‘বাঙালি’ পরিচয়ে পরিচিত মানুষদের ‘দেশ’ হিসেবে বর্তমানে সাধারণত বাংলাদেশ ও ভারত (নির্দিষ্ট করে বললে, ভারতের একটি অঙ্গরাজ্য, পশ্চিমবঙ্গ) চিহ্নিত হয়ে থাকে। বিশ্বের অন্য সমস্ত জায়গায় ছড়িয়ে থাকা ‘বাঙালি’-দের ‘প্রবাসী বাঙালি’ বলা হয়, ধরে নেওয়া হয় যে ওই বাংলাদেশ বা পশ্চিমবঙ্গেই একদা তাঁরা বা তাঁদের পূর্বপুরুষরা থাকতেন, এখন পেশা বা বৃত্তির কারণে তাঁরা প্রবাসে থাকছেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সময় বাংলা-ভাষা-বাচকতা-ভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে জাতিরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা ‘বাঙালি’-কে একটি রাজনৈতিক জাতীয় পরিচয় (political national identity) করে তুলেছিলো। অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গের ‘বাঙালি’ ভারত নামক জাতিরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্যের বাসিন্দা হিসেবে ‘ভারতীয়’ রাজনৈতিক জাতীয় পরিচয় গঠনপ্রক্রিয়ার টানাপোড়েনের মধ্যে রয়ে গেছে। ক্রমশ ভারতে হিন্দুত্ববাদী সংকীর্ণ ও উগ্র জাতীয়বাদী শক্তিদের উত্থান তাদের নির্দিষ্ট করা হিন্দি-হিন্দু-জাতীয়তাবাদের খোলসে সবকিছুকে ঠেসে পোরার তাড়সে ভাষা-জীবনসংস্কৃতি-ঐতিহ্যের সমস্ত বিভিন্নতা ও বৈচিত্র্যকে পিষে মেরে এক পক্ষাঘাতগ্রস্ত সমসত্ত্বতা আমদানি করতে চাইছে। সেই আঘাত ‘বাঙালি’-দের উপর বিশেষ করে নেমে এসেছে। ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে খেটে রোজগার করতে যাওয়া বাঙালি শ্রমিকরা বাংলা ভাষা বলার কারণে বাংলাদেশী, সুতরাং বিদেশী বলে চিহ্নিত হচ্ছে, এমনকি তাদের অনেককে গ্রেফতার করে রাষ্ট্রীয় যন্ত্র জোর করে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠিয়ে দিচ্ছে। আবার বাংলাদেশেও ক্রমশ শক্তি অর্জন করছে সংকীর্ণ ধর্মভিত্তিক মুসলমান-জাতীয়তাবাদের হিড়িক, যা বাংলা-ভাষা-বাচকতা-ভিত্তিক বাঙালি রাজনৈতিক জাতীয় পরিচয়কে ভেঙে ধর্মভিত্তিক জাতীয় পরিচয় ও জাতীয়তাবাদ গড়ে তুলতে চাইছে। নিজের ঘর-দুয়ারেই ‘বাঙালিয়ানা’ তাই আজ ঘোর সংকটাপন্ন।
কেবলমাত্র ব্যাপ্ত জীবনযাপন-সংস্কৃতিগত স্বাভাবিক স্বপরিচয় না থেকে মূলত রাজনৈতিক পরিসরের জাতীয়তাবাদী স্বপরিচয় নির্মাণের একটি রসদ হয়ে ওঠার মধ্য দিয়েই বাঙালিয়ানার এই সংকট ঘনিয়ে উঠেছে, বাঙালিয়ানার মধ্যের ফাটলগুলোও চওড়া হচ্ছে। বর্তমান আলোচনায় আমরা এই সংকটের কুলজি ধরে বিচার করার চেষ্টা করবো।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীন বাংলায় উনিশ শতকের শেষভাগে বাংলা গদ্যভাষা সৃষ্টিতে ব্যাপৃত বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮-১৮৯৪)-এর আরেকটি সাধনার বিষয় ছিলো ভারতীয় জাতীয়তার নির্মাণ। তাঁর উপন্যাসে, তাঁর সমাজ-ব্যাখ্যায়, তাঁর ধর্ম-আলোচনায়, এমনকী তাঁর রসিকতাতেও এই জাতীয়তা-প্রতিষ্ঠা-চেষ্টা ঘুরেফিরে নানা রূপ ধরে হাজির ছিলো। যে কোনো জাতীয়তার প্রাথমিক লক্ষ্য একটি গোষ্ঠী-চেতনা তৈরি করা। আমরা যে আমরাই এবং ওরা যে ওরা, সেই কথা খোলা ক্ষতের মতো সর্বদা জেগে না থাকলে জাতীয়তাবোধ জোরদার হয় না। বঙ্কিমচন্দ্র ভারতের হিন্দুসমাজকে ‘আমরা’ মনে করেছিলেন। কিন্তু আদ্যোপান্ত মধ্যবিত্ত শিক্ষিত বাঙালি হওয়ার সুবাদে বাঙালি মধ্যবিত্ত হিন্দুসমাজ মাঝেমধ্যেই এই ব্যাপকতর হিন্দুসমাজের স্থান নিতো। ঔপনিবেশিক সমাজে বসে আত্মসম্মানের তাগিদে নিজ জাতীয় আত্মপরিচয় সন্ধানী মানুষটির সাহিত্য-রচনায় তাই হিন্দুসমাজের আলোচনা, হিন্দুর ইতিহাস ফিরে ফিরে এসেছে। কিন্তু তাঁর এই জাতীয়তা-নির্মাণও ভারতবাসীর ঐক্যবিধান করার বদলে ফাটলগুলোকেই চওড়া করেছে--- কীভাবে তা দেখা যাক।
১৭৫৭ সালের পলাশির যুদ্ধের পর একশো বছরের উপর ধরে ইংরেজ শাসনের অভিঘাত বাংলার সমাজে রাজন্যবর্গকে নিরস্ত্র ও নিস্তেজ করেছিলো, কিন্তু নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণি কিছুটা প্রতিপত্তি পেয়েছিলো। বাঙালি মধ্যবিত্ত কলকাতার সমাজে যে মর্যাদা পেলো, মুর্শিদাবাদে সেকথা ভাবা যেতো না। ইংরেজের প্রয়োজনে নতুন ভাষা (ইংরেজি) এসেছিলো, তার ভিত্তিতে নতুন শিক্ষা প্রথাও চালু হয়েছিলো। বাঙালি মধ্যবিত্ত নিজের মতো করে ইংরেজি শিখলো, ইংরেজ দার্শনিক ও রাজনীতি-চিন্তকদের লেখাপত্র হজম (বা বদহজম) করে আধুনিকতার হদিশ করতে চাইলো। তার ফলে ইংরেজি-না-শেখা ‘অশিক্ষিত’ জনতা (কৃষকসমাজ যার বড়ো অংশটাই মুসলমান, জনজাতি সম্প্রদায়, হিন্দুসমাজের তলাকার কুঠুরিতে ঠেসে পুরে রাখা বিভিন্ন জাত সম্প্রদায়) ভদ্রলোক সমাজ থেকে আরো দূরে সরে গেলো, বিচ্ছিন্নতাটা বেশ পাকাপাকি ভাবে গেঁড়ে বসলো। উনিশ শতকের শেষ কটি দশকে, অর্থাৎ বঙ্কিমচন্দ্রের সময়ে, মধ্যবিত্ত শ্রেণি প্রধানত রাষ্ট্র-সংলগ্ন পেশাদারী গোষ্ঠীর রূপ নিয়েছিলো। জমিদারদের ব্রিটিশ ইন্ডিয়া অ্যাসোসিয়েশন সরিয়ে তারা তখন ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন নামে আলাদা সমিতি তৈরি করেছে, জমিদার-শ্রেণির স্বার্থবিরোধী কিছু কথা উপস্থাপনা করার মতো ক্ষমতা ও সুযোগও পেশাদারী মধ্যবিত্তের হয়েছে। এই পেশাদারী মধ্যবিত্ত ইংরেজ শাসনকে মূলত সদর্থক রূপেই দেখছে, বঙ্কিমের সমাজচিন্তাতেও তাই সাম্রাজ্যবাদের দ্বিধাহীন কোনো প্রতিবাদ নেই। বরং ইউরোপীয় জাতি-রাষ্ট্র-কেন্দ্রীক জাতীয়তাবাদকেই তিনি সবল রাজনৈতিক রূপ হিসেবে দেখেছেন এবং সেই তাড়সেই জাতীয়তা-পরিচয় নির্মাণ করতে চেয়েছেন।
কিন্তু জাতীয়তা-পরিচয় নির্মাণে যেমন ‘আমরা’ লাগে, তেমনই ‘ওরা’-ও লাগে; জাতি-প্রতিষ্ঠার সন্ধানে যেমন নায়ক-গোষ্ঠী লাগে, তেমনই কাকে পরাভূত করে সে জয় হাসিল হবে, সেই শত্রু-গোষ্ঠীও চিহ্নিত করতে লাগে। নায়ক-চরিত্রগুলোকে বিজাতীয় শত্রুর বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে হবে এবং সেই অবস্থায় নায়কের গুণকীর্তন করতে হবে, আত্মত্যাগের ফিরিস্তি লিখতে হবে বীরত্বের প্রশংসা করতে হবে। প্রত্যেক উদীয়মান জাতি এভাবেই ইতিহাস লেখে। নিরন্তর শত্রুসন্ধান ও শত্রু-নিকেশ-পরিকল্পনা ছাড়া জাতীয়তাবাদী আবেগকে উথলে তোলা যায় না। বঙ্কিমচন্দ্র হিন্দুদের নায়ক-গোষ্ঠী করলেন, কৃষ্ণচরিত্রকে নতুনভাবে নায়ক চরিত্র হিসেবে পাঠ করলেন, কিন্তু শত্রু কে? ইংরেজরা তো শত্রু নয়, বরং অনুকরণীয় অগ্রগামী গোষ্ঠী, তাই ভারত-ইতিহাসের মুসলমান-শাসন-আমলের দিকে ফিরে তিনি মুসলমানকেই শত্রু বলে চিহ্নিত করে বসলেন। জমিদারদের শোষণের বিরুদ্ধে লিখতে গিয়ে যে হাসিম শেখ ও রামা কৈবর্ত-দের তিনি বাংলার কৃষকসমাজের প্রতিভূ হিসেবে হাজির করেছিলেন, এখন জাতীয়তাবাদের ভিত্তিকে শক্ত করার জন্য তিনি সেই হাসিম সেখ ও রামা কৈবর্তকেই একে অপরের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে দাঁড় করিয়ে দিলেন।
যে বাঙালি হিন্দু মধ্যবিত্ত শিক্ষিতসমাজ বঙ্কিমচন্দ্রকে ‘সাহিত্যসম্রাট’ উপাধি দিয়ে পুজোর আসনে বসিয়েছে, বঙ্কিমচন্দ্রের এই রাজনৈতিক জাতীয়তা নির্মাণও তাদের মধ্যে গভীরে শিকড় ছড়িয়ে দিয়েছে।
হিন্দুকে নায়ক ও মুসলমানকে শত্রু করে এহেন জাতীয়তা নির্মাণ (প্রায় দেড়শ বছর পর এখনও এ গরল আমরা বয়ে নিয়ে চলেছি, অনেক হিন্দু বাঙালিই ‘বাঙালি’ বলতে কেবল হিন্দুদেরই বোঝে, বাংলার মুসলমানদের তারা ‘বাঙালি’ নয়, ‘মুসলমান’ বলে চিহ্নিত করে) হিন্দু শিক্ষিত মধ্যবিত্তদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী আবেগ যতোই ফেনিল উচ্ছ্বাসে উতরোল করে তুলুক না কেন, তা সমাজের অন্য অংশের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা ও বিরূপতার বোধকেই আরো পোক্ত করে তোলে। বিশ শতকের প্রথম অর্ধে জাতীয়তাবাদী স্বাধীনতা আন্দোলনকে (এবং সেই সুবাদে কংগ্রেসকে) অবিভক্ত বাংলার মুসলমান কৃষক ও নমঃশুদ্র সম্প্রদায়ের গরিষ্ঠ অংশই যে হিন্দুদের আন্দোলন হিসেবে দেখেছিলো (এবং কেবলমাত্র হিন্দুত্ববাদী জনসংঘের বিরুদ্ধে নয়, কংগ্রেসের বিরুদ্ধেও মুসলিম লিগ বা প্রজা কৃষক পার্টির মধ্য দিয়ে নিজস্ব প্রতিনিধিত্ব খুঁজেছিলো), তার পিছনে এই ধরনের হিন্দু জাতীয়তাবাদ নির্মাণের বিরুদ্ধ-প্রতিক্রিয়া বড়োভাবে কাজ করেছিলো। আর এই হিন্দুকে নায়ক, মুসলমানকে শত্রু করে সাজানো জাতীয়তাবাদ উশকে দিয়ে ছিলো তার বিপরীত জাতীয়তাবাদ-নির্মাণকেও, যেখানে মুসলমান নায়ক আর হিন্তুরা সব শত্রু। এই দুই পরস্পর বিরোধী, অথচ একে-অপরকে উশকে দিয়ে পরস্পরের শক্তিবৃদ্ধিতে সহযোগী জাতীয়তাবাদ আমাদের এই উপমহাদেশে একের পর এক ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি ঘটিয়ে গেছে, এখনও ঘটিয়ে চলেছে--- জাতীয় পরিচয় প্রতিষ্ঠার নাম করে তা এমন তিনটি জাতিরাষ্ট্র (বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান) পয়দা করেছে যেগুলো নিরন্তর শত্রুতার-অবিশ্বাসের-অসহযোগের বিষক্রিয়া করে চলেছে, দাঙ্গা-গণহত্যা-উৎখাতের খোলা ক্ষত বাড়িয়ে চলেছে। মানুষ ও মানবিকতা ক্রমশ ছোটো হতে হতে অণুবীক্ষণের আওতায় সেঁধিয়েছে, আর জাতিরাষ্ট্রের দমন-পীড়নের যন্ত্রগুলো বড়ো থেকে আরো বড়ো হয়ে উঠে সর্বগ্রাসী হয়ে উঠেছে।
আমাদের বাঙালিয়ানার সংকট নিয়ে ভাবতে বসলে তাই একথা সবার প্রথমে চিহ্নিত করতে হয় যে বাঙালিয়ানাকে জাতি-রাষ্ট্র-উপযোগী জাতীয়তাবাদের আকারে বাঁধতে গিয়েই আমারা আজ নিজেরাই নিজেদের রক্তক্ষরণ ঘটিয়ে সর্ব্বস্বান্ত হতে বসেছি। জাতির গৌরব নির্মাণ করতে গিয়ে নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথ প্রশস্ত করেছি। শিব গড়তে গিয়ে বাঁদর গড়েছি। বাঙালিয়ানার সংকট নিরসনের কথা ভাবতে গেলে তাই এই বুলের সমালোচনা করে নতুন পথে এগোনোর চেষ্টা তো করতে হবে। এই সমালোচনার স্বরও কিন্তু আমাদের ইতিহাসের মধ্যেই ধ্বনিত হয়েছে, জাতীয়তাবাদের কড়া মাদকে আচ্ছন্ন অবস্থায় মানুষজন তাতে তেমন কান দেননি। এই সমালোচনার স্বর সময়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে অসীম প্রজ্ঞা ও সাহসের উপর ভর করে ধ্বনিত করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেই বিশ শতকের গোড়াতেই। তিনি বলেছিলেন:
ভারতে বর্তমান কালের জাতীয়তাবাদীদের অধিকাংশের সাধারণ মত হলো এই যে আমরা আমাদের সামাজিক ও আধ্যাত্মিক আদর্শের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সম্পূর্ণতায় ইতিমধ্যেই পৌঁছে গেছি, আমাদের জন্মানোর বহু হাজার বছর আগেই সমাজগঠনের গঠনমূলক কাজ সম্পন্ন হয়ে গেছে, আর এখন আমরা ঝাড়া হাত-পায়ে আমাদের সমস্ত কাজকর্মকে রাজনৈতিক দিশায় নিযুক্ত করতে পারি। আমাদের বর্তমান অসহায়তার উৎস যে আমাদের সামাজিক অপর্যাপ্ততার মধ্যেই নিহিত তা আমরা স্বপ্নেও মানতে চাই না, যেহেতু আমাদের জাতীয়তাবাদের ধর্মবিশ্বাস হিসেবে আমরা এই ভাবনাকেই গ্রহণ করেছি যে আমাদের এই সামাজব্যবস্থাটি আমাদের পূর্বপুরুষরা চিরকালের জন্য নিখুঁত করে গড়ে দিয়ে গেছেন আর আমাদের সেই পূর্বপুরুষদের আদি থেকে অন্ত অনন্ত কাল নিরীক্ষণ করার অতিমানবিক দূরদৃষ্টি ছিলো এবং সমস্ত ভাবী কালের জন্য সমস্ত রকম প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা-বন্দোবস্ত করে রেখে যাওয়ার অতিপ্রাকৃত শক্তিও ছিলো। তাই, আমাদের সমস্ত দুর্দশা ও ঘাটতিগুলোর জন্য আমরা কেবল বাইরে থেকে আকাশ ফুঁড়ে হামলে পড়া ঐতিহাসিক হতচকিত-করা ঘটনাগুলোর উপরই দোষ চাপাই। আমরা যে ভেবে নিয়েছি যে সামাজিক দাসত্বের চোরাবালির উপর স্বাধীনতা-সৌধ গড়ে তোলার রাজনৈতিক অলৌকিকতা হাসিল করাই আমাদের কাজ, তা এই কারণেই। কার্যত, আমরা আমাদের নিজেদের ইতিহাস-স্রোতের প্রকৃত গতিধারাটির মুখে বাঁধ বেঁধে কেবল অন্য মানুষদের ইতিহাসসূত্র থেকে চেয়ে-চিন্তে ধার করে বাঁচতে চাই।…
… আমাদের মনে রাখা দরকার যে আমাদের সমাজের মধ্যে যে দুর্বলতাকে আমরা প্রশ্রয় দিয়ে লালন-পালন করে চলবো, তা রাজনীতির ক্ষেত্রে বিপদের উৎস হয়ে উঠবে। যে জাড্যের টানে সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মরে-যাওয়া আকরগুলোকে পরম ভক্তিতে আমরা এখনও পুজো করে যাই, সেই একই জাড্য আমাদের রাজনীতির ক্ষেত্রে অনড়-অটল দেওয়ালে বাঁধা জেলখানার জন্ম দেবে। যে সংকীর্ণতা-রোগে পক্ষাঘাতগ্রস্ত অনুভূতির কারণে আমরা মানবতার এক বড়োসড়ো অংশের ঘাড়ে অপমানকর নিকৃষ্টতার জোয়াল চাপিয়ে দিই, সেই প্রকোপই আমাদের রাজনীতিতেও অবিচারের স্বৈরতন্ত্র হয়ে ফুটে বেরোবে।… ভাবনাচিন্তার যে সামাজিক অভ্যাসের তাড়সে আমরা আমাদের সহবাসীদের জীবন দুর্বহ করে তুলি যখনই তারা কোনোকিছুতে, এমনকি খাদ্যের পছন্দে, আমাদের থেকে আলাদা হয়, সেই অভ্যাস নিশ্চিতভাবেই আমাদের রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর মধ্যেও চারিয়ে গিয়ে এমন সব বৃহৎ দমনযন্ত্র গড়ে তুলবে যা জীবনের চিহ্নস্বরূপ যে কোনো যুক্তিসঙ্গত পার্থক্যকে পিষে মারবে। অনিবার্য মিথ্যা ও ভণ্ডামিতে ভরা আমাদের রাজনৈতিক জীবনে স্বৈরতন্ত্র গেঁড়ে বসবে।
(১৯১৭ সালে আমেরিকায় প্রদত্ত ভাষণের অংশ, পরবর্তীকালে তা তাঁর ‘Nationalism’ নামক বইয়ে ‘Nationalism in India’ শিরোনামে অন্তর্ভুক্ত হয়। মূল ইংরেজি থেকে বাংলায় তর্জমা বর্তমান লেখকের করা।)
বিশ শতকের প্রথম দশকের শেষদিকে ‘জাতীয়তাবাদ’ সংক্রান্ত এই ভাষণগুলোয় রবীন্দ্রনাথ একটি রাজনৈতিক আকার হিসেবে জাতি-রাষ্ট্রের যেমন সমালোচনা করেছিলেন, তেমনই গোষ্ঠীচেতনা নির্মাণের উপায় হিসেবে জাতীয়তাবাদের সমালোচনা করেছিলেন। গভীর ও বিস্তৃত সে সমালোচনা। তিনি বলেছিলেন, যে জাতি-রাষ্ট্র নামক রাজনৈতিক রূপটি পশ্চিমে উদ্ভূত হয়ে গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে তা অন্তর্নিহিতভাবেই যান্ত্রিকতা ও সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসী মনোভাব ধারণ করে। তা এমন এক জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠী-চেতনা গড়ে তোলে ও রসদ হিসেবে ব্যবহার করে চলে যা আত্ম সম্পর্কে অতি সংকীর্ণ ও যান্ত্রিক এক ধারণা নির্মাণ করে সমস্ত অপর সম্পর্কে ঘৃণা, বৈরীভাব ও হিংসা তীব্র করে তোলে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য সাধনের প্রয়োজনীয় বল হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসা এই যান্ত্রিক সংগঠন-রূপটি হিংস্র প্রতিযোগিতাকেই স্বাভাবিক বলে নির্ধারণ করে সমস্তরকম ক্ষমা-দয়া-সমবেদনা-সহনশীলতা-র মতো মানবিক গুণগুলোকে ঘৃণ্য দুর্বলতা বলে অবমূল্যায়ন করে। ফলে আত্মীয়ের মতো সহবাসের পরিবেশ না তৈরি করে তা মানুষদের এমনকিছু সদাবিবদমান সদা-সংঘর্ষরত গোষ্ঠীতে ভাগ করে দেয় যারা সবসময় একে অপরকে নিকেশ করে দেওয়ার সুযোগ খোঁজে।
তাঁর বক্তৃতার যে অংশটি আমরা এখানে উদ্ধৃত করেছি সেখানে তিনি বলেছেন যে জাতীয়তাবাদ যে কেবল মানুষের ভিতরের মানবিক গুণগুলোকে শুকিয়ে মারে, তাই নয়, তা আমাদের মধ্যের এই ভ্রম-বাতুলতাকে ভিত্তি করেই বেড়ে ওঠে যে কোনো এক অতীত কালে (সে রামের যুগে বা মনুর যুগে হতে পারে, বা, হজরত মহম্মদের যুগে হতে পারে) আমাদের পূর্বজরা আদর্শ সমাজ-বিধি-রীতি সব বেঁধে দিয়েই গিয়েছিলেন, এখন অপরদের হামলায়-শত্রুতায় তা বিপন্ন হয়েছে, অপর-নিধন করে সেই আদর্শ সমাজ-বিধি-রীতি পুনর্প্রতিষ্ঠা করতে পারলেই সব হয়ে যাবে। এই ভ্রম-বাতুলতা থেকে আমরা যেমন অপরদের শত্রু বলে ভাবতে থাকি, অতি সংকীর্ণভাবে নির্ধারিত নিজ ‘উত্তবাধিকার’-টাকেই প্রশ্নহীনভাবে সর্বশ্রেষ্ঠ বলে জ্ঞান করতে থাকি, ঠিক তার ধারাবাহিকতাতেই দমনমূলক এক বিপুল রাজনৈতিক যন্ত্র নির্মাণ করতে থাকি, যার খাঁচায় বন্দী হয়ে সমস্তরকমের স্বাধীনতা শুকিয়ে মরে।
১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন বাঙালির এমন এক ঐক্য গড়ে উঠুক যা ধর্ম-বর্ণ-ভাষা-জাত-এর বিভিন্নতাকে ধারণ করতে পারবে, পার্থক্যকে সন্দেহের চোখে দেখবে না, বরং, সমস্ত পার্থক্যকে যৌথ সমাজের মধ্যে স্থান করে দিয়ে একে অপরের পার্থক্য সম্পর্কে শ্রদ্ধাশীল হবে, একে অপরের থেকে শিখতে-জানতে আগ্রহী হবে। এ ধরনের ঐক্য জাতি-রাষ্ট্রের খাঁচায় সম্ভব নয়, ওই খাঁচার মধ্যে বাস করা আমাদের ঐতিহ্যও নয়, আমাদের সমাজের প্রশস্ত উঠোন থেকে দীর্ঘদিনের জমা ময়লা ও মৃত অভ্যাসের জাড্যগুলোকে ঝেঁটিয়ে সরিয়ে এই বিবিধের ঐক্যের আসন পাততে হবে। কিন্তু তিনি যখন দেখলেন যে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন বঙ্গভঙ্গ রুখতে সফল হলেও ক্রমশ রাজনৈতিক জাতীয়তাবাদ ও জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে পাড়ি দিয়ে দিয়েছে, দ্বেষ-বৈরীভাব-হিংসাই তার চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে, তখন তিনি তার সমালোচনা করেন ও তা থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নেন। সমাজের আত্মশক্তি জাগিয়ে তুলে বিবিধের ঐক্য গড়ার সাধ্যমতো প্রচেষ্টায় শান্তিনিকেতন ও শ্রীনিকেতনে নিজেকে নিযুক্ত করেন। রবীন্দ্রনাথের এই সমালোচনা সেই সময়ে গুরুত্ব পায়নি কারণ ইউরোপের জাতি-রাষ্ট্র-গুলোর অনুকরণে নিজেদের জাতি-রাষ্ট্র গড়ে তোলার রাজনৈতিক পথই তখন আমাদের কল্পনা ও অভিপ্রায়কে আচ্ছন্ন করে রেখেছিলো। রবীন্দ্রনাথের সমাজের আত্মশক্তি জাগিয়ে তোলার গঠনমূলক কাজও তাঁর তিরোধানের পর ক্রমশ গতি হারিয়ে ও রূপ পাল্টে জাতি-রাষ্ট্রাধীন একটা প্রতিষ্ঠানে পর্যবসিত হয়েছে। এভাবে নিরন্তর শত্রু-তৈরি ও শত্রু-নাশে-উদ্যত রাজনৈতিক জাতীয়তাবাদকে মুক্তির উপায় বলে ভেবে বসার ভ্রম-বাতুলতার প্রকোপে আজ বাঙালির সমাজদেহে খোলা ঘা ছড়িয়ে পড়েছে, নিরন্তর রক্ত-চুঁইয়ে-বেরোনো ফাটলগুলো আরো চওড়া হচ্ছে. ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ রোধ হলেও ১৯৪৭ সালে জাতি-রাষ্ট্র-অর্জনের মোহে বাঙালি নিজেকে দুই টুকরো করেছে। সেই বিভাজন বরাবর ঘা কখনোই শুকোয় নি। একদিকে হিন্দুকে নায়ক করে মুসলমানকে শত্রু করা আর অন্যদিকে মুসলমানকে নায়ক করে হিন্দুকে শত্রু করার আত্মঘাতী রাজনৈতিক কৌশল ক্রমশ পালে হাওয়া পেয়ে তরতরিয়ে এগিয়েছে, এখনও এগোচ্ছে। আত্মহননে উদগ্রীব হলে আমরা আর আত্মশক্তি জাগিয়ে তোলার সাধনা করা তো দূরের কথা, তার প্রয়োজনীয়তাটাই বা বুঝবো কী করে? তাই আমাদের আত্মশক্তির সবচেয়ে বড় আধার বাংলাভাষাটাকেই আমরা মারতে বসেছি। হিন্দুবাদীরা বাংলা ভাষার থেকে ফারসি ও অন্যান্য লোকায়ত বুলির শব্দ বের করে দিয়ে সংস্কৃত-প্রধান এক রূপ প্রমিত বলে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন, আর তার উল্টোদিকে মুসলিমবাদীরা আবার সংস্কৃত সব বাদ দিয়ে ফারসি-উর্দু শব্দ বাড়িয়ে এক পাল্টা প্রমিত রূপ খাড়া করতে চেয়েছেন। এই প্রমিত রূপ নিয়ে আকচাআকচি বাংলা ভাষাকে ক্রমশ তার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষের মুখের ভাষার বৈচিত্র্য ও প্রবাহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে কুলুঙ্গিতে সাজানো মৃত দেবমূর্তি করে তুলেছে। আর তাছাড়া, পেশাজীবী-উপার্জনকে সর্বস্ব ভাবা মধ্যবিত্তরা যেমন একসময় ইংরেজি ভাষাশিক্ষাকেই মান-সম্মান-অর্থাগমের মূল উপায় রূপে ভজনা করতে শিখেছিলো, এই পরম্পরা দুই বাংলার কোথাও-ই বন্ধ তো দূরের কথা, স্তিমিতও হয়নি। ফলে শিক্ষিত জনেরা আজ বাংলা বলেন কম, ইংরেজি বলেন বেশি, বাংলায় লেখেন কম, ইংরেজিতে লেখেন বেশি। আসলে, বিবিধ বৈচিত্র্যকে মূল্য না দিয়ে এক-পাথুরে জাতীয়তা গড়া অভীষ্ট হলে, নিজের আত্মচরিত্র বা আত্মবৈশিষ্ট্যটিকেও সেই বিবিধের উদ্যানে প্রয়োজনীয় ও জরুরী একটি বস্তু হিসেবে দেখা যায় না। যারা বাংলার বিস্তীর্ণ গ্রামাঞ্চলের ভাষাকে বাংলার আত্মশক্তির আকর হিসেবে গুরুত্ব দেন না, তারা তাঁদের সাধের প্রমিত বাংলাকেও আসলে গুরুত্ব দেন না, যে কোনো সময়ে জাতীয়তাবাদী নির্ধারণের প্রয়োজনে বা পেশাজীবী অর্থাগমের টানে তাঁরা ইংরেজি, হিন্দি বা উর্দুকে নিজের ভাষা করে নিতে পারেন। একটি ভাষা সবল থাকে তার বাচকদের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ সমাজ-সংস্কৃতি-পরম্পরা স্বাস্থ্যবান ও প্রাণোচ্ছল থাকার মধ্য দিয়ে, বাংলা ভাষার প্রবাহ শুকিয়ে আসার চিহ্নগুলো ফুটে ওঠা তাই বাঙালিদের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ সমাজ-সংস্কৃতি পরম্পরার প্রবাহের শুকিয়ে আসার দিকে ইশারা করছে।
এই সব মিলেই আজ বাঙালিয়ানার সংকট। জাতি-রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক জাতীয়তাবাদের ন্যাওটা থেকে যাওয়ার মধ্য দিয়ে এই সংকটকে আরো তীব্র ও চূড়ান্ত করে তুলবো, নাকি, পিছন ফিরে আত্মবিশ্লেষণ করে বাংলার সমাজের আত্মশক্তির শুশ্রুষা ও নিরাময় করার পথ খুঁজবো? শুশ্রুষা ও নিরাময় সহজ নয়, তবে সম্ভব তো বটেই।
মার্চ, ২০২৬