সীমানায় বাঁধা প্রশাসনিক অঞ্চল-এর ধারণা নিয়ে এসেছিলো তাদের ঔপনিবেশিক শাসনের ভৌগোলিক ভিত্তি হিসেবে। আমাদের হিন্দুত্ববাদীদের ‘ভারত’ সেই ঔপনিবেশিক শাসকদের ‘ইন্ডিয়া’ ধারণার একটি তর্জমা। ঔপনিবেশিক শাসকরা যেমন ইউরোপ থেকে বয়ে আনা ‘জাতি-রাষ্ট্র’-র ধারণার আদলে তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি রাষ্ট্রের অধীনে যতটা সম্ভব অঞ্চলকে নিয়ে এসে একটি কেন্দ্রীভূত শাসন-শোষণের রাজ কায়েম করার উপর-মোড়ক হিসেবে ‘ইন্ডিয়া’-র প্রশাসনিক ঐক্য সাধন করতে চেয়েছিলো, আমাদের আজকের হিন্দুত্ববাদীরাও হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্থানের গেরুয়া মোড়কের তলে এমন এক কেন্দ্রীভূত শাসন-শোষণ কায়েম করতে চাইছে যেখানে তাদের দোস্ত আম্বানি-আদানি ও বহুজাতিক পুঁজির শোষণাধিপত্য নিরঙ্কুশ করা যাবে।

আজ এই একুশ শতকের চারভাগের একভাগকে পিছনে ফেলে বর্তমান ভারতে দাঁড়িয়ে উপলব্ধি করা কঠিন নয় যে জাতির মুখ-নির্মাণ এমন একটি রাজনৈতিক ক্রিয়া যা অনবরত চলতে থাকে, বিভিন্ন ক্ষমতা-পরিসরের টানাপোড়েন কখনোই তাকে থিতু হতে দেয় না। প্রত্যক্ষ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের পর জাতির রূপকল্পনায় যতো না আদি মাতৃমূর্তির আদল গুরুত্ব পেয়েছিলো, তার চেয়ে ক্রমাণ্বয়ে গুরুত্ব বাড়তে থেকেছে এমন এক নব-বিশ্বকর্মা-মূর্তির যা বড়ো কল-কারখানা-খনি-বাঁধ নির্মাণের মধ্য দিয়ে পাশচাত্য শহরকেন্দ্রীক বৃহৎ-শিল্প-ভিত্তিক ‘আধুনিক’ সমাজ-অর্থনীতির দিকে লাফ কেটে এগোতে চায়। মতাদর্শগত নানা পার্থক্য ও পথ নিয়ে নানা বিতর্ক থাকলেও রাজনৈতিক পরিসরে একাধিপত্য বিস্তার করেছিলো জাতিগঠন সংক্রান্ত এই তাড়নাই। লক্ষ লক্ষ আদিবাসী জনজাতিকে তাদের দীর্ঘদিনের ভিটে-গ্রাম-জীবনপরিসর থেকে বলপ্রয়োগ করে উচ্ছেদ করা চলেছে অনবরত, গ্রামসমাজের দীর্ঘ পরম্পরাবাহী সামাজিক-অর্থনৈতিক লোক-প্রতিষ্ঠানগুলো শুকিয়ে মরেছে, আর এসবগুলোকেই জাতিগঠনের পথে আবশ্যকীয় খুচরো ক্ষয়ক্ষতি বলে পাশে সরিয়ে রেখে সরকারী বিজ্ঞাপনে বিশাল কারাখানা বা বাঁধের ছবির সামনে রাষ্ট্রনেতা ও পরিচয়হীন শ্রমিকদের হাসিমুখে ছবি ‘অন্ধকার থেকে আলোর পথে চলা’-র নিশানা হয়ে উঠেছে। এর মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে পুঁজিবাদী সমাজ-অর্থনীতির দাপুটে আধিপত্য, পণ্য-পুঁজি-ভক্তিই হয়ে দাঁড়িয়েছে নয়া অধ্যাত্মবাদ আর জাতির মুখ ঢেকে গেছে ঝকঝকে বিজ্ঞাপনে: সুবেশ-সুবেশা ‘আইডল’-রা পণ্য-বিজ্ঞাপনে নিজেদেরও পণ্য করে তুলে ঘোষণা করেছে যে পণ্য হয়ে ওঠা ও আরো পণ্য আহরণ করাই জীবনসুখের চাবিকাঠি। গণজ্ঞাপন মাধ্যম যতো প্রসারিত হয়েছে, দৃশ্য-নির্মাণ ও নির্মীত দৃশ্যের জ্ঞাপন প্রযুক্তি-প্রকৌশলের অত্যাশ্চর্য শক্তির পিঠে চেপে যতো সর্বব্যাপী হওয়ার দিকে এগিয়েছে, জাতির রূপপ্রতিমা ততোই এমন এক দৃশ্য-জমক-এ পরিণত হয়েছে যা জীবন-বাস্তবতা-কে প্রতিস্থাপিত করতে করতে একসময় পুরো জীবন-বাস্তবতাটাকেই ঢেকে ফেলেছে, হয়ে উঠেছে বাস্তবের চেয়েও অধিক বাস্তব (ফরাসী তাত্ত্বিক জাঁ বদ্রিয়ার উপস্থাপিত ‘simulation’ সংক্রান্ত ধারণা এই প্রক্রিয়া বুঝতে আরো সাহায্য করে, কিন্তু সে আলোচনার বিশদে বর্তমান প্রবন্ধের পরিসরে আর ঢুকলাম না)। আর এর পাশাপাশি আরেকটি মৌল উপাদান হিসেবে থেকেছে জাতির ‘শত্রু’ নির্ণয় ও জাতির ‘শত্রুনিধনে’ নির্দয় অকুতোভয় হওয়ার তেজস্ক্রিয় ঘৃণা সঞ্চারিত করার কৌশল। জাতির মুখ হিসেবে এখন তাই বড় বড় হোর্ডিঁং-য়ে টাঙানো হয় সেনাবাহিনীর বীরব্যঞ্জক ছবি, যুদ্ধাস্ত্রের গরিমাকীর্তনকারী ছবি: দেশের প্রধানমন্ত্রীকে সেনার পোষাক পরিয়ে হাতে যুদ্ধাস্ত্র দিয়ে তৈরি উদ্ভট ছবিও জাতির ‘বীরত্ব’ ও ‘প্রতিশোধস্পৃহা’-র হাল-নগদ প্রমাণ হিসেবে হাজির করা হয়। এই হিংস্র সেনা ও সরকার যখন দেশেরই মধ্যে উচ্ছেদ-উৎখাত-বিরোধী আদিবাসীদের আন্দোলনকে দমন করতে, বা, সর্বস্বান্ত হওয়ার পথে ঠেলে দেওয়া কৃষকদের বিক্ষোভ দমন করতে, বা, বেকারত্বে অবসন্ন যুবকদের হঠাৎ বিস্ফোরিত হওয়া ক্ষুব্ধ আর্তচিৎকারের টুঁটি চেপে ধরতে, বা, সব-অধিকার-হারানো অস্থায়ী শ্রমিকদের দাবি-দাওয়ার আন্দোলনকে পিষে মারতে অস্ত্রশস্ত্র-বিচারব্যবস্থা সবকিছু নিয়ে ক্ষুধার্ত হায়নার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন সেই হায়নার ঝাঁপকেও বিদেশী শত্রুদের উসকানিতে চেগে ওঠা জাতির শত্রুদের শক্তহাতে দমন করার গপ্পে মুড়ে ফেলা যায়।

বিশ শতকের প্রথম ভাগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন তাঁর বক্তৃতামালায় ও প্রবন্ধে (‘Nationalism’ নামে প্রকাশিত গ্রন্থে তাঁর ইংরেজিতে প্রদত্ত বক্তৃতাগুলো আছে, বাংলা প্রবন্ধগুলোর মধ্যে ‘নেশন কী’ উল্লেখ্য) যখন nation ও nationalism-এর ধারণাকে সমালোচনা করেছিলেন, তখন তাঁর বক্তব্য ছিলো যে ইউরোপে উদ্ভব হওয়া এই nation-এর ধারণা একটি রাজনৈতিক ধারণা, nation-state-এর সঙ্গে যা যুক্ত, যা এক-একটা গোষ্ঠীকে উদার মানবতাবোধ থেকে বিচ্ছিন্ন করে এক যান্ত্রিক, অপরবিদ্বেষী, সংকীর্ণ-স্বার্থ ও আক্রমণাত্মক সংগঠনে বেঁধে ফেলে এবং পণ্য-অর্থনীতির অপার ও চির-অপূর্ণ ভোগচাহিদার আগুনে অন্য সব সুকুমার বৃত্তিকে পুড়িয়ে খাক করে দেয়। আজ এই অন্তর্দৃষ্টির দ্যোতনা মূর্ত হয়ে উঠছে যখন জাতি ও জাতি-রাষ্ট্রকে সমার্থক করে তোলা হয়েছে। যা জাতি-রাষ্ট্রের স্বার্থ, তা-ই জাতির স্বার্থ, যা জাতি-রাষ্ট্রের মতামত ও সিদ্ধান্ত তা-ই জাতির একমাত্র মতামত ও সিদ্ধান্ত: এই সমরূপতায় আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে জাতির ঘরে খিল এঁটে বিবিধ জনগোষ্ঠীর বিবিধ চিন্তা-অভ্যাস-মতামত-কে সমরূপতা-বিরোধী বলেই রাষ্ট্রবিরোধী অর্থাৎ জাতিবিরোধী বলে চিহ্নিত করে দেওয়াটাই স্বাভাবিক বলে প্রতিষ্ঠা করে ফেলা হয়েছে। জাতি: একসময় যা ছিলো মানুষের যৌথতাকে তুলে ধরা ও উদযাপন করার মুখ, আজ সেই মুখের ভাঁজগুলো রয়ে গেছে, কিন্তু তা হয়ে উঠেছে মানুষের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষদের উপর এক যান্ত্রিক হিংসাপরায়ণ কারাগার-কাঠামো আরোপ ও যুক্তিসিদ্ধ করে তোলার প্রকৌশল। সম্প্রতি হাঙ্গেরির লেখক লাজলো ক্রাজনাহোরকাই-এর একটি লেখায় মনে হয় যেন এই আধিপত্যের বয়ান ভাষা পেয়েছে, জাতি/জাতিরাষ্ট্র যেন সদম্ভ ঘোষণা করছে:

তোমরা আমাকে ছুঁতে পারবে না।

আমার চোখ নেই, কান নেই, দাঁত নেই, জিভ নেই, মস্তিষ্ককলা নেই, চুল নেই, ফুসফুস নেই, হৃদপিণ্ড নেই, উদর নেই, শিশ্ন নেই, স্বর নেই, গন্ধ নেই; আমার ভিতরে না আছে রক্ত, না আছে লসিকা, কোনো অনুভূতি নেই আমার, কোনো ভক্তিও নেই, আমি খিদে জানি না, পথঘাট জানি না, যন্ত্রণা জানি না, দিক-অভিমুখ জানি না, লুকোবার জায়গা জানি না আর কখনো তো খোঁজার চেষ্টাও আমি করবো না, আর পৃথিবী বা ঘাম বা বিপদ সম্পর্কেও কোনোকিছুই আমি জানি না, চামড়া বা মাংস বা হাড় সম্পর্কে কোনোকিছু আমি জানি না, আমার উপর তর্জন-গর্জন করা বেকার কাজ হবে, আমি কিছু বুঝি না, কারণ আমি কিছুই শুনি না, আমাকে মারধোর করা বেকার কাজ হবে, আমি দেখি না, আমি পুরো অন্ধ, তোমরা জানো না আমি কেমন আর আমি কী, কারণ তোমরা তার কোনো ছবি তৈরি করতে পারবে না, এমনকি স্বপ্নেও তোমরা আমার হদিশ করতে পারবে না, কারণ এ-যাবৎ যতো ছবি তোমরা দেখেছ তার কোনোটিতেই আমি নেই, তোমাদের মস্তিষ্কের মাপে আমি আঁটবো না, তোমাদের আত্মাসমূহেও আমি আঁটবো না, তোমাদের চোখগুলোর ভেজা ঝিল্লীগুলোয় আমি আঁটবো না, আর আমার মধ্যে কোনো সাবধানতা নেই, আমার মধ্যে কোনো বিচার-বিবেচনা নেই, আমার কোনো স্মৃতি নেই, কাল নেই, কোনো স্ত্রী-গর্ভে আমার জন্ম হয়নি, আমি কখনো কিছু হয়ে উঠি না, আমি যা আমি তা-ই, আমার খাওয়ার দরকার পড়ে না, আমার পান করার দরকার পড়ে না, আর এমনকি আমার চোদারও দরকার পড়ে না, আর আমার বায়ু দরকার নেই, স্বাধীনতা দরকার নেই, আর কোনোকিছুই আমার দরকার নেই কারণ টিকে থাকার জন্য তোমাদের থেকে বা অন্য কারও কাছ থেকে কিছুই আমার দরকার পড়ে না, কারণ আমি জানোয়ার নই, ভূত নই, ছায়া নই, নেকড়ে নই, আমি শিশুদের গিলি না, আর আমার পথও এক নরক থেকে আরেক নরকে ঘুরে বেড়ায় না, তোমরা আমার বর্ণনা দিতে পারবে না, তোমরা আমাকে আঁকতে পারবে না, এমনকি তোমরা আমাকে নিয়ে এক-টুকরো গান-ও বাঁধতে পারবে না, কারণ তোমরা সেই মুহূর্তটিকে জানো না,  তোমরা সেই পাহারাদারদের জানো না, কারণ তোমরা কিছুই জানো না, কিছুই জানো না, যে-কোনো-কিছু সম্পর্কে কোনো-কিছু-না-জানা-ই তোমাদের জানা, কারণ তোমরা এমনকি এটাও জানো না যে তোমরা আমাকে নিয়ে ভাবছো, কারণ এমনকি এটুকুও তোমরা জানো না যে এখন তোমাদের ভয় পাওয়া উচিত নাকি উচিত নয়, বা আতঙ্কিত হওয়া উচিত নাকি উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত, এমনকি এটাও তোমরা জানো না যে তোমাদের ভয় পাওয়ার ও আতঙ্কিত হওয়ার ও উদ্বিগ্ন হতে শুরু করার সময় আসলে এসে গেছে, লুকোও গিয়ে আর জাহান্নামে যাও, হাতড়ানো শুরু করো, কারণ তোমরা কখনোই লুকোতে সমর্থ হবে না, পালাতে সমর্থ হবে না, হাতড়াতেও সমর্থ হবে না, তবু পালাতে না পারলেও কেবল পালানোর চেষ্টা করে যাবে, কারণ এখন আর পালানো সম্ভব নয় যেহেতু আমি এখন এখানে, একেবারে তোমাদের গা ঘেঁষে, আমার কোনো গন্ধ থাকলে তোমরা হয়তো তা ইতিমধ্যেই টের পেতে, যদি আমার কোনো আকার থাকতো তাহলে তোমরা হয়তো ইতিমধ্যেই তা দেখতে পেতে, কিন্তু আমার কোনো গন্ধ নেই, কোনো আকার নেই, কারণ কোনোকিছুর মধ্যেই আমি আঁটি না, কারণ আমার মধ্যে আছে কেবল ঘৃণা, কেবল বিতৃষ্ণা, কেবল ভয়, কেবল ঘৃণা।

তোমরা আমাকে ছুঁতে পারবে না।…

(লাজলো ক্রাজনাহোরকাই ও ম্যাক্স নিউমান, Animalinside, দি কাহিয়েরস সিরিজ, ২০১০, পৃষ্ঠা: ১০-১১, বাংলা তর্জমা বর্তমান লেখকের করা।)

জুলাই, ২০২৬

0 Comments
Leave a reply