ভাষারক্ষার বিষয় নিয়ে ফিরে ভাবা

লিখেছেন:জোশুয়া এ ফিশম্যান, গেলা স্কয়েড ফিশম্যান
ভাষা-চিন্তা-চেতনা-জীবনযাপনে বৈচিত্র্য ধ্বংস করে ক্রমশ সমসত্ত্বতা আমদানির যে আধিপত্যকারী প্রবণতা, তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ভাষারক্ষার প্রচেষ্টা কেন দরকার, কতটুকু হচ্ছে, কীভাবেই বা হচ্ছে, তা নিয়ে এখানে আলোচনা করেছেন অতিসক্রিয় দুই সমাজভাষাতাত্ত্বিক।

মূল ইংরেজি থেকে বাংলা তর্জমা: বিপ্লব নায়ক

[তর্জমাকারের পক্ষ থেকে কিছু কথা: টোভ স্কুটনাব-কাঙ্গাস-এর ষাটতম জন্মদিন উপলক্ষে ২০০০ সালে রবার্ট ফিলিপসন-এর সম্পাদনায় লরেন্স এর্লবম অ্যাসোসিয়েটস-এর প্রকাশনায় একটি সংকলন-গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিলো, যার নাম: Rights to Language Equity, Power, and Education: Celebrating the 60th Birthday of Tove Skutnabb-Kangas। সেই বইয়ের ২৩ থেকে ২৭ পৃষ্ঠায় জোশুয়া এ ফিশম্যান ও গেলা স্কয়েড ফিশম্যান-এর লেখা এই নিবন্ধটি আছে। আমরা এখানে কেন এই নিবন্ধটি বাংলা তর্জমায় হাজির করছি তা নিয়ে দু-এক কথা বলা জরুরী। মাতৃভাষা পত্রিকার এই এগারো বছরের পথ চলায় শুরু থেকেই বিপন্ন ভাষাগুলোর পক্ষে দাঁড়িয়ে ভাষারক্ষাপ্রচেষ্টার উদ্যোগে শামিল হওয়ার কর্তব্যটি অগ্রাধিকার পেয়ে এসেছে। আলিপুরদুয়ার জেলার টোটোপাড়ার টোটো জনজাতি এবং ঝাড়গ্রাম-বাঁকুড়া-পুরুলিয়া-ময়ূরভঞ্জ জেলার ভূমিজ জনজাতির নিজ ভাষা ও সংস্কৃতি পুনরুজ্জীবনের প্রয়াসে আমরা সাধ্যমতো যুক্ত হয়েছি। দুটি ভাষারক্ষাপ্রয়াসে প্রায় এক দশক ধরে যুক্ত থাকার মধ্য দিয়ে যে অভিজ্ঞতা আমাদের হতে হতে যাচ্ছে, তার একটা পর্যালোচনা করার প্রয়োজনীয়তা এখন আমাদের কাছে বড়ো হয়ে উঠেছে। এই পর্যালোচনা আমরা ধাপে ধাপে মাতৃভাষা পত্রিকার আগামী সংখ্যাগুলোয় হাজির করতে করতে যাবো। সেই পর্যালোচনায় প্রবেশ করার আগে সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে একটি আলোচনা হাজির করা প্রয়োজন, সেই প্রয়োজনীয়তাটি বহুলাংশে এই নিবন্ধটির মধ্য দিয়ে সাধিত হচ্ছে বলে মনে হয়। এই পরিপ্রেক্ষিতেই আমরা এই সংখ্যায় এই নিবন্ধটির বাংলা তর্জমা হাজির করলাম। এর ধারাবাহিকতায় পরবর্তী সংখ্যাগুলোয় আমরা আমাদের নির্দিষ্ট অভিজ্ঞতার পর্যালোচনায় প্রবেশ করবো।

--- বিপ্লব নায়ক।]

 

এমন বহুজন আছেন যারা ভাবেন যে সমাজভাষাতত্ত্বের পুরোটাই হলো ‘ফলিত ভাষাতত্ত্ব’। তাঁদের ওই বিশ্বাস আমাদের পীড়িত করে না কারণ আমরা কার্ট লিউইন-এর এই নীতিবাক্যের সঙ্গে একমত যে ‘একটি ভালো ফলিত প্রয়োগের চেয়ে তাত্ত্বিকভাবে সম্ভাবনাপূর্ণ আর কিছুই হতে পারে না’। তবুও আমরা ওই বিশ্বাসটিকে ভুল বলে মনে করি, কারণ, আর কিছু না হলেও, তা এই অতি-আবশ্যক স্বীকৃতিটি দেয় না যে কোনো ভালো ফলিত প্রয়োগ একমাত্র ভালো তত্ত্বের উপর দাঁড়িয়েই হতে পারে। আর এটাও আমাদের গভীর খেদের বিষয় যে প্রয়োগ করার মতো সমাজভাষাতত্ত্ব এখনও তুলনায় খুব কমই মেলে।আমাদের প্রজন্মের ‘ফলিত সমাজভাষাতাত্ত্বিক’-দের মধ্যে টোভ স্কুটনাব-কাঙ্গাস নিঃসন্দেহে অতি বিশিষ্ট একজন। তিনি দ্বিভাষিক শিক্ষার সবলতর ও আরো পরস্পর-উপকারী ধাঁচা প্রতিপালন করার চেষ্টা করে চলেছেন, প্রসঙ্গত সবচেয়ে দুর্বল ভাষাগুলোকে রক্ষা করার চেষ্টা করে চলেছেন, আর তাঁর এই চেষ্টা তত্ত্ব-সচেতন ভাষারক্ষাপ্রচেষ্টার ভিত গড়ে তোলায় বড়ো ভূমিকা নিয়ে চলেছে।

ভাষারক্ষা

যে কোনো পরিপ্রেক্ষিতগতভাবে দুর্বলতর বা সংকটাপন্ন ভাষার জন্য সামগ্রিক ভাষা-পরিকল্পনা প্রচেষ্টার দুটো ভাগ থাকে--- অবস্থান পরিকল্পনা (status planning) এবং অবয়ব পরিকল্পনা (corpus planning)। এই দুই ভাগের মধ্যেই সম্ভাব্য জোরের একটি জায়গা হলো ‘ভাষারক্ষা’। স্কুটনাব-কাঙ্গাস-এর কাজের আগ্রহ যে ধারায় বয়েছে, সেই অনুযায়ী আমরা এখানে আমাদের আলোচনা মূলত অবস্থান পরিকল্পনা ধরনের ভাষারক্ষাপ্রচেষ্টার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখবো। অবস্থান পরিকল্পনা সংক্রান্ত লেখাপত্রে বহু সংখ্যক অন্বেষণকারী বিবিধ ধরনের ভাষারক্ষাপ্রচেষ্টার কথা তুলে এনেছেন। যারা আরো ব্যাপ্ত করে পৃথিবীজোড়া পরিস্থিতিটি বিচার করতে চেয়েছেন, তাদের মধ্যে ফিশম্যান-এর সাম্প্রতিক (১৯৯১ ও ১৯৯৭-এর) কাজ বিবিধ রকমের বহু উদাহরণ থেকে স্থান ও কাল নির্বিশেষে ভাষারক্ষার সাধারণ কিছু নীতিও আহরণ করার চেষ্টা করেছে। বিশেষ দেশ ধরে বা অঞ্চল ধরে ভাষারক্ষাপ্রচেষ্টার সাম্প্রতিক কিছু বিবরণ হামেল (১৯৯৭-এর কাজ), স্কিফম্যান (১৯৯৬-এর কাজ), টোপোলিনস্কা (১৯৯৮-এর কাজ) দিয়েছেন। এরকম আরো বহু কাজ আছে, সবগুলোর উল্লেখ এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে করা সম্ভব নয়, কিন্তু এই সবগুলো কাজকে খুঁটিয়ে বিচার করলে দেখা যায় যে তারা যে বিবিধ ধরনের ভাষারক্ষাপ্রচেষ্টার উপর মনোনিবেশ করেছে, সেই বিবিধ ধরনগুলোর মধ্যে পার্থক্য বিস্তর, আর তাই তাদের সবগুলোকে হালকা চালে সমগোত্রীয় বলে অকসঙ্গে তাল পাকিয়ে ফেললে চলবে না। ভাষারক্ষাপ্রচেষ্টা নামক একটাই তকমার নিচে পৃথক প্রতীতিগুলোকে একতাল করে দিয়ে তাদের মধ্যের বিশৃঙ্খলাকে লুকোতে চাওয়ার চেয়ে তাদের পৃথকতার দিকগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে অনুধাবন করে বিভিন্ন ধরনের প্রচেষ্টা হিসেবে আলাদা করার মধ্য দিয়েই বরং বিশৃঙ্খলাকে সুশৃঙ্খলভাবে বোঝা যেতে পারে।

সহনশীল ভাষারক্ষাপ্রচেষ্টা

ভাষারক্ষাপ্রচেষ্টার সবচেয়ে বিনত ও প্রাথমিক ধরন হলো সংখ্যাগুরু প্রাধিকারীদের (বা ক্ষমতাধারীদের) কাছ থেকে একরূপ ‘অনুমোদনকারী’ ভঙ্গি চাওয়া বা বজায় রাখা। তেমন ভঙ্গির ফলে প্রাধিকারীদের (বা ক্ষমতাধারীদের) এমন কোনো প্রত্যক্ষ বা কার্যকরী দায় থাকে না যে সুবিধাবঞ্চিত ভাষাগুলোর জন্য তাদের কিছু করতে হবে, বরং, তারা যাতে ওই সুবিধাবঞ্চিত ভাষাগুলোর বিরুদ্ধে অনিষ্টকর আরো কিছু না করে এইটুকুই চাওয়া হয়। যেমন ধরা যাক, মার্কিন সংবিধানে অধিকার সংক্রান্ত ঘোষণায় ‘কথা বলার অধিকার’ নিয়ে যে ধারা আছে তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যারা ইংরেজি নয় এমন ভাষার ব্যবহার উজ্জীবিত করতে চায় তাদের কোনো সাহায্যই করবে না, কিন্তু, অপরদিকে, তা নিশ্চিতভাবেই যারা ইংরেজি নয় এমন ভাষার ব্যবহারের বিরুদ্ধে আইন করতে চায় তাদের বাধা হিসেবে কাজ করবে। সংখ্যালঘুদের ভাষা রক্ষা করার প্রয়াসে এই ধরনের সহনশীল প্রচেষ্টা যে ধরনের অাইনকানুন সম্বল করতে চায় তা কোনোভাবেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘কেবল ইংরেজি’ আন্দোলনের সক্রিয়তার বিরুদ্ধে দাঁড়াবে না, ইংরেজিকে একমাত্র সরকারি ভাষা হিসেবে ঘোষণাকে রোধ করাও আবশ্যকীয় বলে মনে করবে না। আবার, যেমন ধরুন ফ্রান্সে, এই ধরনের সহনশীল ভাষারক্ষাপ্রচেষ্টাজাত  আইন-প্রণয়ন এমনকি নবজাতক শিশুদের সংখ্যালঘু ভাষা-সংস্কৃতির চিহ্নবাহক নাম দেওয়ার ক্ষেত্রে আরোপিত বিধিনিষেধ দূর করাকেও প্রয়োজনীয় মনে করে না। এই ধরনের বিধিনিষেধ কিন্তু এখন ছড়িয়ে পড়ছে--- ব্রিটানি, আলসেক-লরাঁ এবং বাস্ক অঞ্চলে নবজাতক শিশুদের পিতামাতাদের তাদের সন্তানকে তাদের গোষ্ঠীগত ভাষা-সংস্কৃতির নির্দিষ্ট চিহ্নবাহক নাম (আর সেইজন্যই যা ‘অ-ফরাসি’ নাম) দেওয়ার অধিকার নেই, যদিও ‘কথা বলার স্বাধীনতা’ রক্ষা করা নিয়ে আশ্বাসের অন্ত নেই এবং কে না জানে যে নাম অনেক কিছুই ‘বলে’। আবার, ধরা যাক, ১৯২২ সালে মার্কিনদেশের সুপ্রিম কোর্ট মেয়ার বনাম নেব্রাস্কা মামলায় যে রায় দিয়েছিলো তার কথা। নেব্রাস্কার প্রশাসন বারো বছরের নিচের বাচ্চাদের শিক্ষাদানের মাধ্যম হিসেবে যে কোনো আধুনিক মুখের ভাষাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলো। সুপ্রিম কোর্টের রায় সেই নিষেধাজ্ঞাকে বাতিল ঘোষণা করে। সুপ্রিম কোর্টের এই রায়কে তাই মার্কিনদেশে পৃথক-পৃথক জনজাতিদের স্কুলের জন্য ‘ম্যাগনা কার্টা’ বলেও কেউ কেউ অভিহিত করেছেন। কিন্তু কোর্টের এই রায় বা তা দিয়ে তৈরি হওয়া নজির কোনোটার মধ্য দিয়েই শিক্ষাদানের মাধ্যম হিসেবে জনজাতিদের ভাষার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা বা এমনকি খোলাখুলি উৎসাহিত করার কোনো দায় বা দায়িত্ব সরকারের উপর বর্তায় নি। আসলে, এই ধরনের সহনশীলতা কেবলমাত্রই  এক ধরনের নিষ্ক্রিয়তার নীতি (hands-off policy), আর তাই তা সুবিধাবঞ্চিত ভাষাগুলোকে পরিপ্রেক্ষিত ও কার্যকারিতার দিক থেকে একই রকম সুবিধাবঞ্চিত করেই রেখে দেয়। ভাষাজগতের জঙ্গলরাজের ডারউইনীয় বিধির বলি হিসেবেই এই সমস্ত ভাষাগুলো পড়ে থাকে: শক্তিশালীরা টিকে যায় আর দুর্বলরা ক্রমে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।

মূলগতভাবে দেখলে, সহনশীল আইন-কানুন-প্রণয়ন বেশিটাই কিছু সাংকেতিক ভঙ্গিমা মাত্র। তা আভাস-ইঙ্গিত দেয় বেশি, কাজে আসে কম। বড় জোর তা ভবিষ্যতে কোনো সহায়তার জমি তৈরি করতে পারে, কিন্তু বর্তমানে তেমন কোনো সহায়তা তার মধ্য দিয়ে পাওয়া যায় না। সুবিধাবঞ্চিত ভাষাগুলোকে নিয়ে মাত্রাতিরিক্ত দীর্ঘ কাল ধরেই তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে আসা হচ্ছে, আর এখন আর তারা তেমন তাগড়া নেই যে আরো দীর্ঘকাল তাদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে চলা যেতে পারে, কারণ তাদের অস্তিত্বরক্ষার ক্ষেত্রে সময় এখন খুব গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে সমস্ত বিষয়ে আশু মনোযোগ দেওয়া দরকার বলে মনে করা হয়, তেমন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তো আমরা কেবল সহনশীল ইশারা করে ছেড়ে দিই না। শিক্ষাকে যদি আমরা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি, তা আবশ্যক করার জন্য, সহায়-সমর্থন করার জন্য, প্রক্রিয়া জারি রাখার জন্য আমরা বিধি প্রণয়ন করি। ভাষারক্ষা (আর সেই সূত্রেই আরো বহুভাষিক/বহুসাংস্কৃতিক সমাজ ও রাজনীতি) যদি সত্যিই জনস্বার্থে দরকারি বলে মনে করা হয় (যদি না তা কেবল ব্যক্তিগত অবসরযাপনের বিষয় বা ব্যক্তিগত আবেগের বিষয় করে না রাখা হয়), তাবলে এই ক্ষেত্রেও কেবলমাত্র কিছু সহনশীল ভঙ্গিমা বজায় রেখে আমরা তুষ্ট থাকতে পারি না। এমনকি ভঙ্গিমা বজায় রাখার ক্ষেত্রেও সহনশীল নীতি যথেষ্ট হয়ে ওঠে না (কীভাবে তা আমরা পরে আরো আলোচনা করছি), আর তাই তাকে কখনোই সক্রিয় রক্ষণশীল ভাষারক্ষাপ্রচেষ্টা হিসেবেও গণ্য করা যায় না।

সক্রিয় ভাষারক্ষাপ্রচেষ্টা

সক্রিয় ভাষারক্ষাপ্রচেষ্টা সুবিধাবঞ্চিত ভাষাগুলোর ক্ষেত্রে চিকিৎসা ও রোগ-উপশমের প্রয়াস চেষ্টা করে। সুবিধাবঞ্চিত ভাষাগুলোর ক্ষেত্রে বিপদ যখন কেবল চিহ্নিত নয়, বরং ভাষাবিলোপের সম্ভাবনার মধ্য দিয়ে প্রকট হয়ে ওঠে, তখন তার বিরুদ্ধ-সক্রিয়তা রূপে এই উপশমকারী পদক্ষেপগুলো নেওয়া হয়। চিকিৎসা-জগৎ থেকেই উপমা ধার করে বললে বলতে হয়, সক্রিয় ভাষারক্ষাপ্রচেষ্টা তার রোগীর চিকিৎসায় উদ্যোগী হয় যখন রোগটি ইতিমধ্যেই বেশ ফুটে উঠেছে ও চিহ্নিত করা হয়ে গেছে। কিন্তু রোগ হওয়া থেকে বাঁচানোর মতো আশাব্যঞ্জক কোনো অভিপ্রায় এহেন চিকিৎসা-উদ্যোগে নেই। আরো দুঃখের কথা হলো এই যে সক্রিয় ভাষারক্ষাপ্রচেষ্টার অধিকাংশ নথিবদ্ধ প্রয়াসই ভাব-ভঙ্গি-সাংকেতিকতায় যতোটা পটু, কার্যকারিতায় ততোটা নয়। বিপন্ন ক্ষতিগ্রস্ত ভাষাগোষ্ঠীদের সান্ত্বনা দেওয়া হয় তাদের ভাষাকে ‘সহ-প্রশাসনিক’ (‘co-official’) ঘোষণা করার মধ্য দিয়ে। প্রশাসনিক লেটারহেড-এ সেই ভাষাকে স্থান দেওয়া বা গুরুত্বপূর্ণ কোনো জনপরিসরের অনুষ্ঠানে সেই ভাষার কোনো একটা গান গাওয়ানোর ব্যবস্থা করার মধ্য দিয়ে বিপন্ন ভাষাগুলোর জন্য সক্রিয় কর্মীদের মন ভেজানো হয়। ওইরকম জনপরিসরের অনুষ্ঠান যদি কালেভদ্রে না হয়ে খুব ঘন-ঘন-ও হয় (যেমন, রোজ স্কুল শুরুর আগে হওয়া সমবেত গান-গাওয়া), তাহলেও প্রায়শই দেখা যায় যে ওইরকম উপশমকারী পদক্ষেপ শুধু যে অনেক দেরী করে নেওয়া হচ্ছে তা নয়, তা প্রয়োজনের তুলনায় নিতান্তই অতি অল্প (যেমন, মুছে-যেতে-থাকা কোনো ভাষাকে অন্তর্গত করে উত্তরণমুখী দ্বিভাষিক শিক্ষা চালু করলে সেক্ষেত্রে হয়)। সত্যিকারের কার্যকরী ভাষারক্ষাপ্রচেষ্টা করতে হলে এইরকম বাইরে সাজসজ্জা-আড়ম্বর তৈরির চেষ্টার চেয়ে আরো অনেক বেশি কিছু প্রয়োজন। দৈনন্দিন জীবনে, বা এমনকি ভাষার জীবনেও এই সাংকেতিক অলঙ্কারসমূহ দিয়ে চিঁড়ে ভেজে না, এমনকি স্বাস্থ্যবান ভাষাদের জীবনেও ভেজে না, যারা রুগ্ন-বিপন্ন তাদের কথা তো ছেড়েই দেওয়া যাক। এমনকি তথাকথিত ‘সক্রিয়তাসূচক গবেষণা’(‘action-research’)–গুলোও যদি নিষ্ঠাবান তথ্য সংগ্রহ ও আবেক্ষণ, পরীক্ষানিরীক্ষা, পর্যায়ক্রমিক মূল্যায়ন এবং পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে নির্দিষ্ট অর্জন-সূচকগুলোর সাপেক্ষে নিজেকে বিচার করতে করতে না যায়, তাহলে তা-ও কোনো রোগ-উপশম ঘটানোর চেয়ে সাংকেতিকতার মধ্যেই আবদ্ধ থাকবে। গবেষণা বহু তথ্য তুলে আনতে পারে, কিন্তু তা বলেই তা রোগ-উপশমকারী হয়ে যায় না। এমন বহু রুগ্ন ভাষা ছিলো এবং এখনও আছে, যেগুলো নিয়ে বিস্তর গবেষণা চালাতে চালাতেই সেগুলোকে মৃত্যুর পথে এগিয়ে দেওয়া হয়েছে, এখনও হচ্ছে। মর্যাদার সঙ্গে কবর দেওয়ার ব্যবস্থা করাকে নিশ্চয় কার্যকরী ভাষারক্ষাপ্রচেষ্টা বলা যায় না। রোগ-উপশমকারী ভাষারক্ষাপ্রচেষ্টার জন্য কোনো তত্ত্বকে কার্যকরী হতে হলে তাকে অবশ্যই ভাষাগুলোর দুর্বলতার অবস্থা ও প্রকৃতি থেকে উন্নতিসাধনের সমস্ত উপায়গুলোর সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হতে হবে। যে ভাষার আন্তর্প্রজন্ম প্রবাহ ক্রমশ শুকিয়ে যেতে যেতে এখন ক্ষীণ হয়ে এসেছে, সে ভাষার ক্ষেত্রে কার্যকরী সহায়তা কী হবে সেই বিচারে ওই বিপন্ন ভাষায় প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য তৈরি কোনো চলচ্চিত্রে ভরতুকি দেওয়ার পদক্ষেপের কোনোই কার্যকারিতা নেই। গানের অনুষ্ঠান, নাটকের অনুষ্ঠান, প্রদর্শনী ও উদযাপনের হরেক ব্যবস্থাপনা করায় ভরতুকি দেওয়াও কেবলমাত্র কিছু সাংকেতিকতার স্ফূরণ ঘটাবে, শিশু বা তরুণ-তরুণী বা সন্তানোৎপাদনের বয়সীদের মধ্যে প্রত্যক্ষ ভাষা-ব্যবহারে বৃদ্ধি ঘটাবে না, যদি না জনজাতির নিজ গোষ্ঠীগত ভাষিক উদ্যোগের সঙ্গে সযত্ন মেলবন্ধন না ঘটানো যায়।

বিপন্ন ভাষাগুলো রক্ষায়

প্রতিরোধী (‘অতিসক্রিয়’/‘proactive’) প্রতিরক্ষাপ্রচেষ্টা

দৈহিক সুস্বাস্থ্য বজায় রাখার সবচেয়ে কার্যকরী ভরসা হলো প্রতিরোধী ওষুধপত্র। একইভাবে, জনসংখ্যাগত দিক থেকে ও কার্যকারিতার দিক থেকে ক্রমলঘিষ্ঠ হতে থাকা ভাষাগুলোর ক্ষেত্রে দ্ব্যর্থহীন বিপত্তির অবস্থায় পৌঁছানোর অনেক আগে থেকেই প্রতিরোধী রক্ষাব্যবস্থা জরুরী হয়ে পড়ে। এই দৃষ্টিভঙ্গিটি বেলজিয়ামে সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত হয়েছে। বেলজিয়ামে দুটি সবলতর ভাষার জন্য ছোটো ছোটো অঞ্চল বরাদ্দ থাকলেও, আরো একটি ভাষা (জার্মান ভাষা)-র জন্যও  নির্দিষ্ট প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দরকার বলে স্বীকৃত হয়েছে। অতিসক্রিয় (proactive) ভাষারক্ষাপ্রচেষ্টা দাঁড়িয়ে থাকে নিরন্তর মূল্যায়নপ্রক্রিয়ার উপর যাতে বিস্ফোরক, সংক্রামক বা সর্বগ্রাসী পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই সম্ভাব্য সমস্যাগুলোকে চিহ্নিত করা যায়। কুয়েবেক-এর ‘Office de la Langue Francaise’-এর ‘চিহ্ন পরিদর্শক’ (‘sign inspector’)-দের খুব বদান্যতা নিয়ে বললে এমনই অতিসক্রিয় ভাষারক্ষা প্রচেষ্টায় নিরত বলে বলা যায়, এবং তা-ও এমনসব অঞ্চলে যেখানে নব্বই শতাংশের উপর মানুষ ফরাসীভাষী। কার্যত, কুয়েবেক-এর গোটা ফরাসীভাষী আন্দোলন বা ফ্রাঙ্কোফোন আন্দোলনটাকেই এই অর্থে অতিসক্রিয় বলা যায় যে তা একটি আধিপত্যকারী ভাষার পক্ষ নিয়ে হচ্ছে। আর সেই পরিস্থিতিতে, অবাক হওয়ার কিছু নেই যে এই আন্দোলনজাত নানা প্রচেষ্টাকে ইংরেজিভাষী অর্থাৎ অ্যাংলোফোন-রা শুধুমাত্র ফরাসীর পক্ষে বলে না দেখে ইংরেজির বিপক্ষে বলেই বেশি দেখে। এর চেয়ে অনেক সুষম পরিস্থিতি দেখা যায় বার্সেলোনা সহ কাতালুনিয়ার অধিকাংশ অঞ্চলে। সেখানে সংখ্যার দিক থেকে কাস্তিলিয়ান ভাষার বাচক ও কাতালান ভাষার বাচকরা প্রায় সমান-সমান। কিন্তু আঞ্চলিক কাজকর্মে প্রত্যক্ষ আর্থিক ও আইনী সহায়তাদান কেবলমাত্র কাতালান ভাষার ক্ষেত্রেই করা হয়। কাস্তিলিয়ান ভাষার বাচকরা কাস্তিলিয়ান ভাষায় সরকারি ফর্ম ও পরিষেবা (তা ছাড়াও দোকানে ও ব্যাঙ্কে তাদের ব্যক্তিগত প্রয়োজনের প্রতি খেয়াল) অবশ্যই চাইতে পারে। তেমন পরিষেবা পাওযার তাদের ব্যক্তিগত অধিকার সাংবিধানিকভাবেই স্বীকৃত ও সংরক্ষিত করা আছে, কিন্তু এই সূত্রে কোনো গোষ্ঠীগত অধিকার তাদের নেই (যেমন, কাস্তিলিয়ান ভাষামাধ্যমের সরকারি বিদ্যালয় পাওয়ার অধিকার নেই)। কেউ কেউ এমন আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন যে কাস্তিলিয়ান ভাষার বাচকদের অভিবাসন ঘটে চলা যেহেতু আর ঘটছে না, তাই কাতালুনিয়ায স্পেনের জাতীয় ভাষা কাস্তিলিয়ান-এর ভবিষ্যৎ বিপন্ন হয়ে উঠেছে। এই আশঙ্কা থেকে যদি কেউ কাস্তিলিয়ান ভাষার প্রতিরক্ষায় অতিসক্রিয় পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দেয়, কাতলানরা সাধারণত এমনটাই জবাব দেবে যে স্পেনের গোটা জাতীয় পরিস্থিতির কথা বিচারে আনলে, কাতালুনিয়ায় কাস্তিলিয়ান নয়, কাতালান ভাষার সপক্ষেই অতিসক্রিয় ভাষাপ্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়া দরকার। কাস্তিলিয়ান ভাষার বাচকরা অবশ্য তার পরও বলবে যে কাতালুনিয়ায় তাদের নিজেদের ভাষিক ভবিষ্যৎ তাদের ভাষার জাতীয় অবস্থানের উপর নির্ভর করছে না, বরং তার আঞ্চলিক অবস্থানের উপরই নির্ভর করছে। তাই, এক্ষেত্রেও, অতিসক্রিয় প্রতিরক্ষাপ্রচেষ্টা সমস্যা সমাধানের সঙ্গে সঙ্গে (বা তদুপরি) সমস্যা তৈরিও করছে। আরেকটি পরিপ্রেক্ষিত যার সাপেক্ষে অতিসক্রিয় ভাষারক্ষাপ্রচেষ্টাকে বোঝার চেষ্টা করা যায়, তা হলো সুইজারল্যান্ডের ইতালিয়-ভাষী অঞ্চলগুলো (ইতালিয় ক্যান্টনস)। অবশ্যই রোমানশ (Romansh) ভাষা এখানে সহায়তাকারী মনোযোগ পাচ্ছে (যা না পেলে অনেকের মতে তা এতোদিনে পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যেতো), কিন্তু সরকারিভাবে ইতালিয় ক্যান্টনস বলে চিহ্নিত এই অঞ্চলগুলোতে ইতালিয় ভাষার বাচকও ক্রমশ কমে যাচ্ছে। জার্মান ও ফরাসী ক্যান্টনগুলো যেহেতু অর্থনৈতিকভাবে সবলতর, তাই হাজারে হাজারে ইতালিয়-ভাষী সুইসরা ইতালিয় ক্যান্টন ছেড়ে ফরাসী বা জার্মান ক্যান্টনে গিয়ে বাসা বাঁধছে। সুইজারল্যান্ডের দীর্ঘপ্রতিষ্ঠিত ‘আঞ্চলিক নীতি’-র ফলে অবধারিতভাবেই এই বহির্গমনকারীদের সন্তানদের ভাষা-সরণ ঘটে যাচ্ছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে, ইতালিয়-ভাষীদের নিজেদের ভাষা-অঞ্চলেই রেখে দেওয়ার জন্য ইতালিয় ক্যান্টনগুলোর অর্থনৈতিক বৃদ্ধি সঞ্চারিত করা কি অতিসক্রিয় ভাষারক্ষাপ্রচেষ্টার একটি কাম্য পদক্ষেপ হতো না? কিন্তু সেই উদ্দেশ্য নিয়ে সহায়তাদান কি জার্মান ও ফরাসী ক্যান্টনে অন্যায্য অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা রূপে প্রতিভাত হতো? হয়তো হতো, কিন্তু তাদের ভাষাগুলো তো সর্বদা বেড়ে চলেছে এবং গোটা সুইজারল্যান্ড জুড়েই সরকারের পৃষ্ঠপোষণায় ‘লক্ষ্যনিবদ্ধ অর্থনৈতিক উৎসাহদান’-এর কর্মসূচী নেওয়ার রেওয়াজ আছে, তাহলে অতিসক্রিয় ভাষিক পরিপ্রেক্ষিত থেকই বা তা নেওয়া হবে না কেন? অতিসক্রিয় ভাষারক্ষাপ্রচেষ্টা যেহেতু প্রকৃতিগতভাবেই এমন নানা সম্ভাব্য বিরোধিতাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে এগোয়, তাই হয়তো তার উপর সযত্ন নিরপেক্ষ নজরদারি প্রয়োজন হয়ে পড়ে। কিন্তু এমন বিরোধ-বিসংবাদের সমস্যা আসবে ধরে নিয়েও এমন অতিসক্রিয় ভাষারক্ষাপ্রচেষ্টা সচেষ্ট হওয়া অনেক ভালো নিরাময়হীন পরিস্থিতিতে পৌঁছে গিয়ে অনবরত প্রতিক্রিয়াজাত নিষ্ফলা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করে যাওয়ার থেকে। ঘোড়া একবার খামারের আশ্রয় হারিয়ে ধুঁকতে ধুঁকতে শেষ নিশ্বাস ফেলার জায়গায় পৌঁছে গেলে তখন আর তার তদবির করার কোনো মানে আছে কি? বিপন্ন ভাষাগুলোর পক্ষ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদী সফল রক্ষাব্যবস্থা সংগঠিত করতে পারার করার উদাহরণ স্থান ও কাল দুই বিচারেই বিরল, তাই অতি সাবধানতা অবলম্বন করার চেয়ে কিছুটা ভুল করার ঝুঁকি নেওয়ার সময় এখন (যেমন ধরা যাক, দুর্বলের বোঝার ভারে পিষে মরা আটকাতে সবলের ঘাড়ে কিছুটা বাড়তি বোঝা চাপানো যেতেই পারে), যদি না আমরা নৃ-সাংস্কৃতিক ও নৃ-ভাষিক ক্ষেত্রে ক্ষয়ের প্রকোপের কাছে আত্মসমর্পণ না করতে চাই। জাতীয় হিসাবরক্ষার মূল্যবান অংশ বলে মনে করা ক্ষেত্রগুলোতে আমরা অনেক কিছুই করে থাকি। যাদের দরকার তাদের জন্য আমরা নতুন রাস্তা বানাই, রাস্তা যাদেই ইতিমধ্যেই আছে তাদের জন্য আর বানাই না। সমাজনীতির একটা বড়ো অংশও কেবলমাত্র রক্ষণমূলক নয়, বরং অতিসক্রিয়তামূলক। যদি আমরা অভিপ্রায়ে ঐকান্তিক হই, তাহলে বিপন্ন ভাষাগুলোর পক্ষ নিয়ে রক্ষাপ্রচেষ্টাও এই অতিসক্রিয় পন্থায় গড়ে তোলার সময় হয়ে গেছে, আর দেরী করা চলে না। টোভ স্কুটনাব কাঙ্গাস বছরের পর বছর ধরে শুনতে চায় এমন সবাইকে এই কথাটাই বলে চলেছেন।

 

টীকা

১। একশো বছর আগে উইলহেল্ম উন্ডট এই মত ব্যক্ত করেছিলেন যে ‘ফলিত মনোবিদ্যার মধ্যে ভুল কিছু নেই কেবল এইটুকু ছাড়া যে ফলিত প্রয়োগের জন্য আসলে খুব অল্প মনোবিদ্যাই রয়েছে’। ওই বক্তব্যটিই সংক্ষিপ্তাকারে এখানে হাজির করা হয়েছে। আজ একশো বছর পরে, ফলিত মনোবিদ্যাই হয়তো সেই লেজ হয়ে উঠেছে যা কুকুরকে নাড়ায়।

 

 

0 Comments
Leave a reply