হোল্ডিং সেন্টার ও পুশ-ব্যাক: হিন্দুত্ববাদীদের তৈরি নরকে স্বাগত

লিখেছেন:বিপ্লব নায়ক
জুন ২০২৬। পশ্চিমবঙ্গ। 'হিন্দু পশ্চিমবঙ্গ' গড়ার নামে হিন্দুত্ববাদীরা রাষ্ট্রীয় শক্তি কব্জা করে নতুন নরক রচনা শুরু করেছে, হিংসা-দ্বেষ-নিষ্ঠুরতার অন্ধকারে ডুবিয়ে অপমনুষ্যত্বের নয়া স্বাভাবিকতা কায়েম করতে চাইছে। তারই প্রতিবেদন।

 

৫ই জুন, ২০২৬। ভারত-রাষ্ট্রের সীমা সুরক্ষা বল বা বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স বা সংক্ষেপে বি-এস-এফ দশজন মানুষকে, যাদের মধ্যে তিনজন শিশু, পঞ্চগড় এলাকার ভারত-বাংলাদেশ-সীমানা দিয়ে বাংলাদেশের মধ্যে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে, অভিযোগ যে তারা বাংলাদেশী। উল্টোদিকের বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড, বা সংক্ষেপে বি-জি-বি তাদের দিকের সীমানা বন্ধ রেখে এদেরকে ঢুকতে দেয়নি, তাদের বক্তব্য এই যে এরা বাংলাদেশী তার যথেষ্ট প্রমাণ নেই, এ-ব্যাপারে চালু অন্তঃ-রাষ্ট্র নিয়ম ও আইনি পদ্ধতিও মানা হচ্ছে না। দুই দেশের সীমান্ত-কাঁটাতারের মাঝে এক-ফালতি নো-ম্যানস্-ল্যান্ড বা শূন্যরেখায় খোলা আকাশের নীচে কাদা-মাটি-ঘাস-ঝোপঝাড়-এর মধ্যে, কখনও রোদ কখনও বৃষ্টি মাথায় করে এই দশজন টানা তিনদিন পড়ে থাকে। দুদিকে দুই রাষ্ট্রের বন্দুকধারী সীমানা-পাহারাদারদের বন্দুক তাক করা তাদের দিকে, যেন হঠাৎ-দেশহীন-হয়ে-যাওয়া এই মানুষরা কোনোদিকের ‘দেশ’-এই ঢুকে পড়তে না পারে। শূন্যরেখায় দিন-কাটানোর সময় কোনো এক ক্যামেরাধারী তাদের একটা ছবি তুলেছিলো, ছবিটা এইরকম:

https://sabrangindia.in/wp-content/uploads/2026/06/image_2026-06-10_114945709.png

তারপর বি-এস-এফ তাদের নিয়ে নাকি কোনো হোল্ডিং সেন্টারে তুলেছে।

হোল্ডিং সেন্টার-টা আবার কী? হ্যাঁ, এটা নতুন বস্তু। বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে সরকার দখল করার পর এই বস্তুটির আমদানি হয়েছে। ২৪ মে ২০২৬ রাতে নতুন বিজেপি সরকার এক নির্দেশিকা জারি করে প্রতিটি জেলায় হোল্ডিং সেন্টার তৈরি করে চালু করার নির্দেশ দেয়। মালদা ও মুর্শিদাবাদে প্রথম হোল্ডিং সেন্টার চালু হয়ে যায় ২৫ মে থেকেই। দুই সপ্তাহের মধ্যে বিভিন্ন জেলায় ১১টি হোল্ডিং সেন্টার কাজ করতে শুরু করে। এখনও নতুন নতুন জায়গায় তৈরি হয়ে চলেছে। সরকার বা পৌরসভার কোনো বাড়ি অধিগ্রহণ করে আধাসেনা-পুলিশ-বি-এস-এফ-এর বন্দুকধারীদের পাহারায় ঘিরে নতুন এক ধরনের জেলখানা এগুলো। তবে জেলখানাতে যাদের বন্দী করা হয় তাদের কোর্টে তোলার ও আইনী বিচারের মধ্য দিয়ে নিয়ে যাওয়ার যে চল আছে, এখানে তা বাদ। অর্থাৎ, বাংলাদেশী মুসলমান অনুপ্রবেশকারী সন্দেহে কাউকে ধরা হলে তাকে এই হোল্ডিং সেন্টারে আনা হবে, কোর্টে কোনো আইনী বিচারপদ্ধতির মধ্য দিয়ে যাওয়া হবে না, বি-এস-এফ নিজেই দ্রুত কয়েকদিনের মধ্যে ঠিক করে ফেলবে এরা বাংলাদেশী মুসলিম বা বর্মী রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারী কিনা এবং সঙ্গে সঙ্গে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের কোথাও একটা নিয়ে গিয়ে ঠেলে ওপারে পাঠিয়ে দেবে, যার সরকারী নাম দেওয়া হয়েছে ‘পুশ-ব্যাক’। বিজেপি যেহেতু হিন্দু পশ্চিমবঙ্গ গড়তে চায়, তাই গরিব মুসলমান হলেই এখন ভয়ঙ্কর বিপদ, বিজেপি ক্যাডার ও পুলিশের যৌথ বাহিনী যে কোনো সময় তাকে পরিবার-সুদ্ধ গ্রেফতার করে হোল্ডিং সেন্টারে ঢুকিয়ে দিতে পারে। এবং হচ্ছেও তাই। নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী খুব গর্ব করে জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহতেই বলেছিলেন যে তাঁর সরকার চার হাজার আটশো জনকে পুশ-ব্যাক করে দিয়েছে আর তখনও হোল্ডিং সেন্টারে আটশো ছত্রিশ জন আছে, তাদেরও পুশ-ব্যাক করে দেওয়া হবে। তিনি আরো বলেছেন যে বাংলাদেশ থেকে আসা হিন্দুদের কোনো ভয় নেই, তাদের সি-এ-এ আইনের মাধ্যমে তিনি হিন্দু পশ্চিমবঙ্গের অংশ করে নেবেন। হোল্ডিং সেন্টার গঠন ও অনুপ্রবেশকারী বলে সন্দেহভাজন গরিব মুসলমানদের সেখানে এনে তোলা, পুশ-ব্যাক-এর চেষ্টা তারপর থেকে চলছে তো বটেই, আড়ে-বহরে আরো বাড়ছে।

এই পরিস্থিতির কোনো আঁচ বাজারী সংবাদপত্র বা টিভি-মিডিয়ায় পাওয়া যাচ্ছে না, সেখানে শাসকদলের তৈরি-করে-দেওয়া নানা অ্যাজেন্ডা ঘিরে নির্বোধ নাচন-কোঁদন চলছে, এইসব মিডিয়াম্যান-জোকারদের দেখলে এখন ঘেন্না লাগে, তাদের কথা আলোচনা করে ফালতু সময় নষ্ট করব না। আঁচ পাওয়ার জন্য তাই আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে জুন মাসের শুরুর দিকে মালদা গিয়েছিলাম, যেখানে প্রথম হোল্ডিং সেন্টার দুটির একটি শুরু হয়েছিল। সেখানে বিভিন্ন জনের সঙ্গে কথা বলে, বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে যা জানতে পেরেছি প্রথমে সে-কথা বলি।

মালদার ইংলিশবাজারে ২৫ মে সকালে হোল্ডিং সেন্টার চালু হয়েছিল নয় জন বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী সন্দেহভাজনকে তুলে আনার মধ্য দিয়ে। এদের তুলে আনা হয়েছিলো গাজোল ব্লকের পাণ্ডুয়া থেকে। এদের মধ্যে দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মহিলা, বাকিরা অপ্রাপ্তবয়স্ক বা শিশু। দুটি গরিব মুসলমান পরিবারের লোকজন। এদের পরিবারের পুরুষরা পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে বাঙ্গালোরে কার্যরত ছিল, ফলে ধরপাকড়ের সময় তারা উপস্থিত ছিল না। যারা উপস্থিত ছিল, চেঁছেপুঁছে সবাইকে ধরে আনা হয়েছে। কিছুদিনের মধ্যেই এদের পুশ-ব্যাক করার জন্য হোল্ডিং সেন্টার থেকে নিয়ে চলে যাওয়া হয়। এখানে একটা প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবে ওঠে। পুশ-ব্যাক-এর জন্য নিয়ে চলে যাওয়া হয়েছে মানে বি-এস-এফ-এর বন্দুকধারীরা খতিয়ে দেখে নিশ্চিত হয়ে গেছিলেন যে এরা অবৈধভাবে ঢোকা বাংলাদেশী। কিন্তু এদের পরিবারের পুরুষরা তখনও এসে পৌঁছয়নি, বাইরে কাজ করতে যাওয়ার সময় তাঁরা নিশ্চয়ই পরিচয়পত্র ও আইনী কাগজসমূহ নিজেদের সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন, কারণ বাংলার বাইরে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে (বিশেষ করে বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোতে) কোনো পরিযায়ী শ্রমিককে বাংলায় কথা বলতে দেখলেই বাংলাদেশী বলে হেনস্থা মারধোর করা, পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া এবং তারপর বি-এস-এফ-এর তৎপরতায় বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার ঘটনা গত প্রায় এক বছর ধরেই ঘটে চলেছে (বীরভূমের সোনালী বিবিকে পরিবারসমেত এভাবেই বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল, ওপারের জেল-এ তাঁদের ঠাঁই হয়েছিল, কোর্টে মামলা-মোকদ্দমা হওয়ায় সোনালী বিবি ফিরতে পেরেছেন কিন্তু তাঁর স্বামী এখনও ফিরতে পারেননি, এমন ঘটনা বহু), তাই বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকদের, বিশেষ করে যদি মুসলমান হয়, টান-টান ভয় ও উদ্বেগের মধ্য দিয়ে এমনিতেই যেতে হচ্ছে। সুতরাং গাজোলের পাণ্ডুয়া থেকে ধৃত ওই নয়জন মহিলা ও শিশুর পরিবারের পুরুষদের কাছে থাকা পরিচয়পত্র ও আইনী কাগজ না পরীক্ষা করেই বি-এস-এফ কীভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে যে এরা সবাই অবৈধ অনুপ্রবেশকারী? তাহলে কি হোল্ডিং সেন্টারে তুলে এনে নাগরিকত্বের বৈধতা-অবৈধতা যাচাইয়ের কথাটা কেবলই গপ্পো, আগে থেকেই সিদ্ধান্ত করে রাখা হয়েছে যে যাদের তুলে আনা হবে তারা সবাই বাংলাদেশী?

ওই ধৃত নয়জনের পরিবারের পুরুষরা খবর পেয়ে তড়িঘড়ি বাঙ্গালোর থেকে মালদায় এসে পৌঁছয়। কিন্তু তাঁরা গাজোলের পাণ্ডুয়ায় তাঁদের বাড়ি অবধি পৌঁছতে পারেননি, মালদা রেলস্টেশন থেকেই তাঁদের গ্রেফতার করা হয় এবং সোজা নিয়ে তোলা হয় মালদার হোল্ডিং সেন্টারে, যেখান থেকে তাঁদেরও পুশ-ব্যাক-এর জন্য নিয়ে চলে যাওয়া হয়।

গাজোল-এর পাণ্ডুয়ার যেখান থেকে এই প্রথম নয়জনকে তোলা হয়েছিল, সেই এলাকায় গেলে দেখা যায় যে তা গরিব মুসলমানদের এক বসতি অঞ্চল, প্রায় সবাই নানাভাবে খেটেখুটে রোজগার করে কোনোরকমে দিন গুজরান করেন। সেখানে এখন কোনো মানুষই এই তুলে-নিয়ে-যাওয়া নয়জন সম্পর্কে মুখ খুলতে রাজি নয়, ভয়ঙ্কর এক সন্ত্রাস-এর বোধ তাঁদের উপর চেপে বসেছে। তাঁদের চোখের তারায় সন্দেহ-অবিশ্বাস-আতঙ্ক আর মুখে বলছেন যে তাঁরা কিছুই জানেন না। ঘটনাটি ঘটার পর অনেক পরিযায়ী শ্রমিক ফিরে এসে তাদের গোটা পরিবারকে নিয়ে তাদের কাজের জায়গায় চলে গেছে, অর্থাৎ, এই বাংলার থেকে বাইরের সেই রাজ্যও এখন তাদের কাছে বেশি নিরাপদ বলে বোধ হচ্ছে।

প্রথম গ্রেফতার হওয়া নয়জন ও তারপর তাদের পরিবারের পুরুষদের যে পুশ-ব্যাক করে দিয়েছে বলে বি-এস-এফ বলছে, তা সীমান্তের কোন অঞ্চল দিয়ে তাদের পুশব্যাক করা হয়েছে? বাংলাদেশের কোন অঞ্চলে এখন তারা আছে? এর কোনো উত্তর পাওয়া যাচ্ছে না। বাংলাদেশের সংবাদপত্রে বা বি-জি-বি-র কোনো বিবৃতি থেকেও এদের বাংলাদেশে পুনর্বাসন হওয়ার কোনো খবর পাওয়া যাচ্ছে না।

সোজা-সাপটা তথ্যের অভাব কেবল এই ক্ষেত্রেই নয়, সমস্ত ক্ষেত্রেই ক্রমে প্রকট থেকে প্রকটতর হয়ে উঠছে। যেমন ধরুন, মালদা-র হোল্ডিং সেন্টার-এ ২৫ মে-র পর ৩০ মে রাতে আরো ৬ জনকে এনে তোলা হয়েছিল, কিন্তু কোথা থেকে তাদের ধরে আনা হয়েছে তা আর জানানো হয়নি। আর তারপর থেকে নিরন্তর লোকজনকে ঢোকাতে ও বের করতে দেখা যাচ্ছে, কিন্তু কতোজনকে কোথা থেকে ধরে নিয়ে আসা হচ্ছে আর কতোজনকে বের করে কোথা দিয়ে পুশ-ব্যাক করা হচ্ছে তার কোনো হিসেব আর জানানো হচ্ছে না। বোঝা যাচ্ছে যে সরকারীভাবেই বি-এস-এফ ও হোল্ডিং-সেন্টার-পরিচালকরা এই নীতি নিয়েছেন।

স্থানীয় লোকদের কাছ থেকে জানা গেল যে ৪ জুন মালদার হোল্ডিং সেন্টার-এ বাইরে থেকে বাসে করে প্রচুর লোককে নিয়ে আসা হয়েছিল। কলকাতার দিককার চারটে বাসে করে মহিলা-পুরুষ-শিশু-বৃদ্ধ মিলে সংখ্যাটা প্রায় দুশো-র মতো হবে। কোথা থেকে তাদের ধরা হয়েছে জানা যায়নি। পুলিশ সুপার অনুপম সিং কেবল এইটুকু বলেছেন যে উত্তর ২৪ পরগণার বসিরহাটের হাকিমপুর সীমান্ত দিয়ে এদের পুশ-ব্যাক করতে গিয়ে বি-জি-বি-র বাধায় করতে না পারায় ও ওইদিককার হোল্ডিং সেন্টার-গুলোয় অতিরিক্ত ভিড় হয়ে যাওয়ায় তাদের মালদা সহ অন্য বিভিন্ন জেলার হোল্ডিং সেন্টার-এ সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

এবার তাহলে পুশ-ব্যাক বস্তুটির উপর নজর দেওয়া যাক। ভারত ও বাংলাদেশ রাষ্ট্রদুটির মধ্যে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী প্রত্যর্পণের যে উভয়-মান্য রীতি প্রতিষ্ঠিত ছিল, বিজেপি সরকার এই পুশ-ব্যাক-পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে তা মানতে নারাজ। সেই প্রতিষ্ঠিত রীতিতে, অবৈধ অনুপ্রবেশকারী সন্দেহে কেউ ধরা পড়লে তাকে জেলে রাখা হতো, কোর্টে তোলা হতো, কোর্টে তাকে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ খণ্ডনের ও সরকারি কর্তৃপক্ষকে অভিযোগ প্রমাণের পর্যাপ্ত সুযোগ দেওয়া হতো, সে বিচারে অভিযোগ প্রমাণিত হলে তবেই তার মূল দেশের সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রমাণ দাখিল করে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া শুরু করার আবেদন করা হতো এবং তারপর দুই দেশের রাষ্ট্রের সহযোগিতা-ক্রমে সীমান্তে প্রত্যর্পণ অনুষ্ঠিত হতো। এই আইন যে সর্বত্র নিখুঁতভাবে মানা হতো তা নয়, কিন্তু তবুও এর মধ্যে অভিযুক্ত ব্যক্তির নিজেকে অভিযোগ-মুক্ত করার একটা সুযোগ ছিল। এই সুযোগটাই আর বিজেপি সরকার রাখতে চায় না। অসম রাজ্যের বিজেপি সরকার বিদেশী বিতাড়নের নামে বহু বাংলাভাষী, বিশেষত মুসলমানদের নাগরিকত্ব হরণ করে ডিটেনশন ক্যাম্পে পুরে আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগ না দিয়ে গায়ের জোরে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার কাজ চালিয়ে আসছে গত প্রায় দশ বছর জুড়ে। এ নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে বিরোধও পেকে উঠেছে, এই অনাচারের বহু বিশদ নথিভুক্তিকরণ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর নানা প্রতিবেদনে পাওয়া যাবে। তাছাড়া, আগেই বলেছি, ভারতের অন্য বহু বিজেপি-শাসিত রাজ্যের সরকারও গত প্রায় এক বছর ধরে বাংলাভাষী গরিব পরিযায়ী শ্রমিক দেখলেই বাংলাদেশী বলে চিহ্নিত করে বি-এস-এফ-এর হাতে তুলে দিয়ে বিনা বিচারে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার তুঘলকী কাণ্ড ঘটিয়ে আসছে। এবার পশ্চিমবঙ্গে নতুন ক্ষমতায় এসে বিজেপি এই তুঘলকী কাণ্ডকেই নতুন উচ্চতায় তুলে নিয়ে যাচ্ছে। বিজেপি সরকারের মুখ্যমন্ত্রী ক্ষমতায় এসেই চায়ের দোকানে বসে বাজার গরম করার ঢঙে বলে দিয়েছেন যে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী সন্দেহে ধৃতরা কেউ আমাদের জামাই নয় যে তাদের জেলে বসিয়ে কোর্টে বিচার শেষ হওয়ার অপেক্ষায় মাসের পর মাস বা বছরের পর বছর ভাত-মাছ-ডিম খাইয়ে আমাদের পয়সা নষ্ট করতে হবে, তাই এদের ধরে জেল-টেল নয়, একেবারে হোল্ডিং সেন্টারে তোলা হবে ও বি-এস-এফ দিনকয়েকের মধ্যে সব ভেরিফিকেশন-টেরিফিকেশন সাঙ্গ করে সীমান্তের ওদিকে চালান করে দেবে। একেই নাম দেওয়া হয়েছে পুশ-ব্যাক। সরকারি নির্দেশ থেকে জানা যাচ্ছে যে এই প্রতিটা হোল্ডিং সেন্টার থেকে প্রতি ১৫ দিন অন্তর রিপোর্ট পাঠাতে হবে ভারতরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র দফতরে যে কতজনকে ধরা হলো ও কতজনকে পুশ-ব্যাক করা হলো। কিন্তু এই কোনো তথ্যই জনপরিসরে সবার জানার জন্য হাজির করার কোনো সদিচ্ছা সরকারের দেখা যাচ্ছে না। হোল্ডিং সেন্টারগুলোয় যাদের এনে তোলা হচ্ছে তাদের কোথা থেকে ধরা হয়েছে, কতজনকে ধরা হয়েছে, তাদের নাম-পরিচয় কী, তাদের হোল্ডিং সেন্টার থেকে যখন বের করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তখন কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, পুশব্যাক করলে কোথা দিয়ে পুশব্যাক করা হচ্ছে, বাংলাদেশে তারা গৃহীত হচ্ছে কিনা, এই কোনো তথ্যই জানানো হচ্ছে না। আমরা ব্যক্তিগতভাবে নাগরিক হিসেবে একাধিক পুলিশ অফিসার ও বি ডি ও-র কাছে এই তথ্য চেয়ে উত্তর পেয়েছি যে এগুলো ‘সেনসিটিভ’ (স্পর্শকাতর) তথ্য তাই জানানো যাবে না, অনেকে আবার বলেছেন যে তাঁরা নিজেরাই এসব তথ্য পাচ্ছেন না। তাই বোঝা যাচ্ছে যে সরকারিভাবেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে সবাইকে জানানো হবে না--- বি-এস-এফ, আধাসামরিক বাহিনী ও উপর-মহলের কিছু মন্ত্রী-আমলার মধ্যে সবকিছু সীমাবদ্ধ রেখে এই তুঘলকী কাণ্ডটি চালিয়ে যাওয়া হবে। সংবাদপত্র ও গণজ্ঞাপনমাধ্যম-ও এ নিয়ে মোটামুটি চতুর নীরবতা রক্ষা করে চলেছে।

ওদিকে বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে এবং বাংলাদেশ সরকার ও বি-জি-বি-র মুখপত্রদের নানা বিবৃতি থেকে জানা যাচ্ছে যে বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ এই পুশ-ব্যাক (তাদের ভাষায় পুশ-ইন) মোটেই মেনে নিচ্ছে না, সরকারীভাবে তা তারা একাধিকবার ভারতরাষ্ট্রকে জানিয়েও দিয়েছে, বি-এস-এফ ও বি-জি-বি-দের যৌথ সভাতেও এই আপত্তি জানিয়ে রেখেছে, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের দাবি যে প্রত্যর্পণ করতে হলে তা মান্য আইন ও প্রক্রিয়া মেনেই করতে হবে, তারা অভিযোগ করছে যে সীমান্ত বরাবর ভারত-রাষ্ট্র গা-জোয়ারি করে লোক ঢুকিয়ে দিতে চাইছে এবং এই গা-জোয়ারি তারা মানবে না ও প্রতিরোধ করবে। বাংলাদেশে সংবাদপত্র থেকে এ-ও জানা যাচ্ছে যে এই প্রতিরোধের কাজে কেবলমাত্র বি-জি-বি বন্দুকহাতে সীমানা পাহারা দিচ্ছে তা নয়, সেখানে সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোর মানুষদের মধ্যে ‘সচেতনতা-প্রচার’ চালিয়ে সেইসব সাধারণ মানুষদেরও রাতদিন সীমানা পাহারা দেওয়ার কাজে শামিল করা হচ্ছে। বাংলাদেশী সংবাদপত্রের প্রতিবেদন থেকেই জানা যাচ্ছে এই ‘সচেতনতা-প্রচার’-এর রূপ: সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোর সাধারণ মানুষদের কাছে প্রচার করা হচ্ছে যে শত্রুভাবাপন্ন ভারতরাষ্ট্র বাংলাদেশে অশান্তি ও অস্থিরতা তৈরির জন্য ও উন্নয়নে বাধা প্রদানের জন্য ‘ভারতীয় রোহিঙ্গা’-দের ঠেলে ঢুকিয়ে দিচ্ছে, যে-কোনো-মূল্যে তা আটকাতে হবে।

রোহিঙ্গা হলো মায়ানমার দেশের এক জনজাতি, তাদের মুখের ভাষা বাংলার খুব কাছাকাছি হলেও পুরো এক নয়, মায়ানমার রাষ্ট্রে তারা সংখ্যালঘু ছিল, সংখ্যাগুরু বর্মী জনজাতি ও মায়ানমার রাষ্ট্রের যৌথ আক্রমণে বছর-দশেক আগে তারা বাস্তুভিটে-সম্বল সব হারিয়ে তাদের দীর্ঘদিনের বসতির গ্রামগুলো ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়। তাদের গ্রামের পর গ্রাম আগুন লাগিয়ে জ্বালিয়ে দিয়ে আধিপত্যকারী বর্মী জনজাতিরা দখল করে নেয়। পালাতে গিয়ে বহু রোহিঙ্গা নৌকাডুবি হয়ে সাগরে মারা গেছে। তাদের সিংহভাগ বাংলাদেশেরই চট্টগ্রাম অঞ্চলের উদ্বাস্তু শিবিরে আশ্রয় নিয়েছে। ভারতেও সেই সময় কিছু রোহিঙ্গা এসেছিল, দিল্লীতে তাদের একটি উদ্বাস্তু শিবিরও গড়ে উঠেছিল, কিন্তু তারা ধর্মে মুসলমান বলে ভারতের হিন্দুত্ববাদীরা তাদের বিরুদ্ধে লাগাতার আক্রমণ ও অপপ্রচার লাগু করে, সরকারে হিন্দুত্ববাদী বিজেপি গেঁড়ে বসার পর তাদের হেনস্থা ও তাড়া-করে-খেদানো শুরু হয়, ফলে ভারতে এখন আর রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু নেই বললেই চলে। বিশ শতকের মাঝে  এমনই রাষ্ট্রীয় নিপীড়নে উদ্বাস্তু হওয়া তিব্বতীদের জন্য নতুনভাবে থাকা ও বাঁচার দরজা খুলে দিয়ে যে ভারত সহমর্মীতা-কুটুম্বিতার নতুন মানবিক নিদর্শন হয়ে উঠেছিল, আজ একুশ শতকে এসে ধর্মীয় ঘৃণার বিষে জর্জর হয়ে সে অসহায় রোহিঙ্গাদের উপর  ঘৃণা-বিদ্বেষ-হিংসার রাষ্ট্ররোষ দেখিয়ে চূড়ান্ত অমানবিকতার পরাকাষ্ঠা হয়ে উঠেছে। এ লজ্জা আমাদের সবার। আর বাংলাদেশ রাষ্ট্রও যে রোহিঙ্গাদের খেদিয়ে-বেড়ানোর মতো মানবেতর কোনো জন্তু হিসেবেই দেখছে, গোঁড়া মুসলিম আইনকানুন প্রবর্তন নিয়ে সেখানে এতো উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা গেলেও বিপদে-পড়া মুসলমান পড়শিদের জন্য সেখানেও যে সহানুভূতি-সমবেদনা নিরক্ত ফ্যাকাশে হয়ে উঠেছে, ‘ভারতীয় রোহিঙ্গা’ শব্দবন্ধ উদ্ভাবন ও তাদের শত্রু রূপে দেখার মধ্য দিয়ে তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ফলে হিংসা-দ্বেষ-এ উন্মত্ত দুই জাতিরাষ্ট্রের সাঁড়াশি-চাপে পড়ে পুশ-ব্যাক হওয়া মানুষগুলোর মর্মান্তিক পরিণতির ছবি এখন তৈরি হয়ে চলেছে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের মধ্যবর্তী নো-ম্যানস-ল্যান্ড বা শূন্যরেখা বরাবর। সেইরকম একটি ছবি দিয়েই এই লেখা শুরু করেছিলাম। এবার সেই ছবিগুলোর দিকে আরো বিশদে তাকানো যাক।

৪ জুন দেখা গিয়েছিল যে হবিবপুর ব্লকের আশরাফপুর সীমান্তে ভারত ও বাংলাদেশ দুই রাষ্ট্রের কাঁটাতারের মাঝের শূন্যরেখায় ২৮ জন মানুষ বসে রয়েছে। একদিকে বন্দুক উঁচিয়ে বি-এস-এফ যারা তাদের ভারতের দিক থেকে ঠেলে এখানে ঢুকিয়ে দিয়েছে। আর অন্যদিকে বন্দুক উঁচিয়ে বি-জি-বি, সঙ্গে মারমুখী বাংলাদেশী জনতা, যারা কোনোমতেই এদের বাংলাদেশে ঢুকতে দেবে না।

এই একই ছবির পুনরাবৃত্তি ঘটে চলেছে সীমান্তের আরো বহু জায়গায়: উত্তর চব্বিশ পরগণার হাকিমপুর, মালদার আশরাফপুর, উত্তর দিনাজপুরের ইসলামপুর, কুচবিহারের গীতালদহ, …।

বাংলাদেশের সংবাদ পোর্টাল এশিয়া পোস্ট, প্রেস টিভি, কালবেলা-য় বি-জি-বি-র এক অধিকর্তাকে উদ্ধৃত করে এই সংবাদ প্রকাশিত হয়: ১ জুন ভারতের হাকিমপুর সীমান্ত সংলগ্ন বাংলাদেশের সাদিপুর মাঠে ১২ জনকে দেখা গিয়েছিল, বি-এস-এফ এদের ঠেলে ঢুকিয়ে দিয়েছিল, বি-জি-বি পাল্টা পাহারা দিচ্ছিল যাতে এরা বাংলাদেশের মধ্যে আর ঢুকতে না পারে, টানা দুদিন তারা এভাবে পড়ে ছিল, দুদিন পর বি-জি-বি এক সকালে খেয়াল করে যে তাদের পোঁটলা-পুঁটলি সব মাঠে ছড়িয়ে পড়ে আছে, কিন্তু মানুষগুলোর কোনো হদিশ নেই, ফাঁকতালে কোনোভাবে তারা বাংলাদেশে ঢুকে গেছে কিনা দেখতে বি-জি-বি সীমান্তবর্তী সব গ্রামে চিরুনি-তল্লাশি চালায়, এমনকি ড্রোন উড়িয়েও তল্লাশি করা হয়, কিন্তু কাউকেই খুঁজে পাওয়া যায়নি।

এখন প্রশ্ন হলো, এই ১২ জনের কী হলো? বি-এস-এফ সাধারণভাবে বলছে যে পুশ-ব্যাক করতে চাওয়া ‘অনুপ্রবেশকারীদের’ বি-জি-বি-র বাধায় পুশ-ব্যাক করতে না পারলে বি-এস-এফ আবার তাদের নিয়ে অন্য কোনো হোল্ডিং সেন্টারে তুলছে সীমান্তের অন্য কোথাও দিয়ে পুশ-ব্যাক করার জন্য। এই ১২ জনের ক্ষেত্রে যদি তাই-ই হয় তাহলে তাদের পোঁটলা-পুঁটলিতে বাঁধা তাঁদের শেষ সম্বলটুকু মাঠে পড়ে রইলো কেন? এই শেষ সম্বলটুকু আঁকড়ে ধরেই তো তাঁরা আশ্রয়চ্যুত হয়ে হোল্ডিং সেন্টারের জেলখানা থেকে অজানা অন্ধকারের দিকে যাত্রায় টিকে থাকতে চেয়েছিলেন, এগুলো তো তাঁরা প্রাণ থাকতে ফেলে যাবেন না। তাহলে কি তাঁদের খুন করে লাশ গায়েব করে দেওয়া হয়েছে? তা হয়ে থাকলে, কে তাঁদের গুম-খুন করলো: বি-এস-এফ নাকি বি-জি-বি?

জুন থেকে শুরু হয়ে লাগাতার এ-ঘটনা ঘটে চলেছে প্রতিদিন সীমান্তের নানা স্থানে। শূন্যরেখায় বসে-থাকা পুরুষ-মহিলা-শিশু-বৃদ্ধের ছবি মাঝে-মধ্যে ফেসবুক-হোয়াটসঅ্যাপ ঘুরে আমাদের মোবাইলেও এসে হাজির হচ্ছে। তা দেখছি আমরা, একে-অপরকে পাঠাচ্ছি, মন্তব্য সেঁটে দিচ্ছি, চতুর-ফোন-এর উজ্জ্বল নীল আলোয় আমাদের ভাষার জেল্লায় তা কেবল উপভোগ্য কিছু সংকেত-বিনিময় হয়ে থাকছে, কোথাও কোনো বুক-ফাটা-বেদনা নেই, মেনে-নিতে-না-পারা-র অস্থিরতা নেই, নিজেদের সাজানো-গোছানো নিরাপদ অবস্থানের মধ্যে বসে তার সীমানার বাইরে কোনো বাঘের হরিণ-শিকার ও সেই শিকারের রক্তে সব ঝর্ণার জলের রঙ লাল হয়ে যেতে দেখে আমরা যেন ট্যুরিস্ট-সুলভ-চোখ-এ নিসর্গদৃশ্য দেখে চলেছি, আর মাঝে-মধ্যে আমাদের এই স্বর্ণখচিত সভ্যতার সুছাঁদ পানপাত্র ছাপিয়ে ভিতরের গরল ফেনিল উচ্ছ্বাসে উপছিয়ে পড়ছে। না, আমি এখানে ভাষার জেল্লা মাখিয়ে কাব্য করছি না, গরল বলতে কী বলছি তার কিছু নমুনা তুলে ধরি--- হয়তো আপনারাও আপনাদের চতুর-ফোনে এগুলো দেখেছেন, তবু আরো একবার এগুলোর চোখে চোখ রেখে দাঁড়ান।

শূন্যরেখায় দিনের পর দিন খাওয়া-দাওয়া-জল ছাড়া বসে থাকা এক বছর বারো-তেরো-র মেয়ের অসহায় আর্তি ‘সারাদিন জল নেই… খাওয়া নেই… গা-ধোয়া নেই… এভাবে বসে থাকা…’ আর তার কান্নায় ভেঙে পড়ার একটা ‘ভিডিও-ক্লিপ’ চতুর-ফোনে খুব ছড়িয়েছিল, আপনিও নিশ্চয়ই দেখেছেন। অনেকে সহানুভূতি প্রকাশ করে তা ‘শেয়ার’ করেছিল। তারপরই মন্থন-জাত গরল উঠে এলো। আমি কারও নাম উল্লেখ করছি না, তাদের মন্তব্যগুলো শুধু উল্লেখ করছি, কারণ শিক্ষিত-মধ্যবিত্ত/উচ্চবিত্ত হলেই এহেন গরলধারীদের কোনো মনুষ্য-নাম-উপযুক্ত বলে আমি মনে করি না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারসাজিতে দক্ষ একজন মেয়েটির ছবি ব্যবহার করে তার মুখে হাসি সেঁটে কমিকস-এর ঢঙে তার মুখে এই কথাগুলো বসালো: ‘হোল্ডিং সেন্টার-এ বসে-বসে হারামে ভাত-মাছ খাওয়ার সুখই আলাদা’। কৃত্রিম-বুদ্ধিমত্তা-বাগীশ এই মহাজনকে ধরে হোল্ডিং সেন্টারে নিয়ে গেলে তিনি এই সুখ উপভোগ করার আনন্দে নাচতে নাচতে সেখানে যাবেন তো? নাকি তিনি নিজেকে মানুষ মনে করেন আর এই অভাগা মেয়েটিকে না-মানুষ কোনো জন্তু-জানোয়ার মনে করেন, তাই তাঁর সুখ-এর মাপে এই মেয়েটির সুখ মাপেন না? আরেকজন অতি-শিক্ষিত করপোরেট-চাকরি-ধারী বীরপুরুষ মন্তব্য করেছেন: এসব লোকগুলোকে আগেকার দিনের দাস-বাজারের মতো নীলামে তুলে বিক্রি করে দিলে দেশের উন্নতি হবে কারণ করপোরেটরা এদের কিনে নিয়ে এদের শরীর থেকে দাস-শ্রম নিঙড়ে নেবে, তাতে জি-ডি-পি বাড়বে। এই মহা করপোরেট-বাগীশের ফেসবুক-পোস্ট-এ মন্তব্য জুড়ে আরো বিকল্প পন্থার হদিশ দিয়েছেন আরো কিছু শিক্ষিত ব্যক্তি। একজন বলেছেন এদের গিনিপিগ করে বিভিন্ন ওষুধের ট্রায়াল চালানো উচিত, আরেক সাজ-পটীয়সী মহিলা বলেছেন এদের মেরে ফেলে কঙ্কালগুলোকে ডাক্তারি-কলেজের পড়ুয়াদের হাতে তুলে দেওয়া উচিত, তাতে ল্যাব-এ কঙ্কালের অভাব ঘুচবে…। পাঠক, চোখে চোখ রেখে তাকান আপনারই চারদিকে আপনারই মতো তথাকথিত সুভদ্র মন্তব্যকারীদের চোখের দিকে? কী মনে হচ্ছে? মানুষ অ্যানথ্রোপোসেন্ট্রিক হয়ে উঠে সেই কবেই না অন্য সমস্ত প্রজাতির প্রাণীদের সহ গাছপালা-নদনদী-বাতাস-মাটি সবকিছুকে নিজেদের আরাম-আয়াস-সাধন-যজ্ঞে নির্বিচারে ধ্বংস-ধ্বস্ত করার সংবেদনহীনতা স্বাভাবিক করে নিয়েছিলো, আজ কি আরো কয়েক ধাপ এগিয়ে মানুষের-ই মধ্যেকার সুযোগ-সুবিধা-ধারী ক্ষমতালগ্ন একটা অংশ বাকি সমস্ত অংশকে একইভাবে ধ্বংস-ধ্বস্ত করাকে একইরকম বৈধ বলে ‘নতুন-স্বাভাবিকতা’ হাজির করতে চাইছে? মানুষের এই সংবেদনহীন স্বার্থপর পশু হয়ে-ওঠা-র বিবর্তনে আপনিও কি শরিক? হ্যাঁ, হয়তো আপনি এমন ‘পোস্ট’ করেননি; এমন খুন-করা, গিনিপিগ-করা, দাস-শ্রমিক-করা বাকতাল্লা থেকে সরকারী নীতি হয়ে-ওঠার পথে এগোলে আপনি হয়তো একটা-দুটো প্রতিবাদী সেমিনার বা মিছিল (তাও পুলিশ-পারমিশন পেলে) করবেন, ইউরোপীয় ফ্যাসিবাদের সঙ্গে এর তুলনা-প্রতিতুলনা করে রাজনৈতিক তত্ত্বের জ্ঞান জাহির করবেন, কিন্তু তারপর? আপনিও কি অর্থহীন চিহ্ন-সর্বস্ব হয়ে ওঠা এই প্রতিবাদের আচারগুলো সেরে আবার আপনার হিসেব-কষা নিরাপত্তা-বলয়-এর মধ্যে সেঁধিয়ে যাবেন না? আপনার চারদিকে সুযোগ-সুবিধা-আঁকড়ে ক্ষমতার গায়ে সেঁটে থাকতে চেয়ে এই যে আপনার-ই মতো মানুষরা হিংসা-দ্বেষ-ধ্বংস-হত্যার নয়া স্বাভাবিকতায় মশগুল হয়ে উঠেছে, তাদের চোখে চোখ রেখে নিরন্তর প্রতিরোধের কোনো উপায় কী আপনার নেই? আপনিই ভাবুন। ততক্ষণ আমরা একটু চোখ মেলে দেখার চেষ্টা করি যে যাদের হোল্ডিং সেন্টার-এ পুরে, শূন্য রেখায় ফেলে রেখে মৃত্যু বা দাস-শ্রম বা না-মনুষ্যত্বের অন্ধকারের মধ্যে ডুবিয়ে দেওয়া হচ্ছে তারা ঠিক কারা?

 ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গের সদ্য-হয়ে-যাওয়া বিধানসভা নির্বাচনের আগে ভারতের নির্বাচন কমিশন যে বিশেষ নির্বাচক তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়া নিয়েছিল, ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ বা সংক্ষেপে এস-আই-আর (বা লোকমুখে ‘সার’) নামে যা হুলস্থুল বাধিয়েছিল, তা আসলে ব্যাপক হারে নির্বাচকদের নাম বাদ দেওয়ার এক যজ্ঞ হয়ে উঠেছিল। আধার কার্ড, ভোটার কার্ড, রেশন কার্ড,… কোনটা দিয়ে যে ঠিক নির্বাচকত্ব প্রমাণ করা যাবে তা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি করা হয়েছিল, নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ‘ডকুমেন্ট’-এর লম্বা তালিকা দেওয়া হচ্ছিল, চোদ্দগুষ্টির অতো ‘ডকুমেন্ট’ সাধারণ মানুষ অনেকেই জমিয়ে রাখেন না, এতোদিন এসবের কোনো দরকারও পড়েনি। নির্বাচন কমিশনের হয়ে কাজ করছিল যে বি-এল-ও-রা তারাও নিশ্চিত ছিলেন না কী কী ‘ডকুমেন্ট’ ঠিক নিতে হবে। মালদা জেলার মুথাবাড়ির বাঙ্গিটোলা গ্রামে ঘুরে বেশ কিছু সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে দেখেছি যে তাঁদের কাছে এমন ‘ডকুমেন্ট’ ছিল যা বি-এল-ও-রা প্রথমে বলেছে দরকার হবে না, অথচ পরে তা দাখিল না করার অজুহাতেই তাঁদের নাম নির্বাচক তালিকা থেকে বাদ গেছে। এই বাঙ্গিটোলা গ্রাম গঙ্গা-ভাঙন এলাকার মধ্যে পড়ে, এখানকার বহু মানুষ ভাঙনের কবলে পড়ে তিন থেকে চারবার বাড়ি ও ভিটে হারিয়ে এখন হয়ত এই চতুর্থ বা পঞ্চমবার  আবার নতুন করে বাসা বেঁধেছে। শহুরে বাবুরা যতোটা ভাবেন, এঁদের পক্ষে সব ‘ডকুমেন্ট’ সংরক্ষণ করে রাখা, বা, সব ‘ডকুমেন্ট’-এ বানান-টানান সব ‘যৌক্তিক সুসঙ্গত’ করে রাখা মোটেই ততো সহজ বা স্বাভাবিক ব্যাপার নয়। এলাকাটি মুসলমান-প্রধান। এখানকার ওয়ার্ডগুলোয় ৫০ শতাংশ থেকে ৬০ শতাংশ নাম নির্বাচক-তালিকা থেকে বাদ পড়েছে।  গোটা পশ্চিমবঙ্গে এমনভাবে নাম বাদ পড়েছে প্রায় ৯১ লাখ মানুষের, যাদের সিংহভাগ মুসলমান। কোর্টের নির্দেশে এই বাদ-পড়া মানুষদের আপিলের ভিত্তিতে পুনর্বিচারের জন্য ‘ট্রাইবুনাল’ গঠিত হয়েছিল কলকাতার কাছে জোকায়। সেখানে আপিল করতে পেরেছেন এখনও অবধি বড়জোর ৩৪ লাখ মানুষ। তাদের মধ্যে মাত্র কয়েক হাজারের কেস বিচার হয়েছে, যাদের ক্ষেত্রে দেখা গেছে প্রায় সবারই (৯৬ শতাংশের উপর) নাম বাদ দেওয়া ঠিক হয়নি, তাঁরা বৈধ নির্বাচক। কিন্তু ভোট মিটতে না মিটতেই সেই ট্রাইবুনাল-এর সমস্ত প্রক্রিয়া স্তব্ধ করে দেওয়া হয়েছে, আর কোনো বিচার সেখানে হচ্ছে না, নতুন করে ট্রাইবুনালে আপিল করার রাস্তাও দেখা যাচ্ছে না। এর থেকে একটা সহজ হিসেব আমরা করতে পারি। হিসেবটা এরকম: ‘সার’ করে নির্বাচক তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া হয়েছে ৯১ লাখ মানুষের, গড় মৃত্যুহার ধরে নিলে আন্দাজ করা যায় যে এর মধ্যে মৃত্যুর কারণে যথার্থভাবেই নাম বাদ গেছে বড়জোর ৫ থেকে ৬ লাখের, বসত-পরিবর্তনের জন্য ধরা যাক আরো ৫ থেকে ৬ লাখ-এর নামও যথার্থভাবেই বাদ গেছে, তাহলে পড়ে থাকে প্রায় ৮০ লাখের মতো মানুষ, এই ৮০ লাখের মধ্যে ট্রাইবুনালে আপিল করেছেন ৩৪ লাখ, ফলে এই ৩৪ লাখের বিচারাধীন অবস্থানের জন্য তাঁরা কিছু আইনি রক্ষাকবচ পাবেন, পড়ে থাকলো আরো অন্তত ৪৬ লাখ। এই ৪৬ লাখ মানুষ ট্রাইবুনালো এখনও আপিল করতে পারেন নি, ট্রাইবুনালকে শীতঘুমে পাঠিয়ে দেওয়ায় তাঁদের করার সম্ভাবনাও এখন নেই, আর এঁদের মধ্যে অন্তত ৯৫ শতাংশ (ট্রাইবুনালে বিচার সম্পন্ন হওয়া ক্ষেত্রে যে হার দেখা গেছে তা ধরে নিচ্ছি, কারণ এঁরা ট্রাইবুনালে আপিল এড়িয়ে যেতে চাইছেন এমন নয়, যতোজনের সঙ্গে কথা হয়েছে তাঁরা আপিল করতেই চান কিন্তু করে উঠতে পারেননি) বৈধ নির্বাচক ও বৈধভাবেই পশ্চিমবঙ্গের নাগরিক ধরে নিলে তার সংখ্যাটা দাঁড়ায় ৪০ লক্ষের কাছাকাছি। এই ৪০ লক্ষ মানুষের এখন আর কোনো আইনি রক্ষাকবচ নেই, তাঁরা যে এ দেশের নাগরিক তা প্রমাণ করার বিতর্কাতীত কোনো উপায় নেই, এদের সিংহভাগই হলো বাংলাভাষী গরিব মুসলমান, খেটে-খাওয়া-মানুষ। ফলে ‘হিন্দু পশ্চিমবঙ্গ’ স্থাপন করতে উদগ্রীব বি-জে-পি সরকারের পক্ষে এদের গায়ে বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী তকমা সেঁটে দেওয়া এখন ছেলেখেলার মতো সহজ হয়ে উঠেছে। বি-এস-এফ, পুলিশ, সরকারি দপ্তর এখন করছেও তাই। হোল্ডিং সেন্টারগুলোর হাঁ-করা-মুখ এদেরই গিলতে চাইছে। মালদায় ধরে নিয়ে যাওয়া প্রথম নয়জন ছিলেন এরকমই, প্রথমে তাঁদের নির্বাচক-তালিকা থেকে ছাঁটা হয়েছে, তারপর তাঁদের বাংলাদেশী বলে ‘হোল্ডিং সেন্টার’  ও ‘পুশব্যাক’ নামক অন্ধকার গুহায় অদৃশ্য করে দেওয়া হয়েছে।

অবশ্যই এর সঙ্গে আছে বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন সময়ে এ-দেশে জীবিকার খোঁজে এসে বসবাস করে যাওয়া মানুষও। কেউ হয়তো কয়েক বছর হলো এখানের কোনো শহরতলীতে এসে বাসা বেঁধে মজুর-এর কাজ নিয়ে রোজগার করতে শুরু করেছিলেন। কারও জীবনের পুরোটাই বা বেশির ভাগটাই কেটেছে পশ্চিমবঙ্গে, তাঁদের ছেলে-মেয়েদের জন্মও হয়েছে এখানে, এখানকার স্কুলেই তারা ভর্তি হয়েছে, আর তাঁরা কেউ হয়তো রাজমিস্ত্রীর কাজ করেন, কেউ রাজমিস্ত্রীর জোগাড়ে, কেউ কলের মিস্ত্রী, কেউ রঙের মিস্ত্রী, কেউ কাঠের মিস্ত্রী, আবার কেউ হয়তো বাজারে সবজি বা মাছ বিক্রি করেন। এখন যে এলাকায় তাঁরা ঝুপড়ি ঘরে থাকতেন বা ঘর ভাড়া নিয়েছিলেন, সেখানে হিন্দুত্ববাদী ক্যাডাররা এসে হুমকি দিয়ে তাঁদের পাড়া-পড়শিদের শঙ্কিত করে তুলেছেন, সেই চাপে ঘর হারিয়ে, জীবিকা হারিয়ে তাঁরা এখন বাধ্য হচ্ছেন ছোটো ছেলে-মেয়েদের হাত ধরে সীমানা-গেট-এ গিয়ে হাজির হতে, যদি সীমানা পেরিয়ে এ-পারের নরক হয়ে ওঠা জীবন থেকে পালানো যায়, তাঁদের এতোদিনের পরিশ্রম-আশা-স্বপ্ন সব ধ্বংসস্তূপ হয়ে পড়ে থাকছে তাঁদের পিছনে। সীমান্ত তাঁরা পেরোতে পারছেন না, বি-এস-এফ প্রথমে তাদের ‘বায়োমেট্রিক ডেটা’ নথিভুক্ত করছে, তারপর জড়ো করে জালে-ঘেরা গাড়িতে ঠেসে পুরে কাছে-দূরের হোল্ডিং সেন্টারগুলোতে এনে বন্দী করছে।

বসিরহাট জেলার হোল্ডিং সেন্টারগুলো এভাবে এতোই ঠাসাঠাসি হয়ে গেছে যে অন্য জেলায় হোল্ডিং সেন্টার খুলে নিয়মিত ধৃতদের স্থানান্তরিত করা হয়ে চলেছে। এই স্থানান্তরিতকরণের জন্য খোলা হোল্ডিং সেন্টার-গুলোর একটা হয়েছে চাকদায়। খবর পেয়ে আমরা দেখতে গেছিলাম। চাকদার আট নম্বর ওয়ার্ডে পৌর সভার বানানো কপালকুণ্ডলা ভবন জুনের গোড়া থেকে পুরোদস্তুর হোল্ডিং সেন্টার হয়ে গেছে। দু-তলা একটা বাড়ি, সামনে একচিলতে মাঠ, নাতি-উচ্চ পাঁচিলে ঘেরা, দোতলার বারান্দায় ও একতলার গেটে আধা-সামরিক বাহিনী ও পুলিশ-এর যৌথ পাহারা। কাউকে ঢুকতে দেওয়া হবে না, কাউকে বেরোতেও না। বাইরে থেকে ভিতরে বন্দী করা মানুষদের কাউকে দেখাও যাচ্ছে না। বাড়িটি একটি সাধারণ পাড়ার মধ্যে। বাড়িটির সামনের দুটো বসতবাড়ির দুই বয়স্কা মহিলার সঙ্গে কথা হলো। তাঁরা বললেন: রোজই তো গাড়ি করে লোক ধরে আনছে, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা মহিলা আর শিশুই বেশি, সব মুসলমান, শোনা যাচ্ছে এদের নাকি বসিরহাট থেকে আনছে, আমরা কারো সঙ্গে তো কোনো কথাবার্তা বলতে পারি না, যাদের ধরে আনছে তাদের সঙ্গে না, পুলিশদের সঙ্গেও না, তারপর রোজই গাড়ি করে এখান থেকে লোকজনকে নিয়ে আবার কোথায় চলেও যাচ্ছে কে জানে, প্রথম দিনে তো খান-পঁচিশ জনকে ধরে এনেছিল, এখন এই রোজ আনা-নেওয়ার মধ্যে কজন ঠিক আছে কে জানে… দেখে খুব কষ্ট হয়… কিন্তু কী করার আছে?

হ্যাঁ, পাঠক, আমিও জানি না কী করার আছে। এটুকু জানি যে এ সহ্য করা যায় না। তাই উপছে-ওঠা অস্থিরতা নিয়ে আপনাকে পড়ানোর জন্য এ লেখাটা লিখে ফেললাম। যদি পড়েন। যদি ভাবেন। তাহলে একা নয়, একসঙ্গে ভাবা যাবে সত্যিই কি কিছু করার নেই?

 

[বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে দেখার সময় আমার সঙ্গীরা ছিল: অর্ঘ্যদীপ, কাশ্যপেয়, অনিরুদ্ধ, সুশোভন, এই লেখার পিছনের ভাবনাচিন্তা আমাদের সবার আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়েই গড়ে উঠেছে। বাঙ্গিটোলার খিদির বক্স ও তরিকুল ইসলাম এবং মালদা টাউন-এর গৌতম চৌধুরী ও গৌতম পাল তাঁদের নানা ভাবনা-চিন্তা-পর্যবেক্ষণ বিনিময় করে আমাদের সাহায্য করেছেন।]

২৬ জুন, ২০২৬

0 Comments
Leave a reply