১
কেবলমাত্র উত্তর দিনাজপুর জেলাতেই নয়, গোটা উত্তর বাংলাতেই রসাখোয়া একটি অতি প্রাচীন ও বড়ো হাট। সেই প্রাচীন পুণ্ড্রবর্ধন ভুক্তির সময়কাল থেকে মৌর্য, গুপ্ত, পাল ও সেন রাজবংশের শাসনকাল ও তারও পরে মুঘল ও ব্রিটিশ শাসনকালে এই এলাকার নাগর নদী বেয়ে মানুষ ও দ্রব্যসামগ্রীর আনাগোনা চালু থেকেছে, একের পর এক হাট গড়ে উঠেছে, রসাখোয়া তেমনই এক অতি পুরাতন হাট। হাট বসার দিন রবিবার, সেদিন ক্রেতা ও বিক্রেতা বহু দূর দূর থেকে এসে এখানে জড়ো হয়। রায়গঞ্জের কাছে দেবীনগরে বড়ো হয়েছে আমার এক বৌদি, বৌদির বাবা বাড়িতে মিষ্টি তৈরি করে আশপাশের নানা হাটে ঘুরে ঘুরে বিক্রি করে অভাবের সংসার চালিয়েছেন। সেই বৌদি বলছিলো যে ছোটবেলা থেকে সে দেখে আসছে রবিবার হলেই বাবা বড়ো হাঁড়ি ও ড্রামে মিষ্টি ভরে সকাল-সকাল বাস ধরে রসাখোয়া পাড়ি দিতো, রায়গঞ্জ থেকে বাসে দেড়-দু ঘন্টা, সারাদিন রাসাখোয়া হাটে বিক্রির পর কিছু কিছু দিন এতো রাত হয়ে যেত যে ফেরার গাড়ি পাওয়া সমস্যা হয়ে যেতো। এই হাটের কেন্দ্রে ছিলো গরুর হাট। বিশাল বড়ো জায়গা জুড়ে গরুর হাট বসতো--- হালের গরু, গাড়ি-টানা গরু, দুধেল গরু, গতর-হারানো গরু, এঁড়ে, বকনা, বাছুর--- চাষী-গৃহস্থ-গোয়ালা-কসাই যে যার প্রয়োজন মতো গরু কিনতে-বেচতে হাজির হতো এখানে। হরেক জনের হরেক রকম বিচার--- কেউ গরুর দাঁত দেখে যাচাই করছে, কেউ দাবনা থাপড়িয়ে যাচাই করছে…। করণদিঘি এলাকার কৃষিভিিত্তক গ্রামগুলোর অর্থনীতির চাকা প্রতি রবিবারের এই গরুর হাটের দিনভোর-তোলপাড়-এর মধ্য দিয়ে আবর্তিত হতো। আর এই গরুর হাটকে ঘিরে রসাখোয়া হাটের অন্যান্য অংশ, যেমন: সবজি ও ফলের (বিশেষ করে আনারসের) হাট, পাট-ধান-চালের হাট, ডাল (বিশেষ করে ভাজা মাসকলাই ডাল)-এর হাট লেগে থাকতো। রবিবার ছাড়া সপ্তাহের বাকি দিনগুলোতেও লোকের আনাগোনা-বিকিকিনি থেমে থাকতো না। এভাবে দূর-দূর গ্রামের মানুষদের নিয়মিত একত্র হওয়ার জায়গায় পরিণত হওয়ার ফলে ধীরে ধীরে এই রসাখোয়া হাটের গায়েই গড়ে উঠেছিলো স্কুল, মাদ্রাসা, ছাত্রছাত্রী-আবাস, সরকারি দপ্তর। এভাবে শতকের পর শতক জুড়ে প্রবাহিত গ্রামজীবনের পলি জমতে জমতে তৈরি হওয়া রসাখোয়া যেন তাকে ঘিরে থাকা অসংখ্য গ্রামের অসংখ্য মানুষদের জীবনের এক মুকুর হয়ে উঠেছে। সেই মুকুরে যখন মলিনতার ছায়া ভেসে ওঠে, বোঝা যায় আশপাশের অসংখ্য গ্রামগুলোয় অসুখ বেঁধেছে গুরুতর।
২৯ শে জুলাই, ২০২৬। রায়গঞ্জ বাসডিপো থেকে সকাল সাতটায় ছাড়া সরকারি বাস আমাদের যখন রসাখোয়ায় নামিয়ে দিলো তখনও ন’টা বাজেনি। আমরা চারজন। আজ বুধবার, হাট বসার দিন নয়, তবু হাট-এর উপর দিয়ে দৃষ্টি ঘোরালে ঝিমন্ত ভাবটা কেমন যেন অস্বাভাবিক লাগে। সবচেয়ে আগে চোখে পড়লো একটা বিরাট ফাঁকা জায়গা। এখানে গরুর হাট বসতো। এখন আর বসে না, কারণ, পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুত্ববাদীরা সরকারী ক্ষমতার দখল নেওয়ার পর, গত বকরি ঈদ-এর আগেই গরু কেনাবেচার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে দিয়েছে। পুলিশ ও হিন্দুত্ববাদী পালোয়ানরা এসে রসাখোয়ার গরুর হাটের সব কাঠামো ভেঙেচুরে দিয়ে গেছে। সেই থেকে দুই মাসের উপর হয়ে গেলো গরুর হাট বন্ধ। আর কখনও আবার চালু হবে কিনা কেউ জানে না। কয়েকজন দোকানদার এবং টোটোচালকদের সঙ্গে কথা হচ্ছিলো। তারা আমাদের আঙুল তুলে সীমানা নির্দেশ করতে করতে দেখাচ্ছিলো যে এই দু’মাসের মধ্যেই গরুর হাটের বেশ কিছুটা অংশ বেদখল হয়ে গেছে, তা দখল নিয়ে নতুন ঘর উঠেছে, ইঁটের দেওয়ালে এখনও চুন-সুরকি-সিমেন্টের পলেস্তারা পড়েনি, সরকারি ক্ষমতায় আসা বিজেপি-র অনুগ্রহপুষ্ট কোনো ব্যবসায়ী সেখানে কী দোকান করবেন তা এখনও তাঁরা জানেন না। তাঁরা প্রত্যেকেই নিজেদের মতো করে বলছিলেন যে গোটা হাটটাই শুকিয়ে যাচ্ছে, আগের মতো আর লোকজন হয় না হাটে, এলাকার মানুষেরই বা হাতে পয়সা কই যে বিক্রিবাটা হবে! শুধু পয়সার অভাব নয়, কথা বলতে বলতে টের পাওয়া যাচ্ছিলো যে সন্ত্রস্ত ভাব তাঁদের মধ্যে দলা পাকিয়ে আছে।
হাটের ভিতরে চা-কচুরি-জলখাবারের একটা দোকানে চা খেতে গিয়ে হাটেরই এক দোকানীর সঙ্গে আলাপ হলো। মাঝবয়সী পুরুষ, মুসলমান। সকালে দোকান খুলে চা খেতে এসেছেন। আমাদের দেখে অচেনা ঠেকায় চা-য়ে চুমুক দিতে দিতে জিজ্ঞাসা করলেন আমরা কোথা থেকে এসেছি। কথায় কথায় গরুর হাট বন্ধের কথা উঠতে বললেন যে কেবল রসাখোয়াতেই নয়, করণদিঘি ব্লকে যে তিনটে বড় গরুর হাট ছিলো, সবকটাই বন্ধ করে দিয়েছে। তারপর একটু চুপ থেকে বললেন, গরু বিক্রি কি আর বন্ধ হয়েছে, যারা গরু বেচবে বলে বড়ো করেছে তারা কতোদিন আর ঘরে বসিয়ে বসিয়ে গরুকে খাওয়াবে, ফলে আধাদামে বা তিনভাগের একভাগ দামেও পারলে বিক্রি করে দেয়, সে সুযোগ নিয়ে তারাই গরু কিনে নিয়ে গিয়ে আবার বেচে দিচ্ছে গোস্ত-রফতানিকারী কোম্পানিদের আড়কাঠিদের কাছে যারা নাকি গেরুয়া তিলক কেটে গোরক্ষার মিছিল করে বেড়ায়, খালি আমরা মুসলমানরা কেনাবেচা করলেই দোষ, এখন তো আমরা বকরি ঈদের সময় মুসলমানরা ঠিক করেছিলাম গরু কিনবো না, কিনিও নি, কিন্তু এমনই যদি চলতে থাকে হালের গরু, দুধের গরুই বা আসবে কোত্থেকে…। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি কি তাহলে মনে করেন যে এতোদিনের গরুর হাট পাকাপাকিভাবেই বন্ধ হয়ে গেল। তীব্র চাউনিতে আমার দিকে চেয়ে বললেন, যা সব হচ্ছে তা তো তেমন ধারাই হচ্ছে: এই যে এস.আই.আর করে আমাদের নাম বাদ দিয়ে দেওয়া হলো, তা-ও কীভাবে আবার ফিরবে বলতে পারেন? সোজা চোখে চোখ রেখে তিনি বলে চললেন: আমাদের এই করণদিঘি ব্লকে এস.আই.আর. করে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া হয়েছে দেড় লাখ মানুষের, প্রায় সবাই মুসলমান, বেশির ভাগ মহিলা, বাপ-দাদা-চোদ্দ-গুষ্টির নাগরিক-পরিচয়ের কাগজপত্র হাতড়ে-হুতড়ে জোগাড় করে ঝোলা করে ভোট-করিয়ে-বাবু-দের দরজায় দরজায় ঘুরেও কোনো লাভ হয়নি, ভোট তো দিতেই পারেনি এখন ব্যাঙ্কে-রেশনে-থানায়-দপ্তরে কোথায় কবে কী বিপদে পড়তে হয় সিঁটিয়ে থাকতে হচ্ছে, টেরাইবুনাল করে নাকি আবার সব নাম তোলা হবে, তো তিন মাস চলে গেল টেরাইবুনালে মাত্র ১৫১ জনের হিয়ারিং হয়েছে জেলাসাহেবের অফিসে, তারপর তো টেরাইবুনালও এখন বন্ধ, কবে কী হবে কেউ জানে না, আপনি জানেন? মাথা নীচু করে আমি মনে মনে কেবল একটা হিসাব করছিলাম: ২০১১ সালের জনগণনার হিসাব অনুযায়ী (এখনও অবধি এটাই সর্বশেষ জনগণনা) করণদিঘি ব্লকের জনসংখ্যা ৩,৬৮,৩৩২, অর্থাৎ, তিন লাখ আটষট্টি হাজারের একটু বেশি; তার মধ্যে মুসলমান জনসংখ্যা পঞ্চাশ শতাংশের কিছু বেশি; তা যদি দুই লাখ বলেও ধরে নিই, তাহলে তার প্রায় চার ভাগের তিন ভাগ, অর্থাৎ প্রতি চার জনে তিন জনের নাম ভোটের তালিকা থেকে বাদ গেছে, তারা ভোট দিতে পারেনি…। চায়ের ভাঁড়ে শেষ চুমুক দিয়ে ভাঁড়টাকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে তিনি তখন বলছেন: আর ভোটের তালিকায় নাম থেকেই বা কী হলো, এই তো বাগড়োই গ্রামের জলিল আখতারকে পুলিশ তুলে নিয়ে গেলো হোল্ডিং সেন্টার-এ, তার তো ভোটের তালিকায় নামও উঠেছিলো, ভোটও দিয়েছিলো, এখন তাকে বলছে ‘বাংলাদেশী’…।
২
‘পূবের কলম’ খবরের কাগজে জলিল আখতার-এর খবরটা পড়েই আমাদের এই রসাখোয়ায় আসা। রসাখোয়ার প্রধান সড়কে বাসস্টপের গায়ে অনেকগুলো টোটো দাঁড়িয়ে। তাদের একজন চালকের সঙ্গে কথা হলো তিনি আমাদের বাগড়োই গ্রামে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দিয়ে আসবেন, আমরা কখন ফিরবো তার জন্য অপেক্ষা করতে পারবেন না। ভাড়াও চাইলেন ভালোই। তাই-ই সই। কী আর করা যাবে! এখান থেকে প্রায় ২৩-২৪ কিলোমিটার পথ, হেঁটে তো আর যাওয়া যাবে না!
আমাদের চারজনকে সওয়ার করিয়ে রসাখোয়ার প্রধান সড়ক ছেড়ে সরু কালো পিচের রাস্তা ধরলো টোটো। কিছুটা যেতেই দুপাশে কেবল বিস্তীর্ণ চাষের মাঠ। বর্ষাকাল, তাই ভেজা সবুজ আর নীল রঙের ছোপ চারদিকে। মাঠে কোথাও কোথাও হালকা জলের আস্তরণ। মেঠো বক ওড়াউড়ি করছে। কোথাও ধান গাড়া হয়েছে। কোথাও কাদা-মাটি তোলপাড় করে চারা গাড়ার জন্য মাঠ তৈরির কাজ চলছে। টোটোচালকের কাছ থেকে জানা গেলো যে এখন অনেকে ভুট্টার চাষ শুরু করেছে, বছর দশেক হলো সরকার তাতে উৎসাহ যুগিয়েছিলো, ভালো দাম পাওয়া যাবে বলেছিলো, ধান বা পাট ফলিয়ে চাষি তো এখন বাজার থেকে কোনো লাভই তুলতে পারে না, তাই ভুট্টার চায় বাড়ছে।
বাগড়োই গ্রাম অবশ্য টোটোচালক নিজেও চেনে না। রাস্তায় লোকজনকে জিজ্ঞাসা করতে করতে এগোতে হচ্ছিলো। রসাখোয়া হাট থেকে প্রায় বিশ কিলোমিটার আসার পর বাজারগাঁও-২ গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় ঢোকা গেলো। সেখানে ওই কালো পিচের রাস্তা ছেড়ে আরও সরু সাদা সিমেন্টের রাস্তা ধরতে হলো। সেই রাস্তা ধরে কয়েকটা গ্রাম পেরিয়ে তারপর বাগড়োই গ্রাম। গ্রামগুলো মুসলমান-প্রধান। কিছু বাড়ি পাকা, কিছু বাড়ি অংশত পাকা, বাকি অনেক বাড়িই কাঁচা। বাগড়োই গ্রামে ঢুকে সরু সাদা সিমেন্টের রাস্তাটা একটা মোড় ঘুরে ডানদিকে কিছুটা এগোতেই জলিল আখতারের বাড়ির সামনে এসে পড়লো। রাস্তার আশপাশ থেকে কয়েকজন এসে জড়ো হয়ে দেখিয়ে দিলো জলিল আখতারের কাঁচা বাড়িটি। তার পাশেই একটা পাকা বাড়ি, সেটা জলিল আখতারের মামাতো ভাই মতিউর রহমান-এর। মতিউর রহমানের বাড়ির সামনের ছোটো ঘরটিতে আমাদের নিয়ে বসালেন গ্রামের মানুষরা। মতিউর রহমান ছাড়াও গ্রামের আরো চারজন মাঝবয়সী ও বয়স্ক পুরুষ জলিল আখতারকে নিয়ে তাঁদের আশঙ্কা-দুশ্চিন্তা-র কথা বলতে শুরু করলেন। ঘরের বাইরে দরজার সামনে খানিক্ষণের জন্য এসে দাঁড়ালেন জলিল আখতারের বউ, রুগ্ন বয়স্কা মহিলাটির ঘোমটা-ঘেরা মুখটা যেন বিষাদে পাষাণ হয়ে গেছে, কান্না জমে আছে সারা মুখাবয়বে, ভয়ার্ত দুটো চোখ। খানিক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে আমাদের উপর চোখ বুলিয়ে নিঃশব্দে তিনি সরে চলে গেলেন।

বাগড়োই গ্রামে জলিল আখতারের বাড়ি (ডানপাশে), বাঁদিকে যে পাকা বাড়ির অংশ দেখা যাচ্ছে, তা মতিউর রহমান-এর বাড়ি।

জলিল আখতারের বাড়ি ঢোকার দরজা।

জলিল আখতারের ঘরের সামনের বারান্দায় পাতা চৌকি। রাতে এখানেই শুয়েছিলেন তিনি। এখান থেকেই চুপিসারে পুলিশ তাঁকে তুলে নিয়ে যায়।
মতিউর রহমানের বয়স ষাট পেরিয়ে গেছে। তাঁর ঘরে যেখানে বসে আমরা কথা বলছিলাম সেখানেই তিনি রাতে ঘুমোন। এই ঘরের পাশে সরু গলির ওপারেই জলিল আখতারের ঘর। ২৯শে জুন রাতে পুলিশ যখন জলিল আখতারকে তুলে নিয়ে গেল তখন তিনি কোনও টের পাননি। জলিল আখতার শুয়েছিলেন তাঁর ঘরের বারান্দায় পাতা এক চৌকিতে। ঘরের মধ্যে শুয়ে থাকা তাঁর স্ত্রীও কিছু টের পাননি। মতিউর বলছিলেন যে পুলিশ চুপিসারে এসে জলিলকে ঘুম থেকে তুলে তাদের সঙ্গে যেতে বলে, জলিল কাউকে ডাকতে চাইলে, পুলিশ তাঁর মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে বলে যে মুখ দিয়ে আওয়াজ বের করলেই গুলি করে দেবে। এভাবেই তারা রাতের অন্ধকারে জলিলকে ধরে নিয়ে যায়। সকালবেলা স্ত্রী উঠে জলিলকে না দেখতে পেয়ে প্রথমে ভেবেছিলেন যে তিনি হয়তো ফজরের নামাজ পড়তে গিয়েছেন। কিন্তু বেলা বেড়ে গেলেও তিনি না ফেরায় মতিউর ও অন্যান্য পাড়ার লোকজন তাঁকে চারিদিকে খোঁজ করতে শুরু করে। কোথাও তাঁর সন্ধান মেলে না। অবশেষে গ্রামের একজন বলে যে রাতে পুলিশ গ্রামে ঢুকেছিলো, তারা ধরে নিয়ে যায় নি তো! পায়ে-হাঁটা দূরত্বেই পুলিশ ক্যাম্প, সবাই দল বেঁধে তখন সেখানে যায়। পুলিশ ক্যাম্পের বড়োবাবু লোকটি ভালো নয়, মতিউর বলছিলেন, তাঁর বড়ো টাকার লালস, কেউ কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে তিনি অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত দুই পক্ষকেই আলাদা করে ডেকে ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করেন। তো পুলিশ ক্যাম্পে যেতেই সেই বড়োবাবু হুমকির ফোয়ারা ছিটোতে শুরু করে, বলতে থাকে, তাদের কাছে খবর ছিলো যে জলিল বাংলাদেশী, তাই তাকে ধরে বি.এস.এফ-এর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। গ্রামের সবাই আকাশ থেকে পড়ে। তারা বারবার জানতে চায় কে বললো জলিল বাংলাদেশী, তারা সবাই একবাক্যে বলতে থাকে যে চোদ্দপুরুষ ধরে জলিলদের এখানেই বাস, জলিলদের পরিবারের কেউ কখনও বাংলাদেশের সীমান্ত অবধি দেখেনি, জলিলের নাম তো এস.আই.আর-এর পর ভোটার তালিকাতেও ছিলো, জলিল তো এবার ভোটও দিয়েছে…। পুলিশক্যাম্পের বড়োবাবু তাদের কোনো কথায় কর্ণপাত না করে হুঙ্কার ছাড়েন: আমাদের কাছে সব খবর আছে, এখন ওসব গলা তুলে কথা বলার দিন আর নেই, সরকার এখন পাল্টে গেছে। সরকার পাল্টে যাওয়ায় বড়োবাবুর রোয়াবও যে কী পরিমাণ বেড়েছে তার চাক্ষুষ প্রমা্ণ নিয়ে গ্রামবাসীদের ফিরে আসতে হয়।
কিন্তু মতিউর রহমান ও অন্যান্য গ্রামবাসীরা এতে ভয়ে কুঁকড়ে যাননি, বরং যতো রকম ভাবে পারা যায় চেষ্টা করে জলিলকে ফিরিয়ে আনার শপথ নিয়েছেন। মতিউর লাগাতার চেষ্টা করে খুঁজে-পেতে জলিল ও তার পূর্বপুরুষদের নাগরিক-পরিচয়ের সব কাগজ জড়ো করে। জলিলের নিজের ভোটার কার্ড, আধার কার্ড, রেশন কার্ড, পঞ্চায়েতের কাগজ তো ছিলোই, এমনকি ১৯৫০-এর দশকের নির্বাচনে জলিলের দাদু ও দিদার নাম যে তখনকার ভোটার তালিকায় ছিলো, সেই প্রমাণও জোগাড় করে। তাঁরা আশা করেছিলেন যে এতো সব প্রমাণের পর সন্দেহের তো আর কোনো অবকাশ থাকতে পারে না, তাই পুলিশের ওপর মহলে এসব পেশ করলে জলিলকে ছাড়িয়ে আনা যাবে। উত্তর দিনাজপুরের ডালখোলা থানার ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক (আই.সি.) ঘটনার দিন থেকেই ছুটিতে ছিলেন, ছুটি শেষে তিনি কাজে যোগ দেওয়ার পরদিন ৯ই জুলাই মতিউর ও জলিলের পরিবারের আরো কিছু সদস্য সব প্রমাণপত্র নিয়ে ডালখোলা থানায় গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করে। এর আগে তাঁরা ইসলামপুর থানার এস.পি.-র সঙ্গেও সব প্রমাণ নিয়ে দেখা করেছিলেন, তাঁদের সাহায্য করেছিলেন এস.আই.আর-এ নাম-বাদ-পড়া মানুষদের নাম তোলার দাবিতে গড়ে ওঠা ‘ভোটাধিকার সুরক্ষা সমন্বয় সমিতি’-র ইসলামপুর এলাকার সংগঠক দুলাল রাজবংশী। সেখান থেকে জানা গিয়েছিলো যে জলিলকে নিয়ে গিয়ে ফুলবাড়ির হোল্ডিং সেন্টার-এ আটক রাখা হয়েছে। ইসলামপুর থানার এস.পি. জলিলের পরিবারের দাখিল করা নথিপত্র দেখে আশ্বাস দিয়েছিলেন যে কিছু ভুল হয়ে থাকলে তাড়াতাড়িই তা শুধরে নেওয়া হবে, আর তিনি ডালখোলার আই.সি.-র কাছে যেতে বলেছিলেন কারণ তাঁর অধীনেই নাকি ব্যাপারটা রয়েছে। ডালখোলার আই.সি.-র কাজে ফের একদফা সমস্ত নথিপত্র জমা দেওয়া হলে তিনিও বলেন যে দু-একদিনের মধ্যে জলিলকে ছেড়ে দেওয়া হতে পারে। উদ্বিগ্ন আত্মীয়স্বজনদের বারংবার কাকুতিমিনতির মুখে তাঁর মুখ দিয়ে অবশ্য অদ্ভুত একটা কথা বেরিয়ে যায়, কথাটা এইরকম: ‘আপনারা তো কেবল ছেড়ে দাও ছেড়ে দাও বলছেন, আমার উপর কী চাপ জানেন? পাঁচশো জনের একটা তালিকা আমায় ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে ধরে দেওয়ার জন্য, এই কালকেই এসেছে আরো পঞ্চাশটা নাম…’--- এইটুকু বলে অবশ্য উনি নিজেকে সামলে নেন, কারা তাঁকে নাম পাঠাচ্ছে ধরে দেওয়ার জন্য, সে তালিকা কোথায় কীভাবে ঠিক হচ্ছে, কারা তাঁর উপর চাপ দিচ্ছে, সে কথা আর জানা যায়নি। মতিউর ও গ্রামের অন্যান্যরা তাই আশা ও আশঙ্কা দুই নিয়েই গ্রামে ফিরেছিলো।
এদিকে জলিলের ঘরে তখন নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। জলিল আখতারের দুই মেয়ে ও দুই ছেলে, সবার বিয়ে হয়ে গেছে। অভাবের সংসার, তাই রোজগারের আশায় দুই ছেলের একজন দিল্লিতে ও অন্যজন হায়দরাবাদে পরিযায়ী শ্রমিক। জলিল আখতারকে ধরে নিয়ে যাওয়ার খবর পেয়ে দুই ছেলেই ভয়ঙ্কর উদ্বিগ্ন, রোজ ফোন করে কান্নাকটি করে, কিন্তু কাজের জায়গা থেকে তারা না পাচ্ছে ছুটি না পাচ্ছে চলে আসার মতো টাকাপয়সা, ফলে তারা কেউ আসতে পারছে না। জলিল আখতারের বউয়ের ডায়াবেটিস-এর রোগ মাত্রাছাড়া, না খেয়ে-দেয়ে সে আরো অসুস্থ হয়ে পড়েছে।
৩
কেবল জলিল আখতারের দুই ছেলেই নয়, এই গ্রামে প্রায় প্রতিটা ঘর থেকেই জোয়ান ছেলেদের কেউ না কেউ পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে বাইরে কাজ করতে গেছে। কৃষিকাজে রোজগারের হাল খারাপ, দিনের পর দিন চাষের খরচ বাড়ছে, ধান-চাল-পাট-এর দামও তেমন পাওয়া যায় না, ফলে কৃষকদের চাষের খরচ সামলাতেই হিমসিম খেতে হয়। এই সময় নানা আড়কাঠির মাধ্যমে রাজ্যের বাইরে চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক হিসেবে খাটতে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। প্রতি মাসে নগদ রোজগার, কিছুদিনের মধ্যেই হাতে একটা মোবাইল ফোন, শহর-শহরতলীর জীবনের আকর্ষণ: ছেলেরা বাইরে কাজে যেতে শুরু করে। এরা কেউ স্থায়ী শ্রমিক নয়, ইউনিয়ন করে নিজেদের দাবি-দাওয়া-অধিকার বুঝে নেওয়ার সুযোগ নেই, আড়কাঠি-ঠিকেদার-কোম্পানি-র তেকাঠি ফাঁদে আটকে থেকে মুখ বুজে কাজ করতে হয়, দিনে বারো-তেরো-চোদ্দ নাকি ষোলো-সতেরো কত ঘন্টা কাজ করতে হবে ঠিক-ঠিকানা নেই, ঘরে ফেরার ছুটি কখন মিলবে তারও ঠিক-ঠিকানা নেই। তবু এই বাইরে-কাজ-করতে যাওয়া ছেলেরাই বাড়িতে কিছু-না-কিছু টাকা পাঠায়, যখন বাড়ি ফেরে এদের হাতের মোবাইল বা পোষাকের জৌলুস বাকিদের চোখ টানে। মতিউর রহমান বলছিলেন, তিনি যে তাঁর ঘর পাকা করতে পেরেছেন, তা তো তাঁর ছেলেদের এই বাইরে কাজ করতে গিয়ে রোজগার করা টাকার জোরেই। ফলে এই ছেলেদের বাইরে কাজ করতে যাওয়া ক্রমশ বেড়েছে। কিন্তু এখানেও গত একবছর জুড়ে আশঙ্কা ঘনিয়ে উঠছে। গত বছরের শেষদিকে ঘটেছিলো ঘটনাটা। এই করণদিঘি ব্লকেরই একটা গ্রামের এমন বাইরে কাজ করতে যাওয়া এক ছেলের লাশ ফিরেছিলো বাড়িতে। গুজরাতে কাজ করতে গিয়েছিলো, সেখানে বাংলাভাষী মুসলমান হওয়ায় তাকে বাংলাদেশী বলে মারধোর করে আটকে রাখা হয়। প্রথমে মারধোর করেছিলো তাইই সাথে কাজ করা কিছু হিন্দুত্ববাদী শ্রমিক। তারপর তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হলে সেখানেও আরেক প্রস্থ মারধোর চলে। তার গ্রামেরই আরেকজনের মাধ্যমে এ খবর যতক্ষণে তার গ্রামে পৌঁচেছে, ততক্ষণে সে মারা গেছে। তার মৃতদেহটুকু কেবল পৌঁছেছিলো অনেক টালবাহানার পর, গোটা গ্রাম ভেঙে পড়েছিলো, এলাকার তৃণমূলী নেতারা এসে বিচার ও ক্ষতিপূরণের নানা কথা বলেছিলো, তারপর তো হিন্দুত্ববাদীদের ক্ষমতা দখলের তোড়ে তাঁরা সব কে কোথায় গিয়ে মুখ লুকিয়েছেন কি জার্সি পাল্টাচ্ছেন তা হদিশ করাই দুষ্কর, ফলে বিচার কিছু হয়নি, ক্ষতিপূরণও পাওয়া যায়নি। এলাকার মানুষদের মনে ভয় সেঁধালো। একের পর এক খবর আসতে লাগলো নানা জায়গা থেকে, বিশেষ করে বি.জে.পি-র সরকার আছে এমন রাজ্যগুলো থেকে: বাংলাভাষী ও মুসলমান হলেই তাদের উপর সরকার-প্রশাসন-পুলিশের প্রচ্ছন্ন মদতে হিন্দুত্ববাদীরা চড়াও হচ্ছে, কোথাও মারধোর করা হচ্ছে, কোথাও কাজ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, কোথাও বা পুলিশ ধরে বি.এস.এফ-এর হাতে তুলে দিলে বি.এস.এফ. কাউকে কিছু না জানিয়ে তাদের বাংলাদেশের বর্ডারে নিয়ে গিয়ে ওদিকে ঠেলে ঢুকিয়ে দিচ্ছে, তারপর বাংলাদেশে জেলখানায় তাদের ঠাঁই হচ্ছে। বাইরে কাজ করতে যাওয়া ছেলেদের কথা ভেবে গোটা গ্রামের বুকে যেন পাষাণের ভার চেপে বসেছে। জলিল আখতারের ছেলেরা যে আসার জন্য ছুটি বা টাকা কিছুই পায়নি, তা নিয়ে তারা নিজেরা কান্নাকাটি করলেও গোটা ব্যাপারটা নিজেদের মধ্যেই চোপে রাখতে বাধ্য হয়েছে, কারণ একবার যদি কাজের জায়গায় জানাজানি হয়ে যায় যে তাদের বাবাকে বাংলাদেশী বলে হোল্ডিং সেন্টার-এ তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তাহলে তাদের উপরও বাংলাদেশী বলে কী অত্যাচার নেমে আসবে তা ভাবতে গেলেও শিউরে উঠতে হয়। মতিউর রহমান-এর গলায় তিক্ত অসহায়তা ফুটে বেরোচ্ছিলো যখন তিনি বলছিলেন: ‘কী যে করি আমি! বিবিজান খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে বুঝি বা মরেই যাবে, ছেলে দুটো ভিনদেশে আছাড়-পিছাড় খেয়ে মরছে, কোনোভাবে জলিলকে বের করে আনতে পারলে আমি বাঁচি…।’
৪
ডালখোলা থানায় গিয়ে আই.সি.-র কাছে জলিল আখতার ও তার পূর্বপুরুষদের এ দেশের নাগরিক হওয়ার প্রমাণস্বরূপ সব নথিপত্র জমা দেওয়ার পর দশদিনের বেশি কেটে গেলো। ডালখোলা ও ইসলামপুর উভয় থানার পুলিশ আধিকারিকরাই মৌখিকভাবে দিন-দুয়েকের মধ্যে জলিলকে ছেড়ে দেওয়া হবে বললেও কাজে কিছুই হলো না। শুধু জানা গেলো জলিলকে এখন ফুলবাড়ি হোল্ডিং সেন্টার থেকে সরিয়ে এনে চাকুলিয়ার হোল্ডিং সেন্টার-এ রাখা হয়েছে। বারবার পুলিশ আধিকারিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে থাকলেও তাঁদের মুখে শুধু একটাই কথা: নানা গুরুত্বপূর্ণ কাজের চাপে তাঁরা নাকি এতোই ব্যস্ত যে দাখিল-করা নথিপত্র ‘ভেরিফিকেশন’ করে তাঁরা এখনও কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে উঠতে পারেননি। মতিউর রহমান, অন্যান্য আত্মীয়-পরিজন ও গ্রামের মানুষ মিলে সিদ্ধান্ত নেয় যে এভাবে পুলিশের মুখের কথার ভরসায় আর থাকা যায় না, তাঁরা উদ্বিগ্ন ছিলেন জলিল আখতারের স্বাস্থ্য নিয়েও, ভাঙা চেহারার বয়স্ক মানুষটি হোল্ডিং সেন্টারের অত্যাচারে মারা না পড়ে এই নিয়েও দুশ্চিন্তা ক্রমশ পেকে উঠছিলো। তাই তাঁরা ঠিক করলেন যে সবাই মিলে ২০শে জুলাই সোমবার রসাখোয়ার হাটে জমায়েত হয়ে প্রতিবাদ মিছিল করবেন। ২০ শে জুলাই রসাখোয়ার হাটে তিনশো জনের বেশি গ্রামের মানুষ জড়ো হয়ে গিয়েছিলেন, তাঁদের দাবি ছিলো একটাই: জলিল আখতারের মুক্তি দিতে হবে। পুলিশ তাঁদের চারদিক থেকে ঘিরে ধরে বলে যে প্রতিবাদ মিছিল করা যাবে না। পুলিশের বাধায় মিছিল করতে না পারলেও গ্রামবাসীদের স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ ও আগুনে মেজাজ করণদিঘি জুড়েই ছাপ ফেলেছিলো, জমাট-বাঁধা সন্ত্রাসের পরিবেশে ফাটল ধরিয়ে দিয়েছিলো।
পরের দিন মঙ্গলবার সকালে জলিল আখতারের পরিবারের লোকজন চাকুলিয়া হোল্ডিং সেন্টার-এ জলিলের সঙ্গে দেখা করতে গেলে তাঁদের বলা হয় যে জলিল এখন সেখানে নেই, কোথায় পাঠানো হয়েছে তা নিয়ে কিছু বলা হয় না। জলিলের পরিবার ও গ্রামের লোকজন আতঙ্কিত ও মরীয়া হয়ে ওঠেন। ‘ভোটাধিকার সুরক্ষা সমন্বয় সমিতি’-র সাহায্য নিয়ে মঙ্গলবারেই তাঁরা রায়গঞ্জে উত্তর দিনাজপুর প্রেস ক্লাবে এক সাংবাদিক সম্মেলন করেন। জলিল আখতার-এর বউ তওফা বিবি ও মেয়ে কুলসুম খাতুন সেখানে সরকার-প্রশাসনের বিরুদ্ধে জলিল আখতারকে গুম করার ও সমস্ত মানবাধিকার লঙ্ঘন করার অভিযোগ তোলেন।
তার পরের দিন, অর্থাৎ, বুঝবার সকালে তাঁদের পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয় যে জলিল আখতারকে ইসলামপুর আদালতে তোলা হচ্ছে। হন্তদন্ত হয়ে মতিউর রহমান সেখানে ছোটেন। সেখানে গিয়ে দেখা যায় যে পুলিশ পুরোপুরি ভুয়ো রিপোর্ট তৈরি করে আদালতে পেশ করছে। এতোদিন যে জলিলকে বিভিন্ন হোল্ডিং সেন্টার-এ বন্দী রাখা হয়েছে তার কোনো উল্লেখমাত্র না করে পুলিশের দাবি যে তারা মাত্র একদিন আগে জলিলকে গ্রেফতার করেছে। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের ঠাকুরগাঁও জেলার হরিপুরের বাসিন্দা বলে জলিলকে দাগিয়ে দেওয়া হয়েছে, তার কোনও প্রমাণ পুলিশ দাখিল করেনি, কেবল বলেছে যে ‘ভেরিফিকেশন’ চলছে, তা শেষ হলে সব প্রমাণ দাখিল করবে। এই বলে জলিলকে তারা পুলিশ কাস্টডিতে রাখতে চাইল এবং আদালতও তা মঞ্জুর করে দিলো। জলিলের পরিবারের লোকজন উকিলের মাধ্যমে আবার নতুন করে জলিলের ও তার পূর্বপুরুষদের এদেশের নাগরিকত্বের সমস্ত প্রমাণ আবার দাখিল করলো। এরপর ইসলামপুর কোর্টে কেসের শুনানির ডেট একের পর এক পড়ে যাচ্ছে, সপ্তাহ তিনেক পেরিয়ে গেলো, তিনটে ডেট-ও পেরিয়ে গেলো, পুলিশ এখনও ভেরিফিকেশন শেষ করে তার ভুয়ো কেস-এর ‘প্রমাণ’ দাখিল করতে পারেনি, পরের পর আরও ডেট চেয়ে যাচ্ছে, আর আদালতও তা মঞ্জুর করে যাচ্ছে।
৫
চাকুলিয়ার হোল্ডিং সেন্টার এবং ইসলামপুরের বন্দিশালায় জলিল আখতার-এর সঙ্গে কয়েকবার মুখোমুখি দেখা করতে পেরেছেন মতিউর রহমান ও পরিবারের অন্যান্যরা। বৃদ্ধ মানুষটির শরীর একেবারেই ভেঙে গেছে। তাঁর বেঁচে-থাকা নিয়ে এখন তাঁরা শঙ্কিত। চাকুলিয়ায় বি.এস.এফ.-এর জওয়ানরাও তাঁদের বলেছে যে জলিল কেবলই কান্নাকাটি করে চলেছে, খাওয়া-দাওয়াও সেভাবে করে না, কাঁদতে কাঁদতে কেবল বলে: ‘বাংলাদেশে আমি কোনোদিন যাই নি, সেখানে কাউকে চিনি না, কোথায় সেখানে পথে-পথে ঘুরে মরবো, ওখানে ঠেলে দেওয়ার বদলে তোমরা বরং আমাকে এখানেই মেরে ফেলো।’
ইসলামপুর বন্দিশালায় জলিল তাঁর পরিজনদের বলেছেন: ফুলবাড়ির হোল্ডিং সেন্টার-এ তাঁর সঙ্গে আরো বাইশজন বন্দি ছিলো, তাদের সবাইকে বাংলাদেশে পুশ-ব্যাক করে দেওয়ার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো, তিনি ছাড়া বাকিদের কী পরিণতি হয়েছে তা আর তিনি জানেন না, তারপর চাকুলিয়া হোল্ডিং সেন্টারে নিয়ে এলে সেখানেও তাঁর সঙ্গে ছয়-সাত-জন বন্দি ছিলো, তাদেরও কী পরিণতি হয়েছে তিনি জানেন না।
বাগড়োই গ্রামের মানুষরা বলছিলেন যে তাঁদেরই পঞ্চায়েত এলাকায়, অর্থাৎ, বাজারগাঁও-২ পঞ্চায়েত এলাকার ভারত-বাংলাদেশ সীমানার দিকে আরো দুটো গ্রাম থেকে দুজন মাঝবয়সী মুসলমান পুরুষকে ধরে হোল্ডিং সেন্টারে তুলে নিয়ে গিয়েছিলো। এই দুজনেরই বউ-ছেলে-মেয়ে ভয়ে কোথায় চলে গেছে তার কোনো হদিশ এখন নেই, সেই দুজনকে নাকি বাংলাদেশে পুশ-ব্যাক করে দেওয়া হয়েছে। এই দুজন কি বাংলাদেশ থেকে এসে এখানে সংসার পেতেছিলেন, তা হয়ে থাকলে কতোদিন আগে তারা এসেছিলেন, তাদের ছেলে-মেয়ে-দের তো জন্ম এখানেই, বউরাও এখানকার মেয়ে, তাদের তাহলে কী হবে? ভেঙে-যাওয়া এই দুটো সংসার সম্বন্ধে কারো কাছ থেকে আর কোনো খবর জোগাড় করা গেলো না। জলিল আখতারকে নিয়ে তাঁর পরিবারের লোকজন ও গ্রামবাসীরা প্রতিবাদ-প্রতিরোধ করেছেন বলেই তো সবার সামনে এসেছে যে কীভাবে এদেশের একজন মানুষকে বাংলাদেশী সাজিয়ে ওপারে পাঠানোর ব্যবস্থা হয়েছিলো, তারপরেও পুলিশ ভুয়ো মামলা চালিয়ে যাচ্ছে, ওই দুটো ভেঙে-যাওয়া পরিবার নিয়ে তেমন কেউ প্রতিবাদ-প্রতিরোধে এগিয়ে আসেনি, তাঁদের প্রকৃত সত্যটা হয়তো আর কোনোদিনই সামনে আসবে না।
৬
মতিউর রহমান-এর বাড়ির সামনের ছোটো ঘরটায় বসে যেখানে আমাদের কথাবার্তা চলছিলো, সেখানে ঘরের ভিতরে ও দরজার সামনে একে একে গ্রামের অনেক পুরুষ ও মহিলা এসে জড়ো হয়েছিলেন। ছোটো কাগজের কাপে চা ও বিস্কুট এলো একবার সবার জন্য। নিজেদের ভয়-আশঙ্কা-ক্ষোভ-এর কথা বলতে বলতে সবাই নিরুচ্চারে উত্তর খুঁজছিলেন কীভাবে পার হয়ে যাওয়া যাবে এই দুঃসময়কে। একজন মাঝবয়সী স্বগতোক্তির মতোই বলে উঠলেন: ‘এ সরকার আবেদন-নিবেদন শোনে না, দিল্লীতে যেমন হয়েছে তেমন সবাই পথে নামলে তবে হয়তো এদের নড়ানো যাবে…’। চমকে উঠলাম। ঠিক তার চারদিন আগে দিল্লীর যন্তর-মন্তরে গোটা দেশ থেকে জড়ো হওয়া কয়েক লাখ ছাত্র-যুবর বিক্ষোভ লাঠি-কাঁদানেগ্যাস-জলকামান-পেলেটগান চালিয়েও ছত্রভঙ্গ করতে না পারায় ছাত্র-যুবদের দাবির কাছে মাথা নত করে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে ইস্তফা দিতে হয়েছে। সেই আন্দোলনের ছাপ তাহলে এখানেও, এই গ্রামে যেখানে নিট পরীক্ষায় বসে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন লালন করার মতো টাকার বা খুঁটির জোর কারও নেই, সেখানেও এসে পড়েছে, অতিদর্পী স্বৈরশাসকদের মাথা নত করে দেওয়ার সম্ভাবনাকে ফুটিয়ে তুলছে।
৭
আসার সময় টোটোচালক বলেছিলেন তিনি কেবল পৌঁছে দেবেন, আমাদের জন্য অপেক্ষা করতে পারবেন না। কিন্তু এখানে পৌঁছে এক-কথায় থাকতে রাজি হয়ে গিয়েছিলেন। মতিউর রহমান-এর বাড়ির দরজার সামনে একদিকে টোটোটাকে রেখে তিনিও সবকিছু দেখছিলেন, শুনছিলেন। এখন আবার তাঁর টোটোয় উঠেই রসাখোয়ায় ফেরার পথ ধরলাম আমরা চারজন, পিছনে ভিড় করে দাঁড়িয়েছিলেন বাগড়োই গ্রামের মানুষজন। ফিরতে ফিরতে টোটোচালক এখানকার গ্রামে চাষের নানা সমস্যার কথা বলছিলেন, রসাখোয়ার হাট শুকিয়ে যাওয়ায় কীভাবে সমস্যা বাড়ছে সেসব কথা বলছিলেন। রসাখোয়ার হাটে এনে আমাদের নামিয়ে দিলেন। প্রথমে যত টাকা ভাড়া চেয়েছিলেন, সে তুলনায় কম-ই নিলেন।
বেলা গড়িয়ে এখন প্রায় মাঝ-দুপুর। ঝিমিয়ে-পড়া রসাখোয়া হাট এখনও ঝিমিয়েই আছে। সব দোকান খোলেনি। এদিক-ওদিক ঘুরে কয়টা আনারস আর কিছুটা ভাজা সাসকলাইয়ের ডাল কিনলাম। দোকানীরাও যেন কেমন ঝিমিয়ে থাকা, প্রাণহীন। দুপুরের খাবার খাবো বলে মুসলিম ভাতের হোটেল-এর খোঁজ করলাম। কেউ হাটের ভিতর দিকে যেতে বললো। সেখানে গিয়ে খোঁজ করলে জানতে পারলাম, এখানে আগে মুসলিম ভাতের হোটেল ছিলো বটে, রমরমিয়েই চলতো, এখন গরুর হাট বন্ধ এবং গোটা হাট ঝিমিয়ে পড়ার পর সে হোটেলও রোজ খোলে না, আজও খোলেনি। ভাত না খেয়েই আমরা রায়গঞ্জে ফেরার বাসে উঠে পড়লাম।
৮
এখন আমার বাড়ি কলকাতায় ফিরে এসেছি। ফোন করে মতিউর রহমান-এর সঙ্গে কথা হয় যেদিন যেদিন ইসলামপুর কোর্টে জলিল আখতার-এর কেসের ডেট পড়ে। প্রতিবারই ফোনের ওপার থেকে মতিউর রহমান-এর অসহায় আর্ত স্বর বেজে ওঠে: ‘পুলিশ আজও তাদের রিপোর্ট দাখিল করে নি… আবার ডেট নিয়েছে… জাজ-ও পুলিশকে তাড়া দিয়েছে… কী যে হবে… লোকটাকে কি মেরেই ফেলবে…’। কী বলবো আমি এদিক থেকে? জলিল, জলিলের স্ত্রী, মেয়ে, ছেলে, মতিউর এনারা কেমন আছেন তা জিজ্ঞাসা করা এতো ঠুনকো ও মেকী বলে মনে হয়, আমি শুধুমাত্র আবার পরে ফোন করবো বলেই ফোন কেটে দিই। রসাখোয়ার ঝিমিয়ে পড়া হাট আর জলিল আখতারের বিষাদ-পাথর ঘরের ছবি আমার চেতন-অবচেতন জুড়ে ছড়িয়ে থাকে।
১২ই আগস্ট, ২০২৬
[রসাখোয়া ও বাগড়োই গিয়েছিলাম আমরা চারজন: আমি, সোহন, সুশোভন এবং পারমিতা। লেখার সঙ্গের আলোকচিত্রগুলো সোহন ও সুশোভন-এর তোলা।]