বিশ্বাসঘাতক না এক বিভ্রান্ত মন (Le Renégat ou un esprit confus)

লিখেছেন:আলবেয়ার কামু, বঙ্গানুবাদ- সুরজিৎ ব্যানার্জী
আগ্রাসন নাকি বিপন্নতা, অন্তর্দাহ নাকি প্রতিহিংসা, ঘর নাকি নির্বাসন, দাস নাকি প্রভু... বিপরীতগুলো একে অপরের প্রান্তছোঁয়া ধারাবাহিকতা রূপে যেখানে অ্যাবসার্ড হয়ে ওঠে...

 

 

কি বিশৃঙ্খলা! কি বিশৃঙ্খলা! …আমাকে, আমাকে আবার মনকে গুছিয়ে নিতে হবে। আমার জিভ কেটে নেওয়ার পর থেকে, মনে হয় আরেকটা জিভ কোথাও আমার খুলির ভেতর অবিরাম নড়েচড়ে কথা বলে চলেছে। কিছু একটা—না কি কেউ—অবিরাম বকছে। হঠাৎ থেমে যায়। তারপর আবার শুরু হয়… উফ! আমি এত কিছু শুনি, যা আমি কখনো উচ্চারণ করিনি। কি গোলমাল! আর যদি মুখ খুলি, শব্দগুলো যেন নুড়িপাথরের মতো ঠোকাঠুকি খেতে শুরু করে। “শৃঙ্খলা, শৃঙ্খলা,” বলে সে জিভ—একই সঙ্গে আরও কত কিছু যে বকতে থাকে। হ্যাঁ, আমি সবসময়ই শৃঙ্খলার জন্য আকুল ছিলাম।

অন্তত এটুকু নিশ্চিত: আমি সেই মিশনারির জন্য অপেক্ষা করছি, যে আমার জায়গা নিতে আসছে। তাঘাজা থেকে ঘণ্টা খানেক দূরে এই পথে, পাথরের স্তূপের আড়ালে, পুরনো বন্দুকের ওপর ভর দিয়ে লুকিয়ে বসেছি। মরুভূমির উপর ভোরের আলো ফুটছে। এখনও প্রচণ্ড ঠান্ডা। শিগগিরই অসহনীয় তাপদাহ শুরু হবে। এই দেশ মানুষকে পাগল করে দেয়। আর আমি এখানে কত বছর আছি, জানি না। না—আর একটু, আর একটু সহ্য করো। মিশনারি আজ সকালেই আসতে পারে, কিংবা সন্ধ্যার দিকে। শুনেছি, তার সঙ্গে একজন গাইড থাকবে। হয়তো তারা দু’জন একটা উটই ভাগ করে নেবে। আমি অপেক্ষা করব। আমি অপেক্ষা করছি। ঠান্ডা—কেবল ঠান্ডাই আমাকে কাঁপাচ্ছে। আরেকটু ধৈর্য ধরো—হতভাগ্য দাস!

কিন্তু এতদিন ধরে আমি ধৈর্য ধরে রয়েছি। মাসিফ সেন্ট্রালের সেই উঁচু মালভূমিতে—আমার রুক্ষ বাবা, অসভ্য মা, প্রতিদিন শূকরচর্বির ঝোল, আর ওয়াইন—বিশেষ করে সেই টক, বরফঠান্ডা ওয়াইন—দীর্ঘ শীতকাল, হাড়-কাঁপানো হিমেল হাওয়া, তুষারের স্তূপ, আর দুর্গন্ধময় ঝোপঝাড়… ওফ্! আমি পালাতে চেয়েছিলাম। এক ঝটকায় সবাইকে ছেড়ে যেতে চেয়েছিলাম, অবশেষে বাঁচতে চেয়েছিলাম—সূর্যের আলোয়, মিষ্টি জলের পাশে।

আমি সেই পাদ্রিকে বিশ্বাস করতাম। তিনি আমাকে সেমিনারির  (ক্যাথলিক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান) কথা বলতেন, পড়াতেন প্রতিদিন। ওই প্রোটেস্ট্যান্ট অধ্যুষিত এলাকায় তাঁর হাতে ছিল সময় আর সময়—গ্রাম পেরোনোর সময় তিনি দেওয়াল ঘেঁষে ঘেঁষে চলতেন। তিনি ভবিষ্যতের কথা বলতেন, সূর্যের কথা বলতেন; "ক্যাথলিক ধর্মই সূর্য," তিনি বলতেন। তিনি আমাকে পড়াতেন, আমার শক্ত মাথায় লাতিন ঠেসে ঢোকাতেন— "ছেলেটা মেধাবী কিন্তু একগুঁয়ে"। আমার মাথা কখনও ফাটেনি। কতবার পড়েছি, কিন্তু রক্ত বেরোয়নি। আমার শুয়োরের-বাচ্চা বাপ বলত, "গোঁয়ারগোবিন্দ।" সেমিনারিতে আমাকে পেয়ে তারা খুশি হয়েছিল। প্রোটেস্ট্যান্ট অঞ্চল থেকে একজনকে নিয়ে আসা ছিল তাদের কাছে যুদ্ধ জয়ের সমান। তারা আমাকে স্বাগত জানিয়েছিল অস্টারলিৎসের সূর্যের মতো।

সূর্যটা ফ্যাকাশে, দুর্বল—নিশ্চয়ই অ্যালকোহলের জন্য। তারা টক মদ খেয়েছে আর বাচ্চাদের দাঁত শিরশির করেছে,... আরে, আরে! তাদের তো উচিত নিজেদের পিতাকে খুন করা। কিন্তু যাই হোক, এখন আর কোনো ভয় নেই যে সে মিশনারির কাজে ঝাঁপিয়ে পড়বে, কারণ সে তো অনেক আগেই মরে গেছে। তীব্র টক মদ শেষ পর্যন্ত তার পেট চিরে ফেলেছিল। তাই এখন আর কিছু করার নেই— মিশনারিটাকে মেরে ফেলা ছাড়া।

আমার তার সঙ্গে হিসাব মেটাতে হবে, তার শিক্ষকদের সঙ্গে—আমার সেই শিক্ষকদের সঙ্গে যারা আমাকে ঠকিয়েছে; এই নোংরা, পচা গোটা ইউরোপের সঙ্গেই। সবাই আমাকে প্রতারিত করেছে। মিশনারি-ধর্ম—এই একটিমাত্র কথাই তারা জানত: যাও বর্বরদের কাছে, আর বলো—“এই যে আমার প্রভু, তাঁকে দেখো। তিনি কখনও মারেন না, খুন করেন না। নিচু গলায় আদেশ দেন, অন্য গাল পেতে দেন। তিনিই শ্রেষ্ঠতম প্রভু—তাঁকেই বেছে নাও। দেখো, আমাকে কেমন ভালো বানিয়েছেন। আমাকে অপমান করো—তবেই দেখতে পাবে।” হ্যাঁ, আমি বিশ্বাস করেছিলাম—হ্যাঁ,হ্যাঁ— আমার ভালোই লেগেছিল। আমার ওজন বেড়েছিল, আমি প্রায় সুদর্শন হয়ে উঠেছিলাম। আমি চাইতাম—আমাকে অপমান করা হোক।

গ্রীষ্মে, গ্রেনোবলের কড়া রোদে, আমরা যখন গা ঠেঁসে ঠেঁসে  হাঁটতাম আর সুতির পাতলা পোশাক পরা মেয়েদের মুখোমুখি হতাম, আমি চোখ ফিরিয়ে নিতাম না। আমি তাদের অবজ্ঞা করতাম; অপেক্ষায় থাকতাম, তারা যেন আমায় অপমান করে। মাঝেমধ্যে তারা হাসত। এমন সময় আমি ভাবতাম: “আমায় মারুক, আমার মুখে থুতু দিক!” কিন্তু সত্যি বলতে কী, তাদের তীর্যক হাসিও কম কিছু ছিল না। দাঁত বের করে, বিদ্রূপের তীক্ষ্ণ বাক্য ছুড়ে তারা আমাকে ছিন্নভিন্ন করে দিত। আর এই অপমানই, এই যন্ত্রণাই আমার কাছে মধুর ছিল।

পাপস্বীকারের সময় আমি নিজের ওপর একটার পর একটা দোষ চাপাতাম। আমার ধর্মযাজক তা বুঝতে পারতেন না; বলতেন, “না, না—তোমার মধ্যে তো ভালোও আছে!” ভালো! আমার ভেতরে ছিল শুধু টক মদ—আর সেটাই ছিল সবচেয়ে ভালো। মানুষ যদি খারাপ না হয়, তবে ভালো হবে কী করে? ওরা যা যা আমাকে শিখিয়েছিল, তার মধ্যে কেবল এটুকুই আঁকড়ে ধরেছিলাম—একটা মাত্র ধারণা। আর একগুঁয়ে বুদ্ধির জেদে আমি সেটাকে তার শেষ পরিণতি পর্যন্ত টেনে নিয়ে গেলাম। নিজেকে শাস্তির মুখে ঠেলে দিলাম, স্বাভাবিককে ঘৃণা করলাম। সংক্ষেপে—আমিও নজরে পড়তে চেয়েছিলাম। একটা উদাহরণ হতে চেয়েছিলাম—যাতে মানুষ আমাকে দেখে বলে, তিনি-ই তাকে ভালো করেছেন; আর আমার মধ্য দিয়ে আমার প্রভুরই মহিমা উচ্চারিত হয়।

লৌহতপ্ত সূর্য উঠছে। মরুভূমি বদলে যাচ্ছে। পাহাড়ি সাইক্লামেনের রং নেই, নেই সেই নরম, ঘিরে ধরা তুষার—না, এটা ধূসর-হলুদ; মহা দীপ্তির ঠিক আগের কদর্য মুহূর্ত। এখান থেকে দিগন্ত পর্যন্ত কিছুই নেই। ওখানে, দূরে—যেখানে মালভূমি নরম রঙের এক বৃত্তে মিলিয়ে যায়—সেটাও নেই। আমার পেছনে পথটা উঠে গেছে এক বালিয়াড়ির দিকে, যা আড়াল করে রেখেছে তাঘাজা। তাঘাজা—এই লৌহময় নামটা বছরের পর বছর ধরে আমার মাথার ভেতর বাজছে।

প্রথম যিনি আমাকে এর কথা বলেছিলেন—প্রথমই বা কেন বলি—তিনিই ছিলেন একমাত্র—এক আধা-অন্ধ বৃদ্ধ পাদ্রি, যিনি আমাদের মঠে এসে আশ্রয় নিয়েছিলেন। লবণের শহর, অন্ধ করে দেওয়া রোদে সাদা দেয়াল—ওগুলো আমাকে স্পর্শও করেনি। আমাকে নাড়িয়েছিল সেখানকার অধিবাসীদের নিষ্ঠুরতা। আর সেই শহর—যা সব বহিরাগতদের জন্য বন্ধ।

তিনি বলেছিলেন, তাঁর জানা মতে মাত্র একজনই সেখানে ঢুকে জীবিত ফিরে এসেছিল—যা দেখেছিল, তার কথা বলতে। তারা তাকে চাবুক মেরেছিল। তার ক্ষতে, তার মুখে লবণ ঘষে মরুভূমিতে তাড়িয়ে দিয়েছিল। ভাগ্যক্রমে সে যাযাবরদের পেয়েছিল। এই একবার তারা করুণাময় হয়েছিল। এক কাকতালীয় সৌভাগ্য।

তারপর থেকে আমি এই গল্পটাই বয়ে বেড়িয়েছি—লবণের আগুন, ঝলসানো আকাশ, মূর্তি-পূজার ঘর আর তার দাসদের। এর চেয়ে বর্বর, এর চেয়ে উত্তেজক আর কী হতে পারে? হ্যাঁ। এটাই ছিল আমার মিশন। আমাকে যেতেই হবে। তাদের সামনে আমার প্রভুকে উদ্ঘাটিত করতেই হবে।

আমাকে নিরুৎসাহিত করার জন্য তারা সেমিনারিতে ভাষণের পর ভাষণ উগলে দিয়ে বলত—আমাকে অপেক্ষা করতে হবে। এটা মিশনের পক্ষে উপযুক্ত দেশ নয়। আমি এখনও প্রস্তুত নই। আমাকে বিশেষ প্রস্তুতি নিতে হবে। আমাকে চিনতে হবে আমি কে। আমাকে আরও পোড় খেতে হবে—তারপর দেখা যাবে।

কিন্তু সবসময় অপেক্ষা? আহ, না! বিশেষ প্রস্তুতির একটা মানে আছে—যেমনটা আলজিয়ার্সে করা হত—সেগুলো আমাকে অভীষ্ট লক্ষ্যের দিকে ঠেলে দিত। কিন্তু বাকি ক্ষেত্রে আমি একগুঁয়ের মতো মাথা নেড়ে একই কথা পুনরাবৃত্তি করতাম: সবচেয়ে বর্বরদের সঙ্গে যোগ দাও। তাদের জীবনে মিশে যাও। তাদের ঘরে ঢুকে পড়ো। এমনকি তাদের মন্দিরেও। উদাহরণ দিয়ে দেখাও—আমার প্রভুর সত্যই সবচেয়ে শক্তিশালী। তারা আমাকে অপমান করবে—সন্দেহ নেই। কিন্তু তাদের অপমানকে আমি ভয় করতাম না। বরং সেটাই দরকার ছিল—দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্য। আমি সবকিছু সহ্য করব। আর সেই সহ্য করার মধ্য দিয়েই আমি এই অসভ্যদের বশীভূত করব—শক্তিশালী সূর্যের মতো। শক্তিশালী—হ্যাঁ, শব্দটা আমি জিভে পাক খাওয়াতাম।

আমি স্বপ্ন দেখতাম নিরঙ্কুশ ক্ষমতার—এমন ক্ষমতার যা কাউকে হাঁটু গেড়ে বসায়, প্রতিদ্বন্দ্বীকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করে, আর শেষে তাকে ধর্মান্তরিত করে। প্রতিদ্বন্দ্বী যত অন্ধ, যত নিষ্ঠুর, যত দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হবে—তার সম্মতিই তত জোরালোভাবে ঘোষণা করবে সেই প্রভুর রাজত্ব, যিনি তাকে পরাস্ত করেছেন।

ভালো লোকেদের যারা সামান্য বিপথগামী, তাদের ধর্মান্তর— এ ছিল আমাদের পাদ্রিদের আদর্শের দৈন্যতা। এত কিছু করতে পারত, তবু এত কম সাহস— আমি তাদের ঘৃণা করতাম। তাদের বিশ্বাস ছিল না—আমার ছিল। আমি স্বীকৃতি চাইতাম খোদ নির্যাতকদের কাছ থেকে— তাদেরই হাঁটু গেড়ে বসাতে, তাদের দিয়ে বলাতে: “হে প্রভু, এই তো তোমার জয়।” এক কথায়, আমি চাইতাম দুষ্টদের এক বাহিনীর ওপর শুধুমাত্র শব্দের জোরেই রাজত্ব করতে। ওহ, আমি সম্পূর্ণ নিশ্চিত ছিলাম— আমার ভাবনায় যুক্তি ছিল। অন্য কোনো বিষয়ে যেমনটা কখনওই হই না। কিন্তু একবার কোনো ধারণা আমার মাথায় কড়া নাড়লে, আমি সেটা ছাড়ি না— এটাই আমার শক্তি। হ্যাঁ—এই-ই সেই বান্দার শক্তি, যাকে নিয়ে তারা সবাই করুণা করত।

সূর্য আরও উঁচুতে উঠেছে। আমার কপাল জ্বলে উঠছে। চারপাশের পাথরগুলো মৃদু চড়চড় শব্দে ফেটে যাচ্ছে। ঠাণ্ডা শুধু বন্দুকের নল—শীতল, দূরের তৃণভূমির মতো, বহু আগের এক বিকেলের বৃষ্টির মতো—যখন হাঁড়িতে স্যুপ আস্তে আস্তে ফুটত, আর তারা আমার জন্য অপেক্ষা করত—আমার বাবা-মা—মাঝে মাঝে আমাকে দেখে হাসত। হয়তো আমি তাদের ভালোবাসতাম। হয়তো। কিন্তু এখন সবই অতীত।

পথের ওপর তাপের পর্দা কেঁপে কেঁপে উঠছে। এসো, মিশনারি—আমি অপেক্ষা করছি। এখন আমি জানি কীভাবে জবাব দিতে হয়; আমার নতুন প্রভুরা আমাকে সেই পাঠ শিখিয়েছে। তারা ঠিক—ভালোবাসার প্রশ্নের সঙ্গে শেষ পর্যন্ত হিসাব চুকোতেই হয়। আলজিয়ার্সের সেমিনারি থেকে পালানোর সময় বর্বরদের নিয়ে আমার কল্পনা ছিল অন্যরকম—তার সার কথা ছিল একটাই: তারা নিষ্ঠুর।

আমি সেমিনারির কোষাগার লুটেছিলাম, ধর্মীয় আংরাখা ছুড়ে ফেলেছিলাম। অ্যাটলাসের উচ্চ মালভূমি পেরিয়েছি, মরুভূমি পেরিয়েছি—একটার পর একটা। ট্রান্স-সাহারার ড্রাইভার উপহাস করে বলেছিল, “ওখানে যেও না।” তাদের সবার কী হয়েছিল? জানি না। জানতে চাইওনি। শত শত মাইল বালির ঝড়—কখনও হাওয়ার মুখে ধেয়ে চলেছে, কখনও হঠাৎ থেমে আবার পিছিয়ে গেছে। তারপর পাহাড়—কালো চূড়া, ইস্পাতের মতো ধারালো। তারপর নামতে হয়েছে বাদামী পাথরের এক অন্তহীন সমুদ্রে—পথ দেখানোর জন্য দরকার হয়েছিল পথপ্রদর্শকের। শেষ বলে কিছু নেই—শুধু তাপে ঝলসে ওঠা প্রান্তর, হাজার হাজার আয়নার আগুনে দাউ দাউ করে জ্বলা ভূমি। অবশেষে পৌঁছলাম—সাদা দেশের শেষ প্রান্তে, কালোদের ভূমির শুরুতে— সেখানে দাঁড়িয়ে আছে লবণের শহর।

আর যে টাকাটা পথপ্রদর্শক চুরি করেছিল—চিরনির্বোধ আমি নিজেই তাকে দেখিয়েছিলাম—সে আমাকে পথের মাঝখানেই ফেলে গিয়েছিল। ঠিক এখানেই। মারধর করে বলেছিল,  “কুত্তা—ওই—যা—এগিয়ে যা। তোকে মেরে ফেলিনি—এইটাই আমার মহত্ব। যা—এগো—বাকিটা ওরাই তোকে দেখাবে।” আর তারা দেখিয়েছিল—ওহ, হ্যাঁ। তারা সূর্যের মতো—যে কখনও থামে না, শুধু রাত ছাড়া। তারা নির্দয়ভাবে, গর্বের সঙ্গে আমাকে মারধর করেছিল—এবং অনুভবে তা এই মুহূর্তেও অব্যাহত; খুব জোরে, মাটি ফুঁড়ে উঠে আসা অগণিত বর্শার মতো। আশ্রয় চাই। হ্যাঁ—আশ্রয়—বড় পাথরের নিচে—সব কিছু ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়ার আগেই।

এই ছায়াটুকু ভালো। এই লবণের শহরে—দগদগে তাপে ঝলসে-ওঠা নিম্নভূমির এই গহ্বরে—কেউ কীভাবে বাঁচে? গাঁইতির আঘাতে কাটা, কর্কশ হাতে সমান করা প্রতিটি তীক্ষ্ণ সমকোণী দেয়ালে আঘাতের ক্ষতগুলো চোখ-ঝলসানো আঁশের মতো খাঁজে খাঁজে দাঁড়িয়ে আছে। কোথাও কোথাও ফ্যাকাশে হলুদ বালি ছিটকে পড়ে তাদের সামান্য হলদেটে করেছে; কিন্তু বাতাস যখন দেয়াল আর ধাপগুলো ঝেড়ে ফেলে, তখন ধুলো-মাখা আকাশের নীল খোলসের নিচে সবকিছু আবার অসহ্য শুভ্রতায় জ্বলে ওঠে।

সেই দিনগুলোতে আমি ক্রমশ অন্ধ হয়ে যেতাম—যখন গনগনে স্থবির আগুন ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে সাদা ধাপওয়ালা চাতালগুলোতে চড়চড় করে ফাটতে থাকত, আর চাতালগুলো এমনভাবে একে অপরের সঙ্গে মিশে যেত, যেন বহুদূর অতীতে তারা এক লবণের পাহাড়ের ওপর চড়াও হয়েছিল—প্রথমে সমতল করে, তারপর খোদাই করে বানিয়েছিল রাস্তাঘাট, বাড়ির ভেতরের অংশ, দরজা-জানালা, দেয়াল। অথবা—হ্যাঁ, এটাই বেশি ঠিক—তারা যেন ফুটন্ত জলের এক খরধার নল দিয়ে কেটে নিয়েছিল তাদের সাদা, জ্বলন্ত নরক, কেবল এটুকু প্রমাণ করার জন্য যে যেখানে কখনও কোনো জীব বাঁচতে পারে না, সেখানেই তারা বাঁচতে পারে— ত্রিশ দিনের পথ পেরোলেও নেই কোনো জীবের ছোঁয়া। মরুভূমির মাঝখানের এই গহ্বরে দিনের তাপ সমস্ত জীবের পারস্পরিক সংযোগ বন্ধ করে দেয়—অদৃশ্য শিখা আর দগ্ধকারী স্ফটিকের এক গরাদ তাদের একে অপরের থেকে আলাদা করে রাখে। কোনো সেতু ছাড়াই—এক লহমায়—রাতের শীত আচমকা তাদের বরফের মতো জমিয়ে দেয়—লবণের খোলসে আবদ্ধ—শুকিয়ে-মরা এক বরফচরের নিশাচর বাসিন্দা—ঘনাকার ইগলুর ভেতর হঠাৎ কেঁপে ওঠা কালো এস্কিমোর মতো।

ওরা কালো—কারণ তাদের পরনে লম্বা কালো আলখাল্লা, আর সেই লবণ, যা নখের নিচেও জমে থাকত, যাকে তারা মেরু-রাত্রির দীর্ঘ, অবসন্ন ঘুমের মধ্যে তিক্ত স্বাদে বারবার চেখে গিলে ফেলত, যে লবণ তারা পান করত জল হিসেবেও উজ্জ্বল এক ফাটলের গভীরে থাকা একমাত্র ঝরনা থেকে, সেই লবণই ধীরে ধীরে তাদের কালো পোশাকে এমন দাগ  এঁকে দিত, যেন বৃষ্টির পর ভেজা জমিতে শামুকের রেখে যাওয়া রূপালি পথচিহ্ন।

হে প্রভু, একবার সত্যিকারের বৃষ্টি নামাও—দীর্ঘ, ঘনঘোর বৃষ্টি, তোমার আকাশ থেকে! একমাত্র তখনই ভেতর থেকে ক্রমাগত ক্ষয়ে যাওয়া কদর্য শহরটি ধীরে, কিন্তু অনিবার্যভাবে ধসে পড়বে—আর আঠালো, পিচ্ছিল এক স্রোতে পুরোপুরি গলে গিয়ে তার বর্বর অধিবাসীদের টেনে–হিঁচড়ে বালির দিকে নিয়ে যাবে। দোহাই প্রভু, একবার বৃষ্টি নামাও!

কী বলছি আমি! কীসের প্রভু? প্রভু তো তারাই, প্রভু এবং অধিপতি! তারা তাদের বন্ধ্যা ঘরগুলোতেও প্রভুত্ব করে, শাসন করে তাদের কালো দাসদের উপর—যাদের তারা খনিতে খাটিয়ে খাটিয়ে মেরে ফেলে—আর এখানে যে প্রতিটি লবণের চাঁই কেটে তোলা হয়, তার দাম দক্ষিণের দেশে একেকটা মানুষের জীবনের সমান; তারা নীরবে হেঁটে যায়—শোকের ঘোমটা পরে—রাস্তাগুলোর খনিজ-শ্বেত আলোয়, আর রাতে—যখন পুরো শহরটা দুধের মতো ফ্যাকাশে এক প্রেতের মতো হয়ে ওঠে—তারা মাথা নুইয়ে ঢুকে পড়ে নিজেদের ঘরের ছায়ায়, যেখানে লবণের দেয়ালগুলো আবছা আলোয় জ্বলে থাকে। তারা ঘুমোয় এক ভারহীন ঘুমে, আর জেগেই আদেশ দেয়, আঘাত করে, বলে তারা এক জাতি, তাদের ঈশ্বরই একমাত্র সত্য ঈশ্বর, আর নিঃশর্ত আনুগত্যই একমাত্র নিয়ম। তারা আমার প্রভু—দয়ার ধারণা যাদের নেই, যারা প্রভুর মতোই একা থাকতে চায়, একা এগোতে চায়, একা শাসন করতে চায়, কারণ কেবল তারাই সাহস করেছিল লবণ আর বালির ভেতর এই শীতল অথচ তপ্ত শহর গড়ে তুলতে। আর আমি…

গরম বাড়তেই সবকিছু গুলিয়ে যায়—আমি ঘামছি, তারা কখনোই না। এখন তো ছায়াটাই গরম হয়ে উঠছে। আমার উপরে থাকা পাথরে সূর্যের আঘাত টের পাই—হাতুড়ির মতো ঠুকছে—বারবার—সব পাথরের গায়ে, আর সেই আঘাতই ধীরে ধীরে সঙ্গীত হয়ে উঠছে, দুপুরের বিস্তীর্ণ সঙ্গীত। শত শত কিলোমিটার জুড়ে বাতাস আর পাথর একসঙ্গে কাঁপছে, আহ্—সেই নিস্তব্ধতা আমি শুনতে পাচ্ছি, ঠিক যেমনটা আগে শুনেছিলাম—একদিন।

হ্যাঁ, এই একই নিস্তব্ধতা—যা বহু বছর আগে আমাকে স্বাগত জানিয়েছিল, যখন প্রহরীরা আমাকে সূর্যের আলোয় টেনে নিয়ে গিয়েছিল তাদের কাছে—চকের মতো সাদা সেই চত্বরের মাঝখানে, কেন্দ্রবিন্দুতে, যেখান থেকে সমকেন্দ্রিক ধাপগুলো ধীরে ধীরে উঠে গিয়েছিল গাঢ় নীল আকাশের ঢাকনার দিকে, যা ঢালু নিম্নভূমিটাকে ছাতার মতো ঢেকে রেখেছিল।

সেখানে, সেই সাদা ঢালের গহ্বরে, আমাকে হাঁটু গেড়ে ফেলে রাখা হয়েছিল। চারদিকের দেয়াল থেকে ছুটে আসা লবণ আর আগুনের শলাকায় আমার চোখ ক্ষয়ে যাচ্ছিল। ক্লান্তিতে আমি ফ্যাকাশে; পথপ্রদর্শকের আঘাতে কান থেকে রক্ত ঝরছিল। আর তারা—লম্বা, কালো—একটিও কথা না বলে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল।

দিন তখন মধ্যগগনে। লৌহতপ্ত সূর্যের আঘাতে আকাশ যেন শ্বেততপ্ত ধাতুর পাতের মতো বাজছিল। ঠিক সেই নিস্তব্ধতার ভেতর তারা আমার দিকে তাকিয়ে ছিল—সময় গড়িয়ে যাচ্ছিল, তবু তারা তাকিয়েই ছিল, নির্নিমেষ, কেবল আমার দিকেই। আমি আর তাদের দৃষ্টির মুখোমুখি থাকতে পারছিলাম না। আমার শ্বাস ক্রমে আরও অনিয়মিত, আরও ভারী হয়ে উঠল, আর শেষমেশ আমি ভেঙে পড়ে কেঁদে ফেললাম।

হঠাৎ তারা সবাই একসঙ্গে আমার দিকে পিঠ ফিরিয়ে একই দিকে চলে গেল। হাঁটু গেড়ে বসে আমি দেখছিলাম শুধু তাদের পা—লাল-কালো স্যান্ডেলে বাঁধা—লবণের ঝিলিকে ঝকঝক করছিল। তারা লম্বা কালো আলখাল্লা সামান্য তুলে হাঁটছিল; পায়ের পাতা সামান্য উঠছিল, গোড়ালি হালকা ঠুকে পড়ছিল মাটিতে। চত্বর ফাঁকা হয়ে যেতেই আমাকে টেনে নিয়ে যাওয়া হল মূর্তির মন্দিরে।

আজ যেমন পাথরের ফাঁকে হাঁটু গেড়ে বসে আছি—মাথার উপর একরাশ আগুনের উত্তাপ, যা পাথরের মোটা স্তর ভেদ করে হুলের মতো গায়ে ফুটছে—ঠিক তেমনই কয়েকদিন কাটিয়েছিলাম মূর্তি-পুজোর মন্দিরের অন্ধকারে। ঘরটি অন্যগুলোর তুলনায় একটু উঁচু, লবণের দেয়াল দিয়ে ঘেরা, জানালাহীন—ঝিকিমিকি করা এক রাতের অন্ধকারে ঠাসা। তারা আমার সামনে ছুড়ে দিত এক বাটি নোনা জল আর কিছু দানা—মুরগিকে যেভাবে খাওয়ানো হয়—আমি সেগুলো কুড়িয়ে নিতাম। দিনের বেলায় দরজা বন্ধই থাকত, তবু অদম্য সূর্য যেন লবণের স্তর ভেদ করে ঢুকে পড়ত, আর অন্ধকার ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে যেত। কোনো প্রদীপ ছিল না—দেয়াল ঘেঁষে হাতড়ে এগোতে গিয়ে আঙুলে ধাক্কা খেত দেয়ালে ঝোলানো শুকনো তালপাতার মালা, আর শেষে পাওয়া যেত একটা ছোট দরজা, অদক্ষভাবে বসানো, যার তালার ক্ষুদ্র ছিদ্র আমি আঙুলের ডগায় চিনে নিয়েছিলাম।

আরও কয়েক দিন কেটে গেল—কত দিন, কত ঘণ্টা, তার হিসেব রাখতে পারিনি। শুধু জানি, প্রায় দশবার আমার সামনে দানা ছোড়া হয়েছিল। মলমূত্রের জন্য একটি গর্ত খুঁড়েছিলাম, ঢেকে দিতাম, তবু পশুর গুহার মতো দুর্গন্ধ ঘরে জমে থাকত। অনেক পরে—হ্যাঁ, অনেক পরে—হঠাৎ দরজা খুলে গেল, আর তারা ভেতরে ঢুকল। তাদের একজন আমার দিকে এগিয়ে এল। আমি তখন এক কোণে হাঁটু গেড়ে বসে। লবণের উত্তাপে গাল জ্বলছিল; তালপাতার ধুলোমাখা গন্ধে ভরা বাতাসে আমি তার কাছে আসা টের পাচ্ছিলাম। সে গজ খানেক দূরে থেমে নীরবে তাকাল। একটুখানি ইশারা। আমি উঠে দাঁড়ালাম। সে তখনও স্থির—তার বাদামি, ঘোড়ার মতো মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই, ধাতব চোখে কোনো আলো নেই। হঠাৎ সে হাত তুলল। একই নির্লিপ্ততায় আমার নিচের ঠোঁট ধরল। ধীরে ধীরে মুচড়ে ধরতে থাকল—যতক্ষণ না মাংস ছিঁড়ে গেল। মুঠি আলগা না করেই আমাকে ঘুরিয়ে ঘরের মাঝখানে টেনে নিল। আমি হাঁটু ভেঙে মাটিতে লুটিয়ে পড়লাম, রক্তাক্ত মুখ নিয়ে নিঃশব্দে হতবাক। তারপর সে ঘুরে দেয়ালের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা অন্যদের পাশে গিয়ে দাঁড়াল।

খোলা দরজা দিয়ে ঢুকে পড়া অবিরাম দিবালোকের অসহ্য উত্তাপে আমি কাতরাচ্ছিলাম, আর তারা সবাই তাকিয়ে ছিল। ঠিক তখনই সেই আলোয় আবির্ভূত হল গুনিন—চুল তালগাছের আঁশে পাকানো, বুকে মুক্তোর বর্ম, খড়ের ছোট ঘাঘরার নিচে উন্মুক্ত পা, মুখে নলখাগড়া ও তারের তৈরি মুখোশ, চোখের জায়গায় দুটি চৌকো ছিদ্র। তার পেছনে এল বাদ্যকর আর নারীরা—ভারী রঙচঙে পোশাকে ঢাকা, শরীরের কিছুই দেখা যায় না। তারা দরজার সামনে নাচতে লাগল—এক বেসুরো, প্রায় তালহীন নাচ, কেবল সামান্য দুলুনি। শেষে গুনিন আমার পেছনের ছোট দরজাটি খুলল। প্রভুরা তখনও নড়েনি—শুধু তাকিয়ে ছিল। আমি ফিরে দাঁড়াতেই দেখলাম একটি মূর্তি—হাতে দ্বি-মুখী কুঠার, লোহার নাসিকা সাপের মতো কুণ্ডলী পাকানো।

আমাকে তাঁর সামনে, বেদির পাদদেশে নিয়ে যাওয়া হল। পান করানো হল এক পাত্র কালো তেতো জল—আর সঙ্গে সঙ্গে আমার মাথা জ্বলে উঠল। আমি হাসতে শুরু করলাম—এটাই সেই অপমান। আমাকে অপমান করা হয়েছে। তারপর তারা আমাকে উলঙ্গ করল। মাথা ও সারা দেহ কামাল। তেল মাখিয়ে গা ঘষে ধুয়ে নিল। তারপর লবানাক্ত জলে চোবানো দড়ি দিয়ে মুখে বারবার আঘাত করতে লাগল। আমি হাসতে হাসতে মুখ ফিরিয়ে নিতাম, কিন্তু প্রতিবারই দুই নারী আমার কান ধরে মুখটি আবার গুনিনের সামনে নিয়ে যেত। আমি দেখতে পাচ্ছিলাম শুধু চতুষ্কোণাকার চোখ। আমি রক্তে ভেসে যাচ্ছিলাম, তবুও হাসি থামছিল না। কিন্তু তারা থেমে গেল। সবাই নীরব ছিল—শুধু আমিই কথা বলে যাচ্ছিলাম। আমার মাথার ভেতর কিছু একটা ফুটতে লাগল। তারপর তারা আমাকে দাঁড় করাল, জোর করে মূর্তির দিকে তাকাতে বাধ্য করল। আমার হাসি বন্ধ হয়ে গেল। আমি বুঝলাম—আমাকে তাঁর কাছে উৎসর্গ করা হয়েছে। তাঁর সেবা করতে। তাঁর পূজা করতে। না। আমি আর হাসছিলাম না। ভয় আর যন্ত্রণায় দম বন্ধ হয়ে আসছিল। বাইরের সূর্য সাদা দেয়াল ভেদ করে ঘরের প্রতিটি ইঞ্চি পুড়িয়ে দিচ্ছিল। আমি কাতরাচ্ছিলাম; সমস্ত স্মৃতি লোপ পেয়ে গিয়েছিল। তখন আমি মূর্তির কাছে প্রার্থনা করতে শুরু করলাম। চোখের সামনে শুধু মূর্তির মুখ। তাঁর ভয়ংকর মুখটিও তখন পৃথিবীর বাকি সবকিছুর চেয়ে কম ভয়ংকর মনে হচ্ছিল। অবশেষে এমন এক সময় এলো যখন আমার গোড়ালি দড়ি দিয়ে বাঁধা হলো—এমনভাবে, যাতে কেবল এক পা ফেলার সুযোগ ছিল। তারা আবার নাচতে লাগল, এবার মূর্তির সামনে। প্রভুরা একে একে দরজা পেরিয়ে বেরিয়ে গেল।

দরজাটা তাদের পেছনে বন্ধ হতেই আবার বেজে উঠল সেই বাজনা। গুনিন ছাল-বাকল জ্বালিয়ে আগুনের চক্র তৈরি করে পা ঠুকে ঠুকে লম্ফঝাঁপ শুরু করল। সাদা দেয়ালের কোণগুলোতে ভেঙে ভেঙে পড়ল তার লম্বা ছায়া। সমতল পৃষ্ঠগুলোতে তা কেঁপে কেঁপে উঠল। ঘরটা নাচতে থাকা অসংখ্য ছায়ায় ভরে উঠল।

সে ঘরের এক কোণে মাটিতে একটি আয়তক্ষেত্র কেটে নিল, যেখানে নারীরা আমাকে টেনে নিয়ে গেল। তাদের শুষ্ক, কোমল হাতের স্পর্শ আমি অনুভব করলাম। তারা আমার সামনে রাখল এক বাটি জল আর এক গুচ্ছ শস্য, তারপর আঙুল তুলে মূর্তির দিকে দেখাল। আমি বুঝলাম—আমার চোখ অটল রাখতে হবে শুধু তাঁরই ওপর। তারপর গুনিন একজন একজন করে তাদের আগুনের কাছে ডাকল। তাদের কয়েকজনকে সে প্রহার করল। তারা কেঁদে উঠল, তারপর গিয়ে মূর্তির সামনে, আমার ভগবানের কাছে, মাথা নত করল। নাচতে নাচতেই গুনিন তাদের সবাইকে ঘর থেকে বের করে দিল। শুধু একজনকে রেখে দিল—সবচেয়ে তরুণ, যেন এখনও অপ্রাপ্তবয়স্ক। সে গুটিসুটি মেরে বসেছিল বাদকদের পাশে আর এখনও মার খায়নি।

গুনিন মেয়েটির চুলের গোছা ধরে কবজির চারপাশে পাকিয়ে নিল। মেয়েটি পিছনে ঝুঁকে পড়ল, চোখ বিস্ফারিত। অবশেষে পিঠে ভর দিয়ে মাটিতে ঢলে পড়ল। তাকে ফেলে দিয়ে গুনিন চিৎকার করে উঠল। বাদকেরা দেয়ালের দিকে মুখ ফিরিয়ে নিল। চৌকো চোখ-ওয়ালা মুখোশের আড়াল থেকে চিৎকার বেরিয়ে এলো—অসম্ভব তীক্ষ্ণ। মেয়েটি খিঁচুনির মতো গড়াগড়ি দিতে লাগল। শেষে হাঁটু ও হাতের ওপর ভর দিয়ে মাথাটা বাহুর ভাঁজে গুঁজে সেও চিৎকার করতে লাগল— ফাঁপা, যেন কাপড়ে চাপা পড়া।  এই অবস্থাতেই, চিৎকার না থামিয়ে, মূর্তির দিক থেকে চোখ না সরিয়ে, গুনিন হঠাৎ তাকে গ্রাস করল—দক্ষ, বীভৎস ভঙ্গিতে। মেয়েটির মুখ দেখা যাচ্ছিল না; পোশাকের ভারি ভাঁজের নিচে ঢাকা। আর আমি—সম্পূর্ণ একা, বোধশক্তিহীন। আমিও কী চিৎকার করে উঠিনি? হ্যাঁ, আমি মূর্তির দিকে তাকিয়ে আর্তনাদ করে উঠেছিলাম, যতক্ষণ না একটি লাথি আমাকে ছুড়ে দেয়ালে আছড়ে ফেলল। আমি লবণ কামড়ে ধরলাম—ঠিক যেমন এখন জিহ্বাহীন মুখ দিয়ে পাথর কামড়ে ধরে আছি, অপেক্ষা করছি সেই লোকটার জন্য, যাকে আমি হত্যা করব।

এখন সূর্য আকাশের মধ্যভাগ পেরিয়ে সামান্য ঢলে পড়েছে। পাথরের ফাঁক দিয়ে দেখি—শ্বেততপ্ত ধাতব আকাশে সূর্য যেন এক ছিদ্র। সেই ছিদ্র আমার মুখের মতোই অনর্গল অগ্নিনদী উগরে দিচ্ছে নির্জীব মরুভূমির বুকে। সামনে পথ পুরো ফাঁকা; দিগন্তে ধুলোর কোনো আভাস নেই। পেছনে তারা হয়তো আমাকে খুঁজছে। না, এখনো নয়।

শেষ বিকেলে দরজা খুললে আমি একটু বাইরে আসার সুযোগ পাই। তার আগে গোটা দিন মূর্তির মন্দির পরিষ্কার করি, নতুন প্রার্থনা সামগ্রী আর নৈবেদ্য প্রস্তুত করি। সন্ধ্যার অনুষ্ঠানে আমাকে প্রায়ই মারধর করা হয়। তবু মূর্তির সেবায় কখনো ঢিলেমি দিই না। সেই মূর্তি—দগ্ধ লোহার মতো যার মুখ আমার স্মৃতিতে খোদাই হয়ে আছে—এখন আমার আশা-আকাঙ্ক্ষার ভুবনও দখল করে নিয়েছে।

কোনো ঈশ্বর কখনও আমাকে এভাবে অধিকার করেনি। এতটা দাসে পরিণত করেনি। আমার পুরো জীবন—অহর্নিশ—তাঁর প্রতিই নিবেদিত ছিল। ব্যথা, অথবা ব্যথার অবসান—সেটাই কি আনন্দ? সবই তাঁর থেকেই উৎসারিত; এমনকি কামনাও—হ্যাঁ, কামনাও—যার জন্ম হয়েছিল প্রায় প্রতিদিন সেই নির্লিপ্ত, নোংরা আচারের সামনে উপস্থিত থাকতে থাকতে। এটির ভেতর থেকে উঠে আসা শব্দ শুনতাম, কিন্তু দৃশ্য দেখতে পেতাম না; আমাকে দেয়ালের দিকে মুখ করে থাকতে হত, নয়তো মার খেতে হত। মুখ লবণের দেয়ালে ঠেকানো। দেয়ালে সঞ্চরিত পাশবিক ছায়ায় আবিষ্ট হয়ে আমি সেই দীর্ঘ চিৎকার শুনতাম। গলা শুকিয়ে যেত। আর এক দহনশীল, যৌনতাহীন কামনা আমার কানপাট আর উদরকে যেন লোহার পেষণযন্ত্রে চেপে ধরত।

সেইভাবে দিনগুলি একের পর এক গড়িয়ে যেত; সেগুলির ভেতর আমি প্রায় কোনো ফারাকই টের পেতাম না—মনে হত উগ্র তাপ আর লবণের দেয়ালের প্রতারণাময় প্রতিধ্বনিতে তারা যেন গলে গিয়ে একাকার হয়ে গেছে। সময় তখন কেবল এক অস্পষ্ট ঢেউয়ের আলতো আছড়ে পড়া—তারই মধ্যে নির্দিষ্ট বিরতিতে ফেটে উঠত যন্ত্রণার বা আবিষ্টতার চিৎকার।। এক দীর্ঘ, বয়সহীন দিন—যেখানে মূর্তিই শাসন করত, যেমন এই হিংস্র সূর্য শাসন করে আমার পাথরের ঘরকে।

আর এখনো, ঠিক তখনকার মতো, আমি কাঁদি—দুঃখে আর তৃষ্ণায়। এক দুষ্ট আশা আমাকে গ্রাস করে। আমি বিশ্বাসঘাতকতা করতে চাই। আমি আমার বন্দুকের নল চাটি, তার ভেতরের আত্মাটাকেও—আত্মা—হ্যাঁ, কেবল বন্দুকেরই আত্মা থাকে! ওহ, হ্যাঁ! যেদিন তারা আমার জিভ কেটে নিয়েছিল, সেদিনই আমি ঘৃণার অমর আত্মাকে আরাধনা করতে শিখেছিলাম।

এ কী গোলমাল, এ কী উন্মত্ত রোষ—উত্তাপ আর ক্রোধে আবিষ্ট আমার বন্দুকের ওপর উপুড় হয়ে পড়ে আছি। কে হাঁপাচ্ছে এখানে? আর সহ্য হয় না—এই অন্তহীন তাপ, এই প্রতীক্ষা। আমাকে তাকে হত্যা করতেই হবে।

না কোনো পাখি, না ঘাসের একটি শিষ—শুধু পাথর, এক শুকনো বাসনা, তাদের চিৎকার, আর আমার ভেতরের এই জিভের স্বতঃস্ফূর্ত কথাবার্তা। যেদিন তারা আমার অঙ্গছেদ করেছিল, সেই দিন থেকে আমি এক দীর্ঘ, অবিরাম, নির্জন যন্ত্রণায়—এক এমন যন্ত্রণায় যা আমাকে রাতের শীতল জল থেকেও বঞ্চিত করেছিল। তবু আমি সেই রাতের স্বপ্ন দেখতাম, যখন আমি সেই ঈশ্বরের সঙ্গে তালাবদ্ধ  থাকতাম, আমার লবণের গহ্বরে।

শীতল নক্ষত্ররাজি আর অন্ধকার ঝর্ণাধারায় ভরা রাতই আমাকে রক্ষা করতে পারত, মানবজাতির দুষ্ট দেবতাদের হাত থেকে মুক্তি দিয়ে আমাকে দূরে কোথাও নিয়ে গিয়ে; কিন্তু চিররুদ্ধ আমি সেই পরিত্রাতা রাতকে দেখতেও পারিনি। যদি নবাগমনকারী আরও দেরি করে, তাহলে আমি অন্তত তাকে দেখতে পাব—মরুভূমির প্রান্তরেখা থেকে উঠে আসতে এবং সমগ্র আকাশে ছড়িয়ে পড়তে; একটি শীতল সোনালি দ্রাক্ষালতার মতো, যা অন্ধকার শিখর থেকে ঝুলবে, এবং যার রস যতক্ষণ চাই, পান করতে পারব, ভিজিয়ে নিতে পারব এই কালো শুষ্ক গহ্বর—যেটিকে আজ আর কোনও সজীব, নমনীয় মাংসপেশী স্পন্দিত করতে পারে না—এবং অবশেষে ভুলে যেতে পারব সেই দিন, যেদিন পাগলামি আমার জিভ কেড়ে নিয়েছিল।

কী গরমই না ছিল, সত্যিই ভয়ানক গরম। লবণ যেন গলে যাচ্ছে—অন্তত আমার তেমন মনে হচ্ছিল। বাতাস আমার চোখকে মরিচের মতো ঝলসাচ্ছিল। তখনই গুনিন মুখোশ ছাড়াই ভেতরে ঢুকল। তার পেছনে একটি নতুন নারী—প্রায় নগ্ন, গায়ে নেকড়ার মতো ছেঁড়া কাপড় জড়ানো—তার মুখজুড়ে ছিল এমন উলকি যে মনে হচ্ছিল সে কোনো মূর্তির মুখোশ পরেছে। তার মুখায়বে ছিল এক অস্বাভাবিক, ভয়ঙ্কর, নির্মম অসাড়তা—মাটির প্রতিমার মতো, যেখানে খোদাই করা আছে বিদ্বেষের অতিপ্রাকৃত অভিব্যক্তি। প্রাণের চিহ্ন বলতে ছিল তার পাতলা, সমতল শরীর, যা মূর্তির পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়েছিল, যখন গুনিন কুলুঙ্গির দরজাটি খুলে দিল।

তারপর গুনিন আমাকে একবারও না দেখে বেরিয়ে গেল। গরম আরও বেড়ে উঠছিল, কিন্তু আমি নড়লাম না। মূর্তিটি নারীর নিথর শরীরের উপর দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। তখনই দেখলাম, নিথর সেই শরীরের পেশীগুলো আলতো করে কেঁপে উঠছে। আমি তার দিকে এগিয়ে গেলাম, কিন্তু তার মূর্তিসদৃশ, নিস্পৃহ মুখে কোনো পরিবর্তন দেখা গেল না। শুধু চোখ দুটি বিস্ফারিত হয়ে আমার দিকে চেয়ে রইল।

আমার পা তার পা স্পর্শ করতেই উত্তাপ যেন বিকট চিৎকারে ফেটে পড়ল। মূর্তিসমা সেই নারী কোনো কথা না বলে, প্রসারিত, অচল দৃষ্টি আমার উপরে রেখে ধীরে ধীরে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ল, পা দুটি ভাঁজ করে তুলে নিল এবং কোমলভাবে হাঁটু দুটি ছড়িয়ে দিল।

কিন্তু তখনই—আহ! গুনিন আমার জন্য ওৎ পেতেছিল। তারা সবাই ভিতরে ঢুকে পড়ে আমাকে সেই নারীর সংস্পর্শ থেকে বিচ্ছিন্ন করল, পাপস্থানে ভীষণভাবে কশাঘাত করল। পাপ কী? আমি হাসতে লাগলাম—পাপ কোথায়, পুণ্য কোথায়! তারা আমাকে দেয়ালে চেপে ধরল। একটি ইস্পাত-কঠিন হাত আমার চোয়াল চেপে ধরল, আরেকটি হাত আমার মুখ খুলল, জিভ টেনে বের করল যতক্ষণ না তা রক্তে ভিজে গেল। পশুর মতো সেই চিৎকারটা কি আমারই ছিল? এক শীতল, ধারালো কোমল স্পর্শ—হ্যাঁ, শেষ পর্যন্ত শীতলই—বুলিয়ে দিল আমার জিভের ওপর।

যখন জ্ঞান এল, আমি একা—রাতের অন্ধকারে, দেয়ালের সঙ্গে সেঁটে; শরীরজুড়ে জমাট রক্ত, মুখে ঠাসা অচেনা গন্ধের শুকনো ঘাস। রক্তপাত থেমে গিয়েছিল, কিন্তু জায়গাটা ফাঁকা—আর সেই শূন্যতার ভেতর একমাত্র জীবিত ছিল এক বিরামহীন যন্ত্রণা। উঠতে চাইলাম, আবার লুটিয়ে পড়লাম—খুশি, মরিয়াভাবে খুশি যে অবশেষে মরতে পারব। মৃত্যুও শীতল; আর তার ছায়ায় কোনো ঈশ্বর লুকিয়ে থাকে না।

আমি মরিনি। একদিন হঠাৎ এক নতুন ঘৃণা মাথা তুলে দাঁড়াল—একই সঙ্গে আমিও উঠে দাঁড়ালাম। কুলুঙ্গির দরজার দিকে এগিয়ে গেলাম, খুললাম, আর ঢুকে বন্ধ করে দিলাম। আমি আমার লোকদের ঘৃণা করলাম। মূর্তিটি তখনও সেখানেই—যে গহ্বরে আমি পড়ে ছিলাম, সেখানে আমি শুধু প্রার্থনা করিনি; আমি তাঁকে বিশ্বাস করলাম, আর এতদিন যা কিছু বিশ্বাস করেছিলাম, সব অস্বীকার করলাম। জয় হোক! তিনি শক্তি ও বলের প্রতীক; তাঁকে ভাঙা যায়, কিন্তু বদলানো যায় না। তাঁর শূন্য, নিস্তেজ চোখ আমার মাথার ওপর সরাসরি চোখ বুলাল। জয় হোক! তিনি শাসক, একমাত্র প্রভুা তাঁর একমাত্র সংশয়াতীত বৈশিষ্ট্য—নিষ্ঠুরতা। ভালো শাসক বলে কিছু নেই। এই প্রথমবার, অপমানের আঘাতে আমার পুরো শরীর একক যন্ত্রণায় চিৎকার করল। আমি তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করলাম, তাঁর দুষ্টাচারী আদেশ মেনে নিলাম। উপাসনা করলাম তাঁর মধ্যে লালিত বিশ্বের দুষ্ট নীতিকে।

আমি বন্দি তাঁর সাম্রাজ্যে—বন্ধ্যা শহর, যা লবণের পাহাড় খুঁঁচিয়ে তৈরি, প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন, মরুভূমির সেই বিরল ও ক্ষণস্থায়ী ফুল ফোটার সৌন্দর্য থেকে বঞ্চিত, হঠাৎ কোনো স্পন্দন বা কোমলতার ছোঁয়া—যেমন আকস্মিক মেঘ বা তীব্র, ক্ষণস্থায়ী বৃষ্টি—থেকে সম্পূর্ণরূপে সংরক্ষিত, যা এতটাই সাধারণ যে সূর্য আর বালিকণারাও তার স্বাদ পায়। সংক্ষেপে, এটি ছিল নিয়মে আবদ্ধ শহর: চৌকো চৌকো ঘর, সমকোণী কোণ, কঠোর আর অনমনীয় মানুষজন। আমি স্বেচ্ছায় এই শহরের নির্যাতিত ও ঘৃণায় পূর্ণ নাগরিক হয়ে গেলাম। এতদিন আমাকে যা ইতিহাস শেখানো হয়েছিল, সব আমি সম্পূর্ণ অস্বীকার করলাম। আমাকে বিভ্রান্ত করা হয়েছিল। কেবল দুষ্টের শাসনই ত্রুটিমুক্ত। আমাকে বিভ্রান্ত করা হয়েছিল— সত্য সোজা, ভাঁজহীন, কঠোর; কোনো বৈচিত্র্য মানে না। ভালো এক অলস স্বপ্ন, একটি উদ্দেশ্য যা সর্বদা  পিছিয়ে যায়, ক্লান্তিকর খাটনির সঙ্গে সাধ্য করা হয়, একটি সীমা যেখানে  কখনো পৌঁছনো যায় না; ভালো শাসন অসম্ভব।

শুধুমাত্র দুষ্টই তার সীমা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে এবং নিরঙ্কুশ শাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারে; তার দৃশ্যমান সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার জন্য তাকে পূর্ণরূপে সেবা করতে হয়। তারপর—কিন্তু এই ‘তারপর’ মানে কী? কেবল দুষ্টই উপস্থিত। নিপাত যাক ইউরোপ, নিপাত যাক যুক্তি, নিপাত যাক মর্যাদা, এবং নিপাত যাক ক্রস। হ্যাঁ, আমাকে আমার প্রভুদের ধর্মে ধর্মান্তরিত হতে হবে; হ্যাঁ, আমি সত্যিই একজন দাস ছিলাম। কিন্তু যদি আমি নিজেও নিষ্ঠুর হয়ে উঠি, তবে আমি আর দাস নই—শেকলবদ্ধ পা এবং বোবা মুখ থাকা সত্ত্বেও।

আহ! এই অদম্য উত্তাপ আমাকে পাগল করে দিচ্ছে। অসহনীয় আলোয় মরুভূমি যেন সর্বত্র আর্তনাদ করছে—আর তিনি, করুণার প্রভু, যার নামই আমাকে ঘৃণায় বিকর্ষণ করে—আমি তাঁকে ত্যাগ করেছি, কারণ এখন আমি তাঁকে চিনি। তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন। তাই মিথ্যা বলতে চেয়েছিলেন; তাই তাঁর জিভ কেটে ফেলা হয়েছিল, যেন তাঁর কথা আর পৃথিবীকে বিভ্রান্ত করতে না পারে। তাঁর শরীরের প্রতিটি অংশে পেরেক গেঁথেছিল, এমনকি মাথাতেও—যেমনটা এখন আমার।

কী গোলমাল! আমি কতটা দুর্বল! অথচ পৃথিবী একটুও কাঁপেনি। আমি নিশ্চিত, তারা কোনো সৎ মানুষকে হত্যা করেনি। আমি তা বিশ্বাস করতে অস্বীকার করি। সৎ মানুষ নেই—আছে শুধু সেই নিষ্ঠুর প্রভুরা, যারা নির্মম সত্যের শাসন প্রতিষ্ঠা করে। হ্যাঁ, একমাত্র মূর্তিই ক্ষমতাধর—এই পৃথিবীর একমাত্র ঈশ্বর। ঘৃণাই তার ধর্মোপদেশ। ঘৃণাই জীবনের উৎস—শীতল জল, পুদিনার মতো ঠাণ্ডা, মুখকে শীতল করে, অন্তরকে জ্বালিয়ে।

তখনই আমি বদলে গেলাম; তারা তা টের পেয়েছিল। দেখা হলে আমি তাদের হাত চুম্বন করতাম। আমি তাদেরই পক্ষে হয়ে গেলাম—অবিরাম তাদের গুণগান গাইতাম, অদম্য ভক্তি নিয়ে, কখনো ক্লান্ত হইনি। আমি তাদের বিশ্বাস করতাম, আশা করতাম তারা আমার লোকদেরও তেমনই অঙ্গছেদ করবে, যেমন আমাকে করেছিল।

যখন জানতে পারলাম যে মিশনারি আসছে, আমি জানতাম কী করতে হবে। সেই দিনও ছিল অন্য সব দিনের মতো—চোখ ঝলসে দেওয়া সেই দীর্ঘ দিবালোক, যা যেন চিরকালীন। বিকেলের শেষভাগে হঠাৎ এক প্রহরীকে দেখা গেল নিম্নভূমির কিনারা ধরে দৌড়াতে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই আমাকে টেনে নেওয়া হলো মূর্তির ঘরে; দরজাটি বন্ধ হয়ে গেল। তাদের একজন অন্ধকারে আমাকে মাটিতে চেপে ধরে রাখল—তার ক্রসাকৃতির তলোয়ার আমার চোখের ওপর ঝুলছিল। দীর্ঘ নীরবতা স্থির হয়ে রইল। হঠাৎই এক অদ্ভুত শব্দে সাধারণত শান্ত সেই নগরী ভরে গেল—প্রথমে বুঝতে সময় লেগেছিল, কারণ ওরা আমার ভাষাতেই কথা বলছিল। কিন্তু শব্দগুলো স্পষ্ট হতে না হতেই তলোয়ারের শীর্ষ আমার চোখের দিকে নেমে এল, আর প্রহরী নীরবে আমার দিকে চোখ রাখল।

তারপর দুটি কণ্ঠস্বর কাছে এগিয়ে এল। তাদের কথাবার্তা আমি এখনো শুনতে পাই। একজন জিজ্ঞেস করল—লেফটেন্যান্ট—কেন এই ঘরটির পাহারা দেওয়া হচ্ছে, দরজা ভেঙে ঢোকা উচিত কি না। অন্য কণ্ঠস্বরটি সংক্ষিপ্তভাবে বলল, “না।” কিছুক্ষণ পরে সে যোগ করল, একটি চুক্তি হয়েছে—শহর বিশ জন সৈন্যের একটি গারিসন মেনে নিয়েছে, শর্ত এই যে তারা প্রাচীরের বাইরে শিবির করবে এবং শহরের রীতিনীতি মেনে চলবে। সৈনিকটি হেসে বলল, “তারা হার মানছে।” কিন্তু অফিসার তা বুঝতে পারল না। এই প্রথমবার, তারা শিশুদের দেখভালের দায়িত্ব অন্যের হাতে দেওয়ার প্রস্তাব গ্রহণ করেছে, আর সেই ব্যক্তিটি হল মিশনারির প্রধান-যাজক।  “পরবর্তীতে আলোচনা হবে এই অঞ্চল নিয়ে,” অন্য কণ্ঠস্বরটি বলল, “তারা প্রধান-যাজককে কেটে ফেলবে যদি সৈন্যরা সেখানে না থাকে।” “ওহ, না,” অফিসার উত্তর দিল, “ফাদার বেফোর্ট বাহিনীর আগেই আসবেন; তিনি দু’দিনের মধ্যে এখানে পৌঁছবেন।”

এর পর আর কিছুই আমি শুনতে পাইনি। তলোয়ারের ধারালো প্রান্ত আমার মাথার উপর ঝুলছিল। যন্ত্রণায় আমার শরীর বিদ্ধ হচ্ছিল—শলাকা আর ছুরির এক ঘূর্ণায়মান চাকা আমার ভেতরে ঘুরছিল। তারা পাগল হয়ে গিয়েছিল। সত্যিই পাগল—তারা শহরের ওপর, তাদের অপরাজেয় ক্ষমতার ওপর, তাদের সত্য ঈশ্বরের ওপর হস্তক্ষেপ মেনে নিয়েছিল।

যে লোকটি আসছে—তার জিভ কাটা হবে না। সে কোনো মূল্য না দিয়েই, কোনো অপমান সহ্য না করেই তার উদ্ধত দয়ার প্রদর্শনী চালিয়ে যাবে। দুষ্টের শাসন স্থগিত থাকবে। সন্দেহ আবার মাথা তুলবে। আবারও সময় নষ্ট হবে। একমাত্র সম্ভবপর সাম্রাজ্যের বাস্তবায়নকে ত্বরান্বিত করার বদলে তারা অসম্ভব ভালোত্বের স্বপ্নে ডুবে, নিষ্ফল প্রচেষ্টায় নিজেদের ক্ষয় করবে। আর আমাকে তাকিয়ে থাকতে হল সেই তলোয়ারের দিকে—যা আমাকে ভয় দেখাচ্ছিল। ওহ ক্ষমতা! পৃথিবীর ওপর শাসন করার একমাত্র শক্তি! ওহ ক্ষমতা!

ধীরে ধীরে শহরের কোলাহল ফুরিয়ে এল। শেষমেশ দরজাটি খুলে গেল। আমি একা পড়ে রইলাম—দগ্ধ, তিক্ত—মূর্তির পাশে। আমি তাঁর কাছে শপথ করলাম: রক্ষা করব আমার নতুন বিশ্বাসকে, আমার সত্য প্রভুদের, আমার স্বৈরাচারী ঈশ্বরকে; এবং প্রয়োজন হলে, যে মূল্যই দিতে হোক না কেন, বিশ্বাসঘাতকতা করব—পরিপূর্ণভাবে, নিখুঁতভাবে।

তাপটা একটু একটু করে কমছে। পাথরের কম্পন থেমে গেছে। আমি আমার গর্ত থেকে বেরিয়ে এসে দেখি, মরুভূমি ধীরে ধীরে হলুদ আর গেরুয়া আভা ধারণ করছে—যা অল্পক্ষণের মধ্যেই ম্লান বেগুনিতে ঢলে পড়বে।

গত রাতে আমি তাদের ঘুমিয়ে পড়া পর্যন্ত অপেক্ষা করেছিলাম। দরজার তালার ছিদ্র গুঁজে বন্ধ করে, আগের মতোই দড়ি মেপে পা ফেলে বেরিয়ে পড়লাম। পথঘাট আমার চেনা ছিল—জানতাম পুরনো বন্দুকটা কোথায় রাখা, কোন ফটকে পাহারা নেই। আর এখানে এসে পৌঁছালাম ঠিক তখনই—যখন মুঠোভরা তারার চারপাশে রাত ফিকে হতে শুরু করেছে, আর মরুভূমি ধীরে ধীরে আরও গাঢ় হয়ে উঠছে।

এখন মনে হচ্ছে—দিনের পর দিন আমি এই পাথরগুলোর ফাঁকে কুঁকড়ে বসে আছি। শিগগিরই, শিগগিরই—আশা করি সে খুব তাড়াতাড়িই আসবে! আর একটু পরেই তারা আমাকে খুঁজতে শুরু করবে, সব পথ ধরে চারদিকে ছুটে বেড়াবে। তারা জানবে না—আমি তাদের জন্যই বেরিয়ে এসেছি, তাদের আরও ভালোভাবে সেবা করার জন্য। আমার পা দুর্বল—ক্ষুধা আর ঘৃণায় টলমল।

ওহ! ওখানে—আহ্—পথের শেষে, দুটি উট ক্রমেই বড় হয়ে উঠছে; হেলেদুলে এগিয়ে আসছে, ছোট ছোট ছায়ায় যেন বহুগুণ হয়ে গেছে। সেই চিরচেনা, প্রাণবন্ত অথচ স্বপ্নালু ভঙ্গিতে এগিয়ে আসছে তারা। এই তো—অবশেষে, এসে গেছে!

দ্রুত—রাইফেল! গুলি ভরে নিই তড়িঘড়ি। ওহ মূর্তি, ওপারে আমার ঈশ্বর—তোমার ক্ষমতা অটুট থাকুক; অপরাধ বহুগুণে বৃদ্ধি পাক; অভিশপ্তদের এই পৃথিবীর উপর ঘৃণা নির্মমভাবে রাজত্ব করুক; পাপীরাই যেন চিরকাল প্রভু হয়ে থাকে। সেই সাম্রাজ্য আসুক—যেখানে লবণ ও লোহার এক নগরীতে কৃষ্ণ স্বৈরাচারীরা করুণা ছাড়া দাসত্ব চাপিয়ে দেবে, নির্মমভাবে দখল করবে, আর নিঃশেষে শাসন করবে!

আর এখন—আহ্—করুণার দিকে গুলি ছোড়ো! দুর্বলতা আর তার দয়ার দিকে গুলি ছোড়ো! যা কিছু দুষ্টের আগমন বিলম্বিত করে—সে সবের দিকে গুলি ছোড়ো! গুলি ছোড়ো—দু’বার! দেখো, তারা ঢলে পড়ছে, ভেঙে লুটিয়ে পড়ছে। আর উটগুলো ছুটে পালাচ্ছে দিগন্তের দিকে—যেখানে অপরিবর্তিত আকাশে এইমাত্র কালো পাখির ঝাঁকের এক ঊর্ধ্বমুখী বিস্ফোরণ ঘটেছে।

আমি হাসছি, আমি হাসছি। লোকটা তার ঘৃণিত পোশাকের ভেতর মোচড়াচ্ছে। মাথাটা একটু তুলেছে—দেখছে আমাকে। আমাকে! তার শেকলবদ্ধ সর্বশক্তিমান প্রভুকে! কিন্তু আমাকে দেখে সে হাসছে কেন? আমি ওই হাসিটা গুঁড়িয়ে দেব! কী সুখকর সেই শব্দ—ভালোত্বের মুখে রাইফেলের বাটের আঘাত! আজ—অবশেষে—সব সিদ্ধ হলো। আর মরুভূমির সর্বত্র—এমনকি এখান থেকে বহু ঘণ্টা দূরেও—শেয়ালগুলো অবিদ্যমান বাতাস শুঁকে নিয়ে মাপা ছন্দে ছুটে বেরিয়ে পড়ে তাদের জন্য অপেক্ষমাণ পচা মৃতদেহের ভোজের দিকে।

জয়! করুণায় আন্দোলিত এক আকাশের দিকে আমি দু’হাত তুলে ধরি। বিপরীত দিকে ফিকে বেগুনি আভা সবেমাত্র ফুটে উঠছে। ও ইউরোপের রাত, আমার দেশ, আমার শৈশব—জয়ের এই মুহূর্তে আমার চোখ ভিজে উঠছে কেন?

সে নড়ল—না, শব্দটা এল অন্য কোথাও থেকে। আর ঠিক সেই দিক থেকেই তারা ছুটে আসছে—কালো পাখির ঝাঁকের মতো—আমার প্রভুরা। তারা ঝাঁপিয়ে পড়ে আমার উপর, আমাকে চেপে ধরে। আহ—হ্যাঁ! মারো! তারা ভয় পাচ্ছে—তাদের নগরী লুণ্ঠিত হবে, আর্তনাদে ফেটে পড়বে। তারা ভয় পাচ্ছে সেই প্রতিশোধপরায়ণ সৈন্যদের, যাদের আমি আহ্বান করেছি। আর এটাই ঠিক—পবিত্র নগরীর উপর শাস্তি এসে পড়া উচিত। এখন আত্মরক্ষা করো—আঘাত করো! আমাকেই আগে মারো। তোমরাই সত্যের অধিকারী!

হে আমার প্রভুরা—তোমরা সৈন্যদের পরাস্ত করবে; শব্দ আর ভালোবাসার উপরও জয় প্রতিষ্ঠা করবে। তোমরা মরুভূমি জুড়ে ছড়িয়ে পড়বে, সমুদ্র পার করবে, ইউরোপের আলো ঢেকে দেবে তোমাদের কালো পর্দায়। আঘাত করো—পেটে আঘাত করো, হ্যাঁ, চোখে আঘাত করো। মহাদেশজুড়ে লবণ ছড়িয়ে দাও—সমস্ত উদ্ভিদ, সমস্ত যৌবন নিঃশেষ হবে। আর শেকলবদ্ধ পায়ের নির্বাক জনতা আমার পাশে পাশে হেঁটে চলবে—বিশ্বব্যাপী মরুভূমিতে, সত্য বলে জাহির করা  একমাত্রিক বিশ্বাসের নিষ্ঠুর সূর্যের নিচে। আমি একা থাকব না।

আহ! কী যন্ত্রণা, কী যন্ত্রণাই না তারা আমাকে দিচ্ছে! তাদের ক্রোধই ভালো। এই ক্রুশাকৃতির যুদ্ধ-সজ্জায়, যেখানে তারা এখন আমাকে জোর করে বেঁধে ফেলেছে—করুণা! আমি হাসছি। পেরেকের উপর যে আঘাতে আমাকে ক্রুশবিদ্ধ করে রাখা হয়, সেই আঘাতকেই আমি ভালোবাসি।

মরুভূমি কত নিস্তব্ধ! রাত নেমে এসেছে, আমি একা, তৃষ্ণার্ত। এখনও অপেক্ষা চলছে… শহর কোথায়? ওই দূরের শব্দগুলো কী? সৈন্যরা—হয়তো বিজয়ী। না, তা হতে পারে না। এমনকি যদি তারা জেতেও, তারা যথেষ্ট দুষ্ট নয়। তারা শাসন করতে পারবে না। তারা এখনও বলবে—মানুষকে আরও ভালো হতে হবে। আবারও লক্ষ লক্ষ মানুষ মন্দ ও ভালোর মাঝখানে ঝুলে থাকবে—ছিন্ন, বিভ্রান্ত। হে মূর্তি, কেন আমাকে পরিত্যাগ করেছ?

সব শেষ। আমি তৃষ্ণার্ত। আমার দেহ জ্বলছে। গাঢ়তর রাত চোখ ভরে দিচ্ছে। দীর্ঘ, এই দীর্ঘ স্বপ্ন—আমি জেগে উঠছি। না, আমি মরে যাচ্ছি। ভোর হচ্ছে। জীবিতদের জন্য দিনের প্রথম আলো। আর আমার জন্য—এই অনিবার্য সূর্য মৃতদেহের উপর ভনভন করা মাছি।

কে কথা বলছে? কেউ না। আকাশ নিজেকে মেলে ধরছে না। না—মরুভূমিতে ঈশ্বর কথা বলেন না। তবু সেই কণ্ঠটা আসে কোথা থেকে, যে বলে: “ঘৃণা আর ক্ষমতার জন্য যদি তুমি মরতে রাজি হও, তাহলে আমাদের ক্ষমা করবে কে?” এটা কী আমার ভেতরে জন্ম নেওয়া আরেকটি জিভ, নাকি সেই অন্য লোকটা—যে মরতে অস্বীকার করছে—এখনও আমার পায়ের কাছে পড়ে বারবার বলছে: “সাহস। সাহস। সাহস।”

আহ! যদি আবারও ভুল হয়ে যায়। একসময় ভ্রাতৃসুলভ মানুষরাই ছিল শেষ আশ্রয়। হে নিঃসঙ্গতা—আমাকে ছেড়ে যেয়ো না। এখানে—এখানে তুমি কে? ছিন্নভিন্ন, রক্তে ভেজা মুখ—তুমিই কি? ও গুনিন, সৈন্যরা কি তোমাকে পরাস্ত করেছে? ওখানে লবণ জ্বলছে— এ তুমিই, আমার প্রিয় প্রভু! ওই ঘৃণায় ভরা মুখটা ঝেড়ে ফেলো—এখন ভালো হও। আমরা ভুল করেছিলাম। নতুন করে শুরু করব—  করুণার শহর গড়ব।  আমি বাড়ি ফিরতে চাই।  হ্যাঁ—আমাকে সাহায্য করো—তোমার হাতটা দাও…

 

বকবক করা দাসের মুখে একমুঠো লবণ ঠেসে দেওয়া হল।

 

0 Comments
Leave a reply