সত্য প্রসঙ্গে

লিখেছেন:লেভ শেস্তভ
লেভ শেস্তভ বহুপঠিত নয়, কিন্তু যাঁরা পড়েছেন তাঁরা তাঁর লেখার সঙ্গে পক্ষে-বিপক্ষে তর্ক-বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছেন অবশ্যম্ভাবীভাবে, সে তর্ক পাঠকের নিজের মনের ভিতরে চলতে থাকলেও নিস্তার দেয় না। বৈজ্ঞানিক মান পদ্ধতি বলে শ্রেয় করে তোলা কাঠামো থেকে শুরু করে যুক্তিসঙ্গতি, এমনকি যুক্তি স্বয়ং এখানে সংশয়াত্মক বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আছে। বিশ শতকের প্রথম দশকে লেখা তাঁর প্রবন্ধ থেকে এই নির্বাচিত অংশটি বাংলা অনুবাদে হাজির করা হলো বাংলা ভাষার পাঠকদের সঙ্গে তাঁর একটা প্রাথমিক পরিচয় তৈরির জন্য।

 

সত্য কী?

সংশয়বাদীরা দাবি করেন যে সত্য বলে কিছু নেই এবং থাকতেও পারে না। এই দাবি আধুনিক মগজকে এতোটাই গ্রাস করে বসে আছে যে আমাদের সময়ে একমাত্র যে দর্শন ছড়াতে পেরেছে তা হলো কান্ট-এর দর্শন, যে দর্শন সংশয়বাদকেই তার প্রস্থানবিন্দু হিসেবে বেছে নিয়েছে। ‘The Critique of Pure Reason’-এর প্রথম সংস্করণের ভূমিকাটা একটু মন দিয়ে পড়ে দেখুন, আপনার আর কোনো সন্দেহ থাকবে না যে ‘সত্য কী?’ এই প্রশ্ন নিয়ে কান্ট-এর কোনো মাথাব্যথা নেই। কান্ট কেবলমাত্র যে সমস্যার সমাধান করতে চেয়েছেন তা হলো এই: বস্তুগত সত্য খুঁজে পাওয়া অসম্ভব বলে যদি কেউ নিশ্চিত হয়ে যায়, তখন তার কী করণীয় থাকে? ইচ্ছামতো ও অপ্রমাণিত দাবিতে সাজানো যতো পুরোনো অধিবিদ্যা, যা কোনো সমালোচনা সহ্য করতে পারে না, সে-সব কান্ট-এর বিরক্তির কারণ হয়ে উঠেছিলো। আর তাই দর্শনের শিক্ষক হিসেবে যেসব অবৈজ্ঞানিক মতবাদ তাঁকে পরিবেশন করতে হতো, সে-সব-কিছুকে তিনি ঝেঁটিয়ে বিদায় করতে চেয়েছিলেন। তা করার জন্য যদি সংশয়বাদ-এর আপেক্ষিক বৈধতা স্বীকার করে নিতে হয়, তাতেও তিনি পিছপা ছিলেন না। কিন্তু তা বলে সংশয়বাদীদের আত্মপ্রত্যয় বা কান্ট-এর শ্রদ্ধাভক্তি আমাদের জন্য কোনোভাবেই বাধ্যতামূলক নয়। আর সবকিছুর পরেও, কান্ট যে সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব নিজেই নিয়েছিলেন, তা পুরোপুরি পালন করে উঠতে পারেননি। যেমন ধরা যাক, সত্য কী তা যদি আমরা না-ই জানতে পারি, তাহলে ঈশ্বরের অস্তিত্ব ও আত্মার অমরত্ব বিষয়ক স্বীকার্যগুলোর আর কী মূল্য অবশিষ্ট থাকে? খৃস্টধর্ম সহ যে-কোনো বিদ্যমান ধর্মের ব্যাখ্যা বা ন্যায্যতা-প্রতিপাদন আমরা কীভাবে করতে পারি? প্রকৃতির নিয়ম সংক্রান্ত আমাদের বৈজ্ঞানিক ধারণাগুলোর সঙ্গে গসপেল যদিও কিছুই মেলে না, তবু ওই গসপেল-এ এমনকিছু নেই যা নিজে থেকেই যুক্তিবিরোধী। অলৌকিক ঘটনা অসম্ভব বলে তাতে আমরা বিশ্বাস করি না--- এমনটাতো নয়। বরং খুব সাদামাটা সাধারণ জ্ঞানেও এটা দিনের মতো পরিষ্কার যে জগতের ভিত্তিমূলে থাকা প্রাণ স্বয়ং হলো অলৌকিকতম অলৌকিক। আর দর্শনের কাজ যদি অলৌকিক-এর সম্ভাবনা প্রতিপাদন করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে যায়, বহু যুগ আগেই তার সমস্ত কর্তব্য ভালোয় ভালোয় মিটে যেতো। গোটা ঝামেলাটা হলো এখানে যে মানুষ কেবল দৃশ্যমান অলৌকিকে সন্তুষ্ট নয়, আর বহু অলৌকিক যে ইতিমধ্যে ঘটে গেছে তা থেকে এমন কোনো সিদ্ধান্তও টানা যায় না যে অন্য আরো-সব অলৌকিক, যা ছাড়া নেহাত অস্তিত্বটুকুও টিকিয়ে রাখা প্রায়শই অসম্ভব, সে-গুলো-ও ঠিক সময় মতো ঘটতে থাকবে। মানুষের জন্ম হচ্ছে--- নিঃসন্দেহে তা মহা অলৌকিক। একটা সুন্দর জগৎ আছে--- তা-ও অলৌকিকতম অলৌকিক। কিন্তু তা থেকে কি এমন সিদ্ধান্তে আসা যায় যে কবর থেকে মানু, আবার উঠে দাঁড়াবে, বা স্বর্গের নন্দনকানন তাদের জন্য তৈরি রাখা হবে? গসপেল-কে যারা শ্রদ্ধাভক্তি করেন তাঁরাও আজ আর খুব লাজারাস-এর মুত্যু থেকে জেগে ওঠায় বিশ্বাস করেন না, তাঁরা যে সাধারণভাবে অলৌকিকের সম্ভাবনাকে নাকচ করবেন তা নয়, বরং আগে থেকে কোনো অলৌকিক ঘটা সম্ভব নাকি সম্ভব নয় তা স্থির করতে না পেরে তাঁরা চাইবেন কোনো অলৌকিক ঘটে যাওয়ার পর তার বিচার করতে। ঘটে যাওয়া কোনো অলৌকিক ঘটনাকে তাঁরা নির্দ্বিধায় মেনে নেবেন, কিন্তু যে অলৌকিক এখনও ঘটেনি তা নিয়ে সন্দেহ পোষণ করবেন, আর সন্দেহ যতো বাড়বে ততোই আরো তীব্রভাবে তার আকাঙ্ক্ষাও বাড়বে। পৃথিবীতে ভালো শেষাবধি জিতবেই বলে (এর থেকে চূড়ান্ত অলৌকিক আর কী ঘটতে পারে!), বা প্রগতি সর্বদা ঘটে চলেছে বলে, বা পোপ সর্বদাই সঠিক বলে (এ-দুটিও কোনো মাত্রায় কম অলৌকিক নয়!) বিশ্বাস করায় তো দায়-খরচ কিছু নেই কারণ সবকিছুর পরেও মানুষ এইসব ভালো বা প্রগতি বা পোপের অমলিন গুণাবলী নিয়ে যথেষ্টই নির্বিকার এখনও। বরং অনেক কঠিন, বা প্রায় অসম্ভবই বলা চলে, প্রিয় ও ঘনিষ্ঠ কোনো মানুষের মরদেহের পাশে দাঁড়িয়ে এমনটা বিশ্বাস করতে পারা যে স্বর্গ থেকে কোনো দেবদূত উড়ে এসে এ মরদেহে আবার প্রাণ জাগিয়ে তুলবে, যদিও মৃতকে পুনরুজ্জীবিত করার চেয়েও কোনো মাত্রায় অলৌকিক নয় এমন ঘটনা জগতে আকছার ঘটে চলেছে।

সুতরাং সংশয়বাদীরা যখন দাবি করেন যে সত্য বলে কিছু নেই, তখন তাঁরা ভুল করেন। সত্য আছে, কিন্তু তার পূর্ণাবয়ব সম্পর্কে আমরা কেউই কিছু জানি না, আর যতটুকু আমরা জানি তাকেও সূত্রায়িত করে হাজির করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়: যা ঘটলো তা কেন ঘটলো, কেন অন্যকিছু ঘটলো না, তা ঘটা কি অনিবার্য ছিলো, নাকি সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছুও ঘটতে পারতো, এগুলো আমাদের পক্ষে বলা সম্ভব নয়। একদা এমনটা নির্ধারণ করা হয়েছিলো যে বাস্তবতা অনিবার্যতার নিয়ম মেনে চলে, কিন্তু ডেভিড হিউম৫০ ব্যাখ্যা করলেন যে অনিবার্যতার বা বাধ্যবাধকতার ধারণাটিই বিষয়ীগত দৃষ্টিভঙ্গির উপর নির্ভরশীল, তাই তাকে ভ্রমাত্মক বলে বাতিল করাই শ্রেয়। হিউম-এর টানা সিদ্ধান্তটিকে বাদ দিয়ে তাঁর মূল ভাবনাটা  নিয়ে ইমানুয়েল কান্ট আরো এগিয়ে গেলেন। সর্বজনীনতা ও অনিবার্যতার চরিত্রধারী যে কোনো নির্ধারণই আমাদের মনস্তাত্ত্বিক গঠনের কল্যাণেই ওই চরিত্র অর্জন করে। যে সমস্ত ক্ষেত্রে আমাদের নির্ধারণের বিষয়গত মূল্য নিয়ে আমরা খুবই নিশ্চিত হয়ে থাকি, সেখানে আমাদের ওই নিশ্চয়তা নেহাতই খাঁটি বিষয়ীগত চরিত্রের, যতোই দৃশ্যজগতে তা অপরিবর্তনীয় ও অনঘ বলে মনে হোক না কেন। হিউম-এর টানা সিদ্ধান্ত যে কান্ট গ্রহণ করেননি তা অনেকেই জানেন: হিউম তাঁর অনিবার্যতার ধারণার জোরে যেভাবে আমাদের বৌদ্ধিক লেনদেন-এর জমি থেকে ভ্রমের আগাছা নির্মূল করতে চেয়েছিলেন, কান্ট তা করার কোনো চেষ্টা করেননি, শুধু তাই নয়, বরং কান্ট ঘোষণা করেছিলেন যে তেমন কোনো প্রচেষ্টা নেহাতই অসম্ভব। প্রায়োগিক যুক্তি কান্ট-কে বলেছিলো যে আমাদের বিচারপ্রক্রিয়া তার শিকড়মূলেই দূষিত হয়ে থাকলেও প্রপঞ্চ (phenomenon)-র জগতে সেই বিচারসমূহের অপরিবর্তনীয়তা খুব কাজে দেয়, অর্থাৎ জন্ম ও মৃত্যুর মধ্যবর্তী পর্ব নির্বাহ করতে সাহাষ্যে আসে। জন্মের আগেও যদি মানুষ কোনো যাপন করে এসে থাকে (যেননটা প্লেটো মনে করতেন) আর মৃত্যুর পরেও যদি কোনো যাপন থেকে থাকে, তাহলে সেই অন্য জগতে মনুষ্য ‘সত্য’-গুলো যে ছিলো বা অবশ্যম্ভাবীভাবে থাকবে, তা নয়। যে-সব সত্য আছে, আর সত্য আদৌ আছে কিনা, তা কান্ট কেবল অনুমান করেছেন, আর সিদ্ধান্ত টানার ক্ষেত্রে যুক্তি অবহেলা করতে তৈরি থাকার কারণেই অনুমান করায় সফল হয়েছেন। তিনি হঠাৎই বাস্তব জগতকে বিচার করার ক্ষেত্রে বিশ্বাসকে প্রভূত অধিকার দিয়ে বসলেন। তাঁর মতো একজন দার্শনিকের বিশেষ পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে ছাড়া বিশ্বাসের পক্ষে এ অধিকার পাওয়া সম্ভব ছিলো না। কিন্তু যুক্তি যেখানে অপারগ, বিশ্বাস সেখানে কীভাবে কার্যকরী হতে পারে? আরো কুটিল একটা প্রশ্নও থেকে যায়: স্বতঃসিদ্ধ বলে যেগুলোকে স্বীকার করে নেওয়া হচ্ছে সেগুলো কি সেই একই মগজের দ্বারা উদ্ভাবিত নয়, যে মগজের সে অধিকারকে কান্ট-ই তাঁর প্রথম সমালোচনা (Critique)-য় নস্যাৎ করেছিলেন--- এ কি সংস্থার নাম পাল্টে পরবর্তীতে সব হৃত অধিকার আবার কড়ায়-গণ্ডায় ফিরিয়ে দেওয়া হলো না? খুব সম্ভবত তাই। আর তাহলে কি এর থেকে এটাই অনুসরণ করে না যে কান্ট অতো সাবধানে যে বাস্তব জগতকে প্রপঞ্চের জগৎ থেকে আলাদা করেছেন, সেই বাস্তব জগতে অনেক নতুন কিছু আমরা পেতে পারি, কিন্তু পুরোনো-ও কিছু কম পাবো না।

সাধারণভাবে স্পষ্ট যে এমন অনুমান করা খুবই ভুল হবে যে আমাদের জগৎ হলো এক মুহূর্তের জগৎ, অতি সংক্ষিপ্ত একটি স্বপ্ন, বাস্তব জীবনের সঙ্গে যা কোনোভাবেই মেলে না। এই অনুমান প্রথম প্লেটো ঘোষণা করেছিলেন, তার পরে ধর্মীয় ও দার্শনিক চিন্তাধারার বহু প্রতিনিধি তাকে আরো বিশদ করেছেন, লালন-পালন করেছেন। কিন্তু এই অনুমান কোনো তথ্যের ভিত্তিতে গড়ে ওঠেনি। তবু অস্বীকার করা যাবে না যে এই অনুমান খুবই মনোমুগ্ধকর। প্রায়শ যা ঘটে থাকে তা এখানেও ঘটেছে: যে মুহূর্তে কোনো মনোকামনায় শব্দের বিনিয়োগ ঘটানো হয়েছে, অতি তীক্ষ্ণ ও অতি কৌণিক এক অভিব্যক্তি ধারণ করার মধ্য দিয়েই তা তার নিজের সঙ্গে সমস্ত মিল হারিয়েছে। মৃত্যু-পরবর্তী প্রকৃত আদ্যজীবনের অন্তঃসার-ই প্লেটোর বিবেচনায় সমস্ত ধাতুসংকর থেকে নিষ্কাশিত পরম বিশুদ্ধ মঙ্গল, সর্বগুণের অন্তঃসার। কিন্তু সবকিছুর পরেও, সেই আদর্শ অস্তিত্বের পরম শূন্যতা প্লেটো নিজে নিরন্তর সহ্য করে যেতে পারেননি, আর তাই অনবরত তার মধ্যে এমন নানা উপাদানের স্বাদ যোগ করতে করতে গেছেন যা কোনোভাবেই আদর্শস্থানীয় নয়, কিন্তু যা তাঁর কথোপকথনের মধ্যে তীব্রতা ও আগ্রহের সঞ্চার করেছে। স্বয়ং প্লেটোকে পাঠ করার অবকাশ না হওয়ায় আপনি যদি তাঁর গুণমুগ্ধদের কোনো একজনের লেখা পাঠ করে তাঁর দর্শনের সঙ্গে পরিচিত হতে যান, নিঃসন্দেহে তার শূন্যতা আপনাকে হতচকিত করে দেবে। এ বিষয়ে নাতোর্প-এর সুপ্রসিদ্ধ মোটা বইটি পড়লেই আপনি দেখতে পাবেন প্লেটোর ‘বিশুদ্ধ’ মতবাদের মূল্য কতোটুকু। কথায় কথায় আমি এখানে সাধারণ নিয়ম হিসেবে কোনো বিখ্যাত দার্শনিকের ভাবনাসমূহ পরীক্ষা করার জন্য তাঁদের নিজেদের মূল লেখার সঙ্গে পরিচিত না হয়ে উঠে তাঁদের নানা শিষ্যবর্গ, বিশেষ করে বিশ্বস্ত ও কর্তব্যনিষ্ঠ শিষ্যবর্গের ব্যাখ্যা-আলোচনার উপর নির্ভর করার প্রক্রিয়া নিয়ে কিছু কথা বলতে চাই। সেই বিখ্যাত দার্শনিকের ব্যক্তিত্বের আকর্ষণ ও বিরল প্রতিভার বিচ্ছুরণ যখন অন্তর্হিত হয় আর ন্যাংটো ভূষণহীন ‘সত্য’-টাই কেবল পড়ে থাকে--- শিষ্যরা সবসময় বিশ্বাস করে যে তাদের গুরুর কাছেই সত্যটি ছিলো এবং সে সত্যের গা থেকে ডুমুর পাতার আবরণটিও খসিয়ে তারা সবার সামনে তাকে খুলেমেলে দেখাতে চায়--- আর তখনই দিনের আলোর মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে সর্বোত্তম দার্শনিকের মৌল ভাবনাগুলোর মূল্যও আসলে কতো কম। তা আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন নিষ্ঠাবান শিষ্যেরা যখন তাদের গুরুর প্রস্তাবগুলো থেকে সিদ্ধান্ত টানতে শুরু করে। মহান প্লেটো-বিশেষজ্ঞ নাতোর্প-এর পূর্বোল্লিখিত বইটি তাঁর গুরুর সমস্ত ভাবনাগুলোকে টেনে-হিঁচড়ে অসঙ্গতিতে পর্যবসিত করেছে। সেখানে উন্মোচিত করা হয়েছে যে প্লেটো আসলে একজন যুক্তিসম্মত নয়া-কান্টবাদী ছিলেন, সংকীর্ণমনা প্রতিভাধর ছিলেন, যাঁর সংকীর্ণতা ও অপরাপর সীমাবদ্ধতা শোধন করে ফ্রেইবুর্গ বা হেইডেলবার্গ-এর কারখানায় বিশুদ্ধ চেহারা দেওয়া হয়েছে। আরো উন্মোচিত করা হয়েছে যে বিশুদ্ধ চেহারার প্লেটো-ভাবনায় প্লেটোর জীবন ও জগৎ সম্পর্কে মনোভাব কণামাত্র প্রকাশিত হয় না। প্লেটোর কোনো অংশকে নয়, গোটা প্লেটোকে, তাঁর সমস্ত বৈপরীত্য ও যুক্তি-অসঙ্গতি সমেত, তাঁর সমস্ত দোষ ও গুণ সমেত, ধরতে হবে এবং তাঁর চমৎকার দিকগুলোর পাশাপাশি তাঁর খুঁতগুলোকেও মূল্য দিতে হবে, এমনকি হয়তো গুটিখানেক চমৎকারিত্বের জায়গা থেকে চোখ ফিরিয়ে রেখে আরো গুটিখানেক খুঁত যোগ করতে হবে। কারণ এই মানুষটি, যাঁর কাছে মনুষ্য-সম্পর্কিত কোনোকিছুই অপর ছিলো না, তিনি কিছু গুণের অধিকারী না হয়েও তা ধারণ করতে চেয়েছিলেন আর কিছু ব্যর্থতার অধিকারী হয়েও তা লুকিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন। অন্যান্য প্রাজ্ঞ গুরু ও তাদের মতবাদ বিচার করার ক্ষেত্রেও এই পথই অবলম্বন করা বিধেয়। তাহলে আর আমাদের এই পার্থিব উপত্যকাকে ওই ‘অন্যতর জগৎ’ অমন গভীর খাদের বিভাজিকায় আলাদা হয়ে থাকতে দেখা যাবে না। আর হয়তো, কান্ট না পেলেও আমরা এই দুই জগতের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য কিছু সাধারণ অভিজ্ঞতালব্ধ সত্য খুঁজে পাবো। তখন পিলাত-এর করা প্রশ্নটি তার সর্বজয়ী নিশ্চয়তার অনেকটাই খুইয়ে বসবে। পিলাত সব দায় ঝেড়ে ফেলার ফন্দি নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন: ‘সত্য কী?’ তাঁর আগেও বহুজন এবং পরেও বহুজন কোনওরকম সংগ্রামের বাসনা না নিয়েই অতি বুদ্ধিদীপ্ত সব প্রশ্ন খাড়া করেছেন এবং সংশয়বাদের সম্পর্কে অবস্থান গ্রহণ করেছেন। তবু সকলেই জানে যে সত্য আছে, এমনকি কখনও কখনও তারা সত্য সম্পর্কে নিজেদের ধারণাটাকেও দেকার্তে-যাচিত স্পষ্টতা ও সূক্ষ্মতা নিয়ে সূত্রায়িত করে ফেলতে পারেন। অলৌকিকের কি কোনো সীমা আছে? সে সীমা কি ইতিমধ্যেই পৃথিবীতে দেখতে পাওয়া অলৌকিকগুলো দিয়ে বাঁধা? নাকি সে সীমা আরো সুদূরবিস্তারী? যদি সুদূরবিস্তারী হয়, কতো সুদূর অবধি তার বিস্তার?

আরও কিছু সত্য

সত্যের প্রকৃতিই বোধহয় এমন যে মানুষদের পক্ষে তা একে-অপরকে জানানো-বোঝানো অসম্ভব, অন্তত ভাষা-ভিত্তিক চলতি জ্ঞাপনের উপায়গুলোর মাধ্যমে তো বটেই। প্রত্যেকে সত্য নিজের মধ্যে হয়তো জানতে পারে, কিন্তু পড়শির সঙ্গে জ্ঞাপনপ্রক্রিয়ায় প্রবেশ করলেই তাকে সে সত্য ত্যাগ করে কোনো প্রথাগত মিথ্যা অবলম্বন করতে হয়। এই যে সত্যের কোনো বাজারি দর নেই তা দিয়ে অবশ্য সত্যের মূল্য বা গুরুত্ব কোনো মাত্রাতে কিছু কমে না। আপনি আপনার গোটা জীবনটাই দর্শনের তত্ত্ব পড়ায় কাটিয়ে দিলেও ‘সত্য কী’ জিজ্ঞাসা করা হলে তেমন কোনো উত্তর দিতে পারবেন না। কিন্তু যদি আপনার নিজের ভিতরের কেউ এই প্রশ্নটি করে, আপনাকে নিজেকেই উত্তর দিতে হয় অন্য কারও মুখ চেয়ে না থেকে, আপনি নিজে ভালোই জানবেন সত্য কী। সুতরাং সত্য তার প্রকৃতিগতভাবে অভিজ্ঞতালব্ধ সত্যের বিন্দুমাত্র অনুরূপ নয়, তাই দর্শনের জগতে প্রবেশ করার আগে আপনাকে অনেক কিছু ছেড়ে-ছুড়ে ফেলে রেখে আসতে হবে, যেমন অনুসন্ধানের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিগুলোকে বিদায় জানিয়ে আসতে হবে, জ্ঞান খতানোর অভ্যস্ত পদ্ধতিগুলোকেও ফেলে রেখে আসতে হবে। এক কথায় বললে, একদম নতুন কিছু, প্রথাগত বা পুরোনো কোনোকিছুর সঙ্গেই যা মেলে না, তা গ্রহণ করার জন্য তৈরি থাকতে হবে। আর সেজন্যই বৈজ্ঞানিক জ্ঞানকে তুচ্ছ করার প্রবণতা অপটু চোখের প্রথম দৃষ্টিতে অকাজের বলে মনে হলেও মোটেই তা নয়।

যে-কোনো অনুসন্ধানকারীর কাছে তাই বিদ্রূপ ও শ্লেষ একটি অতি প্রয়োজনীয় হাতিয়ার। বদ্ধমূল অভ্যাস চিরদিন ছিলো এবং চিরদিন থাকবেও নতুন জ্ঞানের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর শত্রু। প্রায়োগিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, একজন মানুষের অস্তিত্বের অস্থায়ী পরিস্থিতিগুলোর সঙ্গে যা মানিয়ে নিতে সাহায্য করে সেঘুলো জানা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কালনিরপেক্ষ মূল্যের বিষয়গুলো জানা অতো গুরুত্বপূর্ণ নয়। জ্ঞানচাতকতার চেয়ে আত্মসংরক্ষণের প্রবৃত্তি সর্বদাই অধিক শক্তিশালী বলে প্রমাণিত হয়েছে। তাছাড়া এটা মনে রাখা দরকার যে আত্মসংরক্ষণের প্রবৃত্তির হাতে অসংখ্য অতি সূক্ষ্ম রক্ষণাস্ত্র রয়েছে: ব্যতিক্রমহীনভাবে সমস্ত মনুষ্য কর্মশক্তিই তার নির্দেশ মেনে চলে, অবচেতন-চালিত প্রতিবর্ত-ক্রিয়া থেকে শুরু করে মুকুটশোভিত মগজ ও সম্ভ্রান্ত সচেতনতা অবধি সব-ই তার আজ্ঞাবাহক। এ ব্যাপারে প্রায়শই অনেক কিছু বলা-কওয়া হয়ে থাকে, এবং তার সমবেত ঐক্যমতটি অন্তত এই একটি ক্ষেত্রে আমার পক্ষ নেবে। অবশ্য এই ব্যাপারটিকে মনুষ্য-প্রকৃতির এক অনস্বীকার্য বিকার বলে গণ্য করা হয়--- কিন্তু আমি এখানে প্রতিবাদ করবো। আমার মনে হয় না এতে আপত্তি করার মতো কিছু আছে। আমাদের মগজ ও সচেতনতার কাছে এটা গর্বের বিষয় হওয়া উচিত যে তারা প্রবৃত্তির সেবায় নিয়োজিত, এমনকি সে প্রবৃত্তি যদি আত্মসংরক্ষণের প্রবৃত্তি হয় তাতেও কিছু যায়-আসে না। তাদের বেশি অহংকারী না হওয়াই ভালো, আর সত্যি কথা বলতে কী, তারা অহংকারী নয়-ও বটে, তাদের নির্ধারিত দায়-দায়িত্ব পালনে কোনো দ্বিধা তাদের নেই। কেবলমাত্র বইয়ের পাতাতেই তাদের অগ্রাধিকারের ভান খুঁজে পাওয়া যায়, জীবনের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকারের চিন্তা উঠলে তারা কেঁপে-কেটে সারা হয়। যদি কখনও কোনও দুর্ঘটনাবশত তাদেরকে কর্মের স্বাধীনতা দেওয়া হয়, তাহলে রাতের বেলা জঙ্গলে হারিয়ে যাওয়া বাচ্চাদের মতো তার ভয়ে পাগল হয়ে যাবে। মগজ ও সচেতনতা স্বাধীনভাবে বিচার করা শুরু করলে প্রতিটি ক্ষেত্রে ধ্বংসাত্মক পরিণতিতে পৌঁছয়। আর তারপর তারা অবাক হয়ে উপলব্ধি করে যে এই ক্ষেত্রটিতেও তারা স্বাধীনভাবে কাজ করছিলো না, ভিন্ন রূপ ধরে হাজির হওয়া একই প্রবৃত্তির নির্দেশ পালন করছিলো। মনুষ্য সত্তা ধ্বংসকার্য আকাঙ্ক্ষা করেছিলো, তার দাসেদের সে শিকল খুলে লেলিয়ে দিয়েছিলো, দাসেরাও তুমুল ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে তাদের স্বাধীনতা উদযাপন করেছিলো, তা করা কালীন বিন্দুমাত্র সন্দেহ করেনি যে তখনও তারা অপরের হয়ে কাজ করা দাস-ই রয়ে গিয়েছিলো।

অনেকদিন আগে দস্তইয়েভ্স্কি উল্লেখ করেছিলেন যে সৃষ্টির প্রবৃত্তির মতো ধ্বংসের প্রবৃত্তিও মনুষ্য-সত্তা-র একইরকম স্বাভাবিক অংশ। এই দুই প্রবৃত্তির পাশে আমাদের অন্য সমস্ত কার্যশক্তিগুলো যেন কিছু গৌণ চরিত্র বলে মনে হয়, নেহাত নির্দিষ্ট কিছু আপতিক পরিস্থিতিতে যাদের ডাক পড়ে। কেবলমাত্র নিরেট বস্তুবাদীরাই বলেন এমন নয়, ভাববাদীরাও এখন তাদের অধিবিদ্যায় বলছে যে সত্য সম্পর্কে বলতে গেলে একটা মানদণ্ডের ধারণা ছাড়া আর কিছু পড়ে থাকে না। আরো খুলে-মেলে সুবোধ্য ভাষায় বললে, সত্যের অস্তিত্বের কারণ একমাত্র এইজন্য যাতে দেশ-কাল-এর ব্যবধানে অবস্থিত মানুষরা নিজেদের মধ্যে যে-রকম-হোক একটা জ্ঞাপনের প্রক্রিয়া অন্তত স্থাপন করতে পারে। অর্থাৎ মানুষকে দুটি পন্থার মধ্যে একটিকে বেছে নিতে হয়--- একদিকে সত্যকে সঙ্গে নিয়ে তার পরম একাকীত্ব, আর অন্যদিকে পড়শিদের সঙ্গে জ্ঞাপন-পারঙ্গমতা ও অসত্যের সঙ্গ। প্রশ্ন করা হবে যে এর মধ্যে কোনটা বেশি ভালো। আমি বলবো যে এই প্রশ্ন নিরর্থক। এছাড়াও একটা তৃতীয় পন্থা অবশ্য হতে পারে, যা হলো ওই দুটো পন্থাকেই একসঙ্গে গ্রহণ করা, যদিও প্রথম ধাক্কায় তা একেবারে অসম্ভব বলে মনে হতে পারে, বিশেষ করে যাঁরা মনস্থির করে ফেলেছেন যে অঙ্কের মতো যুক্তিবিদ্যাও অব্যর্থ ও অভ্রান্ত তাঁরা তো এর কোনো মানেই খুঁজে পাবেন না। কেবলমাত্র একজন জার্মান ভাববাদী-ই এমন কোনো এক ‘ভালো’ নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে পারেন যা কোথাও কোনোদিন বাস্তব রূপ গ্রহণ করেনি, তাই আমার বলা ওই তৃতীয় পন্থাটি কেবলমাত্র সম্ভবপর বলে আমি সন্তুষ্ট থাকতে পারি না, আমি বরং বলবো যে আমরা হামেশাই এমন দেখে থাকি যে সবচেয়ে পরস্পর-বিপরীত আধ্যাত্মিক অবস্থাও একই সঙ্গে বিরাজ করে। মানুষ যখন কিছু বলতে শুরু করে তখনই সে অসত্যভাষণ করে: আমাদের ভাষা এতো ত্রুটিপূর্ণভাবে বিন্যস্ত যে তার বিন্যাসনীতির মধ্যেই পূর্বনির্ধারিত হয়ে আছে যে অসত্য বলায় কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকবে না। বলার বিষয় যতো বিমূর্ত হয়, ততোই অসত্য বলার ঝোঁক বাড়তে থাকে, আর এভাবে যখন আমরা সবচেয়ে জটিল প্রশ্নগুলোয় এসে পড়ি, তখন তো আমাদের অনবরত অসত্য বলে যেতে হয়, আমরা যতো নিষ্ঠাবান হয়ে উঠি আমাদের সত্যগুলোও ততোই মোটা-দাগ-এর ও অসহ্য হয়ে ওঠে। কারণ, একজন নিষ্ঠাবান ব্যক্তি নিশ্চিত থাকেন যে সত্যতার চিহ্ন হলো পরস্পরবিরোধিতার অনুপস্থিতি, আর তাই অসত্যের আভাস-মাত্র এড়ানোর জন্য তিনি তাঁর সমস্ত মতের মধ্যে এক যৌক্তিক সঙ্গতি বেঁধে দিতে চান, ফলে তাঁর অসত্যকে আকাশচুম্বী উচ্চতায় ঠেলে তোলেন। অন্য কারও বক্তব্য শোনার সময়েও তিনি এই একই ভাবনা দ্বারা চালিত হন, ফলে কোথাও কোনো ন্যূনতম পরস্পর-বিরোধিতা খেয়াল করতে পারলেই হাঁ-হাঁ-করে হামলে পড়ে অভিযোগ তোলেন যে মৌলিক ভদ্রতাটুকুও আর রক্ষা করা হচ্ছে না। কিন্তু মজার বিষয় হলো, দর্শন-পড়ুয়া যে কোনো ছাত্রই ভালো করে জানে (আর তাদের উদ্দশ্য করেই আমার এ লেখা, পাঠক তা হয়তো অনেক আগেই বুঝে গেছেন) যে সবচেয়ে শক্তিশালী দার্শনিকদের কোনো একজনও তাঁর উপস্থাপিত ভাবনাকাঠামোকে পরস্পর-বিরোধিতা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করতে পারেননি। এ ব্যাপারে স্পিনোজা কতো না অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে নেমেছিলেন! চেষ্টার তিনি কোনো ত্রুটি রাখেননি, কোনো বাধায় আটকে যাননি, কিন্তু তবু তাঁর দ্বারা উপস্থাপিত উল্লেখযোগ্য ভাবনাকাঠামোটিও যে যুক্তিশৃঙ্খলার বা যুক্তিসঙ্গতির বিচারে টিকতে পারে না তা এখন সবার জানা। সুতরাং, মনে হয় যে এখন উচিত হলো এই প্রশ্নটি করা যে যুক্তিশৃঙ্খলা বা যুক্তিসঙ্গতি আমাদের এমন কী কাজে আসে, প্রশ্ন করা উচিত যে জগৎ সম্পর্কে ভাবনা গড়ে তোলার কাজে পরস্পর-বিরোধিতা-ই কি সত্যনিষ্ঠতার নির্ধারক চিহ্ন নয়? কান্ট-কে অনুসরণ করে তাঁর শিষ্য ও উত্তরসূরির দল হয়তো ঠাণ্ডা গলায় উত্তর দেবে যে একমাত্র শয়তান-ই জানে সঙ্গতি-শৃঙ্খলা-র কী এতো দরকার। তারা আরো বলবে যে সত্য বাঁচে পরস্পর-বিরোধিতার মধ্য দিয়েই। সত্যি কথা বলতে কী, হেগেল ও শোপেনহাওয়ার, নিজের নিজের মতো করে, অংশত এমনই এক স্বীকৃতি দেওয়ার দিকে এগিয়েছিলেন, কিন্তু তা তাঁদের নিজেদের খুব লাভে আসেনি। 

উপরের আলোচনা থেকে কিছু সিদ্ধান্ত টানার চেষ্টা করা যাক। যুক্তি যখন কাজে লাগতে পারে তখন তা ব্যবহার করতে অস্বীকার করা খুবই অযৌক্তিক বেপরোয়া কাজ হবে। তার ফলিত সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যেও আগ্রহব্যঞ্জক কিছু নেই এমন নয়। প্রথমত, কথা বলার সময় আপনি আগে যা বলেছেন তার সঙ্গে সঙ্গতিরক্ষার জন্য মাথা ঘামাবেন না, ওই নিয়ে মাথা ঘামালে তা আপনার স্বাধীনতায় অপ্রয়োজনীয় বেড়ি পড়াবে ভাবে, ওই অপ্রয়োজনীয় বেড়ি ছাড়া এমনিতেই তো শব্দভাণ্ডার ও ব্যাকরণ-রূপ-এর দ্বারা আপনি শৃঙ্খলিত। বন্ধুদের বলা কথা শোনার সময় বা কোনো বই পড়ার সময় আলাদা করে কোনো একক শব্দের উপর বা বাক্যাংশের উপর বিশাল মূল্য আরোপ করবেন না। আলাদা-আলাদা ভাবনাগুলোকে ভুলে যান, এমনকি যুক্তিশৃঙ্খলায় বিন্যস্ত ভাবনাগুলোকেও তেমন পাত্তা দেওয়ার দরকার নেই। এটা স্মরণে রাখবেন যে আপনার বন্ধু চাইলেও ব্যবহারের-জন্য-তৈরি-করে-রাখা কথনরূপ এড়িয়ে নিজেকে প্রকাশ করতে পারে না। ভালো করে তার মুখের অভিব্যক্তির দিকে তাকান, তার স্বরের ওঠা-নামা খেয়াল করুন--- তার কথাগুলো ভেদ করে তার অাত্মায় পৌঁছতে তা আপনাকে সাহায্য করবে। কেবলমাত্র কথোপকথনেই নয়, এমনকি একটি লিখিত বইতেও লেখকের গলার আওয়াজ, এমনকী তার উপস্বনতা আড়ালে থেকে শোনা যায়, এমনকী লেখকের চোখ-মুখ-এর সূক্ষ্ম অভিব্যক্তিগুলোও ধরা যায়। পরস্পর-বিরোধিতা দেখলেই রে-রে-করে ঝাঁপিয়ে পড়বেন না, ঝগড়া লাগিয়ে বসবেন না, যুক্তি-প্রমাণ দাবি করবেন না, কেবল মন দিয়ে শুনুন। তাহলে তার পরিবর্তে আপনি যখন কথা বলতে শুরু করবেন, আপনাকেও কোনো ঝগড়ায় জড়িয়ে পড়তে হবে না, আপনাকেও কোনো যুক্তি-প্রমাণ হাজির করতে হবে না, আপনি তো ভালোই জানেন যে তেমন যুক্তি-প্রমাণ আপনার কাছে নেই আর থাকতেও পারে না। আপনি আর বিরক্তও হয়ে উঠবেন না যখন আপনার পরস্পর-বিরোধিতাগুলো আপনাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া হবে, কারণ সেগুলো যে সবসময় ছিলো তা আপনি নিজেই ভালো জানেন, সেগুলো যে সব-সময় থাকবে তা-ও আপনি জানেন এবং তা ত্যাগ করা আপনার পক্ষে যন্ত্রণাকর, বা বলা ভালো, অসম্ভবও বটে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, অবশেষে তখন আর আপনার কোনো সন্দেহ থাকবে না যে সত্য যুক্তিনির্ভর নয়, যৌক্তিক সত্য বলে কিছু হয় না, সুতরাং আপনার যা পছন্দ তা-ই অনুসন্ধান করার অধিকার আপনার আছে, যেভাবে খুশি অনুসন্ধান করার অধিকারও আপনার আছে, তার জন্য কোনো যুক্তি-প্রমাণ দাখিল করার দায় আপনার নেই, আর আপনার অনুসন্ধান যদি কোনো ফল ফলায়, সে ফল-কে কোনো সূত্র নিয়ম নীতি বা এমনকি সুগঠিত ভাবনা হতে হবে তার কোনো মাথার দিব্যি নেই! কেবল এটাই মনে রাখুন: অনুসন্ধান যদি ‘সত্য’-র জন্য হয়, যেভাবে ‘সত্য’-কে আজকাল বোঝা হয়ে থাকে তার জন্য, তাহলে যে-কোনোকিছু-র জন্যই আপনাকে প্রস্তুত থাকতে হবে। যেমন ধরা যাক, বস্তুবাদীদের সঠিক প্রমাণ করে বস্তু ও শক্তি-ই জগতের ভিত্তি হবে। বস্তুবাদীদের যে তাদের নিজেদের সিদ্ধান্তগুলো দিয়েই তৎক্ষণাৎ হতভম্ব করা যায় তা দিয়ে কিছু যায়-আসে না। চিন্তার ইতিহাসে এমন বহু উদাহরণ দেখা যায় যেখানে একদা নিন্দা-মন্দ করে ছুঁড়ে-ফেলে-দেওয়া ধ্যান-ধারণা আবার সম্যকভাবে ফিরে এসে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল যা ভুল ছিলো, আগামীকাল হয়তো তা সত্য হয়ে উঠবে, এমনকি তখন হয়তো তাকে সতঃসিদ্ধ রূপেও গণ্য করা হবে। আর তার ভিতরের মাল-মশলা-র কথা বাদ দিলে, বস্তুবাদে খারাপটাই বা কোথায়? তা তো একটা সুসমঞ্জস সুসঙ্গত সুসংহত ধারণা-কাঠামো। আমি আগেই উল্লেখ করেছি যে সর্বেশ্বরবাদী বা ভাববাদী ধারণার মতো জগত সম্পর্কে বস্তুবাদী ধারণাও একই রকম ভাবে মানুষকে মোহগ্রস্ত করে তুলতে পারে। আর এতদূর যখন এগোনোই গেলো, তখন স্বীকার করতে অসুবিধা নেই যে আমার মতে, কোনো ধারণাই নিজে থেকে খারাপ নয়: এখনও অবধি তো কারখানা-রেলগাড়ি-বিমান সহযোগে প্রগতি-ধারণা-র বাড়-বাড়ন্তও আমি বেশ মজা করেই অনুসরণ করতে পারছি। তবু, এই সব মামুলি ব্যাপার--- মানে আমি ভাবনাকাঠামোগুলোর কথাই বলছি--- মানুষের গভীর ও আন্তরিক অনুসন্ধানের বিষয় হয়ে উঠবে এমন আশা করা ছেলেমানুষি বলে আমার মনে হয়। অতিকথা ও ইতিহাসে আমরা ঈশ্বর ও জগতের সঙ্গে মানুষের যে মরীয়া লড়াইয়ের কথা পাই--- কেবলমাত্র প্রমিথিউজ-এর কথাই ধরুন না কেন--- তা যদি সম্ভব হয়ে থাকে, তবে তা সত্য-র জন্য বা কোনো ভাবনাকাঠামোর জন্য সম্ভব হয়নি। মানুষের আকাঙ্ক্ষা যে সে শক্তিশালী ও ধনী ও স্বাধীন হবে যদিও সে ধুলোয় লুটোপুটি খাওয়া এক তুচ্ছ জীব, যে-কোনো ধাক্কা যাকে প্রথম সুযোগেই সকলের চোখের সামনে কীটের মতো পিষে মারে--- আর মানুষ যদি ভাবনাকাঠামো নিয়ে এতো বকবক করে থাকে তা কেবল তার প্রকৃত অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে সাফল্যের অভাবজনিত হতাশার কারণেই। মানুষ অনুভব করে যে সে কীট ছাড়া আর কিছু নয়, যে ধুলোয় সে গড়া সেই ধুলোর মধ্যেই মিশে যেতে হবে বলে যে ভয় পায়, আর তাই সে মিথ্যা বলে, ভান করে যে তার এই দুর্দশাকে সে ভয়ংকর মনে করে না, সত্য যা তা যদি একবারো তার কাছে ধরা দিতো! তার মিথ্যা বলার জন্য তাকে ক্ষমা করে দাও, কারণ কেবলমাত্র তার ঠৌঁটদুটোই তা উচ্চারণ করেছে। সে যা বলতে চায় তাকে বলতে দাও, যেভাবে বলতে চায় সেভাবেই বলতে দাও; যতক্ষণ তার উচ্চারিত শব্দে লড়াইয়ের ডাক-এর পরিচিত অনুরণন আমরা শুনতে পাচ্ছি, যতক্ষণ মরীয়া অনমনীয় প্রতিজ্ঞার আগুন তার চোখে আমরা জ্বলতে দেখছি, আমরা তাকে ঠিক বুঝতে পারবো। আমরা তো হিয়েরোগ্লিফ পাঠোদ্ধার করতেও অভ্যস্ত। কিন্তু সে যদি আজকালকার জার্মানদের মতো মনুষ্য-আকাঙ্ক্ষা-র চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে সত্য এবং আদর্শবিধি-কেই গ্রহণ করে বসে, আমাদের বুঝতে বাকি থাকবে না কাদের মোকাবিলা আমাদের করতে হবে, বিধাতা তাকে সিসেরো-র মতো বাগ্মিতা দান করলেও কোনো অসুবিধা নেই। তেমন কোনো মানুষের সঙ্গে ভাববিনিময়ের চেয়ে নিশ্ছিদ্র একাকীত্বও শ্রেয়। অবশ্য সে-হেন ভাববিনিময়ের মধ্যেও নিশ্ছিদ্র একাকীত্ব সেঁধিয়ে বসে থাকে; হয়তো সে কঠিন সাধনার সাধনে সহযোগীও হয়ে ওঠে।

 

টীকা

১। নাতোর্প: পল গেরহার্ড নাতোর্প (১৮৫৪- ১৯২৪) একজন জার্মান দার্শনিক ও শিক্ষক যাঁকে নয়া-কান্টবাদের মারবুর্গ ঘরানার জনক বলে ধরা হয়ে থাকে। এখানে তাঁর যে বইটির কথা উল্লেখ করা হয়েছে সেটি হলো: Platos Ideenlehre (1903; 2nd ed. 1921); ইংরেজি অনুবাদে: Plato's Theory of Ideas: An Introduction to Idealism (2004 Academia Verlag)।

২। ফ্রেইবুর্গ বা হেইডেলবার্গ-এর কারখানায়: জার্মানির দুটি শহর যা তাদের অতি প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বিখ্যাত। এই দুই শহরের বিশ্ববিদ্যালয় পরম্পরাগতভাবে জার্মান প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যাচর্চার পীঠস্থান হিসেবে কাজ করে আসছে। কারখানা বলতে শেস্তভ এই ছকে-বাঁধা প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যাচর্চার পীঠস্থান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেই বুঝিয়েছেন।

৩। প্রমিথিউজ: গ্রিক অতিকথা বলে যে প্রমিথিউজ স্বর্গ থেকে আগুন চুরি করে এনে মানুষদের হাতে তুলে দিয়েছিলো, যার ফলে মনুষ্য-সভ্যতার বিকাশ সম্ভবপর হয়। এর শাস্তি স্বরূপ ঈশ্বরদের কর্তা জিউস প্রমিথিউজ-কে শাস্তি দেয়। শাস্তিস্বরূপ তাকে একটা পাথরের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়, যেখানে প্রতিদিন একটি ঈগল এসে ঠুকরে ঠুকরে তার যকৃৎটি খেতো, রাতে আবার যকৃৎটি পুরো চেহারা নিয়ে নিতো, আবার পরের দিন সকালে ঈগল এসে ঠুকরে ঠুকরে খেতে শুরু করতো।

৪। সিসেরো: মার্কাস তুল্লিয়াস সিসেরো (১০৬ খৃস্টপূর্বাব্দ- ৪৩ খৃস্টপূর্বাব্দ) একজন রাজনীতি ও আইনে বিশেষজ্ঞ লেখক ও বাগ্মী। রোমের প্রজাতন্ত্রের রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যখন রোম সাম্রাজ্য-এর উৎপত্তি ঘটছে, সেই সময়ে তিনি আদর্শ নিয়মবিধির প্রবক্তা হিসেবে রোম-এ খ্যাত হয়েছিলেন। বিশেষ করে বাগ্মিতার জন্য তিনি বিখ্যাত।

 

বাংলা তর্জমা: বিপ্লব নায়ক

 

0 Comments
Leave a reply