যে পাথর বেড়ে ওঠে (La pierre qui pousse)

লিখেছেন:আলবেয়ার কামু, বঙ্গানুবাদ- সুরজিৎ ব্যানার্জী
Exile and Kingdom বইয়ের অন্তর্ভুক্ত এই গল্প, পাথরের গল্প... যে পাথর বাড়তে থাকে... কখন যে সেঁধিয়ে বসে ভিতরে... ভার ও ভারহীনতার প্রকোপ বাড়তে থাকে...

 

গাড়িটি নিজের ওজন টেনে ধীরগতিতে কাদা-ভেজা লেটেরাইটের রাস্তা ঘুরল। হেডলাইটের আলো হঠাৎ রাতের অন্ধকার চিরে একবার রাস্তার একপাশে, তারপর অন্যপাশে—দুটি টিনে ঢাকা কাঠের কুঁড়েঘরকে তুলে আনল দৃশ্যপটে। দ্বিতীয় কুঁড়েঘরটির কাছে, ডানদিকে, হালকা কুয়াশার ভেতর অস্পষ্টভাবে ভেসে উঠছিল মোটা, খসখসে কড়িকাঠ দিয়ে গড়া একটি টাওয়ার। টাওয়ারের চূড়া থেকে নেমে এসেছে একটি ধাতব তার—সংযোগস্থল চোখে পড়ে না, কিন্তু নিচে নামতে নামতে হেডলাইটের আলোয় সেটি ঝিলমিল করে উঠছিল, তারপর রাস্তা কেটে যাওয়া বাঁধের আড়ালে মিলিয়ে যাচ্ছিল। গাড়িটি গতি কমাল; কুঁড়েঘরগুলো পেরিয়ে কয়েক মিটার দূরে গিয়ে থেমে দাঁড়াল।

ড্রাইভারের ডানদিকে বসা লোকটি দরজার ফাঁক দিয়ে নিজেকে টেনে বার করতে গিয়ে হিমশিম খেলেন। মাটিতে পা রাখতেই তাঁর দানবীয় ভারী দেহটা সামান্য দুলে উঠল। গাড়ির পাশে, আধো-অন্ধকারে—ক্লান্তিতে ভেঙে পড়া সেই শরীর, যেন ভারে মাটিতে গেঁথে আছে—তিনি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন, যেন স্থির হয়ে চলতে থাকা ইঞ্জিনের গুঞ্জন শুনছিলেন। তারপর তিনি বাঁধের দিকে এগোলেন এবং হেডলাইটের আলোর শঙ্কুর ভেতরে ঢুকে পড়লেন। ঢালের চূড়ায় গিয়ে থামলেন; তাঁর বিশাল পিঠ রাতের অন্ধকারে, যেন  কালো ছায়া দিয়ে আঁকা। একটু পর তিনি ফিরে তাকালেন। ড্যাশবোর্ডের ওপর ড্রাইভারের কালো মুখটা চকচক করছিল, আর হাসছিল। লোকটি হাত তুলে ইশারা করলেন; ড্রাইভার ইঞ্জিন বন্ধ করে দিলেন। সঙ্গে সঙ্গেই পথ আর জঙ্গলের ওপর নেমে এল এক বিশাল, শীতল নীরবতা। তখন শোনা গেল জলের শব্দ।

দীর্ঘদেহী মানুষটি নিচে বয়ে চলা নদীর দিকে তাকিয়ে ছিলেন। নদীটিকে আলাদা করে চেনা যাচ্ছিল না—শুধু এক বিস্তৃত, চলমান অন্ধকার, যার গায়ে মাঝে মাঝে আঁশের মতো আলো ঝলসে উঠছিল। দূরে, ওপারে, আরও ঘন আর স্তব্ধ এক অন্ধকার জমাট বেঁধে ছিল—সেটাই নিশ্চয় তীর। কিন্তু ভালো করে তাকালে সেই অন্ধকারের বুকে একটি হলদেটে শিখা কাঁপতে দেখা যাচ্ছিল—দূরে জ্বলা ক্ষীণ কুপির মতো।

দানবদেহী লোকটি গাড়ির দিকে ফিরে মাথা নাড়লেন। ড্রাইভার হেডলাইট একবার নিভিয়ে আবার জ্বালালেন, তারপর সেগুলো নিয়মিতভাবে জ্বালানো-নেভানো শুরু করলেন। ঢালু বাঁধের ওপর লোকটি কখনো দৃশ্যমান হচ্ছিলেন, কখনো অদৃশ্য; প্রতিবার আবার দৃশ্যমান হলে তাঁকে যেন আরও বড় ও ভারী মনে হচ্ছিল।

হঠাৎ নদীর ওপারে, যেন অদৃশ্য কোনো হাতের ডগায়, একটি লণ্ঠন কয়েকবার বাতাসে উঠল। প্রহরীর শেষ এক ইশারায় ড্রাইভার হেডলাইট নিভিয়ে দিলেন। গাড়ি আর লোকটি রাতের অন্ধকারে মিলিয়ে গেলেন।

হেডলাইট নিভে গেলে নদীটি যেন চোখে পড়ছিল—অন্তত তার কয়েকটি দীর্ঘ তরল পেশি মাঝেমধ্যে ঝলমল করছিল। রাস্তার দুপাশে অরণ্যের অন্ধকার গুচ্ছগুলো আকাশের পটভূমিতে রূপরেখা এঁকে দিচ্ছিল এবং অস্বাভাবিকভাবে কাছাকাছি বলে মনে হচ্ছিল। এক ঘণ্টা আগে হালকা বৃষ্টি রাস্তাটিকে ভিজিয়ে দিয়েছিল, তার সূক্ষ্ম কণা তখনও উষ্ণ বাতাসে ঝুলে ছিল এবং আদিম অরণ্যের মাঝের সেই ফাঁকা প্রান্তরের নীরবতা ও স্থিরতাকে আরও ভারী করে তুলছিল। কালো আকাশে কুয়াশায় ঝাপসা তারাগুলো কাঁপছিল।

ওপারের তীর থেকে লোহার শেকলের ঝনঝন শব্দ ভেসে উঠল, সঙ্গে চাপা, দমবন্ধ জলের ছপছপ। কুঁড়েঘরটির ওপর দিয়ে, অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা লোকটির ডানদিকে, তারটি টানটান হয়ে উঠল। তার বরাবর এক গভীর, চাপা ঘর্ষণধ্বনি বয়ে যেতে শুরু করল—আর সেই সঙ্গে নদী থেকে উঠল জল চষে তোলা এক বিস্তৃত অথচ মৃদু শব্দ।

ঘর্ষণের শব্দ ধীরে ধীরে একসমান হয়ে এল; জলের শব্দ আরও ছড়িয়ে পড়ল, তারপর স্পষ্ট হয়ে উঠতে লাগল—আর সেই সঙ্গে লণ্ঠনটি বড় হতে থাকল। এবার তার চারপাশের হলদেটে আলোর বলয় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল।

 

আলোর বলয়টি ধীরে ধীরে ফুলে উঠছিল, আবার সংকুচিত হচ্ছিল—যেন নিঃশ্বাস নিচ্ছে; কুয়াশার ভেতর দিয়ে লণ্ঠনটি জ্বলছিল আর ক্রমে আলোকিত করে তুলছিল তার উপরে ও চারপাশে থাকা চৌকো ছাউনি—শুকনো তালপাতায় তৈরি, চার কোণে মোটা বাঁশের খুঁটির ওপর দাঁড়িয়ে।

এই খসখসে ছাউনিটি—যার চারপাশে অস্পষ্ট ছায়ারা অস্থিরভাবে নড়ছিল—ধীরে ধীরে তীরের দিকে এগিয়ে আসছিল। ভেলাটি যখন প্রায় নদীর মাঝামাঝি, তখন হলুদ আলোর ভেতর স্পষ্ট হয়ে উঠল তিনজন খাটো মানুষ—প্রায় কালো দেহ, উন্মুক্ত বুক, মাথায় শঙ্কু আকৃতির টুপি। তারা স্থির দাঁড়িয়ে ছিল, পা সামান্য ফাঁক করে, শরীর একটু ঝুঁকিয়ে—নদীর প্রবল স্রোতের টান সামলাতে। সেই স্রোত, অদৃশ্য সব জল নিয়ে, আছড়ে পড়ছিল এক বিশাল, খসখসে ভেলার গায়ে—যা শেষে রাত আর জলের অন্ধকার ফুঁড়ে বেরিয়ে এল।

ভেলাটি আরও কাছে এলে লোকটি  ছাউনির পেছনে, ভাটির দিকে, দুজন লম্বা কৃষ্ণাঙ্গ দেখতে পেলেন—তাদের মাথাতেও চওড়া খড়ের টুপি, আর গায়ে শুধু ধূসর ক্যানভাসের প্যান্ট। পাশাপাশি তারা সমস্ত শক্তি দিয়ে লম্বা বাঁশে ভর দিচ্ছিল; বাঁশগুলো ধীরে ধীরে ভেলার পেছনের দিকে নদীর জলে ঢুকে যাচ্ছিল, আর একই ধীর গতিতে তারা জলের ওপর ঝুঁকে পড়ছিল, প্রায় ভারসাম্যের শেষ সীমা পর্যন্ত।

 

ভেলার সামনে তিনজন মুলাতো—স্থির, নীরব—তাকিয়ে ছিল তীরের দিকে; তাদের জন্য অপেক্ষা করা লোকটির দিকে একবারও চোখ তোলেনি। (মুলাতো: বাবা শ্বেতাঙ্গ, মা কৃষ্ণাঙ্গ)

হঠাৎ ভেলাটি গিয়ে ধাক্কা খেল একটি ঘাটের শেষ প্রান্তে, যা এগিয়ে ছিল জলের ভেতর এবং ধাক্কার দোলায় দুলতে থাকা লণ্ঠনের আলোয় তখনই প্রথম দেখা গেল।

দুজন লম্বা মানুষ থেমে গেল; মাথার ওপর উঁচু করে ধরা বাঁশের মাথা শক্ত করে চেপে। তবু তাদের পেশি টানটান, তার ভেতর দিয়ে একটানা শিহরণ বয়ে যাচ্ছিল—যেন সেই শিহরণ উঠছে নদীর জল থেকেই, তার সমস্ত ভার নিয়ে।

অন্য মাঝিরা জেটির খুঁটির চারপাশে শেকল ছুঁড়ে দিল, তারপর তক্তার ওপর লাফিয়ে উঠে একধরনের রুক্ষ চলমান সাঁকো নামিয়ে দিল—যা ঢালু হয়ে ভেলার সামনের অংশটিকে ঢেকে দিল।

লোকটি গাড়ির কাছে ফিরে এসে আস্তে করে ভেতরে সরে বসলেন। ড্রাইভার ইঞ্জিন চালু করলেন। গাড়িটি ধীরে বাঁধের ঢালে উঠল; নাক আকাশের দিকে উঠল, তারপর আবার নদীর দিকে ঝুঁকে পড়ে ঢাল বেয়ে নামতে শুরু করল। ব্রেক শক্ত করে ধরা—তবু গাড়িটি এগোচ্ছিল; কখনও কাদায় পিছলে যাচ্ছিল, কখনও থামছিল, আবার চলতে শুরু করছিল।

 

দুলতে থাকা তক্তার ধাক্কাধাক্কির শব্দ তুলে গাড়িটি ঘাটের সাঁকোয় উঠল আর সেই প্রান্তে পৌঁছাল, যেখানে তিনজন মুলাতো, এখনও নীরব, দুপাশে সরে দাঁড়িয়েছিল; তারপর ধীরে ধীরে নেমে ঢুকে গেল ভেলার ওপর। সামনের চাকা ছোঁয়ামাত্র ভেলাটি নাক ডুবিয়ে জলে ঝুঁকে পড়ল, কিন্তু প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই উঠে এল, পুরো গাড়ির ভার গ্রহণ করতে।

তারপর ড্রাইভার গাড়িটিকে ভেলার পেছনের দিকে নিয়ে গেলেন—সেই চৌকো ছাউনির সামনে, যেখানে লণ্ঠনটি ঝুলছিল। সঙ্গে সঙ্গে মুলাতোরা ঢালু পাটাতনটি তুলে ভাঁজ করে ফেলল এবং একযোগে লাফ দিয়ে ভেলার ওপর উঠল; একই সঙ্গে ভেলাটিকে কাদামাখা তীর থেকে ছাড়িয়ে নিল। নদী যেন ভেলার নিচে ঠেস দিয়ে ভেলাটিকে ঠেলে তুলল জলের পৃষ্ঠে; তারপর সেটি ধীরে ভেসে চলল—এক দীর্ঘ লোহার দণ্ডের প্রান্তে বাঁধা, যা এখন আকাশের দিকে উঠে গিয়ে তারের বরাবর প্রসারিত।

তখন লম্বা কৃষ্ণাঙ্গ দুজন চাপ শিথিল করল এবং বাঁশগুলো তুলে নিল। লোকটি ও ড্রাইভার গাড়ি থেকে নেমে ভেলার ধারে এসে দাঁড়ালেন, উজানের দিকে মুখ করে। পুরো সময় কেউ কথা বলেনি; এখনও সবাই নিজ নিজ জায়গায় দাঁড়িয়ে—স্থির, নীরব। শুধু লম্বা কৃষ্ণাঙ্গদের একজন মোটা কাগজে তামাক গুটিয়ে নিচ্ছিল।

লোকটি তাকিয়ে ছিলেন সেই ফাঁকটির দিকে, যে পথ বেয়ে নদী ব্রাজিলের বিশাল অরণ্য থেকে বেরিয়ে এসে তাদের দিকে নেমে আসছিল। এখানে নদীটির প্রস্থ কয়েকশো মিটার। ঘোলা অথচ রেশমি জল ভেলার পাশ ঘেঁষে চাপ দিয়ে দিয়ে বয়ে যাচ্ছিল, দুই প্রান্তে মুক্ত হয়ে সরে গিয়ে আবার একটিমাত্র প্রবল স্রোতে মিলিত হচ্ছিল, যা অন্ধকার অরণ্যের ভেতর দিয়ে ধীরে ধীরে সাগর আর রাতের দিকে বয়ে চলছিল। জল থেকে, নাকি স্পঞ্জের মতো ভেজা আকাশ থেকে—আবছা স্যাঁতসেঁতে গন্ধ ভেসে আসছিল। ভেলার নিচে ভারী জলের চাপা ছপছপ শব্দ শোনা যাচ্ছিল; আর দুই তীর থেকে, বিরতি দিয়ে ভেসে আসছিল কোলা ব্যাঙের ডাক, কিংবা অদ্ভুত পাখিদের চিৎকার।

লোকটি ড্রাইভারের কাছে এগিয়ে এল। ড্রাইভারটি ছোটখাটো, রোগা-পাতলা, বাঁশের খুঁটিতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল; দুটো মুঠো গুঁজে রেখেছিল তার জামস্যুটের পকেটে—একসময় নীল, এখন লাল ধুলোয় ঢাকা, সারাদিন ধরে যেই ধুলো তারা ঘেঁটেছে। বয়সে তরুণ হয়েও তার ভাঁজে ভরা মুখে এক প্রশস্ত হাসি লেগে ছিল; সে তাকিয়ে ছিল আর্দ্র আকাশে ভাসতে থাকা ক্লান্ত তারাগুলোর দিকে—তবে সেগুলো যেন তার চোখে পড়ছিল না।

পাখিদের ডাক আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল, তার সঙ্গে মিশে গেল অপরিচিত কলরব। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তারটি কড়কড়ে শব্দ তুলল। লম্বা কৃষ্ণাঙ্গরা বাঁশগুলো নদীর জলে ঢুকিয়ে অন্ধের মতো হাতড়ে তল খুঁজতে লাগল। লোকটি পেছনে ফিরে তাকাল সেই তীরের দিকে, যা তারা একটু আগে ছেড়ে এসেছে। তীরটি আবার রাত আর জলের আচ্ছাদনে ঢাকা—অসীম, অরণ্যের মতো বুনো, যার বিস্তার হাজার হাজার কিলোমিটার জুড়ে। একদিকে কাছেই মহাসাগর, আর অন্যদিকে এই অরণ্যময় সমুদ্র—এই দুইয়ের মাঝখানে, সেই মুহূর্তে বন্য নদীতে ভেসে চলা গুটিকতক মানুষ এখন সম্পূর্ণ হারিয়ে গেছে বলে মনে হচ্ছিল। ভেলাটি যখন নতুন ঘাটে ধাক্কা খেল, মনে হল যেন সব বাঁধন ছিন্ন করে তারা অন্ধকারের ভেতর একটি দ্বীপে এসে ভিড়েছে—ভীতিকর নৌযাত্রার পর।

স্থলে পা দিতেই অবশেষে মানুষের কণ্ঠস্বর শোনা গেল। ড্রাইভার তখনই তাদের টাকা মিটিয়ে দিয়েছিল, আর ভারী রাতের মধ্যে, অদ্ভুত প্রফুল্ল স্বরে, লোকগুলো পর্তুগিজে, চলতে শুরু করা গাড়িটিকে অভিবাদন জানাচ্ছিল।

“তারা বলেছে, ইগুয়াপে ষাট কিলোমিটার। তিন ঘণ্টা চালালেই শেষ। সোক্রাত খুশি,” ড্রাইভার জানালেন।

লোকটি হেসে উঠলেন—এক ভরাট, উষ্ণ হাসি, যা তাঁকেই মানায়। “আমিও খুশি, সোক্রাত। রাস্তা শক্ত।”

“— বড্ড ভারী, মঁসিয়ে দ’আরাস্ত, আপনি বড্ড ভারী,” আর ড্রাইভারও থামতেই পারছিলেন না, হেসেই যাচ্ছিলেন।

গাড়িটা কিছুটা গতি ধরল। উঁচু গাছের প্রাচীর আর জটপাকানো, দুর্ভেদ্য বনানীর ভেতর দিয়ে তা এগোচ্ছিল; চারপাশে ভাসছিল এক নরম, একটু মিঠে গন্ধ। উড়ে বেড়ানো জোনাকিরা অন্ধকারে ক্রমাগত একে অপরকে ছেদ করে উড়ে যাচ্ছিল, আর মাঝে মাঝে লাল চোখওয়ালা পাখিরা হঠাৎ এসে উইন্ডশিল্ডে ধাক্কা খেয়ে সরে যাচ্ছিল। কখনো কখনো রাতের গভীরতা থেকে অদ্ভুত, বুনো এক শব্দ ভেসে আসত, আর ড্রাইভার মজার ভঙ্গিতে চোখ গোল গোল করে পাশের জনের দিকে তাকাতেন।

রাস্তা ঘুরে ঘুরে চলছিল, টলমল কাঠের সেতুর ওপর দিয়ে ছোট ছোট নদী পেরোচ্ছিল। এক ঘণ্টা পর কুয়াশা ধীরে ধীরে ঘন হয়ে উঠল। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি নামল, হেডলাইটের আলো ম্লান করে দিতে দিতে।

ঝাঁকুনি সত্ত্বেও দ’আরাস্ত আধো ঘুমে তলিয়ে ছিলেন। তিনি আর ভেজা বনে ছিলেন না; যেন ফিরে গিয়েছিলেন সেই পথগুলোয়—যেগুলো তাঁরা সকালে সাও পাওলো ছেড়ে ধরেছিলেন। অবিরাম সেই মাটির পথগুলো থেকে লাল ধুলো উঠছিল—যার স্বাদ এখনো তাদের মুখে লেগে ছিল—যা দিগন্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে উজাড় প্রান্তরের বিরল গাছপালাকে ঢেকে রেখেছিল। তপ্ত সূর্য, ফ্যাকাশে ও খাঁজকাটা পাহাড়, পথে দেখা কঙ্কালসার জেবু গরু—যাদের একমাত্র সঙ্গী ছিল ক্লান্ত, ছেঁড়া পালকের উরুবু শকুনের উড়ান—আর সেই দীর্ঘ, দীর্ঘ যাত্রা অন্তহীন মরুভূমি পেরিয়ে…

হঠাৎ লোকটি চমকে উঠলেন। গাড়ি থেমে গেছে। তাঁরা যেন এখন জাপানে—রাস্তার দুপাশে সূক্ষ্ম সাজসজ্জার ঘরবাড়ি, আর সেই ঘরগুলোর ভেতরে ক্ষণিক ভেসে ওঠা কিমোনো। ড্রাইভার কথা বলছিল এক জাপানির সঙ্গে—গায়ে ময়লা কাজের প্যান্ট, মাথায় ব্রাজিলীয় খড়ের টুপি। তারপর গাড়ি আবার চলতে শুরু করল।

“ও বলল, মাত্র চল্লিশ কিলোমিটার।”

 “আমরা কোথায় ছিলাম? টোকিও?”

 “না, রেজিস্ট্রো। সব জাপানি এখানেই আসে।”

 “কেন?”

 “কেউ জানে না। তারা হলুদ-বর্ণ, জানেন, মঁসিয়ে দ’আরাস্ত।”

কিন্তু বনটা একটু হালকা হয়ে আসছিল, আর রাস্তা চলার মতো সহজ হয়ে উঠছিল, যদিও এখনও পিচ্ছিল। গাড়ির চাকা বালির ওপর পিছলে যাচ্ছিল। দরজার ফাঁক দিয়ে ভেতরে ঢুকছিল এক আর্দ্র, উষ্ণ, সামান্য টক গন্ধমাখা বাতাস।

“গন্ধ পাচ্ছেন?” চালক ঠোঁট চাটতে চাটতে বললেন। “ পুরনো সেই সমুদ্রের গন্ধ। শিগগিরই ইগুয়াপে।”

“যদি তেল থাকে যথেষ্ট,” দ’আরাস্ত বললেন। তারপর আবার শান্তভাবে ঘুমিয়ে পড়লেন।

ভোরবেলায়, দ’আরাস্ত বিছানায় বসে বিস্মিত চোখে তাকিয়ে রইলেন সেই ঘরটার দিকে, যেখানে তিনি সদ্য জেগে উঠেছেন। উঁচু দেয়ালগুলো অর্ধেক পর্যন্ত নতুন করে বাদামি চুনে লেপা। উপরে একসময় সাদা রঙ করা হয়েছিল, এখন হলদে দাগে দাগে ছাদ পর্যন্ত ছোপ পড়েছে। দু সারি খাট মুখোমুখি রাখা। দ’আরাস্ত শুধু নিজের সারির একেবারে শেষের একটা অগোছালো খাটই চোখে রাখল—সেটা খালি। বাঁদিক থেকে শব্দ পেয়ে তিনি ফিরে তাকালেন দরজার দিকে—সেখানে সোক্রাত দাঁড়িয়ে, দু হাতে দুটো খনিজ জলের বোতল আর হেসে যাচ্ছেন।

“সুখস্মৃতি!” তিনি বললেন।

দ’আরাস্ত একটু ঝাঁকুনি খেলেন। হ্যাঁ—গতকাল মেয়র যে হাসপাতালে তাঁদের রেখেছিলেন, তারই নামই “সুখস্মৃতি।”

“স্মৃতিই বটে!” সোক্রাত বলে চললেন, “আগে হাসপাতাল বানাও, পরে জল। ততদিন—এই যে সুখস্মৃতি—নিন, এই সোডা জল দিয়ে ধুয়ে নিন!”

তিনি মিলিয়ে গেলেন—হাসতে হাসতে, গাইতে গাইতে—মনে হচ্ছিল, রাতভর যে প্রলয়ঙ্কর হাঁচির দমকে তিনি কেঁপে উঠেছিলেন আর দ’আরাস্তকে এক মুহূর্তও চোখ বুজতে দেননি, তার কোনো চিহ্নই যেন নেই।

এখন দ’আরাস্ত সম্পূর্ণ জেগে উঠেছেন। লোহার জালি-দেওয়া জানালার ওপারে, ঠিক সামনে, তিনি দেখতে পেলেন লাল মাটির এক ছোট উঠোন—বৃষ্টিতে ভিজে আছে। বড় বড় ঘৃতকুমারীর ঝোপের ওপর দিয়ে বৃষ্টির জল নিঃশব্দে গড়িয়ে পড়ছে। এক মহিলা হেঁটে গেল—মাথার ওপর হলুদ ওড়না ধরে। দ’আরাস্ত আবার শুয়ে পড়লেন, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই উঠে বসলেন, তারপর খাট থেকে নেমে দাঁড়ালেন—তাঁর ওজনে খাটটা কেঁপে উঠল।

ঠিক তখনই সোক্রাত ঢুকলেন। “এবার আপনার পালা, মঁসিয়ে দ’আরাস্ত। মেয়র বাইরে অপেক্ষা করছেন।” কিন্তু দ’আরাস্তের মুখের ভাব দেখে তিনি যোগ করলেন, “চিন্তা করবেন না, তিনি কখনো তাড়া দেন না।”

খনিজ জলে দাড়ি কামিয়ে, দ’আরাস্ত প্যাভিলিয়নের বারান্দার নিচে বেরিয়ে এলেন। মেয়র—খাটো গড়ন, আর সোনালি ফ্রেমের চশমার নিচে এক অমায়িক বেজির মতো মুখ—বৃষ্টির দিকে একরকম বিষণ্ণ মনোযোগে তাকিয়ে ছিলেন। কিন্তু দ’আরাস্তকে দেখামাত্রই এক মনোহর হাসি তাঁর মুখটাকে যেন বদলে দিল। তিনি নিজের ছোট্ট দেহটা টানটান করে দ্রুত এগিয়ে এসে মঁসিয়ে ইঞ্জিনিয়র-এর বুক জড়িয়ে ধরতে উদ্যত হলেন। ঠিক তখনই উঠোনের ছোট দেওয়ালের ওপারে একটা গাড়ি এসে ব্রেক কষল, ভেজা কাদায় পিছলে গিয়ে বেঁকে থামল। “জজ!” মেয়র বললেন। জজও মেয়রের মতো গাঢ় নীল পোশাক পরা। কিন্তু তিনি অনেকটাই তরুণ—অথবা অন্তত তাই মনে হয়—তাঁর সুশ্রী গড়ন আর বিস্মিত কিশোর সতেজ মুখের জন্য। তিনি এখন উঠোন পেরিয়ে তাদের দিকে আসছেন, জলজমা জায়গাগুলো সাবলীল ভঙ্গিতে এড়িয়ে।

দ’আরাস্তের কাছাকাছি পৌঁছতেই তিনি আগেভাগেই দুহাত বাড়িয়ে তাঁকে স্বাগত জানালেন। তিনি গর্বিত—মঁসিয়ে ইঞ্জিনিয়রকে স্বাগত জানাতে পেরে; এ যে তাঁদের দরিদ্র শহরের প্রতি এক বিরাট সম্মান। তিনি আপ্লুত সেই অমূল্য সেবার কথা ভেবে, যা মঁসিয়ে ইঞ্জিনিয়র ইগুয়াপেকে দিতে চলেছেন—এই ছোট বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে, যা নিম্নাঞ্চলগুলোকে নিয়মিত বন্যা থেকে রক্ষা করবে।

জলকে আদেশ দেওয়া, নদীকে বশে আনা—আহা, কী মহান পেশা! আর নিশ্চিতভাবেই ইগুয়াপের গরিব মানুষরা মঁসিয়ে ইঞ্জিনিয়রের নাম মনে রাখবে—বহু বছর পরেও, তাদের প্রার্থনায় সেই নাম উচ্চারণ করবে। এত সৌজন্য আর বাগ্মিতায় পরাভূত হয়ে দ’আরাস্ত ধন্যবাদ জানালেন; আর নিজেকে জিজ্ঞেস করার সাহস পেলেন না—একজন জজেরই বা এই  বাঁধের সঙ্গে কী সম্পর্ক!

যাই হোক, মেয়রের মতে এখন ক্লাবে যাওয়া দরকার—সেখানে শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা নিম্নাঞ্চল দেখতে যাওয়ার আগে মঁসিয়ে ইঞ্জিনিয়রকে যথাযথভাবে অভ্যর্থনা জানাতে চান।

“এই গণ্যমান্য ব্যক্তিরা কারা?”

“আচ্ছা,” মেয়র বললেন, “আমি নিজে—মেয়র হিসেবে, মঁসিয়ে কার্ভালহো—বন্দর-ক্যাপ্টেন, আর আরও কয়েকজন… ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাছাড়া, এ নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না—তারা ফরাসি বলতে পারে না।”

দ’আরাস্ত সোক্রাতকে ডেকে বললেন, বেলা শেষে তাঁর সঙ্গে আবার দেখা হবে।

“ঠিক আছে,” সোক্রাত বললেন। “আমি ফোয়ারা-উদ্যানে যাব।”

— “উদ্যানে?”

— “হ্যাঁ, সবাই চেনে। ভয় নেই, মঁসিয়ে দ’আরাস্ত।”

দ’আরাস্ত বাইরে বেরোতেই লক্ষ করলেন, হাসপাতালটি বনাঞ্চলের সীমান্তে—বিশাল বৃক্ষশাখাগুলো প্রায় ছাদের ওপর ঝুঁকে আছে। গাছপালার বিস্তৃতির ওপর এখন নেমে এসেছে এক সূক্ষ্ম জলের পর্দা, যা ঘন অরণ্য নিঃশব্দে শুষে নিচ্ছে—যেন এক বিশাল স্পঞ্জ। শহরটা—মোটামুটি একশোটা বাড়ি, ম্লান রঙের টালিতে ঢাকা—অরণ্য আর নদীর মাঝখানে ছড়িয়ে। দূরের নদীর মৃদু গুঞ্জন ভেসে আসছে হাসপাতাল পর্যন্ত।

গাড়ি প্রথমে কাদায় ভেজা রাস্তায় ঢুকল, তারপর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই এসে পড়ল এক আয়তাকার, বেশ প্রশস্ত চত্বরে। লাল মাটির ওপর, অসংখ্য জলের গর্তের ফাঁকে ফাঁকে, টায়ারের দাগ, লোহার চাকায় কাটা রেখা, আর পশুর খুরের ছাপ জমে আছে। চারদিকে নিচু বাড়িগুলো—বহুরঙা প্লাস্টার-ঢাকা—চত্বরটিকে ঘিরে রেখেছে। তার পেছনে দেখা যায় একটি নীল-সাদা গির্জার দুই গোলাকার মিনার—ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের ছাপ স্পষ্ট। এই নিরাবরণ দৃশ্যপটে মোহনা দিক থেকে ভেসে আসছে লোনা গন্ধ।

চত্বরের মাঝখানে কয়েকটি ভেজা অবয়ব ঘুরে বেড়াচ্ছে। বাড়িগুলোর ধার ঘেঁষে ধীরে ধীরে চলাফেরা করছে এক রঙচঙে ভিড়—গাউচো (স্থানীয় কাউবয় ধরনের মানুষ), জাপানি, মিশ্র-রক্তের আদিবাসী, আর কিছু পরিপাটি গণ্যমান্য ব্যক্তি—যাদের গাঢ় স্যুট এখানে যেন বেমানান, প্রায় অচেনা। তারা ছোট ছোট পা ফেলে হাঁটছিল, অঙ্গভঙ্গিও ছিল ধীর। গাড়িটিকে জায়গা দিতে তারা অনায়াসে সরে দাঁড়ায়, তারপর থেমে তাকিয়ে রইল গাড়িটার দিকে। গাড়িটি যখন চত্বরের এক বাড়ির সামনে এসে থামল, তখন নীরবে ভেজা গাউচোদের একটি বৃত্ত সেটাকে ঘিরে গড়ে উঠল।

ক্লাবের প্রথম তলায় ছিল এক ধরনের ছোট বার—বাঁশের কাউন্টার আর টিনের ছোট টেবিলে সাজানো। গণ্যমান্য লোকের ভিড় নেহাত কম ছিল না। দ’আরাস্তের সম্মানে আখের মদ পরিবেশন করা হল। মেয়র গ্লাস হাতে তাঁকে মঙ্গল কামনা করে স্বাগত জানালেন। দ’আরাস্ত যখন জানালার কাছে দাঁড়িয়ে পান করছিলেন, এক লম্বা কঙ্কালসার লোক—পরনে ঘোড়সওয়ারদের প্যান্ট আর লেগিংস—টলতে টলতে এসে শুরু করল এক দ্রুত ও অস্পষ্ট বক্তৃতা। দ’আরাস্ত শুধু ‘পাসপোর্ট’ শব্দটাই ধরতে পারলেন। দ’আরাস্ত একটু দ্বিধা করে কাগজ বের করলেন; লোকটি তা একরকম লোলুপ আগ্রহে কেড়ে নিল। পাসপোর্টটা উল্টেপাল্টে দেখার পর লোকটি স্পষ্ট অসন্তোষ দেখিয়ে পাসপোর্টটা ইঞ্জিনিয়ারের নাকের সামনে নেড়ে আবার বলতে শুরু করল। আর দ’আরাস্ত নির্বিকারভাবে সেই রাগান্বিত লোকটির দিকে তাকিয়ে রইলেন। এই সময় হাসিমুখে জজ এসে জিজ্ঞেস করলেন, ব্যাপার কী। মাতাল লোকটি এক মুহূর্ত সেই শীর্ণকায় মানুষটিকে নিরীক্ষণ করল—যে তাকে থামানোর দুঃসাহস করেছে। তারপর আরও বিপজ্জনকভাবে দুলতে দুলতে আবার পাসপোর্টটা নতুন লোকটির চোখের সামনে নেড়ে ধরল। দ’আরাস্ত শান্তভাবে এক ক্যাফে-টেবিলের পাশে বসে অপেক্ষা করতে লাগলেন। কথোপকথনটি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে উঠল। হঠাৎই জজ এমন এক বজ্রনিনাদে ফেটে পড়লেন—যা তাঁর কাছ থেকে কেউ কল্পনাও করেনি। কিছু বুঝে ওঠার আগেই লম্বা লোকটিকে হঠাৎ দেখা গেল পিছু হটতে, দোষ ধরা পড়া শিশুর ভঙ্গিতে। জজের শেষ নির্দেশে সে দরজার দিকে এগোল—শাস্তি পাওয়া বেয়াড়া ছাত্রের মতো তেরছা পায়ে—আর অদৃশ্য হয়ে গেল।

জজ সঙ্গে সঙ্গেই দ’আরাস্তের কাছে এসে, আবার কোমল হয়ে ওঠা কণ্ঠে বোঝালেন—এই অভদ্র লোকটি আসলে পুলিশপ্রধান এবং সে দুঃসাহস করে দাবি করেছে যে পাসপোর্টটি বৈধ নয়; এই বেয়াদপির জন্য তাকে শাস্তি দেওয়া হবে। এরপর মঁসিয়ে কার্ভালহো বৃত্ত করে দাঁড়িয়ে থাকা গণ্যমান্যদের দিকে ফিরলেন আর তাদের যেন কিছু জিজ্ঞেস করতে লাগলেন। সংক্ষিপ্ত আলোচনার পর জজ আনুষ্ঠানিকভাবে দ’আরাস্তের কাছে ক্ষমা চাইলেন আর অনুরোধ করলেন যেন তিনি স্বীকার করেন—এমন শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার অভাব—যা সমগ্র ইগুয়াপে শহরের তাঁর প্রতি থাকা উচিত—তা কেবল অতিরিক্ত মদ্যপানের ফলেই ব্যাখ্যা করা যায়। শেষে তিনি দ’আরাস্তকেই অনুরোধ করলেন এই অপদার্থ লোকটির জন্য উপযুক্ত শাস্তি নির্ধারণ করতে।

দ’আরাস্ত বললেন, তিনি কোনো শাস্তি চান না—এটা তুচ্ছ ঘটনা, বরং তিনি নদীর তীরে যেতে  উদগ্রীব। তখন মেয়র একরকম সরল প্রফুল্ল ভঙ্গিতে জোর দিয়ে বললেন, শাস্তি সত্যিই অপরিহার্য; অপরাধী আটক থাকবে, তারা সবাই মিলে অপেক্ষা করবে, যতক্ষণ না তাদের সম্মানিত অতিথি নিজে তার শাস্তি নির্ধারণ করেন। কোনো আপত্তিই এই হাসিমাখা কঠোরতাকে নরম করতে পারল না। দ’আরাস্তও শেষ পর্যন্ত প্রতিশ্রুতি দিতেই বাধ্য হলেন যে তিনি এ বিষয়ে ভাববেন। তারপর নিচু বস্তি এলাকা পরিদর্শনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হল।

নদীটি ইতিপূর্বেই তার হলদেটে জলরাশিকে নিচু, পিচ্ছিল তীরজুড়ে অনেকখানি ছড়িয়ে দিয়েছিল। ইগুয়াপের শেষ বাড়িগুলো পেছনে ফেলে এসে এখন তারা ছিল নদী আর এক উঁচু খাড়া ঢালের মাঝখানে—যেখানে কাদা-মাটি আর ডালপালার তৈরি কুঁড়েঘরগুলো কোনোমতে টিকে ছিল। তাদের সামনে, উঁচু ভরাট মাটির একেবারে শেষ প্রান্তে, বন হঠাৎই আবার শুরু হয়ে গেছে—অন্য পাড়ের মতোই। কিন্তু গাছের ফাঁক দিয়ে জলের খোলা পথ দ্রুত প্রশস্ত হতে হতে এক অস্পষ্ট ধূসর রেখায় গিয়ে মিশেছে—সেটাই সমুদ্রের শুরু।

দ’আরাস্ত কিছু না বলে ঢালের দিকে হাঁটলেন। ঢালের গায়ে বন্যার জলের বিভিন্ন স্তরের টাটকা চিহ্ন তখনও রয়ে গিয়েছিল। একটি কাদামাখা পথ ওপরে কুঁড়েঘরগুলোর দিকে উঠেছে। সেগুলোর সামনে কিছু কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে, আগন্তুকদের দিকে তাকিয়ে ছিল। কয়েক জোড়া ছেলে-মেয়ে হাত ধরে দাঁড়িয়ে ছিল, আর একেবারে ঢালের ধারে, বয়স্কদের সামনে, এক সারি ছোট কৃষ্ণাঙ্গ শিশুরা—ফোলা পেট আর সরু উরু নিয়ে—গোল চোখ মেলে তাকিয়ে ছিল।

কুঁড়েঘরগুলোর সামনে পৌঁছে দ’আরাস্ত ইশারায় বন্দর-কমান্ড্যান্টকে ডাকলেন। তিনি ছিলেন এক স্থূলকায়, সদা-হাস্যমুখ কৃষ্ণাঙ্গ, সাদা উর্দি পরা। দ’আরাস্ত তাঁকে স্প্যানিশে জিজ্ঞেস করলেন, একটি কুঁড়েঘর দেখা কী সম্ভব। কমান্ড্যান্ট নিশ্চিত ছিলেন; বরং তাঁর মতে, এটা ভালো প্রস্তাব—আর মঁসিয়ে ইঞ্জিনিয়ার খুবই দেখার মতো কিছু জিনিস দেখবেন। তিনি কৃষ্ণাঙ্গদের দিকে ফিরে দীর্ঘক্ষণ কথা বলতে লাগলেন, দ’আরাস্ত ও নদীর দিকে ইশারা করতে করতে। বাকিরা চুপচাপ শুনছিল। তিনি থামলেন—কিন্তু কেউ নড়ল না। তখন তিনি আবার বললেন, কণ্ঠে অস্থিরতা নিয়ে। তারপর তিনি একজনকে ডেকে উঠলেন; লোকটি মাথা নেড়ে অসম্মতি জানাল। সঙ্গে সঙ্গে কমান্ড্যান্ট সংক্ষিপ্ত কয়েকটি কথা বললেন, এবার স্পষ্ট আদেশের সুরে। লোকটি দল থেকে আলাদা হয়ে এগিয়ে এল, দ’আরাস্তের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ইশারায় পথ দেখাল। কিন্তু তার দৃষ্টি ছিল বিরূপ।

লোকটি ছিল বেশ বয়স্ক—মাথায় ছোট, ধূসর-সাদা চুল; মুখ শীর্ণ ও কুঞ্চিত, অথচ শরীর তখনও তরুণের মতো টানটান—কঠিন কাঁধ, আর ক্যানভাসের প্যান্ট ও ছেঁড়া শার্টের নিচে পেশিগুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। তারা এগিয়ে চলল—পেছনে কমান্ড্যান্ট ও কৃষ্ণাঙ্গদের ভিড় নিয়ে—আর উঠল আরেকটি, আরও খাড়া ঢালে, যেখানে মাটি, টিন আর নলখাগড়ার কুঁড়েঘরগুলো এমন কষ্টে মাটি আঁকড়ে টিকে ছিল যে তাদের গোড়া বড় বড় পাথর দিয়ে ঠেকিয়ে রাখতে হয়েছিল। পথে তারা এক মহিলার পাশ দিয়ে গেল—সে সরু পথ বেয়ে নিচে নামছিল, খালি পায়ে কখনো পিছলে যাচ্ছিল, মাথার ওপর তুলে ধরে জলভরা টিনের পাত্র।

তারপর তারা পৌঁছাল এক ধরনের ছোট খোলা জায়গায়, তিনটি কুঁড়েঘর দিয়ে ঘেরা। লোকটি একটি ঘরের দিকে এগিয়ে গিয়ে বাঁশের দরজা ঠেলে খুলল—যার কবজা ছিল লতার তৈরি। সে সরে দাঁড়াল, কিছু না বলে, একই নির্বিকার দৃষ্টিতে ইঞ্জিনিয়ারের দিকে তাকিয়ে।

ঘরের ভেতরে প্রথমে দ’আরাস্ত কিছুই দেখতে পেলেন না—শুধু মেঝের ঠিক মাঝখানে ধিকিধিকি জ্বলতে থাকা একটি আগুন। তারপর চোখে পড়ল—এক কোণে একটি পেতলের খাট—খালি আর ভাঙাচোরা জালি; অন্য কোণে মাটির বাসনে ভরা একটি টেবিল; আর এই দুইয়ের মাঝে এক ধরনের কাঠের স্ট্যান্ড, যেখানে সেন্ট জর্জের একটি রঙিন ছবি প্রাধান্য নিয়ে রাখা ছিল। বাকি যা ছিল—দরজার ডানদিকে একগাদা ছেঁড়া কাপড় আর ছাদের নিচে আগুনের ওপর শুকোতে থাকা কয়েকটি রঙিন কাপড়। দ’আরাস্ত স্থির দাঁড়িয়ে, সেই ধোঁয়া আর দারিদ্র্যের গন্ধ তিনি টেনে নিচ্ছিলেন যা মেঝের নিচ থেকে উঠে আসছিল আর তাঁর দম বন্ধ করে দিচ্ছিল।

পেছনে কমান্ড্যান্ট হাততালি দিলেন। দ’আরাস্ত ঘুরে দাঁড়ালেন এবং দরজার চৌকাঠে, আলো-আঁধারির ভেতর, শুধু দেখতে পেলেন—এক কৃষ্ণাঙ্গ তরুণীর নমনীয় অবয়ব এগিয়ে আসছে, হাতে কিছু বাড়িয়ে। তিনি গ্লাসটি নিলেন এবং তাতে থাকা ঘন আখের মদ পান করলেন। তরুণীটি খালি গ্লাসটি নেওয়ার জন্য রেকাবি এগিয়ে ধরল, তারপর এমন নমনীয় ভঙ্গিতে বেরিয়ে গেল যে দ’আরাস্তের হঠাৎ তাকে থামিয়ে রাখতে ইচ্ছে হল।

কিন্তু তার পেছন পেছন বাইরে এসে, কুঁড়েঘরের চারপাশে জড়ো হওয়া কৃষ্ণাঙ্গ ও গণ্যমান্যদের ভিড়ের মধ্যে তিনি তাকে আর চিনতে পারলেন না। তিনি বৃদ্ধ লোকটিকে ধন্যবাদ জানালেন; লোকটি কোনো কথা না বলে মাথা নোয়াল। তারপর তিনি চলে গেলেন। তাঁর পেছনে কমান্ড্যান্ট আবার তার ব্যাখ্যা শুরু করলেন, জিজ্ঞেস করছিলেন—রিওর ফরাসি কোম্পানিটি কবে কাজ শুরু করতে পারবে এবং বড় বর্ষার আগে বাঁধটি নির্মাণ করা সম্ভব হবে কি না। দ’আরাস্ত জানতেন না; আসলে তিনি তা ভাবছিলেন না। তিনি নামছিলেন শীতল নদীর দিকে, সেই প্রায়-অস্পর্শ বৃষ্টির নিচে। তিনি তখনও শুনছিলেন সেই সর্বব্যাপী শব্দ—যা আসার পর থেকেই তিনি অবিরাম শুনে আসছিলেন আর তা জলের না গাছের—তিনি বুঝতে পারছিলেন না। তীরে পৌঁছে তিনি দূরে সমুদ্রের অনির্দিষ্ট রেখার দিকে তাকালেন—হাজার হাজার কিলোমিটার একাকী জলরাশি, আর আফ্রিকা, আর তারও ওপারে ইউরোপ, যেখান থেকে তিনি এসেছেন।

 "কমান্ড্যান্ট," তিনি বললেন, "আমরা এইমাত্র যাদের দেখে এলাম, এই মানুষগুলো বাঁচে কীভাবে?"

"— যখন তাদের প্রয়োজন হয় তখন তারা কাজ পায়," কমান্ড্যান্ট বললেন। "আমরা গরিব।"

“ওরাই কি সবচেয়ে গরিব?”

“ওরাই সবচেয়ে গরিব।”

জজ, যিনি সেই মুহূর্তে তাঁর পাতলা জুতোয় হালকা পিছলে এগিয়ে আসছিলেন, বললেন, তারা ইতিমধ্যেই মঁসিয়ে ইঞ্জিনিয়ারকে ভালোবাসতে শুরু করেছে, যিনি তাদের কাজ দিতে যাচ্ছেন।

“আর জানেন,” তিনি বললেন, “ওরা প্রতিদিন নাচে আর গান গায়।” তারপর, হঠাৎ, তিনি দ’আরাস্তকে জিজ্ঞেস করলেন তিনি শাস্তির ব্যাপারে ভেবেছেন কি না।

“কোন শাস্তি?”

“এই যে, আমাদের পুলিশপ্রধান।”

“ওকে ছেড়ে দিতে হবে।”

জজ বললেন, তা সম্ভব নয়, শাস্তি দিতেই হবে। দ’আরাস্ত তখনই ইগুয়াপের দিকে হাঁটছিলেন।

ছোট্ট ‘জারদিন দে লা ফঁতেন’ উদ্যানের ভেতর, ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টির নিচে রহস্যময় ও স্নিগ্ধ ফুলের গুচ্ছ সব লতাগুল্ম বেয়ে ঝুলে নামছিল, কলাগাছ আর কেয়াগাছের ফাঁক দিয়ে। ভেজা পাথরের স্তুপগুলো চিহ্নিত করে দিচ্ছিল পথগুলোর মিলনস্থল, যেখানে এই সময়ে এক রঙচঙে ভিড় ধীর পায়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। মিশ্রজাত, মুলাতো আর কয়েকজন গাউচো নিচু স্বরে কথা বলছিল, অথবা একই ধীর পায়ে ঢুকে পড়ছিল বাঁশের সরু পথগুলোয়—সেই পর্যন্ত, যেখানে ঝোপঝাড় ঘন হয়ে শেষে দুর্ভেদ্য হয়ে ওঠে। সেখানেই হঠাৎ শুরু হয় বন।

ভিড়ের মধ্যে দ’আরাস্ত সোক্রাতকে খুঁজছিলেন, এমন সময় পেছন থেকে একটা মৃদু ধাক্কা পেলেন—সে-ই।

“উৎসব!” হেসে উঠল সোক্রাত, দ’আরাস্তের উঁচু কাঁধে ভর দিয়ে লাফাতে লাফাতে।

“কীসের উৎসব?”

“এই! তুমি জানো না নাকি?” এবার তাঁর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বিস্ময়ে বললেন তিনি। “দয়ালু যীশুর উৎসব। প্রতি বছর, সবাই আসে… গুহায়… হাতুড়ি নিয়ে।” তিনি গুহার দিকে নয়, বরং বাগানের এক কোণে অপেক্ষা করে থাকা একদল লোকের দিকে ইশারা করলেন।

“একদিন… ভালো যীশুর মূর্তি… সে এসেছে সমুদ্র থেকে… নদী বেয়ে উঠে। জেলেরা পেয়েছে তাকে… কী সুন্দর! কী সুন্দর! তারপর ওরা ধুয়েছে তাকে… এখানে… গুহায়। আর এখন, গুহার ভেতর একটা পাথর গজিয়েছে। প্রতি বছর উৎসব হয়। হাতুড়ি দিয়ে টুকরো ভাঙো, ভাঙো…আশীর্বাদের জন্য। তারপর আবার কী, পাথরটা গজায়, তুমি ভাঙো, আবার ভাঙো… সব সময়ই তাই। এটাই অলৌকিক।”

তাঁরা এসে পৌঁছেছিলেন সেই গুহার সামনে—যার নিচু প্রবেশমুখটি অপেক্ষমাণ লোকগুলোর মাথার ওপর দিয়েই কেবল দেখা যাচ্ছিল। ভেতরে, কাঁপতে থাকা মোমের শিখায় দাগ কাটা অন্ধকারে, ঝুঁকে থাকা এক অবয়ব তখন হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করছিল। লোকটি—এক শীর্ণ গাউচো, লম্বা গোঁফ—সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বাইরে এল। খোলা তালুতে সবার দেখার জন্য রাখা ছিল ভেজা শিলাখণ্ডের একটি ছোট টুকরো; তার পর, সরে যাওয়ার আগে, সে তা সাবধানে মুঠোর ভেতর বন্ধ করে নিল। তারপর আরেকজন লোক ঝুঁকে গুহার ভেতরে ঢুকে গেল।

দ’আরাস্ত ঘুরে দাঁড়ালেন। তাঁর চারপাশে তীর্থযাত্রীরা দাঁড়িয়ে ছিল—তাঁর দিকে না তাকিয়েই—গাছ থেকে কুয়াশার মতো ঝরে পড়া জলের নিচে নিস্পৃহ। তিনিও অপেক্ষা করছিলেন—সেই গুহার সামনে, একই কুয়াশার নিচে—কিসের জন্য, তা তিনি জানতেন না। আসলে, তিনি অপেক্ষাই করে চলেছিলেন—এই দেশে আসার পর থেকে—প্রায় এক মাস ধরে। তিনি অপেক্ষা করছিলেন—আর্দ্র দিনের লালচে উত্তাপে, রাতের ক্ষুদ্র নক্ষত্রের নিচে; নিজের কাজের মধ্যেও—যে কাজ তাঁরই ছিল, বাঁধ তৈরি করা, রাস্তা খুলে দেওয়া—তবু যেন এই কাজ কেবল একটি অজুহাত, কোনো অপ্রত্যাশিত ঘটনার, কোনো সাক্ষাতের সুযোগ, যাকে তিনি কল্পনাও করতে পারেননি, অথচ যা, যেন পৃথিবীর শেষ প্রান্তে ধৈর্য ধরে তাঁর জন্য অপেক্ষা করে আছে। তিনি নিজেকে সামলে সরে গেলেন—ছোট্ট দলটির কেউই তাঁর দিকে খেয়াল করল না—আর বেরোনোর পথের দিকে এগোলেন। তাঁকে নদীর কাছে ফিরে যেতে হবে, কাজে ফিরে যেতে হবে।

দরজার কাছে সোক্রাত অপেক্ষা করছিলেন; এক খাটো, মোটাসোটা, গাট্টাগোট্টা গড়নের লোকের সঙ্গে বাচাল কথোপকথনে এমনভাবে নিমগ্ন ছিলেন যেন চারপাশের সবকিছু ভুলে গেছেন। লোকটির গায়ের রং কালোর চেয়ে বরং হলদেটে; সম্পূর্ণ কামানো মাথা তার প্রশস্ত কপালটাকে আরও উন্মুক্ত করে তুলেছিল। এই মসৃণ মুখমণ্ডলের বিপরীতে দাড়িটা—কুচকুচে কালো, চৌকো করে ছাঁটা—এক অদ্ভুত বৈপরীত্য তৈরি করছিল।

“এই লোকটা—চ্যাম্পিয়ন!” পরিচয়ের ভঙ্গিতে বললেন সোক্রাত। “কাল, শোভাযাত্রায় ও-ই থাকবে সামনে।”

লোকটি—মোটা সার্জের নাবিক-পোশাক পরা, নাবিক-জ্যাকেটের নিচে নীল-সাদা ডোরা কাটা গেঞ্জি—দ’আরাস্তকে খুঁটিয়ে লক্ষ্য করছিল তার শান্ত, কালো চোখে। ঠোঁটের কোণে তখনই এক হাসি ফুটে উঠেছে; পুরু, উজ্জ্বল ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে তার ঝকঝকে সাদা দাঁতগুলো দীপ্যমান হয়ে উঠছিল। (সার্জ: এক ধরনের টেকসই সুতির কাপড় যা আড়াআড়ি বুননের জন্য পরিচিত)

 

“ইনি স্প্যানিশ বলতে পারেন,” বললেন সোক্রাত, তারপর অচেনা লোকটির দিকে ঘুরে—“মঁসিয়ে দ’আরাস্তকে বলো।” এই বলে তিনি নাচতে নাচতে অন্য দলের দিকে সরে গেলেন। লোকটি হাসি থামাল, খোলামেলা কৌতূহল নিয়ে দ’আরাস্তের দিকে তাকাল।

— “আপনার আগ্রহ হচ্ছে, ক্যাপ্টেন?”

— “আমি ক্যাপ্টেন নই,” বললেন দ’আরাস্ত।

—“তাতে কিছু যায় আসে না। আপনি একজন সিইন্যর। সোক্রাত আমাকে তাই বলেছে।”

—“না, আমি নই। তবে আমার দাদু ছিলেন, তাঁর বাবাও, আর তাঁর আগের সবাই। এখন আমাদের দেশে আর কোনো সিইন্যর নেই।”

— “আঃ!” লোকটি হেসে উঠল, “বুঝেছি—এখন সবাই-ই সিইন্যর।”

— “না, তা নয়। সেখানে না সিইন্যর আছে, না প্রজা।”

লোকটি কিছুক্ষণ ভেবে নিল, তারপর বলল—“তাহলে কেউ কাজ করে না, কেউ কষ্ট পায় না?”

— “করে—লক্ষ লক্ষ মানুষ।”

— “তাহলে ওরা-ই তো প্রজা।”

— “সে অর্থে, হ্যাঁ—প্রজা আছে। কিন্তু তাদের প্রভু হলো পুলিশ আর ব্যবসায়ী।”

মুলাতোর শান্ত মুখে আবার মন্থন হল। তারপর সে গোঁ গোঁ করে উঠল—

— “হুম্! কেনাবেচা, তাই না! কী নোংরা জিনিস! আর পুলিশ থাকলে—কুকুরই হুকুম চালায়।”

কোনো ভূমিকা ছাড়াই সে হঠাৎ হেসে উঠল।

— “আপনি কিছু বিক্রি করেন না?”

— “প্রায় না। আমি বাঁধ বানাই, রাস্তা করি।”

— “বেশ! আমি জাহাজে রাঁধুনি। চাইলে আপনাকে আমাদের কালো শিম রান্না করে খাওয়াব।”

 — “খুব ভালো।”

লোকটি দ’আরাস্তের কাছে এসে তার হাত ধরল।

— “শুনুন, আপনি যা বললেন, আমার ভালো লেগেছে। আমিও আপনাকে কিছু বলব—হয়তো আপনারও ভালো লাগবে।”

সে তাকে টেনে নিয়ে গেল প্রবেশপথের কাছে—বাঁশঝাড়ের নিচে, ভেজা কাঠের একটি বেঞ্চের দিকে।

“আমি তখন সমুদ্রে—ইগুয়াপের উপকূলের কাছে—একটা ছোট তেলবাহী জাহাজে ছিলাম, যা উপকূল ধরে বন্দরগুলোতে রসদ পৌঁছে দিত। জাহাজে আগুন লেগে গেল। আমার দোষ নয়—আমি আমার কাজ জানি! না, নিছক দুর্ভাগ্য! আমরা লাইফবোট নামাতে পেরেছিলাম। রাতে সমুদ্র হঠাৎ উত্তাল হয়ে উঠল, ঢেউয়ে নৌকাটা উলটে গেল, আমি ডুবে গেলাম। ভেসে উঠতেই মাথা গিয়ে ঠুকল নৌকায়। তারপর ভেসে যেতে লাগলাম। রাত ছিল ঘুটঘুটে, জলরাশি বিশাল—তার ওপর সাঁতারও ভালো জানি না—আমি ভয় পাচ্ছিলাম। হঠাৎ দূরে একটা আলো দেখলাম—চিনতে পারলাম ইগুয়াপের ‘দয়ালু যিশু’র গির্জার গম্বুজ। তখন আমি সেই দয়ালু যিশুকে বললাম—তিনি যদি আমাকে বাঁচান, আমি শোভাযাত্রায় মাথায় করে পঞ্চাশ কিলোর একটা পাথর বহন করব। তুমি হয়তো বিশ্বাস করবে না—কিন্তু জল শান্ত হয়ে এল, আমার বুকও শান্ত হল। আমি ধীরে ধীরে সাঁতার কাটলাম—খুশি লাগছিল—আর শেষ পর্যন্ত তীরে পৌঁছলাম। কাল আমি আমার প্রতিজ্ঞা রাখব।”

সে হঠাৎ দ’আরাস্তের দিকে সন্দেহের চোখে তাকাল।

— “তুমি হাসছ না তো?”

— “না, আমি হাসছি না। যা প্রতিজ্ঞা করা হয়, তা পালন করতে হয়।”

লোকটি তাঁর কাঁধে চাপড় মারল।

 

— “এখন চলো, নদীর ধারে আমার ভাইয়ের বাড়িতে। তোমার জন্য শিম রান্না করব।”

— “না,” বললেন দ’আরাস্ত, “আমার কাজ আছে। আজ সন্ধেয়—আপনি চাইলে।”

— “ঠিক আছে। তবে আজ রাতে বড় কুঁড়েঘরে নাচ আর প্রার্থনা—সেন্ট জর্জের উৎসব।”

দ’আরাস্ত তাকে জিজ্ঞেস করলেন, সে-ও নাচবে কি না। রাঁধুনির মুখটা হঠাৎ শক্ত হয়ে গেল; তার চোখ—প্রথমবারের মতো—দৃষ্টি এড়িয়ে যাচ্ছিল।

— “না, না, আমি নাচব না। কাল পাথর বইতে হবে—ওটা ভারী। আজ রাতে শুধু সন্তের উৎসব করতে যাব। তারপর তাড়াতাড়ি বেরিয়ে আসব।”

— “অনেকক্ষণ চলে?”

— “সারা রাত, একটু সকাল পর্যন্ত।”

সে দ’আরাস্তের দিকে তাকাল—এক ধরনের অস্পষ্ট লজ্জা নিয়ে।

— “নাচে এসো। তারপর আমাকে নিয়ে যাবে। না হলে আমি থেকে যাব, নাচব—হয়তো নিজেকে আটকাতে পারব না।”

— “আপনি নাচতে ভালোবাসেন?”

রাঁধুনির চোখে হঠাৎ লোভাতুর উজ্জ্বলতা জ্বলে উঠল।

— “ওহ্, খুব ভালোবাসি। আর সেখানে আছে চুরুট, সন্ত, মেয়েরা। সেখানে গেলে সব ভুলে যাওয়া যায়—আর কিছু মানতেও হয় না।।”

— “মেয়েরাও আছে? শহরের সব মেয়েরা?”

— “শহরের না—বস্তির।”

রাঁধুনি আবার তার হাসি ফিরে পেল।

— “এসো। ক্যাপ্টেনের কথা আমি মানি। আর তুমি আমাকে সাহায্য করবে, যাতে কাল আমি আমার প্রতিজ্ঞা রাখতে পারি।”

দ’আরাস্ত মনে মনে হালকা একটা বিরক্তি অনুভব করলেন। এই আজগুবি প্রতিজ্ঞার সঙ্গে তাঁর কীই বা সম্পর্ক? তবু তিনি তাকালেন সেই খোলা, উজ্জ্বল মুখটার দিকে—যে তাঁর দিকে নির্ভরতার হাসি ছুঁড়ে দিচ্ছিল, আর যার কালো ত্বক সুস্থতা আর জীবনের দীপ্তিতে ঝলমল করছিল।

"আমি আসব,” তিনি বললেন। “এখন, আমি আপনার সাথে কিছুটা পথ যাব।”

কেন যেন, ঠিক সেই মুহূর্তেই তাঁর মনে ভেসে উঠল—সেই কৃষ্ণাঙ্গ তরুণী, যে তাঁকে স্বাগত-অর্ঘ্য এগিয়ে দিয়ে ছিল।

তারা উদ্যান থেকে বেরিয়ে এল। কাদায় ভরা কয়েকটি রাস্তা পেরিয়ে পৌঁছল এক ভাঙাচোরা চত্বরে; চারপাশের নিচু বাড়িগুলো সেটাকে আরও বিস্তৃত বলে মনে করাচ্ছিল। দেয়ালের প্লাস্টারের গায়ে এখন আর্দ্রতা গড়িয়ে পড়ছিল, যদিও বৃষ্টি আর বাড়েনি। আকাশের ভেজা, স্পঞ্জের মতো স্তর পেরিয়ে নদী আর গাছপালার গুঞ্জন স্তিমিত হয়ে তাদের কানে এসে পৌঁছাচ্ছিল। তারা একই তালে হাঁটছিল—দ’আরাস্তের পদক্ষেপ ভারী, আর রাঁধুনিটা পেশির টানে টানটান। মাঝে মাঝে সে মাথা তুলে সঙ্গীর দিকে তাকিয়ে হাসছিল। তারা গির্জার দিকে এগোল, যা বাড়িগুলোর ওপর দিয়ে দেখা যাচ্ছিল। চত্বরের শেষ প্রান্তে পৌঁছে আবার কাদামাখা কয়েকটি রাস্তা পেরোল—সেখানে রান্নার তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধ ভেসে আসছিল। মাঝে মাঝে কোনো নারী—হাতে থালা বা রান্নার সরঞ্জাম—দরজায় মুখ বাড়িয়ে কৌতূহলী চোখে তাকাত, তারপরই মিলিয়ে যেত। তারা গির্জা পেরিয়ে ঢুকে পড়ল এক পুরনো পাড়ায়, একই রকম নিচু বাড়ির ফাঁক দিয়ে এগিয়ে গিয়ে হঠাৎই এসে পড়ল সেই বস্তি এলাকার পেছনে—যেটা দ’আরাস্ত চিনতে পারলেন—আর যার আড়াল থেকে অদৃশ্য নদীর শব্দ ভেসে আসছিল।

“ঠিক আছে, আমি চলি। সন্ধেয় দেখা হবে,” তিনি বললেন।

— “হ্যাঁ, গির্জার সামনে।”

 

 

কিন্তু রাঁধুনি তখনও দ’আরাস্তের হাত ধরে রেখেছিল। সে ইতস্তত করছিল। শেষে বলল,

— “আচ্ছা, তুমি—কখনও কি ডেকেছ, কোনো প্রতিজ্ঞা করেছ?”

— “হ্যাঁ, একবার—মনে হয়।”

— “জাহাজডুবির সময়?”

— “আপনি চাইলে তাই বলুন।”

দ’আরাস্ত হঠাৎ হাত ছাড়িয়ে নিলেন। কিন্তু ফেরার জন্য পা বাড়াতেই তাঁর সঙ্গে লোকটির দৃষ্টি বিনিময় হলো। দ’আরাস্ত একটু থামলেন, তারপর হাসলেন।

“আপনাকে বলতে পারি—তেমন কিছু নয়। আমার দোষে একজন মানুষ মরতে বসেছিল। মনে হয়, আমি তখন ডেকেছিলাম।”

— “তুমি কি প্রতিজ্ঞা করেছিলে?”

— “না। করতে ইচ্ছে হয়েছিল।”

— “অনেক দিন আগে?”

— “এখানে আসার ঠিক আগে।”

লোকটি দুহাত দিয়ে নিজের দাড়ি চেপে ধরল। তার চোখ জ্বলজ্বল করছিল।

— “তুমি একজন ক্যাপ্টেন,” সে বলল। “আমার বাড়ি তোমারও। আর তুমি আমাকে আমার প্রতিজ্ঞা রাখতে সাহায্য করবে—যেন তুমি নিজেই তা করছ। এতে তোমারও উপকার হবে।”

দ’আরাস্ত হাসলেন: —“আমার তা মনে হয় না।”

— “তুমি গর্বিত, ক্যাপ্টেন।”

— “আমি গর্বিত ছিলাম। এখন আমি একা। কিন্তু বলুন তো—আপনার সেই দয়ালু যিশু কী সবসময় আপনার ডাকে সাড়া দেন?"

— "সবসময় নয়, ক্যাপ্টেন!"

— "তাহলে?"

লোকটি টাটকা, শিশুসুলভ হাসিতে ফেটে পড়ল।

“আচ্ছা,” সে বলল, “তিনি তো স্বাধীন—তাই না?”

 

 

 

ক্লাবে, যেখানে দ’আরাস্ত গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজ করছিলেন, মেয়র তাঁকে বললেন, পৌরসভার অতিথি-স্মারক পুস্তকে স্বাক্ষর করতে হবে—যাতে অন্তত তাঁর ইগুয়াপে আগমনের এই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটির একটি চিহ্ন থেকে যায়। জজও, অতিথির গুণ ও প্রতিভার পাশাপাশি, তাদের মধ্যে তাঁর মহান দেশকে যে অনাড়ম্বর ভঙ্গিতে তিনি প্রতিনিধিত্ব করছিলেন, তা প্রশংসা করতে দু-একটা নতুন প্রশংসার বুলি জুড়ে দিলেন। দ’আরাস্ত শুধু বললেন, এতে সম্মান আছে—আর পাশাপাশি তাঁর সংস্থারও সুবিধা হয়েছে, এই দীর্ঘ কাজের চুক্তিটা তারা পেয়েছে। এত বিনয়ের সামনে জজ যেন প্রতিবাদ করেই উঠলেন। "ভালো কথা," তিনি বললেন, “পুলিশ প্রধানকে নিয়ে আমাদের কী করা উচিত—সে বিষয়ে ভেবেছেন?” দ’আরাস্ত মৃদু হেসে তাঁর দিকে তাকালেন।

“পেয়ে গেছি,” দ’আরাস্ত বললেন।

দ’আরাস্তের নামে ওই বেখেয়ালি লোকটিকে ক্ষমা করা হলে, তিনি সেটাকে ব্যক্তিগত অনুগ্রহ—এক বিরল দয়া—হিসেবেই গণ্য করবেন; যাতে তাঁর এই অবস্থান—তিনি যে ইগুয়াপের সুন্দর শহর আর তার উদার অধিবাসীদের সঙ্গে পরিচিত হতে পেরে এত আনন্দিত—সম্প্রীতি আর সৌহার্দ্যের আবহেই শুরু হতে পারে। জজ মনোযোগী ও হাসিমুখে মাথা নাড়ছিলেন। বোদ্ধার মতো তিনি কিছুক্ষণ এই প্রস্তাবটি ভেবে দেখলেন, তারপর উপস্থিতদের দিকে ঘুরে সেই মহান ফরাসি জাতির উদার ঐতিহ্যের প্রশংসায় হাততালি দিতে উদ্বুদ্ধ করলেন। এরপর আবার দ’আরাস্তের দিকে ফিরে তিনি তাঁর সন্তুষ্টি প্রকাশ করলেন। “যেহেতু ব্যাপারটা এমনই,” তিনি উপসংহার টানলেন, “তাহলে আজ রাতে আমরা সেই পুলিশ প্রধানের সঙ্গেই নৈশভোজ করব।”

কিন্তু দ’আরাস্ত বললেন, তিনি বন্ধুদের আমন্ত্রণে বস্তি এলাকায় নাচের অনুষ্ঠানে যাবেন।

“ওহ্, আচ্ছা!” জজ বললেন। “আমি খুশি যে আপনি সেখানে যাচ্ছেন। দেখবেন, আমাদের মানুষদের ভালো না বেসে থাকা যায় না।”

সন্ধের দিকে, দ’আরাস্ত, রাঁধুনি আর তার ভাই নিভে যাওয়া আগুনের চারপাশে গোল হয়ে বসেছিল, সেই কুঁড়েঘরের ঠিক মাঝখানে—যেখানে ইঞ্জিনিয়ার সকালে একবার এসেছিলেন। তাঁকে আবার দেখে ভাইটির মধ্যে বিন্দুমাত্র অবাকভাব দেখা গেল না। সে স্প্যানিশ প্রায় বলতেই পারত না, বেশিরভাগ সময় শুধু মাথা নেড়ে সায় দিচ্ছিল। আর রাঁধুনি—সে আগে ক্যাথেড্রালগুলো নিয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছিল, এখন অনেকক্ষণ ধরে কালো শিমের স্যুপ নিয়ে কথা বলছিল।

এখন আলো প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। দ’আরাস্ত যদিও এখনও রাঁধুনি আর তার ভাইকে দেখতে পাচ্ছিলেন, ঘরের ভেতরের দিকে উবু হয়ে বসে থাকা এক বৃদ্ধা আর সেই তরুণীটির ছায়া ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে আসছিল—যে তরুণীটি তাঁকে আবারও পরিবেশন করেছিল। নিচের দিক থেকে ভেসে আসছিল নদীর একটানা একঘেয়ে শব্দ।

রাঁধুনিটি উঠে দাঁড়িয়ে বলল: "সময় হয়েছে।"

তারা উঠে দাঁড়াল, কিন্তু  নারীরা বসেই থাকল। পুরুষরা একাই বেরোল। দ’আরাস্ত ইতস্তত করলেন, তারপর অন্যদের সঙ্গে যোগ দিলেন। ততক্ষণে রাত নেমেছে, বৃষ্টি থেমে গেছে। ফিকে কালো আকাশটা তখনও তরল। সেই স্বচ্ছ ও গাঢ় অন্ধকারে, দিগন্তের নিচু প্রান্তে, তারারা ক্রমে জ্বলে উঠে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই একে একে নিভে নদীতে খসে পড়ছিল—যেন আকাশ থেকে তার শেষ আলোগুলো চুইয়ে পড়ছে। ঘন বাতাসে জল আর ধোঁয়ার গন্ধ। খুব কাছ থেকেই বিশাল অরণ্যের অস্পষ্ট গমগমে শব্দ শোনা যাচ্ছিল, যদিও অরণ্যটি স্থির। হঠাৎ দূর থেকে ঢোল আর গানের শব্দ উঠল—প্রথমে চাপা, তারপর স্পষ্ট। শব্দগুলো ক্রমে কাছে এল, আবার হঠাৎ থেমে গেল। একটু পর দেখা গেল এক সারি কালো মেয়ে—খসখসে সাদা রেশমি পোশাক পরা, কোমরে নিচু করে বাঁধা। তাদের পেছনে আসছিল এক লম্বা কালো লোক, লাল আঁটসাঁট কোট গায়ে, গলায় ঝুলছে নানা রঙের দাঁতের মালা। তার পেছনে এলোমেলোভাবে আসছিল সাদা পায়জামা পরা কিছু পুরুষ, আর ত্রিভুজ আর চওড়া, খাটো ঢোল হাতে কয়েকজন বাদ্যকর।

 রাঁধুনি বলল, তাদের সঙ্গে যেতে হবে।

নদীর ধার ধরে এগিয়ে, শেষ কুঁড়েঘরগুলো পেরিয়ে, কিছুটা দূরে তারা যে ঘরে পৌঁছল, সেটি বড় আর প্রায় ফাঁকা; ভেতরে দেয়ালে প্লাস্টার থাকায় অন্যগুলোর চেয়ে আরামদায়ক; মাটি-লেপা মেঝে; খড় আর নলখাগড়ার ছাদ মাঝখানের এক খুঁটির ওপর ভর দিয়ে আছে; চারদিকের দেয়াল একেবারে ফাঁকা। ঘরের শেষ দিকে, মোমবাতির মৃদু আলোয় তালপাতায় ঢাকা এক ছোট বেদির ওপর সেন্ট জর্জের রঙিন ছবি—তিনি এক গোঁফওয়ালা ড্রাগনকে পায়ের নিচে চেপে রেখেছেন। বেদির নিচে, রঙিন কাগজে সাজানো এক কুলুঙ্গিতে, এক বাটি জল আর একটি মোমবাতির মাঝখানে রাখা লাল রঙ করা মাটির ছোট মূর্তি—এক শিংওয়ালা দেবতা, রুপালি কাগজের বড় ছুরি উঁচিয়ে ধরে আছে।

রাঁধুনি দ’আরাস্তকে এক কোণে নিয়ে গেল। তারা দরজার কাছে দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়াল। লোকটি ফিসফিস করে বলল, “এভাবে আমরা কাউকে বিরক্ত না করেই বেরিয়ে যেতে পারব।”

ঘরটি তখন পুরুষ-নারীতে ঠাসা, সবাই গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে। ভেতরে ইতিমধ্যেই গরম জমে উঠেছে। বাদ্যকররা ছোট বেদিটির দুপাশে গিয়ে বসল। নর্তক-নর্তকীরা দুটো সমকেন্দ্রিক বৃত্তে ভাগ হয়ে দাঁড়াল—পুরুষেরা ভেতরের বৃত্তে। মাঝখানে এসে দাঁড়াল সেই লম্বা কালো লোকটি, লাল আঁটসাঁট কোট পরা। দ’আরাস্ত হাত ভাঁজ করে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়ালেন। কিন্তু লম্বা লোকটি নর্তক-নর্তকীদের বৃত্ত চিরে তাদের দিকে এগিয়ে এল আর গম্ভীর মুখে রাঁধুনিকে কিছু বলল।

“হাত গুটিয়ে রেখো না। ক্যাপ্টেন,” রাঁধুনিটি বলল, “তুমি নিজেকে গুটিয়ে রেখেছো—এতে সন্তের আত্মা নামতে পারছে না।”

দ’আরাস্ত বাধ্য হয়ে হাত নামালেন। পিঠ তখনও দেয়ালে ঠেস দেওয়া। দীর্ঘ, ভারী অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আর ঘামে চকচকে বড় মুখ নিয়ে তিনি যেন এখন এক পশুসম অথচ আশ্বাসদায়ী দেবতা। সেই লম্বা লোকটি তাঁর দিকে তাকাল, তারপর সন্তুষ্ট হয়ে নিজের জায়গায় ফিরে গেল। সে উচ্চস্বরে সুর ধরল—কাঁপতে থাকা সুর—যা সবাই একসঙ্গে গেয়ে উঠল, ঢোলের তালে। দুটো বৃত্ত বিপরীত দিকে ঘুরতে শুরু করল—ভারী, জোরালো পায়ে, প্রায় পা ঠুকে, কোমরের দোলনে সামান্য আভাসিত। গরম আরও বাড়ছিল। তবু বিরতিগুলো কমে আসছিল, আর নাচ ক্রমেই তীব্র হয়ে উঠছিল। অন্যদের তালের গতি না ভেঙ্গে আর নিজের নাচ না থামিয়ে, লম্বা কালো লোকটি আবারও বৃত্তগুলো চিরে, এবার বেদীর দিকে এগিয়ে গেল। সে এক গ্লাস জল আর একটি জ্বলন্ত মোমবাতি নিয়ে ফিরে এল—ঘরের ঠিক মাঝখানে মাটিতে গেঁথে দিল। সে মোমবাতির চারপাশে জল ঢেলে দুটি সমকেন্দ্রিক বৃত্ত তৈরি করল। তারপর সোজা হয়ে দাঁড়াল—উন্মাদের মতো ছাদের দিকে তাকিয়ে। দেহ টানটান। অপেক্ষা।

“সেন্ট জর্জ আসছেন… দেখো, দেখো…” রাঁধুনি ফিসফিস করে বলল—তার চোখ যেন কোটর থেকে বেরিয়ে আসছে।

কয়েকজন নর্তক-নর্তকী তখন তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ছিল—তবে তা ছিল এক জমাট, স্থবির তন্দ্রা: হাত কোমরে ঠেসে ধরা; পা শক্ত; দৃষ্টি স্থির; শরীর অনড়। অন্যরা তালের গতি ক্রমেই আরো বাড়িয়ে দিচ্ছিল, শরীর খিঁচুনির মতো মোচড়াচ্ছিল; মুখ থেকে বেরোচ্ছিল ভাঙা, ভাষাহীন চিৎকার। সেই চিৎকার চড়ে উঠল—একসময় একসঙ্গে মিশে গেল এক হাহাকারে। তখন লম্বা লোকটি—চোখ এখনও উপরে—এক দীর্ঘ, অস্পষ্ট আর্তনাদ ছুড়ে দিল; একই শব্দ ফিরে আসছিল বারবার।

“দেখছো,” রাঁধুনি ফিসফিস করে বলল, “ও-ই ঈশ্বরের রণক্ষেত্র।”

দ’আরাস্ত তার কণ্ঠস্বরের এই পরিবর্তনে চমকে উঠে লোকটির দিকে তাকালেন, যে সামনের দিকে ঝুঁকে, মুষ্টিবদ্ধ হাতে, আর স্থির দৃষ্টিতে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকেই অন্যদের সেই ছন্দময় পা-ঠোকার ভঙ্গিটি যেন পুনরাবৃত্তি করে চলেছে। হঠাৎই দ’আরাস্ত খেয়াল করলেন—তিনি নিজেও কিছুক্ষণ ধরে, পা একটুও না নেড়ে, পুরো শরীরের ওজন নিয়ে তালের সঙ্গে দুলে উঠছেন।

হঠাৎই ঢোলগুলো উন্মত্ত হয়ে উঠল। আর সেই সঙ্গে লাল কোট পরা দানবটিও এক ঝটকায় বাঁধনছাড়া; জ্বলন্ত চোখ; চার অঙ্গ শরীরের চারপাশে ঘূর্ণায়মান—এক পায়ের পরে আরেক পায়ে, হাঁটু ভেঙে পড়ছিল, এমন তীব্র গতিতে তাল বাড়াচ্ছিল যে শেষে মনে হচ্ছিল তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ যেন ছিঁড়ে ছিটকে যাবে। কিন্তু পূর্ণ গতির মধ্যেই আচমকা থেমে গেল সে—ঢোলের বজ্রধ্বনির মধ্যে গর্বিত ও ভয়ার্ত দৃষ্টিতে উপস্থিত সকলের দিকে তাকিয়ে রইল। সঙ্গে সঙ্গে, এক অন্ধকার কোণ থেকে এক নর্তক বেরিয়ে এসে হাঁটু গেড়ে বসে সেই ভর পাওয়া লোকটির দিকে একটি ছোট তলোয়ার বাড়িয়ে দিল। লোকটি চারপাশে দৃষ্টি রেখে তলোয়ারটি তুলে নিল, তারপর সেটিকে মাথার উপর বনবন করে ঘোরাতে লাগল। ঠিক সেই মুহূর্তে দ’আরাস্ত দেখতে পেলেন—রাঁধুনি অন্যদের মাঝখানে নাচছে। ইঞ্জিনিয়ার খেয়ালই করেননি সে কখন সেখানে গিয়ে মিশে গেছে।

সেই রক্তাভ, অনিশ্চিত আলোয় মেঝে থেকে ধুলো উড়ে বাতাসকে—যা ইতিমধ্যেই ত্বকে লেগে থাকা, দমবন্ধ করা—আরও ঘন ও ভারী করে তুলছিল। দ’আরাস্ত টের পাচ্ছিলেন, ক্লান্তি ধীরে ধীরে তাঁকে গ্রাস করছে; শ্বাসও ক্রমশ কষ্টকর হয়ে উঠছে।

তিনি খেয়ালই করেননি—নর্তকেরা কখন বিশাল সব চুরুট জোগাড় করেছে। এখন তারা নাচ না থামিয়েই সেগুলো টানছে; ঝাঁঝালো সেই গন্ধে ঘর ভরিয়ে তুলেছে, আর তাঁকেও একটু একটু করে আচ্ছন্ন করে দিচ্ছে।

তিনি দেখলেন—রাঁধুনি তাঁর পাশ দিয়ে নাচতে নাচতে চলে গেল, চুরুটে টান দিতে দিতে।

“ধূমপান করো না,” তিনি বললেন।

লোকটি গরগর করে উঠল—তবু পায়ের তাল থামাল না; মাথার ওপরের খুঁটির দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে, যেন আঘাতে দিশেহারা কোনো মুষ্টিযোদ্ধা। তার ঘাড় বেয়ে এক দীর্ঘ, অবিরাম শিহরণ কেঁপে উঠছিল। তার পাশেই এক স্থূল কৃষ্ণাঙ্গী, ডানে-বামে তার জান্তব মুখ দুলিয়ে, অবিরাম ঘেউ ঘেউ করছিল।

কিন্তু তরুণ কৃষ্ণাঙ্গীরাই—বিশেষ করে তারাই—ঢুকে পড়ছিল সবচেয়ে ভয়ংকর তন্দ্রায়: পা মাটিতে সেঁটে, শরীর পা থেকে মাথা পর্যন্ত ক্রমশ তীব্রতর খিঁচুনিতে কেঁপে উঠছিল, সেই খিঁচুনি উঠে গিয়ে জমাট বাঁধছিল কাঁধে। তখন তাদের মাথা সামনে-পেছনে এমনভাবে ছটফট করতে লাগল, যেন তা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন।

ঠিক তখনই সবাই একসঙ্গে ফেটে পড়ল—একটানা, দীর্ঘ, সম্মিলিত আর্তনাদে; এমন এক চিৎকার, যেখানে শ্বাস নেই, সুর নেই, ওঠানামা নেই। পেশি আর স্নায়ু দিয়ে গড়া তাদের সমগ্র শরীর যেন একটিমাত্র উদ্গীরণে গিঁট বেঁধে গেছে—আর সেই উদ্গীরণই অবশেষে তাদের প্রত্যেকের ভেতরে এতদিন সম্পূর্ণ নীরব, চাপা পড়ে থাকা এক প্রাণীকে কণ্ঠ দিচ্ছে। আর সেই চিৎকার না থামিয়েই নারীরা একে একে মাটিতে লুটিয়ে পড়তে লাগল। লম্বা কালো লোকটি প্রত্যেকের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে, তার শক্ত, কালো পেশিবহুল হাত দিয়ে দ্রুত, খিঁচুনির মতো ভঙ্গিতে তাদের কানপাট চেপে ধরছিল।

তখন তারা দুলতে দুলতে উঠে দাঁড়াত, আবার নাচে ফিরে যেত, আবার চিৎকার শুরু করত—প্রথমে ক্ষীণ, তারপর ক্রমে আরও উচ্চ, আরও দ্রুত; আবার লুটিয়ে পড়ত, আবার উঠে দাঁড়াত—পুনরায়, আবার—এভাবেই চলতে থাকত দীর্ঘক্ষণ, যতক্ষণ না সেই সম্মিলিত আর্তনাদ স্তিমিত হয়ে ভেঙে পড়ত এক কর্কশ, ভাঙাচোরা ঘেউ-ঘেউ শব্দে, যা তাদের হেঁচকির মতো ঝাঁকিয়ে তুলছিল।

দ’আরাস্ত—সম্পূর্ণ ক্লান্ত, দীর্ঘক্ষণ স্থির নাচে পেশিগুলো গিঁট বেঁধে গেছে—নিজেরই নীরবতায় দমবন্ধ হয়ে দুলে উঠলেন। তাপ, ধুলো, চুরুটের ধোঁয়া, মানুষের গন্ধ—সব মিলিয়ে বাতাস তখন প্রায় শ্বাস-অযোগ্য। তিনি চোখ ঘুরিয়ে রাঁধুনিকে খুঁজলেন—সে নেই। দ’আরাস্ত দেয়ালের গা বেয়ে ধীরে ধীরে নেমে উবু হয়ে বসে পড়লেন, বমি বমি ভাব চেপে ধরে।

চোখ খুলতেই দেখলেন—বাতাস তখনও ততটাই দমবন্ধ করা, কিন্তু শব্দ থেমে গেছে। শুধু ঢোলগুলোই নিচু তালে একটানা বেজে চলেছে; আর ঘরের চার কোণে, সাদাটে কাপড়ে ঢাকা দলগুলো, সেই তালের সঙ্গে পা ঠুকে চলেছে। কিন্তু ঘরের মাঝখানে—যেখান থেকে এখন গ্লাস আর মোমবাতি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে—একদল তরুণ কৃষ্ণাঙ্গী, আধা-সম্মোহিত অবস্থায়, ধীরে ধীরে নাচছিল—যেন প্রতি মুহূর্তেই তালের পিছনে পড়ে যাচ্ছে। চোখ বন্ধ, অথচ দেহ সোজা—তারা পায়ের আঙুলের ডগায় ভর দিয়ে, প্রায় একই জায়গায়, মৃদু দোল খাচ্ছিল।

তাদের মধ্যে দুজন—স্থূলকায়া—রাফিয়ার ঝালরে মুখ ঢাকা। তারা ঘিরে রেখেছিল আরেক তরুণীকে: লম্বা, ছিপছিপে, সাজপোশাকে সজ্জিত—যাকে দ’আরাস্ত হঠাৎ চিনতে পারলেন তাঁর আতিথেয়ের মেয়ে হিসেবে। সবুজ পোশাক পরা সে, মাথায় নীল গজ কাপড়ের শিকারিণীর টুপি—সামনে তোলা, তাতে পালক গোঁজা। হাতে সবুজ-হলুদ ধনুক, তাতে লাগানো তীর—যার ডগায় গেঁথে আছে এক বহুরঙা পাখি। তার সুকুমার দেহের ওপর সুন্দর মাথাটি ধীরে দুলছিল, সামান্য পেছনে হেলানো; নিদ্রালু সেই মুখে ভেসে উঠেছিল এক নিষ্পাপ বিষণ্ণতা। সুর থামলেই সে ঢলে পড়ত—তন্দ্রাচ্ছন্ন, প্রায় ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছে। কিন্তু ঢোলের তীব্রতর তাল তাকে আবার ধরে রাখত—এক অদৃশ্য অবলম্বনের মতো—যার চারপাশে সে তার শিথিল ভঙ্গিগুলো ধীরে ধীরে পাক খাইয়ে তুলছিল। তারপর আবার, সুর থামার সঙ্গে সঙ্গে, ভারসাম্যের কিনারায় দুলতে দুলতে—হঠাৎই সে এক অদ্ভুত পাখির মতো ডাক ছুঁড়ে দিত—তীক্ষ্ণ, অথচ সুরেলা।

দ’আরাস্ত, সেই মন্থর নাচে মোহাবিষ্ট হয়ে, কালো ডায়ানার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। ঠিক তখনই রাঁধুনি হঠাৎ তাঁর সামনে উপস্থিত হল—তার মসৃণ মুখটি এখন বিকৃত। চোখে আর কোনো নম্রতা নেই—সেখানে শুধু এক অচেনা, দমিত লোভের ঝলক। নিরাবেগ, প্রায় শীতল স্বরে—যেন একেবারেই অচেনা কাউকে বলছে—সে বলল,

“দেরি হয়ে গেছে, ক্যাপ্টেন। ওরা সারারাত নাচবে—কিন্তু এখন ওরা চায় না তুমি এখানে থাকো।”

মাথা ভার হয়ে আসছিল—দ’আরাস্ত উঠে দাঁড়ালেন আর তার পিছু নিলেন। লোকটি দেয়াল ঘেঁষে দরজার দিকে এগোচ্ছিল। দোরগোড়ায় এসে সে সরে দাঁড়াল, বাঁশের দরজাটা ধরে রাখল। দ’আরাস্ত বাইরে বেরিয়ে এলেন। তিনি ফিরে তাকালেন—লোকটি তখনও স্থির দাঁড়িয়ে।

“চলুন। একটু পরেই পাথরটা বহন করতে হবে—”

—“আমি থাকব,” লোকটি বলল, মুখ বন্ধ, কঠোর।

—“আর আপনার প্রতিজ্ঞা?”

কোনো উত্তর না দিয়ে রাঁধুনি ধীরে ধীরে দরজাটা ঠেলতে লাগল—যেটা দ’আরাস্ত এক হাত দিয়ে ধরে রেখেছিলেন। এক মুহূর্ত তারা এভাবেই মুখোমুখি রইল। তারপর দ’আরাস্ত কাঁধ ঝাঁকিয়ে সরে গেলেন।

রাত ভরে ছিল তাজা, তীব্র সুগন্ধে। বনের ওপর, দক্ষিণ আকাশের বিরল তারাগুলো—অদৃশ্য কুয়াশায় ঝাপসা—ম্লান আলোয় টিমটিম করছিল। আর্দ্র বাতাস ভারী; তবু কুটির থেকে বেরিয়েই সেটাই যেন এক অদ্ভুত, উপভোগ্য শীতলতা হয়ে উঠল।

দ’আরাস্ত পিচ্ছিল ঢাল বেয়ে ওপরে উঠছিলেন, প্রথম কুঁড়েঘরগুলোর দিকে এগোচ্ছিলেন—গর্তে ভরা পথে মাতালের মতো হোঁচট খেতে খেতে। খুব কাছেই বন, নিচু গর্জনে ধ্বনিত হচ্ছিল। নদীর শব্দ ক্রমে ফুলে উঠছিল; যেন সমগ্র মহাদেশই রাতের ভেতর ধীরে ধীরে ভেসে উঠছে—আর সেই সঙ্গে এক তীব্র বমিভাব দ’আরাস্তকে গ্রাস করছিল।

তাঁর মনে হচ্ছিল—তিনি যেন উগলে দিতে চান এই সমগ্র দেশটাকেই: তার বিস্তীর্ণ শূন্যতার বিষণ্ণতা, বনের সেই বিবর্ণ, জলপচা সবুজ আলো, আর তার নির্জন, বিশাল নদীগুলোর রাতের অন্ধ, লেপ্টে থাকা শব্দ। এই ভূমি বড়ই বিস্তৃত; এখানে রক্ত আর ঋতু মিশে একাকার। সময় এখানে তরল—গলে পড়ে, ছড়িয়ে যায়। এখানে জীবন মাটির গা ঘেঁষে লেপ্টে থাকে—আর তার সঙ্গে একাকার হতে হলে বছরের পর বছর কাদা কিংবা শুকনো মাটির ওপর শুয়ে থাকতে হয়।

ওদিকে, ইউরোপে—লজ্জা আর ক্রোধ। আর এখানে—নির্বাসন, অথবা নিঃসঙ্গতা—এই অবসন্ন অথচ খিঁচুনিধরা উন্মত্ত মানুষগুলোর মধ্যে, যারা নাচছে মৃত্যুর দিকে। তবু সেই আর্দ্র, উদ্ভিদগন্ধে ভরা রাতের ভেতর দিয়ে, এখনো তাঁর কানে এসে বাজছিল সেই আহত পাখির বিকৃত ডাক—যা ছুঁড়ে দিচ্ছিল সেই ঘুমন্ত সুন্দরী।

খারাপ এক ঘুমের পর, মাথা জুড়ে তীব্র মাইগ্রেন নিয়ে যখন দ’আরাস্ত জেগে উঠলেন, তখন এক ভ্যাপসা, আর্দ্র উত্তাপ শহর আর স্থির অরণ্যকে চেপে ধরেছিল। এখন তিনি হাসপাতালের বারান্দার ছাউনির নিচে দাঁড়িয়ে—অপেক্ষা করছেন; বন্ধ হয়ে যাওয়া ঘড়ির দিকে তাকিয়ে, সময় সম্পর্কে অনিশ্চিত, এই বিস্তৃত দিনের আলো আর শহর থেকে উঠে আসা নীরবতায় বিস্মিত। আকাশ—প্রায় খাঁটি নীল—নিভে থাকা প্রথম সারির ছাদগুলোর গা ঘেঁষে ভার হয়ে নেমে ছিল। হাসপাতালের উল্টোদিকের বাড়ির ছাদে হলদেটে উরুবুগুলো গরমে অবশ হয়ে ঝিমোচ্ছিল। তাদের মধ্যে একটি হঠাৎ গা ঝাড়া দিল, ঠোঁট ফাঁক করল, যেন খুব সচেতন ভঙ্গিতে উড়তে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। দুবার ধুলো-মাখা ডানা শরীরের সঙ্গে আছড়ে মারল, ছাদের ওপরে সামান্য—কয়েক সেন্টিমিটার—উঠল, তারপর আবার নেমে এসে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ঘুমিয়ে পড়ল।

ইঞ্জিনিয়ার শহরের দিকে নেমে এলেন। প্রধান চত্বরটা ফাঁকা—যেমন ফাঁকা ছিল তিনি যে রাস্তাগুলো পেরিয়ে এসেছেন। দূরে, নদীর দুপাশে, নিচু কুয়াশা বনের ওপর ভেসে ছিল। গরমটা খাড়া হয়ে নেমে আসছিল, প্রায় উল্লম্বভাবে। দ’আরাস্ত ছায়ার খোঁজে চারপাশে তাকালেন। তখন তিনি দেখলেন—একটা বাড়ির ছাউনির নিচে এক খাটো মানুষ তাকে ইশারা করছে। কাছে যেতেই তিনি চিনতে পারলেন—সোক্রাত।

“তা মঁসিয়ে দ’আরাস্ত, অনুষ্ঠানটা কেমন লাগল?”

দ’আরাস্ত বললেন, কুটিরের ভেতরটা খুব গরম ছিল—তিনি বরং আকাশ আর রাতটাই বেশি পছন্দ করেন।

“হ্যাঁ,” সোক্রাত বললেন, “আপনাদের ওখানে তো শুধু প্রার্থনা—নাচটাচ কিছুই নেই।”

সোক্রাত হাত ঘষছিলেন, এক পায়ে লাফাচ্ছিলেন, নিজের চারপাশে ঘুরছিলেন আর দমফাটা হাসি হাসছিলেন।

“অসম্ভব! ওরা অসম্ভব!” তারপর কৌতূহলী দৃষ্টিতে দ’আরাস্তের দিকে তাকালেন:

— “আর আপনি—গির্জায় যান?”

— “না।”

— “তাহলে কোথায় যান?”

— “কোথাও না… জানি না।”

সোক্রাত তখনও হাসছিলেন। 

“অদ্ভুত! এক ভদ্রলোক—না কোনো গির্জা, না কিছুই!”

দ’আরাস্তও হেসে ফেললেন।

“হ্যাঁ, দেখছেন তো—নিজের জায়গাটাই খুঁজে পাইনি। তাই বেরিয়ে পড়েছি।”

— “থাকুন না আমাদের সঙ্গে, মঁসিয়ে দ’আরাস্ত… আপনাকে আমার ভালো লাগে।”

— “থাকতে তো চাই, সোক্রাত… কিন্তু আমি নাচতে পারি না।”

তাদের হাসির শব্দ ফাঁকা শহরের নীরবতায় প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল।

“আরে হ্যাঁ,” সোক্রাত হঠাৎ বলে উঠলেন, “একটা কথা ভুলে গেছি—মেয়র আপনার সঙ্গে দেখা করতে চায়। ক্লাবে খাচ্ছে এখন।”

কোনো আগাম ইঙ্গিত না দিয়ে তিনি হাসপাতালের দিকে রওনা দিলেন।

“কোথায় যাচ্ছন?” দ’আরাস্ত চিৎকার করে উঠলেন।

সোক্রাত নাক ডাকার ভান করলেন: “ঘুমোতে। একটু পরেই তো শোভাযাত্রা।” আধা-দৌড়ে দৌড়তে দৌড়তে আবার নাক ডাকার ভান করতে লাগলেন।

মেয়র আসলে দ’আরাস্তকে শোভাযাত্রা দেখার জন্য এক বিশেষ সম্মানের আসন দিতে চেয়েছিলেন। ইঞ্জিনিয়ারকে তা বোঝাতে বোঝাতে তিনি তাকে খাওয়ালেন মাংস-ভাতের এমন এক পদ—যা নাকি অলৌকিকভাবে পক্ষাঘাতগ্রস্তকেও হাঁটিয়ে তুলতে পারে। প্রথমে বসা হবে জজের বাড়ির বারান্দায়, গির্জার ঠিক সামনে—শোভাযাত্রা বেরোনো দেখার জন্য। তারপর যাওয়া হবে পৌরভবনে, সেই প্রধান রাস্তায়—যেটা গির্জার দিকে গিয়ে মিশেছে—ফেরার পথে অনুতাপকারীরা সেই পথেই আসবে। জজ আর পুলিশপ্রধান দ’আরাস্তের সঙ্গে থাকবেন; মেয়র নিজে অনুষ্ঠানে অংশ নিতে বাধ্য। পুলিশপ্রধান তখন সত্যিই ক্লাবঘরেই ছিলেন, এবং দ’আরাস্তের প্রতি একধরনের অতিরিক্ত সৌজন্যে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন—ঠোঁটে এক ক্লান্তিহীন হাসি, আর মুখে অবিরাম এমন সব কথা, যা বোঝা যায় না, কিন্তু নিঃসন্দেহে সদুদ্দেশ্যে বলা। দ’আরাস্ত বেরোতে গেলে তিনি তড়িঘড়ি এগিয়ে এসে পথ করে দিলেন—তার আগে আগে গিয়ে একে একে সব দরজা খুলে ধরে।

প্রচণ্ড রোদ, এখনও শহরটা ফাঁকা—দুজন মানুষ জজের বাড়ির দিকে এগোচ্ছিলেন। চারপাশের নীরবতায় প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল কেবল তাদের পায়ের শব্দ। কাছের এক রাস্তায় হঠাৎ একটা পটকা ফেটে উঠল, আর তার শব্দে ছাদের পর ছাদ থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে গেল টেকো-গলা উরুবুগুলো—ভারী আর হোঁচট-খাওয়া ভঙ্গিতে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই চারদিক থেকে ডজন ডজন পটকা ফাটতে শুরু করল; দরজাগুলো খুলে গেল, আর লোকজন ঘর থেকে বেরিয়ে এসে সরু রাস্তাগুলো ভরে তুলতে লাগল।

জজ তাঁর এই সামান্য বাড়িতে দ’আরাস্তকে স্বাগত জানাতে পেরে গর্ব প্রকাশ করলেন এবং নীল চুনকাম করা একটি সুন্দর বারোক শৈলীর সিঁড়ি দিয়ে তাঁকে উপরের তলায় নিয়ে গেলেন। চাতালে উঠতে উঠতে, দ’আরাস্তের পায়ের শব্দে দরজাগুলো খুলে যাচ্ছিল—সেখান থেকে উঁকি দিচ্ছিল কালো চুলের বাচ্চাদের মুখ, আর পরক্ষণেই চাপা হাসিতে মিলিয়ে যাচ্ছিল। অতিথি-কক্ষটি স্থাপত্যে সুন্দর, কিন্তু ভেতরে ছিল শুধু বেতের আসবাব আর বড় বড় পাখির খাঁচা—যেগুলো থেকে আসছিল একেবারে বধির করে দেওয়ার মতো কিচিরমিচির। যে বারান্দায় তারা গিয়ে বসলেন, সেখান থেকে দেখা যাচ্ছিল গির্জার সামনের ছোট্ট চত্বরটা। চত্বরটা এখন ধীরে ধীরে ভরে উঠছিল—অদ্ভুতভাবে নীরব, স্থির, যেন আকাশ থেকে নেমে আসা প্রায় দৃশ্যমান তাপের ঢলে জমে আছে। শুধু বাচ্চারাই দৌড়াদৌড়ি করছিল চারদিকে—হঠাৎ থেমে পটকা জ্বালাচ্ছিল, আর একটার পর একটা বিস্ফোরণের শব্দ ছড়িয়ে পড়ছিল। বারান্দা থেকে প্লাস্টার করা দেয়াল, নীল চুনকাম করা ডজনখানেক সিঁড়ি এবং নীল ও সোনালি রঙের দুটি মিনারসহ গির্জাটিকে আরও ছোট দেখাচ্ছিল।

হঠাৎ, গির্জার ভেতর থেকে অর্গানের সুর বিস্ফোরণের মতো ফেটে উঠল। ভিড়টা মুখ ঘুরিয়ে গির্জার প্রবেশপথের দিকে তাকাল, আর চত্বরের দুপাশে সরে দাঁড়াল। পুরুষেরা মাথার টুপি খুলে ফেলল; নারীরা হাঁটু গেড়ে বসল। দূর থেকে ভেসে আসা অর্গানের সেই সুর দীর্ঘক্ষণ ধরে শোভাযাত্রার তালে বাজতে লাগল। তারপর হঠাৎ বনের দিক থেকে এল এক অদ্ভুত শব্দ—পতঙ্গের ডানার মতো খসখসানি। এক ক্ষুদ্র বিমান—স্বচ্ছ ডানা, ভঙ্গুর কাঠামো—এই কালাতীত জগতের মধ্যে একেবারেই বেমানান—গাছের মাথার ওপর দিয়ে হঠাৎ আবির্ভূত হলো, একটু নেমে এলো চত্বরের দিকে, আর মাথা উঁচু করে তাকিয়ে থাকা লোকজনের ওপর দিয়ে কর্কশ ঘূর্ণি-ধ্বনি তুলে উড়ে গেল। তারপর বিমানটি ঘুরে গিয়ে মোহনার দিকে মিলিয়ে গেল।

কিন্তু গির্জার সেই ছায়ামাখা অন্ধকারে আবার এক অস্পষ্ট গোলমাল দৃষ্টি টানল। অর্গানের সুর থেমে গেছে—এখন তার জায়গা নিয়েছে তামার বাঁশি আর ঢোলের শব্দ—প্রবেশপথের ছাউনির নিচে অদৃশ্যভাবে বাজছে। কালো সারপ্লিসে (ধর্মীয় বিশেষ পোশাক) ঢাকা অনুতাপকারীরা একে একে গির্জা থেকে বেরিয়ে চত্বরের সামনে এসে জড়ো হল, তারপর ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নামতে শুরু করল। তাদের পেছনে এল সাদা পোশাকের অনুতাপকারীরা, লাল আর নীল পতাকা হাতে; তারপর দেবদূতের সাজে একদল বালক, ‘চিলড্রেন অব মেরি’-র—ছোট, কালো, গম্ভীর মুখ। আর সবশেষে—বহুরঙা এক শোভাধারে, ঘামে ভেজা গাঢ় স্যুট পরা গণ্যমান্যদের কাঁধে—স্বয়ং যিশুর প্রতিমা: হাতে নলখাগড়া, মাথায় কাঁটার মুকুট, রক্তাক্ত, টলতে টলতে—চত্বরের সিঁড়ি ভরে থাকা জনতার ওপর ঝুঁকে।

যখন শোভাধারটি সিঁড়ির নিচে এসে পৌঁছাল, তখন এক মুহূর্তের বিরতির ফাঁকে অনুতাপকারীরা নিজেদের কোনো রকমভাবে শৃঙ্খলায় গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল। ঠিক তখনই দ’আরাস্ত দেখতে পেলেন রাঁধুনিকে। সে গির্জার চত্বর থেকে বেরিয়ে এসেছিল—বুক উন্মুক্ত, মাথার ওপর এক বিশাল আয়তাকার পাথর, যা কর্কের বৃত্তের ওপর ভর করে আছে। ছোট, পেশিবহুল দুই বাহুর বক্রতায় পাথরটি নিখুঁত ভারসাম্যে রেখে, দৃঢ় পদক্ষেপে সে সিঁড়ি নামছিল। শোভাধারের পেছনে গিয়ে দাঁড়াতেই শোভাযাত্রা আবার চলতে শুরু করল। প্রবেশপথ থেকে বেরিয়ে এল বাদ্যকররা—রঙিন জ্যাকেট, ফিতা জড়ানো পিতলের বাঁশিতে প্রাণপণে ফুঁ দিচ্ছিল। দ্রুত তালের সুরে অনুতাপকারীরা গতি বাড়াল, আর চত্বর থেকে বেরিয়ে এক রাস্তায় ঢুকে পড়ল। শোভাধারটি তাদের পিছু পিছু অদৃশ্য হয়ে গেলে আর দেখা গেল না—শুধু রাঁধুনি আর শেষ দিকের কয়েকজন বাদ্যকর। তাদের পেছনে, পটকার বিস্ফোরণের মধ্যে ভিড়ও এগোতে শুরু করল। সেই সময়ই, পিস্টনের ধাতব গর্জন তুলে বিমানটি আবার ফিরে এলো শেষ দিকের দলগুলোর ওপর দিয়ে। দ’আরাস্ত তখন শুধু তাকিয়ে ছিলেন রাঁধুনির দিকে—সে এখন গলির ভেতর মিলিয়ে যাচ্ছে, আর হঠাৎ মনে হলো, কাঁধ যেন একটু নুয়ে পড়ছে। তবে এই দূরত্ব থেকে তিনি স্পষ্ট দেখতে পারছিলেন না।

ফাঁকা রাস্তাগুলো অতিক্রম করে, বন্ধ দোকান আর তালাবন্ধ দরজার মাঝে, জজ, পুলিশপ্রধান আর দ’আরাস্ত তখন পৌরভবনের দিকে এগোলেন। যত তারা ব্যান্ডের সুর আর পটকার বিস্ফোরণ থেকে দূরে সরে যাচ্ছিল, ততই নীরবতা আবার শহরটিকে গ্রাস করতে শুরু করছিল; ইতিমধ্যেই কয়েকটি উরুবু ফিরে এসে ছাদের ওপর তাদের সেই স্থায়ী স্থান দখল করছিল, যেন চিরকাল ওটাই ওদের জায়গা।

পৌরভবনটির মুখ করে একটি সরু কিন্তু দীর্ঘ রাস্তা—যা শহরের প্রান্তিক অঞ্চলগুলিকে গির্জার চত্বরের সঙ্গে যুক্ত করে—আপাতত ছিল একেবারেই জনশূন্য। ভবনের বারান্দা থেকে যতদূর চোখ যায়, দেখা যাচ্ছিল শুধু এক ভাঙাচোরা রাস্তা—সাম্প্রতিক বৃষ্টিতে এখানে-ওখানে জমে থাকা কাদাজল। সূর্য খানিকটা নেমে এসেছে, তবু রাস্তার বিপরীত দিকের অন্ধ দেয়ালগুলোকে এখনো তীব্র আলো কুরে খাচ্ছিল।

তারা অনেকক্ষণ অপেক্ষা করল—এতক্ষণ, যে সামনের দেয়াল থেকে সূর্যের তীব্র প্রতিফলনের দিকে তাকাতে তাকাতে দ’আরাস্ত আবারও অনুভব করলেন তার ক্লান্তি আর মাথা-ঘোরা।  ফাঁকা রাস্তা আর খালি বাড়িগুলো এক সঙ্গে তাঁকে টানছিল, আবার বিরক্তিও জাগাচ্ছিল।  আবারও তিনি এই দেশ থেকে পালাতে চাইলেন; আর একই সঙ্গে মাথায় ভেসে উঠল সেই বিশাল পাথর—তিনি চাইছিলেন, এই পরীক্ষা যেন শেষ হয়। তিনি ঠিক করেছিলেন নিচে নামবেন আর খোঁজ নেবেন। কিন্তু ঠিক তখনই গির্জার ঘণ্টাগুলো সজোরে বেজে উঠল; একই সঙ্গে রাস্তার অন্য প্রান্তে, বাঁ দিকে, হঠাৎ তুমুল হট্টগোল ফেটে পড়ল, আর ফুটে উঠল উত্তাল জনসমুদ্র। দূর থেকে দেখা যাচ্ছিল—শোভাধারের চারপাশে তীর্থযাত্রী আর অনুতাপকারীরা একাকার; পটকা বিস্ফোরণ আর উল্লাসধ্বনির মধ্যে তারা সরু রাস্তায় এগোচ্ছিল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই রাস্তা কানায় কানায় ভরে গেল—পৌরভবনের দিকে এগোতে লাগল এক অবর্ণনীয়  বিশৃঙ্খলায়; যেখানে বয়স, বর্ণ আর পোশাক সব মিলেমিশে এক বর্ণিল স্রোতে প্রবাহিত, চোখ আর চিৎকারে ভরা মুখে ছড়িয়ে, আর ভেতর থেকে বর্শার মতো অসংখ্য মোমবাতি উঁচু হয়ে দ্যুতি ছড়াচ্ছিল দিনের দগ্ধ আলোয়। কিন্তু যখন তারা কাছাকাছি এল, আর ভিড় বারান্দার নিচে এমন ঘন হয়ে উঠল যে যেন দেয়াল বেয়ে ওপরে উঠে আসছে, তখন দ’আরাস্ত দেখলেন—রাঁধুনি সেখানে নেই।

এক ঝটকায়, কোনো ক্ষমা না চেয়ে, তিনি বারান্দা আর ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলেন, সিঁড়ি বেয়ে দ্রুত নেমে এসে মুহূর্তেই রাস্তায় দাঁড়ালেন—ঘণ্টাধ্বনি আর পটকার বিস্ফোরণের গর্জনের মাঝে। সেখানে তাঁকে লড়তে হল উচ্ছ্বসিত ভিড়ের সঙ্গে—মোমবাতি হাতে লোকজন আর কালো সারপ্লিসে ঢাকা অনুতাপকারীদের ঠেলে। কিন্তু অপ্রতিরোধ্য এক টানে, নিজের সমস্ত জোরে জনস্রোতের বিপরীতে ঠেলে এগোতে এগোতে, তিনি নিজের জন্য পথ কেটে নিলেন—এতটাই বেগে যে, হঠাৎ ভিড় ফুঁড়ে বেরোতেই টলতে টলতে প্রায় পড়ে যাচ্ছিলেন। রাস্তার একেবারে শেষপ্রান্তে, ভিড়ের পেছনে এসে যখন তিনি মুক্ত হলেন, তখন দগ্ধ দেয়ালে হেলে দাঁড়িয়ে শ্বাস সামলে নিলেন। তিনি শ্বাস স্বাভাবিক হওয়ার জন্য অপেক্ষা করলেন। তারপর আবার হাঁটা শুরু করলেন। ঠিক তখনই, একদল লোক রাস্তায় ঢুকে পড়ল। সামনে যারা ছিল, তারা পেছন দিকে হাঁটছিল; আর দ’আরাস্ত দেখলেন, তারা রাঁধুনিকে ঘিরে রেখেছে।

রাঁধুনি স্পষ্টই চরম ক্লান্তিতে ভেঙে পড়েছে। সে বারবার থামছিল—তারপর আবার সেই বিশাল পাথরের নিচে ঝুঁকে, একটু দৌড়োচ্ছিল—বন্দরের কুলি বা মালখালাসিদের মতো ছোট ছোট দ্রুত পায়ে—মেহনতের সেই আধা দৌড়, পায়ের পুরো পাতা সজোরে মাটিতে ফেলে। তার চারপাশে, গলে পড়া মোম আর ধুলায় মলিন সারপ্লিসে ঢাকা অনুতাপকারীরা, থামলেই, তাকে উৎসাহ দিচ্ছিল। বাঁ দিকে তার ভাই—চুপচাপ—কখনো হাঁটছিল, কখনো দৌড়োচ্ছিল। দ’আরাস্তের মনে হলো, তাদের আর তাঁর মাঝের এই অল্প দূরত্বটুকু পেরোতেই যেন অন্তহীন সময় লেগে যাচ্ছে। প্রায় সমান্তরালে এসে রাঁধুনি আবার থামল। চারদিকে নিস্তেজ চোখে তাকাল। দ’আরাস্তকে দেখে—তবে যেন চিনতে না পেরে—তার দিকেই মুখ ফিরিয়ে স্থির হয়ে রইল। এখন তার মুখ তেলতেলে, ময়লা ঘামে ঢেকে গেছে; রঙ ফ্যাকাসে ধূসর। দাড়িতে লালার সরু রেখা জমে আছে; শুকনো বাদামি ফেনা ঠোঁট দুটোকে যেন জুড়ে রেখেছে। সে হাসার চেষ্টা করল। কিন্তু বোঝার ভারে স্থির দাঁড়িয়ে থেকে তার সারা শরীর কাঁপছিল—কাঁধ ছাড়া—সেখানে পেশিগুলো শক্ত হয়ে গিঁট বেঁধে আছে, যেন খিঁচ ধরে গেছে। ভাইটি, যে দ’আরাস্তকে চিনেছিল, শুধু বলল,

—“ও আগেই একবার পড়ে গেছে।”

আর সোক্রাত—কোথা থেকে হঠাৎ এসে—তাঁর কানে ফিসফিস করে বললেন,

—“খুব নেচেছে, মঁসিয়ে দ’আরাস্ত, সারা রাত। খুব ক্লান্ত।”

রাঁধুনি আবার এগোতে শুরু করল—তার সেই খাপছাড়া, ছন্দভাঙা ছোট দৌড়ে—এগোবার জন্য নয়—যেন পিষে ফেলা সেই বোঝা থেকে পালাতে চাইছে—এমন এক মরিয়া আশায় যেন চলার মধ্যেই কোনোভাবে তার ভার হালকা হয়ে যাবে। কিভাবে যেন দ’আরাস্ত এসে পড়লেন তার ডান পাশে। তিনি রাঁধুনির পিঠে আলতো করে হাত রাখলেন, আর তার সঙ্গে সঙ্গে হাঁটতে লাগলেন—ছোট ছোট, তাড়াহুড়ো অথচ ভারী পায়ে। রাস্তার ওপারে শোভাধার তখন আর দেখা যাচ্ছে না; ভিড়—সম্ভবত এখন চত্বর ভরে ফেলেছে—স্থির হয়ে আছে, আর এগোচ্ছে না। কয়েক সেকেন্ডের জন্য, ভাই আর দ’আরাস্তের মাঝখানে জায়গা পেয়ে, রাঁধুনি খানিকটা এগোতে পারল। খুব শিগগিরই, পৌরভবনের সামনে জড়ো হয়ে থাকা দলের সঙ্গে তার দূরত্ব কমে এল—মাত্র কুড়ি মিটার মতো। তবু আবার থামল সে। দ’আরাস্তের আলতো হাত এবার ভারী হয়ে উঠল।
 —চলো, আর একটু।

লোকটা কাঁপছিল; তার মুখ দিয়ে আবার লালা গড়িয়ে পড়তে লাগল, আর সারা শরীর থেকে যেন হঠাৎ করে ঘাম ফেটে বেরোচ্ছে। সে গভীর শ্বাস নিতে চাইল—হঠাৎ থেমে গেল। আবার নড়ল—তিন পা এগোল—টলে উঠল। হঠাৎ পাথরটা তার কাঁধ বেয়ে পিছলে নামল—মাংস কেটে—তারপর সামনে মাটিতে আছড়ে পড়ল; আর ভারসাম্য হারিয়ে রাঁধুনি পাশের দিকে ধসে পড়ল। যারা তাকে উৎসাহ দিচ্ছিল, তারা চিৎকার করে লাফিয়ে সরে গেল। একজন তাড়াতাড়ি কর্কের বৃত্তটা তুলে নিল, আর বাকিরা পাথরটা ধরে ফেলল—আবার সেটা তার ওপর তুলে চাপিয়ে দেওয়ার জন্য।

দ’আরাস্ত ঝুঁকে পড়ে তার কাঁধ থেকে রক্ত আর ধুলো হাত দিয়ে মুছে দিচ্ছিলেন; আর সেই ছোটখাটো মানুষটা তখন মাটিতে মুখ ঠেকিয়ে হাঁপাচ্ছিল। সে কিছুই শুনছিল না, নড়ছিলও না। প্রতিটা শ্বাস নিতে গিয়ে তার মুখ এমনভাবে হাঁ হয়ে যাচ্ছিল, যেন এটাই শেষ নিশ্বাস।

দ’আরাস্ত তাকে জাপটে তুলে নিলেন—একেবারে শিশুর মতো সহজে। বুকের সঙ্গে চেপে ধরে দাঁড় করিয়ে রাখলেন। নিজের পুরো দেহ ঝুঁকিয়ে, তার মুখের কাছে মুখ নিয়ে কথা বলতে লাগলেন—যেন নিজের শক্তিটুকু তার ভেতর ঢেলে দিতে চাইছেন।

কিছুক্ষণ পর, রক্তে-ধুলোয় মাখা মানুষটা তার থেকে আলগা হয়ে এল। মুখে তখন উদভ্রান্ত শূন্যতা। টলতে টলতে আবার পাথরের দিকে এগোল—যেটা অন্যরা সামান্য তুলে ধরেছিল। কিন্তু হঠাৎ থেমে গেল। পাথরটার দিকে ফাঁকা চোখে তাকিয়ে রইল—তারপর ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল। দুহাত শরীরের পাশে ঝুলে পড়ল। তারপর ঘুরে দাঁড়াল দ’আরাস্তের দিকে। তার ভেঙে যাওয়া মুখ বেয়ে নিঃশব্দে গড়িয়ে পড়ছিল বড় বড় অশ্রু। সে কিছু বলতে চাইছিল—বলছিলও—কিন্তু ঠোঁট ঠিক করে শব্দ গড়তে পারছিল না।

—আমি কথা দিয়েছিলাম…

তারপর, প্রায় ভেঙে পড়া গলায়—

—“আহ… ক্যাপিটেন… আহ… ক্যাপিটেন…”

বাকিটা কান্নায় ডুবে গেল।

ঠিক তখনই তার ভাই পেছন থেকে এসে তাকে জড়িয়ে ধরল; আর রাঁধুনি, কাঁদতে কাঁদতে, তার গায়ে ঢলে পড়ল—পুরো ভেঙে পড়ে, মাথা পেছনে হেলানো।

দ’আরাস্ত তার দিকে তাকিয়ে রইলেন—কোনো শব্দ খুঁজে পেলেন না। তারপর দূরের ভিড়ের দিকে ফিরলেন, যারা আবার চিৎকার শুরু করেছে। হঠাৎই, তিনি কর্কের চাকতিটা ধরে থাকা হাতগুলো থেকে ছিনিয়ে নিলেন আর পাথরের দিকে সোজা এগিয়ে গেলেন। অন্যদের ইশারায় তা তুলতে বললেন আর প্রায় বিনা কষ্টেই নিজের কাঁধে তুলে নিলেন। পাথরের ভারে সামান্য ঝুঁকে, কাঁধ গুটিয়ে, অল্প হাঁপাতে হাঁপাতে, তিনি নিজের পায়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন—পেছনে রাঁধুনির কান্না শুনতে শুনতে।

তারপর তিনি চলতে শুরু করলেন—একটি শক্ত, দমে না-যাওয়া পদক্ষেপে। রাস্তার শেষপ্রান্তে ভিড় পর্যন্ত যে দূরত্ব, তা তিনি বিন্দুমাত্র না থেমে পেরিয়ে গেলেন, আর প্রথম সারিগুলোকে দৃঢ়ভাবে চিরে এগোলেন—তারা নিজেরাই সরে দাঁড়িয়ে ছিল।

তিনি ঢুকে পড়লেন চত্বরে—ঘণ্টার গর্জন আর বিস্ফোরণের শব্দের ভেতর—দুপাশে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা দর্শকদের মাঝখান দিয়ে, যারা বিস্ময়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে ছিল, হঠাৎই স্তব্ধ। তিনি একই তাড়নায় এগিয়ে চললেন, আর ভিড় তাঁর সামনে পথ খুলে দিতে লাগল—গির্জার দিকে।

পাথরের ভার তখন ধীরে ধীরে তাঁর মাথা আর ঘাড় পিষে দিতে শুরু করেছে—তবু তিনি গির্জাটাকে দেখতে পেলেন, আর প্রাঙ্গণে যেন অপেক্ষা করে থাকা শোভাধারটিকেও। তিনি তার দিকেই এগোচ্ছিলেন—চত্বরের প্রায় মাঝামাঝি পেরিয়েও গিয়েছিলেন—হঠাৎই, কোনো কারণ না জেনেই, বাঁ দিকে মোড় নিলেন। গির্জার পথ থেকে সরে গেলেন—ফলে তীর্থযাত্রীরা বাধ্য হয়ে তাঁর মুখোমুখি হয়ে পড়ল। পেছনে তিনি দ্রুত পায়ের শব্দ শুনতে পেলেন।

 তাঁর সামনে চারদিক থেকে মুখ হাঁ হয়ে উঠছিল—চিৎকারে ভরা। তিনি বুঝতে পারছিলেন না তারা কী বলছে, যদিও বারবার ছুঁড়ে দেওয়া সেই পর্তুগিজ শব্দটা যেন চিনতে পারছিলেন। হঠাৎই সোক্রাত তাঁর সামনে এসে পড়লেন—চোখ বিস্ফারিত, এলোমেলো কথা বলতে বলতে, আর তাঁর পেছনে গির্জার পথ দেখিয়ে ইশারা করছেন।

“গির্জায়! গির্জায়!”—এই ছিল সোক্রাত আর ভিড়ের চিৎকার।

তবু দ’আরাস্ত নিজের গতিতেই এগিয়ে চললেন। সোক্রাত তখন সরে গেলেন—কৌতুককর ভঙ্গিতে হাত তুলে আকাশের দিকে—আর ভিড় ধীরে ধীরে স্তব্ধ হয়ে এল।

দ’আরাস্ত যখন সেই প্রথম গলিটায় ঢুকলেন—যেটা দিয়ে তিনি আগে রাঁধুনির সঙ্গে এসেছিলেন, আর জানতেন যে সেটাই নদীর দিকের পাড়াগুলোতে গিয়ে মেশে—তখন  তাঁর পেছনে চত্বরটা মিলিয়ে গেল এক অস্পষ্ট গুঞ্জনে।

এখন পাথরটা মাথার ওপর যন্ত্রণাদায়ক ভারে চেপে বসেছিল, আর তা সামলাতে তাঁর দুই শক্তিশালী বাহুর সমস্ত জোর লাগছিল। প্রথম গলিগুলোতে পৌঁছতেই—যেগুলোর ঢাল ছিল পিচ্ছিল—তাঁর কাঁধের পেশিগুলো ইতিমধ্যেই গিঁট বেঁধে আসছিল। তিনি থামলেন, কান পেতে রইলেন। তিনি একা। কর্কের আসনে পাথরটাকে ভালো করে স্থির করে নিয়ে, সতর্ক কিন্তু এখনও দৃঢ় পায়ে তিনি নেমে যেতে লাগলেন—কুঁড়েঘরের পাড়ার দিকে।

সেখানে পৌঁছতেই তাঁর শ্বাস ভেঙে আসতে শুরু করল, পাথরটাকে জড়িয়ে থাকা বাহুগুলো কাঁপছিল। তিনি গতি বাড়ালেন—অবশেষে পৌঁছে গেলেন সেই ছোট্ট চত্বরে, যেখানে রাঁধুনির কুঁড়েঘরটা দাঁড়িয়ে।

দৌড়ে গিয়ে এক লাথিতে দরজা খুলে ফেললেন, আর এক ঝটকায় পাথরটা ছুড়ে ফেললেন ঘরের মাঝখানে—সেই আগুনের ওপর, যা এখনও লালচে দপদপ করছিল। আর সেখানে—হঠাৎই তিনি সোজা হয়ে দাঁড়ালেন—সমগ্র উচ্চতায়, এক মুহূর্তে যেন বিশাল হয়ে উঠলেন—হাঁপাতে হাঁপাতে মরিয়া টানে টানে টেনে নিতে লাগলেন সেই দারিদ্র্য আর ছাইয়ের গন্ধ—যেটা তিনি চিনতে পারলেন। তিনি অনুভব করলেন, নিজের ভেতরে ধীরে ধীরে ফুলে উঠছে এক অদ্ভুত, অন্ধকার, হাঁপ ধরা আনন্দের ঢেউ—যার কোনো নাম তিনি খুঁজে পেলেন না।

কুঁড়েঘরের লোকেরা ফিরে এলে, তারা দেখল—দ’আরাস্ত দাঁড়িয়ে আছেন, পেছনের দেয়ালে হেলান দিয়ে, চোখ বন্ধ। ঘরের মাঝখানে, আগুনের জায়গায়, পাথরটা অর্ধেক গেঁথে আছে—ছাই আর মাটিতে ঢাকা। তারা দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে রইল—ভেতরে এগোল না—নিঃশব্দে দ’আরাস্তের দিকে তাকিয়ে, যেন তাঁকে প্রশ্ন করছে। কিন্তু তিনি চুপ। তখন ভাইটি রাঁধুনিকে পাথরের কাছে নিয়ে এল। সে ধীরে মাটিতে ঢলে পড়ল। ভাইটিও বসল, অন্যদের ইশারা করল। বৃদ্ধা এল, রাতের সেই মেয়েটিও—কিন্তু কেউই দ’আরাস্তের দিকে তাকাল না। তারা সবাই পাথরটাকে ঘিরে গোল হয়ে বসে রইল—নীরব। শুধু নদীর চাপা কলধ্বনি, ভারী বাতাস ভেদ করে তাদের কাছে ভেসে আসছিল। দ’আরাস্ত অন্ধকারে দাঁড়িয়ে, কিছু না দেখে শুধু শুনছিলেন সেই জলের শব্দ যা তাঁর ভেতর ভরে দিচ্ছিল এক উচ্ছ্বসিত, উত্তাল আনন্দ। চোখ বন্ধ রেখেই, তিনি যেন আনন্দের সঙ্গে নিজের শক্তিকে উদ্‌যাপন করলেন—আর স্বীকার করলেন জীবনের এক নতুন শুরু।

ঠিক তখনই, খুব কাছ থেকে যেন একটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেল। ভাইটি রাঁধুনির কাছ থেকে একটু সরে, আধা ঘুরে—দ’আরাস্তের দিকে না তাকিয়েই—খালি জায়গাটা দেখিয়ে বলল—

— “এসো, বসো—আমাদের সঙ্গে।”

0 Comments
Leave a reply