আমাকে তুলে সমুদ্রে নিক্ষেপ করো...
কেননা আমি জানি, আমার কারণেই এই মহা ঝড়
এসেছে তোমাদের উপর।
– যোনাহ ১:১২
গিলবেয়ার জোনাস ছিল একজন চিত্রশিল্পী এবং সে বিশ্বাস করত তার নিজের নক্ষত্রে। আসলে সে নিজের নক্ষত্র ছাড়া আর কিছুতে বিশ্বাস করত না, যদিও অন্যের ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা বা এমনকি এক ধরনের মুগ্ধতাও ছিল তার। তবুও তার নিজের বিশ্বাস ছিল কিছু বিশেষ—এক অন্তঃস্থ অনুভূতি—যে প্রচেষ্টা বা যোগ্যতা ছাড়াই সে অনেক কিছু অর্জন করবে। তাই, যখন সে পঁয়ত্রিশের কোঠায় পৌঁছাল, আর প্রায় দশজন সমালোচক হঠাৎ তর্ক জুড়ে দিল কে তার প্রতিভা প্রথম আবিষ্কার করেছে, তখন সে একটুও আশ্চর্য হল না। কিন্তু তার প্রশান্তিকে কেউ কেউ আত্মতুষ্টি ভেবেছিল; অথচ তা ছিল আস্থাপূর্ণ বিনয়। জোনাস তার সাফল্যের কৃতিত্ব নিজের গুণের চেয়ে বরং ভাগ্যকেই দিয়েছিল।
সে বেশ বিস্মিতই হল, যখন এক চিত্রব্যবসায়ী এমন একটি মাসিক ভাতার প্রস্তাব দিলেন, যা তাকে সমস্ত দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি দেবে। কিন্তু রাতো—পেশায় স্থপতি, এবং স্কুলজীবন থেকেই জোনাস, এমনকি তার সেই নক্ষত্রটিরও অনুরাগী—বৃথাই বোঝাতে চাইল যে এই ভাতা তাকে কেবল কষ্টেসৃষ্টে মানানসই একটি জীবনই দেবে, আর তাতে ব্যবসায়ীর বিন্দুমাত্র ক্ষতিও হবে না।
“তবু তো…” বলল জোনাস।
রাতো, সে যা-ই হাতে নিত, নিজের জোরেই সাফল্য আদায় করত, বন্ধুকে ধমক দিল। “‘তবু তো’ মানে কী? দরদাম করতে হয়।”
কিন্তু কিছুতেই ফল হলো না। জোনাস মনে মনে তার নক্ষত্রটিকে ধন্যবাদ জানাল।
“আপনি যেমন চান,” সে ব্যবসায়ীকে বলল।
তারপর সে পিতার প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে যে দায়িত্ব পালন করছিল তা ত্যাগ করে সম্পূর্ণভাবে নিজেকে চিত্রকলায় সমর্পণ করল।
“এ তো সত্যিই ভাগ্য!”—বলত সে। সত্যিই মনে মনে ভাবত, “এ সেই সৌভাগ্য, যা অবিরত চলেছে।” স্মৃতির যতদূর পর্যন্ত ফিরে যেতে পারত, সর্বত্রই সে এই সৌভাগ্যকে কর্মরত দেখতে পেত।
এইভাবেই সে বাবা-মায়ের প্রতি এক কোমল কৃতজ্ঞতা পোষণ করত—প্রথমত, তাঁরা তাকে কিছুটা উদাসীনতার সঙ্গে মানুষ করেছিলেন, আর সেই অবহেলাই তাকে স্বপ্নে ডুবে থাকার অবকাশ দিয়েছিল; দ্বিতীয়ত, তাঁরা আলাদা হয়ে গিয়েছিলেন, পরকীয়ার কারণে। অন্তত তার বাবা তাই দাবি করতেন। তবে তিনি উল্লেখ করতে ভুলে যেতেন যে সেই পরকীয়াটি ছিল একটু বিশেষ ধরনের। তিনি তাঁর স্ত্রীর সেবামূলক কাজ সহ্য করতে পারতেন না। অথচ তিনি ছিলেন প্রকৃত অর্থে এক ধর্মনিরপেক্ষ সাধ্বী—নির্মল সরলতায় নিজেকে দুঃখী মানবতার সেবায় সমর্পণ করেছিলেন। কিন্তু স্বামীর দাবি ছিল, স্ত্রীর পুণ্যও তাঁরই অধিকারে—তার সদ্গুণের উপরও যেন একচ্ছত্র মালিকানা তাঁর।
“যথেষ্ট হয়েছে,”—বলতেন সেই ওথেলো,—“দরিদ্রদের জন্য এভাবে বঞ্চিত হতে হতে আমি আর পারছি না।”
এই ভুল-বোঝাবুঝিই শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠেছিল জোনাসের পক্ষে লাভজনক। তার বাবা-মা—পড়ে হোক বা শুনে—জেনেছিলেন যে বিবাহবিচ্ছিন্ন দম্পতির সন্তানদের মধ্যেই নাকি স্যাডিস্টিক খুনির দৃষ্টান্ত মেলে। ফলে এমন কোনো অশুভ বিকাশের বীজ অঙ্কুরেই বিনষ্ট করতে তাঁরা আদর-যত্নে একপ্রকার নীরব প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছিলেন। তাঁদের বিশ্বাস ছিল, সন্তানের চেতনায় যে অভিঘাত লেগেছে, তার লক্ষণ যত কম দৃশ্যমান, বিপদ তত গভীর। অদৃশ্য ক্ষতই সবচেয়ে ভয়ংকর—এই ধারণাই তাঁদের ক্রমাগত উদ্বিগ্ন করে রাখত। জোনাস যদি নিছক জানাত যে সে নিজের কাজ নিয়ে সন্তুষ্ট, তাতেই তাঁদের স্বাভাবিক উৎকণ্ঠা হঠাৎ আতঙ্কের কাছাকাছি পৌঁছে যেত। সঙ্গে সঙ্গে স্নেহ এবং মনোযোগ দ্বিগুণ হয়ে উঠত, এবং তখন শিশুটির আর কিছুই চাওয়ার অবকাশ থাকত না।
তার এই কথিত দুর্ভাগ্যই অবশেষে জোনাসকে এনে দিল এক নিবেদিতপ্রাণ, ভ্রাতৃসুলভ বন্ধু—রাতো। রাতোর বাবা-মা তাঁদের পুত্রের এই ছোট্ট সহপাঠীকে প্রায়ই বাড়িতে আমন্ত্রণ জানাতেন; ছেলেটির দুর্দশা তাঁদের মনে সহানুভূতি জাগাত। তাঁদের করুণাভরা কথাবার্তা বলিষ্ঠ ও ক্রীড়াপ্রবণ পুত্রটির মনে এক অদ্ভুত সংকল্পের জন্ম দিল—সে স্থির করল, এই ছেলেটির জন্য সে রক্ষাকবচ হয়ে দাঁড়াবে; সেই ছেলে, যার অক্লেশে পাওয়া সাফল্য তাকে আগেই নিঃশব্দে মুগ্ধ করেছিল। এই মুগ্ধতা ও স্নেহমিশ্রিত ঔদার্য মিলে যে বন্ধুত্বের জন্ম দিল, জোনাস তা-ও জীবনের অন্য সবকিছুর মতোই অকপট স্বাভাবিকতায় গ্রহণ করল।
বিশেষ কোনো পরিশ্রম ছাড়াই পড়াশোনা শেষ করে জোনাসের ভাগ্য আবারও প্রসন্ন হলো—পিতার প্রকাশনা-প্রতিষ্ঠানে একটি পদ পেল, এবং সেই সূত্রেই পরোক্ষভাবে তার চিত্রকর-সত্তার আভাস ধরা দিল।
ফ্রান্সের অন্যতম প্রধান প্রকাশক ছিলেন জোনাসের পিতা। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল—সংস্কৃতির সংকট যত ঘনীভূত হবে, বইয়ের ভবিষ্যৎ ততই উজ্জ্বল হবে। “ইতিহাসই দেখায়,” তিনি বলতেন, “মানুষ যত কম পড়ে, তত বেশি বই কেনে।”
এই বিশ্বাসের যুক্তিতেই তিনি নিজে খুব কমই পাণ্ডুলিপি পড়তেন; লেখকের ব্যক্তিত্ব কিংবা বিষয়টির সমসাময়িক গুরুত্ব দেখেই প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিতেন। (এই হিসাবে একমাত্র চিরকালীন বিষয় ছিল ‘যৌনতা’; শেষ পর্যন্ত সে দিকেই তিনি প্রায় বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠেছিলেন।) তাঁর আসল মনোযোগ থাকত চমকপ্রদ উপস্থাপনার কৌশল এবং বিনামূল্যের প্রচারের উপায় আবিষ্কারে। ফলে ‘পাঠ বিভাগ’-এর দায়িত্বের পাশাপাশি জোনাসের হাতে এসে পড়ল প্রচুর অবসর—যার সদ্ব্যবহার তাকে খুঁজে নিতে হলো। সেই সূত্রেই তার সঙ্গে চিত্রকলার পরিচয়।
প্রেমে আগ্রহ জাগাতে শেষ পর্যন্ত দরকার হয়েছিল একটি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার—রাতো অতিরিক্ত জোরে চালাচ্ছিল, জোনাস ছিল তার পেছনে। ডান হাত ব্যান্ডেজে মোড়া, একঘেয়েমিতে বিরক্ত জোনাস তখনই প্রেমে আগ্রহ দেখাতে পারল। এবারও সে গুরুতর দুর্ঘটনার মধ্যেই তার ভাগ্যের শুভ প্রভাবের ইঙ্গিত দেখল। এটি না ঘটলে, লুইস পুলাঁর প্রতি তার যথার্থ মনোযোগ দেওয়ার সময় ও সুযোগ সে কখনো পেত না। রাতোর অবশ্য মত ছিল ভিন্ন। তার চোখে লুইসের মধ্যে বিশেষ কিছুই ছিল না যা অত মনোযোগ দাবি করতে পারে। ছোটখাটো কিন্তু দৃঢ়গঠনের রাতো কেবল লম্বা নারীদেরই পছন্দ করত।
“আমি বুঝি না, এই পিঁপড়েটার মধ্যে তুমি কী দেখলে,” সে বলত।
বস্তুত লুইস ছিল খাটো, শ্যামবর্ণা; চুল আর চোখ দুটোই কালো—কিন্তু গড়নে সুষম, মুখশ্রী আকর্ষণীয়। লম্বা ও বলিষ্ঠ জোনাস এই ‘পিঁপড়ে’র প্রতি বিশেষ অনুরাগী হয়ে উঠেছিল—আংশিক কারণ, সে ছিল পরিশ্রমী। লুইসের প্রকৃত পেশা বা মানসিক অভ্যাস ছিল ক্রিয়াশীল থাকা। এ ধরনের উদ্যম আশ্চর্যরকমভাবে মানিয়ে গিয়েছিল জোনাসের অলসতা এবং তার সুবিধাভোগী স্বভাবের সঙ্গে।
লুইস প্রথমে সাহিত্যে নিজেকে নিয়োজিত করল; অন্তত যতদিন পর্যন্ত মনে করেছিল যে জোনাস প্রকাশনার কাজের প্রতি আগ্রহী। সে সবকিছু পড়ত, কোনো বাছাই বা শর্ত ছাড়া, এবং কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই যেকোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে সক্ষম হয়ে উঠল। এতে জোনাস তার প্রতি মুগ্ধ হল এবং মনে করল যে বই পড়ার প্রয়োজন আর নেই—কারণ লুইসের দেওয়া তথ্য-ভাণ্ডার থেকে সমসাময়িক আবিষ্কার ও জ্ঞানের সারমর্ম সহজেই জানতে পারছে।
“কেউ খারাপ বা কুশ্রী, এটা বলা উচিত নয়; বরং বলা উচিত যে সে খারাপ বা কুশ্রী হতে চায়,” লুইস দৃঢ়ভাবে বলত। রাতো এই সূক্ষ্ম পার্থক্যটিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করত এবং জোর দিয়ে বলত, এই ধারণা শেষ পর্যন্ত গোটা মানবজাতিকে নিন্দার দৃষ্টিতে দেখার দিকে ঠেলে দেবে। কিন্তু লুইস স্পষ্টভাবে দেখাল, যেহেতু এই সত্যকে একদিকে জনপ্রিয় পত্রপত্রিকা এবং অন্যদিকে দার্শনিক প্রবন্ধগুলো সমর্থন করে, তাই এই ভাবনা সর্বজনীন এবং আর বিতর্কের বিষয় নয়। “যেমন তুমি চাও,” বলত জোনাস, এবং পরক্ষণেই এই কঠিন উপলব্ধি ভুলে গিয়ে আবার তার ভাগ্যের নক্ষত্রের স্বপ্নে মগ্ন হয়ে পড়ত।
যে মুহূর্তে লুইস বুঝতে পারল যে জোনাসের আসল আগ্রহ শুধুমাত্র চিত্রকলাতেই সীমাবদ্ধ, সে সাহিত্যের জগৎ ত্যাগ করে তৎক্ষণাৎ চিত্রকলায় মনোনিবেশ করল। এরপর লুইস জোনাসকে সঙ্গে নিয়ে বিভিন্ন জাদুঘর ও প্রদর্শনীতে ঘুরতে শুরু করল। যদিও জোনাস সমসাময়িক শিল্পীদের কাজ পুরোপুরি বোঝার ক্ষমতা রাখত না এবং নিজের সরল শিল্পচেতনায় মাঝে মাঝে লজ্জিত বোধ করত, তবুও আনন্দিত ছিল এই ভেবে যে শিল্পকলার নানা দিক সম্পর্কে প্রচুর ধারণা ও তথ্য পাচ্ছে। সত্যি বলতে, পরদিনই সে প্রায়শই সেই শিল্পীদের নাম পর্যন্ত ভুলে যেত। তবুও, লুইস সঠিকভাবেই স্মরণ করিয়ে দিয়েছিল তার সাহিত্যিক যুগের দৃঢ় বিশ্বাস—আসলে আমরা কিছুই সম্পূর্ণভাবে ভুলে যাই না। নিশ্চিতই নক্ষত্র জোনাসকে রক্ষা করেছিল, যার ফলে সে স্মৃতির নিশ্চয়তা এবং ভুলে যাওয়ার স্বাচ্ছন্দ্য একসাথে উপভোগ করতে পারছিল।
কিন্তু লুইসের আত্মত্যাগের ভাণ্ডার জোনাসের দৈনন্দিন জীবনে সবচেয়ে উজ্জ্বলভাবে ঝলমল করত। সেই সদয় দেবদূত তাকে জুতো, পোশাক ও অন্যান্য বস্ত্র কেনার ঝামেলা থেকে মুক্তি দিত—যা সাধারণ মানুষের সংক্ষিপ্ত জীবনকে আরও সংক্ষিপ্ত করে দেয়। তিনি দৃঢ় সংকল্পের সঙ্গে নিজের কাঁধে তুলে নিত সময় অপচয় করার অগণিত নিত্যনতুন উপায়—সামাজিক নিরাপত্তার জটিল নথিপত্র থেকে শুরু করে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব দপ্তরের নিয়মাবলীর ক্রমাগত পরিবর্তন পর্যন্ত।
“ঠিক আছে,” বলল রাতো, “কিন্তু সে তোমার বদলে দাঁতের ডাক্তারের কাছে যেতে পারবে না।”
ঠিকই, বাস্তবিকই সে যেত না, কিন্তু ফোন করে সেরা সময়ে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ঠিক করত। ছোটগাড়ির তেল বদলানো, ছুটিতে হোটেল রুম বুক করা, উনুনের কয়লা যোগান—সব কাজ সে-ই সামলাত। জোনাস যে উপহার দিতে চাইত, তা নিজে কিনে পাঠাত; ফুলের তোড়াও বেছে পাঠাত; এমনকি কিছু সন্ধ্যায় জোনাসের অনুপস্থিতিতে বাড়িতে গিয়ে বিছানাটি এমনভাবে গুছিয়ে রাখত, যাতে রাতের ঘুমের আগে আর কোনো অসুবিধা না থাকে।
সেই একই উৎসাহ ও উদ্যমে সে নববিবাহিত জীবনের প্রতিটি আয়োজন নিখুঁতভাবে পরিচালনা করল। জোনাসের প্রতিভা স্বীকৃতি পাওয়ার অনেক আগেই—দুই বছর আগে—সে তাকে মেয়রের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য সঙ্গে নিয়ে গেল। সে এমনভাবে ভ্রমণ পরিকল্পনা করল, যাতে সফরে প্রতিটি জাদুঘর ও প্রদর্শনী সুন্দরভাবে দেখার সুযোগ মেলে। এর আগে, বাসস্থানের সংকটের মধ্যেও সে খুঁজে বের করেছিল একটি তিন কক্ষের অ্যাপার্টমেন্ট, যেখানে ফিরে এসে তারা বসবাস শুরু করল। এরপর, সে পরপর দুটি সন্তান পৃথিবীতে আনল—একটি ছেলে, একটি মেয়ে—আর তার পরিকল্পনা অনুযায়ী তৃতীয় সন্তানের আশা পূর্ণ হল ঠিক তখন, যখন জোনাস তার পিতার প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ছেড়ে চিত্রকলায় নিজেকে পুরোপুরি উৎসর্গ করল।
সন্তান জন্মের পর থেকেই তার সম্পূর্ণ মনোযোগ প্রথমে প্রথম সন্তানের দিকে, পরে ক্রমে অন্য সন্তানদের দিকে কেন্দ্রীভূত হল। সে এখনও স্বামীকে সাহায্য করতে চাইত, কিন্তু সময়ের অভাবে তা আর সম্ভব ছিল না। অবশ্যই, সে কিছুটা অনুশোচনা করত যে জোনাসকে সে অবহেলা করছ, কিন্তু তার দৃঢ় এবং সংকল্পবদ্ধ স্বভাব তাকে এই অনুশোচনায় বেশি সময় নষ্ট করতে দেয়নি। “কিছু করার নেই,” সে বলত, “প্রত্যেকেরই নিজস্ব কাজের জগৎ থাকে।” এই বাক্য জোনাসকে আনন্দ দিয়েছিল, কারণ সে, তার সময়ের অন্যান্য শিল্পীর মতো, একজন প্রকৃত শিল্পকার হিসেবে পরিচিত হতে চেয়েছিল। ফলে, এই শিল্পকার—অল্প কিছুটা—অবহেলিত হয়ে পড়ল এবং নিজের জুতো নিজেকেই কিনতে হল। তবু এতে জোনাসের মনে একধরনের সন্তুষ্টি জন্ম নিল। অবশ্যই, দোকানে যাওয়ার জন্য তাকে কষ্ট করতে হত, কিন্তু সেই কষ্টের বিনিময়ে সে পেল এমন কিছু একাকী সময়—যা দাম্পত্য সুখকে আরও মূল্যবান করে তোলে।
গৃহস্থালির অসংখ্য সমস্যার ভিড়ে একটিই ক্রমে সবকিছুকে ছাপিয়ে উঠল—বসবাসের স্থানসংকট। একই গতিতে সময় ও স্থান যেন তাদের চারপাশে ক্রমশ সঙ্কুচিত হয়ে পড়ছিল। সন্তানদের জন্ম, জোনাসের নতুন পেশার অনিশ্চয়তা, সঙ্কীর্ণ বাসস্থানের আবদ্ধতা, আর সেই সামান্য মাসিক ভাতা—যা বৃহত্তর একটি আশ্রয়ের স্বপ্নকেও নিষিদ্ধ করে রেখেছিল—সব মিলিয়ে লুইস ও জোনাসের যুগপৎ জীবন ও কর্মের জন্য অবশিষ্ট ছিল খুবই সীমিত এক পরিসর।
অ্যাপার্টমেন্টটি ছিল রাজধানীর পুরনো অঞ্চলে, অষ্টাদশ শতাব্দীর এক প্রাচীন হোটেলের প্রথম তলায়। এই পাড়ায় বহু শিল্পী বাস করতেন। তাঁরা এই নীতির প্রতি অনুগত ছিলেন যে শিল্পে নতুনের অনুসন্ধান পুরনো কাঠামোর মধ্যেই করা উচিত। জোনাস, যে নিজেও এই নীতিতে বিশ্বাস করত, এই পাড়ায় বাস করতে পেরে খুব আনন্দিত ছিল।
প্রাচীন বলতে যা বোঝায়, অন্তত সেই অর্থে অ্যাপার্টমেন্টটি সত্যিই প্রাচীন ছিল। তবে কয়েকটি অত্যন্ত আধুনিক বিন্যাস তাকে এক অভিনব চেহারা দিয়েছিল; তার প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল—মেঝের পরিসর কম হলেও মাথার উপর ছিল উদার বিস্তার। ঘরগুলো ছিল অস্বাভাবিক উঁচু, দৃষ্টিনন্দন বৃহৎ জানালায় অলঙ্কৃত। তাদের মহিমান্বিত অনুপাত দেখে মনে হয়, এগুলো মূলত অভ্যর্থনা ও আড়ম্বরের জন্য নির্মিত হয়েছিল। কিন্তু নগর-ঘনত্বের ক্রমবর্ধমান চাপ এবং স্থাবর সম্পত্তি থেকে নিয়মিত মুনাফা আদায়ের অর্থনৈতিক তাগিদ পরপর মালিকদের বাধ্য করেছিল সেই বিস্তৃত কক্ষগুলোকে পার্টিশন দিয়ে খণ্ডিত করতে এবং এভাবে যত বেশি সম্ভব ছোট ছোট খোপ তৈরি করে উচ্চমূল্যে ভাড়াটে-পালের কাছে ভাড়া দিতে।
তবু তারা গর্বের সঙ্গে তুলে ধরত, যাকে তারা বলত—“অসাধারণ বায়ু-পরিসর”। সুবিধাটি অস্বীকার করার উপায় ছিল না—শুধু এটুকু মানতে হত যে, ঘরগুলোর উচ্চতাও সমানভাবে ভাগ করা মালিকদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। অন্যথায়, তারা নিশ্চয়ই প্রয়োজনীয় ত্যাগ স্বীকার করে উদীয়মান, বিবাহপ্রবণ ও সন্তানবহুল সেই প্রজন্মের জন্য আরও কয়েকটি আশ্রয়-খোপ বানাতে দ্বিধা করত না।
ঘনাকার ‘বায়ু-পরিসর’ কেবল সুবিধাই দিত, এমন নয়। শীতে এত উঁচু কক্ষ গরম রাখা কঠিন ছিল—ফলে মালিকদের দুঃখজনকভাবে (!) গরমের খরচ বাড়াতে হত। আর গ্রীষ্মে অ্যাপার্টমেন্টটি আক্ষরিক অর্থেই আলোর দ্বারা আক্রান্ত হত; জানালায় কোনো খড়খড়ি ছিল না। জানালার উচ্চতা এবং কাঠের কাজের ব্যয়ের কথা ভেবে মালিকেরা সে উদ্যোগ নেননি। মোটা পর্দাই তো একই কাজ করতে পারে—আর তার খরচ যেহেতু ভাড়াটেদেরই বহন করতে হত, সেহেতু মালিকদের পক্ষে সেটাই ছিল অধিক সুবিধাজনক ব্যবস্থা।
তবে সহায়তায় তারা কখনও কৃপণ ছিলেন না—নিজেদের দোকান থেকেই তারা অপ্রতিদ্বন্দ্বী দামে পর্দা সরবরাহ করতেন। বস্তুত, বাড়ি ভাড়া দেওয়াটা তাঁদের কাছে ছিল দয়া প্রদর্শনের ক্রীড়া—এক প্রকার বিনোদনমূলক মানবদরদ। নিত্যদিনের ব্যবসায় এই নবীন রাজপুরুষেরা সুক্ষ্ম সুতির কাপড় ও মখমলই বিক্রি করতেন।
জোনাস অ্যাপার্টমেন্টটির সুবিধা দেখে এতটাই মুগ্ধ হয়েছিল যে, অসুবিধাগুলোও সে সহজেই মেনে নিল। মালিকের সঙ্গে গরমের খরচ নিয়ে সে বলল, “আপনি যেভাবে ঠিক করবেন।” পর্দার বিষয়ে সে লুইসের সঙ্গে একমত ছিল। লুইস মনে করেছিল, শুধু শোবার ঘরে পর্দা লাগালেই যথেষ্ট; বাকি জানালা খোলা রাখা যাবে। “আমাদের তো কিছুই গোপন করার নেই,” বলল সে, সেই সরল হৃদয়-মানুষটি।
সবচেয়ে বড় ঘরটির সৌন্দর্য জোনাসকে বিশেষভাবে মুগ্ধ করেছিল, বিশেষত এর বিশাল উঁচু ছাদ, যেখানে কোনো আলো লাগানোই সম্ভব ছিল না। একটি সরু করিডোর পার হয়ে এই বড় ঘরে প্রবেশ করা যেত, যা দুটি ছোট, পাশাপাশি ঘরের সঙ্গে যুক্ত। করিডোরের একেবারে শেষ প্রান্তে ছিল রান্নাঘর, একটি ল্যাট্রিন এবং একটি সংকীর্ণ কক্ষ, যাকে স্নানঘর হিসেবে ব্যবহার করা যেত—তবে শর্ত হলো সেখানে সম্পূর্ণ খাড়া একটি শাওয়ার বসাতে হবে আর সম্পূর্ণ স্থির অবস্থায় জলধারা গ্রহণে রাজি থাকতে হবে।
ছাদের অস্বাভাবিক উচ্চতা আর কক্ষগুলোর সংকীর্ণতা—এই দুই মিলে অ্যাপার্টমেন্টটিকে এক অদ্ভুত স্থাপত্যে পরিণত করেছিল। প্রায় পুরোপুরি কাচের দরজা-জানালায় ঘেরা ঘরগুলোতে আসবাবপত্র রাখা ছিল বেশ দুষ্কর। উজ্জ্বল, তীক্ষ্ণ আলোয় আলোকিত ঘরে মানুষগুলোকে মনে হত যেন একটি খাড়া অ্যাকোরিয়ামের ভেতরে লুদিয়নের মতো ভেসে বেড়াচ্ছে।
উপরন্তু, জানালাগুলো এমনভাবে সারিবদ্ধ ছিল যে একটার ঠিক সামান্য দূরত্বে আরেকটা, এবং তাতে চোখে পড়ত পরের জানালার উপরের নকশা-কাটা অংশ, যা আবার দ্বিতীয় ছোট জায়গায় খুলত। “এটা তো একেবারে আয়নার ঘর,” বলত জোনাস, আনন্দ প্রকাশ করতে না পেরে।
রাতোর পরামর্শে, ছোট ঘরদুটির একটিকে করা হলো তাদের শোবার ঘর, আরেকটি আগত সন্তানের জন্য। বড় ঘরটি দিনের বেলায় জোনাসের স্টুডিও হিসেবে কাজ করবে, সন্ধ্যা ও খাবারের সময়ে হবে পারিবারিক ঘর। রান্নাঘরে দাঁড়িয়েও খাওয়া যেত, যদি জোনাস বা লুইস তা করতে রাজি হত।
রাতো অ্যাপার্টমেন্টের ভেতরে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে বেশ কিছু উদ্ভাবনী ব্যবস্থা যোগ করল। রোলিং দরজা, ভাঁজ করা টেবিল-চেয়ার, চটজলদি খুলে ফেলা যায় এমন তাক—সব মিলিয়ে সে আসবাবের ঘাটতি মিটিয়েছিল এবং অ্যাপার্টমেন্টটিকে একটি সত্যিকারের বিস্ময় বাক্স করে তুলেছিল।
কিন্তু যখন ঘরগুলো ক্যানভাসে ভরে গেল এবং ছোট বাচ্চাদের দৌড়ঝাপ ও হট্টগোল আরও বেড়ে গেল, তখন নতুনভাবে পরিকল্পনা করা জরুরি হয়ে পড়ল। তৃতীয় সন্তানের জন্মের আগে, জোনাস দিনের বেলায় বড় ঘরটিকে ব্যবহার করত স্টুডিও হিসেবে, লুইস শোবার ঘরে বসে সোয়েটার বুনত, আর ছোট দুটি শিশু শেষের ঘরটি দখল করে নিজেদের খেলার জায়গা বানাত এবং সুযোগ পেলেই পুরো অ্যাপার্টমেন্ট জুড়ে ছোটাছুটি ও দৌড়ঝাপ করত। সেই সময় ঠিক করা হলো, নবজাতককে জোনাসের স্টুডিওর এক কোণে রাখা হবে। জোনাস ক্যানভাসগুলোকে পর্দার মতো সাজিয়ে সেই কোণটি আলাদা করে দিল, যাতে শিশুটির ডাক শুনলে সহজেই সাড়া দেওয়া যায়।
জোনাসকে নিজেকে ব্যস্ত করার কোনো দরকার পড়ত না; লুইস আগেভাগেই সতর্ক থাকত। সে শিশুর চিৎকারের জন্য অপেক্ষা করত না; ঘরে ঢুকত নীরবভাবে, সবসময় পা টিপে টিপে। জোনাস, এই নিঃশব্দ সতর্কতা দেখে মুগ্ধ হয়ে, একদিন লুইসকে বলল যে সে অতটা সংবেদনশীল নয় এবং তার পায়ের শব্দে কাজ চালিয়ে যাওয়া তার পক্ষে মোটেই অসুবিধাজনক নয়। লুইস উত্তরে বলল, তার আসল উদ্দেশ্য বাচ্চাকে না জাগানো। লুইসের এই মাতৃত্বের গভীরতা দেখে জোনাস মুগ্ধ হল এবং নিজের ভুল বুঝতে পেরে হেসে ফেলল। ফলে, সে বলতে সাহস পেল না যে লুইসের সতর্ক পদক্ষেপগুলো, প্রকৃতপক্ষে, সরাসরি প্রবেশের চেয়ে বেশি বিরক্তিকর। কারণ, প্রথমত, এই সতর্ক পদক্ষেপগুলো দীর্ঘ সময় চলত; দ্বিতীয়ত, লুইসের ভঙ্গিমা—হাত প্রশস্ত করে, বুক সামান্য পেছনের দিকে ঝুঁকিয়ে, এক পা খুব উঁচু করে সামনে তোলা—এর ফলে সে অনিচ্ছাকৃতভাবে দৃশ্যমান হয়ে উঠত। মাঝে মাঝে লুইসের এই অতিসতর্ক পদক্ষেপে ক্যানভাসগুলোতে আঘাত লাগত, আর সেই শব্দে শিশু জেগে ওঠে শক্তিশালী কণ্ঠে অসন্তোষ প্রকাশ করত। পিতা, তার পুত্রের শক্তিশালী শ্বাসপ্রশ্বাসের ক্ষমতা দেখে মুগ্ধ হয়ে দ্রুত ছুটে গিয়ে তাকে আদর করত, পরে লুইসও তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসত। এরপর জোনাস ক্যানভাসগুলো আবার দাঁড় করাত। তুলি হাতে রেখে, মুগ্ধভাবে পুত্রের জোরালো এবং কর্তৃত্বপূর্ণ কণ্ঠ শুনত।
একই সময় জোনাসের সাফল্য তাকে অনেক বন্ধু এনে দিল। তারা কখনও ফোন করে, কখনও হঠাৎ করে এসে পড়ত। ফোনটি অনেক ভাবনা-চিন্তার পর স্টুডিওতে রাখা হয়েছিল; কিন্তু সেটি প্রায়ই বেজে উঠত এবং শিশুটির ঘুম নষ্ট করত। শিশুটির কান্না তখন মিশে যেত ফোনের জোরালো ঘণ্টাধ্বনির সঙ্গে। যদি কখনও লুইস অন্য দুই শিশুর দেখাশোনায় ব্যস্ত থাকত, সে তাদের নিয়েই তাড়াতাড়ি ছুটে আসার চেষ্টা করত। কিন্তু প্রায়ই দেখা যেত, জোনাসের এক হাতে শিশু, অন্য হাতে তুলি, আর কাঁধ ও কানের ফাঁকে চেপে ধরা ফোনের রিসিভার—যার ওপাশ থেকে ভেসে আসছে স্নেহভরা মধ্যাহ্নভোজের নিমন্ত্রণ।
জোনাস বিস্মিত হত—নিজের কথাবার্তা যে নিতান্তই সাধারণ, তবু কেউ তার সঙ্গে স্বেচ্ছায় মধ্যাহ্নভোজ করতে চায়! তবে দিনের কাজ অক্ষত রাখতে সে রাতের নিমন্ত্রণই বেশি পছন্দ করত। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে, বেশিরভাগ সময়েই বন্ধুর কেবল ওই দিনের দুপুরটাই ফাঁকা থাকত, এবং সে একান্ত জোর করেই সেটি ‘প্রিয় জোনাস’-এর জন্য তুলে রাখতে চাইত।
প্রিয় জোনাস তখন সায় দিত—“আপনি যেমন চান!”—ফোন রেখে বলত, “আহা, কী ভদ্র লোক!” তারপর শিশুটিকে লুইসের হাতে ফিরিয়ে দিয়ে আবার ছবির সামনে দাঁড়াত; যদিও অচিরেই দুপুর কিংবা রাতের আহার তার কাজ ব্যাহত করত।
খাবারের সময় ক্যানভাসগুলো সরিয়ে টেবিল খুলে ছেলেমেয়েদের সঙ্গে বসত। খাওয়ার সময়ও জোনাস এক চোখে তার অসমাপ্ত ছবিটির দিকে তাকিয়ে থাকত। প্রথমদিকে অন্তত সে মনে করত, বাচ্চারা খুব ধীরে ধীরে চিবোচ্ছে ও গিলছে—ফলে প্রতিটি গ্রাস অযথাই দীর্ঘ হয়ে উঠছে। কিন্তু একদিন পত্রিকায় পড়ল, ধীরে খেলে নাকি হজম ভালো হয়। তারপর থেকে প্রতিটি গ্রাস দীর্ঘায়িত করতেই সে স্বস্তি পেতে শুরু করল—এমনকি সামান্য আনন্দও।
অনেক সময়, তার নতুন বন্ধুরা দেখা করতে আসত। রাতো অবশ্য কেবল রাতের খাবারের পরেই আসত। দিনে সে অফিসে থাকত। তাছাড়া, সে জানত—চিত্রশিল্পীরা দিনের আলোতেই কাজ করে। কিন্তু জোনাসের নতুন বন্ধুরা ছিল প্রায় সবাই শিল্পী বা সমালোচক গোত্রের। কেউ এঁকেছিল, কেউ আঁকতে চলেছিল, আর বাকিরা যা আঁকা হয়েছিল বা হবে, তা নিয়েই ব্যস্ত থাকত। সকলেই, নিশ্চতই, শিল্পের কাজকে অত্যন্ত উচ্চ আসনে রাখত এবং আধুনিক বিশ্ব ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগ করত—যে ব্যবস্থা এইসব কাজের সাধনা ও শিল্পীর জন্য অপরিহার্য ধ্যানচর্চাকে এত কঠিন করে তোলে। বিকেলের পর বিকেল তারা এ নিয়ে আক্ষেপ করত, জোনাসকে অনুনয় করত কাজ চালিয়ে যেতে, যেন তারা সেখানে নেই এমন ভান করতে এবং তাদের সঙ্গে সংকোচ না করতে—কারণ তারা বুর্জোয়া নয় এবং শিল্পীর সময়ের মূল্য কী, তা তারা জানে। জোনাস এমন বন্ধু পেয়ে সত্যিই খুশি ছিল—যারা মনে করত তাদের উপস্থিতিতেও অবাধে কাজ চলতে পারে। তাই সে নিজের ছবির কাছে ফিরে যেত, প্রশ্নের উত্তর দিত, আর তাকে বলা কৌতুকগুলিতে হেসে উঠত।
এই স্বাভাবিক ভঙ্গিই তার বন্ধুদের ক্রমে আরও স্বচ্ছন্দ করে তুলত। তাদের মেজাজ এতটাই অকৃত্রিম ছিল যে খাওয়ার সময় কখন পেরিয়ে যেত, তা তারা ভুলে যেত। শিশুদের স্মৃতি ভালো ছিল। তারা ছুটে এসে ভিড়ে মিশে যেত, চিৎকার করত, অতিথিদের কোলে উঠত, এক হাঁটু থেকে আরেক হাঁটুতে লাফাত। প্রাঙ্গণে, ঘেরা আকাশের চৌকো অংশে, আলো অবশেষে ঢলে পড়ত, আর জোনাস তুলি নামিয়ে রাখত। তখন আর কিছু নয়—যা আছে তাই দিয়ে বন্ধুদের খাওয়ানো, আর গভীর রাত পর্যন্ত কথা বলা; শিল্প নিয়ে অবশ্যই, কিন্তু আরও বেশি করে সেই চিত্রশিল্পীদের নিয়ে, যারা সেখানে উপস্থিত ছিল না—অযোগ্য, নকলবাজ, স্বার্থান্বেষী। জোনাস ভোরে উঠতে ভালোবাসত—প্রথম আলোর সময়টুকু উপভোগ করতে। সে জানত যে তা কঠিন হবে, যে প্রাতঃরাশ সময়মতো তৈরি থাকবে না, এবং যে সে নিজেও ক্লান্ত থাকবে। তবু এক সন্ধ্যায় এত কিছু শেখার আনন্দ সে পেত—যা অদৃশ্যভাবে হলেও তার শিল্পে নিশ্চয়ই কাজে লাগবে। “শিল্পে, যেমন প্রকৃতিতে, কিছুই নষ্ট হয় না,” সে বলত। “এ তো সত্যিই ভাগ্যই।”
বন্ধুদের সঙ্গে কখনও কখনও শিষ্যরাও যোগ দিত—জোনাস এখন নিজেই অনুসরণীয় হয়ে উঠেছিল। প্রথমে এতে সে বিস্মিত হয়েছিল—তার কাছ থেকে কেউ কী শিখবে, যখন তার নিজেরই আবিষ্কার করার এত কিছু বাকি? তার ভেতরের শিল্পী অন্ধকারে হাঁটছিল; সত্যিকারের পথ সে কীভাবে শেখাবে? কিন্তু শিগগিরই সে বুঝল, শিষ্য মানেই যে কিছু শিখতে চায়, তা নয়। বরং অনেক সময় শিষ্য হওয়া মানে গুরুকে শেখানোর সেই নিঃস্বার্থ আনন্দ উপভোগ করা। তখন সে বিনয়ের সঙ্গে এই অতিরিক্ত সম্মান গ্রহণ করল। শিষ্যরা তাকে দীর্ঘক্ষণ ধরে ব্যাখ্যা করত, সে কী এঁকেছে এবং কেন। জোনাস তার কাজে এমন অনেক অভিপ্রায় খুঁজে পেতে লাগল যা তাকে একটু বিস্মিতই করত, আর অনেক কিছু, যা সে সেখানে রাখেইনি। সে নিজেকে সামান্য ভাবত; শিষ্যদের কল্যাণেই হঠাৎ নিজেকে ধনী আবিষ্কার করল। কখনও কখনও, এতদিন অজানা সে-সম্পদের মুখোমুখি হয়ে, সামান্য গর্ব তাকে ছুঁয়ে যেত। “সত্যিই তো,” সে নিজেকে বলত। “একেবারে পেছনের ওই মুখটা—চোখে পড়ে শুধু সেটাই। ওরা যে ‘পরোক্ষ মানবিকীকরণ’ বলে, তা বুঝি না। তবু, এই প্রভাবের সাহায্যে আমি যথেষ্ট দূর এগিয়েছি।” কিন্তু শিগগিরই সে এই অস্বস্তিকর নৈপুণ্যের দায় তার নক্ষত্রের ওপর চাপিয়ে দিত। “দূর পর্যন্ত যায় নক্ষত্রই,” সে বলত। “আমি তো লুইস আর বাচ্চাদের কাছেই থাকি।”
শিষ্যদের আরেকটি গুণ ছিল: তারা জোনাসকে নিজের প্রতি আরও কঠোর হতে বাধ্য করত। তাদের কথাবার্তায় তাকে এত উঁচুতে তুলে ধরত—বিশেষ করে তার সততা ও কর্মশক্তি—যে এরপর আর কোনো দুর্বলতার অবকাশ তার নিজের কাছেই থাকল না। এভাবে তার সেই পুরনো অভ্যাসটি চলে গেল—কঠিন কোনো অংশ শেষ করে একটু মিষ্টি বা চকোলেট মুখে দেওয়া, তারপর আবার কাজে ফেরা। একান্তে হলে, সে হয়তো গোপনে এই দুর্বলতার কাছে হার মানত। কিন্তু তার শিষ্য ও বন্ধুদের প্রায় স্থায়ী উপস্থিতিই তাকে এই নৈতিক অগ্রগতিতে সাহায্য করেছিল। তাদের সামনে চকোলেট খেতে তার একটু সংকোচ হত, আর এত সামান্য এক বাতিকের জন্য সেই আকর্ষণীয় আলাপচারিতা থামাতে সে পারত না।
তাছাড়া, শিষ্যরা চাইত যে সে তার নান্দনিকতার প্রতি বিশ্বস্ত থাকুক। জোনাস দীর্ঘ পরিশ্রম করত, কদাচিৎ পাওয়া সেই ক্ষণিক বিদ্যুৎ-চমকের জন্য—যে চমকে বাস্তবতা তার চোখে অমল আলোয় হঠাৎ ফুটে উঠত। নিজের নান্দনিকতা সম্পর্কে তার ধারণা ছিল অত্যন্ত অস্পষ্ট। শিষ্যদের ছিল বরং একাধিক—পরস্পরবিরোধী ও চূড়ান্ত—ধারণা; এ বিষয়ে তারা গম্ভীর ছিল। জোনাস মাঝে মাঝে খেয়ালখুশির আশ্রয় নিতে চাইত—শিল্পীর সেই বিনম্র বন্ধু। কিন্তু কিছু ক্যানভাস যখন তাদের ধারণা থেকে সরে যেত, শিষ্যদের ভ্রুকুঞ্চন তাকে তার শিল্প নিয়ে আরও একটু ভাবতে বাধ্য করত—যা তার জন্য নিখাদ লাভই ছিল।
শিষ্যরা আর-একভাবে জোনাসকে সাহায্য করত—তাদের নিজেদের কাজ সম্পর্কে তার মতামত দিতে বাধ্য করে। প্রায় প্রতিদিনই কেউ না কেউ একটি অর্ধসমাপ্ত ক্যানভাস এনে সেটি জোনাস ও তার সামনে থাকা ছবির মাঝখানে রেখে দিত, যাতে সেটিও সেরা আলোয় থাকে। মতামত দিতেই হত। এতদিন শিল্পকর্ম বিচার করার নিজের গভীর অক্ষমতা নিয়ে জোনাসের এক গোপন লজ্জা ছিল। হাতে গোনা কয়েকটি ছবি—যেগুলো তাকে উচ্ছ্বসিত করত—এবং স্পষ্ট কাঁচা আঁকিবুঁকি বাদ দিলে, সবকিছুই তার কাছে একই সঙ্গে আকর্ষণীয় ও উদাসীন মনে হত। ফলে তাকে বিচারের এক অস্ত্রাগার গড়ে তুলতে হল। শিষ্যরা, রাজধানীর অন্য শিল্পীদের মতোই, মোটের ওপর প্রতিভাবান ছিল; আর তাদের প্রত্যেককে সন্তুষ্ট করতে হলে যথেষ্ট সূক্ষ্ম পার্থক্য টানতেই হত। এই সৌভাগ্যজনক বাধ্যবাধকতা তাকে তার শিল্প নিয়ে একটি শব্দভাণ্ডার এবং কিছু মতামত গড়ে তুলতে বাধ্য করল। এই প্রয়াসে তার স্বাভাবিক সদয়তা একটুও তিক্ত হল না। খুব তাড়াতাড়িই সে বুঝল, শিষ্যরা তার কাছে সমালোচনা চায় না—সেগুলোর তাদের দরকারও নেই—বরং চায় উৎসাহ, এবং সম্ভব হলে প্রশংসা। শুধু চাই, প্রশংসা ঝরে পড়ুক। জোনাস আর কেবল সদয় রইল না; সে সদয় হল কৌশলে।
এভাবেই জোনাসের সময় বয়ে যেত—বন্ধু ও শিষ্যদের মাঝখানে ছবি আঁকতে আঁকতে; তারা ইজেলের চারপাশে সমকেন্দ্রিক সারিতে বসত। কখনও কখনও সামনের বাড়ির জানালায় প্রতিবেশীরাও দেখা দিত এবং তার দর্শকদলে যোগ দিত। সে আলোচনা করত, মত বিনিময় করত, কাছে আনা ক্যানভাসগুলো দেখত, লুইসের আসা–যাওয়ায় হাসত, বাচ্চাদের সান্ত্বনা দিত এবং টেলিফোনের ডাকে আন্তরিক সাড়া দিত—তবু একবারের জন্যও তুলি হাতছাড়া করত না; ফাঁক পেলেই শুরু করা ছবিতে আরেকটি আঁচড় যোগ করত। এক অর্থে তার জীবন পরিপূর্ণ ছিল; তার সব ঘণ্টাই কাজে ভরা, এবং সে ভাগ্যকে ধন্যবাদ দিত যে একঘেয়েমি তাকে স্পর্শ করেনি। তবু ছবি পূর্ণ করতে অনেক আঁচড় লাগে; আর সে কখনও কখনও ভাবত, একঘেয়েমিরও ভালো দিক আছে—অবিরাম পরিশ্রমে তা থেকে বেরিয়ে আসা যায়।
বন্ধুরা যত বেশি তাকে টানছিল, তার কাজের গতি তত কমছিল। এমনকি যে বিরল সময়গুলোতে সে একেবারে একা থাকত, তখনও নিজেকে এত ক্লান্ত মনে করত যে দ্বিগুণ জোরে কাজ করতে পারত না। আর সেই সময়গুলোতে সে কেবল এমন এক নতুন ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখত, যেখানে বন্ধুত্বের আনন্দ ও একঘেয়েমির গুণ মিলিয়ে দেওয়া যাবে।
সে এ কথা লুইসকে জানাল। লুইসও উদ্বিগ্ন ছিল—বড় দুই সন্তানের দ্রুত বেড়ে ওঠা এবং তাদের ঘরের স্বল্পতা নিয়ে। সে প্রস্তাব দিল, বড়দের বড় ঘরে রাখা হবে, তাদের বিছানা একটি পর্দা দিয়ে আড়াল করা যাবে; শিশুটিকে নিয়ে যাওয়া হবে ছোট ঘরে, সেখানে টেলিফোনে তার ঘুম ভাঙবে না। যেহেতু শিশুটি তেমন জায়গা নেয় না, ছোট ঘরটি জোনাস তার কাজের জন্য ব্যবহার করতে পারবে। বড় ঘরটি দিনে অতিথি-আড্ডার কাজে লাগবে; জোনাস সেখানে যাওয়া–আসা করবে, বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করবে বা কাজ করবে—এই ভরসায় যে তার একান্ত থাকার প্রয়োজন তারা বুঝবে। তাছাড়া, বড়দের শোয়াতে হলে সন্ধ্যাগুলো স্বাভাবিকভাবেই সংক্ষিপ্ত করতে হবে।
“চমৎকার,” একটু ভেবে বলল জোনাস।
“আরও একটা কথা,” বলল লুইস, “তোমার বন্ধুরা যদি তাড়াতাড়ি চলে যায়, আমরা একটু বেশি সময় একসঙ্গে থাকতে পারব।”
জোনাস তার দিকে তাকাল। লুইসের মুখে হালকা বিষণ্নতার ছায়া ভেসে উঠেছিল। আবেগাপ্লুত হয়ে সে তাকে বুকে টেনে নিল, সমস্ত স্নেহ দিয়ে চুম্বন করল। এক মুহূর্তের জন্য তারা সুখী হল—যেমন ছিল বিবাহের শুরুর দিনগুলোতে। কিন্তু লুইস নিজেকে সামলে নিল; ঘরটি হয়তো জোনাসের জন্য খুব ছোট হয়ে যাবে।
লুইস একটি ভাঁজ করা মাপজোখের ফিতা নিয়ে এল। হিসেব করে তারা দেখল, তার নিজের এবং শিষ্যদের ক্যানভাসে ঘর ভরা থাকায়, সে সাধারণত যে জায়গায় কাজ করে, তা আসলে নতুন নির্ধারিত জায়গার চেয়ে খুব বেশি বড় নয়। জোনাস দেরি না করে স্থানবদলের কাজে লেগে গেল।
সৌভাগ্যক্রমে, সে যত কম কাজ করছিল, তার খ্যাতি ততই বাড়ছিল। প্রতিটি প্রদর্শনী আগেভাগেই প্রতীক্ষিত ও উদযাপিত হতো। সত্যি বলতে, অল্প কয়েকজন সমালোচক—যাদের মধ্যে তার স্টুডিওর দুই নিয়মিত দর্শকও ছিল—তাদের উষ্ণ পর্যালোচনায় দু-একটি আপত্তি যোগ করত। কিন্তু শিষ্যদের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া সেই ছোটখাটো বিপত্তি পুষিয়ে দিত—বরং তার চেয়েও বেশি। তারা জোর দিয়ে বলত, প্রথম পর্বের ছবিগুলোকে তারা সর্বোচ্চ স্থানেই রাখে, কিন্তু বর্তমান অনুসন্ধানগুলো এক সত্যিকারের বিপ্লবের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
যখনই প্রথম পর্বের কাজগুলোর অতিরিক্ত প্রশংসা হতো, জোনাসের মনে সামান্য বিরক্তি জাগত; তবু সে উচ্ছ্বাসভরে ধন্যবাদ জানাত। কেবল রাতো গজগজ করত: “আজব সব লোক... তারা তোমাকে মূর্তির মতো, স্থির অবস্থাতেই ভালোবাসে। তাদের কাছে বেঁচে থাকাই যেন নিষেধ!” কিন্তু জোনাস শিষ্যদের পক্ষ নিত। “তুমি বুঝবে না,” সে রাতোকে বলত, “তুমি তো আমি যা-ই করি, সবই ভালোবাসো।” রাতো হেসে বলত, “তোমার আলাদা ছবিগুলো নয়—আমি ভালোবাসি তোমার আঁকাকে।”
সব মিলিয়ে, তার ছবিগুলো জনপ্রিয়ই রইল। উষ্ণ অভ্যর্থনা পাওয়া একটি প্রদর্শনীর পর, ব্যবসায়ী নিজে থেকেই মাসিক ভাতা বাড়ানোর প্রস্তাব দিলেন। জোনাস কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তা মেনে নিল। “আপনার কথা শুনলে তো মনে হয়, আপনি টাকাকেও গুরুত্ব দেন,” বললেন ব্যবসায়ী। এমন সহজ-সরল ভঙ্গি চিত্রশিল্পীর হৃদয় জয় করল।
কিন্তু জোনাস যখন দাতব্য নিলামের জন্য একটি ছবি দিতে চাইল, ব্যবসায়ী শুধু জিজ্ঞেস করলেন—সেখান থেকে কিছু ফেরত আসবে তো? জোনাস তা জানত না। তখন ব্যবসায়ী বললেন, চুক্তির শর্ত মেনে চলাই ভালো—আর সেই চুক্তি অনুযায়ী ছবির বিক্রির একচেটিয়া অধিকার তার। “চুক্তি তো চুক্তিই,” তিনি বললেন। তাদের চুক্তিতে দানের কথা উল্লেখ ছিল না। “যেমন আপনার ইচ্ছা,” বলেছিল চিত্রশিল্পী।
নতুন ব্যবস্থাটি জোনাসের জন্য কেবল সন্তোষই বয়ে আনল। এখন সে প্রায়ই নিজেকে আলাদা রাখতে পারত, যাতে অসংখ্য চিঠির উত্তর দিতে পারে—যেগুলোর জবাব না দেওয়া তার ভদ্রতাবোধে বাঁধত। কিছু চিঠি ছিল তার শিল্প নিয়ে; অন্যগুলো—সংখ্যায় অনেক বেশি—ছিল লেখকের নিজের বিষয়ে: কেউ চেয়েছে চিত্রকর হওয়ার বাসনায় উৎসাহ, কেউ পরামর্শ বা আর্থিক সাহায্য। সংবাদপত্রে তার নাম যত ঘনঘন উঠতে লাগল, ততই তাকে, সবার মতোই, নানা ক্ষোভজনক অন্যায়ের বিরুদ্ধে হস্তক্ষেপ করতে অনুরোধ করা হতে লাগল। জোনাস উত্তর দিত, শিল্প নিয়ে লিখত, কৃতজ্ঞতা জানাত, পরামর্শ দিত, নিজের একটি টাই না কিনে সামান্য সাহায্য পাঠাত, এবং শেষে তার সামনে আনা ন্যায্য প্রতিবাদপত্রগুলোতে স্বাক্ষর করত।
“তুমি এখন রাজনীতি করছ নাকি? এটা লেখক আর কুৎসিত মহিলাদের জন্য রেখে দাও,” বলত রাতো। না, সে কেবল সেই সব প্রতিবাদেই স্বাক্ষর করত, যেগুলো নিজেকে কোনো দলীয় মনোভাবের বাইরে বলে ঘোষণা করত। কিন্তু সবই সেই সুন্দর স্বাধীনতার দাবিদার ছিল।
সপ্তাহের পর সপ্তাহ জোনাস পকেটভর্তি চিঠি নিয়ে ঘুরত—চিঠিগুলো অবহেলিতই থাকত, তবু ক্রমাগত নতুন করে জমত। সে সবচেয়ে জরুরি চিঠিগুলোর উত্তর দিত—যেগুলো সাধারণত অচেনাদের কাছ থেকে আসত—আর যেগুলো সময় নিয়ে উত্তর দেওয়ার দাবি করত, অর্থাৎ বন্ধুদের চিঠি, সেগুলো ফাঁকা সময়ের জন্য তুলে রাখত। এত দায়িত্ব তাকে উদ্দেশ্যহীন ঘোরাঘুরি এবং মনকে নিরুদ্বেগ রাখার সুযোগ—এই দুটো থেকেই বঞ্চিত করত। সে সবসময় নিজেকে পিছিয়ে পড়া মনে করত, সবসময়ই অপরাধী—এমনকি মাঝেমধ্যে কাজ করার সময়েও।
লুইস দিন দিন সন্তানদের নিয়ে আরও ব্যস্ত হয়ে উঠছিল; আর ঘরের যেসব কাজ অন্য পরিস্থিতিতে জোনাস নিজেই করত, সেগুলোও সামলাতে সামলাতে ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছিল। এতে জোনাস দুঃখ পেত। সে তো কাজ করত নিজের আনন্দের জন্য, আর লুইসের ভাগেই পড়ত সবচেয়ে কঠিনটা।
“ফোন!” বড় ছেলে চিৎকার করত, আর জোনাস ছবির কাজ ফেলে সেখানে যেত, তারপর আরেকটি নিমন্ত্রণ পেয়ে শান্ত মনে ফিরে আসত।
ফোন বা দরজা থেকে ফিরতেই কোনো বন্ধু, কোনো শিষ্য—কখনো দুজনেই—শুরু করা কথোপকথন শেষ করতে তাকে ছোট ঘর পর্যন্ত অনুসরণ করত। ধীরে ধীরে সবাই করিডোরে অভ্যস্ত হয়ে গেল। তারা সেখানে দাঁড়িয়ে গল্প করত, দূর থেকে তাকে কথার সাক্ষী করত, কিংবা হঠাৎ ছোট ঘরে ঢুকে পড়ত।
“এখানে অন্তত আপনাকে একটু দেখা যায়, সময় নিয়ে,” তারা বলত।
জোনাস নরম হয়ে যেত। “শেষ পর্যন্ত, আমরা আর দেখা-সাক্ষাৎই করি না।”
অনেক সময়ই তারা ছিল এমন বন্ধু, যাদের সঙ্গেই সে বরং দেখা করতে চাইত। কিন্তু সময় তার হাতে ছিল না। সব নিমন্ত্রণ সে গ্রহণ করতে পারত না। পৃথিবী আর মানুষকে আঁকা আর একই সঙ্গে তাদের সঙ্গে বাস করা—কঠিন।
ফলে চিঠি জমতেই থাকল। শিষ্যরা কোনো ঢিলেমি বরদাস্ত করত না, আর ভদ্রসমাজও এখন ভিড় জমাতে লাগল—যাদের চিত্রকলায় আগ্রহ জোনাস মন্দ বলে মনে করত না, কারণ চাইলে সবার মতো ইংল্যান্ডের রাজপরিবার বা নামী রেস্তোরাঁ নিয়েই মেতে থাকতে পারত। সত্যি বলতে, তাদের বেশিরভাগই ছিল ভদ্রমহিলা, কিন্তু ব্যবহার ছিল খুবই সহজ-সরল। তারা নিজেরা ছবি কিনত না; বরং বন্ধুদের স্টুডিওতে নিয়ে আসত, এই আশায়—যা প্রায়ই অপূর্ণই থাকত—বন্ধুরাই তাদের হয়ে কিনবে। তবে তারা লুইসকে সাহায্য করত, বিশেষ করে অতিথিদের জন্য চা তৈরি করে দিত।
কাপগুলো এক হাত থেকে অন্য হাতে যেতে যেতে রান্নাঘর থেকে করিডোর পেরিয়ে বড় ঘরে যেত, আবার ফিরে এসে ছোট্ট স্টুডিওতে গিয়ে থামত। সেখানে হাতে গোনা কয়েকজন বন্ধু ও দর্শকই ঘর ভরিয়ে দিত, আর জোনাস আঁকতে থাকত—যতক্ষণ না তাকে তুলি নামিয়ে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে সেই কাপটি নিতে হতো, যা কোনো আকর্ষণীয়া বিশেষভাবে তার জন্য ভরে দিত।
সে চা পান করত, ইজেলে সদ্য রাখা শিষ্যের স্কেচটি দেখত, বন্ধুদের সঙ্গে হাসি-ঠাট্টা করত, হঠাৎ থেমে রাতে লেখা চিঠির প্যাকেটটি পোস্ট করে দিতে কাউকে অনুরোধ করত, পায়ের কাছে হোঁচট খেয়ে পড়ে যাওয়া ছোট ছেলেটিকে তুলে দাঁড় করাত, ফটোগ্রাফির জন্য পোজ দিত, এমন সময় শোনা যেত—“জোনাস, ফোন!” সে চায়ের কাপ উঁচিয়ে ক্ষমা চাইতে চাইতে করিডোর ভরা ভিড় চিরে বেরিয়ে যেত, ফিরে এসে ছবির এক কোণে তুলি ছোঁয়াত, আবার থেমে সেই আকর্ষণীয়াকে আশ্বাস দিত যে অবশ্যই তার প্রতিকৃতি আঁকবে, তারপর ইজেলের সামনে ফিরতেই আরেকটা ডাক—“জোনাস, একটা সই!”
—“কী ব্যাপার, ডাকপিয়ন?”
—“না, কাশ্মীরের বন্দিদের নিয়ে।”
—“আচ্ছা, আচ্ছা!”
সে তখন দরজার দিকে ছুটত, তরুণ প্রতিবাদীর বক্তব্য শুনত, জিজ্ঞেস করত এতে রাজনীতির কিছু আছে কি না, সম্পূর্ণ আশ্বস্ত হয়ে—এবং শিল্পীদের বিশেষাধিকারের সঙ্গে যে দায় জড়িয়ে আছে সে বিষয়ে গুটি কতক নীতিকথা শুনে—সই করত, তারপর ফিরে এসে এমন কারও মুখোমুখি হত যার নাম ঠিক বুঝে ওঠার আগেই তাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হতো—কোনো সদ্য বিজয়ী মুষ্টিযোদ্ধা, অথবা দূর দেশের এক মহৎ নাট্যকার। নাট্যকার পাঁচ মিনিট তার সামনে দাঁড়িয়ে আবেগভরা চোখে বোঝাতে চাইত যা ফরাসি না জানার কারণে স্পষ্ট করে বলতে পারত না, আর জোনাস আন্তরিক সহানুভূতিতে মাথা নেড়ে যেত। সৌভাগ্যক্রমে এই অচলাবস্থা ভাঙত আরেক আগন্তুকের হঠাৎ আবির্ভাবে—এক মন্ত্রমুগ্ধকর বক্তা, যে মহান চিত্রশিল্পীর সঙ্গে আলাপ করতে ব্যাকুল।
জোনাস খুশি সুরে বলত সে সত্যিই খুশি—এবং সে তা ছিলও—তবু পকেটের ভেতর চিঠির প্যাকেটটা হাতড়ে দেখত, তুলি শক্ত করে ধরত, ছবির একটি অংশে ফের মন দেওয়ার প্রস্তুতি নিত, কিন্তু তার আগেই সদ্য আনা শিকারি কুকুর-জোড়ার জন্য কৃতজ্ঞতা জানাতে হতো, তাদের শোবার ঘরে আটকে রেখে ফিরে এসে দাতার মধ্যাহ্নভোজের নিমন্ত্রণ গ্রহণ করত, আর তখনই লুইসের চিৎকারে আবার ছুটে যেত এই দেখে নিতে যে কুকুরদুটি অ্যাপার্টমেন্টে থাকতে শেখেনি, তাদের টেনে নিয়ে যেত বাথরুমে, যেখানে তারা এমন একনিষ্ঠতায় চিৎকার জুড়ে দিত যে শেষ পর্যন্ত আর তাদের শোনাই যেত না।
মাঝে মাঝে কাজের ফাঁকে সে লুইসের দৃষ্টি টের পেত—দৃষ্টিটা কেমন যেন বিষণ্ন। অবশেষে দিন ফুরোত, কেউ কেউ বিদায় নিত, কেউ বড় ঘরে থেকে যেত, আর আবেগভরে তাকিয়ে দেখত লুইস কীভাবে শিশুদের শুইয়ে দিচ্ছে—এক টুপি-পরা সুশ্রী মহিলার কোমল উপস্থিতিতে, যিনি দুঃখ করছিলেন যে অল্প পরেই তাঁকে নিজের সেই বিশাল বাড়িতে ফিরে যেতে হবে, যেখানে জীবন দোতলায় বিস্তৃত, অথচ জোনাসদের বাড়ির মতো এত ঘনিষ্ঠ, এত উষ্ণ নয়।
এক শনিবার বিকেলে রাতো একটি কাপড়-শুকোনোর যন্ত্র নিয়ে এল, যা রান্নাঘরের ছাদে লাগানো যায়। সে দেখল অ্যাপার্টমেন্ট ভরা লোকজন। ছোট ঘরে কয়েকজন সমঝদার তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে ছিল, আর জোনাস আঁকছিল সেই মহিলার প্রতিকৃতি, যিনি তাঁকে কুকুরদুটো উপহার দিয়েছিলেন; আর একই সঙ্গে এক সরকারি শিল্পী জোনাসেরই ছবি আঁকছিলেন। লুইস বলেছিল—সরকারের হুকুম—নাম হবে “শিল্পীর কর্মযজ্ঞ।”
রাতো ঘরের এক কোণে সরে গিয়ে বন্ধুকে দেখছিল—সে স্পষ্টতই নিজের কাজে নিমগ্ন। এক সমঝদার, যিনি রাতোকে চিনতেন না, ঝুঁকে বললেন, “দেখেছেন, বেশ ভালোই দেখাচ্ছে!” রাতো কিছু বলল না।
“আপনিও আঁকেন বোধহয়। আমিও আঁকি। বিশ্বাস করুন, ও নামছে।”
— “এত তাড়াতাড়ি?”
— “হ্যাঁ। সাফল্যের বিরুদ্ধে কেউ টিকতে পারে না। ও শেষ।”
— “নামছে, না শেষ?”
— “যে শিল্পী নামতে শুরু করেছে, সে শেষ। দেখুন, ওর আর কিছু আঁকার নেই। এখন ওকেই আঁকা হচ্ছে—দেয়ালে টাঙানোর জন্য।”
পরে, গভীর রাতে, শোবার ঘরে লুইস, রাতো আর জোনাস চুপ করে ছিল—জোনাস দাঁড়িয়ে, আর বাকি দু’জন বিছানার এক কোণে বসে। শিশুরা ঘুমোচ্ছিল, কুকুরগুলোকে শহরের বাইরে রেখে আসা হয়েছিল। একটু আগে লুইস অনেকগুলো বাসন ধুয়েছে, জোনাস আর রাতো সেগুলো মুছে দিয়েছে। ক্লান্তিটা ভালো লাগছিল।
“একজন কাজের লোক রাখো,” প্লেটের স্তূপের দিকে তাকিয়ে বলেছিল রাতো।
“তাকে রাখব কোথায়?” লুইস মৃদু বিষণ্নতায় বলেছিল।
“তুমি কি খুশি?” হঠাৎ জিজ্ঞেস করল রাতো।
জোনাস হাসল, তবে তাকে ক্লান্ত দেখাচ্ছিল।
“হ্যাঁ। সবাই খুব ভালো।”
“না। সাবধান হও। সবাই ভালো নয়।”
“কারা?”
“তোমার আঁকিয়ে বন্ধুরা।”
“জানি। অনেক শিল্পীই এমন। ওরা নিজেদের অস্তিত্ব নিয়েই নিশ্চিত নয়—সবচেয়ে বড়রাও নয়। তাই ওরা প্রমাণ খোঁজে, বিচার করে, নিন্দা করে। এতে ওরা শক্তি পায়—এটাই ওদের অস্তিত্বের প্রাথমিক প্রমাণ। ওরা খুব একা।”
রাতো মাথা নাড়ল।
"আমার কথা বিশ্বাস করো," জোনাস বলল, "আমি ওদের চিনি। ওদের ভালোবাসতে হয়।"
—"আর তুমি," রাতো জিজ্ঞেস করল, "তোমার কি অস্তিত্ব আছে? তুমি তো কখনো কারও সম্পর্কে খারাপ কিছু বলো না।"
জোনাস হাসল, "ওহ! আমি প্রায়ই মানুষের ব্যাপারে খারাপ ভাবি। কিন্তু তারপর ভুলে যাই।" সে আবার গম্ভীর হয়ে বলল, "না, আমি নিশ্চিত নই যে আমার অস্তিত্ব আছে। কিন্তু আমি জানি, একদিন আমি সত্যিই নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পাব।"
রাতো লুইসকে তার মতামত জিজ্ঞেস করল। লুইস ক্লান্তি ঝেড়ে বলল, “জোনাস ঠিক বলেছে। অতিথিদের মতামত কোনো গুরুত্ব রাখে না। একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ হলো জোনাসের কাজ। আর আমি মনে করি, ছোট শিশুটি কখনও কখনও জোনাসের কাজে বিঘ্ন ঘটায়। ও বড় হচ্ছে, তাই এখন একটা ডিভানের প্রয়োজন, যা আরও জায়গা নেবে। যতক্ষণ না আমরা বড় অ্যাপার্টমেন্টে উঠছি, ততক্ষণ কীই-বা করা যায়।”
জোনাস শোবার ঘরের দিকে তাকাল। “এটা পুরোপুরি ঠিকঠাক নয়,” সে বলল, “খাটটা খুব বড়। তবে ঘরটা সারাদিন খালি থাকে।”
লুইস ভাবল: অন্তত ঘরটাতে জোনাস একা কাজ করতে পারবে; কেউও নিশ্চয় আমাদের বিছানায় শুতে আসবে না।
“তোমার কী মনে হয়?” লুইস এবার রাতোকে জিজ্ঞেস করল।
রাতো জোনাসের দিকে তাকাল। জোনাস জানালার বাইরে উল্টোদিকের বাড়িগুলো দেখছিল। তারপর চোখ তুলে নক্ষত্রহীন আকাশের দিকে চাইল এবং পর্দা টেনে দিল। ফিরে এসে সে হাসিমুখে রাতোকে দেখে পাশে বিছানায় চুপচাপ বসল।
লুইস, স্পষ্টতই ক্লান্ত, বলল, “আমি শাওয়ার নিতে যাচ্ছি।”
দুই বন্ধু একা থাকল। জোনাস অনুভব করল, রাতোর কাঁধ তার কাঁধে স্পর্শ করছে। সে তাকাল না, শুধু বলল, “আমি ছবি আঁকতে ভালোবাসি। সারাজীবন, দিন-রাত ছবি আঁকতে চাই। এটা কি সৌভাগ্যের নয়?”
রাতো স্নেহভরে বলল, “হ্যাঁ, নিঃসন্দেহে এটা সৌভাগ্য।”
বাচ্চারা বড় হচ্ছিল। তাদের সুখী ও সুস্থ দেখে জোনাস খুশি হত। তারা স্কুলে যেত আর বিকেল চারটেয় ফিরে আসত। তবু প্রতি শনিবার বিকেল, বৃহস্পতিবার, এবং মাঝে মাঝে দীর্ঘ ছুটির দিনগুলো জোনাস উপভোগ করত। তারা এখনও এত বড় হয়নি যে শান্তভাবে খেলতে পারত, কিন্তু যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল অ্যাপার্টমেন্টকে তাদের ঝগড়া আর হাসিতে ভরিয়ে তুলতে। মাঝে মাঝে জোনাসকে তাদের শান্ত করতে হত, শাসাতে হত, এমনকি মিথ্যে ভান করে মারারও অভিনয় করতে হত।
বাসন ধোয়া, পোশাকের বোতাম লাগানো—এসব কাজ লুইস একা করতে পারছিল না। যেহেতু কোনো কাজের লোক রাখা সম্ভব ছিল না, আর এত অন্তরঙ্গ পরিবেশে কাউকে আনাও যায় না, জোনাস পরামর্শ দিল লুইসের বিধবা বোন রোজ়কে সাহায্যের জন্য ডাকা হোক, যার একটি বড় মেয়েও আছে।
“ঠিক,” লুইস বলল, “রোজ়কে চাইলে আমরা বের করে দিতে পারব—কোনও সামাজিক শিষ্টাচারের বাধা নেই।”
এই সমাধান জোনাসকে আনন্দ দিল—লুইসের ক্লান্তি কিছুটা লাঘব হল, আর নিজের বিবেকও শান্ত হলো। আরও ভালো লাগল যখন রোজ় মাঝে মাঝে তার মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে সাহায্যে আসত। দুজনেই ছিল অসাধারণ সদয়; তাদের সততা আর নিঃস্বার্থ মনোভাব সত্যিই প্রশংসনীয়। সাহায্যের জন্য তারা সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করত, আর সময় দিতে কখনো কষ্ট পেত না। তাদের নিঃসঙ্গ জীবনের একঘেয়েমি আর লুইসের সহজ-সরলতা তাদের আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছিল।
যেমনটা আশা করা হয়েছিল, কেউই সামাজিক শিষ্টাচারের সীমায় আটকে থাকেনি। দুজন আত্মীয়ই শুরু থেকেই নিজেদেরকে বাড়ির সদস্য মনে করেছিল। বড় ঘরটি একাধিক কাজে ব্যবহৃত হত—খাবার ঘর, কাপড় রাখার ঘর, আর বাচ্চাদের খেলার জায়গা। ছোট ঘরটি, যেখানে তাদের সবচেয়ে ছোট সন্তান ঘুমোত, ছবি রাখার স্টোররুম হিসেবে ব্যবহৃত হত। সেই ঘরে একটি ভাঁজ করা খাটও ছিল, যেখানে রোজ় ঘুমোত যখন তার মেয়ে সঙ্গে থাকত না।
জোনাস এখন শোবার ঘরে, খাট আর জানালার মাঝের ছোট্ট জায়গাটায় কাজ করত। তবে শুরুতে অপেক্ষা করতে হত—প্রথমে বাচ্চাদের ঘর গোছানো হত, তারপর এই ঘর। একবার সব ঠিক হয়ে গেলে আর কেউ তাকে বিরক্ত করত না, শুধু কখনো কেউ কাপড় খুঁজতে আসত—কারণ পুরো বাড়ির একমাত্র আলমারি এই ঘরেই ছিল। অতিথিরাও—কম হলেও—এতটা স্বচ্ছন্দ হয়ে গিয়েছিল যে, লুইসের আশা অনুযায়ী হয়তো তারা পুরোপুরি শিষ্টাচার মানছিল না—খাটে শুয়ে আরাম করে জোনাসের সঙ্গে গল্প করত। বাচ্চারাও মাঝে মাঝে বাবাকে চুমু দিতে আসত।
“ছবি দেখাও,” তারা বলত। জোনাস তাদের তার আঁকা ছবি দেখাত এবং স্নেহভরে চুমু দিত। যখন তাদের চলে যেতে বলত, তখন তিনি অনুভব করত যে তারা তার হৃদয়কে সম্পূর্ণভাবে ভরে দিয়েছে—একটুখানি শূন্যতা নেই। তাদের ছাড়া তার জীবন শুধুই শূন্যতা আর একাকীত্বের হয়ে যেত। সে তাদের ঠিক ততটাই ভালোবাসত, যতটা ভালোবাসত তার চিত্রকলাকে—কারণ এই পৃথিবীতে, তারা তার ছবির মতোই জীবন্ত।
তবুও, জোনাস আগের তুলনায় কম কাজ করছিল, যদিও সে নিজেই বুঝতে পারছিল না কেন। সে সর্বদাই পরিশ্রমী ছিল, কিন্তু এখন একাকী মুহূর্তগুলোতেও ছবি আঁকা তার জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই সময়গুলোতে সে শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে সময় কাটাত। সবসময়ই সে কিছুটা অন্যমনস্ক থাকত, সহজেই চিন্তায় ডুবে যেত; কিন্তু এখন সে যেন দিবাস্বপ্নে বিভোর হয়ে পড়েছিল। ছবি আঁকার বদলে সে ছবি আঁকা নিয়ে ভাবত, নিজের প্রতিভা ও উদ্দেশ্য নিয়ে চিন্তা করত। “আমি ছবি আঁকতে ভালোবাসি,” সে নিজের কাছে বলত, অথচ হাতে তুলি থাকলেও সেটি পাশে ঝুলিয়ে দিয়ে দূরের রেডিওর শব্দ শুনত।
এই সময় তার খ্যাতি ধীরে ধীরে কমছিল। তাকে নিয়ে এমন প্রবন্ধ আসত, যেগুলোর কিছুতে ছিল চাপা সমালোচনা, কিছু একেবারেই নেতিবাচক, আর কিছু এতটাই বিদ্বেষপূর্ণ যে তার বুকের ভেতরটা কেমন চেপে আসত। তবু সে নিজেকে বোঝাত, এসব আক্রমণ থেকেও লাভ আছে—এসবই তাকে আরও ভালোভাবে কাজ করতে উৎসাহ দেবে। যারা এখনও তার কাছে আসত, তারা আর আগের মতো শ্রদ্ধাশীল ছিল না; বরং তাকে পুরনো বন্ধুর মতো ভাবত, যার সঙ্গে আর শিষ্টাচার মানার প্রয়োজন নেই। যখন সে কাজে ফিরতে চাইত, তারা বলত, “আরে, অনেক সময় আছে!” জোনাস বুঝতে পারত যে একভাবে তারা যেন তাকে নিজেদের মতো ব্যর্থদের দলে ফেলছে। কিন্তু অন্যদিকে, এই নতুন সহমর্মিতার মধ্যেও এক ধরনের উপকার খুঁজে পেত।
রাতো কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলত, “তুমি খুব বোকা। ওরা তোমাকে খুব একটা ভালোবাসে না।”
“না, এখন ওরা আমাকে কিছুটা ভালোবাসে,” জোনাস উত্তর দিত। “সামান্য ভালোবাসাও বিশাল ব্যাপার। সেটা কীভাবে পাওয়া গেল, তাতে কী এসে যায়!”
তাই সে কথা বলত, চিঠি লিখত এবং যতটা পারত, ছবি আঁকত। মাঝে মাঝে, বিশেষ করে রবিবার বিকেলে, যখন বাচ্চারা লুইস আর রোজ়ের সঙ্গে বাইরে যেত, তখন সে সময় নিয়ে মনোযোগ দিয়ে আঁকত। সন্ধ্যায় ছবির কাজটা একটু এগিয়েছে ভেবে সে খুশি হতো। সেই সময় সে আকাশ আঁকত।
যে দিন চিত্র-ব্যবসায়ী তাকে জানালেন যে বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় দুঃখের সঙ্গে তার মাসিক ভাতা কমাতে বাধ্য হচ্ছেন, জোনাস তা মেনে নিল। কিন্তু লুইস উদ্বিগ্ন হল। তখন সেপ্টেম্বর মাস; স্কুল খোলার আগে বাচ্চাদের পোশাকের ব্যবস্থা করতে হবে। লুইস নিজের স্বাভাবিক দৃঢ়তা নিয়ে কাজে নেমে পড়ল, কিন্তু শিগগিরই তার পক্ষে সব সামলানো কঠিন হয়ে উঠল। রোজ় বোতাম লাগাতে আর ছেঁড়াফাটা সারাতে পারত, কিন্তু দর্জির কাজ জানত না। রোজ়ের মৃত স্বামীর এক খুড়তুতো বোন দর্জি ছিল; সে এসে লুইসকে সাহায্য করল। মাঝে মাঝে সে জোনাসের ঘরের এক কোণে চুপচাপ বসে সেলাই করত। সে এত শান্তভাবে বসে থাকত যে লুইস একদিন বলল, তাকে নিয়ে একটি শ্রমজীবী নারীর ছবি আঁকা যেতে পারে। “ভালো ভাবনা,” জোনাস বলল। সে চেষ্টা করল, দুটো ক্যানভাস নষ্ট করল, তারপর আগের শুরু করা একটি আকাশের ছবিতে ফিরে গেল।
পরের দিন সে দীর্ঘক্ষণ অ্যাপার্টমেন্টে হাঁটাহাঁটি করল এবং আঁকার বদলে ভাবল। এক উত্তেজিত শিষ্য একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ এনে তাকে দেখাল—না হলে সে হয়তো পড়তই না—যেখানে সে দেখল, তার ছবি একদিকে অতিমূল্যায়িত, অন্যদিকে সেকেলে। ব্যবসায়ীও ফোন করে বিক্রির ধারার প্রতি তার উদ্বেগ আবার জানালেন। তবুও সে ভাবতে ও স্বপ্ন দেখতে থাকল।
শিষ্যকে সে বলল, প্রবন্ধে কিছু সত্যি কথা আছে, কিন্তু তার সামনে এখনও বহু বছর কাজ করার সময় আছে। ব্যবসায়ীকে বলল, তার উদ্বেগ সে বোঝে, কিন্তু সেই উদ্বেগে তার সায় নেই।। তার একটি বড় কাজ করার আছে—সত্যিই নতুন কিছু। সব আবার শুরু হতে চলেছে। কথা বলতে বলতে সে অনুভব করল, সে সত্য বলছে; তার নক্ষত্র সেখানেই আছে। শুধু ভালোভাবে গুছিয়ে নিলেই যথেষ্ট।
পরের কদিন সে করিডোরে কাজ করার চেষ্টা করল, তার পরের দিন বাথরুমে বৈদ্যুতিক আলো জ্বেলে, তারপরের দিন রান্নাঘরে। কিন্তু এই প্রথম সে চারদিকে যাদেরই দেখত, তাদের উপস্থিতিতে অস্বস্তি বোধ করতে লাগল—যাদের সে প্রায় চিনত না আর নিজের মানুষদেরও, যাদের সে ভালোবাসত। কিছুদিন সে কাজ বন্ধ রেখে শুধু ভাবত। ঋতু অনুকূল হলে সে প্রকৃতির সামনে বসে আঁকত। দুর্ভাগ্যবশত, শীত শুরু হতে চলেছিল; বসন্তের আগে বাইরে বসে দৃশ্য আঁকা কঠিন। তবু সে চেষ্টা করল, পরে ছেড়ে দিল: ঠাণ্ডা তার হৃদয়ের গভীর পর্যন্ত ঢুকে গিয়েছিল।
কয়েক দিন সে তার ক্যানভাসগুলোর সঙ্গে কাটাল—বেশিরভাগ সময় তাদের পাশে বসে, নয়তো জানালার সামনে দাঁড়িয়ে; সে আর আঁকত না। এরপর সে সকালে বেরোনোর অভ্যাস করল। নিজের কাছে ঠিক করত, একটি গাছ, কুঁজো হয়ে থাকা একটি বাড়ি, কিংবা চলতে চলতে দেখা কোনো মুখের রেখা এঁকে ফেলবে। কিন্তু দিনের শেষে দেখা যেত, সে কিছুই করেনি। সামান্যতম প্রলোভন—খবরের কাগজ, আকস্মিক দেখা, দোকানের জানালা, কোনো ক্যাফের উষ্ণতা—তাকে সেখানেই স্থির করে দিত। প্রতিদিন সন্ধ্যায় সে অবিরাম অজুহাতের পর অজুহাত জোগাত তার সেই অপরাধী বিবেকের জন্য, যা তার পিছু ছাড়ত না। সে আঁকবে—এটা নিশ্চিত—এবং আরও ভালো আঁকবে, এই আপাত শূন্যতার পর। ভেতরে কাজ চলছিল, এই তো; তার নক্ষত্র এই অন্ধকার কুয়াশা থেকে ধুয়ে-মুছে, ঝলমল করে বেরিয়ে আসছে!
এদিকে সে আর ক্যাফে ছাড়ত না। মদ তাকে সেই একই উত্তেজনা দিত, যা সে গভীর কাজের দিনগুলিতে পেত—যখন সে তার ছবির কথা ভাবত সেই কোমলতা ও উষ্ণতায়, যা সে কেবল সন্তানদের কাছে পেত। দ্বিতীয় কনিয়াকের পর সে আবার পেত সেই তীক্ষ্ণ অনুভূতি, যা তাকে একই সঙ্গে বিশ্বের অধিপতি ও সেবক বানাত। সে তা উপভোগ করত শুধু শূন্যেই, কর্মহীন হাতে, কোনো ছবিতে তা রূপ না দিয়ে। তবু সেটাই ছিল সেই আনন্দের সবচেয়ে কাছাকাছি, যার জন্য সে বাঁচত; এখন সে ধোঁয়াটে ও কোলাহলপূর্ণ জায়গায় দীর্ঘ সময় বসে স্বপ্ন দেখত।
তবু সে শিল্পীদের যাতায়াতের জায়গা ও পাড়া এড়িয়ে চলত। চেনাশোনা কেউ তার ছবির কথা তুললেই এক ধরনের আতঙ্ক তাকে গ্রাস করত। সে পালাতে চাইত—তা বোঝা যেত—এবং সত্যিই পালিয়ে যেত। সে জানত, তার পেছনে বলা হয়: “ও নিজেকে রেমব্রান্ট ভাবে।” এতে তার অস্বস্তি বাড়ত। সে আর হাসত না; তার পুরনো বন্ধুরা এক অদ্ভুত, কিন্তু অনিবার্য সিদ্ধান্তে পৌঁছাত: “সে আর হাসে না মানে, নিজের উপর ভীষণ সন্তুষ্ট।” এ কথা জানার পর সে ক্রমে আরও গুটিয়ে গেল এবং আরও স্পর্শকাতর হয়ে উঠল।
কোনো ক্যাফেতে ঢুকেই যদি মনে হতো, ভিড়ের মধ্যে কেউ তাকে চিনেছে, তবে তার ভেতর সবকিছু অন্ধকার হয়ে যেত। এক মুহূর্ত সে স্থির দাঁড়িয়ে থাকত, অসহায়ত্ব আর এক অদ্ভুত দুঃখে আচ্ছন্ন; তার মুখ শক্ত হয়ে যেত, ভেতরের অস্থিরতা আর হঠাৎ জেগে ওঠা এক ক্ষুধার্ত বন্ধুত্বের প্রয়োজন আড়াল করে। সে রাতোর সদয় দৃষ্টির কথা ভাবত এবং হঠাৎ বেরিয়ে যেত। “দেখেছিস মুখটা!”—একদিন তার পাশেই কেউ বলেছিল, সে অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার মুহূর্তে।
সে আর শুধু শহরের সেই অদ্ভুত প্রান্তের এলাকাগুলোতেই যেত, যেখানে কেউ তাকে চিনত না। সেখানে সে কথা বলতে পারত, হাসতে পারত; তার স্বাভাবিক সদয় মন ফিরে পেত, আর কেউ তার কাছে কিছু প্রত্যাশা করত না। সে কয়েকজন বন্ধু বানাল, যাদের দাবি কম। বিশেষ করে সে একজন বন্ধুর সঙ্গ পছন্দ করত, যে একটি স্টেশন-ক্যান্টিনে বেয়ারার কাজ করত, যেখানে সে প্রায়শই যেত। একদিন সেই লোকটি তাকে জিজ্ঞেস করল, “আপনি কী করেন?”
“পেইন্টার,” বলেছিল জোনাস।
“চিত্রকর, না বাড়ির রংমিস্ত্রি?”
“চিত্রকর।”
“আচ্ছা!” লোকটি বলেছিল, “কঠিন কাজ।”
তারপর তারা আর এ বিষয়ে কথা বলেনি। কাজটা সত্যিই কঠিন ছিল। কিন্তু জোনাস ভাবছিল, একবার কাজের সঠিক পথটি খুঁজে পেলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।
দিনের পর দিন, একের পর এক পানীয়ের মাঝে, সে নতুন কিছু মানুষের সঙ্গে পরিচিত হলো; কিছু নারী তার পাশে দাঁড়াল, তার কথা শুনল, তার সাহায্য করল। সে তাদের সঙ্গে কথা বলতে পারত, শারীরিক সম্পর্কের আগে বা পরে, এবং মাঝে মাঝে নিজেকে নিয়ে হালকা বড়াই করত। তারা সবকিছু মেনে নিত না, কিন্তু বোঝার চেষ্টা করত। কখনও কখনও জোনাসের মনে হত, তার পুরনো শক্তি আবার ফিরে আসছে।
একদিন, যখন এক বান্ধবী তাকে উৎসাহ দিলে সে ঠিক করল—ফের কাজ শুরু করবে। বাড়ি ফিরে, আবার শোবার ঘরে কাজ করতে চাইল; সেলাইওয়ালী তখন সেখানে ছিল না। কিন্তু এক ঘণ্টার মধ্যেই সে ক্যানভাস সরিয়ে রাখল, লুইসের দিকে তাকিয়ে হাসল—যদিও সে তা দেখল না—আর বেরিয়ে গেল। সে সারাদিন মদ্যপান করল, আর রাত কাটাল বান্ধবীর সঙ্গে, যদিও তাকে কামনা করতে সে সক্ষম ছিল না।
সকালে, লুইসের জীবন্ত যন্ত্রণার ছাপ আর ধ্বংসপ্রাপ্ত মুখের অভিব্যক্তি তাকে স্বাগত জানাল। লুইস জানতে চাইল, সে কি ওই মহিলাকে নিয়েছে। জোনাস বলল, না, সে মাতাল ছিল, তবে পূর্বে অন্যদের সঙ্গে মিলিত হয়েছিল। এই প্রথম, ভগ্ন হৃদয় নিয়ে সে দেখল লুইসের সেই ভেসে যাওয়া মুখ—যা আসে আচমকা বিস্ময় আর অতিরিক্ত যন্ত্রণার ফলে। সে খেয়াল করল, এতদিন এক মুহূর্তও লুইসের কথা মনে করেনি—এবং তা বুঝতে পেরে লজ্জায় আচ্ছন্ন হলো। সে ক্ষমা চাইল; সব শেষ হয়ে গেছে, আগামীকাল আবার আগের মতো সব শুরু হবে। লুইস কথা বলতে পারল না, চোখের জল লুকোতে মুখ ঘোরাল।
পরের দিন, জোনাস ভোরে বেরোল। বৃষ্টি হচ্ছিল। ভিজে একশা হয়ে, হাতে তক্তার বোঝা নিয়ে বাড়ি ফিরল। খবর নিতে আসা দুজন পুরনো বন্ধু বড় ঘরে কফি খাচ্ছিল। “জোনাস বদলে গেছে। সে কাঠের ওপর আঁকতে যাচ্ছে!”—তারা বলল।
জোনাস হাসত: “তা নয়। তবে আমি কিছু নতুন শুরু করছি।”
সে ছোট করিডোর দিয়ে এগোল, যা শাওয়ার, ল্যাটরিন এবং রান্নাঘরের দিকে নিয়ে যায়। দুই করিডোরের কোণে দাঁড়িয়ে, দীর্ঘক্ষণ তাকাল অন্ধকার ছাদ পর্যন্ত উঠে থাকা উঁচু প্রাচীরগুলোতে। প্রয়োজন ছিল একটি সিঁড়ি—যা সে দারোয়ানের কাছে নিতে গেল।
যখন সে সিঁড়ি নিয়ে ফিরে এল, তখন বাড়িতে আরও কয়েকজন এসেছিল। করিডোরের শেষ পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য তাকে অতিথিদের আন্তরিকতা—যারা তাকে পেয়ে আনন্দিত ছিল—এবং পরিবারের জিজ্ঞাসার সঙ্গে লড়াই করতে হল। সেই সময়ে তার স্ত্রী রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এল। সিঁড়ি রেখে জোনাস তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। লুইস তাকিয়ে বলল, “অনুগ্রহ করে, আর কখনো ওটা করো না।” “না, না,” জোনাস বলল, “আমি আঁকব। আমাকে আঁকতেই হবে।” কিন্তু যেন সে নিজেকেই বলছিল; চোখের দৃষ্টি অন্য কোথাও বিভ্রান্ত, মন অন্যত্র। মুখের অভিব্যক্তি শান্ত, কিন্তু ভেতরে কিছু অচেনা উদ্দীপনা জেগে উঠছিল।
সে কাজে লেগে গেল। দেয়ালের মাঝামাঝি উচ্চতায় সে তক্তাগুলো এমনভাবে লাগাল যাতে একটি সরু, কিন্তু উঁচু এবং গভীর লফ্ট—অনেকটা মাচার মতো—তৈরি হল। বিকেলের শেষে সব কাজ সম্পন্ন হল। সিঁড়ির সাহায্যে জোনাস সেই তক্তার উপরে উঠল এবং দৃঢ়তা পরীক্ষা করতে কয়েকবার ঝুলে পড়ল। তারপর সে অন্যদের সঙ্গে দেখা করল। সবাই তাকে আবার এতটা আন্তরিক দেখে খুশি হল।
সন্ধ্যায়, যখন বাড়ি তুলনামূলকভাবে ফাঁকা, জোনাস একটি পেট্রোলের বাতি, একটি চেয়ার, একটি ছোট টেবিল এবং একটি ফ্রেম নিয়ে সেই মাচার উপরে উঠল, তিনজন নারী এবং বাচ্চাদের বিস্মিত দৃষ্টির সামনে।
“এখন,” সে উঁচু আসন থেকে বলল, “আমি কারও উপদ্রব ছাড়াই কাজ করতে পারব।”
লুইস জিজ্ঞেস করল, “তুমি কি এতে নিশ্চিত?”
“অবশ্যই,” জোনাস বলল, “আমার বেশি জায়গা লাগবে না। আমি আরও স্বাধীন বোধ করব। এমন অনেক বিখ্যাত চিত্রশিল্পী ছিলেন যাঁরা মোমবাতির আলোয় ছবি আঁকতেন, আর...”
“মেঝেটা কি যথেষ্ট মজবুত?”
“চিন্তা করো না,” জোনাস বলল, “এটি একটি খুব ভালো সমাধান।” এরপর সে ধীরে ধীরে নিচে নামল।
পরের দিন খুব ভোর ভোর সে মাচায় উঠল। ফ্রেমটি টুলের উপর দেয়ালে সঙ্গে ঠেস দিয়ে রাখল এবং বাতি না জ্বালিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল। একমাত্র শব্দগুলো যা সে সরাসরি শুনতে পাচ্ছিল, তা আসছিল রান্নাঘর বা ল্যাটরিন থেকে। বাকি শব্দগুলো দূরের মনে হচ্ছিল। অতিথির আগমন, দরজার ঘণ্টা বা টেলিফোনের শব্দ, পায়ের শব্দ, কথোপকথন—সবই অর্ধেক ঢেকে আসছিল, যেন সেগুলো রাস্তা বা অন্য কোনো বাড়ি থেকে আসছে। তার উপরে, পুরো অ্যাপার্টমেন্ট যখন দগ্ধ করে দেওয়া তীব্র আলোয় ভেসে যাচ্ছিল, সেখানে এই অন্ধকারটা ছিল বেশ আরামের। মাঝে মাঝে কোনো বন্ধু এসে মাচার নিচে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করত, “তুমি ওখানে কী করছ, জোনাস?”
—“আমি কাজ করছি।”
—“আলো ছাড়া?”
—“হ্যাঁ, আপাতত।”
সে ছবি আঁকছিল না, তবে চিন্তা করছিল। এই অন্ধকার আর আধা-নিস্তব্ধতা যা তার আগের অভিজ্ঞতার তুলনায় মরুভূমি বা কবরের নীরবতার মতো মনে হচ্ছিল, তাকে তার নিজের হৃদয়ের স্পন্দন শোনার সুযোগ করে দিচ্ছিল। মাচায় পৌঁছনো শব্দগুলো যেন আর তাকে ছুঁতে পারছিল না, যদিও সেগুলো তাকে উদ্দেশ্য করেই আসছিল। সে যেন সেই সব মানুষের মতো হয়ে গিয়েছিল যারা একা বাড়িতে ঘুমের মধ্যে মারা যায়, আর সকালে ফাঁকা বাড়ির মধ্যে এক নিঃসঙ্গ দেহের পাশে জোরালো ও আকুল টেলিফোনের রিং বারবার বাজতে থাকে। কিন্তু সে তখনও বেঁচে ছিল, নিজের মধ্যে এই নীরবতা শুনছিল, অপেক্ষা করছিল তার নক্ষত্রের জন্য, যা তখনও ছিল লুকিয়ে, কিন্তু শিগগিরই আবার উঠবে অবিনশ্বর, এই শূন্যতা ভরা দিনের বিশৃঙ্খলার ওপর দিয়ে। “জ্বলো, জ্বলো,” সে বলল। “তোমার আলো থেকে আমাকে বঞ্চিত করো না।”
নক্ষত্র আবার জ্বলবে—এতে তার কোনো সন্দেহ ছিল না। কিন্তু তাকে আরও দীর্ঘ সময় ধরে ধ্যান করতে হবে, কারণ অবশেষে তাকে একা থাকার সুযোগ দেওয়া হয়েছে, তাও পরিবারের থেকে আলাদা না হয়ে। তাকে খুঁজে বের করতে হবে সেই রহস্যটি যা সে এখনও স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করতে পারেনি—যদিও অন্তর্গতভাবে সবসময় জানত— আর সবসময় এমনভাবে আঁকত যেন সে পুরোপুরি জানে। সে এখন পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারছিল—তাকে শেষ পর্যন্ত এই গোপন রহস্যটি সম্পূর্ণভাবে উপলব্ধি করতে হবে যা কেবল শিল্পের রহস্য নয়। তাই সে বাতি জ্বালায়নি।
এখন প্রতিদিন, জোনাস মাচায় উঠত। অতিথিরা ক্রমে কমে আসছিল, লুইসও চিন্তিত থাকত এবং কথাবার্তায় খুব বেশি অংশ নিত না। জোনাস খাওয়ার সময় নিচে নামত, তারপর আবার মাচায় ফিরে আসত। সারাদিন অন্ধকারে স্থির হয়ে বসে থাকত। রাতে, তার স্ত্রীর পাশে শুয়ে পড়ত। কয়েকদিন পর, সে লুইসকে দুপুরের খাবার পৌঁছে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করল; লুইস অত্যন্ত যত্নসহকারে তা করল, যা জোনাসের মনকে ছুঁয়ে গেল। তাকে বারবার বিরক্ত না করার জন্য, জোনাস লুইসকে কিছু খাবার মজুদ করে রাখতে বলল, যা সে মাচায় রেখে দিল। ধীরে ধীরে, জোনাস আর সারাদিন নিচে নামত না, যদিও মজুদ খাবারের খুব সামান্যই সে স্পর্শ করত।
এক সন্ধ্যায়, সে লুইসকে ডেকে কিছু কম্বল চাইল। “আমি আজ রাতটা এখানেই কাটাব।” লুইস তার দিকে তাকাল, মাথা সামান্য পেছনে হেলানো। মুখ খুলল, কিন্তু কিছু বলল না। সে শুধু চিন্তিত ও বিষণ্ণ দৃষ্টিতে জোনাসকে দেখছিল। হঠাৎ জোনাস বুঝতে পারল, লুইসের ওপর কতটা বয়সের ছাপ পড়েছে, আর তাদের জীবনের কঠোর পরিশ্রম তাকে কত গভীরভাবে ক্ষতবিক্ষত করেছে। সে ভাবল, সে কখনও সত্যিই লুইসকে সাহায্য করেনি। কিন্তু কিছু বলার আগেই, লুইস মমতায় হাসল। জোনাসের হৃদয় কেঁপে উঠল।
"যেমন তুমি চাও, সোনা," লুইস বলল।
এখন থেকে সে তার রাতগুলো মাচাতেই কাটাতে লাগল, সেখান থেকে প্রায় আর নিচে নামত না। এর ফলে, বাড়ি ধীরে ধীরে দর্শনার্থীশূন্য হয়ে গেল, কারণ দিনে বা সন্ধ্যায়—কোনো সময়েই আর জোনাসকে দেখা যেত না। কিছু লোককে বলা হত, সে দেশের বাড়ি গেছে; আর মিথ্যে বলতে বলতে ক্লান্ত হয়ে পড়লে অন্যদের বলা হত, সে একটি স্টুডিও পেয়েছে। শুধু রাতোই নিয়মিত আসত। সে সিঁড়ি বেয়ে উঠত; তার বড়, গোল মাথাটা মাচার তলার সমতল ছাড়িয়ে উপরে দেখা দিত।
“কেমন আছ?” সে জিজ্ঞেস করত।
— “দারুণ।”
— “কাজ করছ?”
— “ধরতে পারো।”
— “কিন্তু তোমার তো ক্যানভাসই নেই!”
— “তবু কাজ করছি।”
সিঁড়ি আর মাচার ফাঁক দিয়ে এই কথোপকথন বেশিক্ষণ টিকিয়ে রাখা কঠিন ছিল। রাতো মাথা নেড়ে নিচে নেমে আসত, কখনও ফিউজ, কখনও তালা মেরামত করে লুইসকে সাহায্য করত, তারপর আর সিঁড়িতে না উঠেই বিদায় জানাতে আসত; অন্ধকার থেকে জোনাস জবাব দিত, “বিদায়, ছেলেবেলার বন্ধু।”
এক সন্ধ্যায়, জোনাস তার সম্ভাষণের সঙ্গে একটি “ধন্যবাদ” যোগ করল।
“ধন্যবাদ কেন?”
— “কারণ তুমি আমাকে ভালোবাসো।”
— “বাহ, কী নতুন খবর!”—বলে রাতো চলে গেল।
আরেক সন্ধ্যায়, জোনাস রাতোকে ডাকল; সে তৎক্ষণাৎ ছুটে এল। প্রথমবারের মতো বাতিটা জ্বালানো ছিল। জোনাস উৎকণ্ঠিত মুখে মাচার বাইরে ঝুঁকে ছিল।
“আমাকে একটা ক্যানভাস দাও,” সে বলল।
— “কী হয়েছে তোমার? তুমি শুকিয়ে গেছো, একেবারে ভূতের মতো দেখাচ্ছে!”
— “কয়েক দিন ধরে প্রায় কিছুই খাইনি, ও কিছু না, আমাকে কাজ করতেই হবে।”
— “আগে খেয়ে নাও।”
— “না, আমার খিদে নেই।”
রাতো একটি ক্যানভাস এনে দিল। মাচার ভেতরে অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার মুহূর্তে জোনাস তাকে জিজ্ঞেস করল—“ওরা কেমন আছে?”
— “কারা?”
— “লুইস আর বাচ্চারা।”
— “ভালো আছে। তবে তুমি যদি ওদের সঙ্গে থাকতে, আরও ভালো থাকত।”
— “আমি তো ওদের ছেড়ে যাইনি। ওদের বলো, আমি ওদের ছেড়ে যাইনি।” এবং সে অদৃশ্য হয়ে গেল।
রাতো এসে তার উদ্বেগের কথা লুইসকে জানাল। লুইস স্বীকার করল, সেও কয়েক দিন ধরে ভীষণ উদ্বিগ্ন। “কী করা যায়? আহা, যদি আমি ওর বদলে কাজ করতে পারতাম!” সে অসহায় মুখে রাতোর সামনে দাঁড়িয়েছিল। “আমি ওকে ছাড়া বাঁচতে পারি না,” সে বলল। সে আবার তরুণী হয়ে উঠেছিল, যা রাতোকে বিস্মিত করল। তখন সে লক্ষ করল, লুইস লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠেছে।
পরদিন সকাল। যারা আসত—রাতো বা লুইস—তাদের জোনাস শুধু উত্তর দিত, “ছেড়ে দাও, আমি কাজ করছি।” দুপুরে সে কেরোসিন চাইল। ধুঁকতে থাকা বাতিটা আবার জ্বলে উঠল তীব্র আলোয়, এবং সন্ধ্যা পর্যন্ত জ্বলতে থাকল। রাতো লুইস ও বাচ্চাদের সঙ্গে রাতের খাবারের জন্য থেকে গেল। মধ্যরাতে সে জোনাসকে বিদায় জানাতে গেল। আলোকিত মাচার সামনে সে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল, তারপর কিছু না বলেই চলে গেল। দ্বিতীয় দিনের সকালে, যখন লুইস ঘুম থেকে উঠল, বাতিটা তখনও জ্বলছিল।
সুন্দর দিন শুরু হচ্ছিল, কিন্তু জোনাস তা টের পায়নি। সে ক্যানভাসটি দেয়ালের দিকে ফিরিয়ে রেখেছিল। ক্লান্ত হয়ে, সে বসে অপেক্ষা করছিল, হাত দুটো হাঁটুর ওপর মেলে রাখা। সে নিজেকে বলছিল, এখন সে আর কখনও কাজ করবে না; সে সুখী। সে তার সন্তানদের গুঞ্জন, জলের শব্দ, বাসনপত্রের টুংটাং শুনতে পাচ্ছিল। লুইস কথা বলছিল। রাস্তা দিয়ে একটি ট্রাক যাওয়ার সময় বড় কাঁচের জানালাগুলো কেঁপে উঠছিল। পৃথিবী তখনও ছিল—তরুণ, ভালোবাসায় পূর্ণ; জোনাস শুনছিল মানুষের সৃষ্টি করা সেই মধুর গুঞ্জন। এত দূর থেকে, সেই গুঞ্জন তার ভেতরের আনন্দময় শক্তিকে—তার শিল্পকে, সেই চিন্তাগুলোকে, যা সে কখনও বলতে পারত না, চিরকাল নীরব—বাধা দিচ্ছিল না; বরং সেগুলো তাকে সব কিছুর ঊর্ধ্বে তুলে ধরছিল, এক মুক্ত ও তীক্ষ্ণ বাতাসে। বাচ্চারা ঘরের ভেতর দৌড়াচ্ছিল, ছোট মেয়েটি হাসছিল, লুইসও এখন হাসছিল—যার হাসি সে বহুদিন শোনেনি। সে তাদের ভালোবাসত! কী গভীরভাবেই না ভালোবাসত! সে বাতি নিভিয়ে দিল, আর ফিরে আসা অন্ধকারে—ওখানে, ওটা কি তার নক্ষত্র না, যা এখনও জ্বলছে? ওটাই; সে ওকে চিনতে পারল, হৃদয় ভরা কৃতজ্ঞতায়; আর তাকিয়ে থাকতে থাকতেই নীরবে লুটিয়ে পড়ল।
“কিছুই হয়নি,” একটু পরে ডাক্তার ঘোষণা করলেন। “উনি অতিরিক্ত কাজ করেছেন। এক সপ্তাহের মধ্যে উঠে দাঁড়াবেন।”
— “ও সেরে উঠবে তো, আপনি নিশ্চিত?” বলল লুইস, মুখ বিবর্ণ।
— “উনি সেরে উঠবেন।”
অন্য ঘরে, রাতো সম্পূর্ণ সাদা ক্যানভাসটির দিকে তাকিয়ে ছিল, যার কেন্দ্রে জোনাস খুব ছোট অক্ষরে মাত্র একটি শব্দ লিখেছিল, যা পড়া যেত, কিন্তু বোঝা যেত না সেখানে কী লেখা ছিল—“solitaire” (নিঃসঙ্গ) না “solidaire” (সংহত/সহমর্মী)।