নকশা ২০২৬

লিখেছেন:বিপ্লব নায়ক
কী ভয়ানক সভ্য হয়ে উঠেছি আমরা! ড্রোন-ক্ষেপনাস্ত্রের নিশ্ছিদ্র জঙ্গলে ক্ষমতার অভিপ্রায়ের কতো না জমক আমরা নিত্য প্রত্যক্ষ করছি! শিশু-ভর্তি স্কুল, রোগী-ভর্তি হাসপাতাল নিমেষে গুঁড়িয়ে দিয়ে মৃত্যুর দলা পাকিয়ে আমাদের যুদ্ধ-প্রযুক্তির ক্যারিশমা ঝলকাচ্ছি! আমাদের অন্তর্গত এই নবদানবকে জিভ ভেংচিয়ে এই নকশা...

 

একসময় দর্শনের সূত্র হিসেবে আমাদের শেখানো হয়েছিলো যে সমস্ত বস্তুর মধ্যেই বিপরীতের ঐক্য বিরাজ করছে। গতি ও স্থিতি, অস্তি ও নাস্তি সব শঙ্খ-লাগা-সাপের মতো পেঁচিয়ে আছে। আকর্ষণীয় লাগলেও বিষয়টিকে বেশ বিমূর্ত মনে হতো। যতক্ষণ না অবধি কলির অবতার ট্রাম্পবাবা মূর্ত রূপ ধরে হাজির হলেন স্যামকাকাদের দেশে। ট্রাম্পবাবা তাঁর দোসর বিবিনেতানুর সঙ্গে জোড় বেঁধে  গাজা ভূখণ্ডের পুরুষ-নারী-শিশুদের পোড়া মাংসের তাল ও রক্তের ছিটেয় পরিণত করার নিরন্তর কর্মযজ্ঞ চালিয়ে যান, আবার তাঁর চোখ দিয়েই অভিমানের অশ্রু গড়াতে থাকে যে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়ার কমিটির চালশে-পড়া চোখ বিশ্বজুড়ে সুখশান্তিপ্রতিষ্ঠার তাঁর এতোগুলো প্রয়াস কোনোটাই কি দেখতে পায় না! ট্রাম্পবাবা তাঁর লস্করদের পাঠিয়ে ভেনেজুয়েলা থেকে তার রাষ্ট্রপতিকে রাতের বেলা শোয়ার ঘর থেকে গায়েব করে এনে নিজ দুর্গের জেলখানায় পোরেন, ভেনেজুয়েলার তেলখনি চালোনোর লাগাম মুঠোয় পোরেন, আর একই সঙ্গে তাঁর রাজত্বসীমায় তাঁর অপছন্দের (সে ওই কালো বা বাদামী শূদ্ররা হোক, মুসলমানরা হোক, বা…) লোকজনদের ঢুকতে না দেওয়া কেন তাঁর বাপখেলে অধিকার সে বিষয়ে গর্জন করেন। ইরান নাকি জঙ্গীদের পুষছে তাই তিনি আবার সেই বিবিনেতানুর সঙ্গে জোড় বেঁধে ইরানের রাষ্ট্রপ্রধানকে খুন করে দেন, হামলায় হাজার জনের বেশি ইরানিকে দুদিনে নিকেশ করে দেন, স্কুলে-হাসপাতালে বোমা ফেলে শিশুদের গণকবর নিশ্চিন্ত করেন, কিন্তু এই রুদ্র হিংসাই কি তাঁর মনের কথা, সেখানে যে কতো প্রেমও জমে আছে তা এপস্টিন ফাইল খুললেই বোঝা যাবে, কতো শিশু বালিকা থেকে যুবতীর সঙ্গে বিলাসবহুল রিসর্ট-বৃন্দাবনে তিনি প্রেমলীলা করেছেন, তাঁর স্নেহভাজন আরও নানা হর্তাকর্তাদেরও লীলার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন (হিংসুটেরা যদি তাকে যৌনবিকৃতি যৌননিপীড়ন বলে চেল্লামিল্লি করে তো মহামহিমদের কী আসে যায়!)। এহেন ট্রাম্পবাবা এখন আমাদের শের-ই-জাহান (শব্দটা তাঁর অপছন্দ হতে পারে, তাঁর অনুগত জ্ঞানীদের ডেকে তিনি এর লাতিন তর্জমা করিয়ে নেবেন নিশ্চয়ই) হয়ে বসেছেন। এহেন শের-ই-জাহান-এর যখন উদয় হয়, তাঁর চারপাশ আলোকিত করার জন্য বিবিধ রত্নও তো জড়ো হয় জগৎ ঢুঁড়ে। মহামহিমের লীলাখেলা সম্ভব করার জন্য সহখেলোয়াড়ও তো চাই নানা রকম। এই সহখেলোয়াড়রাও এমনই গুণধর যে তাঁদের প্রত্যেককে নিয়ে একএকটি আস্ত পুরাণ লেখা যায়। অত সাধ্য আমার নেই, তাই তাদের মধ্যে দুইজনের কথাই অল্প বলি। প্রথমে আছেন রুশদেশের পুতিনবাবা। কোটালগিরি (গোয়েন্দাগিরি, নজরদারি, গুমখুন, গণসন্ত্রাস) করে হাত পাকাতে পাকাতে তিনি একেবারে রুশ-রাজার সিংহাসনটাই পাকাপাকিভাবে কবজা করে নিয়েছেন, তাঁর বিরুদ্ধে কেউ কথা বললে বা দল পাকালেই হয় জেলে ঢোকে, নয়তো কেউ-জানে-না-কীভাবে হঠাৎ দুর্ঘটনায় বা বিষক্রিয়ায় পটল তোলে। তাঁর খুব ইচ্ছে ইউক্রেন দখল করবেন, তাই বছরের পর বছর ধরে মিসাইল-বোমা ছুঁড়ে ইউক্রেনিয়দের হত্যা চালিয়ে যাচ্ছেন। ট্রাম্পবাবা এখন ইউক্রেনিয়দের উপর চাপ তৈরি করছেন পুতিনবাবার আবদার মেনে নিয়ে চুক্তি করার জন্য, তা এককথায় মেনে না নেওয়ার জন্য ইউক্রেনের নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের উপর তিনি বেশ বিরক্ত, ট্রাম্প-পুতিন-লীলায় ইউক্রেনিয়দের হাড়িকাঠে চড়া যে এখনও কতোটা কীভাবে বাকি তা কে জানে! আবার ট্রাম্পবাবা ও পুতিনবাবা কে কতো তেল বেচবেন তা নিয়ে একে অপরের উপর প্যাঁচ কষে চলেছেন, সেই রাজায়-রাজায় যুদ্ধে উলুখাগড়া-নিকেশের আগুন ছড়িয়ে পড়ছে নানাদিকে। এরপর আছেন চীনা জিনপিংবাবা, তিনি তাঁর দেশের সিংহাসনটাকে আজীবন নিজের করে নিয়েছেন, মাঝেমধ্যেই দাবার বোর্ডে নতুন করে ঘুঁটি সাজানোর মতো করে দেশের মন্ত্রী থেকে সেনাপতি এক-হুকুমে রদবদল করে দেন, দেশের শূদ্ররা যাতে বিনাবাক্যে শরীরের সমস্ত রক্ত উগলে দিয়ে তাঁর পসরার পণ্য উৎপাদন করে দেয় তা নিশ্চিত করেন আর তারপর শস্তা পণ্যের চারা ছিপে লাগিয়ে জগৎসাগরে রাঘব-বোয়াল ধরে বেড়ান। ট্রাম্পবাবার তাই এই জিনপিংবাবাকে নিয়ে সন্দেহ-মাথাব্যথার শেষ নেই, এই বুঝি তাঁর পুকুরের রাঘব-বোয়ালটাও জিনপিং-য়ের ছিপে উঠে গেলো! ভেনেজুয়েলা থেকে আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য থেকে বাংলাদেশ এভাবে আমাদের বাবাদের লীলাস্পর্শে হোমের আগুন জ্বালানো হয়েছে, বাবার-ঠিক-না-থাকা অঞ্চল-পাণ্ডারা (আমাদের দেশে যেমন মোদীপাণ্ডা) সে আগুনের অগ্নিহোত্রী হয়ে বসেছেন, আর গণহত্যা-গণকবর আবশ্যকীয় রীতি হয়ে উঠেছে। যতক্ষণ না আপনার গায়ে আগুনটি এসে লাগছে বা আপনার বাড়ির উপর বোমাটি এসে পড়ছে, ততক্ষণ আপনি একে উপভোগও করে যেতে পারেন, এই পুরো লীলাখেলাই অডিও-ভিজুয়াল মিডিয়ার জাদুবাক্সে ভরে গুলতানি-রোমাঞ্চের বিষয় হিসেবে আপনার কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। কেবলমাত্র এই উলুখাগড়া হয়ে থাকতে থাকতে আপনি-আমি বুঝি মনুষ্যেতর কিছু হয়ে উঠেছি।

মার্চ, ২০২৬

0 Comments
Leave a reply