নিৎশের নেহাইয়ে পেটানো ইতিহাস

লিখেছেন:বিপ্লব নায়ক
নিৎশে-র 'জীবনের জন্য ইতিহাসের ব্যবহার-অপব্যবহার' (The Use and Abuse of History for Life) লেখাটির বাংলা তর্জমার উপস্থাপনা হিসেবে এই লেখাটি লেখা হয়েছে। এখানে ইতিহাস বিষয়ে নিৎশে-র ভাবনার একটি রূপরেখা তৈরি করতে চাওয়া হয়েছে।

 

ফ্রিয়েদরিখ নিৎশে (১৮৪৪-১৯০০)-র এই লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিলো ১৮৭৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। নিৎশের বয়স তখন তিরিশের কিছু কম। বাসেল-এর বিশ্ববিদ্যালয়ে চার বছরের কিছু বেশি সময় হলো তিনি ধ্রুপদী ফিলোলজি-র অধ্যাপক। সেখানে তাঁর অগ্রজ সহকর্মী ছিলেন জাকব বুর্কহার্ড (১৮১৮-১৮৯৭), প্রখ্যাত সুইস ইতিহাসবিদ, যাঁর ইতালিয় রেনেসাঁ নিয়ে লেখা বইটি এখনও দিকনির্ণায়ক ধ্রুপদী কীর্তি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে আসছে। ১৮৭২ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাচীন গ্রিক সংস্কৃতি নিয়ে বুর্কহার্ডের বক্তৃতাগুলো নিৎশে অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে শুনেছিলেন এবং দুজনের মধ্যে তা ঘিরে পারস্পরিক আলোচনা ও মতবিনিময় গড়ে উঠেছিলো। দুজনেই দুজনকে প্রভাবিত করেছিলেন বলা যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে নিৎশের আরেকজন সহকর্মী ছিলেন ফ্রানজ ওভারবেক (১৮৩৭-১৯০৫), চার্চের ইতিহাস বিষয়ে বিশেষজ্ঞ। তাঁর সঙ্গে নিৎশের আলোচনা ও মতবিনিময় ছিলো আরো নিবিড় ও ঘনিষ্ঠ, দুজনেই দুজনকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। নিৎশের ভাবনাচিন্তা ক্রমশ আমূল সমালোচনাত্মক রূপ গ্রহণ করার সঙ্গে সঙ্গে রক্ষণশীল মেজাজের বুর্কহার্ডের সঙ্গে তাঁর নীরব দূরত্ব তৈরি হয়েছিলো, কিন্তু ওভারবেক-এর সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব-ঘনিষ্ঠতা অটুট ছিলো আজীবন। ‘জীবনের জন্য ইতিহাসের ব্যবহার-অপব্যবহার’ লেখাটিকে সম্পূর্ণ করার কাজে অনুলিখন-পরিমার্জন সহ সম্পাদনার নানা কাজে নিৎশেকে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করেছিলেন ওভারবেক। এই লেখাটির ভাবনা সংহত করার ক্ষেত্রে আর এক দিক থেকে বড়ো ভূমিকা নিয়েছিলো নিৎশের সঙ্গে জার্মান শিল্পী রিচার্ড ওয়াগনার (১৮১৩-১৮৮৩)-এর সংসর্গ। ওয়াগনার-এর জার্মান সংস্কৃতির পুনর্জাগরণ/ পুনরুত্থান ঘটানোর অভিপ্রায় এই সময়ে নিৎশেকে তীব্রভাবে আকর্ষণ করেছিলো। ইতিহাসের ব্যবহার-অপব্যবহার কীসের সাপেক্ষে বিচার করা হবে, সেই প্রশ্নটির উত্তর বোধহয় এখান থেকেই এসেছিলো। নিৎশে এখানে ইতিহাসের ব্যবহার-অপব্যবহার বিচার করতে চেয়েছেন ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর জীবনকে প্রতিনিয়ত নতুন প্রাণময় রূপ দেওয়ার পক্ষে/বিপক্ষে তার ভূমিকা দিয়ে। সময়বিরুদ্ধ চিন্তা (Unzeitgemäße Betrachtungen, ইংরেজিতে: Untimely Meditations)-র দ্বিতীয় খণ্ড হিসেবে প্রথমে এটি আলাদাভাবে প্রকাশিত হয়। পরবর্তীকালে ‘সময়বিরুদ্ধ চিন্তা’ শিরোনামাধীন চারটি লেখা একত্রে একটি খণ্ডে প্রকাশিত হতে শুরু হওয়ার পর থেকে এইটি ওই নামের বইয়ের দ্বিতীয় প্রবন্ধ হিসেবে ছাপা হয়ে আসছে।

‘সময়বিরুদ্ধ চিন্তা’-র এই দ্বিতীয় লেখাটি থেকে নিৎশে ইতিহাসরচনার যে কোনো সর্বাত্মক ভঙ্গিকে নাকচ করতে শুরু করেন। সর্বাত্মক ভঙ্গি বলতে কী বোঝাতে চাইছি তা একটু ভেঙে বলা দরকার। সর্বাত্মক ভঙ্গির ইতিহাসরচনা সর্বদা এক ঘটনা-নিরপেক্ষ নকশা বা আদরা গঠন করে তার অধীনে অতীতের ঘটমানতা ও ভবিষ্যতের ঘটনীয়তাকে একই ধারায় বেঁধে হাজির করতে চায়। প্রদত্ত বর্তমানে পৌঁছানোর অভিপ্রায়েই যেনবা গোটা অতীত ধেয়ে এসেছে এবং ভবিষ্যতের গতিও যেনবা অন্যকিছু হতে পারে না। কেউ বর্তমানটাকেই ইতিহাসগতির চূড়ান্ত বিন্দু হিসেবে ধরে নিয়ে তারই অনন্ত সম্প্রসারণ রূপে ভবিষ্যতকে দেখে এবং অতীতের সমস্ত কিছু কীভাবে বর্তমানে এসে পূর্ণতালাভ করলো তার আখ্যান রচনাকেই ইতিহাসরচনা বলে ঠাউরে বসে। আবার কেউ ইতিহাসগতির চূড়ান্ত বিন্দুটিকে ভবিষ্যতের কোনো একটি মুহূর্তে স্থাপন করে (যেমন, যখন শ্রেণিহীন সমাজ উপলব্ধ হবে, বা, যখন কোনো একটি আদর্শ মনুষ্যধাঁচায় জগতের সমস্ত মানুষকে গড়েপিটে নেওয়া যাবে, বা, বিশেষ একটি ধর্মাদর্শ জগৎ ব্যেপে রাজ করবে, ইত্যাদি) সমস্ত অতীতকে সেই মুখে ধাবমান ও সেই ধাবমানতাকে আরো ত্বরাণ্বিত করার যজ্ঞে বর্তমানকে বলিদান দেওয়াই একমাত্র মনুষ্যকর্তব্য বলে নির্ধারণ করাকেই ইতিহাসরচনা বলে মনে করেন। এনাদের রচিত ইতিহাস-আখ্যানে অনিশ্চয়তা-অনবস্থা-র কোনো ঠাঁই নেই, বা ঠাঁই নিতান্তই দিতে হলেও তাকে আপদ হিসেবে যতোটা বেঁধে-ধরে-লুকিয়ে রাখা যায় তার ব্যবস্থা করা হয়। প্রকৃত ঘটনাবলীর বিপুল বৈচিত্র্য যে আকস্মিকতা-অনিশ্চয়তা-অনবস্থা-র সরলীকরণ-অযোগ্য বিশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে এগোয়, প্রতিটি চলনবিন্দুতে একাধিক গতিমুখ থাকে যার কোনো একটিকেই আগে থেকে নিশ্চিত বলে ধরে নেওয়া যায় না, এ কথা তাঁরা সর্বত অস্বীকার করবেনই, কারণ নইলে তাঁদের অভিপ্রেত অতীত-থেকে ভবিষ্যৎ অবধি নিশ্চিত চলনগতির গতিসূত্রটি তো আর রচনা করা যাবে না। আর এই নিশ্চিত চলনগতির গতিসূত্রটি রচনা করে ও সেই গতিসূত্রটিকেই ইতিহাসের সর্বাত্মক শাসক করে তুলে তাঁরা ঘোষণা করেন যে তাঁদের রচিত ইতিহাস-আখ্যান হলো ইতিহাসের সর্বোচ্চ রূপ, কারণ তা ইতিহাসকে কলাশাস্ত্রের কুয়াশাচ্ছন্ন খাদ থেকে উদ্ধার করে আলোকোজ্জ্বল বিজ্ঞানের সর্বোচ্চ শিখরে প্রতিষ্ঠিত করেছে। অর্থাৎ, তাঁদের চোখে, ইতিহাস এখন বিজ্ঞান (জড়বস্তুর ধর্ম সংক্রান্ত বিজ্ঞান, কারণ বিজ্ঞানকে তাঁরা এই সীমায়িত অর্থেই বোঝেন) হয়ে উঠেছে। কোনদিক থেকে ঠেলা দিলে জড়বস্তু কোনদিকে যাবে তা যেমন বলা যায়, জনসমাজকে কোনদিক থেকে কীভাবে ঠেললে ইতিহাসকে কোনদিকে এগোনো যাবে তা-ও ঠিক সমান নিশ্চয়তা নিয়ে তাঁরা বলে দিতে পারেন বলে নিজেরা দাবি করে থাকেন। তাঁরা আরো দাবি করে থাকেন যে বিধ্বংসী বস্তুনিষ্ঠতার শক্তিতে তাঁদের কর্মপদ্ধতি সর্বাধুনিক ও সর্বত্রুটিমুক্ত, অথচ সেকেলেপন্থীরা যেমন চিরায়ত মূল্যবোধ, পরম সত্য, আত্মার অবিনশ্বরতা, ইত্যাদি মনগড়া বস্তুকে পারানির কড়ি হিসেবে চালাতে চাইতেন, আমাদের এই আধুনিক বৈজ্ঞানিক ইতিহাসবিদরাও সচেতনতার সমসত্ত্বতা (একই শ্রেণির মধ্যে সচেতনতার সমসত্ত্বতা যা ছাড়া শ্রেণিসচেতনতা সম্ভব নয়, একই জাতির মধ্যে সচেতনতার সমসত্ত্বতা যা ছাড়া জাতীয় সচেতনতা সম্ভব নয়) নামক এক ভৌতিক পদার্থে বিশ্বাস করেন এবং তাকেই তাঁদের বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের পাথেয় করে তোলেন। ইতিহাসরচনার এই সর্বাত্মক রূপটিকে নিৎশে আক্রমণ করতে শুরু করেছেন এই লেখাটির মধ্য দিয়ে।

আগেই বলেছি যে নিৎশের আক্রমণ বা সমালোচনা জীবনের চাহিদা মেটানোর জায়গা থেকে, অর্থাৎ, জীবনকে প্রতিনিয়ত নতুন প্রাণময় রূপ দেওয়ার পক্ষে/বিপক্ষে কী ভূমিকা ইতিহাস পালন করছে তার সাপেক্ষে। ইতিহাসরচনাকারের অভিপ্রায়ের সাপেক্ষে এখানে প্রথমে নিৎশে রচিত ইতিহাসকে তিনটে ভাগে ভাগ করেছেন--- স্মারকধর্মী ইতিহাস, প্রত্নতাত্ত্বিক ইতিহাস ও সমালোচনাত্মক ইতিহাস। এই তিনটি ভাগের ব্যবহার ও অপব্যবহার নিৎশে কী আলোচনা করেছেন তা অনুসরণ করে এগোনো যাক।

স্মারকধর্মী ইতিহাস অতীত থেকে মহান ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা আদর্শের উদাহরণ তুলে এনে দেখাতে চায় যে তা যেহেতু একসময় ছিলো/ ঘটেছে, তাই আবার তা ফিরিয়ে আনা সম্ভব বা ঘটানো সম্ভব। সেই অতীত মহত্ত্বের মাপকাঠিতে তা বর্তমানের ক্ষুদ্রতা/সংকীর্ণতাকে প্রকট ও নিন্দার্হ করে তোলে এবং আবারও মহান ভবিষ্যৎ রচনার আকাঙ্ক্ষাকে তীব্র করতে চায়। বর্তমান যদি স্রোত হারিয়ে ডোবায় পরিণত হয়, ব্যক্তি যদি উদ্যম হারায়, প্রতিষ্ঠানগুলো হয়ে ওঠে অচলায়তন, তাহলে এই ধরনের ইতিহাস স্থিতিজাড্যে ধাক্কা দিয়ে গতি সৃষ্টিতে ভূমিকা অবশ্যই নিতে পারে। কিন্তু এর সীমাবদ্ধতা বা অপব্যবহার আবার ক্ষতিকরও হয়ে উঠতে পারে। এই ক্ষতিকর দিকটা কী? ক্ষতিকর দিকটা হলো এই যে স্মারকধর্মী অভিপ্রায়ের অত্যধিক তাড়নায় আমরা যদি ভুলে যাই যে অতীতের মহান ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা আদর্শ সেই অতীতের সমাজ ও সংস্কৃতির বিভিন্ন ধারার নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে প্রাণ পেয়েছিলো, ভুলে যাই যে অতীত সমাজ-সংস্কৃতির সেই বিভিন্ন ধারা কখনোই একইভাবে বর্তমানে হাজির থাকতে পারে না এবং কাজ করতেও পারে না, আর এইসব ভুলে গিয়ে অতীত মহত্ত্বকে বর্তমানে প্রতিস্থাপিত করতে চাই, তাহলে আমাদের এই অবিমৃশ্যকারিতার ফলস্বরূপ হয় আমরা চূড়ান্ত ব্যর্থ হবো আর নয়তো প্রাণহীন অনড়-অটল একপাথুরে মূর্তি দিয়ে বর্তমানকে সাজিয়ে তুলতে গিয়ে সেসব মূর্তিবেদীর নিচে চাপা দিয়ে বর্তমানের শেষবিন্দু প্রাণরসটিকেও নিঙড়ে নিঃশেষ করে দেবো।

প্রত্নতাত্ত্বিক ইতিহাস বর্তমান সম্পর্কে খানিক নিস্পৃহতা নিয়ে প্রাণরসের ধারার উৎস হিসেবে অতীতকে শ্রদ্ধার চোখে দেখে থাকে। তা সুব্যবহারের ফলে আমাদের নিজেদের শিকড় সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি হয়: বর্তমানকে যে যেমন খুশি তেমন ভাবে গড়েপিটে নেওয়া যায় না, অতীতের মধ্যে ডোবা সামাজিক-সাংস্কৃতিক শিকড়গুলো দিয়ে রস আহরণ করে তবেই যে আমরা বর্তমানকে সৃষ্টি করে নেওয়ার শক্তি পেতে পারি, তা আমরা শিখি। কিন্তু মাত্রায় অত্যধিক হয়ে গেলে প্রত্নতাত্ত্বিক ইতিহাসও বিপদ ঘটায়: তা তখন অতীতের সমস্তকিছুকেই একইভাবে পূজ্য ও অনুকরণীয় বলে দাবি করে বসে, যা-কিছু পুরোনো তার উপরই অতিরিক্ত মূল্য আরোপ করে নতুন সবকিছুকে অবমূল্যায়ন করতে থাকে, প্রথার বাঁধন কষে বেঁধে যে কোনো নতুন পথে যাওয়ার চেষ্টাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে, ফলে জীর্ণ পুরানত্বের ভারে নবপ্রাণের শেষ লেশটুকুও পিষে মারা যায়।  

সমালোচনাত্মক ইতিহাস একদিক থেকে স্মারকধর্মী ও প্রত্নতাত্ত্বিক ইতিহাসের সমস্যাগুলোর প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করতে পারে। সমালোচনাকে হাতিয়ার করে তা অতীত মহত্ত্ব ও মহাভাবগুলোকে অতিকথা-মুক্ত-ভাবে বিচার করার চেষ্টা করে, অতীতের কাছে তা শ্রদ্ধায় মাথা নত করে থাকে না, বর্তমানের উপর অতীতের নিরঙ্কুশ অধিকার স্বীকার করে না। তার নিজের বিচার অনুযায়ী অতীতের যে অংশটি পরিত্যাজ্য, তা ধ্বংস করে বর্তমানকে সে নতুন করে গড়ে তুলতে চায়, আবার এই গড়ে তোলার কাজে অতীত থেকে গ্রহণীয় বিষয়গুলোর উপরই ভিত্তি স্থাপন করতে চায়। কিন্তু এ কাজ শাঁখের করাতের উপর হাঁটার মতো। কোনো একদিকে আতিশয্যভারে ঝুঁকে পড়লেই উপকার নয়, অপকারের মাত্রা বাড়তে থাকে। সমালোচনা-আতিশয্যে তা যদি অতীতের সবকিছুকেই নস্যাৎ করে নতুনত্বের মোহে আবিষ্ট হয়ে কেবল-মাত্র নতুন বলেই নতুনের আরাধনা করতে বসে, সমালোচনা করাটাকেই মহান কাজ ধরে নিয়ে অতীতের রূপ অনুধাবনে যথেষ্ট মনোযোগী ও পরিশ্রমী না হয়েই ফাঁকির উপর সমালোচনাসৌধ রচনা করে, বিচার করার মতো পরিপক্কতা অর্জন করার চেষ্টা না করেই শখের বিচারক হয়ে বসে, তাহলে আত্মম্ভরীতার শূন্যগর্ভ বন্ধ্যাত্বের মধ্যে তা জীবনের সমস্ত সম্ভাবনাকে শুকিয়ে মারে।

অতএব, নিৎশের মতে, এই তিন ধরনের মধ্যে কোনো এক ধরনের ইতিহাসচর্চার উপর একপেশে জোর বা আতিশয্য ইতিহাসের অপব্যবহার ঘটিয়ে জীবনের প্রতিনিয়ত নতুন প্রাণময় রূপ নেওয়ার ধারাকে আটকে দেয়। এখন প্রশ্ন থেকে যায় যে নিৎশে জীবনের প্রতিনিয়ত প্রাণময় রূপ নেওয়া বলতে কী বুঝিয়েছেন এবং তার সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ ইতিহাসের ব্যবহার বলতেই বা কী বুঝিয়েছেন। এই বিষয়ে প্রাথমিক কিছু ধারণা করার চেষ্টা করা যাক।

পরস্পরবিরোধী অথচ পরস্পর-সংযুক্ত দুটি বিশেষ ভাব ও অভিপ্রায় সূচক অবস্থা বোঝাতে নিৎশে গ্রিক অতিকথার আভাসে দুটি পরিভাষা ব্যবহার করেছিলেন--- ডায়োনিসীয় অবস্থা এবং আপোলিনীয় অবস্থা। যে অবস্থায় মানবমন সমস্ত বাধা-বন্ধন-বেড়ি ছিঁড়ে ফেলে আত্মপ্রকাশের পূর্ণতা ঘটাতে চায়, নতুনকে সৃষ্টি করার আপন ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ করতে চায়, প্রথা-নৈতিকতাকে হেলায় অস্বীকার করে, এমনকি যে কোনো শিলীভূত ধারণাকে বিগলিত করে সমস্ত রূপরেখা বা বহিঃসীমা মুছে ফেলে সম্ভাবনার দিগন্ত অনন্ত-প্রসারিত করতে চায়, সেই অবস্থাকে নিৎশে ডায়োনিসীয় অবস্থা বলেছেন। (কেউ এটাকে সংজ্ঞা হিসেবে নেবেন না, এর কোনো সংজ্ঞা হয় না।) আর যে অবস্থায় মানবমন ন্যায়-নৈতিকতা-প্রথা-মূল্যবোধ-প্রতিষ্ঠান-এর বেড়ি বেঁধে কাঠামোয়-বাঁধা রূপরেখা-নির্দিষ্ট জগৎ তৈরি ও রক্ষা করতে চায়, আত্ম ও অপরের মধ্যে স্পষ্ট বিভাজনরেখা টেনে আত্মপরিচয়কে স্পষ্ট সীমানার মধ্যে বাঁধতে চায়, সম্ভাবনার পরিসরকে সংকীর্ণ সীমার মধ্যে বেঁধে নিশ্চয়তা ও সুস্থিতি আমদানি করতে চায়, সেই অবস্থাকে নিৎশে আপোলিনীয় অবস্থা বলেছেন। (এটিও কোনো সংজ্ঞা নয়, কেবল ইশারা মাত্র।) নিৎশের মতে, সমস্ত পার্থক্য ও বিভাজনরেখা মুছে ফেলে মানুষ যদি উচ্চতর জনসমাজগত গোষ্ঠীবোধে উত্তীর্ণ হয়, তখন:

প্রাত্যহিক বাস্তবতা তার সচেতনতায় পুনঃপ্রবেশ করা মাত্র তার গা গুলিয়ে ওঠে, বমি পায়: এই অবস্থার ফলস্বরূপ এক তপস্বীসুলভ (ascetic) অভিপ্রায়-অস্বীকার-করা (will-denying) মেজাজ তৈরি হয়। প্রাত্যহিকতার তুচ্ছতা ও অতি-সাধারণত্বের বিপরীতে ডায়োনিসীয়তা তার কাছে অনেক উচ্চতর তন্ত্র বলে মনে হয়। এই অপরাধবোধ ও নিয়তির জগৎ থেকে সে পুরোপুরি নিষ্ক্রান্ত হয়ে যেতে চায়।… নেশার ঘোর থেকে জেগে ওঠার সচেতনতা নিয়ে সে সর্বত্র মানব-অস্তিত্বের ভয়াবহতা বা অর্থহীনতাকেই দেখতে থাকে, দেখতে দেখতে তার বমি পেতে থাকে। (Kritische Studienausgabe, কোলি ও মন্টিনারি সম্পাদিত, বার্লিন: ডি গ্রুইটার, ১৯৯৯, প্রথম খণ্ড, পৃঃ ৫৯৫, বাংলা তর্জমা বর্তমান লেখকের করা।)

নিখাদ ডায়োনিসীয় অবস্থা এই যে অনাসক্তি ও তপস্বীভাবের মধ্যে ক্রমশ নিমজ্জিত করতে থাকে তা ক্রমশ অনস্তিত্ব (nothingness)-র প্রতি মোহ-আকর্ষণ তৈরি করে, যেমনটা বৌদ্ধ ধর্মে হয়েছিলো। প্রাত্যহিকতার প্রতি এই তীব্র বিকর্ষণ মানুষকে ক্রমশ এমন এক নির্জন সর্ব-বিচ্ছিন্নতার মধ্যে ঠেলে দেয় যা সহ্যাতীত হয়ে উঠতে থাকে। এই অবস্থান রাজনৈতিক স্বতঃক্রিয়ার প্রবৃত্তিকেও দুর্বল করে দেয় যেহেতু দেশ-সমাজ-রাষ্ট্র সম্পর্কে ভাবনা সীমানাহীন অনন্ত পরিসরের অনুধ্যানে ঠাঁই পায় না। দেশ, সমাজ বা রাষ্ট্রের ধারণা নিশ্চিতভাবেই আপোলিনীয় ধারণা। ঠিক যেমন, প্রাত্যহিকতার তুচ্ছতা ও অর্থহীনতাকে ঢাকা-দেওয়া মায়াবিভ্রম-আবরণে ধর্ম-নৈতিকতা-সামাজিকতা-র নকশায় অর্থ ফুটিয়ে তোলে যে কল্পনা-অতিকথা, একইসঙ্গে উচ্চাবচ কাঠামো নির্মাণ করে সাময়িক স্থিতিও উৎপন্ন করে, এই সবই আপোলিনীয় উপাদান। নিখাদ ডায়োনিসীয় চর্চায় অনস্তিত্বের আকর্ষণে বাঁধা পড়ার থেকে বাঁচতে এই আপোলিনীয় ধারণা ও উপাদানগুলো দরকার, ঠিক যেমন এই আপোলিনীয় ভাবনা ও উপাদানগুলো শিলীভূত হয়ে কারাগার হয়ে উঠলে ডায়োনিসীয় ভাবনা ও উপাদানগুলো দরকার। এভাবে নিৎশে চিন্তা করেছেন যে জীবনকে প্রতিনিয়ত প্রাণময় রূপে প্রবাহিত রাখার জন্য ডায়োনিসীয় ও আপোলিনীয় উপাদানগুলো উভয়কেই একে অপরের সঙ্গে অন্তহীন কুস্তির প্যাঁচে জড়িয়ে থাকতে হবে, কোনো একটির আধিপত্য জীবনকে শুকিয়ে দেবে। আপোলিনীয় স্থিতিজাড্যের পেষণপ্রাবল্য যেমন জীবনকে ছিবড়ে নিঃসাড় করে দেয়, ডায়োনিসীয় বিদ্রোহের একগুঁয়েমিও তেমন মায়াবিভ্রমের আশ্রয় ধ্বংস করে জীবনকে উৎপাটিত আশ্রয়হীন করে তোলে। ডায়োনিসীয় ও আপোলিনীয়--- এই দুই মনোভাব ও উপাদান নিজ মধ্যে নিরন্তর পর্যায়ক্রমিকভাবে অবলম্বন করতে পারলে তবেই ইতিহাস জীবনকে নিরন্তর প্রাণময় প্রবাহ হিসেবে বজায় রাখার কাজে ব্যবহারযোগ্য হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু এক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায় মানুষের জ্ঞানের অহমিকা, এই অহমিকা যে বিশ্বপ্রকৃতির নিয়মকে সে চূড়ান্ত রূপে জেনে নিয়ে সমগ্র অতীত থেকে সমগ্র ভবিষ্যৎ অবধি অসীম কালপ্রবাহকে নিজ-উদ্ভাবিত যুক্তির বাঁধনে বেঁধে ফেলতে পারে। নিৎশে তাই তীব্র আক্রমণ হেনেছেন এই জ্ঞানের অহমিকার বিরুদ্ধে। এবার তাহলে সেই দিকটা দেখার চেষ্টা করা যাক।

১৮৭৩ সালে রচিত ‘নীতি-নৈতিকতার বাইরে সত্য ও মিথ্যাভাষণ প্রসঙ্গে’ (ইংরেজিতে: Truth and Lying in an Amoral Sense) লেখাটি নিৎশে শুরু করেছিলেন এইভাবে:

বিশ্বব্রক্ষ্মাণ্ডের কোনো এক দূর-নিঝুম কোণে, অগণ্য সৌরজগতের আলোর মধ্যে একদা এক গ্রহ নিঃসারিত হয়ে দপদপ করে জ্বলেছিলো কিছুকাল, আর সেই গ্রহের চতুর প্রাণীরা জ্ঞানশক্তি আবিষ্কার করেছিলো। ‘জগতের ইতিহাস’-এ সেটাই ছিলো সবচেয়ে উদ্ধত ও সবচেয়ে কপট মুহূর্ত, যদিও তা এক মুহূর্ত বৈ আর কিছু নয়। প্রকৃতির গুটিখানেক শ্বাসপ্রশ্বাস গ্রহণের মধ্যেই সেই গ্রহ জমাট শীতল হয়ে গিয়েছিলো এবং সেই চতুর প্রাণীদের মরতে হয়েছিলো। এমন একটা আখ্যান তৈরি করা যেতেই পারে, কিন্তু তার মধ্য দিয়েও যথেষ্ট সন্তোষজনকভাবে ফুটিয়ে তোলা যাবে না যে, প্রকৃতির মধ্যে এই মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে ঠিক কতোটা তুচ্ছাতিতুচ্ছ, কতোটা অবাস্তব ও ক্ষণস্থায়ী, কতোটা উদ্দেশ্যহীন ও স্বেচ্ছাচারী দেখায়; বহু অনন্তকালপর্যায় অতিবাহিত হয়েছে যখন তার কোনো অস্তিত্ব ছিলো না, আবার তা বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার পরও কোথাও কিছু এসে যাবে না। কারণ মনুষ্যজীবনের সীমার বাইরে প্রসারিত হতে পারে এমন কোনো ভূমিকা বুদ্ধিমত্তার নেই, বা বলা ভালো, এই বুদ্ধিমত্তা হলো মনুষ্যোচিত এবং কেবলমাত্র তার অধিকারী ও বংশবিস্তারকারীরাই তাকে এমন করুণারসসিক্তভাবে দেখে, যেন-বা গোটা বিশ্বজগৎ তাকেই অক্ষ করে আবর্তিত হচ্ছে। কিন্তু, যদি কোনো ডাঁশের সঙ্গে জ্ঞাপন করার ক্ষমতা আমাদের থাকতো, তাহলে আমরা শুনতে পেতাম যে ডাঁশও এই একই করুণারসে অভিভূত হয়ে উড়ে বেড়াচ্ছে যে বিশ্বজগতের উড়ানের কেন্দ্রটি তার মধ্যেই অবস্থিত।…

(সত্য-মিথ্যা ও বিবেক প্রসঙ্গে, ফ্রেডরিখ নিৎশে, বাংলা তর্জমা ও ভূমিকা: বিপ্লব নায়ক, তৃতীয় পরিসর, ২০২৪, পৃঃ ১১-১২)

বুদ্ধিমত্তা ও জ্ঞানশক্তি দিয়ে মানুষ প্রাকৃতিক বন্ধুরতাকে কিয়দংশে অতিক্রম করে নিজ যাপনপ্রক্রিয়ায় কিছুটা মসৃণতা আমদানি করতে পেরেছে সত্য, কিন্তু এই সীমাবদ্ধ সাফল্য তার মাথা ঘুরিয়ে দিয়েছে, সে ভেবে বসেছে যে জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তার বলে সে নিজ অভিপ্রায় মতো প্রকৃতির উপর ছড়ি ঘোরাতে পারে, প্রকৃতিকে বশ করে তার নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠতে পারে। এই অন্ধ অহং-য়ের বশে নিজ লোভ-চাহিদা-আকাঙ্ক্ষা-কে অসীম করে তুলে প্রকৃতি-পরিবেশকে সেই অনুযায়ী দোহন করা বা ঢেলে সাজাতে যাওয়ার মধ্য দিয়ে সে আজ নিজেকেই বিপন্ন করে তুলেছে, কারণ তার এই অবিমৃশ্যকারিতা মানবসহ প্রাণীদের জীবনকে আশ্রয় দেওয়ার মতো বিশ্বব্রক্ষ্মাণ্ডের এই ক্ষুদ্র কোণাটিকে ক্রমশ প্রাণধারণের অযোগ্য করে তুলছে। প্রকৃতির সঙ্গে বস্তুগত মিথষ্ক্রিয়ায় প্রতিভাত এই অন্ধ অহং তার বৌদ্ধিক জগতকেও গ্রাস করেছে। এই নাছোড় বিশ্বাস তাকে পেয়ে বসেছে যে যুক্তিশৃঙ্খলার বুদ্ধিমান বিন্যাসের মধ্য দিয়ে সে জগতসংসারের বিবর্তনের নিয়মকে সূত্রবদ্ধ করে ফেলতে পারে (আপোলিনীয় আতিশয্যের চুড়ো আর কি!) এবং সেই নিয়ম অভিপ্রায়-মতো প্রয়োগ করে সেই বিবর্তনকে প্রভাবিতও করতে পারে। এর নানা রূপ আমরা দেখেছি। হেগেল এনেছিলেন পরমভাবের পূর্ণতার দিকে যাত্রার তত্ত্ব যা অনুযায়ী অনন্ত অতীত থেকে অনন্ত ভবিষ্যৎ অবধি পরমভাব নির্দিষ্ট দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পূর্ণতালাভের দিকে এগোচ্ছে এবং তারই প্রতিফলন হিসেবে ইতিহাসগতি তৈরি হচ্ছে। এই ভাবনা সেই চূড়ান্ত আপোলিনীয় অবস্থানে পৌঁছেছিলো যেখানে যা এখন অস্তিত্বমান, তাই-ই সত্য, অর্থাৎ অলঙ্ঘনীয় বলে ঘোষিত হয়েছিলো। ইতিহাসের এই দ্বান্দ্বিক চালে চলনের সূত্রটিকে সামাজিক উৎপাদন বিকাশের ক্ষেত্রে এনে প্রয়োগ করে মার্কসবাদীরা আবার ক্রমোন্নত উৎপাদন ব্যবস্থার দিকে যাত্রাকেই ইতিহাসের গতি বলে চিহ্নিত করে তার চূড়ান্ত মুহূর্তে শ্রেণিহীন সমাজের প্রতিষ্ঠার ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন। এই গতিসূত্র ত্বরাণ্বিত করার অভিপ্রায়ে বিপ্লব সংগঠনের জন্য পেশাদার দল (পার্টি) গড়ে উঠেছে, বিশ শতকে দুটি বিরাট বিপ্লব ও অসংখ্য বিপ্লব-প্রচেষ্টা দেখা গেছে,কিন্তু তাদের প্রত্যেকটাই মুখ থুবড়ে পড়েছে, কোনোটাই তাদের অভিপ্রায় অনুযায়ী গোটা সমাজের গতিকে তাদের বেঁধে দেওয়া খাতে বওয়াতে পারেনি, বরং অভিপ্রেত-অনভিপ্রেত ধ্বংসের চিহ্ন ছড়িয়ে রেখে গেছে চারপাশে। পাশাপাশি, ইতিহাসের বিবর্তনের সূত্র হিসেবে শ্রেষ্ঠ জাতির আধিপত্য প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে সমগ্র মানবজাতির উৎকৃষ্টতাসাধনের তত্ত্বও হাজির হয়েছে, রাজনৈতিক বলও সঞ্চয় করেছে, বিশ শতকে জার্মান নাজি আধিপত্যের মধ্য দিয়ে সবচেয়ে জমকদার রূপ নিয়েছে, কিন্তু কোথাও-ই তা কোনো মানব-উৎকৃষ্টতার হদিশ দিতে পারেনি, বরং মৃত্যুশিবির-বন্দীশিবির-এর নিশ্ছিদ্র ভয়ংকর অন্ধকার নামিয়ে এনেছে। বিশ শতকের প্রথম বছরটিতেই মৃত্যু হওয়ার কারণে নিৎশে এই গোটা বিশ শতক জোড়া মতবাদিক জ্ঞানের আস্ফালন ও ধ্বংসলীলা দেখে যেতে পারেননি। হেগেলিয় মতবাদের উত্থানপর্বটি তিনি দেখেছিলেন এবং বর্তমান লেখায় তার তীব্র ও গভীর সমালোচনা করে গেছেন। কিন্তু বিশ শতক ছিলো মতবাদের আধিপত্যের শতক, এমনকি নিৎশের মৃত্যুর পরে বিশ শতকের তিরিশ ও চল্লিশের দশকের জার্মানিতে নিৎশের টুকরো কিছু লেখাকে বিচ্ছিন্ন করে নিয়ে অপব্যাখ্যার মধ্য দিয়ে নাজিদের জাতিশ্রেষ্ঠতার মতবাদের উপাদান করে নিতে চাওয়া হয়েছিলো। সে প্রচেষ্টা ধোপে টেকেনি। বিশ শতকের পঞ্চাশ ও ষাট দশক থেকেই নিষ্ঠাবান নিৎশে-পাঠের মধ্য দিয়ে ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে কীভাবে নিৎশে আগাগোড়া জ্ঞান ও যৌক্তিকতার মোড়কে মুড়ে আধিপত্যবাদী মতবাদ নির্মাণ করে ইতিহাসের ছক নির্ণয় করে ফেলার অসারতা ও বিপদ সম্পর্কে আশু প্রয়োজনীয় গভীর কিছু ভাবনাকে উত্তরাধিকার হিসেবে রেখে গেছেন। বর্তমান লেখাটি সেই রেখে-যাওয়া-উত্তরাধিকার-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

আতিশয্যদোষে যখন ইতিহাসকে স্থবির অতীতভজনা, অনস্তিত্বাকাঙ্ক্ষী নৈরাশ্য বা অতিনিশ্চয়তাবাদী মতবাদের রূপ দেওয়া হচ্ছে, নিৎশে সেই ইতিহাসের বিরুদ্ধে, সেই ইতিহাস জীবনের ক্ষতি করে বলে তিনি মনে করেন। কিন্তু তিনি সেই ইতিহাস চান যা জীবনের প্রাণময়তাকে অবারিত বহমান করে তুলবে, স্বতঃক্রিয়ার শক্তিকে নিরন্তর উজ্জীবিত করবে। কোনো অধিবিদ্যায় আস্থা না রেখে যে কোনো অতীতকে যদি মানুষ নিবিড়ভাবে দেখতে চায়, কান পেতে তার বিবিধ সুরের ওঠাপড়া শোনে, নিৎশের মনে হয়েছিলো যে সে অতীত বস্তুগুলোর মধ্যে কোনো আবশ্যকীয় অন্তর্বস্তু বা নির্যাস খুঁজে পাবে না, চিরায়ত কোনো সত্যের সুরও বাজতে শুনবে না। প্রতিটি অতীতখণ্ডেই ইতিহাসগত বস্তুগুলোর নির্যাস বা সত্য-পরিচয় উৎপাদিত হয়েছে তাৎক্ষণিকভাবে নানা কাকতালীয় উপাদানের সমাবেশের মধ্য দিয়ে, কোনো চিরায়ত নিয়ম সেখানে কাজ করে না। ১৮৮৭ সালে প্রকাশিত ‘নীতি-নৈতিকতার কুলজি প্রসঙ্গে’ (ইংরেজিতে: On the Genealogy of Morals) বইয়ের দ্বিতীয় প্রবন্ধে নিৎশে নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করেছেন:

একটি বিশেষ বস্তুর উৎপত্তি কী থেকে ঘটলো এবং সেই বস্তুর চূড়ান্ত উপযোগিতা কী, অর্থাৎ, উদ্দেশ্যসমূহের এক কাঠামোয় তার বিন্যাস ও প্রকৃত ব্যবহারটি কী--- এই দুটি যে একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা; কোনো একভাবে অস্তিত্বধারণ করে নিজ বর্তমান অবস্থায় পৌঁছেছে যে বস্তু তা যে তার উপর অধিষ্ঠিত ক্ষমতার দ্বারা বারংবার নতুন নতুন প্রেক্ষিত থেকে নতুন করে ব্যাখ্যাত হবে, নতুনভাবে উপযোজিত হবে, পুনর্সংগঠিত হয়ে নতুন উদ্দেশ্যে পুনর্বহাল হবে; জৈব জগতে সমস্ত ঘটনাই যে ক্ষমতায় পর্যুদস্ত করা ও প্রভুত্ব স্থাপন করার মধ্য দিয়ে কাজ করে এবং অন্যদিকে যে-কোনো ক্ষমতায় পর্যুদস্ত করা ও প্রভুত্ব স্থাপন যে এমন এক পুনর্ব্যাখ্যা বা পুনর্সমন্বয়ের মধ্য দিয়ে কাজ করে যা ততোধিক কার্যকরী ‘বোধবুদ্ধি’ ও ‘উদ্দেশ্য’-কে অস্পষ্ট করে দেয় বা পুরোপুরি মুছেই দেয়--- এই যে মূলতত্ত্বগুলোয় কতো না কঠিন পথে আমরা পৌঁছেছি এবং না পৌঁছে ‘উপায় নেই’, যে-কোনো ধরনের ইতিহাস নির্মাণে এদের থেকে গুরুত্বপূর্ণ মূলতত্ত্ব আর কিছু হতে পারে না।

 (সত্য-মিথ্যা ও বিবেক প্রসঙ্গে, ফ্রেডরিখ নিৎশে, বাংলা তর্জমা ও ভূমিকা: বিপ্লব নায়ক, তৃতীয় পরিসর, ২০২৪, পৃঃ ৯৯)

এখানে তর্জমা করা লেখাটির পরবর্তী বিভিন্ন লেখায় নিৎশের এভাবে ইতিহাসের দিকে তাকানোর, ইতিহাসের স্বর শোনার চেষ্টার নানা পরিচয় আমরা পেতে পেতে যাই। ১৮৭৮ সালে লেখা ‘মনুষ্যোচিত, সব অতিমাত্রায় মনুষ্যোচিত’ (ইংরেজিতে: Human, All Too Human) বইটিতে তিনি বলেন যে যুক্তি সত্যে পৌঁছানোর একমেবাদ্বিতীয়ম কোনো পূর্ব-প্রদত্ত পথ নয়: জ্ঞানচর্চাভিমানী পণ্ডিতদের আসক্তি, পারস্পরিক ঘৃণা, অন্তহীন গোঁড়ামিপূর্ণ আলাপ-আলোচনা, প্রতিদ্বন্দ্বিতার মেজাজ--- এহেন নেহাতই ব্যক্তিগত বিরোধগুলোর মধ্য থেকেই ধীরে ধীরে যুক্তির অস্ত্রশস্ত্র, বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের রীতিপদ্ধতি ও বৈজ্ঞানিক সত্য সম্পর্কে ধারণা গড়ে উঠেছিলো বহু সম্ভাবনার মধ্যে একটির সংঘটিত হওয়ার ফলস্বরূপ। ১৮৮০ সালে প্রকাশিত ‘ভবঘুরে ও তার ছায়া’ (ইংরেজিতে: The Wanderer and his Shadow)-তে তিনি বলেন যে ‘স্বাধীনতা’ (‘liberty’) নামক ধারণাটি মোটেই মানুষের স্বপ্রকৃতির কোনো মৌল অংশ নয়, সত্তা ও সত্যের সঙ্গে সম্পৃক্তিস্বরূপ স্বাভাবিকতাও নয়, তা হলো শাসক শ্রেণিগুলোর একটি উদ্ভাবন। এভাবেই তিনি ভালো-মন্দ, পাপ-পূণ্য বিষয়ক ধারণাগুলোর ইতিহাস, নৈতিক মূল্যবোধগুলোর ইতিহাস, তপস্বী নৈরাশ্যের ইতিহাস রচনা করেছেন ১৮৮৭ সালে প্রকাশিত ‘নীতি-নৈতিকতার কুলজি প্রসঙ্গে’ (ইংরেজিতে: On the Genealogy of Morals) বইতে। সুতরাং নিৎশে-র পরবর্তী জীবনের কাজের মধ্য দিয়ে জীবনের স্বার্থে ব্যবহারযোগ্য ইতিহাস রচনার এক ধারাবাহিকতা আমরা দেখতে পাই যা এখানে তর্জমা করা লেখাটির ভাবনার ক্রমপ্রসার বা ক্রমসম্প্রসারণ হিসেবেও আমরা দেখতে পারি। তাই নিৎশের এই লেখাটি তার নিজের বিচারে যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই নিৎশের সামগ্রিক দর্শনচর্চাকে বোঝার যে কোনো প্রচেষ্টার ক্ষেত্রেও প্রারম্ভিক একটি সূচনাবিন্দু হিসেবেও অতি গুরুত্বপূর্ণ।

বিপ্লব নায়ক

বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

 

 

 

 

 

0 Comments
Leave a reply